রাত তখন এগারোটা পঞ্চান্ন।
শিয়ালদহ স্টেশনের প্রায় ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অর্ক বারবার ঘড়ি দেখছিল। শেষ ট্রেনটা ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল এগারোটা চল্লিশে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, স্টেশনের ঘোষণায় এখনও বলা হচ্ছে—ট্রেনটি কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছে।
অর্ক বিরক্ত হয়ে ফোন বের করল। ব্যাটারি মাত্র সাত শতাংশ। স্ত্রী মেঘলা ইতিমধ্যে চারবার ফোন করেছে। পঞ্চমবার ফোনটা বেজে উঠতেই সে ধরল।
“কোথায় তুমি? রাত প্রায় বারোটা বাজতে চলল!”
“স্টেশনে আছি। শেষ ট্রেনটা দেরি করছে।”
“কোন ট্রেন?”
“বারাসত লোকাল।”
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর মেঘলা খুব নিচু গলায় বলল, “অর্ক, তুমি এখনই স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসো।”
“কেন?”
“আজ ওই ট্রেনে উঠবে না।”
অর্ক হেসে ফেলল। “তুমি কি পাগল হয়েছ? বাড়ি ফিরব কী করে?”
“ট্যাক্সি নাও। বাস না পেলে রাতটা কোথাও কাটিয়ে দাও। কিন্তু ওই ট্রেনে উঠবে না।”
মেঘলার গলায় এমন একটা আতঙ্ক ছিল, যা অর্ক আগে কখনও শোনেনি।
“হঠাৎ কী হয়েছে তোমার?”
“আমি স্বপ্ন দেখেছি।”
“স্বপ্ন?”
“একটা ট্রেন। জানলার পাশে তুমি বসে আছ। তোমার সামনে একটা ছোট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার জামা ভেজা, চুল থেকে জল পড়ছে। সে তোমাকে একটা টিকিট দিচ্ছে। আর তুমি টিকিটটা হাতে নেওয়ার পর—”
মেঘলা থেমে গেল।
“তারপর কী?”
“তারপর তোমার মুখটা আর তোমার মতো থাকছে না।”
অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“শোনো, তুমি হয়তো সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত। বাড়ি ফিরে কথা বলব। এখন ফোন রাখছি।”
“অর্ক, প্লিজ!”
কিন্তু ততক্ষণে প্ল্যাটফর্মের লাউডস্পিকারে ঘোষণা ভেসে এল—
“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, শেষ বারাসত লোকাল তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছে।”
অর্ক ফোন কেটে দিল।
দূরে রেললাইনের ওপর দুটি আলো দেখা গেল। ধীরে ধীরে ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। আশ্চর্যের বিষয়, ট্রেনের গায়ে কোনও নম্বর নেই। দরজার ওপরের ডিজিটাল বোর্ডটাও অন্ধকার।
অর্ক ভাবল, হয়তো পুরোনো ট্রেন।
কিন্তু ট্রেন থামতেই তার মনে হল, কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।
প্রতিটি কামরা ফাঁকা। কোনও যাত্রী নেই, কোনও হকার নেই, এমনকি চালকের কেবিনেও কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
শুধু শেষ কামরার জানলার পাশে বসে আছে একটি ছোট মেয়ে।
মেয়েটির বয়স দশ কি এগারো। পরনে নীল স্কুলের পোশাক, কাঁধে পুরোনো ব্যাগ। ভেজা চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে তার হাঁটুর ওপর।
অর্কের বুকের মধ্যে অকারণ একটা শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল।
মেয়েটি জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল। অর্ক কাছে আসতেই সে মুখ তুলল।
তার চোখ দুটো অদ্ভুত পরিচিত।
“কাকু,” মেয়েটি বলল, “আপনি কি অর্ক মুখোপাধ্যায়?”
অর্ক চমকে উঠল।
“তুমি আমার নাম জানো কী করে?”
মেয়েটি উত্তর দিল না। ব্যাগের ভেতর থেকে একটা পুরোনো কাগজ বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“এটা আপনার জন্য।”
অর্ক কাগজটা হাতে নিল।
সেটা একটা রেলওয়ের টিকিট।
টিকিটের তারিখ দেখে তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
১৭ অক্টোবর, ২০০৪।
যাত্রার সময় রাত এগারোটা চল্লিশ।
গন্তব্য—বারাসত।
যাত্রীর নাম—অর্ক মুখোপাধ্যায়।
কিন্তু ২০০৪ সালে অর্কের বয়স ছিল মাত্র বারো বছর।
সে কাঁপা গলায় বলল, “এটা তুমি কোথায় পেলে?”
মেয়েটি এবার একটু হাসল।
“আপনি তো সেদিনও এই ট্রেনেই উঠেছিলেন।”
অর্কের মাথার মধ্যে যেন কেউ হাতুড়ি মারল।
“কীসব বলছ তুমি?”
“আপনি সেদিন আপনার বাবার সঙ্গে বাড়ি ফিরছিলেন। ট্রেনটা মাঝপথে থেমে গিয়েছিল। তারপর একটা লোক এসে আপনাকে বলেছিল, আপনার মা স্টেশনে অপেক্ষা করছেন।”
অর্কের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
এমন একটা ঘটনা তার শৈশবে ঘটেছিল। বহু বছর ধরে সে সেটাকে দুঃস্বপ্ন বলে মনে করে এসেছে।
সেদিন দুর্গাপুজোর ছুটি শেষ করে বাবার সঙ্গে কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরছিল সে। ট্রেন মাঝপথে থেমেছিল। একজন রেলকর্মীর মতো পোশাক পরা লোক এসে তাকে বলেছিল, তার মা নাকি পরের স্টেশনে অপেক্ষা করছেন।
অর্ক বাবার হাত ছেড়ে সেই লোকটির পিছু নিয়েছিল।
তারপর?
তারপর কিছুই মনে নেই।
শুধু মনে আছে, পরদিন সকালে সে বাড়িতে ঘুম থেকে উঠেছিল। মা বলেছিলেন, সে নাকি ট্রেনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। বাবা কখনও সেই ঘটনা নিয়ে কথা বলতে চাননি।
অর্ক মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কে?”
মেয়েটি জানলার বাইরে তাকাল।
“আমার নাম পিউ।”
“তুমি কোথায় যাবে?”
“যেখানে ট্রেনটা শেষবার থেমেছিল।”
“কোন স্টেশন?”
পিউ এবার তার দিকে তাকাল।
“যে স্টেশনের নাম কোনও রেললাইনের মানচিত্রে নেই।”
ঠিক সেই সময় ট্রেনের দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
অর্ক ছুটে দরজার কাছে গেল। দরজা খুলতে চেষ্টা করল, কিন্তু খুলল না। সে জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখল, প্ল্যাটফর্মের আলো দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে।
ট্রেন চলতে শুরু করেছে।
অথচ সে তো এখনও ওঠার সিদ্ধান্তই নেয়নি!
অর্ক দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল।
“দরজা খোলো! কেউ আছেন?”
কোনও উত্তর এল না।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্ল্যাটফর্ম অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। জানলার বাইরে দেখা গেল শুধু কালো মাঠ, ঝোপঝাড় আর মাঝে মাঝে দূরের বাড়ির আলো।
অর্ক ফোন বের করল। স্ক্রিনে কোনও নেটওয়ার্ক নেই।
ব্যাটারি পাঁচ শতাংশ।
সে মেঘলাকে ফোন করার চেষ্টা করল। ফোন লাগল না।
পিউ শান্তভাবে বলল, “আপনি যতই চেষ্টা করুন, এখন আর বাড়ি ফিরতে পারবেন না।”
“তুমি কী জানো? আমাকে সব বলো!”
“আমি তো বলছি। এই ট্রেনের যাত্রীরা সবাই কিছু একটা ভুলে গেছে। কেউ নিজের নাম, কেউ নিজের বাড়ি, কেউ নিজের মৃত্যুর কথা।”
অর্ক স্থির হয়ে গেল।
“মৃত্যু?”
পিউ মাথা নাড়ল।
“এই ট্রেনে যারা ওঠে, তারা সবাই জীবিত থাকে না।”
অর্ক পিছিয়ে এল।
“তুমি মিথ্যে বলছ।”
“আপনি নিজেই দেখবেন।”
ট্রেনের ভেতরে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল।
অর্ক এতক্ষণ খেয়াল করেনি, কামরার অন্য প্রান্তে আরও কয়েকজন যাত্রী বসে আছে। একজন বৃদ্ধ, যার হাতে একটা ভাঙা ঘড়ি। একজন যুবতী, যার কোলে সাদা কাপড়ে মোড়া কিছু একটা। আর একটি বয়স্ক লোক, যিনি বারবার নিজের পকেট হাতড়ে যাচ্ছেন।
কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না।
সবার চোখ বন্ধ।
অর্ক এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধকে ডাকল।
“দাদু, শুনতে পাচ্ছেন?”
বৃদ্ধ চোখ খুললেন।
তার চোখের মণি অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে।
“টিকিট আছে?”
“কীসের টিকিট?”
“এই ট্রেনে উঠেছেন, টিকিট আছে তো?”
অর্ক নিজের হাতে থাকা পুরোনো টিকিটটা দেখাল।
বৃদ্ধ টিকিট দেখে হঠাৎ কেঁপে উঠলেন।
“এটা আপনি কোথায় পেলেন?”
“একটা মেয়ে দিয়েছে।”
বৃদ্ধ পিউয়ের দিকে তাকালেন। তারপর চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করলেন, “আবার শুরু হল।”
“কী শুরু হল?”
বৃদ্ধ আর কোনও উত্তর দিলেন না।
ঠিক তখন ট্রেনের ছাদে একটা ঘণ্টা বাজল।
ঢং।
ঢং।
ঢং।
তারপর স্পিকারে ভেসে এল এক অচেনা কণ্ঠস্বর।
“পরবর্তী স্টেশন—স্মৃতিপুর। যাত্রীদের অনুরোধ করা হচ্ছে, নিজেদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি সংগ্রহ করার জন্য প্রস্তুত থাকুন।”
অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।
“স্মৃতিপুর বলে কোনও স্টেশন আছে?”
পিউ মাথা নাড়ল।
“ছিল।”
“কোথায়?”
“আপনার মনে।”
ট্রেন ধীরে ধীরে গতি কমাতে লাগল।
জানলার বাইরে কুয়াশার মধ্যে একটা স্টেশন দেখা গেল। প্ল্যাটফর্মে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে সাদা কাগজ।
স্টেশনের নামফলকে লেখা—
স্মৃতিপুর।
অর্ক জানলার কাচে নিজের মুখ দেখতে পেল।
কিন্তু তার প্রতিচ্ছবি হাসছে।
অর্ক হাসছে না।
সে পিছিয়ে গেল।
প্রতিচ্ছবিটি এবার ঠোঁট নাড়ল।
“অবশেষে ফিরে এলি।”
অর্ক চিৎকার করে উঠল।
কামরার সব যাত্রী একসঙ্গে চোখ খুলল।
আর পিউ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল—
“কাকু, এবার আপনার মনে পড়বে। সেদিন আপনি শুধু ট্রেনে হারিয়ে যাননি। আপনি এমন একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যার জন্য এই ট্রেন বারো বছর ধরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।”
অর্ক কাঁপা গলায় বলল, “কী প্রতিশ্রুতি?”
পিউয়ের চোখে জল এসে গেল।
“আপনি বলেছিলেন, আপনি ফিরে এসে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবেন।”
“কিন্তু আমি তো তোমাকে চিনি না!”
মেয়েটি ব্যাগ থেকে আরেকটি ছবি বের করল।
ছবিতে বারো বছরের অর্ক দাঁড়িয়ে আছে এক ছোট্ট মেয়ের পাশে। দুজনের পিছনে রেলস্টেশন। ছবির নীচে তারিখ লেখা—১৭ অক্টোবর, ২০০৪।
অর্ক ছবিটা হাত থেকে ফেলে দিল।
কারণ ছবির মেয়েটি পিউ।
আর অর্কের নিজের মুখের পাশে লাল কালিতে লেখা ছিল মাত্র তিনটি শব্দ—
“একজন ফিরবে না।”
ট্রেন থামল।
দরজা খুলে গেল।
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো একসঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে অর্কের দিকে তাকাল।
তাদের প্রত্যেকের মুখ অর্কের নিজের মুখের মতো।
পিউ তার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, “নামবেন না, কাকু। ওরা আপনাকে চিনে ফেলেছে।”
কিন্তু ততক্ষণে কামরার দরজায় একজন রেলকর্মী এসে দাঁড়িয়েছে।
তার হাতে টিকিট কাটার যন্ত্র।
মুখে পরিচিত হাসি।
অর্কের বুকের ভেতরটা জমে গেল।
কারণ লোকটি আর কেউ নয়—তার বাবা, যিনি আট বছর আগে মারা গিয়েছিলেন।
বাবা হাত বাড়িয়ে বললেন, “অর্ক, এত দেরি করলি কেন? বাড়ি চল।”
অর্ক এক পা এগিয়ে গেল।
পিউ তার হাত আঁকড়ে ধরে চিৎকার করল—
“ও আপনার বাবা নয়!”
বাবার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
তারপর তিনি ধীরে ধীরে নিজের মুখের চামড়া খুলে ফেলতে শুরু করলেন।
তার নীচে ছিল সম্পূর্ণ অন্য একটি মুখ।
একটি মুখ, যা অর্ক বারো বছর বয়সে শেষবার দেখেছিল।
আর সেই মুখটি দেখে অর্কের স্মৃতির বন্ধ দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল।
সে মনে করতে পারল—সেদিন ট্রেনে কী ঘটেছিল।
আর কেন পিউ তাকে বারো বছর ধরে খুঁজছে।
চলবে…