Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ বিকেলের আলো (দ্বিতীয় পর্ব — মুছে যাওয়া বছর)।

দ্বিতীয় পর্ব — মুছে যাওয়া বছর

সকালে ঘুম ভাঙতেই নীলাদ্রির প্রথম মনে পড়ল রুপোর লকেটটার কথা।

রাতের অন্ধকারে গেটের সামনে যে মহিলা দাঁড়িয়েছিল, সে কে?

মেঘ?

নাকি অন্য কেউ?

বিছানা থেকে উঠে নীলাদ্রি লকেটটা হাতে নিল।

ভেতরের ছবিটা এখনও সেখানে।

ছোট্ট মেয়ে।

চোখে অদ্ভুত এক শান্ত দৃষ্টি।

ছবির পেছনে তারিখ—

১৯৯৮।

নীলাদ্রি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকাল।

তার শৈশবের স্মৃতি খুব পরিষ্কার নয়।

কিন্তু একটা জায়গার কথা তার মনে আছে।

সমুদ্র।

একটা লাল ছাতা।

আর একটা মেয়ের হাসি।

তারপর—

শূন্যতা।

সে কখনও বুঝতে পারেনি কেন তার শৈশবের একটি বছর যেন কুয়াশার মধ্যে ঢাকা।

আজ প্রথমবার সেই শূন্যতার একটা নাম পেল—

মেঘ।


১

নীলাদ্রি কমলাদেবীর বাড়িতে গেল।

বৃদ্ধা তখন উঠোনে বসে শুকনো কাপড় ভাঁজ করছিলেন।

নীলাদ্রি লকেটটা তাঁর সামনে রাখল।

— এটা কোথায় পেলাম জানেন?

কমলা তাকিয়ে রইলেন।

— জানি।

— আপনি জানতেন?

— জানতাম একদিন এটা তোমার হাতে ফিরবে।

— মেঘ কে?

কমলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

— তোমার ছোটবেলার বন্ধু।

— শুধু বন্ধু?

কমলা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— তোমাদের দুজনকে আলাদা করে ভাবাই যেত না।

নীলাদ্রি বসে পড়ল।

— তাহলে আমি ওকে মনে করতে পারি না কেন?

— কারণ তোমার বাবা তোমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিলেন।

— কীভাবে?

— দুর্ঘটনার পর।

নীলাদ্রি চমকে উঠল।

— কোন দুর্ঘটনা?

কমলা বললেন,

— ১৯৯৮ সালের ১৭ জুন।

তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।

সেদিন সমুদ্রের ধারে প্রচণ্ড ঝড় উঠেছিল।

নীলাদ্রি আর মেঘ তখন খুব ছোট।

দুজনেই বিকেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

মেঘের হাতে ছিল লাল ছাতা।

সমুদ্রের ধারে একটা পুরনো জেটির কাছে গিয়ে তারা খেলছিল।

হঠাৎ ঝড়ের মধ্যে জেটির একটা অংশ ভেঙে পড়ে।

নীলাদ্রি জলে পড়ে যায়।

মেঘ তাকে বাঁচাতে ঝাঁপ দেয়।

তারপর দুজনেই নিখোঁজ।

কয়েক ঘণ্টা পর নীলাদ্রিকে পাওয়া যায়।

মেঘকে নয়।

নীলাদ্রি বেঁচে গিয়েছিল।

কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর সে কিছুই মনে করতে পারছিল না।

কমলা বললেন,

— তোমার বাবা তখন ডাক্তারদের বলেছিলেন, ও যেন আর কখনও সেই দিনের কথা জানতে না পারে।

নীলাদ্রি ফিসফিস করে বলল,

— কেন?

কমলা বললেন,

— কারণ তিনি জানতেন মেঘ বেঁচে আছে।

নীলাদ্রি চমকে উঠল।

— কী?

— হ্যাঁ।

— তাহলে সবাই বলল না কেন?

কমলা চোখ নামিয়ে বললেন,

— কারণ মেঘকে তোমার বাবাই লুকিয়ে রেখেছিলেন।


২

নীলাদ্রি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

— আমার বাবা কেন মেঘকে লুকিয়ে রাখবেন?

কমলা বললেন,

— কারণ মেঘ সেদিন এমন কিছু দেখেছিল, যা তোমার বাবা চাইছিলেন না কেউ জানুক।

— কী দেখেছিল?

— আমি জানি না।

— আপনি জানেন না?

— তোমার বাবা আমাকে শুধু বলেছিলেন, “মেঘ বেঁচে আছে। কিন্তু ওকে সামনে আনলে নীলাদ্রির জীবন বিপদে পড়বে।”

নীলাদ্রি উঠে দাঁড়াল।

— মেঘ কোথায় ছিল এত বছর?

কমলা বললেন,

— প্রথমে একটা আশ্রমে।

— তারপর?

— তারপর অন্য শহরে।

— এখন?

কমলা তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

— এখন সে নিজেই তোমার কাছে ফিরে এসেছে।

নীলাদ্রি স্তব্ধ হয়ে গেল।

— তাহলে কাল রাতে যে মহিলা—

— হ্যাঁ।


৩

বিকেল হতে না হতেই নীলাদ্রি বাতিঘরের দিকে রওনা হল।

পুরনো বাতিঘরটা সমুদ্রের একেবারে কিনারে।

চারপাশে বাতাস।

নিচে পাথরে আছড়ে পড়ছে ঢেউ।

বাতিঘরের পাশে একটা বেঞ্চ।

সেখানে একজন মহিলা বসে ছিল।

সাদা পোশাক।

চুল খোলা।

নীলাদ্রি ধীরে এগিয়ে গেল।

মহিলা মুখ তুলল।

দুজনের চোখাচোখি হল।

নীলাদ্রির বুকের মধ্যে হঠাৎ অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল।

যেন এই চোখ সে বহু বছর আগে দেখেছে।

মহিলা বলল,

— অনেক দেরি করেছিস।

নীলাদ্রি থেমে গেল।

— তুমি মেঘ?

মহিলা মৃদু হাসল।

— আমাকে চিনতে পারছিস?

নীলাদ্রি মাথা নাড়ল।

— না।

মেঘ বলল,

— আমি জানতাম।

তারপর পকেট থেকে একটা পুরনো লাল ফিতা বের করল।

— এটা মনে আছে?

নীলাদ্রি ফিতেটা দেখেই চোখ বন্ধ করল।

হঠাৎ তার মাথার ভেতর একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।

সমুদ্র।

বৃষ্টি।

একটা ছোট মেয়ে হাসছে।

সে বলছে—

“নীল, আমাকে ছেড়ে যাস না।”

নীলাদ্রি চোখ খুলল।

মেঘ তার দিকে তাকিয়ে।

— কিছু মনে পড়ল?

— একটু।

— আর মনে পড়বে।


৪

মেঘ তাকে বাতিঘরের নিচের একটা ছোট ঘরে নিয়ে গেল।

ঘরের ভেতর একটা পুরনো কাঠের বাক্স।

মেঘ বলল,

— এটা তোমার বাবার।

অর্কের বদলে নীলাদ্রি নামটা যেন এখানে ভুলভাবে ঢুকে পড়তে পারত, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল—এই বাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে সে বুঝল, তার অতীতের আরও একটা দরজা খুলতে চলেছে।

মেঘ বাক্স খুলল।

ভেতরে কিছু কাগজ।

একটি পুরনো ক্যামেরা।

আর একটা ছোট অডিও ক্যাসেট।

মেঘ বলল,

— তোমার বাবা সেদিন সবকিছু রেকর্ড করেছিলেন।

— কী?

— কারণ তিনি আগেই বুঝেছিলেন বিপদ আসছে।

নীলাদ্রি ক্যাসেটটা হাতে নিল।

— এটা কোথায় ছিল?

— আমার কাছে।

— এত বছর?

— হ্যাঁ।

— তাহলে আমাকে এখন দিলে কেন?

মেঘ তার চোখের দিকে তাকাল।

— কারণ এখন আর তোমাকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যে বলার দরকার নেই।

অডিও চালু করা হল।

কিছুক্ষণ সমুদ্রের শব্দ।

তারপর সুব্রত সেনের কণ্ঠ—

“মেঘ, যদি তুমি এটা শুনতে পাও, তাহলে বুঝব আমি ব্যর্থ হয়েছি।”

নীলাদ্রি নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে লাগল।

“আজ রাতে আমি যে লোকটার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি, সে জানে ১৭ জুন কী ঘটেছিল।”

একটু বিরতি।

“ও জানে নীলাদ্রিকে কেন জলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।”

নীলাদ্রির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে মেঘের দিকে তাকাল।

মেঘের চোখে জল।

রেকর্ডিং চলতে লাগল—

“আমি যদি ফিরে না আসি, মেঘকে নিয়ে দূরে চলে যেও। কারণ বিপদটা দুর্ঘটনা থেকে শুরু হয়নি।”

হঠাৎ রেকর্ডিং বন্ধ।

নীলাদ্রি বলল,

— “নীলাদ্রিকে জলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল”—এর মানে কী?

মেঘ চুপ করে রইল।

— মেঘ!

সে ধীরে বলল,

— সেদিন তুমি নিজে জলে পড়িসনি।

— তাহলে?

— কেউ তোমাকে ধাক্কা দিয়েছিল।


৫

নীলাদ্রির মাথা ঘুরে উঠল।

— কে?

মেঘ বলল,

— আমি জানি না।

— তুমি দেখেছিলে?

— হ্যাঁ।

— তাহলে বলো!

মেঘ চোখ বন্ধ করল।

— লোকটা তোমার বাবার সঙ্গে ঝগড়া করছিল।

— আমার বাবা সেখানে ছিলেন?

— ছিলেন।

— তাহলে বাবা আমাকে বাঁচালেন?

— হ্যাঁ।

— আর তুমি?

মেঘ মৃদু হাসল।

— আমি তোকে ছাড়া ফিরিনি।

নীলাদ্রি কিছু বলতে পারল না।

মেঘ বলল,

— তোর বাবা তোকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

— কোথায়?

— একটা পুরনো বাড়িতে।

— কেন?

— কারণ যে লোকটা তোকে ধাক্কা দিয়েছিল, সে তোমার বাবাকে বলেছিল—যদি সত্যিটা প্রকাশ হয়, তাহলে পরের বার শুধু তোকে নয়, তোমার মাকেও মেরে ফেলবে।

নীলাদ্রি মাথায় হাত রাখল।

এত বছর ধরে সে যে গল্প জানত, তার প্রতিটি অংশ যেন বদলে যাচ্ছে।

তার বাবা দুর্ঘটনায় মারা যাননি।

তার শৈশবের সেই বছরও সাধারণ ছিল না।

আর মেঘ—

মেঘ তার জীবনের এমন একটা অংশ, যাকে ইচ্ছে করে তার কাছ থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছিল।


৬

ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ।

মেঘ জানলার কাছে গিয়ে তাকাল।

— ওরা এসেছে।

— কারা?

— যারা এত বছর ধরে এই সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছে।

— এখন কী করব?

মেঘ বাক্সটা বন্ধ করে বলল,

— আমাদের এখান থেকে যেতে হবে।

কিন্তু দরজা খোলার আগেই বাইরে থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল—

— মেঘ, এবার আর পালিয়ে লাভ নেই।

মেঘের মুখ সাদা হয়ে গেল।

নীলাদ্রি ফিসফিস করে বলল,

— কে?

মেঘ উত্তর দিল না।

দরজায় আবার কড়া নাড়া হল।

তারপর সেই কণ্ঠ—

— নীলাদ্রি, তোমার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী মানুষটা তোমার খুব কাছের ছিল।

নীলাদ্রি স্থির হয়ে গেল।

— কী বলছেন?

বাইরে থেকে উত্তর এল—

— তোমার নিজের পরিবারে এমন একজন ছিল, যে জানত ১৯৯৮ সালে কী ঘটেছিল।

মেঘ অর্কের দিকে নয়, নীলাদ্রির দিকে তাকিয়ে বলল,

— দরজা খুলিস না।

বাইরের লোকটি এবার শেষ কথা বলল—

— কারণ তোমার মা যে গল্পটা তোমাকে বলেছিলেন, সেটাও মিথ্যে ছিল।

তারপর গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ।

গাড়ি দূরে সরে গেল।

নীলাদ্রি ধীরে ধীরে মেঘের দিকে তাকাল।

— আমার মা কী লুকিয়েছিলেন?

মেঘ কোনো উত্তর দিল না।

শুধু বাবার বাক্সের নিচ থেকে আরেকটা খাম বের করল।

খামের ওপর মায়ের হাতের লেখা।

“নীলাদ্রি যখন সত্যিটা জানার জন্য প্রস্তুত হবে।”

নীলাদ্রি খামটা হাতে নিল।

তার আঙুল কাঁপছিল।

কারণ সে বুঝতে পারছিল—

এতদিন যে গল্পটাকে সে নিজের পরিবারের গল্প বলে জানত,

সেটা আসলে তার জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যে।

আর সেই মিথ্যের কেন্দ্রে ছিল—

তার বাবা,

তার মা,

মেঘ,

এবং সেই একটা বছর, যেটা তার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা হয়েছিল।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *