বই মানুষের চিরন্তন বন্ধু। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া, চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করা, কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করা এবং জীবনের নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করার ক্ষেত্রে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। সভ্যতার বিকাশের ইতিহাসে বই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করেছে, অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছে এবং নতুন চিন্তার পথ খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। স্মার্টফোন, সামাজিক মাধ্যম, ছোট ছোট ভিডিও এবং অনলাইন বিনোদনের বিস্তারের ফলে অনেকের দৈনন্দিন জীবনে বই পড়ার সময় কমে যাচ্ছে।
একসময় অবসর সময়ে বই পড়া, পাড়ার গ্রন্থাগারে যাওয়া কিংবা বইমেলা থেকে পছন্দের বই কেনার মধ্যে যে আনন্দ ছিল, তার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের অনেকের পরিচয় ক্রমশ কমে আসছে। যদিও ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে এখন সহজেই অসংখ্য বই পড়া যায়, তবুও নিয়মিত পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নানা বাধা দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—বই পড়ার অভ্যাস কি সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছে, নাকি প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার ধরন বদলে যাচ্ছে?
বাস্তবতা হল, বই পড়ার অভ্যাসকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে পরিবার, বিদ্যালয়, গ্রন্থাগার এবং সমাজকে একসঙ্গে উদ্যোগী হতে হবে। কারণ বই পড়া শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপায় নয়, এটি মানুষের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ এবং চিন্তাশক্তি বিকাশের অন্যতম মাধ্যম।
বই পড়ার অভ্যাস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বই পড়া মানুষের জ্ঞান বাড়ায়। ইতিহাস, বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, ভূগোল, অর্থনীতি কিংবা সমাজবিজ্ঞান—প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে বইয়ের মাধ্যমে বিস্তারিত ধারণা অর্জন করা সম্ভব। সংবাদ বা সামাজিক মাধ্যম থেকে অনেক তথ্য পাওয়া গেলেও কোনও বিষয়কে গভীরভাবে বুঝতে বই বিশেষভাবে সাহায্য করে।
নিয়মিত বই পড়লে ভাষার ওপর দখল বাড়ে। নতুন শব্দ শেখা যায়, বাক্য গঠনের দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং নিজের ভাবনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা তৈরি হয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে গল্পের বই পড়া ভাষা শেখার প্রক্রিয়াকে আনন্দদায়ক করে তুলতে পারে। তারা নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়, বিভিন্ন পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারে এবং কল্পনার জগতে বিচরণ করার সুযোগ পায়।
বই পড়া মনোযোগ ধরে রাখার অভ্যাসও গড়ে তুলতে সাহায্য করে। একটি দীর্ঘ গল্প বা প্রবন্ধ পড়তে গেলে পাঠককে ধারাবাহিকভাবে বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। চরিত্র, ঘটনা, যুক্তি এবং বক্তব্য মনে রেখে এগোতে হয়। এই অভ্যাস পড়াশোনা, কর্মজীবন এবং দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও উপকারী হতে পারে।
এছাড়া বই মানুষের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার জগৎকে বিস্তৃত করে। অন্য মানুষের জীবনসংগ্রাম, আনন্দ, দুঃখ, সাফল্য ও ব্যর্থতার কথা পড়ে আমরা নানা দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে পারি। এর ফলে সহমর্মিতা বাড়তে পারে এবং সমাজকে আরও গভীরভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়।
ডিজিটাল যুগে পাঠাভ্যাসের পরিবর্তন
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি মানুষের জ্ঞান অর্জনের সুযোগকে অনেক সহজ করেছে। স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে ই-বুক, ডিজিটাল গ্রন্থাগার, অনলাইন পত্রিকা এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক লেখা পড়া যায়। যাঁরা দূরবর্তী অঞ্চলে থাকেন কিংবা সব সময় মুদ্রিত বই কিনতে পারেন না, তাঁদের জন্য ডিজিটাল বই বিশেষ সুবিধা এনে দিয়েছে।
তবে প্রযুক্তির এই সুবিধার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিষয়বস্তু মানুষের মনোযোগকে বারবার অন্যদিকে সরিয়ে দিতে পারে। একটি লেখা পড়তে পড়তেই বার্তা, বিজ্ঞপ্তি কিংবা ভিডিও দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কোনও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
অনেকেই দিনের অধিকাংশ সময় ফোনের পর্দায় কাটালেও সেই সময়ের খুব সামান্য অংশ গভীরভাবে পড়াশোনা বা বই পড়ার কাজে ব্যবহার করেন। ছোট ছোট লেখা পড়ার অভ্যাস বাড়লেও দীর্ঘ প্রবন্ধ বা বইয়ের সঙ্গে ধৈর্য ধরে যুক্ত থাকার অভ্যাস কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ডিজিটাল মাধ্যম বই পড়ার শত্রু। প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সেটিই পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। প্রয়োজন শুধু বিনোদন ও জ্ঞান অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা এবং নিজের জন্য নিয়মিত পড়ার সময় নির্ধারণ করা।
শিশুদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করতে হবে
শিশুদের জীবনে বইয়ের সঙ্গে পরিচয়ের সূচনা যত আনন্দদায়ক হবে, ভবিষ্যতে পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। ছোটবেলায় রঙিন ছবির বই, ছড়া, রূপকথা এবং ছোট গল্প শিশুদের কৌতূহল জাগিয়ে তুলতে পারে। বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরা শিশুদের গল্প পড়ে শোনালে বইয়ের সঙ্গে তাদের একটি আবেগপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।
অনেক সময় অভিভাবকেরা বই পড়াকে শুধুমাত্র পড়াশোনা বা পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে দেখেন। ফলে শিশুরা বইকে আনন্দের পরিবর্তে চাপের বিষয় হিসেবে ভাবতে শুরু করতে পারে। এই ধারণা বদলানো জরুরি। পাঠ্যবইয়ের বাইরে গল্প, বিজ্ঞান, প্রকৃতি, জীবনী, ভ্রমণ এবং কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়ের বই পড়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।
শিশুকে নিজের পছন্দের বই বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাও দিতে হবে। কেউ রহস্যের গল্প পছন্দ করতে পারে, কেউ পশুপাখি সম্পর্কে জানতে চাইতে পারে, আবার কেউ বিজ্ঞান বা মহাকাশ নিয়ে আগ্রহী হতে পারে। এই আগ্রহকে সম্মান জানালে পড়ার প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হয়।
অভিভাবকেরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু সময় পরিবারের সবাইকে নিয়ে বই পড়তে পারেন। বাড়িতে ছোট একটি বইয়ের তাক তৈরি করা যেতে পারে। জন্মদিন বা বিশেষ অনুষ্ঠানে খেলনা কিংবা পোশাকের পাশাপাশি বই উপহার দেওয়ার অভ্যাসও গড়ে তোলা যেতে পারে।
বিদ্যালয়ে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির উদ্যোগ
শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় শুধু পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণ করার জায়গা নয়; এটি জ্ঞান, কৌতূহল এবং সৃজনশীলতা বিকাশের কেন্দ্র। তাই শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার সুযোগ করে দেওয়া দরকার।
প্রতিটি বিদ্যালয়ে সমৃদ্ধ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য গ্রন্থাগার থাকা উচিত। সেখানে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, বিজ্ঞান, ইতিহাস, জীবনী এবং সাধারণ জ্ঞানের বইয়ের পাশাপাশি বয়সোপযোগী পত্রিকা রাখা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগারে যাওয়ার জন্য নিয়মিত সময় নির্ধারণ করলে বইয়ের সঙ্গে তাদের পরিচয় বাড়বে।
বিদ্যালয়ে বই পড়া নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা যেতে পারে। যেমন—বই পরিচিতি অনুষ্ঠান, গল্প বলা, কবিতা পাঠ, পাঠ-পরবর্তী আলোচনা, বই পর্যালোচনা লেখা এবং পছন্দের চরিত্র নিয়ে বক্তব্য রাখা। এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের পড়া বিষয়টি বুঝতে এবং নিজেদের ভাষায় প্রকাশ করতে সাহায্য করবে।
শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের বই পড়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। কোনও বই পড়তে বাধ্য করার পরিবর্তে বইটির আকর্ষণীয় দিক তুলে ধরা বেশি কার্যকর হতে পারে। শিক্ষক নিজে বই পড়েন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিজের পাঠ-অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গ্রন্থাগারের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা দরকার
একসময় পাড়ার গ্রন্থাগার ছিল জ্ঞানচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে নানা বয়সের মানুষ বই পড়তে যেতেন, পত্রিকা পড়তেন এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। বর্তমানে অনেক জায়গায় গ্রন্থাগারের ব্যবহার কমে যাওয়ার অভিযোগ শোনা যায়। আবার কিছু গ্রন্থাগারে পর্যাপ্ত নতুন বই, আধুনিক পরিকাঠামো কিংবা পাঠকবান্ধব পরিবেশের অভাব রয়েছে।
গ্রন্থাগারকে আবার মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে হলে বইয়ের সংগ্রহ সমৃদ্ধ করা, পাঠকবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা প্রয়োজন। শিশুদের জন্য আলাদা পাঠকক্ষ, তরুণদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বই এবং প্রবীণদের জন্য সংবাদপত্র ও সাময়িকীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
গ্রন্থাগার শুধু বই ধার দেওয়ার জায়গা নয়; এটি একটি সামাজিক শিক্ষাকেন্দ্রও হতে পারে। সেখানে লেখক-পাঠক আলোচনা, কবিতা পাঠ, গল্পপাঠ, বই প্রকাশের অনুষ্ঠান এবং শিক্ষামূলক কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আদানপ্রদান বাড়বে।
গ্রামীণ এলাকায় গ্রন্থাগারের প্রসার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যেসব পরিবারের পক্ষে নিয়মিত বই কেনা সম্ভব নয়, তাঁদের সন্তানদের জন্য গ্রন্থাগার শিক্ষার একটি মূল্যবান সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বই পড়ার গুরুত্ব
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলা সাহিত্যে রয়েছে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি এবং জীবনী সাহিত্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। এসব রচনার মধ্যে দিয়ে বাংলার সমাজ, ইতিহাস, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং সময়ের পরিবর্তন সম্পর্কে জানা যায়।
বাংলা বই পড়ার অভ্যাস নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষার সৌন্দর্য ও প্রকাশক্ষমতার সঙ্গে পরিচিত করায়। মাতৃভাষায় গভীরভাবে পড়তে পারলে নিজের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং চিন্তা প্রকাশের দক্ষতাও বৃদ্ধি পেতে পারে।
একই সঙ্গে অন্যান্য ভাষার সাহিত্য পড়ার সুযোগও থাকা উচিত। বিভিন্ন ভাষার বই অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্বের নানা দেশের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। অনুবাদ সাহিত্য ভাষাগত সীমানা অতিক্রম করে পাঠককে বৃহত্তর জগতের সঙ্গে যুক্ত করে।
বাংলা বইয়ের প্রচার ও প্রসারে বইমেলা, সাহিত্যসভা, বিদ্যালয়ের পাঠচক্র এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নতুন লেখকদের বইয়ের সঙ্গে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াও জরুরি।
বই পড়া ও মানসিক বিকাশ
বই মানুষের মানসিক জগৎকে সমৃদ্ধ করতে পারে। কোনও গল্পের চরিত্রের সঙ্গে পাঠক যখন নিজেকে মিলিয়ে দেখেন, তখন তিনি অন্যের অনুভূতি ও পরিস্থিতি বোঝার সুযোগ পান। জীবনী পড়ে অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়, ইতিহাস পড়ে অতীতের ভুল ও সাফল্য সম্পর্কে জানা যায়, আর বিজ্ঞানভিত্তিক বই প্রশ্ন করতে ও যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখায়।
অবসর সময়ে পছন্দের বই পড়া অনেকের কাছে আনন্দ ও স্বস্তির উৎস। দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে সরে মনোযোগ দিয়ে একটি বই পড়া মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে। তবে বই পড়লেই সব মানসিক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং এটি সুস্থ জীবনযাপনের একটি ইতিবাচক অভ্যাস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বই মানুষের মধ্যে প্রশ্ন করার ক্ষমতা বাড়ায়। কোনও তথ্য পড়ে সেটি যাচাই করা, বিভিন্ন লেখকের মতামত তুলনা করা এবং যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করা জরুরি। বর্তমান সময়ে যখন সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়তে পারে, তখন গভীর পাঠাভ্যাস ও তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়।
বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার সহজ উপায়
যাঁরা দীর্ঘদিন বই পড়েননি, তাঁদের জন্য আবার অভ্যাস শুরু করা কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু অল্প সময় দিয়ে শুরু করলে ধীরে ধীরে নিয়মিত পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রথমত, প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মিনিট বই পড়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা যেতে পারে। সকালে, দুপুরে অবসরে কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে—নিজের সুবিধামতো সময় বেছে নেওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, শুরুতেই বড় বা কঠিন বই বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ছোট গল্প, ভ্রমণকাহিনি, জীবনী কিংবা নিজের আগ্রহের বিষয় নিয়ে লেখা বই দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, পড়ার সময় মোবাইল ফোনের অপ্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তি বন্ধ রাখা ভালো। এতে মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হতে পারে।
চতুর্থত, পড়া বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা নিজের পছন্দের বক্তব্য একটি খাতায় লিখে রাখা যেতে পারে। বই শেষ হলে তার বিষয়বস্তু নিয়ে নিজের সঙ্গে কিংবা অন্য পাঠকের সঙ্গে আলোচনা করলে পড়ার অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হয়।
পঞ্চমত, বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ছোট পাঠচক্র তৈরি করা যেতে পারে। সবাই একটি বই পড়ে নিজেদের মতামত ভাগ করে নিলে পড়ার আগ্রহ বাড়তে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বই পড়াকে প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে আনন্দের অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করা। কতগুলি বই পড়া হল, তার চেয়ে কী পড়লাম এবং তা থেকে কী শিখলাম—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক, প্রকাশক ও বইমেলার ভূমিকা
পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির ক্ষেত্রে লেখক, প্রকাশক এবং বই বিক্রেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাঠকের আগ্রহ অনুযায়ী মানসম্মত বই প্রকাশ করা, বইয়ের দাম যতটা সম্ভব নাগালের মধ্যে রাখা এবং নতুন লেখকদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
বইমেলা পাঠক ও লেখকের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বইমেলায় মানুষ নতুন বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হন, লেখকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান এবং বিভিন্ন সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ পাঠ-আয়োজন করলে ছোটবেলা থেকেই বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
এখন অনলাইনে বই কেনা এবং ই-বুক পড়ার সুযোগও রয়েছে। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে দূরবর্তী এলাকার পাঠকদের কাছেও বই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। তবে বইয়ের প্রচারের পাশাপাশি পাঠকের মধ্যে নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তৈরি করার দিকেও নজর দেওয়া দরকার।
উপসংহার: বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠুক প্রতিটি ঘরে
বই মানুষের জ্ঞান, কল্পনা, অনুভূতি এবং চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে তথ্য পাওয়া সহজ হয়েছে, কিন্তু তথ্যের গভীরতা বোঝা, যুক্তি দিয়ে বিচার করা এবং কোনও বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করার জন্য মনোযোগী পাঠাভ্যাসের গুরুত্ব এখনও অপরিসীম।
বই পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে বড় কোনও কর্মসূচির অপেক্ষা করার দরকার নেই। একটি বই হাতে তুলে নেওয়া, প্রতিদিন কয়েক মিনিট পড়া এবং পড়া বিষয় নিয়ে ভাবার মধ্য দিয়েই শুরু হতে পারে পরিবর্তন। পরিবারে বই পড়ার পরিবেশ তৈরি করা, বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারকে সক্রিয় করা এবং পাড়ায় পাঠচক্র গড়ে তোলার মাধ্যমে এই অভ্যাস আরও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
শিশুদের হাতে বই তুলে দিতে হবে, তরুণদের নিজেদের পছন্দের বিষয় পড়তে উৎসাহিত করতে হবে এবং প্রাপ্তবয়স্কদেরও আজীবন শিক্ষার অংশ হিসেবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত গভীর হবে, সমাজে জ্ঞানচর্চা, যুক্তিবোধ এবং সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশের সুযোগও তত বাড়বে।
মনে রাখতে হবে, বই কেবল কাগজের পাতা আর মুদ্রিত অক্ষরের সমষ্টি নয়। বই মানুষের সামনে নতুন জানালা খুলে দেয়, অজানাকে জানতে শেখায় এবং পরিচিত পৃথিবীকে নতুন চোখে দেখতে সাহায্য করে।
তাই ডিজিটাল যুগে বইকে দূরে সরিয়ে না রেখে প্রযুক্তির পাশাপাশি বই পড়ার অভ্যাসকেও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলা দরকার। আজ থেকেই শুরু হোক বইয়ের সঙ্গে নতুন বন্ধুত্ব—প্রতিটি বাড়িতে, প্রতিটি বিদ্যালয়ে এবং প্রতিটি মানুষের জীবনে।