শেষ পর্ব
কাচের ঘরের ভিতরে দুটি শিশু একসঙ্গে চোখ খুলেছে।
নীলাঞ্জনা সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে, এতক্ষণ যা কিছু দেখেছে, তার কোনওটাই সত্যি নয়। আবার সবকিছুই যেন তার জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে আছে।
দুটি শিশুর মুখ অবিকল এক।
তাদের চোখের মণি গাঢ় নীল।
কাচের ঘরের দেয়ালে লাল আলো জ্বলছে। যন্ত্রের ভিতর থেকে একটানা শব্দ আসছে। আর সেই যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বারবার ঘোষণা করছে—
‘বিষয়বস্তু নং ২৭, জেগে উঠুন।’
নীলাঞ্জনা পিছনে ফিরে ইরার দিকে তাকাল।
‘এগুলো কী?’
ইরা পিস্তলটা নামিয়ে বলল, ‘আমি জানি না। কিন্তু এই ঘরটার খোঁজ আমি ছোটবেলা থেকে করছি।’
‘তুমি কী করে জানতে?’
‘কারণ আমাকে যখন এই বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমার বয়স ছয় মাস। আমার মনে থাকার কথা নয়। কিন্তু কিছু কিছু স্মৃতি আমার কাছে ফিরে এসেছে। একটি অন্ধকার ঘর, কাচের দেওয়াল, আর দুটো শিশুর কান্না।’
অদ্বৈত রায় সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর মুখে আর সেই আত্মবিশ্বাস নেই।
তিনি বললেন, ‘তোমরা যা দেখছ, তার ভুল ব্যাখ্যা কোরো না। এই ঘরটি একটি পরীক্ষাগার ছিল।’
নীলাঞ্জনা ঘুরে দাঁড়াল।
‘কীসের পরীক্ষাগার?’
অদ্বৈত উত্তর দিলেন না।
সুচরিতা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘মানুষের স্মৃতি নিয়ে পরীক্ষা চলত এখানে। মানুষ কীভাবে নিজের অতীত ভুলে যায়, কীভাবে অন্যের বলা কথা নিজের স্মৃতি বলে বিশ্বাস করে—সেসব নিয়ে গবেষণা করা হত।’
নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।
‘আমাদের ওপর?’
‘হ্যাঁ,’ সুচরিতা বললেন। ‘তোমাদের জন্মের পর তোমাদের বাবা অরুণাভ জানতে পেরেছিলেন, এই প্রকল্পে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি তোমাদের দুজনকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।’
ইরা ফিসফিস করে বলল, ‘তাহলে আমাদের স্মৃতিগুলো মিথ্যে?’
‘সব নয়,’ মা বললেন। ‘কিছু সত্যি, কিছু অন্যের তৈরি করে দেওয়া। কোনটা কোনটি, তা বোঝা খুব কঠিন।’
নীলাঞ্জনা কাচের ভিতরে শুয়ে থাকা শিশু দুটির দিকে তাকাল।
‘তাহলে ওরা কারা?’
অদ্বৈত ধীরে ধীরে বললেন, ‘ওরা এই প্রকল্পের শেষ দুটি নমুনা।’
‘নমুনা?’ নীলাঞ্জনার গলা কেঁপে উঠল। ‘ওরা শিশু!’
‘আমি জানি।’
‘না, আপনি জানেন না!’ নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল। ‘আপনি এত বছর ধরে কী করেছেন? আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করেছেন, আমাদের পরিচয় কেড়ে নিয়েছেন, আর এখন বলছেন আপনি জানেন?’
অদ্বৈত মাথা নীচু করলেন।
‘আমি অপরাধ করেছি। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত আমার ছিল না।’
‘তাহলে সিদ্ধান্ত কে নিত?’
অদ্বৈত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘ঋত্বিক চৌধুরী।’
নামটা শুনে নীলাঞ্জনার শরীর শক্ত হয়ে গেল।
তার অফিসের মালিক। যে মানুষটি তাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করতেন। যিনি তার সাংবাদিকতার প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন। যিনি মায়ের মৃত্যুর পর তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
সেই মানুষই কি এত বড় ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে?
ঠিক তখনই উপরতলা থেকে ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল।
একজন পুরুষের গলা ভেসে এল—
‘অদ্বৈত, আর কতক্ষণ লাগবে?’
নীলাঞ্জনা মুখ তুলে তাকাল।
সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আছেন ঋত্বিক চৌধুরী।
পরনে কালো কোট, হাতে একটি চামড়ার ব্যাগ। তাঁর মুখে কোনও বিস্ময় নেই। যেন তিনি জানতেন, নীলাঞ্জনা ঠিক এখানেই থাকবে।
‘বাবা?’ শব্দটা নীলাঞ্জনার মুখ থেকে অনিচ্ছায় বেরিয়ে এল।
ঋত্বিক হাসলেন।
‘এত বছর পর এই সম্বোধন শুনতে ভালো লাগছে।’
নীলাঞ্জনা বলল, ‘আপনি আমার বাবা নন।’
‘রক্তের সম্পর্কই কি সব?’
‘আপনি আমার মায়ের সঙ্গে কী করেছেন?’
ঋত্বিক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘তোমার মা এমন কিছু সত্য জেনে ফেলেছিলেন, যা তাঁর জানা উচিত ছিল না।’
‘আপনি তাঁকে বন্দি করে রেখেছিলেন?’
‘আমি তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।’
সুচরিতা চিৎকার করে উঠলেন, ‘মিথ্যে! তুমি আমাকে বাঁচিয়ে রাখোনি। তুমি আমাকে আমার সন্তানদের কাছ থেকে আলাদা করেছিলে!’
ঋত্বিক মায়ের দিকে তাকালেন।
‘তুমি যদি চুপ থাকতে, তাহলে কিছুই হত না।’
‘আমার সন্তানদের নিয়ে পরীক্ষা চালানোর অনুমতি আমি তোমাকে দিইনি!’
‘পরীক্ষা?’ ঋত্বিক মৃদু হাসলেন। ‘তুমি এখনও ব্যাপারটা বুঝতে পারোনি, সুচরিতা। আমরা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছিলাম, যার সাহায্যে মানুষের স্মৃতি থেকে যন্ত্রণা মুছে ফেলা সম্ভব। যুদ্ধ, দুর্ঘটনা, অত্যাচার—মানুষের মস্তিষ্কে জমে থাকা ভয়াবহ স্মৃতিগুলো মুছে ফেলা গেলে পৃথিবীটা আরও ভালো হত।’
নীলাঞ্জনা বলল, ‘তাহলে শিশুদের কেন ব্যবহার করেছিলেন?’
ঋত্বিকের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।
‘কারণ শিশুদের মস্তিষ্কে স্মৃতি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করলে ফল পাওয়া সহজ। কিন্তু তোমাদের মা বাধা দিয়েছিলেন। তোমার বাবা অরুণাভও বাধা দিয়েছিলেন। তাই আমাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।’
ইরা পিস্তলটা তুলে ধরল।
‘আপনি আমার পরিবার কেড়ে নিয়েছেন।’
ঋত্বিক তার দিকে তাকালেন।
‘তোমার পরিবার তোমাকে ছেড়ে যায়নি, ইরা। তোমাকে রক্ষা করার জন্যই তোমাদের আলাদা করা হয়েছিল।’
‘আমাকে মিথ্যে বলা হয়েছিল!’
‘হ্যাঁ। কারণ সত্যিটা জানলে তুমি এখানে ফিরে আসতে।’
‘আমি ফিরে এসেছি আপনাকে থামাতে।’
ঋত্বিক মৃদু হাসলেন।
‘তুমি কি জানো, তোমার হাতে থাকা পিস্তলটা আসল নয়?’
ইরা চমকে উঠল।
ঋত্বিক বললেন, ‘তুমি যখন এই বাড়িতে ঢুকেছিলে, তখন তোমার হাত থেকে পিস্তলটা নিয়ে তার বদলে অন্য একটি অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল। তুমি বুঝতে পারোনি।’
ইরা ট্রিগার টিপল।
শুধু একটা মৃদু ক্লিক শব্দ হল।
কোনও গুলি বেরোল না।
ঋত্বিক এগিয়ে এলেন।
‘এবার অস্ত্রটা নামিয়ে রাখো।’
ইরা পিছিয়ে গেল। তার মুখে আতঙ্ক।
নীলাঞ্জনা বোনের সামনে দাঁড়াল।
‘আপনি আর এক পা এগোবেন না।’
ঋত্বিক থেমে গেলেন।
‘তুমি এখনও বুঝতে পারছ না, নীলু। তোমাকে এখানে আনা আমার পরিকল্পনার অংশ ছিল না। তুমি নিজেই সব দরজা খুলে দিয়েছ।’
‘কেন?’
‘কারণ তোমার স্মৃতির মধ্যে এমন একটি তথ্য লুকিয়ে আছে, যা আমরা কেউ খুঁজে পাইনি।’
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।
‘আমার কোনও বিশেষ স্মৃতি নেই।’
‘আছে। তোমার জন্মের রাতের স্মৃতি। যে স্মৃতি তোমার বয়স ছয় মাস হওয়ার আগেই তোমার মস্তিষ্কে তৈরি হয়েছিল। তুমি সেই রাতের একটি দৃশ্য দেখেছিলে, যা অন্য কেউ দেখেনি।’
সুচরিতা ফিসফিস করে বললেন, ‘নীলু, ওর কথা শুনিস না।’
ঋত্বিক বললেন, ‘তোমার বাবা মৃত্যুর আগে একটি রেকর্ডিং রেখে গিয়েছিলেন। সেই রেকর্ডিংয়ে তিনি বলেছিলেন, নীলাঞ্জনা একদিন সব মনে করতে পারবে। সেই স্মৃতির মধ্যেই আছে প্রকল্প নীলের আসল নথি কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে।’
নীলাঞ্জনা বলল, ‘আমি কিছুই মনে করতে পারছি না।’
ঋত্বিক চামড়ার ব্যাগ থেকে একটি ছোট যন্ত্র বের করলেন।
‘এই যন্ত্র তোমার মস্তিষ্কের পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত সংকেত শনাক্ত করতে পারবে। একবার তথ্যটা পেয়ে গেলে, তুমি মুক্ত। আমরাও মুক্ত।’
‘আর এই শিশু দুটো?’
‘ওদেরও মুক্ত করা হবে।’
‘আমি আপনাকে বিশ্বাস করি না।’
ঋত্বিকের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
‘তাহলে তোমার মায়ের কী হবে, ভেবে দেখো।’
তিনি ব্যাগের ভিতর থেকে একটি ছোট রিমোট বের করলেন। সঙ্গে সঙ্গে কাচের ঘরের ভিতরে লাল আলো জ্বলে উঠল। দুটি শিশুর বিছানার পাশে যন্ত্রগুলো দ্রুত শব্দ করতে শুরু করল।
সুচরিতা চিৎকার করে উঠলেন, ‘ঋত্বিক, বন্ধ করো! ওরা মারা যাবে!’
‘নীলাঞ্জনা, আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।’
নীলাঞ্জনা মায়ের দিকে তাকাল।
তারপর কাচের ভিতরে শুয়ে থাকা শিশু দুটির দিকে।
একটি শিশু কাঁদছে। অন্যটি স্থির হয়ে আছে।
নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল, সময় খুব কম।
সে চোখ বন্ধ করল।
মনে করার চেষ্টা করল সেই রাতের কথা।
হাসপাতালের ঘর। মায়ের কান্না। বাবার কণ্ঠস্বর। অদ্বৈতের হাতে সাদা কাপড়ে মোড়া শিশু।
তারপর একটি দরজা।
দরজার গায়ে লেখা—১৩।
আর দরজার ওপারে একটি কাঠের বাক্স।
বাক্সের ভিতরে একটি লাল ডায়েরি।
নীলাঞ্জনা চোখ খুলে বলল, ‘ডায়েরিটা কোথায়?’
ঋত্বিক চমকে গেলেন।
‘কোন ডায়েরি?’
‘লাল ডায়েরি। বাবা সেটা কক্ষ ১৩-তে লুকিয়ে রেখেছিলেন।’
ঋত্বিকের মুখে প্রথমবার ভয়ের ছাপ দেখা গেল।
‘তুমি মনে করতে পেরেছ?’
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।
‘হ্যাঁ। আর আমি জানি, সেটা কোথায়।’
সে মেঝের নীচে খোলা দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
কাচের ঘরের পিছনে আরেকটি সরু পথ রয়েছে। সেই পথের শেষে একটি ছোট কাঠের বাক্স। নীলাঞ্জনা বাক্সটা খুলল।
ভিতরে সত্যিই একটি লাল ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় অরুণাভ সেনের হাতের লেখা—
‘যদি আমার মেয়েরা কখনও এই ডায়েরি খুঁজে পায়, তাহলে জেনে রেখো—তোমাদের আলাদা করা হয়েছিল তোমাদের বাঁচানোর জন্য নয়। তোমাদের স্মৃতির ভিতরে একটি অপরাধের প্রমাণ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।’
নীলাঞ্জনা পাতা উল্টাতে লাগল।
পরের পাতায় একটি তালিকা।
সেখানে কয়েকজন চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার নাম লেখা। তাঁদের প্রত্যেকের পাশে উল্লেখ রয়েছে, প্রকল্প নীলের কোন পর্যায়ে তাঁরা যুক্ত ছিলেন।
শেষ পাতায় লেখা—
‘প্রকল্প নীল কখনও স্মৃতি মুছে ফেলার প্রকল্প ছিল না। এটি ছিল সাক্ষীদের স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করার প্রকল্প।’
নীলাঞ্জনার মাথায় যেন বাজ পড়ল।
ঋত্বিকের মুখের রং বদলে গেছে।
‘ডায়েরিটা আমাকে দাও।’
নীলাঞ্জনা ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।
‘না।’
ঋত্বিক এগিয়ে এলেন।
‘তুমি বুঝতে পারছ না, এটা প্রকাশ পেলে কত মানুষ ধ্বংস হবে।’
‘যারা অপরাধ করেছে, তাদেরই ধ্বংস হওয়া উচিত।’
‘তুমি কি তোমার নিজের জীবনটাও ধ্বংস করতে চাও?’
নীলাঞ্জনা শান্ত গলায় বলল, ‘আমার জীবন আপনারা অনেক আগেই ধ্বংস করেছেন। এবার সত্যিটা বাইরে আসবে।’
ঋত্বিক তার হাত থেকে ডায়েরি কেড়ে নিতে গেলেন।
ঠিক সেই সময় অদ্বৈত তাঁর সামনে দাঁড়ালেন।
‘যথেষ্ট হয়েছে, ঋত্বিক।’
ঋত্বিক অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন।
‘তুমিও আমার বিরুদ্ধে যাবে?’
অদ্বৈত বললেন, ‘আমি অনেক দিন তোমার হয়ে অপরাধ করেছি। আর নয়।’
তিনি পকেট থেকে একটি ছোট রেকর্ডার বের করলেন।
‘তোমার সমস্ত কথা রেকর্ড হয়েছে।’
ঋত্বিকের চোখ জ্বলে উঠল।
‘তুমি জানো না, তুমি কী করছ।’
‘জানি। এত বছর পরে প্রথমবার ঠিক কাজ করছি।’
ঋত্বিক অদ্বৈতের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হল। রেকর্ডারটা মেঝেতে পড়ে গেল। নীলাঞ্জনা সেটি তুলে নিয়ে ইরার হাতে দিল।
‘এটা নিয়ে মাকে বের করে নিয়ে যাও!’
ইরা মাকে ধরে সিঁড়ির দিকে এগোল।
কিন্তু ঋত্বিক হঠাৎ অদ্বৈতকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। তারপর কাচের ঘরের দিকে ছুটে গেলেন। তিনি একটি লাল বোতাম টিপলেন।
ঘরের ভিতর থেকে তীব্র অ্যালার্মের শব্দ উঠল।
যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ঘোষণা করল—
‘স্বয়ংক্রিয় ধ্বংসপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অবশিষ্ট সময়: পাঁচ মিনিট।’
নীলাঞ্জনা চিৎকার করে উঠল, ‘আপনি কী করলেন?’
ঋত্বিক বললেন, ‘কোনও প্রমাণ থাকবে না।’
কাচের ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। শিশুদুটিকে ঘিরে থাকা যন্ত্রগুলো থেকে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করল।
নীলাঞ্জনা দরজার দিকে ছুটল। কিন্তু তালা খুলছে না।
ইরা চাবিটা বের করে তালায় ঢোকাল। তবু দরজা খুলল না।
সুচরিতা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘ওদের বাঁচাও!’
অদ্বৈত দেয়ালের পাশে একটি লাল সুইচ দেখতে পেলেন।
‘এটাই জরুরি বন্ধের সুইচ!’
তিনি সুইচের দিকে ছুটলেন।
ঋত্বিক তাঁর পথ আটকে দাঁড়ালেন।
‘ওটা ছুঁয়ো না!’
অদ্বৈত বললেন, ‘এই পাগলামি শেষ হতেই হবে।’
ঋত্বিক তাঁকে আঘাত করলেন। অদ্বৈত মেঝেতে পড়ে গেলেন।
নীলাঞ্জনা আর অপেক্ষা করল না। সে মায়ের দেওয়া পুরোনো চাবিটা নিয়ে সুইচের বাক্সের তালা ভাঙল। ভিতরে তিনটি বোতাম।
কালো।
সাদা।
নীল।
ডায়েরির শেষ পাতায় অরুণাভের লেখা ছিল একটি নির্দেশ—
‘বিপদ এলে নীল বোতাম টিপবে। অন্য দুটিতে হাত দেবে না।’
নীলাঞ্জনা নীল বোতাম টিপে দিল।
এক মুহূর্তের জন্য সব আলো নিভে গেল।
তারপর অ্যালার্ম থেমে গেল। কাচের ঘরের দরজা খুলে গেল। যন্ত্রগুলো বন্ধ হয়ে গেল।
দুটি শিশু কাঁদছে।
নীলাঞ্জনা দৌড়ে গিয়ে প্রথম শিশুটিকে কোলে তুলে নিল। ইরা দ্বিতীয় শিশুটিকে তুলে নিল।
শিশু দুটির কান্না ধীরে ধীরে থেমে এল।
নীলাঞ্জনা নিজের হাতে ধরা শিশুটির কপালে চুমু খেয়ে বলল, ‘তোমাদের আর কেউ আঘাত করতে পারবে না।’
পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ঋত্বিক মেঝেতে বসে পড়েছেন। তাঁর চোখে আর কোনও অহংকার নেই।
সুচরিতা এগিয়ে এসে দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটছে।
বহু বছর পর নীলকুঠির নীল আলো নিভে গেল।
৫. শেষ সাক্ষ্য
পরের কয়েক ঘণ্টার ঘটনা যেন ঝড়ের মতো কেটে গেল।
নীলাঞ্জনা নিজের সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় দপ্তরে ফোন করল। রেকর্ডার, ডায়েরি এবং হাসপাতালের নথির ছবি নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়ে দিল। তারপর পুলিশের কাছে খবর দেওয়া হল।
পুলিশ নীলকুঠি থেকে উদ্ধার করল বহু বছরের নথি, পুরোনো যন্ত্রপাতি এবং প্রকল্প নীলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা। ঋত্বিক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হল। অদ্বৈত রায়ও তদন্তে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিলেন এবং নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করলেন।
তবে সব প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া গেল না।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন। কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছেন। কিছু নথি ধ্বংস করা হয়েছিল। আর নীলাঞ্জনার স্মৃতিতে যে রাতের দৃশ্যগুলি ফিরে এসেছিল, তার সবকিছুর প্রমাণ পাওয়া সম্ভব হল না।
তবু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি প্রকাশ্যে এল।
প্রকল্প নীলের আড়ালে বহু মানুষের স্মৃতি ও সাক্ষ্যকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের মধ্যে কয়েকজনকে নতুন পরিচয় দিয়ে অন্যত্র পাঠানো হয়েছিল। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। ইরা ছিল সেই শিশুদের একজন, যাকে তার প্রকৃত পরিচয় থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল।
আর নীলাঞ্জনা?
তার জন্মপরিচয় নিয়ে এখনও কিছু প্রশ্নের উত্তর বাকি। ঋত্বিক দাবি করেছিলেন, তিনি তার জৈবিক বাবা। কিন্তু আদালতে তা প্রমাণ করার জন্য আরও নথি এবং পরীক্ষার প্রয়োজন ছিল। নীলাঞ্জনা সিদ্ধান্ত নিল, নিজের পরিচয়ের সত্য জানতে সে আইনি পথেই এগোবে।
তার কাছে এখন সবচেয়ে বড় কথা—সে আর কোনও মিথ্যার মধ্যে বাস করবে না।
কয়েক মাস পরে, শালিখা গ্রামের আদালতে সাক্ষ্য দিতে এলেন সুচরিতা সেন।
নীলাঞ্জনা ও ইরা পাশাপাশি বসেছিল। দুজনের মাঝখানে একটি ছোট শিশু ঘুমোচ্ছিল। উদ্ধার হওয়া শিশু দুটির মধ্যে একজনকে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, অন্যজনকে রাখা হয়েছে বিশেষ পরিচর্যাকেন্দ্রে। তাদের পরিচয় এবং পরিবারের খোঁজ চলছে।
সুচরিতা আদালতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমার মেয়েদের কাছ থেকে সত্য লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম, চুপ থাকলে ওদের বাঁচাতে পারব। কিন্তু নীরবতা অপরাধকে আরও শক্তিশালী করেছে।’
তাঁর কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল।
‘আজ আমি চাই, কোনও মা যেন আর নিজের সন্তানকে খুঁজতে গিয়ে নিজের স্মৃতিকেই সন্দেহ না করে। কোনও সন্তান যেন নিজের পরিচয় জানার অধিকার হারিয়ে না ফেলে।’
আদালতকক্ষে নীরবতা নেমে এল।
সেদিন নীলাঞ্জনা বুঝল, সত্যের জন্য লড়াই মানে শুধু অপরাধীর শাস্তি চাওয়া নয়। সত্যের জন্য লড়াই মানে যাদের কণ্ঠস্বর কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের কথা বলার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া।
৬. দুই বোনের নতুন জীবন
ছয় মাস পর।
কলকাতার একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে নীলাঞ্জনা একটি প্রতিবেদন লিখছে। শিরোনাম—‘প্রকল্প নীল: স্মৃতি, পরিচয় ও হারিয়ে যাওয়া মানুষদের কাহিনি।’
প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে সে শেষবারের মতো নথিগুলো মিলিয়ে নিচ্ছিল।
দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।
ইরা এসেছে।
তার হাতে দুটি কাপ চা।
‘আবার কাজ?’
নীলাঞ্জনা হেসে বলল, ‘শেষ করতে হবে।’
‘তুই কোনও দিন বদলাবি না।’
‘তুইও তো বদলাসনি।’
দুজনেই হেসে উঠল।
কিন্তু সেই হাসির ভিতরে আর আগের মতো ভয় নেই। আছে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর ফিরে পাওয়া সম্পর্কের উষ্ণতা।
ইরা জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।
‘দিদি, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?’
‘কর।’
‘তোর কি এখনও মনে হয়, আমাদের জীবনে যা ঘটেছিল, তার সবকিছুর উত্তর আমরা পেয়ে গেছি?’
নীলাঞ্জনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
‘না। কিছু উত্তর হয়তো কোনও দিন পাব না। কিন্তু এখন অন্তত আমরা জানি, কোন প্রশ্নগুলো করা দরকার।’
ইরা মাথা নাড়ল।
‘আমি মাঝে মাঝে এখনও সেই নীল দরজার স্বপ্ন দেখি।’
‘আমিও।’
‘স্বপ্নে দেখি, দরজার ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।’
নীলাঞ্জনা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।
‘কে?’
ইরা বলল, ‘জানি না। কিন্তু সে আমাদের নাম ধরে ডাকে।’
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর নীলাঞ্জনা নিজের ল্যাপটপ বন্ধ করল।
‘চল, আজ কোথাও ঘুরে আসি।’
‘কোথায়?’
‘যেখানে কোনও পুরোনো বাড়ি নেই, কোনও বন্ধ দরজা নেই, কোনও গোপন নথি নেই।’
ইরা হেসে বলল, ‘তোর পক্ষে সেটা সম্ভব?’
‘চেষ্টা করে দেখা যাক।’
দুজন বেরিয়ে গেল।
বাইরে শরতের আকাশ। রাস্তায় মানুষের ভিড়, দোকানে আলো, চায়ের কাপে ধোঁয়া। পৃথিবীটা অন্য দিনের মতোই চলছে।
কেউ জানে না, এই দুই বোন কত অন্ধকার পেরিয়ে এখানে এসেছে।
কেউ জানে না, তাদের শৈশবের কতটা সময় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু তারা জানে—তাদের জীবন আর অন্য কারও হাতে লেখা হবে না।
সেদিন রাতে নীলাঞ্জনা বাড়ি ফিরে মায়ের পুরোনো ডায়েরিটা খুলল। ডায়েরির শেষ পাতার নীচে সে একটি নতুন বাক্য লিখল—
‘স্মৃতি ভুলে যাওয়া যায়, পরিচয় লুকিয়ে রাখা যায়, কিন্তু সত্যকে চিরকাল বন্দি করে রাখা যায় না।’
ডায়েরিটা বন্ধ করে সে জানালার বাইরে তাকাল।
দূরে আকাশে মেঘ জমেছে।
হঠাৎ তার মনে হল, কোনও এক অন্ধকার ঘরে নীল আলো জ্বলে উঠল।
সে চোখ মুছে আবার তাকাল।
আলো নেই।
শুধু দূরের বাড়িগুলোর জানালায় সাধারণ হলুদ আলো জ্বলছে।
নীলাঞ্জনা নিজেকে বোঝাল, সব শেষ হয়েছে। নীলকুঠির গোপন ঘর সিল করে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প নীলের নথি তদন্তকারীদের হাতে। ঋত্বিকের বিচার চলছে।
আর কোনও রহস্য নেই।
ঠিক তখনই তার ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে বার্তা এল।
বার্তায় লেখা—
‘তোমরা দুজনেই বেঁচে গেছ। কিন্তু তৃতীয় শিশুটির কী হল, তা কি মনে আছে?’
নীলাঞ্জনার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে ইরাকে ফোন করল।
ফোন ধরতেই নীলাঞ্জনা বলল, ‘ইরা, তুই কোথায়?’
‘বাড়িতে। কী হয়েছে?’
‘আমাদের জন্মের সময় কি সত্যিই দুটো শিশু ছিল?’
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর ইরা বলল, ‘দিদি, তুই কী বলতে চাইছিস?’
নীলাঞ্জনা বার্তাটি পড়ে শোনাল।
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘অসম্ভব। আমরা তো সব নথি দেখেছি।’
‘হয়তো কোনও নথি আমাদের দেখানো হয়নি।’
‘তুই কি আবার নীলকুঠিতে যাবি?’
নীলাঞ্জনা জানালার বাইরে তাকাল।
তার মনে পড়ল সেই নীল দরজা, সেই অন্ধকার সিঁড়ি, সেই কাচের ঘর।
তারপর সে ধীরে ধীরে বলল, ‘না। এবার আমরা কোথাও অন্ধকারে ঢুকব না। আগে খুঁজে বের করব, এই বার্তা কে পাঠিয়েছে।’
সে নম্বরটিতে ফোন করল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
কেউ ধরল না।
তারপর ফোনের পর্দায় আরেকটি বার্তা ভেসে উঠল।
‘আমি তোমাদের তৃতীয় বোন।’
নীলাঞ্জনা নিঃশ্বাস বন্ধ করে পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক সেই মুহূর্তে, শহরের অন্য প্রান্তে একটি পুরোনো বাড়ির নীল দরজা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ভিতর থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল—
‘এবার আমার পালা।’
— সমাপ্ত —