তৃতীয় পর্ব : কুয়াশা সরে যাওয়ার পরে
—অভীক, দরজা খোল।
কণ্ঠস্বরটা আবার এল।
অভীক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
এই গলা তার অচেনা নয়।
বরং এতটাই পরিচিত যে, সেই পরিচিতিই এখন তাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে।
সে ধীরে দরজার কাছে গেল।
—কে?
বাইরে থেকে উত্তর এল,
—আমি।
অভীক দরজা খুলল না।
—নাম বলুন।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর উত্তর এল—
—আমি সুশান্ত দে।
অভীক চমকে উঠল।
আইনজীবী।
যে মানুষটা দুদিন আগে তার কাকার উইল নিয়ে এসেছিল।
অভীক দরজার ফাঁক দিয়ে তাকাল।
করিডোরে সত্যিই সুশান্ত দাঁড়িয়ে।
কিন্তু তার মুখে সেই শান্ত ভাব নেই।
চোখে উদ্বেগ।
—দরজা খোল, অভীক। কথা আছে।
অভীক বলল,
—আপনি এই সময়ে এখানে কেন?
সুশান্ত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—তোর কাকার একটা জিনিস আমার কাছে ছিল। সেটা আজই তোকে দিতে হবে।
—কী জিনিস?
—একটা ডায়েরি।
অভীক দরজা খুলে দিল।
সুশান্ত ঘরে ঢুকে চারদিকে তাকালেন।
তারপর খুব নিচু গলায় বললেন,
—রণেন তোকে সব বলেনি।
—কী বলেনি?
—অয়নকে লুকিয়ে রাখার আসল কারণ।
অভীক তাকিয়ে রইল।
—তাহলে আপনি জানেন অয়ন কোথায়?
সুশান্ত মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ।
—কোথায়?
—নবগ্রামে।
অভীক চমকে উঠল।
রণেনের দেওয়া ঠিকানা।
সুশান্ত বললেন,
—কিন্তু যাওয়ার আগে তোর কাকার ডায়েরিটা পড়তে হবে।
তিনি ব্যাগ থেকে একটা কালো ডায়েরি বের করলেন।
প্রথম পাতায় লেখা—
“যদি অভীক ফিরে আসে।”
অভীক ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম কয়েক পাতা অরুণের নিজের লেখা।
“আমি জানি, একদিন অভীক ফিরবে।
সেদিন ওকে আর মিথ্যে বলা যাবে না।
অয়ন বেঁচে আছে।
কিন্তু ওকে আমি নিজের ইচ্ছায় লুকিয়ে রাখিনি।
ওকে বাঁচানোর জন্যই লুকিয়েছিলাম।
রণেন ওকে নদী থেকে তুলে এনেছিল।
কিন্তু রণেনকে আমি পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারিনি।
কারণ রণেন নিজেও সেই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
পরে সে অনুতপ্ত হয়েছিল।
তবে শুরুতে সে তাদের হয়ে কাজ করত।”
অভীক থেমে গেল।
রণেনের কথাগুলো মনে পড়ল।
“আমাকে মৃত থাকতে হয়েছিল।”
ডায়েরির পরের পাতায়—
“অয়ন বাস দুর্ঘটনার পরে যে বাক্সটা দেখেছিল, সেটার মধ্যে শুধু জমির কাগজ ছিল না।
ছিল মানুষের নাম।
ঘুষের হিসাব।
ব্যাংক লেনদেন।
আর একটি ভিডিও।
সেই ভিডিওতে প্রমাণ ছিল, দুর্ঘটনাটা দুর্ঘটনা নয়।”
অভীক জিজ্ঞেস করল,
—ভিডিওটা কোথায়?
সুশান্ত বললেন,
—তোর কাকা সেটা কখনও কাউকে দেননি।
—কেন?
—কারণ ভিডিওতে এমন একজন মানুষ ছিল, যাকে প্রকাশ করলে পুরো চক্রের পাশাপাশি আরও বড় বিপদ তৈরি হতে পারত।
অভীক ডায়েরির পরের পাতায় গেল।
সেখানে লেখা—
“যে মানুষটা সবকিছুর পেছনে ছিল, সে বাইরের কেউ নয়।”
অভীকের বুক ধক করে উঠল।
তারপরের পাতায় শুধু একটা নামের প্রথম অক্ষর—
“স…”
পাতাটা ছেঁড়া।
অভীক বলল,
—এই পাতাটা কে ছিঁড়েছে?
সুশান্ত চুপ।
অভীক এবার কঠিন গলায় বলল,
—আপনি?
সুশান্ত মাথা নাড়লেন।
—না।
—রণেন?
—না।
—তাহলে?
সুশান্ত ধীরে বললেন,
—তোর কাকা নিজেই ছিঁড়েছিলেন।
হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ।
সুশান্ত জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন।
—ওরা এসে গেছে।
অভীক বলল,
—কারা?
—যারা এত বছর ধরে অয়নকে খুঁজছে।
—কিন্তু অয়ন তো এখানে নেই।
—ওরা জানে না।
সুশান্ত দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
—তুই এখনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা।
অভীক বলল,
—আমি পালাব না।
—এটা পালানো নয়। সত্যিটা বাঁচিয়ে রাখা।
তিনি একটা ছোট চাবি অভীকের হাতে দিলেন।
—এটা অরুণের স্টাডির টেবিলের গোপন ড্রয়ারের।
—সেখানে কী আছে?
—শেষ উত্তর।
বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে অভীক বেরিয়ে গেল।
কুয়াশা তখন এত ঘন যে কয়েক হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না।
সে রাস্তার দিকে হাঁটতে হাঁটতে পিছনে তাকাল।
চৌধুরী বাড়ির দোতলার উত্তরের জানালায় আলো জ্বলছে।
একটা ছায়া দাঁড়িয়ে।
অভীক থেমে গেল।
ছায়াটা হাত তুলল।
তারপর জানালার আলো নিভে গেল।
সকাল হওয়ার আগেই অভীক মাধবপুর ছাড়ল।
নবগ্রামের দিকে যাওয়ার বাসে বসে তার মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন—
অয়ন কেন এত বছর নিজের পরিচয় লুকিয়ে ছিল?
দুই ঘণ্টা পরে বাস পাহাড়ি রাস্তার কাছে পৌঁছল।
একটা ছোট শহর।
নবগ্রাম।
রণেন যে ঠিকানা দিয়েছিল, সেটা ছিল একটা পুরনো লাইব্রেরির পাশে।
অভীক সেখানে পৌঁছে দরজায় দাঁড়াল।
দরজায় ছোট নামফলক—
“অর্ক সেন।”
অভীকের বুক কেঁপে উঠল।
সে দরজায় কড়া নাড়ল।
কোনো উত্তর নেই।
আবার।
এইবার ভেতর থেকে পায়ের শব্দ।
দরজা খুলল একজন যুবক।
বয়স প্রায় আটাশ।
চোখ দুটো গভীর।
মুখে অদ্ভুত শান্তি।
অভীক কিছু বলতে পারল না।
যুবকটি বলল,
—দাদা?
অভীকের চোখে জল চলে এল।
—অয়ন?
যুবকটি ধীরে হাসল।
—হ্যাঁ।
অভীক আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে ভাইকে জড়িয়ে ধরল।
দুজনেই অনেকক্ষণ কিছু বলল না।
পনেরো বছরের দূরত্ব যেন সেই এক মুহূর্তে ভেঙে গেল।
কিছুক্ষণ পর অয়ন বলল,
—আমি জানতাম তুমি একদিন আসবে।
—তুই আমাকে চিনলি কীভাবে?
—রণেন স্যার তোমার ছবি দেখিয়েছিলেন।
—তুই এত বছর কোথায় ছিলি?
—প্রথমে রণেন স্যারের পরিচিত এক পরিবারের কাছে। পরে নিজের নামে পড়াশোনা শুরু করি। অর্ক নামটা ব্যবহার করি।
—কিন্তু আমাকে একটা খবরও দিলি না?
অয়ন মাথা নিচু করল।
—দিতে চেয়েছিলাম।
—তাহলে?
—যারা আমাকে খুঁজছিল, তারা তোমাকেও ব্যবহার করত।
অভীক চুপ।
অয়ন একটা আলমারি খুলে একটা ধাতব বাক্স বের করল।
—এটার জন্যই এত বছর আমাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে।
বাক্সের ভেতরে একটা পুরনো মেমোরি কার্ড।
আর একটা ছবি।
ছবিতে বাস দুর্ঘটনার দৃশ্য।
অয়ন বলল,
—আমি সেদিন নদীর ধারে ছিলাম। দুর্ঘটনার পর সবাই যখন মানুষ বাঁচাতে ছুটছিল, তখন আমি দেখলাম একজন লোক বাসের ভেতর থেকে একটা কালো বাক্স বের করল।
—কে?
—প্রথমে মুখ দেখতে পাইনি।
—তারপর?
—লোকটা যখন গাড়ির কাছে গেল, তখন আলো পড়েছিল মুখে।
অয়ন ছবিটা উল্টে ধরল।
ছবির পেছনে পেন্সিলে একটা মুখ আঁকা।
অভীক তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বলল,
—সুশান্ত দে?
অয়ন মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
অভীক স্তব্ধ হয়ে গেল।
আইনজীবী সুশান্ত!
যে তাকে বাড়িতে এসে সাহায্য করছিল।
যে অরুণের উইল নিয়ে এসেছিল।
যে ডায়েরি দিয়েছিল।
সবই অভিনয়?
অয়ন বলল,
—না।
অভীক তাকাল।
—মানে?
—সুশান্ত দে-কে আমি দেখেছিলাম বাক্সটা নিয়ে যেতে। কিন্তু পরে জানতে পারি, সে সেটা নিজের জন্য নেয়নি।
—তাহলে?
—সে সেটা তোর কাকার কাছে দিয়েছিল।
অভীক কিছু বুঝতে পারল না।
—তাহলে সুশান্ত খারাপ লোক নয়?
—না।
অয়ন বলল,
—সুশান্ত কাকার হয়ে কাজ করছিল।
অভীক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—তাহলে আসল মানুষটা কে?
অয়ন মেমোরি কার্ডটা হাতে নিল।
—এই ভিডিওটা দেখ।
ল্যাপটপে ভিডিও চালু হল।
দৃশ্য ঝাপসা।
একটা রাস্তা।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাস।
কয়েকজন লোক দৌড়াচ্ছে।
তারপর ক্যামেরা একটু ঘুরল।
একজন মানুষ কালো বাক্স হাতে বাস থেকে বেরিয়ে এল।
মুখ স্পষ্ট নয়।
সে গাড়ির কাছে গেল।
আর তখনই ক্যামেরা একটু কাছে জুম করল।
অভীক হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
—এটা…
লোকটা গাড়িতে বাক্সটা দেওয়ার সময় তার মুখ দেখা গেল।
হরিপদ।
অভীক কিছু বলতে পারল না।
তারপর ভিডিওতে হরিপদের সঙ্গে আরেকজনের কথা শোনা গেল।
কণ্ঠস্বর—
অরুণ চৌধুরী।
অরুণ বলছে,
“এটা এখানে রাখুন। অভীককে কিছু জানানো যাবে না।”
হরিপদ বলছে,
“অয়ন যদি সব দেখে থাকে?”
অরুণ—
“ওকে আমি সামলে নেব।”
ভিডিও শেষ।
অভীক চেয়ারে বসে পড়ল।
—কাকা…
অয়ন বলল,
—কাকা খারাপ ছিলেন না।
—তাহলে ভিডিওতে এমন কথা কেন?
—কারণ তিনি তখন আমাদের বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন।
অভীক তাকাল।
—কীভাবে?
অয়ন বলল,
—দুর্ঘটনার আসল পরিকল্পনাকারী ছিল অন্য একজন।
—কে?
অয়ন চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
—যার নাম তুই ছোটবেলায় খুব ভালোবাসা দিয়ে ডাকতিস।
অভীক শিউরে উঠল।
তার মনে একটা মুখ ভেসে উঠল।
একজন মানুষ, যিনি তাদের পরিবারের খুব কাছের ছিলেন।
যিনি অয়নের জন্মদিনে কেক কাটতেন।
যিনি অভীককে স্কুলে নিয়ে যেতেন।
যিনি বাবার বন্ধু ছিলেন।
প্রবীর সেনগুপ্ত।
কিন্তু প্রবীর তো বহু বছর আগে মারা গেছেন!
অয়ন বলল,
—প্রবীর মারা যায়নি।
অভীক উঠে দাঁড়াল।
—তাহলে রণেন কেন বলল—
—রণেন মিথ্যে বলেনি।
—কী?
—প্রবীর নামটা বদলে ফেলেছিল।
অভীক হতভম্ব।
অয়ন বলল,
—প্রবীর সেনগুপ্ত এখন অন্য নামে বেঁচে আছে।
—কোন নামে?
অয়ন ধীরে উত্তর দিল—
—সুশান্ত দে।
অভীক যেন মাথায় আঘাত পেল।
সবকিছু এক মুহূর্তে জুড়ে গেল।
উইল।
বাড়ি।
উত্তরের ঘর।
কাকার ডায়েরি।
সুশান্তের উপস্থিতি।
রহস্যময় চিঠি।
সব।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে গেল।
—তাহলে সে আমাকে এখানে আসতে দিল কেন?
অয়ন বলল,
—কারণ সে জানত, কাকার মৃত্যুর পরে শেষ প্রমাণটা তোর কাছেই আসবে।
—কী প্রমাণ?
অয়ন তাকাল তার হাতে থাকা চাবির দিকে।
—ওই চাবি।
অভীক বুঝতে পারল।
তারা রাতের ট্রেনে মাধবপুরে ফিরল।
চৌধুরী বাড়িতে তখন কেউ নেই।
হরিপদও নেই।
অভীক স্টাডির ঘরে ঢুকল।
অরুণের পুরনো টেবিলের নিচে একটা গোপন ড্রয়ার।
চাবি ঘোরাতেই খুলে গেল।
ভেতরে একটা খাম।
তার মধ্যে তিনটি জিনিস—
একটা পাসপোর্ট।
একটা পুরনো ছবি।
আর একটা হাতে লেখা স্বীকারোক্তি।
অভীক ছবি হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।
ছবিতে—
অরুণ।
সুব্রত।
রণেন।
আর—
প্রবীর।
পেছনে লেখা—
“প্রবীরের নতুন নাম সুশান্ত।”
স্বীকারোক্তিতে অরুণ লিখেছিল—
“আমি অনেক বছর ধরে জানতাম প্রবীর বেঁচে আছে।
সুব্রত সেটা জানতে পেরেছিল।
তাই সুব্রতকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
অয়ন সব দেখে ফেলেছিল।
আমি ওকে বাঁচানোর জন্য রণেনের সাহায্য নিই।
হরিপদ প্রথমে প্রবীরের লোক ছিল, পরে আমাদের পক্ষে আসে।
সুশান্ত নিজেকে আইনজীবী সাজিয়ে পরিবারের কাছাকাছি থেকে সব প্রমাণ খুঁজছিল।
আমি জানতাম সে একদিন অভীকের কাছে আসবে।
তাই আমি শেষ প্রমাণটা এমন জায়গায় রেখেছি, যেখানে শুধু অভীক পৌঁছতে পারবে।
যদি আমি মারা যাই, অভীককে অয়নের কাছে পাঠিও।
আর তাকে বলো—
কুয়াশা যত ঘনই হোক, মানুষকে তার নিজের ছায়া চিনতে শেখাতে হয়।”
অভীকের চোখ ভিজে গেল।
তারপর সে চিঠির শেষ লাইন পড়ল—
“আমি যদি ভুল করে থাকি, আমাকে ক্ষমা করিস।
আমি শুধু চেয়েছিলাম, তুই আর অয়ন অন্তত একদিন সত্যিটা জেনে পাশাপাশি দাঁড়াস।”
হঠাৎ বাইরে গাড়ির শব্দ।
অয়ন জানালার দিকে তাকাল।
—ও এসেছে।
অভীক বলল,
—সুশান্ত?
অয়ন মাথা নাড়ল।
দুজনেই ঘরের আলো নিভিয়ে দিল।
নিচে দরজা খুলল।
পায়ের শব্দ।
তারপর সুশান্তের গলা—
—অভীক?
কোনো উত্তর নেই।
সে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল।
অভীক দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে।
সুশান্ত উত্তরের ঘরে ঢুকল।
তার হাতে বন্দুক।
সে টেবিলের ড্রয়ার খুলতে গেল।
ঠিক তখন অভীক আলো জ্বালল।
—খুঁজছেন কী?
সুশান্ত ঘুরে দাঁড়াল।
অভীক বলল,
—প্রবীর সেনগুপ্ত?
সুশান্তের মুখের সমস্ত রং বদলে গেল।
অয়ন পাশে এসে দাঁড়াল।
সুশান্ত কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে বন্দুকটা নামিয়ে দিল।
—তোমরা সব জেনে গেছ।
অভীক বলল,
—বাবাকে কেন মেরেছিলেন?
সুশান্ত চুপ।
—কাকাকে কেন?
চুপ।
—আমাকে কেন এত বছর নজরে রেখেছিলেন?
সুশান্তের চোখে ক্লান্তি।
—কারণ তুই ছিলি শেষ সাক্ষী।
—আর অয়ন?
—ও ছিল দ্বিতীয় সাক্ষী।
অয়ন বলল,
—আপনি আমাদের পরিবারটাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন।
সুশান্ত মাথা নাড়ল।
—আমি একা ছিলাম না।
—দেবাশিস?
—হ্যাঁ।
—আর দুর্ঘটনা?
—সব পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
অভীক বলল,
—বাবা?
—তোর বাবা সত্যিটা জেনে গিয়েছিল।
—তাই তাকে?
সুশান্ত চোখ নামিয়ে বলল,
—হ্যাঁ।
ঘরের মধ্যে নীরবতা।
অভীক বলল,
—কাকা?
—সে অনেক বছর চুপ ছিল। পরে সব প্রমাণ জোগাড় করতে শুরু করে। তাই তাকেও থামানো হয়।
অয়ন বলল,
—কিন্তু আপনি পারেননি।
সুশান্ত মৃদু হাসল।
—না।
ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল।
অভীক অবাক হয়ে সুশান্তের দিকে তাকাল।
সুশান্ত বলল,
—রণেন সব জানত।
অভীক বুঝতে পারল।
রণেন আগেই পুলিশকে খবর দিয়েছিল।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ ঘরে ঢুকল।
সুশান্ত আর পালানোর চেষ্টা করল না।
বন্দুকটা মেঝেতে রেখে হাত বাড়িয়ে দিল।
পরবর্তী কয়েক মাসে পুরনো তদন্ত আবার শুরু হল।
সুব্রত চৌধুরীর মৃত্যুর মামলা।
বাস দুর্ঘটনা।
অবৈধ জমি দখল।
ভুয়ো নথি।
ব্যাংক লেনদেন।
দেবাশিস মল্লিকের পুরনো সহযোগীরা একে একে ধরা পড়ল।
হরিপদ নিজেও আদালতে সাক্ষ্য দিলেন।
রণেন নিজের পুরনো অপরাধ স্বীকার করলেন।
আর অয়ন ফিরে এল নিজের আসল পরিচয়ে।
পনেরো বছর পর মাধবপুরের মানুষ জানতে পারল—
অয়ন মারা যায়নি।
সে বেঁচে ছিল।
অপেক্ষা করছিল।
একদিন তার দাদা ফিরে আসবে বলে।
এক বছর পর চৌধুরী বাড়ির উত্তরের ঘর আর বন্ধ থাকল না।
অভীক সেখানে একটা ছোট পাঠাগার তৈরি করল।
নাম দিল—
“অয়ন-সুব্রত স্মৃতি পাঠাগার।”
দেওয়ালে দুটো ছবি।
একটা সুব্রতের।
আরেকটা অয়নের ছোটবেলার।
পাশে রাখা সেই পুরনো নীল বল।
অয়ন এখন মাধবপুরেই থাকে।
সে শিশুদের পড়ায়।
অভীক কলকাতা আর মাধবপুরের মধ্যে যাতায়াত করে।
তাদের জীবন আগের মতো হয়নি।
বরং আরও সত্যি হয়েছে।
এক সন্ধ্যায় দুজন ভাই বাড়ির বারান্দায় বসেছিল।
অয়ন বলল,
—দাদা।
—হুম?
—তুই কি এখনও কুয়াশাকে ভয় পাস?
অভীক হেসে বলল,
—না।
—কেন?
অভীক নদীর দিকে তাকাল।
সন্ধ্যার আলো জলে পড়েছে।
—কারণ কুয়াশার ওপারে কী আছে, সেটা এখন জানি।
অয়ন হাসল।
দূরে নদীর ওপর ধীরে ধীরে কুয়াশা নামছে।
কিন্তু এবার সেই কুয়াশার মধ্যে কোনো ভয় নেই।
কারণ সত্যি আর লুকিয়ে নেই।
পনেরো বছর ধরে যে বাড়ির উত্তরের জানালা বন্ধ ছিল, সেটাও আজ খোলা।
জানালা দিয়ে শেষ বিকেলের আলো ঘরে ঢুকছে।
অভীক উঠে গিয়ে জানালার সামনে দাঁড়াল।
তার মনে হল, অয়ন ঠিকই বলেছিল—
কিছু দরজা বন্ধ থাকে ভয়ের জন্য।
কিছু দরজা বন্ধ থাকে সত্যিকে রক্ষা করার জন্য।
কিন্তু একদিন দরজা খুলতেই হয়।
কারণ মানুষ যতই কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে যাক,
সত্যি তার পথ খুঁজে নেয়।
অয়ন পিছন থেকে বলল,
—দাদা, চল। চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
অভীক ফিরে তাকিয়ে হাসল।
—চল।
দুজন ভাই পাশাপাশি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পেছনে খোলা রইল উত্তরের জানালা।
বাইরে কুয়াশা ঘন হচ্ছে।
কিন্তু ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে।
আর সেই আলোয়—
পনেরো বছরের হারিয়ে যাওয়া দুই ভাইয়ের ছায়া পাশাপাশি পড়ে আছে।
— সমাপ্ত —