Categories
উপন্যাস বিবিধ

কুয়াশার ওপারে (দ্বিতীয় পর্ব)।।

দ্বিতীয় পর্ব — যে মানুষটি হারিয়ে গিয়েছিল

দরজায় আবার ধাক্কা পড়ল।

ঠক।

অর্কের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাটি ঠোঁটে আঙুল রাখল।

— চুপ।

বাইরে থেকে এবার একটা পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল।

— দরজা খুলুন। আমি থানার লোক।

মহিলাটি মাথা নাড়ল।

— বিশ্বাস করবেন না।

অর্ক ফিসফিস করে বলল,

— কিন্তু যদি সত্যিই পুলিশ হয়?

— তাহলে পরিচয়পত্র দেখাতে বলুন।

অর্ক দরজার কাছে গিয়ে বলল,

— আপনার নাম?

বাইরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর উত্তর এল—

— সাব-ইন্সপেক্টর অমিত ঘোষ।

মহিলাটি অর্কের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।

— মিথ্যে।

— আপনি কীভাবে জানলেন?

— কারণ এই শহরের থানায় অমিত ঘোষ নামে কোনো অফিসার নেই।

অর্কের শরীর শিউরে উঠল।

বাইরের লোকটি এবার জোরে দরজা ধাক্কাতে শুরু করল।

— দরজা খুলুন!

মহিলাটি অর্কের হাত ধরে টেনে পিছনের দিকে নিয়ে গেল।

— আমাদের এখনই বেরোতে হবে।

— কোথা দিয়ে?

— রান্নাঘরের পেছনে একটা দরজা আছে।

দুজনেই অন্ধকার ঘর পেরিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।

বাইরে তখন ঘন কুয়াশা।

দশ হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না।

মহিলাটি অর্ককে নিয়ে দ্রুত পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে লাগল।

অর্ক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

— আপনি কে?

— মেঘলা।

— আমার বাবাকে চিনতেন?

মেঘলা থেমে গেল।

— শুধু চিনতাম না।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— তোমার বাবার শেষ কয়েকটা দিন আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম।

অর্ক স্তব্ধ।

— তাহলে এতদিন কোথায় ছিলেন?

মেঘলা উত্তর দিল না।


১

ভোরের আলো ফুটতে ফুটতে তারা একটি ছোট্ট কাঠের বাড়িতে পৌঁছল।

মেঘলা দরজা খুলে বলল,

— ভেতরে আসুন।

ঘরের মধ্যে খুব বেশি আসবাব নেই।

একটা কাঠের টেবিল।

দুটি চেয়ার।

একটা পুরনো আলমারি।

আর দেওয়ালে ঝোলানো বেশ কিছু ছবি।

অর্ক ছবি দেখতে গিয়ে থেমে গেল।

সুব্রত সেনের ছবি।

তার বাবার।

একটা নয়।

অনেকগুলো।

বিভিন্ন সময়ের।

বিভিন্ন জায়গায়।

একটা ছবিতে তার বাবা পাহাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে।

আর পাশে মেঘলা।

অর্ক ছবিটা হাতে তুলে নিল।

— এটা কবে?

— তোমার বাবার মৃত্যুর তিন মাস আগে।

— তাহলে তিনি এখানে এসেছিলেন?

— বারবার।

— কেন?

মেঘলা জানলার বাইরে তাকাল।

— একটা পুরনো দুর্ঘটনার তদন্ত করতে।

অর্ক অবাক।

— কোন দুর্ঘটনা?

মেঘলা বলল,

— আঠারো বছর আগে তোমার বাবার যে দুর্ঘটনা হয়েছিল, সেটা একমাত্র দুর্ঘটনা ছিল না।

অর্ক কিছু বলল না।

মেঘলা ধীরে ধীরে একটা ফাইল খুলল।

তার মধ্যে ছিল পুরনো সংবাদপত্রের কাটিং।

শিরোনাম—

“পাহাড়ি রাস্তায় বাস খাদে, মৃত্যু ১১।”

তারিখ আঠারো বছর আগের।

অর্ক পড়তে পড়তে বলল,

— এই বাস দুর্ঘটনার সঙ্গে বাবার কী সম্পর্ক?

— তোমার বাবা দুর্ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।

অর্ক তাকাল।

— কী?

— বাসটা খাদে পড়ার আগে তোমার বাবা ঘটনাস্থলের কাছেই ছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, বাসের সামনে একটা ট্রাক ইচ্ছাকৃতভাবে দাঁড় করানো হয়েছিল।

— কিন্তু সংবাদে তো লেখা ছিল ব্রেক ফেল।

— সেটাই সরকারি রিপোর্ট।

অর্ক ধীরে বসে পড়ল।

— বাবা তাহলে কী দেখেছিলেন?

মেঘলা বলল,

— ট্রাকের চালককে।

— কে?

মেঘলা উত্তর দিল না।

শুধু একটা ছবি এগিয়ে দিল।

ছবিতে এক যুবক।

অর্ক ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ বলল,

— এই মানুষটাকে আমি চিনি।

মেঘলা চমকে উঠল।

— কোথায় দেখেছ?

অর্কের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

— আমার বাবার শেষকৃত্যের দিন।


২

স্মৃতিটা অর্কের মাথায় হঠাৎ ফিরে এল।

শ্মশানের ভিড়।

মায়ের কান্না।

আত্মীয়স্বজন।

আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অচেনা লোক।

কালো শার্ট।

হাতে সেই কালো ডায়ালের ঘড়ি।

তখন অর্ক ভেবেছিল, হয়তো বাবার কোনো অফিস-সহকর্মী।

কিন্তু লোকটা সেদিন তার দিকে একবার তাকিয়ে ছিল।

সেই দৃষ্টি আজও অর্কের মনে ছিল।

মেঘলা বলল,

— লোকটার নাম রণজিৎ পাল।

— সে এখন কোথায়?

— জানি না।

— আপনি কি জানেন সে বেঁচে আছে?

— হ্যাঁ।

অর্ক উঠে দাঁড়াল।

— কোথায়?

মেঘলা বলল,

— শিলাবতীপুরেই।

ঠিক তখনই বাইরে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

মেঘলা জানলার কাছে ছুটে গেল।

— ওরা আমাদের খুঁজে পেয়েছে।

অর্ক বলল,

— কারা?

মেঘলা উত্তর দিল,

— যারা চায় তোমার বাবার ফাইলটা আর কখনও বাইরে না আসুক।


৩

দুজনেই বাড়ির পেছনের সরু রাস্তা ধরে বেরিয়ে গেল।

মেঘলা অর্ককে নিয়ে পৌঁছল একটি পুরনো কাঠের সেতুর কাছে।

নিচে নদী।

কুয়াশায় নদীর জল দেখা যাচ্ছে না।

মেঘলা বলল,

— এখান থেকে আমরা আলাদা হব।

অর্ক অবাক।

— কেন?

— তুমি একা গেলে ওরা তোমাকে অনুসরণ করবে। আমি অন্যদিকে যাব।

— না। এতদূর এসে আমি আর একা যাব না।

মেঘলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

— তোমার বাবার কাছে একটা জিনিস ছিল।

— কী?

— একটা ছোট্ট নোটবুক।

অর্ক বলল,

— বাবার ডায়েরি আমার কাছে আছে।

— সেটা নয়।

— তাহলে?

— আসল নোটবুকটা কখনও তোমার বাড়িতে ছিল না।

মেঘলা পকেট থেকে একটা চাবি বের করল।

— এটা নাও।

— কীসের চাবি?

— শিলাবতীপুর পুরনো রেলগুদামের।

অর্ক অবাক হয়ে বলল,

— এখানে রেলগুদাম আছে?

— এখন নেই। বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে।

— সেখানে কী আছে?

মেঘলা বলল,

— তোমার বাবার সত্যি।


৪

পুরনো রেলগুদামটা শহরের প্রান্তে।

জং ধরা লোহার গেট।

ভাঙা দেওয়াল।

ঘাসে ঢাকা লাইন।

অর্ক আর মেঘলা সন্ধ্যার আগে সেখানে পৌঁছল।

চাবিটা তালায় ঢুকতেই অর্কের হাত থেমে গেল।

— আপনি আগে কখনও এটা খুলেছেন?

— না।

— তাহলে চাবি আপনার কাছে কীভাবে?

মেঘলা বলল,

— তোমার বাবা দিয়েছিলেন।

দরজা খুলল।

ভেতরে পুরনো কাঠের বাক্স।

লোহার তাক।

ধুলো।

অন্ধকার।

অর্ক টর্চ জ্বালিয়ে খুঁজতে লাগল।

একটা বাক্সের গায়ে লেখা—

S.S.

অর্কের বুক ধক করে উঠল।

সুব্রত সেন।

বাক্স খুলতেই বেরিয়ে এল একটা নোটবুক।

কালো মলাট।

প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখা।

“যদি অর্ক এই খাতা পড়ে, তবে ধরে নেব আমি আর বেঁচে নেই।”

অর্কের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

সে পড়তে লাগল।

“আমি যে বাস দুর্ঘটনার তদন্ত করছি, তার সঙ্গে শুধু দুর্নীতি নয়, মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে। দুর্ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল। কারণ বাসে এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি পাহাড়ি অঞ্চলের জমি দখলের একটি বড় চক্রের প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।”

পরের পাতায় নাম।

রণজিৎ পাল।

তার নিচে—

দেবাশিস মল্লিক।

আরও একটি নাম—

অমল সরকার।

অর্ক থেমে গেল।

— অমল সরকার?

মেঘলা বলল,

— নামটা গুরুত্বপূর্ণ।

— কে?

— সেই সময়ের পরিবহণ দফতরের কর্মকর্তা।

অর্ক আবার পড়তে লাগল।

“আমি বুঝতে পারছি, আমাকে নজরে রাখা হচ্ছে। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল একজনকে বিশ্বাস করা।”

পরের পাতাটা ছিঁড়ে নেওয়া।

তার পরের পাতায় শুধু একটা বাক্য—

“বিশ্বাসঘাতক আমার খুব কাছেই।”

অর্ক মাথা তুলল।

মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে।

— তোমার বাবা কাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন?

অর্ক বলল,

— জানি না।

ঠিক তখনই গুদামের বাইরে পায়ের শব্দ হল।

মেঘলা বাতি নিভিয়ে দিল।

দুজনেই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

বাইরে দুজন লোক কথা বলছে।

— বাক্সটা এখানেই আছে।

অন্যজন বলল,

— ওরা ভেতরে ঢুকেছে।

অর্ক মেঘলার দিকে তাকাল।

মেঘলা ঠোঁট নাড়ল—

পেছনের দরজা।


৫

তারা পেছনের ভাঙা দেওয়াল টপকে বেরিয়ে এল।

কিন্তু অর্কের হাতে নোটবুকটা রয়ে গেল।

পাহাড়ি রাস্তা ধরে ছুটতে ছুটতে মেঘলা বলল,

— এবার তোমাকে একটা কথা বলতে হবে।

— কী?

— তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগের রাতে আমি তাঁর সঙ্গে ছিলাম।

অর্ক থেমে গেল।

— কী বলছেন?

— তিনি আমাকে বলেছিলেন, যদি তাঁর কিছু হয়, তাহলে যেন তোমাকে শিলাবতীপুরে নিয়ে আসি।

— কিন্তু আপনি এতদিন আমাকে ডাকেননি কেন?

মেঘলার চোখে অপরাধবোধ।

— কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।

— কিসের?

— তোমাকে হারানোর।

অর্ক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

মেঘলা বলল,

— তোমার বাবা মারা যাওয়ার পর যারা তদন্ত করছিল, তাদের মধ্যে একজন আমাকে বলেছিল—আমি যদি মুখ খুলি, তোমাকেও মেরে ফেলবে।

অর্ক ধীরে বলল,

— আপনি কে ছিলেন বাবার?

মেঘলা উত্তর দিল,

— তাঁর সহকারী।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— আর শেষ দিকে তাঁর সবচেয়ে কাছের সাক্ষী।


৬

রাতের দিকে তারা একটা ছোট্ট অতিথিশালায় আশ্রয় নিল।

অর্ক নোটবুকটা আবার খুলল।

একটা পাতায় লেখা ছিল—

“অর্ককে সত্যিটা জানাতে হলে প্রথমে ওকে রণজিতের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু রণজিৎ নিজে অপরাধী নয়। সে শুধু জানে কে আসল মানুষটি।”

অর্ক মেঘলার দিকে তাকাল।

— রণজিৎ যদি অপরাধী না হয়, তাহলে এতদিন আমরা তাকে কেন সন্দেহ করছিলাম?

মেঘলা বলল,

— কারণ সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

— কেন?

— কারণ সে সাক্ষী।

— কিসের সাক্ষী?

মেঘলা উত্তর দেওয়ার আগেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল।

দুজনেই চুপ।

আবার কড়া নাড়া।

তারপর একটি কণ্ঠ—

— অর্কবাবু?

অর্ক দরজার কাছে গেল।

— কে?

বাইরে থেকে উত্তর এল—

— আমি রণজিৎ পাল।

অর্কের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।

মেঘলা ফিসফিস করে বলল,

— দরজা খুলো না।

অর্ক তাকাল।

— কেন?

মেঘলা ধীরে বলল,

— কারণ রণজিৎ পাল গতকাল রাতে মারা গেছে।

অর্কের মুখ সাদা হয়ে গেল।

বাইরে আবার সেই কণ্ঠ ভেসে এল—

— অর্কবাবু, দরজা খুলুন। আপনার বাবার মৃত্যুর সত্যিটা আমি জানি।

অর্ক দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নোটবুকের শেষ পাতাটা খুলল।

সেখানে বাবার হাতের লেখায় মাত্র একটি লাইন—

“যদি রণজিৎ তোমার সামনে আসে, তার কথা বিশ্বাস কোরো না। কারণ সে একা আসবে না।”

বাইরে তখন ধীরে ধীরে দরজার হাতল নড়তে শুরু করেছে।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *