১. যে মানুষটি মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়েছিল
রাত দশটা।
পুরোনো রেকর্ড সংরক্ষণাগারের দরজা খুলে যেতেই অনিরুদ্ধ সেনের মনে হল, সে যেন কোনও পরিত্যক্ত আদালতের ভিতরে প্রবেশ করছে। লম্বা করিডর, দেওয়ালে জমে থাকা স্যাঁতসেঁতে দাগ, ছাদের কোণে মাকড়সার জাল আর দূরে কোথাও একটানা টুপটাপ জলের শব্দ।
দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ প্রথমে অন্ধকারে ঢাকা ছিল। কয়েক মুহূর্ত পর তিনি এগিয়ে এলেন। করিডরের হলুদ আলো তাঁর মুখে পড়তেই অনিরুদ্ধের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
সেই মুখ সে দেখেছে।
তিন বছর আগে হাসপাতালের মর্গে, কাচের ঘেরা শীতল কক্ষে, সাদা চাদরে ঢাকা একটি মৃতদেহের মুখ হিসেবে।
সেই মুখের মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছিল।
বিচারপতি অরুণাভ মজুমদার।
“আপনি!” অনিরুদ্ধের গলা শুকিয়ে গেল।
বিচারপতি কোনও উত্তর দিলেন না। তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোখের নীচে গভীর কালি। তিনি যেন বহু রাত ঘুমোননি।
মৈত্রী বসু পিছন থেকে বললেন, “আপনি এত দিন কোথায় ছিলেন?”
অরুণাভ তাঁদের দুজনকে ভিতরে আসতে ইঙ্গিত করলেন।
“এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় নেই। যে খবর তোমাদের কাছে পৌঁছেছে, সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়। আজ রাতেই একটি নতুন মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হবে। কিন্তু সেই খবর প্রকাশিত হওয়ার আগেই আমাদের আসল নথিটি উদ্ধার করতে হবে।”
অনিরুদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়েই বলল, “আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। তিন বছর আগে আপনার মৃতদেহ দেখেছিলাম আমি। তাহলে সেটি কার ছিল?”
বিচারপতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“একজন মানুষের।”
“নাম?”
“এই মুহূর্তে নাম বললে তোমার সামনে থাকা রহস্যের অর্ধেকও বুঝতে পারবে না।”
“আপনি আমাকে তিন বছর ধরে খুনের অভিযুক্ত হতে দিয়েছেন। আমার পেশা, সম্মান, জীবন—সবকিছু তছনছ হয়ে গিয়েছে। আর এখন আপনি বলছেন, নাম বলার সময় হয়নি?”
অরুণাভ মজুমদার মাথা নিচু করলেন।
“তোমার প্রতি যা হয়েছে, তার জন্য আমি দায় এড়াতে পারি না।”
“তাহলে সত্যি বলুন।”
বিচারপতি ধীরে ধীরে বললেন, “যে মৃতদেহটিকে আমার বলে শনাক্ত করা হয়েছিল, সেটি এমন একজনের, যিনি নিজের পরিচয় হারিয়েছিলেন। তাঁর মুখের গঠন আমার সঙ্গে কিছুটা মিলত। দাঁতের চিকিৎসার পুরোনো নথিও বদলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর শরীরে এমন একটি চিহ্ন ছিল, যা আমার শরীরে কখনও ছিল না।”
“তাহলে পোস্টমর্টেমে সেটা ধরা পড়েনি কেন?”
“ধরা পড়েছিল। রিপোর্টে লেখা হয়েছিল। পরে সেই অংশ পরিবর্তন করা হয়।”
মৈত্রী বললেন, “আপনি কি জানতেন, অনিরুদ্ধকে ওই মামলায় ফাঁসানো হবে?”
“আমি জানতাম, তাকে সন্দেহভাজন করা হতে পারে। কিন্তু তদন্ত কোন দিকে যাবে, সেটা পুরোপুরি আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল না।”
অনিরুদ্ধ তিক্ত স্বরে বলল, “আপনি বিচারপতি ছিলেন। আদালতের মানুষ। তবু আমাকে রক্ষা করতে পারলেন না?”
“আমি তখন আর প্রকাশ্যে বিচারপতি হিসেবে কাজ করছিলাম না।”
“কেন?”
অরুণাভ একটি পুরোনো কাঠের টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
“কারণ ২০০৯ সালের মামলায় আমি এমন কিছু নথি দেখেছিলাম, যেগুলোর অস্তিত্ব সরকারি রেকর্ড থেকে মুছে ফেলা হচ্ছিল। সেই মামলার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় বদলানো হচ্ছিল। কিছু মানুষকে রক্ষা করার জন্য তৈরি করা ব্যবস্থা পরে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে অপরাধের সাক্ষীকে অদৃশ্য করে দেওয়া যায়। আমি বিষয়টি আদালতে আনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই আমার নিজের পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়।”
“আপনার পরিচয়?”
“একটি সরকারি নথিতে লেখা হয়েছিল, আমি বহু বছর আগেই মারা গিয়েছি। অন্য একটি নথিতে আমাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন নামে শনাক্ত করা হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম, এগুলো নিছক প্রশাসনিক ভুল। পরে বুঝলাম, ভুল নয়—পরিকল্পিত ব্যবস্থা।”
অনিরুদ্ধের মনে পড়ল, বাবার পরিচয়পত্র, অনির্বাণ দত্তের নাম এবং তার নিজের স্বাক্ষরযুক্ত সেই অদ্ভুত কাগজ।
“আপনি কি আমার বাবাকে এই ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন?”
বিচারপতি সরাসরি উত্তর দিলেন, “তোমার বাবা নিজেই তদন্ত শুরু করেছিলেন। আমি তাঁকে সাহায্য করেছিলাম। কিন্তু তাঁকে যে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিলাম, তার দায় আমারও।”
“তাহলে তিনি কেন নিজের ছেলের কাছ থেকে পালিয়ে থাকলেন?”
“কারণ তোমাকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল।”
“কারা আমাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল?”
বিচারপতি টেবিলের নীচের ড্রয়ার খুলে একটি পাতলা ফাইল বের করলেন।
“এই প্রশ্নের উত্তর এই ফাইলে আছে। তবে ফাইলটি পড়ার আগে তোমাকে একটা বিষয় বুঝতে হবে। তোমার বাবার পরিচয় নিয়ে যে নথি তৈরি হয়েছিল, সেটি শুধু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত নয়। সেটি তোমার নিজের পরিচয় সম্পর্কেও একটি মিথ্যা তৈরি করেছিল।”
অনিরুদ্ধ ফাইলটির দিকে হাত বাড়াল।
ঠিক সেই সময় ভবনের পিছনের দিক থেকে ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হল।
মৈত্রী দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালেন।
অরুণাভ ফাইলটি বন্ধ করে বললেন, “ওরা এসে গেছে।”
“কারা?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞাসা করল।
“যারা চায়, এই নথি আর কখনও আদালতে না পৌঁছয়।”
২. ফাইল নম্বর ৪৭/২০০৯
তিনজন দ্রুত করিডরের শেষ প্রান্তে এগিয়ে গেলেন। সেখানে একটি ছোট ঘর। দেওয়ালজুড়ে লোহার আলমারি, পুরোনো নথির বাক্স এবং ধুলো জমে থাকা রেজিস্টার।
অরুণাভ দরজা বন্ধ করে চাবি ঘুরিয়ে দিলেন।
“এই ঘরটি সরকারি নকশায় নেই,” তিনি বললেন। “বহু বছর আগে রেকর্ড সংরক্ষণের জন্য এটি তৈরি হয়েছিল। পরে মূল সংরক্ষণাগারের সম্প্রসারণের সময় ঘরটিকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু নথি এখানে রেখে দেওয়া হয়েছিল।”
অনিরুদ্ধ জিজ্ঞাসা করল, “আপনি জানতেন ফাইলটি এখানে আছে?”
“আমি জানতাম, ২০০৯ সালে মামলার একটি মূল কপি এখানে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেটি এখনও আছে কি না, তা জানতাম না।”
মৈত্রী আলমারির গায়ে লাগানো নম্বরগুলি পরীক্ষা করতে লাগলেন।
একটি আলমারিতে লেখা—‘বিশেষ আদালত: ২০০৮–২০১০’।
তার নীচে কয়েকটি বাক্স।
অনিরুদ্ধ একটি বাক্স টেনে বের করল। ভিতরে ফাইলের স্তূপ। বেশিরভাগ ফাইলের মলাটে তারিখ ও মামলা নম্বর লেখা। সে দ্রুত খুঁজতে লাগল।
হঠাৎ একটি কালো মলাটের ফাইল চোখে পড়ল।
মামলা নম্বর ৪৭/২০০৯।
ফাইলের নীচে লাল কালিতে লেখা—‘সীমিত প্রবেশাধিকার’।
অরুণাভ ফাইলটি হাতে নিয়ে বললেন, “এটাই।”
কিন্তু ফাইল খুলতেই দেখা গেল, অধিকাংশ পাতা ফাঁকা। কিছু পাতার কোণা ছেঁড়া। সাক্ষীদের তালিকার জায়গায় শুধু একটি সিল—‘পরিচয় যাচাই অসম্পূর্ণ’।
মৈত্রী বললেন, “এখানে তো কিছুই নেই!”
অরুণাভ পাতা উল্টে যেতে যেতে থামলেন।
শেষের দিকে একটি ভাঁজ করা কাগজ।
তিনি সেটি সাবধানে খুললেন।
কাগজে তিনটি কলাম।
প্রথম কলামে নাম, দ্বিতীয় কলামে পুরোনো পরিচয়, তৃতীয় কলামে নতুন পরিচয়।
প্রথম নাম—অমিতাভ সেন।
দ্বিতীয় নাম—অনির্বাণ দত্ত।
তৃতীয় নামের জায়গাটি ফাঁকা।
কিন্তু পাশে লেখা ছিল একটি সংখ্যা—০৩।
অনিরুদ্ধ বলল, “তৃতীয় ব্যক্তির নাম নেই কেন?”
অরুণাভ উত্তর দিলেন, “কারণ এই নথি তৈরি হওয়ার সময় তৃতীয় ব্যক্তি নিজের পরিচয় জানাতে অস্বীকার করেছিলেন।”
“কে ছিলেন তিনি?”
“এখনও জানি না।”
অনিরুদ্ধ অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
“আপনি এই মামলার বিচারপতি ছিলেন। আর আপনি জানেন না, আপনার সামনে থাকা তৃতীয় ব্যক্তি কে?”
“আমি বিচারপতি হিসেবে এই মামলার সব শুনানি পরিচালনা করিনি। এক পর্যায়ে আমাকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে যে নথিগুলো আমার হাতে আসে, সেগুলো অসম্পূর্ণ ছিল।”
“কেন আপনাকে সরানো হয়েছিল?”
“কারণ আমি এমন একটি নির্দেশে সই করতে অস্বীকার করেছিলাম, যার মাধ্যমে একজন জীবিত মানুষকে আইনিভাবে মৃত বলে ঘোষণা করা সম্ভব হত।”
মৈত্রী কাগজটি হাতে নিয়ে বললেন, “তাহলে আপনার মৃত্যুর নথি কি সেই একই পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছিল?”
অরুণাভ মাথা নাড়লেন।
“আমার মৃত্যুর নথি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তার আগে আমাকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল, যেখানে প্রকাশ্যে বেঁচে থাকার অর্থ ছিল অন্যদের বিপদে ফেলে দেওয়া।”
অনিরুদ্ধ বলল, “আপনি নিজেই নিজের মৃত্যু মেনে নিয়েছিলেন?”
“আমি প্রকাশ্যে মৃত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার হয়ে যে দেহটি শনাক্ত করা হয়েছিল, সেটি আমার ছিল না। সেই ব্যবস্থা কীভাবে সম্পন্ন হল, তা নিয়ে আমারও প্রশ্ন আছে।”
“তাহলে আপনি জানতেন না, আপনার নামে অন্য একজনের দেহ দেখানো হবে?”
“আমি জানতাম, আমার পরিচয় গোপন করা হবে। কিন্তু দেহ শনাক্তকরণের ঘটনাটি আমার পরিকল্পনার অংশ ছিল না।”
অনিরুদ্ধের সন্দেহ আরও বাড়ল।
“আপনি কি নিশ্চিত, আপনি পুরো সত্য বলছেন?”
বিচারপতি কোনও উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
একজন বলল, “ঘরটা দেখো। ফাইল এখানে থাকার কথা।”
আরেকজন বলল, “কেউ বেরোতে পারবে না।”
মৈত্রী অনিরুদ্ধের দিকে তাকালেন।
অরুণাভ দ্রুত ফাইলের ভিতর থেকে কাগজটি বের করে তাঁর হাতে দিলেন।
“এটা লুকিয়ে রাখো।”
“আর আপনি?”
“আমি ওদের আটকানোর চেষ্টা করব।”
অনিরুদ্ধ মাথা নাড়ল।
“না। এবার আর কাউকে একা রেখে যাব না।”
অরুণাভ তার দিকে তাকালেন। তারপর খুব নিচু স্বরে বললেন, “তোমার বাবা ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন। আর সেই কারণেই তিনি আজও বিপদে।”
৩. পরিচয় বদলের কারিগর
দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ল।
“দরজা খুলুন!”
অরুণাভ টেবিলের পাশের দেওয়ালে হাত রাখলেন। একটি সরু কাঠের প্যানেল সামান্য সরে গেল। তার পিছনে অন্ধকার পথ।
“এই পথটি পুরোনো নথি পরিবহণের জন্য তৈরি হয়েছিল,” তিনি বললেন। “মৈত্রী, তুমি অনিরুদ্ধকে নিয়ে বেরিয়ে যাও।”
মৈত্রী প্রতিবাদ করলেন, “আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন।”
“আমি অন্য পথে যাব। যদি আমরা তিনজন একসঙ্গে ধরা পড়ি, তাহলে কাগজটি আর বাইরে যাবে না।”
অনিরুদ্ধ বলল, “আপনি আমাদের সঙ্গে মিথ্যা বলে থাকলে?”
অরুণাভ স্থির চোখে তার দিকে তাকালেন।
“তাহলে এই মুহূর্তে তোমাকে পালানোর পথ দেখাতাম না।”
দরজায় আবার আঘাত পড়ল। কাঠ ফেটে যাওয়ার শব্দ।
অনিরুদ্ধ ও মৈত্রী সরু পথ দিয়ে এগিয়ে গেলেন। পথটি নিচের দিকে নেমেছে। কিছু দূর গিয়ে একটি লোহার সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে নেমে তাঁরা ভবনের পিছনের একটি পরিত্যক্ত ঘরে পৌঁছলেন।
মৈত্রী দরজা খুলে বাইরে উঁকি দিলেন।
চারপাশে কেউ নেই।
দুজনেই দ্রুত গাড়ির দিকে এগোলেন।
গাড়িতে বসেই অনিরুদ্ধ কাগজটি বের করল। তার চোখ বারবার তৃতীয় নামের ফাঁকা জায়গায় চলে যাচ্ছিল।
“আমাদের অনির্বাণ দত্তকে খুঁজতে হবে,” সে বলল।
মৈত্রী মাথা নাড়লেন।
“গবেষণাগারের নথি অনুযায়ী, তিনি ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন।”
“তারপর?”
“তাঁর নামে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।”
অনিরুদ্ধ বলল, “কিন্তু আমার বাবার পরিচয়পত্রে তাঁর কর্মী নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। তার মানে তাঁদের মধ্যে কোনও সম্পর্ক ছিল।”
মৈত্রী ফোন বের করে পুরোনো নথিতে থাকা নম্বরগুলি মিলিয়ে দেখতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, “একটা তথ্য পেয়েছি। ২০০৯ সালের শেষ দিকে অনির্বাণ দত্তের নামে একটি গবেষণাপত্র জমা পড়েছিল। বিষয় ছিল—মৃতদেহ শনাক্তকরণে পরিচয়গত অসংগতি।”
“কোথায় জমা পড়েছিল?”
“একটি চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু গবেষণাপত্রটি পরে প্রত্যাহার করা হয়।”
“কেন?”
“প্রকাশিত রেকর্ডে বলা হয়েছে, তথ্য যাচাই করা যায়নি।”
অনিরুদ্ধ বলল, “সেটি সত্যি নয়। কেউ গবেষণাটি চাপা দিয়েছে।”
মৈত্রী বললেন, “সম্ভব। কিন্তু এখন আমাদের কাছে প্রমাণ নেই।”
অনিরুদ্ধ ফোনের দিকে তাকাল। অচেনা নম্বর থেকে আরেকটি বার্তা এসেছে।
আপনি ভুল মানুষকে খুঁজছেন। অনির্বাণ দত্ত কখনও আপনার বাবার পরিচয় নেননি। আপনার বাবা তাঁর পরিচয় নিয়েছিলেন।
অনিরুদ্ধ বার্তাটি মৈত্রীকে দেখাল।
“এর মানে কী?”
মৈত্রী বললেন, “যদি বার্তাটি সত্যি হয়, তাহলে আপনার বাবা কোনও সময়ে অনির্বাণ দত্তের পরিচয়ে ছিলেন।”
“কিন্তু কেন?”
“সম্ভবত নিজের পরিচয় আড়াল করার জন্য। অথবা অন্য কাউকে রক্ষা করার জন্য।”
অনিরুদ্ধ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “আমার বাবার পরিচয়পত্র, বিচারপতির মৃত্যু এবং তৃতীয় সাক্ষী—সবকিছুর মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু আমরা এখনও সেই সম্পর্কের কেন্দ্রে পৌঁছতে পারিনি।”
মৈত্রী বললেন, “আমাদের এমন কাউকে খুঁজতে হবে, যিনি অনির্বাণ দত্তকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন।”
অনিরুদ্ধের মনে পড়ল, তার বাবা হাসপাতালে শুয়ে বলেছিলেন—সেই লোকটি পরে সরকারি নথিতে মৃত বলে চিহ্নিত হয়েছিল।
হয়তো সেই লোকটি অনির্বাণ দত্ত।
হয়তো নয়।
কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার: ২০০৯ সালের নভেম্বরে এমন কিছু ঘটেছিল, যার পর তিনজন মানুষের পরিচয় আর আগের মতো থাকেনি।
আর সেই ঘটনার সঙ্গে তার নিজের নাম জড়িয়ে গিয়েছিল, যখন সে ছিল মাত্র সাত বছরের শিশু।
৪. দ্বিতীয় মৃত্যুসংবাদ
রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ।
অনিরুদ্ধ ও মৈত্রী একটি নিরাপদ বাড়িতে পৌঁছলেন। বাড়িটি মৈত্রীর এক পরিচিত চিকিৎসকের। সেখানে ফোনের সংযোগ বন্ধ রেখে তাঁরা কাগজপত্র পরীক্ষা করতে লাগলেন।
হঠাৎ মৈত্রীর ফোনে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এল।
তিনি পড়ে স্থির হয়ে গেলেন।
“অনিরুদ্ধ, এটা দেখুন।”
বিজ্ঞপ্তিটি একটি সংবাদ সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। শিরোনাম—
তিন বছর আগে মৃত ঘোষিত বিচারপতি অরুণাভ মজুমদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী অমিতাভ সেনের মৃত্যু।
বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি অমিতাভ সেন রাত এগারোটা দশ মিনিটে মারা গিয়েছেন। তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে পুরোনো সরকারি নথির ভিত্তিতে।
অনিরুদ্ধ চিৎকার করে উঠল, “এটা মিথ্যা! আমি কয়েক ঘণ্টা আগেই তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি!”
মৈত্রী বললেন, “আমাদের হাসপাতালে যেতে হবে।”
“না। আগে খবরটা যাচাই করতে হবে।”
অনিরুদ্ধ হাসপাতালের একজন চিকিৎসককে ফোন করল। বহুবার চেষ্টা করার পর যোগাযোগ হল।
চিকিৎসক বললেন, “রোগী এখনও জীবিত। তবে তাঁকে অন্য একটি কক্ষে স্থানান্তর করা হয়েছে। কিছু লোক নিজেদের সরকারি তদন্তকারী বলে পরিচয় দিয়ে তাঁকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমরা বাধা দিয়েছি।”
“তাঁর নিরাপত্তা আছে?”
“এই মুহূর্তে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা পাহারা দিচ্ছেন। কিন্তু আপনাকে একটা কথা বলি—যে পরিচয়পত্র দিয়ে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল, সেটি যাচাই করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, ওই নম্বরের কোনও বৈধ রেকর্ড নেই।”
অনিরুদ্ধ ফোন নামিয়ে রাখল।
মৈত্রী বললেন, “তার মানে, আপনার বাবাকে আবারও অন্য পরিচয়ে নথিভুক্ত করা হয়েছে।”
“আর তাঁর মৃত্যুর খবরও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে কেউ তাঁকে খুঁজতে গেলে ধরে নেয়, তিনি আর নেই।”
অনিরুদ্ধ জানালার দিকে তাকাল।
“এটা শুধু আমার বাবাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা নয়। কেউ চাইছে, আমরা যেন তাঁর কাছ থেকে কোনও তথ্য না পাই।”
ঠিক তখনই দরজায় ঘণ্টা বাজল।
দুজনেই স্থির হয়ে গেলেন।
মৈত্রী ধীরে ধীরে দরজার কাছে গেলেন। চোখের সমান ছোট ছিদ্র দিয়ে বাইরে তাকালেন।
তারপর ফিরে এসে বললেন, “একজন লোক এসেছে। বলছে, সে বিচারপতি অরুণাভ মজুমদারের পাঠানো।”
অনিরুদ্ধ জিজ্ঞাসা করল, “তার কাছে কোনও প্রমাণ আছে?”
“একটি খাম।”
অনিরুদ্ধ দরজার কাছে গিয়ে বলল, “খামটা দরজার নীচ দিয়ে দিন।”
বাইরে থেকে খামটি ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। লোকটি আর কোনও কথা না বলে চলে গেল।
খামের মধ্যে একটি ছোট মেমোরি কার্ড এবং হাতে লেখা একটি বার্তা।
‘তোমার বাবা জীবিত। কিন্তু তুমি যে মানুষটিকে আজ হাসপাতালে দেখেছ, তিনি তোমার বাবার পরিচয় ব্যবহার করছেন। আসল অমিতাভ সেনকে খুঁজে পেতে হলে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বরের হাসপাতাল রেজিস্টার খুঁজে বের করো।’
নিচে স্বাক্ষর—অরুণাভ মজুমদার।
অনিরুদ্ধের মাথা ঘুরে গেল।
“তাহলে হাসপাতালে যে মানুষটির সঙ্গে দেখা করেছি, তিনি কে?”
মৈত্রী বললেন, “হয়তো একজন প্রতারক।”
“কিন্তু তিনি আমার শৈশবের কথা জানতেন। আমার মায়ের মৃত্যুর খবর শুনে কেঁদেছিলেন।”
“সেই কারণেই ব্যাপারটা আরও জটিল।”
অনিরুদ্ধ মেমোরি কার্ডটি কম্পিউটারে চালাল।
ভিডিওতে একটি ছোট ঘর। টেবিলের সামনে বসে আছেন একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ। মুখে ক্লান্তি, চোখে গভীর উদ্বেগ।
তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার নাম অনির্বাণ দত্ত। অন্তত এই পরিচয়ে আমাকে তোমরা চিনতে পারো। কিন্তু এই নামটিও আমার আসল নাম নয়।”
অনিরুদ্ধ শ্বাস আটকে ভিডিও দেখতে লাগল।
লোকটি বললেন, “২০০৯ সালের ১৭ নভেম্বর একটি সরকারি হাসপাতালে তিনজন মানুষকে আনা হয়েছিল। তাঁদের প্রত্যেকের পরিচয় নিয়ে সমস্যা ছিল। একজনের পরিচয় ছিল অমিতাভ সেন। দ্বিতীয়জনের পরিচয় ছিল অরুণাভ মজুমদার। তৃতীয়জনের পরিচয় নথিভুক্ত করা হয়নি।”
“সেদিন একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল,” তিনি বললেন। “একজন মানুষ মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃতদেহের পরিচয় ভুলভাবে নথিভুক্ত করা হয়। সেই ভুল সংশোধন করার বদলে পরের দুই দিনে আরও দুটি মিথ্যা পরিচয় তৈরি করা হয়।”
ভিডিওর লোকটি সামনের দিকে ঝুঁকলেন।
“অনিরুদ্ধ, তুমি যদি এই ভিডিও দেখো, তাহলে জেনে রেখো—তোমার বাবা তোমাকে ছেড়ে যাননি। তিনি তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটিই তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।”
অনিরুদ্ধের চোখে জল এসে গেল।
“তৃতীয় ব্যক্তির পরিচয় আমি জানি,” লোকটি বললেন। “কিন্তু নামটি বলার আগে তোমাকে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর তোমার নামে যে সম্মতিপত্র তৈরি হয়েছিল, তাতে তোমার স্বাক্ষর কে করেছিল?”
ভিডিও থেমে গেল।
স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।
অনিরুদ্ধ অনেকক্ষণ কোনও কথা বলতে পারল না।
তারপর মৈত্রী বললেন, “এখন আমাদের বুঝতে হবে, সেই দিন হাসপাতালের রেজিস্টারে কী লেখা ছিল।”
অনিরুদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
“না। তার আগে আমাকে আমার বাবার সঙ্গে আবার দেখা করতে হবে।”
“আপনি তো তাঁকে আজই দেখেছেন।”
“আমি যাঁকে দেখেছি, তিনি হয়তো আমার বাবা নন। কিন্তু তাঁর চোখে যে যন্ত্রণা দেখেছি, তা অভিনয়ও হতে পারে, আবার সত্যিও হতে পারে। আমি আর অনুমানের ওপর নির্ভর করব না।”
সে টেবিল থেকে নোটবুকটি তুলে নিল।
“আগামীকাল প্রথম কাজ—২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বরের হাসপাতাল রেজিস্টার উদ্ধার করা। দ্বিতীয় কাজ—অমিতাভ সেনের পরিচয় নিশ্চিত করা। আর তৃতীয় কাজ—অনির্বাণ দত্তকে খুঁজে বের করা।”
মৈত্রী বললেন, “তৃতীয় ব্যক্তি কে, সেটা না জানা পর্যন্ত কি আমরা এগোতে পারব?”
অনিরুদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমরা এত দিন ভুল প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। কে মারা গিয়েছিল, কে বেঁচে আছে—সেটা নয়। আসল প্রশ্ন হল, কে কাকে নিজের পরিচয় দিয়েছিল, আর কেন?”
৫. যে সাক্ষী নিজের নাম জানে না
রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে।
অনিরুদ্ধের ফোনে আবার একটি বার্তা এল।
এবার কোনও অচেনা নম্বর নয়। প্রেরকের নামের জায়গায় লেখা—‘অমিতাভ সেন’।
বার্তাটি ছোট।
আমাকে খুঁজিস না। হাসপাতালের লোকটি তোর বাবা নয়। কিন্তু সে শত্রুও নয়। কাল সকাল ন’টায় পুরোনো ফরেনসিক গবেষণাগারের পিছনের প্রবেশদ্বারে আসিস। একা। সঙ্গে কোনও নথি আনবি না।
অনিরুদ্ধ বার্তাটি পড়ে মৈত্রীকে দেখাল।
“এটা কি সত্যিই আপনার বাবার নম্বর?” তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।
“না। নম্বরটি নতুন। কিন্তু তিনি এমন একটি কথা লিখেছেন, যা শুধু আমার বাবা জানতেন।”
“কী কথা?”
অনিরুদ্ধ উত্তর দিল না।
শৈশবে তার বাবা তাকে একটি খেলা শেখাতেন। যখনই বাবা বাইরে থেকে বাড়ি ফিরতেন, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন করতেন—যার উত্তর শুধু অনিরুদ্ধ জানত। সেই প্রশ্নের উত্তর ভুল হলে দরজা খোলা হত না।
বার্তায় সেই প্রশ্নের প্রথম অংশ লেখা ছিল।
এটি কাকতালীয় হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবু অনিরুদ্ধ বুঝতে পারছিল, তাকে একা যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মানেই সেটি নিরাপদ নয়।
মৈত্রী বললেন, “আপনি একা যাবেন না।”
“বার্তায় একা যেতে বলা হয়েছে।”
“যে আপনাকে ডাকছে, সে আপনার বাবা কি না, আমরা নিশ্চিত নই। আপনি একা গেলে বিপদ হতে পারে।”
অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “আপনি দূর থেকে নজর রাখবেন। আমি ভিতরে যাব। যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরে না আসি, তাহলে দেবাশিস রায়কে খবর দেবেন।”
মৈত্রী সম্মতি দিলেন।
কিন্তু ঘুমোতে যাওয়ার আগে অনিরুদ্ধ আর একবার মেমোরি কার্ডের ভিডিওটি চালাল। এবার সে লোকটির মুখের দিকে নয়, পিছনের দেওয়ালের দিকে তাকাল।
দেওয়ালে একটি ক্যালেন্ডার ঝুলছে।
তারিখ—১৯ নভেম্বর, ২০০৯।
ক্যালেন্ডারের নীচে একটি হাসপাতালের নাম। তার পাশেই ছোট অক্ষরে লেখা—‘সাক্ষী ০৩’।
অনিরুদ্ধ ভিডিও থামিয়ে ছবিটি বড় করল।
ক্যালেন্ডারের পাশে একটি ফ্রেমে রাখা ছবি। ছবিতে তিনজন মানুষ—অমিতাভ সেন, অরুণাভ মজুমদার এবং আরেকজন অচেনা ব্যক্তি।
অচেনা মানুষটির মুখে কোনও বিশেষ চিহ্ন নেই। কিন্তু তাঁর ডান হাতে একটি আঙুল অনুপস্থিত।
অনিরুদ্ধের মনে পড়ল, পুরোনো আদালতের করিডরে সে একবার এমন একজন মানুষকে দেখেছিল। সেই মানুষটি বিচারপতির মৃত্যুর মামলার শুনানির দিন আদালতে এসেছিলেন। তিনি কোনও সাক্ষী ছিলেন না, কোনও আইনজীবীও নন। কিন্তু বিচারপতির মৃতদেহ শনাক্ত করার সময় তিনি মর্গের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তখন অনিরুদ্ধ ভেবেছিল, তিনি মৃতের আত্মীয়।
আজ বুঝতে পারল, লোকটি হয়তো এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
আর আশ্চর্যের বিষয়, তার নাম কোনও সরকারি নথিতে নেই।
অনিরুদ্ধ কম্পিউটার বন্ধ করে দিল।
তার সামনে এখন তিনটি প্রশ্ন।
হাসপাতালে শুয়ে থাকা মানুষটি কে?
তার বাবা কোথায়?
আর সেই তৃতীয় সাক্ষী—যার নাম কোনও নথিতে নেই—তিনি কি এখনও জীবিত?
সকালে সে উত্তর খুঁজতে যাবে।
কিন্তু সে জানত না, পরদিন সকাল ন’টার আগেই তার নিজের নামের পাশে সরকারি নথিতে একটি নতুন শব্দ লেখা হয়ে যাবে।
‘নিখোঁজ।’
আর যে ব্যক্তি সেই নথিতে সই করবেন, তাঁর নাম হবে—
অমিতাভ সেন।
— সমাপ্ত —