পুতুলের ভেতর থেকে ফোনটা তখনও বেজে চলেছে।
ট্রিং… ট্রিং… ট্রিং…
অর্কের চোখ ফোনের পর্দায় স্থির হয়ে আছে। সেখানে জ্বলজ্বল করছে মাত্র দুটি শব্দ— “মা কলিং…”
তার পাশে দাঁড়িয়ে মেঘলা। একটু দূরে অভিজিৎ। আর টেবিলের সামনে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে তারা।
কেউ কথা বলছে না।
অর্কের মনে হচ্ছিল, তার জীবনের প্রতিটি পরিচয় একে একে ভেঙে পড়ছে। যে মানুষটিকে সে দাদা বলে জানত, তিনি নাকি তার দাদা নন। যাঁকে বাবা বলে বড় হয়েছে, তিনিও নাকি তার বাবা নন। আর যে মেয়েটিকে নিজের মেয়ে বলে বুকে টেনে নিতে চাইছে, সে নিজেই জানে না তার জন্মের প্রকৃত পরিচয়।
তার ওপর মেঘলার দাবি— অর্ককে বারো বছর আগে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল!
কিন্তু অর্ক তো বেঁচে আছে। সে চাকরি করেছে, সংসার করেছে, ভালোবেসেছে, বিয়ে করেছে। তাহলে তার মৃত্যু কোথায় ঘটেছিল?
নাকি তার জীবনের কোনও একটা অংশকে মুছে দিয়ে নতুন পরিচয় তৈরি করা হয়েছিল?
ফোনটা আবার বেজে উঠল।
তারা চিৎকার করে বলল, “বাবা, ধরো না!”
কিন্তু এবার অর্ক আর থামল না। সে পুতুলের ভেতর থেকে ফোনটা তুলে কল রিসিভ করল।
—হ্যালো!
ওপাশ থেকে কোনও উত্তর এল না।
শুধু শোনা গেল শিশুর কান্না।
একটা নবজাতকের কান্না।
তারপর সেই কান্নার মধ্যেই ভেসে এল এক মহিলার গলা।
—অর্ক, তুমি কি আমাকে চিনতে পারছ?
অর্কের বুক কেঁপে উঠল।
—আপনি কে?
—আমি সেই মানুষ, যার জন্য তোমার জন্মের দিন দুটো পরিবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
—আপনি কি আমার মা?
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর মহিলাটি বললেন, “হ্যাঁ। কিন্তু আমি তোমাকে জন্ম দিয়েছি কি না, সেই উত্তরটা তোমাকে নিজেকেই খুঁজে বের করতে হবে।”
কল কেটে গেল।
অর্ক ফোনটা নামিয়ে মেঘলার দিকে তাকাল।
—তুমি সব জানো, তাই না?
মেঘলা উত্তর দিলেন না।
—আমার জন্মের কথা জানো? আমার বাবা-মা কে, সেটা জানো? এই বারো বছরে রূপার সঙ্গে কী হয়েছে, সেটাও জানো?
মেঘলা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
—সবটা জানি না।
—যেটুকু জানো, সেটুকু বলো।
মেঘলা কালো ব্যাগটা মেঝেতে রাখলেন। তারপর তার ভেতর থেকে একটা পুরোনো ফাইল বের করলেন। ফাইলের মলাটে লেখা— “প্রকল্প ২১৭: পরিচয় পরিবর্তন সংক্রান্ত নথি।”
অর্ক ফাইলটা খুলল।
ভেতরে হাসপাতালের কয়েকটি কাগজ, দুটি জন্মের শংসাপত্র, কিছু ছবি এবং একটি পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং।
প্রথম কাগজে লেখা— ১৮ নভেম্বর, ১৯৯০।
অর্কের চোখ আটকে গেল তারিখটায়।
—এটা আমার জন্মতারিখ?
—তোমার সরকারি নথিতে যে তারিখ আছে, সেটা।
—আর আসল তারিখ?
মেঘলা ফাইলের দ্বিতীয় কাগজটা দেখালেন।
সেখানে লেখা— ১৮ নভেম্বর, ১৯৯৪।
অর্কের মাথা ঘুরে উঠল।
—কী বলছ তুমি? আমার বয়স তো চৌত্রিশ!
—তুমি যে বয়স জানো, সেটা তোমাকে বলা হয়েছে। তোমার আসল বয়স নিয়ে নথিতে কারচুপি করা হয়েছিল।
অর্ক ফাইলটা বন্ধ করে দিল।
—এ সব পাগলামি! আমার স্কুলের সার্টিফিকেট আছে, কলেজের কাগজ আছে, চাকরির নথি আছে। সব জায়গায় একই জন্মতারিখ!
—কারণ সব নথি একই জায়গা থেকে তৈরি করা হয়েছিল।
—কোন জায়গা?
মেঘলা উত্তর দেওয়ার আগে অভিজিৎ এগিয়ে এল।
—অর্ক, তুই ছোটবেলায় যে বাড়িতে বড় হয়েছিস, সেই বাড়ির মালিক তোর বাবা ছিলেন না। তিনি ছিলেন তোর অভিভাবক।
অর্ক তার দিকে তাকাল।
—তুমি জানলে কী করে?
অভিজিৎ চোখ নামিয়ে বলল, “কারণ আমিও সেই বাড়িতে অন্য একটা পরিচয় নিয়ে বড় হয়েছি।”
ঘরের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।
অভিজিৎ ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল।
“বারো বছর আগে নয়, এই ঘটনার শুরু আরও অনেক আগে। আমাদের বাবা ছিলেন কলকাতার এক চিকিৎসক। তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করতেন। বাইরে থেকে তিনি সম্মানিত মানুষ ছিলেন, কিন্তু হাসপাতালের ভেতরে এমন কিছু ঘটত, যার কথা কেউ জানত না। সদ্যোজাত শিশুদের নথি বদলে দেওয়া হত। কিছু শিশুকে তাদের প্রকৃত পরিবারের কাছ থেকে সরিয়ে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হত।”
অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।
—শিশু পাচার?
—আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না, সব ক্ষেত্রেই কী উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু নথি বদলানো হত। কিছু শিশুর পরিচয় মুছে ফেলা হত। আর যারা প্রশ্ন করত, তাদের চুপ করিয়ে দেওয়া হত।
—তুমি এসব জানতেই?
—সব জানতাম না। কিন্তু একটা ঘটনা আমার সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
অভিজিৎ ফাইলের ভেতর থেকে একটা ছবি বের করল।
ছবিতে হাসপাতালের একটি ঘর। সামনে একজন চিকিৎসক। পাশে দুজন নার্স। আর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলার কোলে নবজাতক।
অর্ক ছবিটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।
মহিলাটিকে সে চেনে।
ছবির সেই মহিলা মেঘলা।
কিন্তু ছবির তারিখ দেখে অর্কের মাথা ঘুরে গেল।
১৮ নভেম্বর, ২০১৪।
যে বছর রূপার মৃত্যুর কথা তাকে জানানো হয়েছিল, সেই বছরই এই ছবি তোলা।
—তুমি সেখানে কী করছিলে?
মেঘলা এবার মুখ খুললেন।
—আমি সেই হাসপাতালে কাজ করতাম। নার্স হিসেবে।
—তুমি আমাকে কখনও বলোনি!
—কারণ তুমি প্রশ্ন করলে আমি উত্তর দিতে পারতাম না।
—কেন?
মেঘলা চোখ মুছলেন।
—কারণ ওই হাসপাতালেই তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা লুকিয়ে আছে।
অর্ক ছবিটা টেবিলে রাখল।
—রূপার সঙ্গে তোমার পরিচয় ছিল?
—হ্যাঁ।
—কীভাবে?
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “রূপা যখন হাসপাতালে এসেছিল, তখন সে গর্ভবতী। তার পাশে কেউ ছিল না। সে বারবার একজনের নাম করছিল— অর্ক। কিন্তু হাসপাতালের নথিতে তার সন্তানের বাবার নাম অন্য একজনের লেখা ছিল।”
—কার নাম?
মেঘলা উত্তর দেওয়ার আগেই অভিজিৎ বলে উঠল, “আমার।”
অর্ক যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।
—তোমার?
—হ্যাঁ। কিন্তু ওই নথিতে আমার নাম কীভাবে এল, আমি জানতাম না। বাবা আমাকে বলেছিলেন, রূপা মানসিকভাবে অসুস্থ। সে যা বলছে, তার কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।
—আর তুমি বিশ্বাস করেছিলে?
অভিজিৎ মাথা নিচু করল।
—প্রথমে করেছিলাম। পরে বুঝেছিলাম, বাবা আমাদের সবাইকে মিথ্যে বলছেন।
অর্কের মনে পড়ল রূপার ডায়েরির কথা। সেখানে লেখা ছিল, অর্কের মৃত্যুর খবর পেয়ে সে ভেঙে পড়েছিল। কেউ তাকে বলেছিল, অর্ক আর বেঁচে নেই। আর তার সন্তানকে তার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
—তাহলে আমার মৃত্যুর খবর রূপাকে কে দিয়েছিল?
অভিজিৎ বলল, “বাবা।”
—আর আমাকে রূপার মৃত্যুর খবর কে দিয়েছিল?
অভিজিৎ চুপ করে রইল।
অর্ক তার দিকে এগিয়ে গেল।
—তুমিই দিয়েছিলে, তাই না?
অভিজিৎ মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
—কেন?
অভিজিৎ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
—কারণ সেদিন রাতে আমি রূপাকে বাঁচাতে পারিনি।
“রূপা কোথায় ছিল?” অর্ক চিৎকার করে উঠল।
“পুরোনো বাড়ির সেই বন্ধ ঘরে। বাবা তাকে সেখানে আটকে রেখেছিলেন। রূপা পালানোর চেষ্টা করেছিল। আমি তাকে বের করে আনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পৌঁছনোর আগেই বাবা ঘরে আগুন লাগিয়ে দেন।”
অর্কের শরীর কেঁপে উঠল।
—তাহলে রূপা আগুনে মারা গিয়েছিল?
অভিজিৎ মাথা নাড়ল।
—আমি জানি না। ঘরটা পুড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে কোনও দেহ পাওয়া যায়নি। বাবা বলেছিলেন, রূপা পালিয়ে গিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আমি তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। পুলিশকে কিছু বলিনি। তোকে মিথ্যে বলেছিলাম।
অর্ক পিছিয়ে গেল।
বারো বছর ধরে সে যে মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করেছে, সেই মৃত্যুর কোনও প্রমাণই নেই!
রূপা হয়তো বেঁচে আছে।
হয়তো এতদিন ধরে কোথাও আটকে ছিল।
হয়তো সে নিজেই ফোন করছিল।
অথবা কেউ তার কণ্ঠস্বর নকল করে অর্ককে চালিত করছে।
অর্ক এবার মেঘলার দিকে তাকাল।
—তুমি আমাকে বিয়ে করলে কেন?
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “কারণ তোমাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছিল।”
অর্কের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—কী?
—হাসপাতালের নথিতে তোমার নাম ছিল না। কিন্তু তোমার ছবি ছিল। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, তুমি ওই দুই শিশুর একজন। পরে তোমাকে খুঁজে পাই। তুমি তখন দিল্লিতে। তোমার অতীত সম্পর্কে খুব বেশি কিছু মনে করতে পারতে না। তোমাকে দেখাশোনা করার কথা ছিল আমার। কিন্তু ধীরে ধীরে…
তিনি থেমে গেলেন।
—ধীরে ধীরে কী?
—আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।
অর্কের মনে হল, তার বুকের ভেতর কেউ একটা ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে।
—তাহলে আমাদের বিয়েটা কি একটা পরিকল্পনা ছিল?
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “শুরুতে ছিল। কিন্তু আমার ভালোবাসা মিথ্যে ছিল না।”
—আর রূপা?
—আমি জানতাম না সে বেঁচে আছে কি না। আমি শুধু জানতাম, তোমাকে খুঁজে বের করতে হবে। আর তোমার কাছে এমন কিছু তথ্য আছে, যা ওই হাসপাতালের ঘটনার সত্যি প্রকাশ করতে পারে।
—আমার কাছে কী তথ্য?
মেঘলা উত্তর দেওয়ার আগেই তারা বলে উঠল, “বাবা, মায়ের চিঠিটা পড়ো।”
অর্ক পকেট থেকে রূপার চিঠিটা বের করল। এতক্ষণ উত্তেজনার মধ্যে সে চিঠির শেষ অংশটা পড়তে পারেনি। কাগজের ভাঁজ খুলতেই একটা ছোট্ট ছবি মেঝেতে পড়ে গেল।
ছবিতে দুটো শিশু পাশাপাশি শুয়ে আছে।
একজনের কপালে জন্মদাগ।
অন্যজনেরও একই জায়গায় জন্মদাগ।
ছবির পেছনে লেখা—
“একজনকে আমি বাঁচাতে পেরেছি। অন্যজনকে বাঁচানোর দায়িত্ব তোমার।”
অর্ক চিঠির শেষ অংশ পড়তে শুরু করল।
“অর্ক,
যদি তুমি এই চিঠি পড়ে থাকো, তাহলে বুঝব তুমি অবশেষে সত্যির কাছাকাছি পৌঁছেছ। তোমাকে যে মানুষগুলো বড় করেছে, তাদের প্রত্যেকেই তোমার কাছে কিছু না কিছু লুকিয়েছে। কিন্তু তাদের সবাই অপরাধী নয়।
তোমার জীবনের প্রথম চার বছর তোমাকে অন্য নামে ডাকা হত। তোমার জন্মের পরপরই তোমাকে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তোমার সঙ্গে আরেকটি শিশুও ছিল। সেই শিশুটির পরিচয় তোমার পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
তোমাকে যে বাড়িতে বড় করা হয়েছিল, সেই বাড়ির মানুষগুলো তোমাকে ভালোবাসত। কিন্তু তারা জানত না, তোমার জন্মের আসল কাহিনি কী।
আমাকে যদি আর কখনও দেখতে না পাও, মনে রেখো— তোমার জন্মের রহস্যের চাবি কোনও মানুষের হাতে নেই। সেটা লুকিয়ে আছে একটি শব্দের মধ্যে।
শব্দটি হল— ‘নীলদরজা’।
পুরোনো হাসপাতালের বেসমেন্টে নীল রঙের একটা দরজা আছে। সেই দরজার ওপারে যা আছে, তা দেখলে তুমি বুঝতে পারবে কেন তোমার জীবন থেকে চার বছর মুছে ফেলা হয়েছিল।
আর একটা কথা।
মেঘলাকে ঘৃণা কোরো না। সে তোমার কাছে সত্যিটা লুকিয়েছে, কিন্তু সে তোমার শত্রু নয়।
তোমার শত্রু সেই মানুষ, যে আজও তোমার নাম ব্যবহার করে অন্যদের ফোন করে।
যদি কখনও রাত ২টা ১৭ মিনিটে ফোন আসে, মনে রেখো— ফোনের ওপারে যে-ই থাকুক, সে তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছে।
কিন্তু তুমি সেখানে যাওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করবে—
তুমি কি সত্যিই অর্ক?
— রূপা”
চিঠিটা পড়ে অর্ক অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
—নীলদরজা কোথায়?
মেঘলা বললেন, “পুরোনো হাসপাতালটা এখন বন্ধ। বিল্ডিংটা ভেঙে ফেলার কথা ছিল। কিন্তু বেসমেন্টের অংশটা এখনও আছে।”
—আমাকে সেখানে নিয়ে চলো।
অভিজিৎ বাধা দিল।
—না, অর্ক! ওখানে যাওয়া বিপজ্জনক।
—কেন? বাবা কী লুকিয়ে রেখেছিলেন সেখানে?
অভিজিৎ বলল, “ওখানে শুধু নথি নেই। এমন কিছু প্রমাণ আছে, যেগুলো প্রকাশ পেলে অনেক প্রভাবশালী মানুষের নাম সামনে চলে আসবে। তারা কোনওদিন সেটা হতে দেবে না।”
—তাহলে এতদিন ধরে তোমরা সবাই ভয়ে চুপ করে ছিলে?
—আমি ভয় পেয়েছিলাম, হ্যাঁ। কিন্তু আজ আর চুপ থাকব না।
অর্ক তারার হাত ধরল।
—তুমিও আমাদের সঙ্গে যাবে।
তারা মাথা নাড়ল।
—না, বাবা। আমাকে এখানে থাকতে হবে।
—কেন?
তারা ধীরে ধীরে পুতুলটার দিকে এগিয়ে গেল। ছেঁড়া কাপড়ের ভেতর থেকে সে একটা ছোট্ট চিপ বের করল।
—কারণ এই ফোনটা শুধু ফোন নয়। এটা একটা রেকর্ডিং যন্ত্র। মা আমাকে বলেছিল, শেষ ফোনের সব কথোপকথন এখানে জমা থাকে।
অর্ক চিপটা হাতে নিল।
—এতে কী আছে?
—তোমার জন্মের রাতের রেকর্ডিং।
অর্ক চিপটা ফোনে লাগাল।
প্রথমে শোঁ-শোঁ শব্দ। তারপর এক মহিলার গলা—
“দুটো বাচ্চাকে আলাদা করে ফেলুন। একটা থাকবে অর্ক নামে। অন্যটার নাম হবে তারা। কিন্তু নথিতে কোনও নাম থাকবে না।”
তারপর আরেকজন পুরুষের গলা—
“কিন্তু ম্যাডাম, একই জন্মদাগ থাকলে একদিন সত্যি প্রকাশ হয়ে যাবে।”
মহিলাটি ঠান্ডা গলায় বললেন—
“তাহলে জন্মদাগের নথি বদলে দিন। আর যে মানুষটা এই দুই শিশুর জন্মের কথা জানে, তাকে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।”
রেকর্ডিংয়ে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর পুরুষটি জিজ্ঞেস করল—
“আর অর্কের আসল মা?”
মহিলার উত্তর শুনে অর্কের বুকের ভেতরটা বরফ হয়ে গেল।
“ওকে এমন জায়গায় রাখুন, যেখানে সে নিজের নামটাও ভুলে যায়।”
রেকর্ডিং শেষ।
অর্কের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে মেঘলার দিকে তাকাল।
—এই গলাটা কার?
মেঘলা কাঁদছিলেন। তিনি মুখ ঢেকে বললেন—
—আমি জানি না।
কিন্তু অভিজিৎ পিছিয়ে গেল। তার মুখে এমন আতঙ্ক, যা অর্ক আগে কখনও দেখেনি।
—দাদা?
অভিজিৎ কোনও উত্তর দিল না।
—তুমি কণ্ঠস্বরটা চিনতে পেরেছ, তাই না?
অভিজিৎ কাঁপা গলায় বলল—
—হ্যাঁ।
—কার গলা?
অভিজিৎ দরজার দিকে তাকাল।
—আমাদের মায়ের।
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।
—কিন্তু আমাদের মা তো…
—মারা গিয়েছিলেন, যখন আমরা ছোট ছিলাম। অন্তত আমাদের তাই বলা হয়েছিল।
ঠিক তখনই অর্কের ফোনে নতুন একটা কল এল।
এবার নম্বরটা পরিচিত।
“মা।”
অর্ক কল ধরল না। ফোনটা টেবিলে রেখে স্পিকার চালু করল।
ওপাশ থেকে এক বৃদ্ধার গলা ভেসে এল।
—অভিজিৎ, তুমি কি ওকে সব বলে দিয়েছ?
অভিজিৎ কেঁপে উঠল।
—মা?
বৃদ্ধা হেসে উঠলেন।
—এত বছর পরেও আমার গলা চিনতে পারলে? ভালো। তাহলে এবার তোমার ভাইকে বলো, সে কোথায় জন্মেছিল।
অর্ক ফোনের দিকে ঝুঁকে বলল—
—আপনি কে?
—আমি তোমার মা।
—আমার আসল মা?
—তুমি কি সত্যিই সেটা জানতে চাও?
—হ্যাঁ!
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর বৃদ্ধা বললেন—
—তাহলে পুরোনো হাসপাতালের বেসমেন্টে এসো। নীলদরজার ওপারে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
কল কেটে গেল।
অর্ক আর দেরি করল না।
মেঘলা, অভিজিৎ আর তারাকে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কলকাতার রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু অর্কের মনে হচ্ছিল, সে যেন এমন এক রাতের মধ্যে দিয়ে চলেছে, যার কোনও সকাল নেই।
পুরোনো হাসপাতালটা শহরের এক নির্জন প্রান্তে। বহু বছর ধরে বন্ধ। দেওয়ালে আগাছা, জানালায় ভাঙা কাচ, গেটের সামনে মরচে ধরা তালা।
অভিজিৎ একটা ছোট্ট কাটার দিয়ে তালা খুলল।
ভেতরে ঢুকতেই পচা গন্ধে অর্কের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। করিডোরের দেওয়ালে এখনও পুরোনো নির্দেশিকা ঝুলছে। কোথাও লেখা— শিশু বিভাগ। কোথাও— নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র।
সিঁড়ি দিয়ে তারা বেসমেন্টে নামল।
শেষ প্রান্তে একটা নীল দরজা।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অর্কের মনে হল, সে এই জায়গায় আগে এসেছে। বহু বছর আগে। হয়তো ছোটবেলায়। হয়তো কোনও দুঃস্বপ্নে।
মেঘলা তার হাত ধরলেন।
—প্রস্তুত?
অর্ক মাথা নাড়ল।
অভিজিৎ দরজার তালায় চাবি ঢোকাল।
ক্লিক করে তালা খুলে গেল।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই অর্ক দেখল, একটা ছোট ঘর। ঘরের মাঝখানে পুরোনো কাঠের খাট। দেওয়ালে সারি সারি ফাইল। এক কোণে অকেজো মনিটর। আর খাটের পাশে বসে আছেন এক বৃদ্ধা।
সাদা চুল। কুঁচকে যাওয়া মুখ। চোখে মোটা চশমা।
তিনি অর্ককে দেখে মৃদু হাসলেন।
—অনেক দেরি করে ফেললে, বাবা।
অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।
—আপনি কি আমার মা?
বৃদ্ধা উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে জল।
—আমি তোমাকে জন্ম দিইনি। কিন্তু তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমি নিজের সন্তানকে হারিয়েছিলাম।
অর্ক হতবাক।
—কী বলছেন?
বৃদ্ধা টেবিলের ওপর রাখা একটা ফাইল খুললেন।
—তোমার আসল নাম অর্ক নয়। জন্মের সময় তোমার নাম রাখা হয়েছিল অরিত্র। তোমার একটি যমজ ভাই ছিল। তার নাম ছিল অরিন্দম।
অর্কের মাথার ভেতর যেন সব শব্দ থেমে গেল।
—আমার যমজ ভাই?
—হ্যাঁ। তোমাদের দুজনকে জন্ম দিয়েছিল এক তরুণী। তার নাম ছিল রূপা।
অর্ক মেঘলার দিকে তাকাল। মেঘলা কাঁদছিলেন।
বৃদ্ধা বললেন, “রূপা তোমাদের জন্ম দেওয়ার পর মারা যায়নি। তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সে পালিয়ে যায়। যাওয়ার আগে সে তোমাদের একজনকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল।”
—কাকে?
বৃদ্ধা অর্কের দিকে তাকালেন।
—তোমাকে।
—তাহলে অন্য শিশুটি?
বৃদ্ধা চোখ নামিয়ে বললেন—
—অরিন্দমকে নিয়ে গিয়েছিল সেই মানুষ, যে এই হাসপাতালের সব নথি বদলাত। আমি তাকে থামাতে পারিনি।
অর্কের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
—কে সে?
বৃদ্ধা ফাইল থেকে একটা ছবি বের করলেন।
ছবিতে হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণ চিকিৎসক।
অর্ক ছবিটা দেখেই পিছিয়ে গেল।
কারণ মানুষটিকে সে চিনতে পেরেছে।
তিনি আর কেউ নন।
তার নিজের দাদা বলে পরিচিত অভিজিৎ।
কিন্তু ছবির তারিখ লেখা— ১৯৯৪।
সেই সময় অভিজিৎ তো নিজেও শিশু ছিল!
অর্ক ঘুরে তাকাল।
—দাদা, এ কী?
অভিজিৎ দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল।
—আমি জানি না, অর্ক। আমি শপথ করে বলছি, আমি জানি না!
বৃদ্ধা এবার ধীরে ধীরে বললেন—
—কারণ ছবির মানুষটা অভিজিৎ নয়।
তিনি ছবিটা উল্টে দিলেন।
পেছনে লেখা—
“অরিন্দম ভট্টাচার্য— যমজ শিশুদের জৈবিক পিতা।”
অর্কের মাথা ঘুরে গেল।
তার বাবা নাকি একজন চিকিৎসক ছিলেন। কিন্তু সেই মানুষটি তো তার পরিচিত পরিবারের কেউ নন। আর ছবির মানুষটির মুখ অভিজিতের মতোই দেখতে।
বৃদ্ধা বললেন—
—তোমার যমজ ভাই অরিন্দম বড় হয়ে নিজের বাবার পরিচয় ব্যবহার করেছিল। সে এই হাসপাতালের নথি বদলানোর কাজে জড়িয়ে পড়ে। তোমাকে খুঁজে বের করার জন্যই সে তোমার দাদার পরিচয় নিয়ে তোমার জীবনে ঢুকে পড়েছিল।
অর্কের চোখ অভিজিতের দিকে স্থির হয়ে গেল।
—তুমি তাহলে কে?
অভিজিৎ কাঁপা গলায় বলল—
—আমি অরিন্দম নই, অর্ক। আমি সত্যিই অভিজিৎ। আমি তোমার মতোই এই ষড়যন্ত্রের শিকার। আমাকে ছোটবেলায় এই পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আমার আসল বাবা-মা কারা, তা আমি জানি না।
অর্ক কিছু বলতে পারল না।
এতক্ষণ যে রহস্যের সমাধান খুঁজছিল, তার বদলে সে যেন আরও গভীর অন্ধকারে ঢুকে পড়েছে।
ঠিক তখনই বৃদ্ধার পেছনের দরজা খুলে গেল।
একজন মানুষ ঘরে ঢুকলেন।
মুখে দাড়ি। চোখে কালো চশমা। হাতে একটা পুরোনো ফোন।
তিনি অর্কের দিকে তাকিয়ে বললেন—
—অবশেষে দেখা হল, ভাই।
অর্কের বুকের ভেতরটা থেমে গেল।
মানুষটি চশমা খুললেন।
মুখটা অভিজিতের মতো। কিন্তু চোখ দুটো সম্পূর্ণ আলাদা।
তিনি মৃদু হাসলেন।
—আমার নাম অরিন্দম। আর এত বছর ধরে তোমার ফোনে যে রূপার কণ্ঠস্বর শুনেছ, সেটা আমার তৈরি করা রেকর্ডিং।
অর্ক পিছিয়ে গেল।
—রূপা কোথায়?
অরিন্দমের হাসি মিলিয়ে গেল।
—সে বেঁচে আছে।
—কোথায়?
অরিন্দম টেবিলের ওপর ফোনটা রাখল।
—সেটা জানার আগে তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তুমি কি তোমার মাকে বাঁচাতে চাও, নাকি তোমার মেয়েকে?
অর্কের চোখ বড় হয়ে গেল।
—আমার মেয়ে কোথায়?
অরিন্দম ফোনের পর্দা ঘুরিয়ে দেখাল।
লাইভ ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে একটি অন্ধকার ঘর। ঘরের এক কোণে বাঁধা অবস্থায় বসে আছে এক মহিলা।
তার মুখে আঘাতের দাগ। চুল এলোমেলো। চোখ বন্ধ।
অর্ক সেই মুখ দেখেই চিৎকার করে উঠল—
—রূপা!
কিন্তু ভিডিওর পরের দৃশ্য দেখে তার গলা বন্ধ হয়ে গেল।
রূপার পাশে বসে আছে একটি মেয়ে।
তারার মতো দেখতে।
একই মুখ। একই চোখ। একই জন্মদাগ।
কিন্তু মেয়েটির চোখ খুলতেই অর্ক দেখল, তার কপালের বাঁ দিকে কোনও জন্মদাগ নেই।
মেয়েটি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
—বাবা, আমাকে বাঁচাও।
অরিন্দম ফোনটা বন্ধ করে দিল।
—তোমার দুই মেয়ের মধ্যে একজন সত্যি। অন্যজন এমন এক রহস্যের চাবি, যার জন্য বহু মানুষ মরেছে।
অর্ক কাঁপা গলায় বলল—
—তুমি কী চাও?
অরিন্দম এগিয়ে এসে তার কানের কাছে ফিসফিস করল—
—আমি চাই তুমি আজ রাত ২টা ১৭ মিনিটে শেষ ফোনটা ধরো। কারণ সেই ফোনের ওপারে থাকবে তোমার আসল মা।
সে থামল।
তারপর এমন একটা কথা বলল, যা শুনে অর্ক বুঝতে পারল— এই গল্পের শেষ এখনও অনেক দূরে।
—আর ফোনটা ধরার পর তুমি জানতে পারবে, রূপা তোমার প্রেমিকা ছিল না। সে ছিল তোমার…
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ঘরের আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে একটা ফোন বেজে উঠল।
ট্রিং… ট্রিং… ট্রিং…
অর্ক হাতড়ে ফোনটা খুঁজতে লাগল।
তারপর কানে এল সেই পরিচিত নারীকণ্ঠ—
“অর্ক, এবার চোখ খোলো। তুমি এখনও ঘুমিয়ে আছ।”
অর্ক চোখ খুলল।
সে নিজের বাড়ির বিছানায় শুয়ে আছে।
পাশে মেঘলা ঘুমোচ্ছে।
দেয়ালে ঘড়ি— রাত ২টা ১৬ মিনিট।
তার হাতে একটা ফোন।
আর ফোনের পর্দায় লেখা—
“রূপা কলিং…”
অর্ক বুঝতে পারল না, গত রাতের সব ঘটনা স্বপ্ন ছিল, নাকি সে সত্যিই পুরোনো হাসপাতালে গিয়েছিল।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
রাত ২টা ১৭ মিনিট।
অর্ক কল রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে রূপার গলা ভেসে এল—
“অর্ক, তুমি কি মনে করতে পারছ, তোমার জন্মের রাতে কী হয়েছিল?”
অর্ক কিছু বলার আগেই রূপা ফিসফিস করে বলল—
“কারণ তুমি যে জীবনটাকে নিজের বলে জানো, সেটা তোমার জীবনের প্রথম স্বপ্ন ছিল।”
কল কেটে গেল।
অর্ক ধীরে ধীরে মেঘলার দিকে তাকাল।
মেঘলা তখনও ঘুমোচ্ছে।
কিন্তু তার বালিশের নিচে একটা পুরোনো ছবি দেখা যাচ্ছে।
অর্ক ছবিটা টেনে বের করল।
ছবিতে দুটি শিশু পাশাপাশি শুয়ে আছে। তাদের পাশে দাঁড়িয়ে এক তরুণী।
তরুণীর মুখ রূপার মতো।
আর ছবির পেছনে লেখা—
“অর্ক ও অরিন্দম। জন্ম: ১৮ নভেম্বর, ১৯৯৪।”
অর্কের হাত থেকে ছবিটা পড়ে গেল।
তারপর ঘরের অন্ধকারে, মেঘলার বন্ধ চোখের আড়াল থেকে, খুব নিচু একটা গলা ভেসে এল—
“অবশেষে তুমি জেগে উঠেছ, অরিত্র।”
অর্ক স্থির হয়ে গেল।
কারণ গলাটা মেঘলার নয়।
সেটা তার নিজের গলা।
— সমাপ্ত —