Categories
গল্প বিবিধ

যে মেয়েটি হারিয়ে যাওয়া সুরের বদলে খুঁজে পেয়েছিল মানুষের হৃদয়।

১. পুরোনো বাড়ির জানালায়

নদিয়ার এক ছোট্ট শহরে থাকত পায়েল। তার বয়স পনেরো। ছোটবেলা থেকেই সে গান শুনতে ভালোবাসত। স্কুল থেকে ফিরে পড়াশোনা শেষ করেই সে জানালার পাশে বসে থাকত। দূরের বাড়ি থেকে ভেসে আসা গানের সুর শুনে নিজের মতো করে গুনগুন করত।

পায়েলের বাবা ছিলেন বাসচালক। মা সেলাইয়ের কাজ করতেন। সংসারে খুব বেশি স্বচ্ছলতা ছিল না, তাই পায়েলের গানের স্কুলে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছেটা কখনও পূরণ হয়নি।

তবু তার মন খারাপ হতো না। সে ভাবত, গান শেখার জন্য শুধু বড় মঞ্চের দরকার হয় না। মন দিয়ে শুনতে জানলেই অনেক কিছু শেখা যায়।

তাদের বাড়ির পাশেই ছিল একটি পুরোনো বাড়ি। সেখানে থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত সংগীতশিক্ষক অমলবাবু। একসময় তিনি শহরের একটি বিদ্যালয়ে গান শেখাতেন। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইত। কিন্তু কয়েক বছর আগে তাঁর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন।

এখন তিনি খুব কম কথা বলতেন। বাড়ির দরজা বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকত। আশপাশের মানুষ জানতেন, তিনি একসময় অসাধারণ গান গাইতেন, কিন্তু বহু বছর হলো কেউ তাঁর গান শোনেনি।

একদিন বিকেলে পায়েল বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ অমলবাবুর বাড়ির ভিতর থেকে ভেসে এল কয়েকটি সুর। সুরগুলো খুব মৃদু, যেন কেউ বহুদিনের ঘুম ভেঙে নিজের পুরোনো পরিচয় খুঁজছে।

পায়েল থেমে গেল।

কিছুক্ষণ পরে সুর থেমে গেল। জানালার কাছে গিয়ে সে দেখল, অমলবাবু একটি পুরোনো হারমোনিয়ামের সামনে বসে আছেন। তাঁর চোখ বন্ধ, মুখে গভীর বিষণ্ণতা।

পায়েল দরজায় কড়া নাড়ল।

অমলবাবু দরজা খুলে অবাক হয়ে বললেন, “কী হয়েছে?”

পায়েল একটু ইতস্তত করে বলল, “আপনি খুব সুন্দর গান করেন। আমি কি মাঝে মাঝে আপনার গান শুনতে আসতে পারি?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “এখন আর গান হয় না মা। গলায় আগের সুর নেই।”

পায়েল উত্তর দিল, “সুর একটু বদলে গেলেও গান কি শেষ হয়ে যায়?”

অমলবাবু কোনও উত্তর দিলেন না। শুধু দরজাটি বন্ধ করার আগে একবার মেয়েটির দিকে তাকালেন।

সেদিন বাড়ি ফিরে পায়েল বুঝতে পারল, তার প্রশ্নটি হয়তো বৃদ্ধের মনে কোথাও গিয়ে লেগেছে।

২. যে মানুষটি আর গান গাইতেন না

পরের কয়েক দিন পায়েল অমলবাবুর বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে নমস্কার করত। বৃদ্ধও মাথা নেড়ে উত্তর দিতেন, কিন্তু কথা বাড়াতেন না।

একদিন পায়েলের মা সেলাইয়ের কাজ নিয়ে তাঁর বাড়িতে গেলেন। অমলবাবুর একটি পুরোনো পর্দা সেলাই করা দরকার ছিল। মায়ের সঙ্গে পায়েলও গেল।

ঘরের ভিতরে তাকিয়ে পায়েল অবাক হয়ে গেল। দেওয়ালে পুরোনো ছবির সারি। কোথাও অমলবাবু ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন, কোথাও মঞ্চে গান গাইছেন। একটি ছবিতে তাঁর পাশে এক মহিলা—সম্ভবত তাঁর স্ত্রী।

ছবির নীচে ছোট্ট অক্ষরে লেখা, ‘আমার প্রথম শ্রোতা’।

পায়েল ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকতেই অমলবাবু বললেন, “ও আমার স্ত্রী, মাধবী। গান শেখানোর সময় ও প্রায়ই পাশে বসে থাকত। কোনও সুর ভুল হলে ধরিয়ে দিত।”

পায়েল ধীরে জিজ্ঞেস করল, “উনি কি গান গাইতেন?”

“গাইত। আমার চেয়েও ভালো গাইত,” বৃদ্ধের মুখে এক মুহূর্তের জন্য হাসি ফুটে উঠল। “কিন্তু নিজের গান কখনও মানুষের সামনে গাইতে চাইত না।”

মায়ের কাজ শেষ হলে পায়েল বিদায় নেওয়ার আগে বলল, “আপনি যদি আবার গান শেখান, আমি শিখতে চাই।”

অমলবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“শেখানোর মতো মন আর নেই মা।”

পায়েল সেদিন আর কিছু বলল না।

কিন্তু বাড়ি ফিরে সে ভাবল, মানুষ যখন কোনও প্রিয়জনকে হারায়, তখন শুধু সেই মানুষটিকেই হারায় না—তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অভ্যাস, আনন্দ, এমনকি নিজের পরিচয়ের একটা অংশও হারিয়ে ফেলে।

অমলবাবুর হারিয়ে যাওয়া সুরের পিছনে হয়তো এমনই কোনও কষ্ট রয়েছে।

৩. একটি পুরোনো খাতা

এক সপ্তাহ পরে পায়েল স্কুল থেকে ফেরার সময় দেখল, অমলবাবু বাড়ির সামনে বসে পুরোনো কাগজপত্র গুছিয়ে রাখছেন। কয়েকটি কাগজ বাতাসে উড়ে রাস্তার উপর পড়েছে।

পায়েল দৌড়ে গিয়ে সেগুলো তুলে দিল।

কাগজের মধ্যে ছিল গানের স্বরলিপি, ছাত্রছাত্রীদের নাম এবং হাতে লেখা কিছু ছোট ছোট কবিতা। একটি খাতার প্রথম পাতায় লেখা ছিল—‘মাধবীর জন্য’।

অমলবাবু খাতাটি হাতে নিয়ে চুপ করে গেলেন।

পায়েল বুঝতে পারল, খাতাটি তাঁর কাছে খুব মূল্যবান।

“আপনি কি এগুলো ফেলে দিচ্ছেন?” সে জিজ্ঞেস করল।

“না। শুধু গুছিয়ে রাখছিলাম। অনেক দিন খুলে দেখা হয়নি।”

পায়েল খাতাটি খুলে দেখল, সেখানে কয়েকটি গানের কথা লেখা। পাতার এক কোণে পেনসিলে ছোট্ট একটি মন্তব্য—‘এই গানটি একদিন সবাই মিলে গাইব।’

পায়েল জিজ্ঞেস করল, “এই গানটি কি আপনারা একসঙ্গে গেয়েছিলেন?”

অমলবাবু মাথা নাড়লেন।

“না। মাধবীর ইচ্ছা ছিল, পাড়ার সবাইকে নিয়ে একদিন গান গাইবে। কিন্তু তার আগেই ও অসুস্থ হয়ে পড়ল। তারপর…”

কথা শেষ করতে পারলেন না তিনি।

পায়েল নীরবে খাতাটি বন্ধ করে দিল।

কিছুক্ষণ পরে সে বলল, “আপনি যদি চান, আমরা একদিন পাড়ার সবাইকে নিয়ে বসতে পারি। কেউ গান গাইবে, কেউ শুধু শুনবে। আপনার স্ত্রীর ইচ্ছেটাও তো পূরণ হতে পারে।”

অমলবাবু মৃদু হেসে বললেন, “এখনকার দিনে কে আর এসবের জন্য সময় দেবে?”

পায়েল বলল, “একবার চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কী?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। কিন্তু এবার তিনি দরজা বন্ধ করার আগে পায়েলকে থামিয়ে বললেন, “তুই কি সত্যিই গান শিখতে চাস?”

পায়েল আনন্দে মাথা নাড়ল।

“তাহলে কাল বিকেলে আসিস। তবে আগে শুনতে শিখবি, তারপর গাইতে।”

৪. প্রথম পাঠ

পরদিন পায়েল ঠিক সময়ে হাজির হলো।

অমলবাবু হারমোনিয়ামের সামনে বসে তাকে বোঝালেন, গান শেখার প্রথম শর্ত হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা। তিনি একটি সহজ সুর বাজালেন। পায়েল মন দিয়ে শুনল, তারপর নিজের মতো করে গাওয়ার চেষ্টা করল।

প্রথমবার সুর ঠিক হলো না। দ্বিতীয়বারও ভুল হলো।

পায়েল লজ্জা পেয়ে বলল, “আমি বোধহয় পারব না।”

অমলবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “এই কথাটা আর বলবি না। সুর ভুল হওয়া মানে শেখার সুযোগ পাওয়া। তুই যদি চেষ্টা না করিস, তবেই শেখা হবে না।”

তিনি ধৈর্য ধরে আবার শেখালেন। পায়েলও বারবার চেষ্টা করল।

সেদিন এক ঘণ্টা কেটে গেল। পায়েল বাড়ি ফেরার সময় তার মুখে আনন্দের হাসি।

এরপর থেকে সপ্তাহে তিন দিন সে অমলবাবুর কাছে যেতে লাগল। ধীরে ধীরে বৃদ্ধের বাড়িতে প্রাণ ফিরে আসতে শুরু করল। জানালা খুলে রাখা হতো, ঘর পরিষ্কার থাকত, আর বিকেলে হারমোনিয়ামের সুর শোনা যেত।

তবে অমলবাবু এখনও নিজের গান গাইতেন না। তিনি শুধু পায়েলকে শেখাতেন।

একদিন পায়েল সাহস করে জিজ্ঞেস করল, “আপনি আমাকে গান শেখান, অথচ নিজে গান করেন না কেন?”

বৃদ্ধ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “যে গানটা আমি মাধবীর সঙ্গে গাইতাম, সেটি গাইতে গেলেই ওর কথা মনে পড়ে। গলাটা আটকে যায়।”

পায়েল ধীরে বলল, “তাহলে গানটা ওঁকে মনে রেখেই গাইবেন। ভুলে যাওয়ার জন্য তো গান নয়।”

অমলবাবু তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটির কথায় কোনও বড় দর্শন ছিল না, ছিল সরল বিশ্বাস।

সেদিন তিনি গানটি গাওয়ার চেষ্টা করলেন। প্রথম লাইনেই তাঁর গলা কেঁপে উঠল। তিনি থেমে গেলেন।

পায়েল তাঁর পাশে বসে রইল। কোনও সান্ত্বনার কথা বলল না, শুধু অপেক্ষা করল।

কিছুক্ষণ পরে অমলবাবু আবার শুরু করলেন।

এবার গানটি শেষ হলো।

গান শেষ করে তিনি চোখ মুছলেন। পায়েল দেখল, তাঁর মুখে একই সঙ্গে দুঃখ ও শান্তির ছাপ।

৫. একটি ছোট্ট অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা

কয়েক সপ্তাহ পরে পায়েল তার শিক্ষিকা ও কয়েকজন বন্ধুকে অমলবাবুর কথা বলল। সে প্রস্তাব দিল, পাড়ার মানুষের জন্য একটি ছোট্ট সংগীতসন্ধ্যার আয়োজন করা হোক। কোনও বড় মঞ্চ নয়, কোনও প্রতিযোগিতা নয়—শুধু মানুষ একসঙ্গে বসবে, কেউ গান গাইবে, কেউ শুনবে, কেউ নিজের স্মৃতির কথা বলবে।

বন্ধুরা রাজি হলো।

তারা পাড়ার ক্লাবঘরের অনুমতি নিল। স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ মানুষকে আমন্ত্রণ জানাল। পায়েলের মা ও অন্য কয়েকজন মহিলা অনুষ্ঠানটির জন্য সামান্য খাবারের ব্যবস্থা করতে চাইলেন।

কিন্তু অমলবাবু খবরটি শুনে আপত্তি করলেন।

“আমি মঞ্চে উঠতে পারব না। আমাকে এসবের মধ্যে জড়াস না।”

পায়েল বলল, “আপনাকে মঞ্চে উঠতেই হবে না। আপনি চাইলে দর্শকদের মধ্যে বসে থাকবেন। আমরা শুধু আপনার স্ত্রীর সেই ইচ্ছেটা মনে রাখতে চাই—সবাই একসঙ্গে গান গাইবে।”

বৃদ্ধ বললেন, “লোকজন যদি হাসাহাসি করে?”

পায়েল হেসে উত্তর দিল, “এটা তো প্রতিযোগিতা নয়, কাকু। এখানে কেউ কাউকে নম্বর দেবে না।”

অবশেষে অমলবাবু সম্মতি দিলেন।

অনুষ্ঠানের দিন ঠিক হলো শনিবার সন্ধ্যা। পায়েল কয়েকটি সহজ গান শিখল। তার বন্ধুরাও নিজেদের পছন্দের গান প্রস্তুত করল। অমলবাবু পুরোনো খাতা থেকে একটি গান বেছে দিলেন, যেটি তিনি ও মাধবী একসময় একসঙ্গে গাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।

তিনি বললেন, “গানটা খুব কঠিন নয়। সবাই মিলে গাইতে পারবে।”

তারপর তিনি পায়েলকে গানটির অর্থ বুঝিয়ে দিলেন। গানটিতে ছিল মানুষের পাশে থাকা, অভিমান ভুলে ফিরে আসা এবং জীবনের ছোট ছোট আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার কথা।

পায়েল বুঝল, এই গানটি শুধু একটি সুর নয়; এটি অমলবাবু ও তাঁর স্ত্রীর অসমাপ্ত স্বপ্ন।

৬. সেই সন্ধ্যা

শনিবার ক্লাবঘরটি মানুষের ভিড়ে ভরে গেল। কেউ চেয়ারে বসেছেন, কেউ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। গ্রামের বৃদ্ধ থেকে ছোট শিশু—সব বয়সের মানুষ এসেছেন।

অনুষ্ঠান শুরু করল পায়েল। তার কণ্ঠে কিছুটা কাঁপুনি ছিল, কিন্তু সে মন দিয়ে গান গাইল। তারপর তার বন্ধুরা গান শোনাল।

একজন বৃদ্ধ নিজের ছোটবেলার একটি গান গাইলেন। আরেকজন মহিলা জানালেন, তাঁর মা কাজ করতে করতে যে গান গাইতেন, সেটি আজও তাঁর মনে আছে।

ধীরে ধীরে পরিবেশ বদলে গেল। মানুষ শুধু গান শুনছিলেন না; তাঁরা নিজেদের স্মৃতি ভাগ করে নিচ্ছিলেন।

সবশেষে পায়েল অমলবাবুর লেখা গানটির কথা ঘোষণা করল।

“এই গানটি অনেক বছর আগে অমল কাকু ও তাঁর স্ত্রী মাধবী কাকিমার একসঙ্গে গাওয়ার কথা ছিল। আজ আমরা সবাই মিলে গানটি গাইব।”

ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

পায়েল প্রথম লাইন শুরু করল। তারপর তার বন্ধুরা যোগ দিল। উপস্থিত কয়েকজনও ধীরে ধীরে সুর ধরলেন।

গানটির মাঝামাঝি অমলবাবু উঠে দাঁড়ালেন।

প্রথমে তিনি শুধু ঠোঁট নাড়ছিলেন। তারপর মৃদু কণ্ঠে গাইতে শুরু করলেন। তাঁর গলা আগের মতো শক্তিশালী ছিল না, কোথাও কোথাও কেঁপে যাচ্ছিল। কিন্তু কেউ সেই ত্রুটি খেয়াল করছিল না।

সবাই তাঁর সঙ্গে গাইছিলেন।

গান শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ কেউ কথা বলতে পারলেন না। তারপর হাততালি শুরু হলো।

অমলবাবু চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “আজ মনে হলো, মাধবী যেন আমাদের মাঝেই বসে আছে।”

পায়েল তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

বৃদ্ধ বললেন, “তুই আমাকে আবার গান শেখাসনি, মা। তুই আমাকে আবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে এনেছিস।”

পায়েল কিছু বলতে পারল না। তার নিজের চোখও ভিজে উঠেছিল।

৭. যে সুর মানুষের মধ্যে থেকে গেল

সেই সন্ধ্যার পরে অমলবাবুর জীবনে নতুন পরিবর্তন এল। তিনি সপ্তাহে এক দিন পাড়ার শিশুদের সহজ গান শেখাতে শুরু করলেন। কেউ গান শিখতে চাইলে তিনি ফিরিয়ে দিতেন না। তবে তিনি সব সময় বলতেন, গান শেখার জন্য ধৈর্য দরকার, আর অন্যের কণ্ঠকে সম্মান করতে হয়।

পায়েলও নিয়মিত তাঁর কাছে শিখতে লাগল। একসময় সে স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ পেল। সে যখন মঞ্চে দাঁড়াল, দর্শকদের মধ্যে অমলবাবুও বসে ছিলেন।

গান শেষ হলে তিনি হাততালি দিলেন। পায়েল দূর থেকে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসল।

কয়েক মাস পরে ক্লাবঘরে আবার একটি সংগীতসন্ধ্যার আয়োজন হলো। এবার আর কাউকে বিশেষ করে আমন্ত্রণ জানাতে হয়নি। গ্রামের মানুষ নিজেরাই এসে জড়ো হলেন। কেউ গান গাইলেন, কেউ পুরোনো স্মৃতির কথা বললেন, কেউ নতুন গান শেখার আগ্রহ প্রকাশ করলেন।

অমলবাবু বুঝতে পারলেন, তাঁর স্ত্রীর অসমাপ্ত ইচ্ছেটি আর শুধু তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়। সেটি এখন বহু মানুষের আনন্দের অংশ হয়ে উঠেছে।

একদিন পায়েল তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “কাকু, এখন কি গান গাইতে আর কষ্ট হয়?”

অমলবাবু কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “কষ্ট হয়, মা। মাধবীর কথা এখনও মনে পড়ে। কিন্তু এখন সেই স্মৃতি আমাকে শুধু কাঁদায় না। গান গাইলে মনে হয়, ওর সঙ্গে কাটানো সময়টুকু আবার ছুঁয়ে দেখতে পারি।”

পায়েল মৃদু হেসে বলল, “তাহলে গানটা আর হারিয়ে যায়নি।”

অমলবাবু জানালার বাইরে তাকালেন। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছিল। পাশের বাড়ি থেকে শিশুদের হাসির শব্দ ভেসে আসছিল।

তিনি বললেন, “না, সুরটা হারায়নি। শুধু এত দিন বন্ধ দরজার ওপারে আটকে ছিল।”

পায়েল জানত, সে কোনও জাদু করেনি। সে শুধু একজন মানুষের পাশে বসেছিল, তাঁর কষ্টের কথা শুনেছিল এবং তাঁকে আবার মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।

তার উপলব্ধি হলো, অনেক সময় কারও দুঃখ দূর করার জন্য বড় বড় কথা বলার প্রয়োজন হয় না। কখনও দরকার হয় একটু সময়, মন দিয়ে শোনা, আর এমন একটি পরিবেশ—যেখানে মানুষ নিজের দুর্বলতা লুকিয়ে রাখতে বাধ্য বোধ করেন না।

অমলবাবুর কণ্ঠে হয়তো আগের মতো জোর ফিরে আসেনি। কিন্তু তাঁর গানে আবার প্রাণ ফিরে এসেছিল।

আর পায়েল বুঝেছিল, সুরের আসল সৌন্দর্য শুধু নিখুঁত গলায় নয়। সুরের সৌন্দর্য মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মধ্যে, স্মৃতির মধ্যে, ভালোবাসার মধ্যে।

শিক্ষা: মানুষের দুঃখ সব সময় মুছে দেওয়া যায় না, কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে দুঃখের ভার কিছুটা ভাগ করে নেওয়া যায়। সহমর্মিতা কখনও কখনও একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া আনন্দকে নতুন করে খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *