শহরের ব্যস্ত বাজারের এক কোণে ছোট্ট একটি নাপিতের দোকান ছিল। দোকানের মালিক মধুসূদন—সবাই তাঁকে মধুদা বলে ডাকত।
দোকানটি খুব সাধারণ। একটি পুরনো চেয়ার, একটা কাঠের তাক, কয়েকটি কাঁচি আর দেওয়ালজোড়া বড় আয়না।
মধুদা বলতেন,
—“চুল কাটা আমার কাজ, কিন্তু মানুষকে একটু ভালো লাগানো আমার আসল কাজ।”
একদিন বিকেলে দোকানে এল এক কিশোর। নাম অর্ক।
সে চুপচাপ চেয়ারে বসে বলল,
—“কাকু, খুব ছোট করে চুল কেটে দিন।”
মধুদা জিজ্ঞেস করলেন,
—“কেন?”
অর্ক কিছু বলল না।
চুল কাটতে কাটতে মধুদা আয়নায় ছেলেটার মুখ দেখছিলেন। ছেলেটি বারবার নিজের মুখটা নিচু করে ফেলছিল।
শেষে মধুদা বললেন,
—“নিজের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না?”
অর্ক চমকে উঠল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—“স্কুলে সবাই আমার চেহারা নিয়ে হাসে।”
মধুদা কাঁচি থামিয়ে বললেন,
—“মানুষের মুখ নিয়ে হাসে যারা, তারা নিজের মনটা আয়নায় দেখেনি।”
অর্ক প্রথমবার মাথা তুলল।
মধুদা চুল কেটে সুন্দর করে দিলেন। শেষে আয়নাটা একটু কাছে এনে বললেন,
—“এবার নিজের দিকে তাকাও।”
অর্ক তাকাল।
মধুদা বললেন,
—“দেখলে? এই ছেলেটা খারাপ দেখতে নয়। শুধু একটু দুঃখী।”
অর্ক হেসে ফেলল।
সেদিন টাকা দিতে গেলে মধুদা বললেন,
—“আজ লাগবে না।”
—“কেন?”
—“কারণ আজ তুমি হাসলে। সেটাই আমার পারিশ্রমিক।”
এরপর অর্ক প্রায়ই দোকানে আসত। কখনও চুল কাটাতে, কখনও শুধু কথা বলতে।
মধুদা বুঝতে পারলেন, ছেলেটির সমস্যা শুধু স্কুলের ঠাট্টা নয়। পড়াশোনায়ও সে পিছিয়ে পড়ছে।
তিনি নিজের পরিচিত এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের কাছে অর্ককে পড়তে পাঠালেন।
ধীরে ধীরে অর্ক বদলে গেল।
সে পড়াশোনায় ভালো করতে শুরু করল। আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল।
বছর পাঁচেক পর একদিন মধুদা দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হঠাৎ একজন তরুণ এসে দাঁড়াল।
পরনে সুন্দর শার্ট, হাতে একটি ব্যাগ।
—“মধুদা, আমাকে চিনতে পারছেন?”
মধুদা তাকিয়ে রইলেন।
—“অর্ক?”
ছেলেটি হেসে বলল,
—“হ্যাঁ।”
সে ব্যাগ থেকে একটি নতুন আয়না বের করল।
—“আপনার দোকানের পুরনো আয়নাটা বদলে দিন।”
মধুদা অবাক হয়ে বললেন,
—“কেন?”
অর্ক বলল,
—“এই আয়নায় আমি শুধু নিজের মুখ দেখিনি। নিজের সম্পর্কে আমার ধারণাটাও বদলেছিল।”
মধুদার চোখে জল এসে গেল।
অর্ক আরও বলল,
—“আমি এখন কাউন্সেলিং নিয়ে কাজ করি। স্কুলে যেসব ছেলেমেয়েরা নিজেদের নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে, তাদের সঙ্গে কথা বলি।”
মধুদা চুপ করে শুনলেন।
অর্ক নতুন আয়নাটা দোকানের দেওয়ালে লাগিয়ে দিল।
তারপর পুরনো আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—“এটা ফেলে দেবেন না।”
—“কেন?”
অর্ক মৃদু হেসে বলল,
—“এটার মধ্যে আমার একটা পুরনো মানুষ এখনও দাঁড়িয়ে আছে।”
মধুদা কিছু বলতে পারলেন না।
শুধু ছেলেটার কাঁধে হাত রাখলেন।
দোকানের আয়নায় তখন পাশাপাশি দেখা যাচ্ছিল দুজন মানুষকে—
একজন বৃদ্ধ নাপিত,
আর একজন বড় হয়ে ওঠা সেই কিশোর।
কখনও কখনও কাউকে সুন্দর করে তুলতে কাঁচির দরকার হয় না; দরকার হয় এমন একজন মানুষের, যে তার ভেতরের সৌন্দর্যটা তাকে দেখতে শেখায়।