তৃতীয় পর্ব : যে স্মৃতি ফিরে এসেছিল
রাত তখন অনেক।
রূপসাগরের সমুদ্রের শব্দ যেন আরও কাছে চলে এসেছে। জানলার কাঁচে বাতাস ধাক্কা মারছে বারবার। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল, তারপর আবার সব চুপ।
টেবিলের ওপর খোলা পড়ে আছে নীলাদ্রির মায়ের সেই খাম।
খামের ওপর লেখা—
“নীলাদ্রি যখন সত্যিটা জানার জন্য প্রস্তুত হবে।”
নীলাদ্রি অনেকক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার পাশে মেঘ।
দুজনেই যেন বুঝতে পারছিল, এই খামের ভেতরে শুধু কয়েকটা কাগজ নেই। আছে পনেরো বছরের নীরবতা। আছে একটা পরিবারের লুকিয়ে রাখা ইতিহাস। আর আছে সেই এক বছর, যে বছরটাকে নীলাদ্রি নিজের জীবন থেকে হারিয়ে ফেলেছিল।
শেষ পর্যন্ত মেঘই বলল,
—খুলবে?
নীলাদ্রি ধীরে মাথা নাড়ল।
খামটা খুলতেই বেরিয়ে এল চার পাতার একটি চিঠি।
মায়ের হাতের লেখা।
নীলাদ্রি পড়তে শুরু করল।
“নীল,
তুই যদি এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব তুই আর পালিয়ে বেড়াস না।
তোকে আমরা মিথ্যে বলেছিলাম। কিন্তু সেই মিথ্যের কারণ ছিল তোকে বাঁচিয়ে রাখা।
১৯৯৮ সালের ১৭ জুন যা ঘটেছিল, সেটা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।
তোকে কেউ জলে ফেলে দিয়েছিল।
তুই বেঁচে গিয়েছিলি।
আর মেঘ তোকে বাঁচাতে জলে ঝাঁপ দিয়েছিল।
সেদিনের পর থেকে তোর স্মৃতির কিছু অংশ তুই নিজেই হারিয়ে ফেলেছিলি। আমরা সেটা জোর করে ফিরিয়ে আনিনি।
কারণ তুই একটা দৃশ্য দেখেছিলি।
এমন একটা দৃশ্য, যার জন্য একজন মানুষকে ভয় পেতাম আমরা।
প্রবীর সেনগুপ্ত।”
নীলাদ্রির চোখ হঠাৎ থেমে গেল।
নামটা সে চিনত।
প্রবীর কাকা।
বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
ছোটবেলায় যিনি প্রায়ই তাদের বাড়িতে আসতেন। মাকে “বৌদি” বলতেন। নীলাদ্রির জন্মদিনে বই এনে দিতেন।
চিঠির পরের লাইন—
“প্রবীর তোর বাবার বন্ধু ছিল। কিন্তু পরে জানতে পারি, সে দেবাশিস মল্লিকের সঙ্গে কাজ করত।
রূপসাগর ও আশপাশের জমি নিয়ে একটা বড় চক্র তৈরি হয়েছিল। মানুষের জমি কম দামে কিনে নিয়ে পরে পর্যটন প্রকল্পের নামে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছিল।
তোর বাবা প্রথমে শুধু একটা বাস দুর্ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করছিল।
কিন্তু পরে বুঝতে পারে, ওই দুর্ঘটনার সঙ্গে জমি দখলের একটা যোগ আছে।
তারপর থেকেই ওকে চাপ দেওয়া শুরু হয়।
তুই সেদিন ভুল করে সেই লোকদের কথোপকথন শুনে ফেলেছিলি।
তাই তোকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়।
তুই জলে পড়ার পর মেঘ তোকে বাঁচিয়ে ফেলেছিল।
কিন্তু মেঘও সব দেখেছিল।
আমরা দুজনেই বুঝেছিলাম, তোমাদের দুজনকে আলাদা না করলে তোমাদের জীবন বিপদে পড়বে।
তাই মেঘকে দূরে পাঠানো হয়।
আর তোকে বলা হয়েছিল, মেঘ চলে গেছে।
আমি তোকে আরও একটা মিথ্যে বলেছিলাম।
আমি বলেছিলাম, তোর বাবা দুর্ঘটনায় মারা গেছে।
সত্যিটা হলো—ওর মৃত্যুর পেছনেও সেই মানুষগুলোর হাত ছিল।
তুই তখন ছোট।
তোর মনে এসব রেখে দিলে তুই স্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারতিস না।
তাই ডাক্তার রমেন মুখার্জির সাহায্যে আমরা তোর সঙ্গে কয়েক মাস কাজ করেছিলাম। তোর স্মৃতির যে অংশগুলো তোকে ভয় দেখাত, সেগুলো তুই নিজেই চাপা দিয়ে ফেলেছিলি।
আমরা শুধু সেই ভুলে যাওয়াটাকে জোর করে ফিরিয়ে দিইনি।
মনে রাখিস—
তুই কোনো অপরাধ করিসনি।
মেঘও করেনি।
তোদের বাঁচানোর জন্যই আমরা তোদের আলাদা করেছিলাম।
আর যদি কোনোদিন সত্যিটা জানতে চাস, তাহলে বাবার ঘড়িটা দেখিস।
ওই ঘড়ির পেছনে উত্তর আছে।”
চিঠি শেষ।
নীলাদ্রি কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
তার চোখ আটকে আছে হাতঘড়িটার দিকে।
কালো ডায়াল।
রুপোর চেন।
বাবার ঘড়ি।
হঠাৎ তার মাথার ভেতর যেন একটা দরজা খুলে গেল।
একটা দৃশ্য।
সমুদ্র।
বৃষ্টি।
চিৎকার।
তার ছোট্ট শরীর জলের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে।
আর ওপরে—
দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
একজন তার বাবা।
আর একজন—
কালো ডায়ালের ঘড়ি পরা।
রুপোর চেন।
তারপর একটা হাত।
ধাক্কা।
নীলাদ্রির বুক কেঁপে উঠল।
—মেঘ!
মেঘ ছুটে এল।
—কী হয়েছে?
—আমি দেখেছি।
—কী?
—কে আমাকে জলে ফেলেছিল।
মেঘ নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
নীলাদ্রি চোখ বন্ধ করল।
আরও একটা স্মৃতি ফিরে আসছে।
সেদিন বিকেলে সে একা ছিল না।
মেঘ তার সঙ্গে ছিল।
তারা দুজনে সমুদ্রের ধারে খেলছিল।
হঠাৎ মেঘ বলেছিল,
—ওই দেখ, তোমার বাবা কার সঙ্গে কথা বলছে?
দূরে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।
তার পাশে সুব্রত সেন।
আর প্রবীর সেনগুপ্ত।
দুজনের মধ্যে তর্ক হচ্ছিল।
ছোট্ট নীলাদ্রি দূর থেকে শুনেছিল—
“আমি কাগজগুলো পুলিশের হাতে দেব।”
প্রবীর বলেছিল,
“সুব্রত, তুমি বুঝতে পারছ না তুমি কী করতে যাচ্ছ!”
“মানুষের জমি দখল করে ব্যবসা করা অপরাধ।”
“সবাই করে।”
“আমি সবাই নই।”
তারপর প্রবীর চলে গিয়েছিল।
কিন্তু যাওয়ার আগে সে একবার পিছনে তাকিয়েছিল।
তার চোখ পড়েছিল নীলাদ্রির দিকে।
সেই চোখ।
সেই কালো ঘড়ি।
তারপর—
আরেকটা স্মৃতি।
নীলাদ্রি মেঘকে বলছে,
—চলো বাবাকে বলি।
মেঘ মাথা নাড়ছে।
—না। আগে দেখি উনি কোথায় যান।
তারা দুজনে পেছন পেছন গিয়েছিল।
একটা পুরনো গুদামের কাছে।
সেখানে আরও দুজন লোক ছিল।
তাদের একজনের নাম নীলাদ্রি তখন শুনেছিল—
দেবাশিস মল্লিক।
দেবাশিস বলেছিল,
“ছেলেটা অনেক কিছু দেখে ফেলেছে।”
প্রবীর উত্তর দিয়েছিল,
“আমি সামলে নেব।”
তারপর মেঘ নীলাদ্রির হাত শক্ত করে ধরেছিল।
কিন্তু পিছন থেকে কেউ এসে নীলাদ্রিকে ধরে ফেলেছিল।
তারপর—
সমুদ্র।
অন্ধকার জল।
মেঘের চিৎকার।
আর একটা দৃশ্য—
জলের ধারে দাঁড়িয়ে প্রবীর।
সে ফোনে বলছে,
“ছেলেটা পড়েছে। কিন্তু মেয়েটা সব দেখেছে।”
নীলাদ্রি চোখ খুলল।
তার শরীর ঘামে ভিজে গেছে।
মেঘ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে।
—প্রবীর।
নীলাদ্রি বলল,
—হ্যাঁ।
—আমি জানতাম।
—তুমি জানতেই?
—আমি ওকে দেখেছিলাম।
মেঘ ধীরে বলল,
—সেদিন ওর মুখ আমি দেখেছিলাম। তোমাকে জলে ফেলে দেওয়ার পর ও আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম। তোমার বাবা আমাকে ধরে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।
নীলাদ্রি তাকিয়ে রইল।
—তারপর?
—তারপর তোমার বাবা আমাকে বলেছিলেন, “তুমি যদি নীলাদ্রিকে বাঁচাতে চাও, তাহলে আজকের ঘটনা কাউকে বলবে না।”
—আর তুমি?
—আমি চুপ করেছিলাম।
মেঘের চোখে জল এসে গেল।
—কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।
নীলাদ্রি কিছু বলল না।
শুধু হাত বাড়িয়ে মেঘের হাত ধরল।
পরদিন সকালে তারা গেল অমল সরকারের কাছে।
অমলবাবু অনেকক্ষণ চুপ করে সব শুনলেন।
তারপর আলমারি থেকে একটা পুরনো ফাইল বের করলেন।
—এটা তোমার বাবার কাছে ছিল।
নীলাদ্রি অবাক।
—আপনার কাছে কীভাবে?
—তোমার বাবা মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে আমাকে দিয়েছিলেন।
ফাইল খুলতেই বেরিয়ে এল কয়েকটি নথি।
বাস দুর্ঘটনার রিপোর্ট।
কিছু জমির দলিল।
ব্যাংক লেনদেনের কাগজ।
আর একটি পেনড্রাইভ।
অমলবাবু বললেন,
—তোমার বাবা বুঝেছিলেন, তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে। তাই মূল নথির কপি আলাদা আলাদা মানুষের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।
—বাস দুর্ঘটনাটা?
—ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছিল।
—কেন?
অমলবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—বাসে যারা ছিল, তাদের মধ্যে তিনজন এমন জমির মালিক ছিলেন যারা তাদের জমি বিক্রি করতে রাজি হচ্ছিলেন না। দুর্ঘটনার পরে তাদের একজন মারা যান। বাকি দুজন ভয়ে জমি বিক্রি করে দেন।
মেঘ বলল,
—আর দেবাশিস মল্লিক?
—পুরো চক্রের অর্থনৈতিক সমন্বয়কারী।
—প্রবীর?
অমলবাবু চুপ করলেন।
তারপর বললেন,
—প্রবীর ছিল মধ্যস্থতাকারী। কিন্তু পরে সে আরও অনেক গভীরে চলে যায়।
নীলাদ্রি বলল,
—আমার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে ওর সম্পর্ক?
অমলবাবু একটা কাগজ সামনে রাখলেন।
—এটা দেখো।
কাগজটা ছিল একটি পুরনো টেলিফোন কলের নোট।
তারিখ—
২৩ আগস্ট ২০০৮।
সুব্রত সেনের মৃত্যুর আগের দিন।
নোটে লেখা—
“প্রবীর আবার ফোন করেছে। বলেছে, ফাইল বন্ধ না করলে এবার পরিবারকে টার্গেট করা হবে।”
নীলাদ্রির বুক ঠান্ডা হয়ে গেল।
—আমার বাবা এটা লিখেছিলেন?
—হ্যাঁ।
—তাহলে পুলিশকে বলেননি কেন?
অমলবাবু মাথা নিচু করলেন।
—ভয় পেয়েছিলাম।
সেই স্বীকারোক্তির মধ্যে কোনো অজুহাত ছিল না।
শুধু দীর্ঘদিনের অপরাধবোধ।
সেদিন বিকেলেই নীলাদ্রি থানায় গেল।
তার হাতে বাবার নথি।
মায়ের চিঠি।
পুরনো ছবি।
আর মেঘের সাক্ষ্য।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পেনড্রাইভ।
তার মধ্যে ছিল একটি ভিডিও।
সুব্রত সেনের রেকর্ড করা।
ভিডিওতে তিনি বলছিলেন—
“যদি এই ভিডিও কেউ দেখে, তাহলে বুঝব আমি আর নেই।
আমি জানি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে।
দেবাশিস মল্লিকের সঙ্গে প্রবীর সেনগুপ্তের যোগাযোগের প্রমাণ আমি পেয়েছি।
আর আমি নিশ্চিত, ১৯৯৮ সালের ঘটনাটাও দুর্ঘটনা ছিল না।
আমার ছেলে নীলাদ্রিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল।
মেঘ সব দেখেছে।
আমি চাই না আমার মৃত্যুর পর আমার পরিবার আবার বিপদে পড়ুক।
কিন্তু একদিন সত্যিটা প্রকাশ করতেই হবে।”
ভিডিও শেষ হওয়ার আগে সুব্রত একটা কথা বলেছিলেন—
“সত্যিকে যতদিন লুকিয়ে রাখবে, ততদিন তার ছায়া তোমাদের পিছু নেবে।”
স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে গেল।
তিন দিন পর খবর এল।
প্রবীর সেনগুপ্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তার সঙ্গে দেবাশিস মল্লিকের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়েছে।
পুরনো বাস দুর্ঘটনা নতুন করে খোলা হয়েছে।
১৯৯৮ সালের ঘটনাটিও তদন্তের আওতায় এসেছে।
অনেক পুরনো সাক্ষী সামনে এলেন।
কেউ বললেন, তারা সেদিন কালো গাড়ি দেখেছিলেন।
কেউ বললেন, সুব্রতকে মৃত্যুর আগে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
আর একজন বৃদ্ধ জেলে বললেন,
—সেদিন রাতে আমি সমুদ্রের ধারে একটা গাড়ি দেখেছিলাম। গাড়ির পাশে একজন লোক দাঁড়িয়েছিল। তার হাতে কালো ঘড়ি ছিল।
স্মৃতি কখনও কখনও মরে যায় না।
শুধু অপেক্ষা করে।
কয়েক সপ্তাহ পর রূপসাগরের পুরনো বাড়িটা বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিল নীলাদ্রি।
বাড়িটা আর তার কাছে শুধু পুরনো ইট-পাথর নয়।
এখানে তার বাবার কণ্ঠ আছে।
মায়ের ভয় আছে।
মেঘের শৈশব আছে।
আর আছে সেই সত্যি, যেটা এত বছর ধরে অন্ধকারে ছিল।
কমলাদেবী একদিন বাড়িতে এসে বললেন,
—তুই তাহলে বাড়িটা রাখছিস?
নীলাদ্রি হাসল।
—হ্যাঁ।
—কী করবি?
—বাবার ঘরটা একটা ছোট লাইব্রেরি করব।
মেঘ পাশ থেকে বলল,
—শুধু বই থাকবে না। পুরনো নথিগুলোও থাকবে।
কমলাদেবী মৃদু হেসে বললেন,
—তাহলে বাড়িটা এবার সত্যিই বাঁচবে।
একদিন সন্ধ্যায় নীলাদ্রি আর মেঘ আবার গেল সেই বাতিঘরের কাছে।
যেখানে বহু বছর পর তাদের দেখা হয়েছিল।
সূর্য তখন ডুবছে।
আকাশে কমলা আলো।
সমুদ্র শান্ত।
মেঘ বলল,
—মনে আছে, তুমি ছোটবেলায় বলেছিলে সূর্য ডোবার সময় সমুদ্রের ওপারে একটা রাস্তা তৈরি হয়?
নীলাদ্রি হাসল।
—মনে আছে।
—তখন তুমি বলেছিলে, একদিন ওই রাস্তা ধরে চলে যাবে।
—আর তুমি বলেছিলে, আমাকেও নিয়ে যাবে।
মেঘ একটু চুপ করে বলল,
—তুমি তো আমাকে রেখে চলে গিয়েছিলে।
নীলাদ্রি তার দিকে তাকাল।
—এবার আর যাব না।
মেঘ মৃদু হাসল।
দুজনেই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছু সম্পর্ককে নতুন করে নাম দিতে হয় না।
কিছু মানুষকে ফিরে পাওয়া মানেই আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া নয়।
বরং নতুন করে পথ তৈরি করা।
সূর্যের আলো আরও ফিকে হয়ে এল।
নীলাদ্রি বাবার ঘড়িটা হাতে পরল।
কালো ডায়াল।
রুপোর চেন।
একসময় এই ঘড়িটাই ছিল তার কাছে একটা রহস্য।
আজ সেটা শুধু বাবার স্মৃতি।
মেঘ জিজ্ঞেস করল,
—ঘড়িটা রাখবে?
—হ্যাঁ।
—কেন?
নীলাদ্রি বলল,
—কারণ এটা আমাকে একটা কথা শিখিয়েছে।
—কী?
—সময় কিছু মুছে দেয় না। শুধু অপেক্ষা করে।
মেঘ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
নীলাদ্রি আবার বলল,
—আর কিছু সত্যি যত দেরিতেই আসুক, একদিন আলোয় আসবেই।
বাতিঘরের আলো জ্বলে উঠল।
দূরে সমুদ্রের বুকের ওপর শেষ বিকেলের আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু আজ নীলাদ্রির মনে কোনো অন্ধকার নেই।
পনেরো বছর পর সে বুঝল—
তার জীবনের হারিয়ে যাওয়া বছরটা আসলে হারিয়ে যায়নি।
সেটা তার ভেতরেই ছিল।
তার মায়ের নীরবতায়।
তার বাবার অসমাপ্ত তদন্তে।
মেঘের অপেক্ষায়।
আর সেই সমুদ্রের জলে, যেখানে একদিন একটা শিশুকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
আজ সেই সমুদ্রই যেন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সত্যি ফিরে এসেছে।
বাবার মৃত্যুর রহস্যের উত্তর এসেছে।
মায়ের মিথ্যের কারণ জানা গেছে।
মেঘ ফিরে এসেছে।
আর নীলাদ্রি নিজের হারানো স্মৃতিকে ফিরে পেয়েছে।
শেষ বিকেলের আলোয় দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারল—
জীবনের সব অন্ধকার দূর করতে সূর্যের প্রয়োজন হয় না।
কখনও কখনও একজন মানুষই যথেষ্ট।
যে বলে—
“আমি আছি।”
মেঘ ধীরে তার হাত ধরল।
নীলাদ্রি হাতটা শক্ত করে ধরল।
তারপর দুজনে বাতিঘর থেকে নিচে নামতে শুরু করল।
পেছনে রয়ে গেল সমুদ্র।
রয়ে গেল পুরনো বাড়ি।
রয়ে গেল বহু বছরের গোপন সত্য।
আর সামনে—
একটা নতুন রাস্তা।
শেষ বিকেলের আলো তখন প্রায় নিভে এসেছে।
কিন্তু তাদের সামনে যে পথটা খুলে গেছে, সেখানে অন্ধকার ছিল না।
ছিল আগামী দিনের আলো।
— সমাপ্ত —