শহরের প্রান্তে ছোট্ট একটি দমকলকেন্দ্র ছিল। সেখানে কর্মরত ছিলেন অনির্বাণ দত্ত। বয়স পঞ্চান্ন পেরিয়েছে, চুলে পাক ধরেছে, তবু জরুরি খবর পেলেই তাঁর চোখে-মুখে ফুটে উঠত অদ্ভুত এক সতর্কতা। আগুনের শিখা দেখার আগেই তিনি অনেক সময় বুঝে ফেলতেন, বিপদ কোথায় এবং কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
সহকর্মীরা মজা করে বলত, “অনির্বাণদা, আপনি কি আগুনের শব্দ শুনতে পান?”
অনির্বাণ হাসতেন। বলতেন, “আগুনের নিজের কোনও শব্দ নেই। কিন্তু বিপদের আগে চারপাশের শব্দগুলো বদলে যায়। শুধু কান খোলা রাখতে হয়।”
একদিন গভীর রাতে দমকলকেন্দ্রে খবর এল, শহরের পুরোনো বাজারে আগুন লেগেছে। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ি বেরিয়ে পড়ল। বাজারে পৌঁছে দেখা গেল, একটি মুদির দোকানের পিছনের অংশ থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আশপাশের দোকানদাররা আতঙ্কে চিৎকার করছেন। কেউ বলছেন, ভিতরে মানুষ আটকে আছে, কেউ বলছেন, আগুন পাশের দোকানেও ছড়িয়ে পড়েছে।
অনির্বাণ সবাইকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করলেন। কিন্তু তাঁর কানে বারবার একটা অস্বাভাবিক শব্দ আসছিল—টুকটুক করে কিছু ফেটে যাওয়ার মতো আওয়াজ। সাধারণত বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে এমন শব্দ হতে পারে, কিন্তু এখানে শব্দের সঙ্গে একটা চাপা হিসহিস আওয়াজও মিশে ছিল।
তিনি দ্রুত সহকর্মীকে বললেন, “ওই দিকের দেওয়ালের কাছে কেউ যাবে না। আগে গ্যাসের সংযোগটা পরীক্ষা করতে হবে।”
দোকানের মালিক জানালেন, ভিতরে একটি পুরোনো গ্যাসের সিলিন্ডার রয়েছে। সবাই বুঝতে পারল, সামান্য অসতর্কতায় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। দমকলকর্মীরা সতর্কতার সঙ্গে বিপদের উৎস নিয়ন্ত্রণে আনলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন নেভানো সম্ভব হল।
পরদিন বাজারের ব্যবসায়ীরা অনির্বাণকে ধন্যবাদ জানাতে এলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন এক তরুণ, নাম সৌরভ। সে স্থানীয় একটি বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের দোকানে কাজ করত। সৌরভ বলল, “আপনি যদি সেই শব্দটা খেয়াল না করতেন, কাল অনেকগুলো দোকান পুড়ে যেত। আপনি কীভাবে বুঝলেন?”
অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, বিপদ সব সময় চিৎকার করে আসে না। কখনও কখনও সে খুব আস্তে দরজায় কড়া নাড়ে।”
কথাটা সৌরভের মনে গেঁথে গেল।
কয়েক সপ্তাহ পরে বাজারের ব্যবসায়ী সমিতি একটি নিরাপত্তা সচেতনতা শিবিরের আয়োজন করল। অনির্বাণ সেখানে আগুন লাগলে কী করতে হবে, কীভাবে বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা করতে হয় এবং অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তা শেখালেন। সৌরভও সেই শিবিরে যোগ দিল।
শিবিরের শেষে সৌরভ একটি প্রস্তাব দিল। বাজারের প্রতিটি দোকানে যেন জরুরি যোগাযোগের নম্বর, প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার পথের নির্দেশিকা রাখা হয়। প্রথমে কয়েকজন ব্যবসায়ী খরচের কথা বলে আপত্তি তুললেন। সৌরভ তখন বলল, “দোকান বাঁচানোর জন্য যে টাকা খরচ হবে, সেটা অপচয় নয়। বিপদ ঘটার পরে ক্ষতি সামলানোর চেয়ে আগে প্রস্তুতি নেওয়া অনেক ভালো।”
ধীরে ধীরে সবাই রাজি হলেন। বাজারের প্রতিটি দোকানে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে উঠল। মাসে একদিন করে পরীক্ষা করা শুরু হল অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও জরুরি বহির্গমনের পথ।
এক বছর পরে সেই বাজারে ছোট একটি বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু আগাম প্রস্তুতি থাকায় দোকানদাররা দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করেন এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই পরিস্থিতি সামলে নেন। কাউকে হাসপাতালে যেতে হয়নি, কোনও দোকানও পুড়ে যায়নি।
খবরটা শুনে অনির্বাণ শুধু মৃদু হেসেছিলেন। তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য আগুন নেভানো নয়, আগুন লাগার আগেই মানুষকে সতর্ক করে তোলা।
সেদিন সৌরভ তাঁকে বলেছিল, “আপনি আমাদের শুধু আগুন চিনতে শেখাননি, বিপদকে গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছেন।”
অনির্বাণ উত্তর দিয়েছিলেন, “মনে রেখো, সাহস মানে বিপদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়া নয়। কখন থামতে হবে, কখন সতর্ক হতে হবে, আর কখন অন্যকে সাবধান করতে হবে—সেটা বুঝতেও সাহস লাগে।”
শিক্ষা: বিপদ ঘটার পরে বীরত্ব দেখানোর চেয়ে বিপদ ঘটার আগেই সতর্ক হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং দায়িত্ববোধ বহু মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে পারে।