মরক্কোর পাহাড়ি অঞ্চলে এমন একটি শহর রয়েছে, যেখানে বাড়ির দেওয়াল নীল, দরজা নীল, সিঁড়ি নীল, গলিপথ নীল—এমনকি সকালের আলোয় পুরো শহরটিই যেন নীল রঙের এক স্বপ্নরাজ্যে পরিণত হয়। সেই শহরের নাম শেফশাওয়েন।
উত্তর মরক্কোর রিফ পাহাড়ের কোলে অবস্থিত শেফশাওয়েন পর্যটকদের কাছে পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় শহর হিসেবে পরিচিত। অনেকেই একে “Blue City” বা “নীল শহর” বলে ডাকেন। তবে শুধুমাত্র নীল রঙের জন্য নয়, পাহাড়, পুরনো মদিনা, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য, ছোট ছোট দোকান, কারুশিল্প, স্থানীয় খাবার এবং শান্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে শেফশাওয়েনের নিজস্ব একটি চরিত্র রয়েছে।
ফেজের মতো এখানে ইতিহাসের ছাপ রয়েছে, আবার মারাকেশের মতো অতিরিক্ত ব্যস্ততাও নেই। শহরের সরু সিঁড়ি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখনও মনে হয় কোনো শিল্পীর আঁকা ছবির মধ্যে ঢুকে পড়েছি। কোথাও নীল দেওয়ালের গায়ে রঙিন ফুল, কোথাও কাঠের দরজা, কোথাও ছোট ক্যাফে, কোথাও পাহাড়ের দিকে খোলা জানালা—প্রতিটি মোড়েই নতুন দৃশ্য।
শেফশাওয়েন তাই শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি রঙ, পাহাড়, ইতিহাস ও মানুষের জীবনযাপনের এক অপূর্ব সম্মিলন।
শেফশাওয়েনের ইতিহাস
শেফশাওয়েনের ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরনো। পঞ্চদশ শতকে আন্দালুসিয়া থেকে আসা মুসলিম ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষ এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তাঁদের সঙ্গে স্পেনের আন্দালুসিয়ান সংস্কৃতিরও কিছু প্রভাব এখানে এসে মিশে যায়।
পাহাড়ঘেরা অবস্থানের কারণে শহরটি দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল। এই ভৌগোলিক অবস্থান তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্থাপত্যকে ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
পুরনো শহরের বাড়িঘর, সরু গলি এবং ছোট ছোট উঠোনে আজও সেই ঐতিহ্যের ছাপ দেখা যায়।
নীল শহরের রহস্য
শেফশাওয়েনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শহরটি নীল কেন?
এই প্রশ্নের একক কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ও স্থানীয় বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে।
একটি জনপ্রিয় ধারণা হলো, ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষ নীল রঙকে আকাশ ও ঈশ্বরের স্মরণের সঙ্গে যুক্ত করে বাড়িঘরে নীল রং ব্যবহার করতেন। আবার কেউ বলেন, নীল রং গরমের অনুভূতি কমিয়ে দেয় এবং শহরকে তুলনামূলকভাবে শীতল মনে হতে সাহায্য করে।
আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, নীল রঙের ব্যবহার ধীরে ধীরে শহরের নিজস্ব নান্দনিক পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।
যে কারণই হোক, আজ নীল রঙ শেফশাওয়েনের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নীল গলির ভেতর দিয়ে হাঁটা
শেফশাওয়েনের সৌন্দর্য সবচেয়ে ভালোভাবে অনুভব করা যায় হাঁটতে হাঁটতে।
পুরনো মদিনার গলিগুলি অনেক জায়গায় এত সরু যে বড় যানবাহন ঢুকতে পারে না। তাই হাঁটতে হাঁটতেই শহরকে আবিষ্কার করতে হয়।
একটি নীল সিঁড়ি উঠে গেছে আরেকটি গলিতে। সেই গলির শেষে আবার একটি ছোট উঠোন। কোথাও নীল দেয়ালে সাদা ফুলের টব, কোথাও রঙিন দরজা, কোথাও পুরনো কাঠের জানালা।
প্রতিটি গলিই যেন আলাদা একটি ছবি।
সকালবেলা পর্যটকের ভিড় তুলনামূলক কম থাকলে এই গলিগুলির সৌন্দর্য আরও ভালোভাবে উপভোগ করা যায়।
প্লাজা উতা এল হাম্মাম
শেফশাওয়েনের প্রাণকেন্দ্রগুলির একটি হলো প্লাজা উতা এল হাম্মাম।
পুরনো মদিনার মধ্যে অবস্থিত এই চত্বরটি স্থানীয় জীবন ও পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র।
চারপাশে রয়েছে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্য। পর্যটকরা এখানে বসে চা বা কফি পান করেন, স্থানীয় খাবার খান এবং চারপাশের পরিবেশ উপভোগ করেন।
বিকেলের দিকে চত্বরটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
কাছেই রয়েছে শহরের ঐতিহাসিক কাসবা।
কাসবা
শেফশাওয়েনের কাসবা শহরের ইতিহাস বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
পুরনো এই দুর্গসদৃশ স্থাপনার ভেতরে রয়েছে উঠোন, বাগান এবং ঐতিহাসিক অংশ। কাসবার স্থাপত্যে উত্তর আফ্রিকা ও আন্দালুসিয়ান প্রভাবের ছাপ রয়েছে।
কাসবার ওপরের অংশে উঠলে পুরনো শহর ও আশপাশের পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যায়।
নীল বাড়ির ছাদ, পাহাড়ের সবুজ এবং দূরের আকাশ—সব মিলিয়ে এখান থেকে শেফশাওয়েনকে অন্যরকম লাগে।
স্প্যানিশ মসজিদ
শহরের বাইরে পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত স্প্যানিশ মসজিদ বা Spanish Mosque একটি জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান।
মসজিদটি নিজে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও বেশি আকর্ষণীয় এর অবস্থান।
এখান থেকে শেফশাওয়েন শহরের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময় নীল শহরের ওপর আলো-ছায়ার খেলা অসাধারণ।
শহর থেকে হাঁটতে হাঁটতে এখানে পৌঁছানো যায়, যদিও পাহাড়ি পথ হওয়ায় আরামদায়ক জুতো ব্যবহার করা ভালো।
সূর্যাস্তের শেফশাওয়েন
শেফশাওয়েনের সূর্যাস্ত ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হতে পারে।
দিনের আলো ধীরে ধীরে কমতে থাকে। পাহাড়ের গায়ে ছায়া পড়ে। নীল দেয়ালগুলো কখনও গাঢ়, কখনও হালকা রঙ ধারণ করে।
শহরের ওপর থেকে সূর্যাস্ত দেখলে মনে হয় পুরো নীল শহরটি ধীরে ধীরে সন্ধ্যার আলোয় ভেসে যাচ্ছে।
ফটোগ্রাফির জন্যও এই সময়টি অত্যন্ত সুন্দর।
পাহাড় ও প্রকৃতি
শেফশাওয়েন শুধু শহর নয়; এটি রিফ পাহাড়ের অংশ।
শহরের চারপাশে পাহাড়, উপত্যকা, ঝরনা এবং সবুজ প্রকৃতি রয়েছে।
যাঁরা শুধু শহরের গলি দেখতে চান না, তাঁদের জন্য পাহাড়ি হাঁটা বা ছোট ট্রেকিংয়ের সুযোগ রয়েছে।
আশপাশের প্রকৃতিতে স্থানীয় উদ্ভিদ ও পাখির উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়।
শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে গেলে পাহাড়ি পরিবেশের শান্তি খুব ভালোভাবে অনুভব করা যায়।
রাস এল মা
শেফশাওয়েনের কাছাকাছি একটি জনপ্রিয় স্থান হলো রাস এল মা।
এটি একটি জলধারার এলাকা, যেখানে পাহাড় থেকে নেমে আসা জল শহরের দিকে প্রবাহিত হয়।
স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও এই জলধারার ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।
এখানে বসে কিছুটা সময় কাটানো যায়। চারপাশের পাহাড়ি পরিবেশ এবং পানির শব্দ শহরের ব্যস্ততার তুলনায় একেবারেই আলাদা অনুভূতি দেয়।
শেফশাওয়েনের বাজার
শহরের পুরনো বাজারে ঢুকলে বোঝা যায়, শেফশাওয়েন শুধু ছবি তোলার জায়গা নয়।
এখানে স্থানীয় কারিগররা বিভিন্ন পণ্য তৈরি ও বিক্রি করেন।
উলের পোশাক, কম্বল, কার্পেট, চামড়ার সামগ্রী, মাটির পাত্র, কাঠের তৈরি জিনিস, রঙিন কাপড় এবং হাতে তৈরি স্মারক পাওয়া যায়।
পাহাড়ি অঞ্চলের কারুশিল্পের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
কোনো পণ্য কিনলে শুধু স্মারক নয়, স্থানীয় কারিগরদের ঐতিহ্যের একটি অংশও সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া হয়।
মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক
শেফশাওয়েনের বাজারে মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও কাপড় দেখতে পাওয়া যায়।
জেলাবা, স্কার্ফ, শাল ও নানা ধরনের হাতে বোনা কাপড় পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
শীতকালে পাহাড়ি অঞ্চলের ঠান্ডার কারণে উলের তৈরি পোশাকের চাহিদাও থাকে।
রঙিন কাপড়ের সঙ্গে নীল শহরের পরিবেশ মিলিয়ে বাজারের দৃশ্যও অত্যন্ত সুন্দর।
শেফশাওয়েনের খাবার
মরক্কোর অন্যান্য শহরের মতো শেফশাওয়েনেও তাজিন ও কুসকুস জনপ্রিয়।
তাজিনে মাংস, সবজি, মশলা এবং কখনও শুকনো ফল ব্যবহার করা হয়।
স্থানীয় রুটি, অলিভ, সালাদ, স্যুপ এবং বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিও পাওয়া যায়।
পাহাড়ি পরিবেশের কারণে স্থানীয় খাবারে সহজ ও ঘরোয়া স্বাদের উপস্থিতি বেশি অনুভূত হতে পারে।
আর মরক্কোর পুদিনা চা এখানে অবশ্যই উপভোগ করা উচিত।
একটি ছোট ক্যাফের ছাদে বসে পুদিনা চা হাতে নিয়ে নীল শহরের গলি দেখা—এটিও শেফশাওয়েন ভ্রমণের অংশ।
রিয়াদে থাকার অভিজ্ঞতা
শেফশাওয়েনে থাকার জন্য ঐতিহ্যবাহী রিয়াদ বেছে নেওয়া যেতে পারে।
রিয়াদের কেন্দ্রে সাধারণত একটি উঠোন থাকে। চারপাশে ঘর এবং উপরের তলায় ছোট বারান্দা বা ছাদ থাকে।
অনেক রিয়াদকে ঐতিহ্যবাহী নকশায় সাজানো হয়েছে।
সকালে উঠেই যদি ছাদে গিয়ে দেখা যায় সামনে পাহাড়, নিচে নীল বাড়ির সারি এবং দূরে পাখির ডাক—তাহলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আরও বিশেষ হয়ে ওঠে।
ছাদের ক্যাফে
শেফশাওয়েনের অন্যতম আনন্দ হলো ছাদে বসে শহর দেখা।
অনেক ক্যাফে ও রেস্তোরাঁর ছাদ থেকে পুরনো শহরের দৃশ্য দেখা যায়।
সকালে নাশতা, বিকেলে চা কিংবা সন্ধ্যায় খাবার—সবই ছাদে বসে উপভোগ করা যায়।
একদিকে নীল শহর, অন্যদিকে রিফ পাহাড়—এই দৃশ্য পর্যটকের মনে দীর্ঘদিন থেকে যায়।
ছবি তোলার শহর
শেফশাওয়েনকে পৃথিবীর অন্যতম ফটোগ্রাফি-বান্ধব শহর বলা যায়।
কারণ এখানে প্রায় প্রতিটি গলিই একটি সম্ভাব্য ছবির ফ্রেম।
নীল দেওয়ালের সঙ্গে সাদা ফুল, রঙিন দরজা, পুরনো সিঁড়ি, কাঠের জানালা এবং পাহাড়ের পটভূমি—সব মিলিয়ে ছবির জন্য অসংখ্য সুযোগ রয়েছে।
তবে ছবি তোলার সময় স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি।
শেফশাওয়েনের শান্ত পরিবেশ
মরক্কোর বড় শহরগুলির তুলনায় শেফশাওয়েন অনেক বেশি শান্ত।
এখানে রাতের জীবন বা বড় শহরের ব্যস্ততা কম। বরং ধীরে চলা জীবনযাত্রাই শহরের সৌন্দর্যের অংশ।
সকালে দোকান খোলা, দুপুরে পর্যটকের আনাগোনা, বিকেলে ক্যাফে জমে ওঠা এবং রাতে ধীরে ধীরে শহর শান্ত হয়ে যাওয়া—এই ছন্দ শেফশাওয়েনকে অন্যরকম করে তোলে।
শেফশাওয়েন ও আন্দালুসিয়ান প্রভাব
শহরের স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে আন্দালুসিয়ার প্রভাব স্পষ্ট।
স্পেন থেকে আগত মুসলিম ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে এই প্রভাব মরক্কোতে আসে।
বাড়ির উঠোন, টাইলসের নকশা, দরজা, খিলান এবং কিছু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সেই ইতিহাসের ছাপ দেখা যায়।
এই কারণে শেফশাওয়েনের সংস্কৃতি শুধু উত্তর আফ্রিকার নয়; ভূমধ্যসাগরীয় ও আন্দালুসিয়ান ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত।
কাছাকাছি আকচোর
প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য শেফশাওয়েনের কাছাকাছি আকচোর একটি আকর্ষণীয় স্থান।
পাহাড়ি পথ, সবুজ বন, জলধারা এবং ঝরনার জন্য এই অঞ্চল জনপ্রিয়।
এখানে যেতে কিছুটা হাঁটতে হয়, তাই আরামদায়ক জুতো, পানি এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকা ভালো।
শহরের নীল গলির পাশাপাশি যদি প্রকৃতির গভীরে যেতে চান, তাহলে আকচোর ভ্রমণসূচিতে যোগ করা যেতে পারে।
পাহাড়ি ট্রেকিং
রিফ অঞ্চলে বিভিন্ন স্তরের হাঁটার পথ রয়েছে।
কিছু পথ সহজ, কিছু পথ তুলনামূলক কঠিন।
পাহাড়ি পরিবেশে হাঁটার সময় আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনে এবং প্রয়োজনে গাইডের সাহায্য নিয়ে বের হওয়া ভালো।
শেফশাওয়েনের প্রকৃতি উপভোগ করার জন্য ট্রেকিং একটি চমৎকার উপায়।
বসন্তের শেফশাওয়েন
বসন্তকালে পাহাড়ি অঞ্চল সবুজ হয়ে ওঠে।
আবহাওয়াও সাধারণত আরামদায়ক থাকে।
শহরের নীল রঙের সঙ্গে সবুজ পাহাড়ের বৈপরীত্য এই সময় বিশেষ সুন্দর লাগে।
যাঁরা হাঁটা, ছবি তোলা এবং প্রকৃতি দেখতে ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে বসন্ত একটি আকর্ষণীয় সময় হতে পারে।
গ্রীষ্মের শহর
গ্রীষ্মে দিনের বেলা তুলনামূলক উষ্ণতা থাকলেও পাহাড়ি অবস্থানের কারণে পরিবেশ অনেক সময় উপভোগ্য থাকে।
তবে দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে সকাল ও বিকেলে ঘোরাঘুরি করা সুবিধাজনক।
হালকা পোশাক, টুপি, সানস্ক্রিন এবং পর্যাপ্ত পানি সঙ্গে রাখা উচিত।
শীতের শেফশাওয়েন
শীতকালে রিফ পাহাড়ে ঠান্ডা পড়তে পারে।
নীল বাড়ির ওপর কুয়াশা বা ঠান্ডা সকালের আলো শহরকে একেবারে অন্যরকম করে তোলে।
যাঁরা শান্ত পরিবেশ ও কম পর্যটকের সময় পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে শীত আকর্ষণীয় হতে পারে।
তবে রাতে উষ্ণ পোশাকের প্রয়োজন হবে।
ভারত থেকে শেফশাওয়েন
ভারত থেকে শেফশাওয়েন ভ্রমণ করতে সাধারণত প্রথমে মরক্কোর আন্তর্জাতিক বিমান সংযোগ ব্যবহার করতে হয়।
শেফশাওয়েনে সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেই। তাই মরক্কোর অন্য শহর, বিশেষ করে ট্যাঙ্গিয়ার বা ফেজের মতো শহরের সঙ্গে ভ্রমণসূচি মিলিয়ে নেওয়া সুবিধাজনক হতে পারে।
ফেজ থেকে শেফশাওয়েন সড়কপথে যাওয়া যায়।
মরক্কো ভ্রমণের সময় ফেজ, শেফশাওয়েন, মারাকেশ, রাবাত এবং সাহারা অঞ্চলের সঙ্গে একটি বড় ভ্রমণ পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
কতদিন থাকবেন?
শেফশাওয়েনের জন্য দুই থেকে তিন দিন যথেষ্ট হতে পারে।
প্রথম দিনে পুরনো মদিনা, নীল গলি, প্লাজা উতা এল হাম্মাম, কাসবা ও বাজার ঘোরা যায়।
দ্বিতীয় দিনে রাস এল মা, স্প্যানিশ মসজিদ এবং আশপাশের পাহাড়ি এলাকা দেখা যেতে পারে।
তৃতীয় দিনে আকচোরের মতো প্রকৃতিনির্ভর কোনো স্থানে দিনের ভ্রমণ করা যায়।
আর যদি শুধু আরাম করে শহর অনুভব করতে চান, তাহলে তিন দিনও খুব দ্রুত কেটে যাবে।
তিন দিনের একটি পরিকল্পনা
প্রথম দিন
সকালে মদিনায় হাঁটা দিয়ে শুরু করা যায়। বাব এল আইন বা পুরনো শহরের প্রবেশপথ থেকে নীল গলিতে ঢুকে ধীরে ধীরে প্লাজা উতা এল হাম্মামের দিকে যাওয়া যায়।
দুপুরে কাসবা ও আশপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখা যায়।
বিকেলে বাজারে কেনাকাটা এবং ছাদে বসে চা পান করা যেতে পারে।
দ্বিতীয় দিন
সকালে রাস এল মা ঘুরে স্প্যানিশ মসজিদের দিকে যাওয়া যায়।
পাহাড়ের ওপর থেকে শহরের দৃশ্য উপভোগ করে বিকেলে আবার মদিনায় ফিরে আসা যায়।
সন্ধ্যায় নীল গলির আলো এবং স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া যেতে পারে।
তৃতীয় দিন
প্রকৃতিপ্রেমীরা আকচোরে যেতে পারেন।
যাঁরা শহরে থাকতে চান, তাঁরা স্থানীয় কারুশিল্পের দোকান ঘুরে দেখতে পারেন এবং রিয়াদের ছাদে বসে ধীরে ধীরে সময় কাটাতে পারেন।
শেফশাওয়েনের বিশেষত্ব
শেফশাওয়েনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সরলতা।
এখানে বিশাল আকাশচুম্বী ভবন নেই। নেই বড় বড় আধুনিক শপিং মল। নেই মহানগরের কোলাহল।
তার পরিবর্তে রয়েছে ছোট গলি, পুরনো দরজা, পাহাড়ের বাতাস, হাতে তৈরি সামগ্রী, স্থানীয় খাবার এবং মানুষের ধীর জীবনযাত্রা।
এই সরলতার মধ্যেই শহরের সৌন্দর্য।
ভ্রমণকারীর জন্য কিছু পরামর্শ
শেফশাওয়েনে হাঁটার জন্য আরামদায়ক জুতো অবশ্যই রাখা উচিত।
মদিনার গলিগুলি পাথুরে ও সিঁড়িবহুল হতে পারে।
স্থানীয় মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নেওয়া ভালো।
বাজারে কেনাকাটার সময় দরদাম করা প্রচলিত হলেও তা ভদ্রভাবে করা উচিত।
পাহাড়ে যাওয়ার সময় আবহাওয়া ও পথের অবস্থা সম্পর্কে আগে জেনে নেওয়া ভালো।
আর শহরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে তাড়াহুড়ো না করাই ভালো।
উপসংহার
পৃথিবীতে অনেক সুন্দর শহর আছে। কিন্তু শেফশাওয়েনের মতো শহর খুব বেশি নেই।
একটি শহর যখন নিজের স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও রঙকে এত গভীরভাবে নিজের পরিচয়ের অংশ করে নেয়, তখন সেই শহর শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র থাকে না—একটি অনুভূতিতে পরিণত হয়।
শেফশাওয়েন সেই অনুভূতির শহর।
এখানে নীল রঙ শুধু দেওয়ালে নেই; নীল রঙ মিশে আছে শহরের স্মৃতিতে, পাহাড়ের ছায়ায়, পুরনো গলির নীরবতায় এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
কখনও নীল সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে, কখনও কোনো ছোট ক্যাফের ছাদে বসে, কখনও পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে কিংবা সন্ধ্যার আলোয় পুরনো শহরের গলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হতে পারে—এটি কি সত্যিই বাস্তব শহর, নাকি কোনো শিল্পীর কল্পনার ছবি?
শেফশাওয়েনের উত্তর হয়তো তার নীল দেওয়ালের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
কারণ কিছু শহর চোখে দেখা যায়, কিছু শহর ক্যামেরায় বন্দি করা যায়, আর কিছু শহরকে শুধু অনুভব করা যায়।
শেফশাওয়েন সেই শেষের শহরগুলির একটি।
========== শেষ ==========