Categories
উপন্যাস বিবিধ

কুয়াশার বাড়ি (প্রথম পর্ব : বন্ধ জানালার ওপারে)।

প্রথম পর্ব : বন্ধ জানালার ওপারে

শীতের সকাল।

রাস্তাটা যেন কুয়াশার ভেতর হারিয়ে গেছে।

গাড়ির জানালার বাইরে যতদূর চোখ যায়, শুধু ধূসর সাদা পর্দা। মাঝে মাঝে সেই পর্দা ভেদ করে গাছের কালো ছায়া দেখা যাচ্ছে। তারপর আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

অভীক চৌধুরী জানালার কাচে কপাল ঠেকিয়ে বসেছিল।

পনেরো বছর পর সে ফিরছে মাধবপুরে।

এই শহরটা তার কাছে কোনোদিনই খুব বড় ছিল না।

একটা পুরনো বাজার।

একটা নদী।

একটা কলেজ।

রেলস্টেশন।

আর শহরের শেষ প্রান্তে একটা বিশাল বাড়ি—

চৌধুরী বাড়ি।

সেই বাড়িতেই কেটেছিল তার শৈশব।

কিন্তু আজ সেখানে ফেরার কারণ আনন্দের নয়।

তার কাকা, অরুণ চৌধুরী, মারা গেছেন তিন সপ্তাহ আগে।

অরুণ কাকা ছিলেন তার বাবার ছোট ভাই।

বাবা-মা দুজনেই মারা যাওয়ার পর তিনিই অভীকের অভিভাবক হয়েছিলেন।

কিন্তু মাত্র কয়েক বছর পরেই অভীক মাধবপুর ছেড়ে কলকাতায় চলে যায়।

তারপর আর ফিরে আসেনি।

কাকা মারা যাওয়ার পর আইনজীবীর কাছ থেকে একটা চিঠি এসেছিল।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“বাড়িটি বিক্রি করার আগে আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকতে হবে।”

আর একটা লাইন—

“আপনার কাকার রেখে যাওয়া কিছু নথি আপনাকে নিজে হাতে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।”

এই শেষ লাইনটাই অভীককে ফিরিয়ে এনেছে।

গাড়ি যখন মাধবপুরের পুরনো রাস্তার দিকে ঢুকল, তখন ঘড়িতে সকাল সাড়ে দশটা।

কুয়াশা একটু পাতলা হয়েছে।

দূরে নদী দেখা গেল।

অভীকের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ অনুভূত হল।

এই নদীর ধারেই একদিন সে তার ছোট ভাই অয়নকে হারিয়েছিল।

পনেরো বছর আগে।

মাত্র বারো বছর বয়সে।

সেই ঘটনাটার পরই অভীক শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

অয়নের মৃত্যুকে সবাই বলেছিল দুর্ঘটনা।

নদীতে পড়ে গিয়েছিল।

স্রোতে ভেসে গিয়েছিল।

শরীর পাওয়া যায়নি।

কিন্তু অভীক কখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি।

কারণ অয়ন সাঁতার জানত।

আর সেদিন নদীর জল ছিল অস্বাভাবিক শান্ত।


চৌধুরী বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই অভীক কিছুক্ষণ নড়ল না।

বাড়িটা আগের মতোই আছে।

দোতলা পুরনো বাড়ি।

দেওয়ালে শ্যাওলা।

লোহার গেটের ওপর মরচে।

বারান্দার স্তম্ভে ফাটল।

আর দোতলার শেষ ঘরের জানালা—

বন্ধ।

অভীকের চোখ সেখানে আটকে গেল।

ছোটবেলায় ওই ঘরটাকে সবাই বলত—

“উত্তরের ঘর।”

কাকা কখনও কাউকে সেখানে ঢুকতে দিতেন না।

অয়ন একবার বলেছিল,

“ওই ঘরে কী আছে জানিস?”

অভীক হেসে বলেছিল,

“ভূত।”

অয়ন বলেছিল,

“ভূত নয়। কেউ আছে।”

তখন অভীক হেসেছিল।

আজ সেই কথাটাই হঠাৎ মনে পড়ল।

গেট খুলে এক বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন।

অভীক তাঁকে চিনতে একটু সময় নিল।

—হরিপদ কাকা?

বৃদ্ধের চোখ বড় হয়ে গেল।

—অভীক?

—হ্যাঁ।

হরিপদ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

—তুই অনেক বদলে গেছিস।

অভীক মৃদু হাসল।

—আপনিও।

হরিপদ হাসলেন না।

তিনি শুধু বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—বাড়িটা তো বদলায়নি।

তার গলায় এমন একটা সুর ছিল, যেন কথাটার মধ্যে অন্য কোনো অর্থ লুকিয়ে আছে।


দুপুরে আইনজীবী এলেন।

নাম সুশান্ত দে।

তিনি কাগজপত্র খুলে বললেন,

—আপনার কাকা বাড়িটা আপনার নামে করে গেছেন।

অভীক অবাক হল।

—আমার নামে?

—হ্যাঁ।

—কিন্তু কাকা তো জানতেন আমি এখানে থাকব না।

—জানতেন।

—তাহলে?

সুশান্তবাবু একটা খাম বের করলেন।

—এটা আপনার কাকার ব্যক্তিগত চিঠি। উনি বলেছেন, বাড়ি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এটা আপনাকে পড়তে হবে।

অভীক খামটা নিল।

খামের ওপর লেখা—

“অভীক, একা পড়বে।”

সে খাম খুলল।

ভেতরে মাত্র কয়েক লাইন।

“অভীক,

তুই যদি এই বাড়ি বিক্রি করতে চাস, করিস।

কিন্তু তার আগে উত্তরের ঘরটা খুলবি।

আর একটা কথা মনে রাখিস—

অয়নের মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না।

তুই যেটা দেখেছিলি, সেটা পুরো সত্যি নয়।

—অরুণ”

অভীকের হাত কেঁপে উঠল।

সে চিঠিটা আবার পড়ল।

তারপর তৃতীয়বার।

অয়নের মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না।

পনেরো বছর ধরে যে প্রশ্নটা সে নিজের মধ্যে চাপা দিয়ে রেখেছিল, আজ তার কাকা মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নটাকে আবার জাগিয়ে দিয়েছেন।

সুশান্তবাবু বললেন,

—আপনি ঠিক আছেন?

অভীক চিঠিটা ভাঁজ করল।

—হ্যাঁ।

তারপর জিজ্ঞেস করল,

—উত্তরের ঘরের চাবি কোথায়?

সুশান্তবাবু হরিপদের দিকে তাকালেন।

হরিপদ নিচু গলায় বললেন,

—চাবি আমার কাছে নেই।

—কোথায়?

—জানি না।

অভীক কিছু বলল না।

হরিপদ এবার ধীরে বললেন,

—তবে একটা কথা বলি।

—কী?

—ওই ঘরটা খোলার দরকার নেই।

অভীক তাকিয়ে রইল।

—কেন?

বৃদ্ধের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

—কারণ তোর কাকা পনেরো বছর ধরে ওই ঘরটা বন্ধ রেখেছিলেন।

—আর এখন?

—এখন উনি নেই।

—তাই?

হরিপদ উত্তর দিলেন না।


রাত নামার পর বাড়িটা অন্যরকম হয়ে গেল।

পুরনো কাঠের দরজা বাতাসে শব্দ করছে।

দোতলার করিডোরে পায়ের শব্দের মতো আওয়াজ হচ্ছে।

অভীক নিজের ঘরে বসে পুরনো অ্যালবাম দেখছিল।

একটা ছবিতে সে আর অয়ন।

দুজনেই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে।

অয়নের হাতে একটা ছোট নীল বল।

ছবির পেছনে কাকার হাতের লেখা—

“মাধবপুর, ২০০৯।”

অভীক ছবিটা উল্টে রাখল।

ঠিক তখনই—

ঠক।

দোতলার করিডোরে একটা শব্দ হল।

অভীক দরজা খুলে বাইরে এল।

সব অন্ধকার।

সে মোবাইলের আলো জ্বালল।

করিডোরের শেষ প্রান্তে উত্তরের ঘরের দরজা।

বন্ধ।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে যেন একটা শব্দ এল।

খুব ক্ষীণ।

টুপ।

তারপর আবার।

টুপ।

অভীক দরজায় কান রাখল।

নিঃশব্দ।

হয়তো পুরনো বাড়ির কাঠের শব্দ।

সে ফিরে আসতে যাচ্ছিল।

তখনই ভেতর থেকে একটা শব্দ এল।

একটা শিশুর কণ্ঠ।

খুব আস্তে—

—দাদা…

অভীক জমে গেল।

তার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে দরজায় হাত রাখল।

—কে?

কোনো উত্তর নেই।

অভীক আবার বলল,

—কে ওখানে?

কয়েক সেকেন্ড পর ভেতর থেকে শব্দ এল।

—দাদা…

এইবার কণ্ঠটা পরিষ্কার।

অভীক পিছিয়ে গেল।

কারণ সেই কণ্ঠ সে চেনে।

পনেরো বছর ধরে সে সেই কণ্ঠ আর শোনেনি।

অয়ন।


অভীক ছুটে নিচে নেমে এল।

হরিপদ তখন রান্নাঘরের পাশে বসে ছিলেন।

অভীক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—ওই ঘরে কে আছে?

হরিপদ মুখ তুলে তাকালেন।

—কোন ঘর?

—উত্তরের ঘর।

বৃদ্ধের মুখের রং বদলে গেল।

—তুই কিছু শুনেছিস?

—হ্যাঁ।

—কী?

অভীক কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

—অয়নের গলা।

হরিপদ চোখ নামিয়ে ফেললেন।

—অসম্ভব।

—কেন?

—কারণ অয়ন নেই।

—আমি জানি!

অভীক চিৎকার করে উঠল।

—আমি জানি অয়ন নেই। কিন্তু আমি ওর গলা শুনেছি!

হরিপদ উঠে দাঁড়ালেন।

—আজ রাতে ওই দিকটায় যাস না।

—আপনি কী জানেন?

—কিছু না।

—মিথ্যে বলছেন।

হরিপদ তাকালেন তার দিকে।

তার চোখে ভয়।

—তোর কাকা বলেছিলেন, তুই ফিরে এলে যেন তোকে কিছু না বলি।

—কী কিছু?

হরিপদ কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু বললেন,

—সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা কর।


সেই রাতেই অভীক ঘুমোতে পারল না।

ভোররাতে সে একটা পুরনো কাঠের আলমারি খুলতে গিয়ে একটা ছোট বাক্স পেল।

বাক্সের ওপর লেখা—

“অয়নের জিনিস।”

ভেতরে একটা নীল বল।

একটা ভাঙা ঘড়ি।

আর একটা ছোট কাগজ।

অভীক কাগজটা খুলতেই দেখল—

“দাদা, যদি আমি কখনও হারিয়ে যাই, নদীর দিকে তাকাস না।

উত্তরের ঘরের জানালার দিকে তাকাস।

ওখানেই উত্তর আছে।”

অভীক নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

এই লেখা অয়নের।

সে নিশ্চিত।

কিন্তু তারিখ?

কাগজের নিচে লেখা—

১৭ নভেম্বর ২০০৯।

অয়ন নিখোঁজ হয়েছিল—

১৬ নভেম্বর ২০০৯।

অর্থাৎ এই চিঠি লেখা হয়েছিল অয়ন নিখোঁজ হওয়ার পরের দিন।

অভীকের মাথা ঘুরে উঠল।

কেউ যদি চিঠিটা পরে লিখে থাকে?

অয়ন যদি বেঁচে থেকেও থাকে?

তাহলে এত বছর কোথায় ছিল?


সকালে অভীক প্রথমেই উত্তরের ঘরের সামনে গেল।

দিনের আলোয় দরজাটা আগের চেয়ে আরও পুরনো লাগছিল।

সে হাতল ধরল।

তালা নেই।

অভীক থমকে গেল।

গত রাতে তো দরজায় তালা ছিল।

সে ধীরে দরজা ঠেলে খুলল।

ঘরের ভেতর ধুলো।

একটা পুরনো খাট।

দেওয়ালে বইয়ের তাক।

একটা কাঠের টেবিল।

আর জানালা।

জানালাটা ভেতর থেকে বন্ধ।

অভীক টেবিলের কাছে গেল।

সেখানে একটা পুরনো টেপরেকর্ডার।

তার পাশে তিনটি ক্যাসেট।

প্রথমটির ওপর লেখা—

“অভীক।”

দ্বিতীয়টি—

“অয়ন।”

তৃতীয়টি—

“যেদিন সত্যিটা জানবি।”

অভীক তৃতীয় ক্যাসেটটা হাতে নিল।

তার হাত কাঁপছিল।

ঠিক তখনই পিছন থেকে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

ধাম!

অভীক ঘুরে দাঁড়াল।

কেউ নেই।

সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

দরজা খুলছে না।

সে জোরে ধাক্কা দিল।

—হরিপদ কাকা!

কোনো উত্তর নেই।

তারপর—

জানালার দিক থেকে একটা শব্দ।

অভীক ধীরে ঘুরে তাকাল।

জানালার কাচের ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে।

কুয়াশায় মুখ দেখা যাচ্ছে না।

শুধু একটা হাত।

হাতটা কাচের ওপর উঠে এল।

তারপর আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে লেখা হল—

“দাদা, আমাকে খুঁজিস না।”

অভীক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে টেপরেকর্ডারটা নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

খসখসে শব্দের পর একটা কণ্ঠ ভেসে এল।

অয়নের কণ্ঠ।


“দাদা, যদি তুই এই টেপটা শুনিস, তাহলে বুঝবি আমি এখনও বেঁচে আছি।”

অভীকের বুকের ভেতর যেন বিস্ফোরণ হল।

কণ্ঠটা আবার বলল—

“কিন্তু আমাকে খুঁজতে যাস না। কারণ যারা আমাকে নিয়ে গেছে, তারা জানে তুই একদিন ফিরে আসবি।”

টেপে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর অয়নের কণ্ঠ—

“আর দাদা… কাকাকে বিশ্বাস করিস না।”

টেপ থেমে গেল।

অভীক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

বাইরে তখন কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে।

জানালার ওপারের সেই মানুষটিও নেই।

কিন্তু কাচের ওপর লেখা কথাটা এখনও স্পষ্ট—

“আমাকে খুঁজিস না।”

অভীক ধীরে টেপরেকর্ডারের দিকে তাকাল।

তারপর দ্বিতীয় ক্যাসেটটা হাতে নিল।

“অয়ন।”

ক্যাসেটটা ঢোকানোর আগেই দরজার বাইরে হরিপদের কণ্ঠ শোনা গেল—

—অভীক, দরজা খোল!

অভীক দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

হরিপদ দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন।

তার চোখ প্রথমেই পড়ল টেপরেকর্ডারের ওপর।

তারপর কাচের লেখার দিকে।

বৃদ্ধের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

—তুই টেপটা শুনেছিস?

অভীক বলল,

—হ্যাঁ।

হরিপদ চোখ বন্ধ করলেন।

—তাহলে আর কিছু লুকিয়ে রাখা যাবে না।

অভীক এগিয়ে এল।

—অয়ন কোথায়?

হরিপদ উত্তর দিলেন না।

—কাকা কী করেছিলেন?

বৃদ্ধ এবার ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালেন।

—তোর কাকা অয়নকে নদী থেকে উদ্ধার করেননি।

অভীকের বুক কেঁপে উঠল।

—তাহলে?

হরিপদ ফিসফিস করে বললেন,

—অয়নকে নদী থেকে কেউ নিয়ে গিয়েছিল।

—কে?

বৃদ্ধের ঠোঁট কাঁপল।

—যে লোকটাকে তুই পনেরো বছর ধরে মৃত ভেবে এসেছিস…

অভীক তাকিয়ে রইল।

—সে এখনও বেঁচে আছে।

হরিপদ থামলেন।

তারপর বললেন—

—আর সে আজ সকালেই এই বাড়িতে এসেছে।

অভীকের চোখ বড় হয়ে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে নিচতলার দরজায় তিনবার কড়া নাড়ার শব্দ হল।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

দুজনেই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকাল।

বাড়ির ভেতর আবার সেই কণ্ঠ ভেসে এল—

—অভীক…

একটা অপরিচিত পুরুষের গলা।

—অনেক দেরি করে ফেলেছিস।

কুয়াশার বাড়ির দরজা তখন ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *