পুরোনো সিনেমা হলের ভেতরে তখন এমন এক নীরবতা নেমে এসেছে, যেন বহু বছর ধরে জমে থাকা অন্ধকারও নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে।
টেবিলের ওপর পড়ে থাকা পুরোনো পুতুলটার পেটের ভেতর থেকে ফোন বেজে চলেছে।
ট্রিং… ট্রিং… ট্রিং…
অর্ক স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে পুতুলটার দিকে। তার হাতে তারার দেওয়া রূপার শেষ চিঠি। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার দাদা অভিজিৎ। আর ফোনের পর্দায় জ্বলছে সেই নাম— রূপা কলিং…
বারো বছর আগে যে মেয়েটির মৃত্যুসংবাদ শুনে অর্ক নিজের জীবনের একটা বড় অধ্যায় বন্ধ করে দিয়েছিল, সেই মেয়েই কি আজ তাকে ফোন করছে?
নাকি কেউ তার মৃত অতীতকে ব্যবহার করে অর্ককে এমন একটা ফাঁদে ফেলেছে, যেখান থেকে ফেরার পথ নেই?
—বাবা, ফোনটা ধরো না।
তারার ফিসফিসানি শুনে অর্ক চমকে উঠল।
—কেন?
—ওই ফোনটা যখনই বাজে, কেউ না কেউ হারিয়ে যায়।
অর্কের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
—তুমি কী বলতে চাইছ, তারা?
মেয়েটি উত্তর দিল না। তার চোখ পুতুলটার দিকে স্থির। বারো বছরের একটা মেয়ের চোখে এমন আতঙ্ক থাকার কথা নয়। তার চোখে যেন বহু বছরের জমে থাকা রাত, অসংখ্য অপেক্ষা আর এমন কিছু স্মৃতি লুকিয়ে আছে, যেগুলো তার বয়সের তুলনায় অনেক বেশি ভারী।
ফোনটা আবার বেজে উঠল।
অর্ক আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে পুতুলটা তুলে টেবিলের ওপর আছাড় মারল।
পুতুলের পুরোনো কাপড় ছিঁড়ে গেল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা ছোট মোবাইল ফোন, কয়েকটা তার, আর ভাঁজ করা একটি কাগজ।
ফোনের রিং বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরের নীরবতার মধ্যে অর্ক কাগজটা তুলে নিল।
তাতে মাত্র একটি লাইন লেখা—
“অভিজিৎকে বিশ্বাস করো না। কিন্তু ওকে মেরে ফেলতেও যেয়ো না। কারণ ও-ই জানে, রূপা কোথায়।”
নিচে লেখা তারিখ— ১৮ নভেম্বর, ২০১৪।
অর্কের হাত কেঁপে উঠল।
ঠিক সেই দিন, যেদিন অভিজিৎ তাকে বলেছিল রূপা আত্মহত্যা করেছে।
দরজার বাইরে থেকে আবার অভিজিতের গলা ভেসে এল।
—অর্ক! আমি শেষবারের মতো বলছি, দরজা খোল!
অর্ক তারার দিকে তাকাল।
—তুমি এখানে থাকো। আমি দাদার সঙ্গে কথা বলব।
তারা তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
—না, বাবা! তুমি বাইরে গেলে ও তোমাকে সত্যিটা বলবে না।
—তাহলে কী করব?
—ওকে ভেতরে আসতে দাও। কিন্তু দরজাটা খোলার আগে একটা প্রশ্ন করবে।
—কী প্রশ্ন?
তারা অর্কের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল—
—জিজ্ঞেস করবে, মা মারা যাওয়ার রাতে ওর শার্টে রক্ত লেগেছিল কেন।
অর্কের মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হল।
রক্ত?
রূপার মৃত্যুর রাতের কথা তার স্পষ্ট মনে নেই। বারো বছর আগের সেই সময়টা তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। অভিজিৎই তাকে ফোন করে জানিয়েছিল, রূপা আর নেই। সে নাকি বাড়ির কাছের একটা পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিল। পুলিশ দেহ উদ্ধার করেছে। অর্ক যেন আর সেখানে না যায়, কারণ সবকিছু শেষ।
অর্ক তখন দিল্লিতে চাকরি করত। খবরটা পাওয়ার পর ছুটে কলকাতায় এসেছিল। কিন্তু অভিজিৎ তাকে বলেছিল, দেহ শনাক্ত করার মতো অবস্থায় নেই। পুলিশি ঝামেলা এড়াতে পরিবারের লোকজন দ্রুত শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে।
অর্ক তখন ভেঙে পড়েছিল। দাদার কথায় বিশ্বাস করেছিল।
আজ মনে হচ্ছে, তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সেই বিশ্বাস।
সে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
—দাদা!
বাইরে সঙ্গে সঙ্গে নীরবতা নেমে এল।
—তুই ভেতরে আছিস, আমি জানি। দরজা খোল।
—একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।
—কী প্রশ্ন?
অর্ক গলা শক্ত করে বলল—
—রূপার মৃত্যুর রাতে তোমার শার্টে রক্ত লেগেছিল কেন?
কয়েক সেকেন্ড কোনও উত্তর এল না।
তারপর দরজার বাইরে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
—তুই ওর সঙ্গে দেখা করেছিস?
—প্রশ্নের উত্তর দাও।
—অর্ক, তুই বুঝতে পারছিস না। যা কিছু ঘটেছে, সব তোর ভালোর জন্য…
—আমার ভালোর জন্য তুমি আমাকে বিশ্বাস করিয়েছিলে যে আমার মেয়ের মা মারা গেছে?
দরজার ওপাশে এবার একটা ধাক্কা পড়ল।
—কী বললি? তোর মেয়ে?
অর্ক বুঝতে পারল, কথাটা শুনে অভিজিৎ সত্যিই চমকে উঠেছে।
অথবা সে খুব ভালো অভিনয় করছে।
ঠিক তখনই সিনেমা হলের ভাঙা জানালা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে এল। টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলো উড়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। তাদের মধ্যে একটা পুরোনো ছবি অর্কের চোখে পড়ল।
ছবিতে তিনজন মানুষ।
অর্ক, রূপা এবং অভিজিৎ।
ছবিটা তোলা হয়েছিল রূপার মৃত্যুর আগের রাতে। পেছনে পুরোনো সিনেমা হলের প্রবেশদ্বার। ছবির নিচে কালো কালিতে লেখা—
“আমাদের শেষ রাত— ১৭ নভেম্বর ২০১৪।”
অর্ক ছবিটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে তাকাল।
—দাদা, তুমি এখানে এসেছিলে কেন?
এবার অভিজিৎ উত্তর দিল না।
অর্ক আবার বলল—
—রূপার সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী ছিল?
দরজার বাইরে থেকে আচমকা একটা শব্দ এল। যেন কেউ দেয়ালে হাত রেখে দাঁড়াতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়েছে।
তারপর অভিজিৎ খুব নিচু গলায় বলল—
—দরজা খোল, অর্ক। আমি তোকে সব বলব। কিন্তু তার আগে তোকে একটা কথা জানতে হবে।
—কী কথা?
—তুই যাকে তোর মেয়ে ভাবছিস, সে সত্যিই তোর মেয়ে কি না, সেটা তুই জানিস না।
অর্কের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল।
তারার দিকে তাকাতেই মেয়েটি মাথা নিচু করে ফেলল।
—তারা, দাদার কথা কি সত্যি?
মেয়েটি কোনও উত্তর দিল না।
—তুমি কি আমার মেয়ে নও?
তারার চোখে জল জমল। সে ধীরে ধীরে পকেট থেকে একটা ছোট্ট লকেট বের করল। লকেটের ভেতরে দুটো ছবি— একদিকে রূপা, অন্যদিকে অর্কের বহু পুরোনো ছবি।
—আমি জানি না, বাবা। মা বলেছিল তুমি আমার বাবা। কিন্তু আমার জন্মের কাগজে তোমার নাম নেই।
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।
—কী?
—মা বলেছিল, আমার জন্মের পর হাসপাতালের কাগজ বদলে দেওয়া হয়েছিল। কেউ আমার আসল পরিচয় মুছে দিয়েছিল। মা অনেক চেষ্টা করেছিল সত্যিটা খুঁজে বের করতে। কিন্তু তার আগেই…
তারা থেমে গেল।
—তার আগেই কী?
মেয়েটি চোখ মুছে বলল—
—মা হারিয়ে গেল।
অর্ক তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
—তুমি শেষ কবে তোমার মাকে দেখেছিলে?
—গতকাল রাতে।
—গতকাল রাতে? তুমি তো বলেছিলে মা আর নেই!
—আমি বলেছিলাম, মা চলে গেছে। মারা গেছে বলিনি।
অর্কের মনে হল, সে যেন একটা গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছে। প্রতিটি উত্তর তাকে আরও দশটা প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছে।
—তাহলে রূপা কোথায়?
তারা মুখ খুলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে অভিজিৎ চিৎকার করে উঠল—
—অর্ক! ওর কথা শুনিস না! ও মেয়েটা তোকে শেষ করে দেবে!
অর্ক উঠে দাঁড়াল।
—দাদা, তুমি ওকে চেনো?
—চিনি। আর তুই যা ভাবছিস, ও তার কিছুই নয়!
—তাহলে ও কে?
—দরজা খোল। সব বলব।
অর্ক দরজার ছিটকিনি খুলে দিল।
অভিজিৎ ভেতরে ঢুকতেই অর্ক তার জামার কলার চেপে ধরল।
—বারো বছর ধরে তুমি আমাকে মিথ্যে বলেছ! কেন?
অভিজিৎ কোনও প্রতিরোধ করল না। তার মুখ ক্লান্ত, চোখ লাল, আর কপালের পাশে শুকনো রক্তের দাগ।
—তুই আমাকে মেরে ফেলতে পারিস, অর্ক। কিন্তু সত্যিটা শোনার আগে কোনও সিদ্ধান্ত নিস না।
—রূপা কোথায়?
অভিজিৎ ধীরে ধীরে পকেট থেকে একটা পুরোনো চাবি বের করল।
—এই চাবিটা চিনিস?
অর্ক চাবিটা দেখেই থমকে গেল।
এটা তাদের ছোটবেলার বাড়ির চাবি। যে বাড়িটা বারো বছর আগে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। সেই বাড়ির পেছনে একটা বন্ধ ঘর ছিল, যেখানে ছোটবেলায় তাদের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হত না।
বাবা মারা যাওয়ার পর অভিজিৎ সেই ঘরটা তালাবন্ধ করে রেখেছিল।
—এই চাবি তোমার কাছে কেন?
অভিজিৎ বলল—
—কারণ রূপাকে শেষবার আমি ওই ঘরেই দেখেছিলাম।
অর্কের হাত থেকে কলার ছেড়ে গেল।
—তুমি বলেছিলে, ও আত্মহত্যা করেছে!
—আমি মিথ্যে বলেছিলাম।
—কেন?
অভিজিৎ চোখ বন্ধ করল।
—কারণ সেদিন রাতে আমি যখন ওকে খুঁজে পেয়েছিলাম, তখন ওর হাতে একটা নবজাতক ছিল। আর ও আমাকে বলেছিল, বাচ্চাটাকে বাঁচাতে হলে তোকে সবকিছু থেকে দূরে রাখতে হবে।
অর্কের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
—সেই বাচ্চা কি তারা?
অভিজিৎ উত্তর দেওয়ার আগে তারার দিকে তাকাল। তারপর বলল—
—আমি জানি না।
—তুমি জানো না মানে?
—কারণ সেদিন রাতে ওই ঘরে দুটো বাচ্চা ছিল।
ঘরের বাতাস যেন জমে গেল।
অর্ক ধীরে ধীরে বলল—
—দুটো?
—হ্যাঁ। একটার জন্ম দিয়েছিল রূপা। অন্য শিশুটিকে কে নিয়ে এসেছিল, আমি জানি না। কিন্তু দুটো শিশুর গলায় একই রকম লকেট ছিল। আর দুটোরই কপালের বাঁ দিকে একই রকম জন্মদাগ।
অর্ক তারার কপালের দিকে তাকাল। চুল সরিয়ে বাঁ দিকে ছোট্ট একটা জন্মদাগ দেখা গেল।
—অন্য বাচ্চাটা কোথায়?
অভিজিৎ বলল—
—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমাদের বাবা মারা গিয়েছিলেন।
অর্ক পিছিয়ে গেল।
—বাবার মৃত্যু তো স্বাভাবিক দুর্ঘটনা ছিল!
—না। বাবা দুর্ঘটনায় মারা যাননি।
অভিজিৎ এবার পকেট থেকে একটা ছোট অডিও রেকর্ডার বের করল। সেটার গায়ে ধুলো জমে আছে, কিন্তু লাল আলো জ্বলছে।
—বাবা মারা যাওয়ার আগের রাতে এই রেকর্ডিং করেছিলেন। আমি এত বছর এটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। কারণ এতে এমন একজনের গলা আছে, যার নাম শুনলে তুই নিজের জীবনকে আর চিনতে পারবি না।
—কার গলা?
অভিজিৎ রেকর্ডারটা চালু করল।
প্রথমে কয়েক সেকেন্ড শোঁ-শোঁ শব্দ। তারপর একটা পুরুষ কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
“যদি এই রেকর্ডিং কেউ শুনে থাকো, তাহলে বুঝবে আমি আর বেঁচে নেই। আমার দুই নাতনির মধ্যে একজনকে আমি বাঁচাতে পেরেছি। অন্যজনকে বাঁচাতে পারিনি। আর অর্ককে সত্যিটা বলা যাবে না। কারণ সে যদি জানতে পারে, তার জন্মের রহস্য কী, তাহলে সে নিজেই সেই মানুষটার কাছে ফিরে যাবে…”
রেকর্ডিং হঠাৎ থেমে গেল।
অর্ক হাঁ করে তাকিয়ে রইল।
—দুই নাতনি? বাবা কি জানতেন রূপার দুই মেয়ে ছিল?
অভিজিৎ মাথা নাড়ল।
—শুধু জানতেন না। তিনি জানতেন, দুটো শিশুর মধ্যে একজনকে জন্মের পরই বদলে দেওয়া হয়েছিল।
অর্কের কানে যেন শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হতে লাগল— দুই শিশু, বদলে দেওয়া, জন্মের রহস্য।
তারা ধীরে ধীরে বলল—
—বাবা, আমার মনে হয়, অন্য মেয়েটা এখনও বেঁচে আছে।
অর্ক তার দিকে তাকাল।
—তুমি কীভাবে জানো?
তারা লকেটটা খুলে দেখাল। ছবির পেছনে একটা ক্ষুদ্র সংখ্যা খোদাই করা— ২১৭।
অভিজিৎ সংখ্যাটা দেখেই চমকে উঠল।
—এটা তোর কাছে এল কোথা থেকে?
—মা দিয়েছিল। বলেছিল, যখনই রাত দুটো সতেরো বাজবে, তখন বুঝব আমার বোন আমাকে খুঁজছে।
ঠিক তখনই অর্কের ফোন বেজে উঠল।
রাত ২টা ১৭ মিনিট।
ফোনের পর্দায় এবার কোনও নাম নেই। শুধু একটি অজানা নম্বর।
অর্ক কলটা ধরল।
ওপাশ থেকে একটা ছোট্ট মেয়ের গলা ভেসে এল।
—বাবা?
অর্কের বুক কেঁপে উঠল।
—কে বলছ?
—আমি তোমার দ্বিতীয় মেয়ে।
অর্ক কিছু বলতে পারল না।
মেয়েটি আবার বলল—
—তুমি কি তারাকে পেয়েছ?
—হ্যাঁ। তুমি কোথায়?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর মেয়েটি এমন একটা কথা বলল, যা শুনে অর্কের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল।
—আমি তোমার বাড়িতেই আছি, বাবা। তোমার বিছানার নিচে।
অর্কের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।
তার বাড়ি তো বহু দূরে। কলকাতার অন্য প্রান্তে। সেখানে এখন মেঘলা একা।
আর তার বিছানার নিচে…
অর্কের চোখের সামনে ভেসে উঠল মেঘলার মুখ।
সে কি জানে?
সে কি এতদিন ধরে দ্বিতীয় শিশুটিকে লুকিয়ে রেখেছে?
নাকি মেয়েটি মিথ্যে বলছে?
অর্ক অভিজিতের দিকে তাকাল।
দাদার মুখে এবার আর কোনও বিস্ময় নেই। বরং এমন এক অসহায় আতঙ্ক, যেন সে বহুদিন ধরে অপেক্ষা করছিল এই ফোনটার জন্য।
—দাদা, তুমি জানো ও কে?
অভিজিৎ ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
—জানি।
—কে ও?
অভিজিৎ চোখ নামিয়ে বলল—
—ও শুধু তোর দ্বিতীয় মেয়ে নয়, অর্ক। ও এমন একটা সত্যির সাক্ষী, যেটা জানলে তুই বুঝতে পারবি, তোর স্ত্রী মেঘলা তোকে কেন বিয়ে করেছিল।
অর্কের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
—মেঘলা?
অভিজিৎ উত্তর দিল না।
তার বদলে সে রেকর্ডারের ভেতর থেকে আরেকটা ছোট মেমোরি কার্ড বের করে অর্কের হাতে দিল।
—বাড়ি ফিরে এটা শুনিস। কিন্তু সাবধান, অর্ক। রেকর্ডিংটা শোনার পর তুই যদি মেঘলাকে প্রশ্ন করিস, ও হয়তো আর কোনও দিন তোর সামনে দাঁড়াবে না।
—তুমি কী বলতে চাইছ?
অভিজিৎ অন্ধকার দরজার দিকে তাকাল।
—আমি বলতে চাইছি, বারো বছর আগে রূপা হারিয়ে যায়নি। তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আর যে মানুষটা তাকে লুকিয়েছিল, সে আজও তোর পাশে ঘুমোয়।
অর্কের মাথায় একটাই নাম ঘুরতে লাগল— মেঘলা।
কিন্তু সেই মুহূর্তেই তারার হাত থেকে লকেটটা মেঝেতে পড়ে খুলে গেল।
ভেতরে থাকা ছবিটা উল্টে যেতেই অর্ক দেখল, ছবির পেছনে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা রয়েছে—
“অর্কের জন্মের সত্যি: ১৮ নভেম্বর, রাত ২টা ১৭ মিনিট।”
অর্ক ছবিটা তুলে ধরতেই অভিজিৎ তার হাত চেপে ধরল।
—না! এটা এখন পড়িস না!
—কেন?
—কারণ তুই যদি এখন নিজের আসল পরিচয় জানতে পারিস, তাহলে রূপার দুই মেয়ের কেউই আর নিরাপদ থাকবে না।
ঠিক তখনই সিনেমা হলের বাইরে একটা গাড়ি এসে থামল।
হেডলাইটের আলো ভাঙা জানালা দিয়ে ভেতরে পড়ল।
একজন মহিলা গাড়ি থেকে নামলেন। তাঁর হাতে একটা কালো ব্যাগ। মুখটা ওড়নায় ঢাকা।
অর্ক তাঁকে চিনতে পারল না।
কিন্তু অভিজিৎ চিনল।
তার মুখ থেকে একটাই শব্দ বেরিয়ে এল—
—মেঘলা!
মহিলাটি ধীরে ধীরে সিনেমা হলের দরজার দিকে এগিয়ে এলেন।
তারপর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এমন একটা কথা বললেন, যা শুনে অর্ক বুঝতে পারল— এতক্ষণ ধরে যে রহস্যের সমাধান খুঁজছিল, আসল রহস্যটা তার শুরুতেই সে ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল।
মেঘলা বললেন—
—অর্ক, তোমাকে একটা কথা বলার আছে। তুমি যাকে এতদিন তোমার দাদা বলে জেনেছ, সে তোমার দাদা নয়।
ঘরের ভেতরে কেউ নড়ল না।
মেঘলা এবার ওড়না সরিয়ে মুখ তুলে তাকালেন।
—আর তুমি যাকে তোমার বাবা বলে জেনেছ, তিনিও তোমার বাবা ছিলেন না।
অর্কের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
—তাহলে… আমি কে?
মেঘলা চোখ বন্ধ করলেন।
—তুমি সেই শিশুটি, যাকে বারো বছর আগে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল।
ঠিক তখনই অর্কের ফোনে আবার একটি বার্তা এল।
প্রেরক: রূপা।
বার্তায় লেখা—
“মেঘলার কথা বিশ্বাস কোরো না। কারণ তোমার আসল মা এখনও বেঁচে আছে। আর সে এখন তোমার সামনে দাঁড়িয়ে।”
অর্ক ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে আছেন।
তার পাশে দাঁড়িয়ে অভিজিৎ।
আর টেবিলের ওপর রাখা পুতুলের ভেতর থেকে আবারও ভেসে এল ফোনের রিংটোন।
ট্রিং… ট্রিং… ট্রিং…
এবার ফোনের পর্দায় ভেসে উঠল নতুন একটি নাম—
“মা কলিং…”
কিন্তু ফোনটা ধরার আগেই অর্ক দেখল, তারার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
মেয়েটি কাঁপা গলায় বলল—
—বাবা, ফোনটা ধরো না। ওই ফোনে যে কথা বলবে, সে তোমার মা নয়।
—তাহলে কে?
তারা চোখ তুলে মেঘলার দিকে তাকাল।
—ওই কণ্ঠস্বরটা আমার নিজের।
চলবে…