কাঁঠালতলা গ্রামের মানুষ রমেনকে সবাই চিনত।
সকালে সূর্য ওঠার আগেই তার সাইকেলের ঘণ্টা শোনা যেত।
টিং… টিং…
কাঁধে বাদামি রঙের ব্যাগ।
সাইকেলের সামনে ছোট্ট একটা লোহার ঝুড়ি।
আর মুখে চিরকালের শান্ত হাসি।
রমেন ছিলেন গ্রামের ডাকপিয়ন।
প্রায় তিরিশ বছর ধরে তিনি চিঠি বিলি করতেন।
তখন মোবাইল ফোন ছিল না। দূরের মানুষদের খবর আসত চিঠিতে।
কারও ছেলে শহর থেকে টাকা পাঠানোর খবর দিত।
কেউ মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ পাঠাত।
কেউ চাকরি পাওয়ার খবর জানাত।
আবার কখনও কোনো চিঠির খামে থাকত এমন খবর, যা পড়ে একটি বাড়ির সমস্ত আনন্দ এক মুহূর্তে বদলে যেত।
রমেন তাই চিঠিকে শুধু কাগজ বলে ভাবতেন না।
তিনি বলতেন,
—“চিঠির ভেতরে মানুষের জীবন থাকে।”
গ্রামের বৃদ্ধা সরস্বতী দেবী প্রতি মাসে একটি চিঠির অপেক্ষা করতেন।
চিঠিটি আসত তাঁর একমাত্র ছেলে অমলের কাছ থেকে।
অমল বহু বছর আগে কাজের জন্য মুম্বই চলে গিয়েছিল।
প্রথম দিকে নিয়মিত চিঠি আসত।
তারপর ধীরে ধীরে চিঠি কমে গেল।
তবু সরস্বতী দেবী প্রতিদিন বিকেলে বাড়ির সামনে বসে থাকতেন।
রমেন সাইকেল নিয়ে এলেই জিজ্ঞেস করতেন,
—“আমার অমলের চিঠি আছে?”
রমেন না বলতে চাইতেন না।
কিন্তু অনেক সময় সত্যিই চিঠি থাকত না।
তখন তিনি বলতেন,
—“আজ নেই মাসিমা। হয়তো কাল আসবে।”
সরস্বতী দেবী বলতেন,
—“কাল তুমি আসবে তো?”
—“আমি তো রোজই আসি।”
এই উত্তর শুনে বৃদ্ধা হাসতেন।
একদিন বর্ষার দুপুরে রমেন ডাকঘরে বসে চিঠি সাজাচ্ছিলেন।
হঠাৎ তাঁর হাতে এল একটি খাম।
প্রেরকের নাম—
অমল।
প্রাপকের নাম—
সরস্বতী দেবী।
রমেনের বুকটা আনন্দে ভরে উঠল।
কিন্তু খামের ওপর একটা লাল দাগ ছিল।
চিঠিটা সরকারি নোটিশের মতো দেখতে।
রমেন বুঝলেন, বিষয়টি হয়তো গুরুতর।
তিনি দ্রুত সাইকেল নিয়ে সরস্বতী দেবীর বাড়ির দিকে রওনা হলেন।
বৃদ্ধা দরজা খুলতেই বললেন,
—“অমলের চিঠি?”
রমেন খামটা এগিয়ে দিলেন।
সরস্বতী দেবী চিঠি পড়তে পারতেন না।
তিনি বললেন,
—“তুমি পড়ে শোনাও বাবা।”
রমেন চিঠি খুললেন।
অমল লিখেছে—
সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
কাজ হারিয়েছে।
ঋণের বোঝা বেড়েছে।
সে মায়ের কাছে ফিরতে চায়, কিন্তু হাতে টাকা নেই।
চিঠির শেষে লেখা—
“মা, আমি যদি ফিরে আসি, আমাকে কি এখনও আগের মতো গ্রহণ করবে?”
চিঠি পড়তে পড়তে রমেনের গলা ভারী হয়ে গেল।
সরস্বতী দেবী চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“ওকে বলো, বাড়ির দরজা কখনও বন্ধ হয় না।”
রমেন বললেন,
—“কিন্তু চিঠি তো আমি পাঠাব না। আপনি লিখবেন?”
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,
—“আমি লিখতে পারি না।”
রমেন বললেন,
—“তাহলে আপনি বলুন, আমি লিখে দেব।”
সেদিন রমেন নিজের হাতে একটি চিঠি লিখলেন।
সরস্বতী দেবী বললেন—
“অমল, তুই ফিরে আয়। টাকা না থাকলে কী হয়েছে? তুই থাকলেই আমার ঘর ভরা। তোর জন্য দরজা খোলা আছে।”
রমেন কথাগুলো লিখে চিঠিটি পড়ে শোনালেন।
বৃদ্ধা বললেন,
—“ঠিক আছে। এবার পাঠিয়ে দাও।”
চিঠি চলে গেল।
দিন কাটতে লাগল।
এক সপ্তাহ।
দুই সপ্তাহ।
তিন সপ্তাহ।
কোনো উত্তর নেই।
সরস্বতী দেবী প্রতিদিন রমেনকে জিজ্ঞেস করতেন,
—“অমল কিছু লিখেছে?”
রমেন বলতেন,
—“এখনও না।”
একদিন ভোরে রমেন ডাকঘরে পৌঁছে দেখলেন, তাঁর নামে একটি ফোন এসেছে।
অমল ফোন করেছে।
রমেন ফোন ধরলেন।
ওপাশ থেকে কাঁপা গলা—
—“রমেন কাকু?”
—“হ্যাঁ, বল।”
—“আমি ট্রেনে উঠেছি।”
রমেন অবাক।
—“কোথায় যাচ্ছ?”
অমল বলল,
—“বাড়ি।”
রমেনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
—“তোর মা অপেক্ষা করছে।”
অমল বলল,
—“আমি জানি।”
পরদিন সকালে গ্রামের বাসস্ট্যান্ডে একজন মানুষ নামল।
চেহারা শুকিয়ে গেছে।
কাঁধে ছোট ব্যাগ।
চোখে ক্লান্তি।
সে সরস্বতী দেবীর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
দরজা খুলতেই মা ছেলেকে দেখে কিছু বলতে পারলেন না।
অমল মায়ের পায়ে মাথা রাখল।
সরস্বতী দেবী শুধু বললেন,
—“এতদিন কোথায় ছিলি রে?”
অমল কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“ভয় পেয়েছিলাম মা।”
—“কিসের?”
—“হেরে যাওয়ার।”
মা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
—“হারলে মানুষ বাড়ি ফেরে। বাড়ি হারলে কোথায় যাবে?”
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন রমেন।
অমল তাঁকে দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল।
—“আপনি না থাকলে আমি হয়তো আর ফিরতাম না।”
রমেন হেসে বললেন,
—“আমি শুধু চিঠি পৌঁছে দিয়েছি।”
অমল মাথা নাড়ল।
—“না কাকু। আপনি শুধু চিঠি পৌঁছাননি। আপনি আমাকে বাড়ির রাস্তা দেখিয়েছেন।”
কয়েক মাস পর অমল গ্রামে ছোট্ট একটি মেরামতির দোকান খুলল।
সে মোবাইল, রেডিও, ছোট বৈদ্যুতিক যন্ত্র মেরামত করতে জানত।
দোকানটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
সরস্বতী দেবীর মুখেও আবার হাসি ফিরল।
আর রমেন?
তিনি আগের মতোই সাইকেল চালিয়ে চিঠি বিলি করতে থাকলেন।
তবে কয়েক মাস পর তাঁর নিজের জীবনে একটা পরিবর্তন এল।
ডাকঘরে নতুন প্রযুক্তি এল।
চিঠির সংখ্যা কমে গেল।
মানুষ ফোনে কথা বলে।
বার্তা পাঠায়।
ভিডিও কলে একে অপরকে দেখে।
একদিন ডাকঘরের বড়বাবু বললেন,
—“রমেন, তোমার কাজ এখন অনেক কমে যাবে।”
রমেন জানতেন, সময় বদলেছে।
তিনি হাসলেন।
—“সময় বদলাবে না তো?”
বড়বাবু বললেন,
—“কী?”
রমেন বললেন,
—“মানুষের খবর পৌঁছে দেওয়ার কাজটা।”
বড়বাবু চুপ করে গেলেন।
পরের দিন থেকে রমেন শুধু চিঠি নয়, গ্রামের বয়স্ক মানুষদের ফোন ব্যবহার করতেও সাহায্য করতে শুরু করলেন।
কেউ ছেলের নম্বর খুঁজে পায় না—রমেন সাহায্য করেন।
কেউ ভিডিও কল করতে জানেন না—রমেন শেখান।
কেউ অনলাইনে নাতির ছবি দেখতে চান—রমেন ফোনে সেটাও খুলে দেন।
গ্রামের মানুষ হাসতে হাসতে বলতে শুরু করল—
“রমেন শুধু ডাকপিয়ন নয়, খবরের মানুষ।”
বহু বছর পর রমেনের অবসর নেওয়ার দিন এল।
সেদিন গ্রামের মানুষ ডাকঘরের সামনে জড়ো হল।
অমলও এল।
তার সঙ্গে তার ছোট ছেলে।
ছেলেটি রমেনের হাতে একটি ছোট বাক্স দিল।
ভেতরে একটি নতুন সাইকেলের ঘণ্টা।
অমল বলল,
—“কাকু, আপনার পুরোনো ঘণ্টাটা তো কত বছর বাজল। এবার এটা রাখুন।”
রমেন ঘণ্টাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর সাইকেলে লাগিয়ে দিলেন।
টিং… টিং…
শব্দটা শুনে গ্রামের সবাই হেসে উঠল।
রমেন বললেন,
—“চিঠি হয়তো একদিন পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের অপেক্ষা কখনও হারাবে না।”
অমল বলল,
—“আর সেই অপেক্ষার কাছে কেউ না কেউ পৌঁছবেই।”
রমেন আকাশের দিকে তাকালেন।
সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে গ্রামের ওপর নেমে আসছে।
তিনি জানতেন, তাঁর সাইকেল হয়তো আর প্রতিদিন রাস্তায় বেরোবে না।
কিন্তু জীবনের তিরিশ বছরে তিনি যে কাজটি করেছেন, তার মূল্য কোনো ডাকটিকিটে মাপা যায় না।
তিনি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন খবর।
কখনও আনন্দের।
কখনও দুঃখের।
কখনও আশার।
আর কখনও—
ফিরে আসার সাহসের।