Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ বিকেলের আলো (প্রথম পর্ব)।।

প্রথম পর্ব — ফিরে আসা মানুষ

শহরটা সমুদ্রের খুব কাছে।

সকালবেলা বাতাসে নোনতা গন্ধ থাকে। দুপুরে রাস্তাগুলো ঝিমিয়ে পড়ে। আর বিকেল নামলেই পুরনো বাড়িগুলোর দেওয়ালে কমলা আলো এসে পড়ে।

সেই শহরের নাম রূপসাগর।

প্রায় পনেরো বছর পর সেখানে ফিরল নীলাদ্রি।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

সবকিছু যেন একই রকম।

আবার কিছুই আগের মতো নেই।

যে চায়ের দোকানে স্কুল থেকে ফেরার পথে দাঁড়িয়ে থাকত, সেটার জায়গায় এখন মোবাইলের দোকান।

যে মাঠে বিকেলে ফুটবল খেলত, সেখানে বহুতল বাড়ি।

শুধু স্টেশনের সামনের পুরনো কৃষ্ণচূড়া গাছটা এখনও আছে।

নীলাদ্রি ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল।

আজ তাকে নিজের বাড়িতে ফিরতে হবে।

বাড়ি—যেটা সে পনেরো বছর আগে রাগ করে ছেড়ে গিয়েছিল।

তার বাবা মারা যাওয়ার পর।

বাবার সঙ্গে শেষ কথাটা আজও মনে আছে।

— তুমি যদি আজও ওই লোকটার কথা বিশ্বাস করো, তাহলে এই বাড়িতে তোমার থাকার দরকার নেই।

নীলাদ্রি সেদিন উত্তর দিয়েছিল,

— আমিও আর থাকতে চাই না।

সেই রাতেই সে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

তারপর আর ফেরেনি।

মায়ের মৃত্যুর খবরেও না।

শেষ পর্যন্ত বাড়িটা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

আজ সেই বাড়ি দেখতে এসেছে।


বাড়ির দরজায় পুরনো তালা।

নীলাদ্রি চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলল।

ধুলো।

পুরনো আসবাব।

দেওয়ালে বাবার ছবি।

একটা ঘড়ি এখনও টিকটিক করছে।

নীলাদ্রি ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকল।

হঠাৎ মনে হল—

বাড়িটা যেন তাকে চিনতে পেরেছে।

সে ধীরে ধীরে বাবার ঘরে ঢুকল।

টেবিলের ওপর কিছু পুরনো কাগজ।

একটা ডায়েরি।

আর একটা কাঠের বাক্স।

বাক্সের ওপর লেখা—

“নীলাদ্রির জন্য। তবে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের আগে খুলবে না।”

নীলাদ্রি অবাক হয়ে গেল।

তার এখন বয়স ছত্রিশ।

সে বাক্স খুলল।

ভেতরে একটা ঘড়ি।

একটা পুরনো ছবি।

আর একটি ছোট্ট কাগজ।

কাগজে লেখা—

“তুই যখন এটা পড়বি, তখন হয়তো আমি থাকব না। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—তোর মায়ের মৃত্যুর জন্য নিজেকে কখনও দোষী ভাবিস না।”

নীলাদ্রির হাত কেঁপে উঠল।

মা তো অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিলেন।

তাহলে বাবা কেন এমন কথা লিখেছিলেন?

তার চোখ চলে গেল ছবিটার দিকে।

ছবিতে তার মা।

বাবা।

আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট মেয়ে।

নীলাদ্রি ছবিটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।

মেয়েটাকে সে চেনে না।

কিন্তু ছবির পেছনে লেখা—

“১৯৯৮। সমুদ্রের ধারে। নীলাদ্রি ও মেঘ।”

মেঘ?

কে মেঘ?

তার নিজের নাম তো নীলাদ্রি।

সে ছোটবেলার কোনো বন্ধু ছিল কি?

মনে করার চেষ্টা করল।

কিছুই মনে পড়ল না।

ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল।

নীলাদ্রি ছবিটা দ্রুত পকেটে ঢুকিয়ে দরজা খুলল।

সামনে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধা।

চোখে মোটা চশমা।

তিনি নীলাদ্রির দিকে তাকিয়ে বললেন,

— তুমি ফিরে এসেছ?

— আপনি আমাকে চেনেন?

বৃদ্ধা হেসে বললেন,

— তোমাকে না চিনে এই বাড়ির সামনে এত বছর দাঁড়িয়ে থেকেছি নাকি?

নীলাদ্রি অবাক।

— আপনি কে?

— আমি কমলা।

একটু থেমে বললেন,

— তোমার মায়ের বন্ধু ছিলাম।

নীলাদ্রি বলল,

— মা সম্পর্কে কিছু জানেন?

কমলার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

— কিছু কথা আছে, যা তোমার মা চেয়েছিলেন তুমি কোনোদিন জানতে না।

নীলাদ্রি চুপ করে গেল।

— কী কথা?

কমলা চারপাশে তাকালেন।

তারপর নিচু গলায় বললেন,

— তোমার মা মারা যাওয়ার আগে আমাকে একটা জিনিস দিয়ে গিয়েছিলেন।

— কী?

— একটা চিঠি।

নীলাদ্রি এগিয়ে এল।

— কোথায়?

কমলা ব্যাগ থেকে একটি পুরনো খাম বের করলেন।

খামের ওপর লেখা—

“নীলাদ্রি যখন ফিরে আসবে।”

নীলাদ্রির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

সে খামটা খুলল।

ভেতরে মাত্র কয়েক লাইন।

“বাবার কথাগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করিস না।

আর মেঘকে খুঁজে বের করিস।

সে জানে কেন তোর জীবন থেকে একটা বছর মুছে ফেলা হয়েছিল।”

নীলাদ্রি চিঠিটা পড়ে স্থির হয়ে রইল।

— একটা বছর মুছে ফেলা হয়েছিল?

কমলা ধীরে মাথা নাড়লেন।

— হ্যাঁ।

— আমার জীবন থেকে?

— তোমার স্মৃতি থেকে।

নীলাদ্রি ফিসফিস করে বলল,

— কিন্তু কেন?

কমলা জানলার বাইরে তাকালেন।

সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে নামছে।

— কারণ সেই এক বছরে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যেটা তোমার বাবা চেয়েছিলেন সবাই ভুলে যাক।

— কী ঘটনা?

কমলা উত্তর দিলেন না।

শুধু বললেন,

— মেঘকে খুঁজে বের করো।

— সে কোথায়?

কমলা দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

তারপর ফিরে তাকিয়ে বললেন,

— সমুদ্রের ধারে যে পুরনো বাতিঘরটা আছে, সেখানে প্রতি বছর শেষ বিকেলে একজন মানুষ আসে।

— কে?

বৃদ্ধা মৃদু স্বরে বললেন,

— মেঘ।


সন্ধ্যা নেমে গেল।

নীলাদ্রি বাড়ির বারান্দায় বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মাথায় একের পর এক প্রশ্ন।

কে এই মেঘ?

কেন তার স্মৃতি থেকে একটা বছর মুছে ফেলা হয়েছিল?

তার মা কেন বাবাকে বিশ্বাস করতে নিষেধ করেছিলেন?

আর সবচেয়ে বড় কথা—

ছবির সেই ছোট্ট মেয়েটি কে?

রাত বাড়ার আগে নীলাদ্রি বাবার ঘরে ফিরে গেল।

সে ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম কয়েকটি পাতা ফাঁকা।

তারপর একটি তারিখ।

১২ জুন, ১৯৯৮।

নিচে বাবার লেখা—

“আজ নীলাদ্রি আর মেঘকে সমুদ্রের ধারে নিয়ে গিয়েছিলাম।”

পরের পাতায়—

“আজ যা ঘটল, তা কাউকে বলা যাবে না।”

তারপর আরও কয়েকটি পাতা ছেঁড়া।

শেষে একটি বাক্য—

“একদিন নীলাদ্রি সব মনে করতে পারবে। আর সেদিন সত্যিটা আর লুকিয়ে রাখা যাবে না।”

নীলাদ্রি ডায়েরি বন্ধ করল।

ঠিক তখনই বাইরে সমুদ্রের দিক থেকে একটা শব্দ এল।

দূরে কোথাও ঘণ্টা বাজল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

নীলাদ্রি জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

বাতিঘরের আলো ঘুরে এসে তার বাড়ির ওপর পড়ল।

আর সেই আলো সরে যাওয়ার মুহূর্তে সে দেখল—

বাড়ির গেটের বাইরে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে।

সাদা পোশাক।

লম্বা চুল।

মুখটা অন্ধকারে ঢাকা।

নীলাদ্রি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

— কে?

মহিলা কোনো উত্তর দিল না।

শুধু হাত তুলে সমুদ্রের দিকে ইশারা করল।

তারপর ধীরে ধীরে চলে গেল।

নীলাদ্রি দৌড়ে গেটের কাছে পৌঁছল।

রাস্তা ফাঁকা।

কেউ নেই।

কিন্তু মাটিতে পড়ে আছে একটা ছোট্ট জিনিস।

একটি পুরনো রুপোর লকেট।

নীলাদ্রি সেটা তুলে নিল।

লকেট খুলতেই ভেতরে ছোট্ট একটি ছবি।

একই মেয়ে।

যাকে সে ছবিতে দেখেছিল।

আর ছবির নিচে লেখা—

“মেঘ — ১৯৯৮”

নীলাদ্রি আকাশের দিকে তাকাল।

সমুদ্রের ওপরে তখন শেষ বিকেলের আলো পুরোপুরি নিভে গেছে।

কিন্তু তার মনে হল—

পনেরো বছর পর সে বাড়িতে ফেরেনি।

সে ফিরে এসেছে এমন একটি বছরের কাছে,

যে বছরটা তার জীবন থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *