প্রথম পর্ব — যে শহরে কেউ নিজের মুখ দেখে না
১. অদ্ভুত চাকরির বিজ্ঞাপন
কলকাতার একটি বেসরকারি গবেষণাগারে কাজ করত ঋতব্রত সেন। তার বয়স বত্রিশ। পেশায় সে একজন তথ্যবিশ্লেষক। মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন এবং বিপুল পরিমাণ তথ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অস্বাভাবিক প্রবণতা খুঁজে বের করাই তার কাজ।
ঋতব্রত খুব বেশি কথা বলত না। সহকর্মীরা তাকে অহংকারী ভাবলেও আসলে সে ছিল ভীষণ পর্যবেক্ষণপ্রবণ। কোনো ঘটনা ঘটলে সে প্রথমে আবেগের বদলে তথ্যের দিকে তাকাত। তার বিশ্বাস ছিল, পৃথিবীতে অধিকাংশ রহস্যেরই ব্যাখ্যা আছে। শুধু সঠিক প্রশ্নটি করতে জানতে হয়।
কিন্তু এক বৃহস্পতিবার সকালে তার ই-মেলে এমন একটি চাকরির প্রস্তাব এল, যা তার সমস্ত যুক্তিবোধকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চলেছে।
ই-মেলের বিষয় ছিল—
“প্রজেক্ট আয়না: বিশেষ গবেষকের জন্য আমন্ত্রণ।”
প্রেরকের নাম—অজ্ঞাত।
বার্তায় লেখা ছিল:
“আপনার তথ্যবিশ্লেষণ সংক্রান্ত কাজ আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি। একটি বিশেষ প্রকল্পে আপনার দক্ষতা প্রয়োজন। প্রকল্পটির অবস্থান কলকাতা থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে। কাজের মেয়াদ একুশ দিন। পারিশ্রমিক পনেরো লক্ষ টাকা। থাকার ব্যবস্থা, যাতায়াত এবং অন্যান্য খরচ সংস্থার পক্ষ থেকে বহন করা হবে।
শর্ত: প্রকল্প সম্পর্কে বাইরে কোনো আলোচনা করা যাবে না। নির্ধারিত সময়ের আগে কাজ ছেড়ে চলে যাওয়া যাবে না।”
ঋতব্রত প্রথমে ভেবেছিল, এটি প্রতারণামূলক কোনও প্রস্তাব। এত অল্প সময়ের কাজের জন্য এত টাকা দেওয়ার কারণ নেই।
কিন্তু ই-মেলের সঙ্গে একটি সংযুক্ত নথি ছিল। সেখানে তার পূর্ববর্তী গবেষণার বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হয়েছে। এমনকি তার একটি অসমাপ্ত গবেষণাপত্রেরও উল্লেখ রয়েছে, যা সে কখনও প্রকাশ করেনি।
ঋতব্রত চেয়ারে হেলান দিল।
কেউ তার কাজের ওপর গভীর নজর রেখেছে।
সে প্রেরকের ঠিকানা পরীক্ষা করল। সাধারণ ই-মেল পরিষেবা নয়, একটি ব্যক্তিগত সার্ভারের ঠিকানা। যোগাযোগের কোনো ফোন নম্বর নেই।
সে উত্তর লিখল—
“প্রকল্পের নাম, সংস্থার পরিচয় এবং কাজের প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।”
দশ মিনিটের মধ্যে উত্তর এল।
“আপনাকে নির্বাচিত করা হয়েছে কারণ আপনি এমন একটি প্যাটার্ন শনাক্ত করতে পারবেন, যা অন্যরা দেখতে পায় না। প্রকল্পের নাম—কাচের শহর। আগামী সোমবার সকাল আটটায় শিয়ালদহ স্টেশনের এক নম্বর প্রবেশপথে উপস্থিত থাকবেন। সেখান থেকে আপনাকে নিয়ে যাওয়া হবে।”
ঋতব্রত বার্তাটি পড়ে মৃদু হাসল।
কাচের শহর!
নামটি শুনে কোনও প্রযুক্তিগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কথা মনে হয় না। বরং মনে হয়, কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প।
তবু তার কৌতূহল বাড়তে লাগল।
সেই রাতেই সে প্রস্তাবটি গ্রহণ করল।
সে জানত না, এই সিদ্ধান্তের পর তার জীবনের সবচেয়ে বড় গবেষণাটি শুরু হতে চলেছে—যে গবেষণায় বিষয় হবে না কম্পিউটার বা তথ্যের হিসাব।
বিষয় হবে মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণা।
২. কাচের শহরের প্রবেশদ্বার
সোমবার সকাল আটটার আগেই ঋতব্রত শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছে গেল।
এক নম্বর প্রবেশপথের পাশে কালো পোশাক পরা একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে একটি ছোট ট্যাবলেট। ঋতব্রত কাছে যেতেই লোকটি তার নাম জিজ্ঞাসা করল।
— ঋতব্রত সেন?
— হ্যাঁ।
লোকটি ট্যাবলেটের পর্দায় কিছু মিলিয়ে নিয়ে বলল, — আমার সঙ্গে আসুন।
স্টেশনের বাইরে একটি কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। চালক ছাড়া গাড়িতে আর কেউ ছিল না। ঋতব্রত বসতেই লোকটি তার মোবাইল ফোনটি একটি সুরক্ষিত খামে রাখতে বলল।
— এটা কেন?
— প্রকল্পের নিয়ম। গবেষণাস্থলে ব্যক্তিগত যোগাযোগের যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।
— জরুরি প্রয়োজনে?
— কেন্দ্রের নিজস্ব যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে।
ঋতব্রত আপত্তি করতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত ফোনটি জমা দিল। তার মনে হচ্ছিল, নিয়মগুলো অস্বাভাবিক, কিন্তু এখনও বিপজ্জনক কিছু নয়।
গাড়ি কলকাতা ছেড়ে হাইওয়েতে উঠল। প্রথম ঘণ্টায় শহরের ভিড়, দোকানপাট, যানজট—সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। তারপর গাড়ি একটি সরু রাস্তায় ঢুকে পড়ল। দুপাশে বিস্তীর্ণ মাঠ, মাঝেমধ্যে ছোট গ্রাম, দূরে তালগাছের সারি।
প্রায় তিন ঘণ্টা পর গাড়ি একটি বিশাল ধাতব ফটকের সামনে থামল।
ফটকের ওপর কোনো নাম লেখা নেই।
শুধু একটি চিহ্ন—একটি বৃত্তের মধ্যে তিনটি সমান্তরাল রেখা।
গাড়ির চালক একটি কার্ড দেখাতেই ফটক খুলে গেল।
ভেতরে ঢুকে ঋতব্রত যা দেখল, তা তার কল্পনার বাইরে।
দূরে সারি সারি আধুনিক ভবন। প্রতিটি ভবনের বাইরের দেওয়াল কাচের। রাস্তা পরিষ্কার, গাছের সারি নিখুঁতভাবে ছাঁটা, কোথাও কোনো বিজ্ঞাপন নেই, দোকানের সাইনবোর্ড নেই, মানুষের কোলাহল নেই।
এ যেন শহরের ভেতরে তৈরি করা একটি সম্পূর্ণ আলাদা শহর।
গাড়ি একটি উঁচু ভবনের সামনে থামল। প্রবেশপথের ওপর লেখা—
MIRROR CITY — RESEARCH COMPLEX
ঋতব্রত নেমে চারদিকে তাকাল।
— এখানে কতজন কাজ করেন?
চালক বলল, — এই মুহূর্তে একশো তেত্রিশজন।
— এত বড় জায়গায় মাত্র একশো তেত্রিশজন?
— কর্মী, গবেষক এবং আবাসিক অংশগ্রহণকারী মিলিয়ে।
— অংশগ্রহণকারী কারা?
চালক উত্তর দিল না।
ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতেই একজন মহিলা এগিয়ে এলেন। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, চুল ছোট করে কাটা, পরনে ধূসর স্যুট।
— আমি ডক্টর ঈশিতা রায়। এই প্রকল্পের গবেষণা-সমন্বয়ক।
ঋতব্রত হাত বাড়িয়ে বলল, — ঋতব্রত সেন।
ঈশিতা করমর্দন করে বললেন, — আপনাকে পেয়ে আমরা আনন্দিত। আপনার কাজ সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানি।
— আপনারা ঠিক কী নিয়ে গবেষণা করছেন?
ঈশিতা মৃদু হাসলেন।
— মানুষ কীভাবে নিজের সম্পর্কে মিথ্যা বিশ্বাস তৈরি করে, এবং সেই বিশ্বাসকে সত্য প্রমাণ করতে গিয়ে নিজের আচরণ বদলে ফেলে—আমরা সেটাই বুঝতে চাইছি।
— মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা?
— তার চেয়েও বেশি কিছু।
তিনি ঋতব্রতকে একটি লিফটে নিয়ে গেলেন। লিফটের প্যানেলে তলার সংখ্যা নেই। শুধু চারটি বোতাম—এ, বি, সি এবং ডি।
ঈশিতা ‘সি’ বোতাম চাপলেন।
লিফট নামতে শুরু করল।
ঋতব্রত বুঝতে পারল, তারা উপরে উঠছে না। বরং ভূগর্ভে নামছে।
লিফটের দরজা খুলতেই সামনে দেখা গেল একটি দীর্ঘ করিডর। দুপাশে কাচের ঘর। প্রতিটি ঘরের ভেতরে একজন করে মানুষ বসে আছেন। কেউ বই পড়ছেন, কেউ কম্পিউটারে কাজ করছেন, কেউ নিঃশব্দে জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন।
কিন্তু ঘরগুলোর একটি বিষয় ঋতব্রতকে অস্বস্তিতে ফেলল।
প্রতিটি কাচের ঘরের ভেতরে আয়না রয়েছে।
কেউ চাইলে নিজের মুখের দিকে তাকাতে পারেন। কিন্তু সব আয়নাই এমনভাবে বসানো, যাতে ঘরের বাইরে দাঁড়ানো মানুষও ভেতরের ব্যক্তির মুখ দেখতে পান।
ঋতব্রত থেমে গেল।
— এরা কারা?
ঈশিতা বললেন, — আমাদের গবেষণার অংশগ্রহণকারী।
— এদের প্রত্যেককে আলাদা ঘরে রাখা হয়েছে কেন?
— কারণ আমাদের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, প্রত্যেক মানুষকে নিজের সঙ্গে একা থাকতে দিতে হবে।
ঋতব্রত কাচের ওপারে এক যুবককে দেখল। যুবকটি একটি চেয়ারে বসে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ সে মাথা তুলল।
সরাসরি ঋতব্রতর দিকে তাকাল।
তারপর নিজের কাচের ওপর আঙুল দিয়ে কিছু লিখল।
ঋতব্রত কাছে এগিয়ে গেল।
কাচে লেখা—
“আপনিও এখানে বন্দি।”
ঋতব্রত পিছিয়ে এল।
ঈশিতা দ্রুত যুবকটির ঘরের সামনে এসে একটি সুইচ চাপলেন। ঘরের ভেতরের আলো নিভে গেল। যুবকটির অবয়ব অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
— ওর কথা গুরুত্ব দেবেন না, — ঈশিতা বললেন। — দীর্ঘ সময় একা থাকলে অনেকেই অস্বাভাবিক আচরণ করে।
ঋতব্রত শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল, — এখানে গবেষণায় অংশ নেওয়ার আগে কি সবাই জানতেন যে তাঁদের একা থাকতে হবে?
ঈশিতা উত্তর দিলেন না।
বরং বললেন, — চলুন। আপনাকে আপনার কাজের জায়গা দেখাই।
৩. নিজের মুখের সঙ্গে পরিচয়
ঋতব্রতকে একটি ছোট কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে একটি ডেস্ক, কম্পিউটার, আরামদায়ক চেয়ার এবং দেওয়ালে বড় পর্দা। ঘরের এক পাশে একটি আয়না।
আয়নাটির সামনে দাঁড়াতেই সে লক্ষ করল, তার প্রতিচ্ছবি সামান্য দেরিতে নড়ছে।
প্রথমে সে ভেবেছিল, চোখের ভুল।
সে ডান হাত তুলল।
প্রতিচ্ছবি ডান হাত তুলল, কিন্তু যেন এক সেকেন্ড পরে।
ঋতব্রত আবার চেষ্টা করল। এবার দ্রুত মাথা ঘোরাল।
প্রতিচ্ছবির নড়াচড়া আবারও সামান্য দেরিতে হলো।
সে আয়নার সামনে গিয়ে কাচে হাত রাখল।
এটি সাধারণ আয়না নয়।
সম্ভবত একটি ডিসপ্লে, যার মাধ্যমে তার শরীরের গতিবিধি ধারণ করে প্রতিফলন তৈরি করা হচ্ছে।
সে ঘুরে কম্পিউটার চালু করল।
পর্দায় একটি নির্দেশনা ভেসে উঠল—
প্রজেক্ট আয়না: প্রথম ধাপ
“আপনার কাজ হলো, এই কেন্দ্রে থাকা ১৩৩ জন মানুষের আচরণগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের সন্ধান করা।
প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর তথ্য আলাদা ফাইলে রাখা হয়েছে। আপনাকে প্রতিদিন দশটি ফাইল দেওয়া হবে। একুশ দিনের মধ্যে আপনাকে এমন একজনকে শনাক্ত করতে হবে, যার আচরণগত তথ্য অন্য সবার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন।
শর্ত: আপনি কোনো অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারবেন না। কেবল তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
ঋতব্রত পড়ে হাসল।
— এত টাকার কাজের জন্য এটাই সব?
তারপর সে ফাইল খুলল।
প্রথম অংশগ্রহণকারী—অংশগ্রহণকারী ০০১।
বয়স ৩৮। পেশা: শিক্ষক। পরিবার: স্ত্রী, এক কন্যা। গবেষণায় যোগ দেওয়ার আগে মানসিক চাপের ইতিহাস নেই। সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা উচ্চ। মিথ্যা বলার প্রবণতা কম।
দ্বিতীয় ফাইল—অংশগ্রহণকারী ০০২।
বয়স ২৯। পেশা: হিসাবরক্ষক। অবিবাহিত। ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা বেশি। স্মৃতির বিবরণে অসামঞ্জস্য মাঝারি।
তৃতীয় ফাইল—অংশগ্রহণকারী ০০৩।
বয়স ৪৪। পেশা: চিকিৎসক। আচরণে সংযত। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় অস্বাভাবিক বিরতি। নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা প্রকাশের প্রবণতা।
একটির পর একটি ফাইল পড়তে পড়তে ঋতব্রত বুঝল, গবেষণাটি মানুষের ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ নিয়ে হলেও এখানে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি অস্বাভাবিকভাবে বিস্তৃত।
প্রত্যেক ব্যক্তির দৈনন্দিন কাজ, কথাবার্তা, ঘুমের সময়, খাওয়ার অভ্যাস, এমনকি একা বসে থাকার সময় মুখের অভিব্যক্তিরও রেকর্ড রয়েছে।
কিন্তু তথ্যগুলোর মধ্যে একটি বিষয় তাকে বিশেষভাবে ভাবিয়ে তুলল।
প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর ফাইলে একটি করে প্রশ্ন রয়েছে—
“আপনি কি নিজেকে ভালো মানুষ বলে মনে করেন?”
উত্তরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে তাঁদের আচরণের পরিসংখ্যান।
কেউ নিজেকে ভালো মানুষ বলেছেন, কিন্তু তাঁর আচরণে অন্যের প্রতি সহানুভূতি কম। কেউ নিজেকে স্বার্থপর বলেছেন, অথচ বাস্তব সিদ্ধান্তে বারবার অন্যকে সাহায্য করেছেন।
ঋতব্রত বুঝল, গবেষণাটি সম্ভবত আত্মপরিচয় ও আচরণের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে।
কিন্তু এই গবেষণার সঙ্গে কাচের শহরের সম্পর্ক কী?
সে ঈশিতাকে ফোন করার জন্য ঘরের ইন্টারকম ব্যবহার করল।
— আমি কয়েকটি প্রশ্ন করতে চাই।
— বলুন।
— অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য এত বিস্তারিতভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে কেন?
— কারণ আচরণের ছোট ছোট পরিবর্তনই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
— তাঁরা কি জানেন যে তাঁদের প্রতিটি কাজ রেকর্ড করা হচ্ছে?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
— এই প্রশ্নের উত্তর আপনার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় নয়।
ঋতব্রত বিরক্ত হলো।
— একজন গবেষক হিসেবে তথ্যের উৎস ও সংগ্রহপদ্ধতি জানা আমার অধিকার।
ঈশিতা বললেন, — আপনার কাজ বিশ্লেষণ করা। অনুমতি ছাড়া প্রকল্পের অন্য বিভাগে প্রবেশ করা যাবে না।
ইন্টারকম বন্ধ হয়ে গেল।
ঋতব্রত এবার নিশ্চিত হলো, এই গবেষণার আড়ালে এমন কিছু রয়েছে, যা তার কাছ থেকে গোপন রাখা হচ্ছে।
সে কম্পিউটারের তথ্যগুলো আবার খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
এক পর্যায়ে তার চোখে একটি অস্বাভাবিক বিষয় পড়ল।
১৩৩ জন অংশগ্রহণকারীর প্রত্যেকের তথ্যের সঙ্গে একটি গোপন কোড রয়েছে। কোডগুলো সাধারণ সংখ্যা নয়। প্রতিটি কোডের মধ্যে একটি অক্ষর এবং চারটি সংখ্যা।
যেমন—এম-১৭৪২, আর-০৯১৬, কে-২৩৮১।
কিন্তু অংশগ্রহণকারী ০৬৭-এর ফাইলে কোনো কোড নেই।
সেখানে লেখা—
“পরিচয় যাচাই অসম্পূর্ণ। পূর্ববর্তী রেকর্ডের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি।”
ঋতব্রত ফাইলটির বিস্তারিত অংশ খুলতে গেল।
পর্দায় একটি বার্তা এল—
“প্রবেশাধিকার নেই।”
সে আবার চেষ্টা করল।
একই বার্তা।
কিন্তু ফাইলের ছোট্ট প্রিভিউতে একটি তথ্য দেখা যাচ্ছিল।
অংশগ্রহণকারী ০৬৭-এর গবেষণায় যোগ দেওয়ার তারিখ—আজ থেকে ঠিক একুশ দিন আগে।
অর্থাৎ, তার কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিনেই ওই ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছিল।
ঋতব্রত চেয়ারে হেলান দিল।
এটা কি কাকতালীয়?
নাকি এই গবেষণায় তার নিজেরও কোনো ভূমিকা রয়েছে?
৪. রাতের সংকেত
প্রথম দিন রাত দশটার সময় ঋতব্রতকে তার আবাসিক কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো।
কক্ষটি আরামদায়ক। বিছানা, আলমারি, কাজের টেবিল, বাথরুম—সবই আছে। জানালার বাইরে দেখা যায় কাচে মোড়া অন্য ভবনগুলোর আলো।
কিন্তু জানালাটি খোলা যায় না।
দরজায় ভেতর থেকে তালা লাগানোর ব্যবস্থাও নেই।
ঋতব্রত বিষয়টি লক্ষ করলেও আপাতত গুরুত্ব দিল না। সে ক্লান্ত ছিল। রাতের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ কাজ করল, তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।
রাত ২টা ১৭ মিনিটে তার ঘুম ভেঙে গেল।
কেন ভাঙল, সে বুঝতে পারল না।
ঘর অন্ধকার। কম্পিউটার বন্ধ। জানালার বাইরে দূরের একটি ভবনের আলো জ্বলছে।
তারপর সে শব্দটি শুনল।
টিক।
টিক।
টিক।
যেন কেউ কাচের ওপর নখ দিয়ে টোকা দিচ্ছে।
ঋতব্রত উঠে বসে জানালার দিকে তাকাল।
শব্দটি জানালা থেকে আসছে না।
আসছে ঘরের আয়না থেকে।
সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামল। আয়নার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই শব্দ বন্ধ হয়ে গেল।
আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি স্বাভাবিক।
সে হাত তুলল। প্রতিচ্ছবিও হাত তুলল।
কোনো দেরি নেই।
ঋতব্রত কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ঘুরে বিছানার দিকে যেতে লাগল।
ঠিক তখনই আয়নার ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল।
— ঋতব্রত।
সে ঘুরে দাঁড়াল।
আয়নার সামনে কেউ নেই।
কিন্তু কণ্ঠটি আবার শোনা গেল—
— তোমাকে এখানে আসতে বলা হয়েছিল, কারণ তুমি সত্য খুঁজে বের করতে পারো। কিন্তু তোমাকে যে সত্য দেখানো হবে, সেটাই যদি মিথ্যা হয়?
ঋতব্রত আয়নার কাছে এগিয়ে গেল।
— কে কথা বলছেন?
কণ্ঠটি বলল—
— অংশগ্রহণকারী শূন্য-ছয়-সাত।
ঋতব্রতর বুক ধক করে উঠল।
— আপনি কে?
— আমার নাম এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়।
— আপনি কোথায় আছেন?
— এমন একটি জায়গায়, যেখানে মানুষ নিজের মুখ দেখতে পায় না।
ঋতব্রত আয়নার গায়ে হাত রাখল।
কাচ ঠান্ডা।
কণ্ঠটি বলল—
— কাল তোমাকে যে ফাইল দেওয়া হবে, সেটি পড়বে না। কারণ ওই ফাইলের মানুষটি তুমি নিজেই।
তারপর শব্দ বন্ধ হয়ে গেল।
ঋতব্রত দ্রুত আয়নার ফ্রেম পরীক্ষা করল। কোনো স্পিকার বা যন্ত্র দেখা গেল না। সে দরজায় ধাক্কা দিল।
— কেউ আছেন? দরজা খুলুন!
কয়েক মিনিট পরে বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। দরজা খুলে ঈশিতা প্রবেশ করলেন। তাঁর হাতে একটি ছোট যন্ত্র।
— আপনি ঠিক আছেন?
ঋতব্রত বলল, — আমার ঘরে কেউ কথা বলেছে।
ঈশিতা তার মুখের দিকে তাকালেন।
— কী বলেছে?
— সে নিজেকে অংশগ্রহণকারী ০৬৭ বলেছে।
ঈশিতার মুখের অভিব্যক্তি এক মুহূর্তের জন্য বদলে গেল।
তারপর তিনি স্বাভাবিক গলায় বললেন—
— আপনি হয়তো ঘুমের মধ্যে কিছু শুনেছেন। নতুন পরিবেশে এমন হতে পারে।
— আমি পুরোপুরি জেগে ছিলাম।
ঈশিতা ঘরের আয়নাটির দিকে তাকালেন। তারপর হাতে থাকা যন্ত্র দিয়ে কয়েকটি বোতাম চাপলেন।
— আজ রাতে আপনি অন্য ঘরে থাকবেন।
— কেন?
— নিরাপত্তার কারণে।
ঋতব্রত আর কিছু বলল না।
তাকে অন্য একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আয়না নেই।
কিন্তু দরজা বন্ধ হওয়ার আগে সে ঈশিতার হাতে থাকা যন্ত্রটির পর্দায় একটি নাম দেখতে পেল।
SUBJECT 067 — STATUS: ACTIVE
অর্থাৎ, অংশগ্রহণকারী ০৬৭ এখনও এই গবেষণার মধ্যে সক্রিয়।
কিন্তু কোথায়?
৫. যে ফাইলটি নিজের কথা বলে
পরদিন সকাল আটটায় ঋতব্রতকে আবার গবেষণাগারে ডাকা হলো।
কম্পিউটার চালু করতেই নতুন একটি ফাইল দেখা গেল।
ফাইলের নাম—
SUBJECT 067 — COMPLETE PROFILE
গতকাল যে ফাইলটি খোলা যাচ্ছিল না, সেটি এখন সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত।
ঋতব্রত ফাইলটি খুলল।
প্রথম পাতায় একটি ছবি।
ছবির মানুষটির মুখ দেখে তার হাত কীবোর্ডের ওপর স্থির হয়ে গেল।
ছবিটি তার নিজের।
কিন্তু ছবির নীচে লেখা—
“অংশগ্রহণকারী ০৬৭। বয়স ৩২। পেশা: তথ্যবিশ্লেষক। পূর্ববর্তী কর্মস্থল: কলকাতার একটি বেসরকারি গবেষণাগার।”
তারপর আরও তথ্য।
“ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য: উচ্চ পর্যবেক্ষণক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা, অস্পষ্ট পরিস্থিতিতে যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংযম।”
ঋতব্রত নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
তার কর্মস্থল, কাজের ধরন, আচরণগত বৈশিষ্ট্য—সবকিছু ঠিক।
কিন্তু ফাইলের পরবর্তী অংশে এমন একটি তথ্য লেখা ছিল, যা সে কখনও কাউকে বলেনি।
“বয়স ১৯-এ একটি গুরুতর পরীক্ষামূলক ঘটনার পর ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে নিজের স্মৃতির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহে ভুগেছেন।”
ঋতব্রতর মুখ শুকিয়ে গেল।
বয়স উনিশে সে একটি বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত গবেষণায় অংশ নিয়েছিল। গবেষণাটি ছিল মানুষের স্মৃতি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে। সেখানে অংশগ্রহণকারীদের কিছু তথ্য দেখিয়ে পরে স্মৃতি যাচাই করা হতো।
গবেষণার শেষে তার মনে হয়েছিল, সে এমন কিছু মনে করতে পারছে না, যা তার স্পষ্ট মনে থাকার কথা। বিষয়টি সে কাউকে জানায়নি। পরে ঘটনাটিকে পরীক্ষার চাপ বলে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু এই প্রকল্পের লোকেরা সেটা জানল কীভাবে?
সে দ্রুত ফাইলের পরবর্তী অংশে গেল।
“অংশগ্রহণকারী ০৬৭-কে প্রকল্পের জন্য নির্বাচিত করা হয়নি। তাঁকে প্রকল্পে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।”
ঋতব্রত স্তব্ধ হয়ে গেল।
ফিরিয়ে আনা হয়েছে?
তারপরের লাইনটি আরও অদ্ভুত।
“প্রাথমিক পরীক্ষায় ব্যক্তি এমন একটি তথ্য শনাক্ত করেছিলেন, যা গবেষণার মূল ফলাফলকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। সেই কারণে তাঁর অংশগ্রহণ সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছিল।”
ঋতব্রতর মাথার ভেতর যেন কিছু একটা খুলে গেল।
উনিশ বছর বয়সে যে গবেষণায় সে অংশ নিয়েছিল, সেটি হয়তো শুধু স্মৃতি যাচাইয়ের পরীক্ষা ছিল না।
সেখানে এমন কিছু ঘটেছিল, যার কথা সে ভুলে গিয়েছিল—অথবা তাকে ভুলে যেতে সাহায্য করা হয়েছিল।
ফাইলের একেবারে শেষ অংশে একটি ভিডিও সংযুক্ত ছিল।
ঋতব্রত ভিডিওটি চালু করল।
পর্দায় একটি ছোট ঘর দেখা গেল। ঘরের মাঝখানে বসে আছে একজন তরুণ। বয়স আনুমানিক উনিশ। মুখ নিচু, চোখে আতঙ্ক।
তার সামনে বসে আছেন একজন গবেষক।
গবেষক জিজ্ঞাসা করছেন—
— আপনি কি নিশ্চিত, আপনি ওই ব্যক্তিকে দেখেছিলেন?
তরুণটি বলছে—
— হ্যাঁ। আমি তাঁর মুখ দেখেছি।
— কিন্তু রেকর্ডে ওই সময় ঘরে কেউ ছিল না।
— রেকর্ড ভুল।
— আপনি কি বুঝতে পারছেন, আপনার বক্তব্যের সঙ্গে প্রমাণের মিল নেই?
তরুণটি মাথা তুলল।
ভিডিওর মুখটি ঋতব্রতর নিজের।
তরুণটি বলল—
— প্রমাণ ভুল হতে পারে। কিন্তু আমি যা দেখেছি, তা দেখেছি।
ভিডিও থেমে গেল।
পর্দায় একটি নতুন বার্তা ভেসে উঠল।
“প্রকল্পের প্রথম প্রশ্ন: মানুষ নিজের স্মৃতিকে বিশ্বাস করবে, নাকি সেই তথ্যকে, যা তাকে স্মৃতি ভুল প্রমাণ করতে শেখায়?”
ঋতব্রত ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
এতক্ষণ সে ভেবেছিল, তাকে ১৩৩ জন মানুষের মধ্যে একজন অস্বাভাবিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে হবে।
এখন সে বুঝতে পারছে, গবেষণাটির আসল উদ্দেশ্য সম্ভবত অন্য কিছু।
এই শহরে মানুষকে শুধু পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে না।
তাদের স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং নিজের ওপর বিশ্বাস—সবকিছুকে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এই গবেষণার সঙ্গে তার সম্পর্ক আজকের নয়।
এটি শুরু হয়েছিল তেরো বছর আগে।
ঋতব্রত দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। করিডরে ঈশিতা দাঁড়িয়ে ছিলেন, যেন তাঁর আসার অপেক্ষায়।
— আপনি সব দেখেছেন, তাই না? — তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।
ঋতব্রত তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
— আমার সঙ্গে তেরো বছর আগে কী ঘটেছিল?
ঈশিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— আপনি যা মনে করতে পারছেন, তা পুরো ঘটনা নয়।
— তাহলে পুরো ঘটনা কী?
ঈশিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—
— এই প্রকল্পে আপনাকে নেওয়া হয়েছে কারণ আপনি একবার এমন একটি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে একজন মানুষকে অস্তিত্বহীন প্রমাণ করা হয়েছিল।
ঋতব্রতর কণ্ঠ শুকিয়ে গেল।
— অস্তিত্বহীন?
— হ্যাঁ। সেই পরীক্ষায় একজন অংশগ্রহণকারীকে অন্য সবার সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেন তিনি কখনও ছিলেনই না। তাঁর ছবি, কণ্ঠ, সাক্ষ্য—সবকিছু অস্বীকার করা হয়েছিল। বেশির ভাগ মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্মৃতিকেই অবিশ্বাস করেছিল।
— আর আমি?
ঈশিতা সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালেন।
— আপনি একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন, যিনি শেষ পর্যন্ত নিজের বক্তব্য বদলাননি।
ঋতব্রতর মনে হলো, চারপাশের কাচের দেওয়ালগুলো যেন আরও কাছে চলে এসেছে।
— সেই মানুষটি কে ছিলেন?
ঈশিতা উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু একটি ছোট কার্ড ঋতব্রতের হাতে দিলেন।
কার্ডে লেখা—
“প্রজেক্ট আয়না: দ্বিতীয় ধাপ। আজ রাত ১১টা। কক্ষ ০৬৭।”
ঋতব্রত কার্ডটি উল্টে দেখল।
পেছনে হাতে লেখা একটি বাক্য—
“যাকে তুমি অস্তিত্বহীন বলে মেনে নিয়েছিলে, সে এখনও তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
ঋতব্রত মাথা তুলে ঈশিতার দিকে তাকাল।
— কে অপেক্ষা করছে?
কিন্তু ঈশিতা ইতিমধ্যেই চলে গেছেন।
দূরের একটি কাচের ঘরের ভেতর আলো জ্বলে উঠল।
সেখানে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
তার মুখ দেখা যাচ্ছে না।
শুধু কাচের ওপর ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে কয়েকটি শব্দ—
“আমাকে মনে করো, ঋতব্রত।”
চলবে…