শালতলা গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে একটি রেললাইন।
রেললাইনটি গ্রামের মানুষকে যেন দুটো ভাগে ভাগ করে দিয়েছিল।
একদিকে বাজার, অন্যদিকে স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র।
তাই প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামের মানুষকে রেললাইন পার হতে হতো।
রেললাইনের পাশে ছিল একটি ছোট্ট কেবিন।
সেখানেই থাকতেন নরেনবাবু।
বয়স ষাটের কাছাকাছি।
তাঁর কাজ ছিল রেলগেট বন্ধ করা, খোলা এবং ট্রেন আসার সময় সতর্ক থাকা।
গ্রামের মানুষ তাঁকে মজা করে বলত,
—“নরেন কাকু না থাকলে আমাদের রাস্তাই বন্ধ।”
নরেন হেসে বলতেন,
—“আমি রাস্তা বন্ধ করি না, দুর্ঘটনা বন্ধ করার চেষ্টা করি।”
নরেনবাবুর একটি মেয়ে ছিল—মৌ।
মৌ শহরে পড়াশোনা করত।
ছুটিতে বাড়ি এলে বাবার কেবিনে বসে গল্প করত।
একদিন মৌ বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
—“বাবা, তুমি এত বছর ধরে এই কাজ করছ। কখনও ভয় লাগে না?”
নরেন বললেন,
—“ভয় লাগে বলেই সাবধান থাকি।”
—“কীসের ভয়?”
নরেন রেললাইনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“একটা ভুলের জন্য কারও জীবন যেন শেষ না হয়ে যায়।”
কথাটা মৌর মনে গেঁথে গেল।
শীতের এক সকাল।
ঘন কুয়াশা।
দূর থেকে রেললাইনের শব্দও ঠিকমতো শোনা যাচ্ছিল না।
নরেন কেবিনে বসে সিগন্যাল দেখছিলেন।
হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল, গেটের ওপারে একজন বৃদ্ধ সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
বৃদ্ধের নাম ছিল হরু কাকা।
তিনি প্রতিদিন ভোরে বাজারে সবজি নিয়ে যেতেন।
সেদিন কুয়াশায় গেট ঠিকমতো দেখতে না পেয়ে তিনি ভুল করে রেললাইনের দিকে এগিয়ে গেলেন।
নরেন সঙ্গে সঙ্গে বাঁশি বাজালেন।
—“হরু! দাঁড়াও!”
হরু থেমে গেলেন।
নরেন ছুটে গিয়ে তাঁকে সরিয়ে আনলেন।
ঠিক তখনই কুয়াশা ভেদ করে ট্রেন ছুটে গেল।
হরু কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
—“আর একটু হলেই…”
নরেন তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন,
—“তাই বলি, নিয়ম মানা কখনও ছোট ব্যাপার নয়।”
সেদিনের ঘটনার পর গ্রামের মানুষ আরও সতর্ক হল।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর নতুন সমস্যা দেখা দিল।
রেলগেটের পাশের পুরোনো রাস্তা ভেঙে গিয়েছিল।
গাড়ি বা সাইকেল নিয়ে পার হতে গেলে মানুষকে রেললাইনের একেবারে কাছ দিয়ে যেতে হচ্ছিল।
নরেন বারবার কর্তৃপক্ষকে জানালেন।
চিঠি লিখলেন।
ফোন করলেন।
কিন্তু কাজ এগোল না।
একদিন গ্রামের স্কুলের শিক্ষক শম্ভুনাথবাবু কেবিনে এসে বললেন,
—“নরেন, আমরা নিজেরা কি রাস্তা মেরামত করতে পারি না?”
নরেন বললেন,
—“পারব। কিন্তু রেললাইনের জমিতে কাজ করা যাবে না।”
শিক্ষক বললেন,
—“রেললাইনের বাইরে যতটুকু রাস্তা আছে, সেটা?”
নরেন একটু ভেবে বললেন,
—“সেটা আমরা করতে পারি।”
পরদিন থেকেই গ্রামের মানুষ কাজে নেমে পড়ল।
কেউ মাটি আনল।
কেউ ইট।
কেউ ঝুড়ি নিয়ে কাজ করল।
স্কুলের ছাত্ররাও এসে সাহায্য করল।
মৌ তখন ছুটিতে বাড়িতে ছিল।
সে বাবাকে বলল,
—“তুমি শুধু গেট পাহারা দাও না, মানুষকেও একসঙ্গে করতে পারো।”
নরেন হেসে বললেন,
—“আমি কিছু করিনি। বিপদ সবাইকে এক করে দেয়।”
রাস্তা কিছুটা ভালো হল।
কিন্তু সমস্যা পুরোপুরি কাটল না।
এক সন্ধ্যায় নরেন কেবিনে বসে ছিলেন।
হঠাৎ তিনি দেখলেন, রেললাইনের ওপরে একটি বড় গাছের ডাল পড়ে আছে।
ঝড়ে ডালটি ভেঙে পড়েছে।
ট্রেন আসার সময় খুব বেশি নেই।
নরেন সঙ্গে সঙ্গে লাল পতাকা হাতে নিলেন।
রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে পতাকা নাড়তে লাগলেন।
দূর থেকে ট্রেনের আলো দেখা গেল।
নরেন চিৎকার করলেন,
—“থামাও!”
ট্রেনের চালক দূর থেকে লাল পতাকা দেখতে পেলেন।
ট্রেন ধীরে ধীরে থেমে গেল।
কয়েক মিনিটের মধ্যে রেলকর্মীরা এসে ডাল সরিয়ে দিলেন।
ট্রেন আবার চলল।
চালক জানালা দিয়ে হাত নেড়ে নরেনকে ধন্যবাদ জানালেন।
নরেন শুধু মাথা নাড়লেন।
পরদিন খবরটা ছড়িয়ে পড়ল।
গ্রামের সবাই নরেনকে নিয়ে গর্ব করতে লাগল।
কিন্তু নরেন বললেন,
—“এতে গর্ব করার কী আছে? এটা আমার কাজ।”
মৌ বলল,
—“সবাই নিজের কাজকে এতটা সম্মান দিয়ে করলে পৃথিবীটা অনেক নিরাপদ হত।”
নরেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
কয়েক মাস পর নরেনের অবসরের সময় এল।
শেষ দিন সকালে তিনি কেবিনের দরজা খুলে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
এই ছোট্ট ঘরেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সময় কেটে গেছে।
রেললাইনের প্রতিটি শব্দ তাঁর চেনা।
কোন ট্রেন কখন আসে, কোনটা কত দ্রুত যায়—সব তাঁর মুখস্থ।
সেদিন গ্রামের মানুষ তাঁকে বিদায় জানাতে এল।
হরু কাকা বললেন,
—“তুমি না থাকলে একদিন আমি থাকতাম না।”
নরেন বললেন,
—“আপনি নিয়ম মেনেছেন, তাই বেঁচেছেন।”
শম্ভুনাথবাবু বললেন,
—“তুমি আমাদের শিখিয়েছ, সতর্কতা ভয়ের নাম নয়।”
মৌ বাবার হাতে একটি লাল পতাকা তুলে দিল।
—“এটা রাখো।”
নরেন বললেন,
—“এটা কেন?”
মৌ বলল,
—“তোমার জীবনের প্রতীক।”
নরেন কিছুক্ষণ পতাকার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“লাল পতাকা মানে শুধু থামা নয়। কখন কোথায় থামতে হবে, সেটাও বোঝা।”
সবাই চুপ করে শুনছিল।
নরেন আবার বললেন,
—“জীবনেও কখনও কখনও একটু থামতে হয়। ভুল করার আগে। রাগের সময়। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে। অন্যকে আঘাত করার আগে।”
মৌ বাবার হাত ধরল।
দূরে তখন একটি ট্রেন ছুটে গেল।
ঝকঝক… ঝকঝক…
নরেন শেষবারের মতো রেললাইনের দিকে তাকালেন।
তারপর কেবিনের দরজা বন্ধ করে দিলেন।
কিন্তু যাওয়ার আগে লাল পতাকাটি কেবিনের দেওয়ালে টাঙিয়ে রেখে গেলেন।
বহু বছর পরও গ্রামের মানুষ সেই কেবিনের পাশ দিয়ে গেলে পতাকাটির দিকে তাকাত।
তারা মনে করত—
জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়া যতটা জরুরি, সঠিক সময়ে থামতে জানাও ততটাই জরুরি।