শহরের পুরোনো পৌরসভা ভবনের দোতলায় একটি ছোট্ট ঘর ছিল। সেখানে বসতেন অনুপম মিত্র। তাঁর কাজ ছিল সাধারণ মানুষের অভিযোগ, আবেদন ও পরামর্শ নথিভুক্ত করা। প্রতিদিন কত মানুষ আসত সেই ঘরে—কেউ রাস্তার সমস্যা জানাতে, কেউ পানীয় জলের অভাবের কথা বলতে, কেউ আবার সরকারি পরিষেবা না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে।
অনুপম মন দিয়ে সবার কথা শুনতেন। কিন্তু তিনি একটি বিষয় লক্ষ করেছিলেন—যাঁরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তেন, তাঁদের অনেকেই নিজের সমস্যার কথা ঠিকমতো বলতে পারতেন না।
কেউ পড়তে জানতেন না, কেউ নিজের বক্তব্য গুছিয়ে বলতে পারতেন না, আবার কেউ ভয়ে মুখ খুলতেন না।
একদিন সেখানে এলেন বৃদ্ধা কমলা দাস। তাঁর হাতে একটি পুরোনো কাপড়ের থলি। তিনি ঘরে ঢুকে চুপচাপ বসে রইলেন।
অনুপম জিজ্ঞাসা করলেন, “কী হয়েছে, মা? কী বলতে এসেছেন?”
কমলা অনেকক্ষণ পর বললেন, “বাবা, আমাদের পাড়ার সরকারি জলের কলটা তিন সপ্তাহ ধরে খারাপ। দূর থেকে জল আনতে হয়। আমি একা কতবার যাব? কাউকে বলতেও পারি না।”
“আগে কোথাও অভিযোগ করেছেন?”
বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন। “করতে এসেছিলাম একবার। কিন্তু এত কাগজপত্র, এত প্রশ্ন—আমি কিছুই বুঝিনি। তাই ফিরে গিয়েছিলাম।”
অনুপম তাঁর অভিযোগ লিখে নিলেন। কিন্তু শুধু সেটুকু করে থেমে থাকলেন না। তিনি জানতে চাইলেন, ওই পাড়ায় আর কতজন একই সমস্যায় ভুগছেন। কমলা জানালেন, সেখানে অনেক বৃদ্ধ মানুষ, দিনমজুর পরিবার এবং ছোট ছোট শিশু রয়েছে। জল আনতে গিয়ে অনেকেরই কাজের সময় নষ্ট হয়।
অনুপম পরদিন নিজেই পাড়াটিতে গেলেন। দেখলেন, কথাটা সত্যি। মহিলারা দূরের নলকূপ থেকে জল আনছেন। স্কুলের শিশুরাও সকালে জল সংগ্রহ করতে গিয়ে দেরি করছে।
তিনি ফিরে এসে কর্তৃপক্ষের কাছে সমস্যাটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরলেন। কয়েক দিনের মধ্যে কল মেরামতের কাজ শুরু হল।
কিন্তু অনুপম বুঝলেন, সমস্যা শুধু একটি জলের কলের নয়। বহু মানুষ তাঁদের অধিকার বা সমস্যার কথা জানাতে পারেন না বলেই তাঁদের কষ্ট দীর্ঘস্থায়ী হয়।
তিনি পৌরসভার অনুমতি নিয়ে প্রতি শনিবার একটি বিশেষ সহায়তা শিবির শুরু করলেন। সেখানে মানুষ বিনা দ্বিধায় নিজেদের সমস্যার কথা বলতে পারতেন। যাঁরা লিখতে জানতেন না, তাঁদের বক্তব্য লিখে দেওয়া হত। কোন দপ্তরে যেতে হবে, কী নথি প্রয়োজন, কীভাবে আবেদন করতে হবে—সবকিছু সহজ ভাষায় বোঝানো হত।
প্রথম দিকে খুব কম মানুষ আসতেন। অনেকে ভাবতেন, এসব করে কোনও লাভ হবে না। কিন্তু কমলা দাস নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের জানাতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে শিবিরে ভিড় বাড়ল।
একদিন এল ষোলো বছরের মেয়ে মধুরা। তাদের পাড়ার কয়েকটি শিশুর স্কুলে যাওয়ার পথে নর্দমার জল জমে থাকত। সে সমস্যাটি জানাতে চাইল, কিন্তু সঙ্গে কোনও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ছিল না। আগে হলে হয়তো তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হত। অনুপম মন দিয়ে তার কথা শুনলেন, বিষয়টি নথিভুক্ত করলেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠালেন।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নর্দমা পরিষ্কারের কাজ শুরু হল।
মধুরা খুশি হয়ে বলল, “কাকু, আমি ভাবতাম বড়দের সমস্যা নিয়ে শুধু বড়রাই কথা বলতে পারে। আজ বুঝলাম, আমাদের কথারও মূল্য আছে।”
অনুপম হেসে বললেন, “সমস্যা যার, কথা বলার অধিকারও তার। বয়স, পড়াশোনা কিংবা আর্থিক অবস্থা সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।”
সময়ের সঙ্গে শনিবারের শিবিরটি শহরের মানুষের কাছে ভরসার জায়গা হয়ে উঠল। তবে অনুপম সব সমস্যার সমাধান করতে পারতেন না। কোনও আবেদন মঞ্জুর হতে সময় লাগত, কোনও বিষয়ে প্রশাসনিক জটিলতা থাকত। তিনি মানুষকে মিথ্যা আশ্বাস দিতেন না। বরং বুঝিয়ে বলতেন, কোন পথে এগোলে সমস্যার সমাধানের সম্ভাবনা বাড়বে।
বছর কয়েক পরে অনুপম বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেলেন। বিদায়ের দিন ঘরটিতে অনেক মানুষ এসেছিলেন। কমলা দাসও এসেছিলেন। তাঁর হাতে ছিল একটি ছোট্ট কাগজ।
কাগজে লেখা ছিল, “আপনি আমাদের হয়ে কথা বলেননি শুধু, আমাদের নিজেদের কথা বলতে শিখিয়েছেন।”
অনুপম কাগজটি ভাঁজ করে পকেটে রাখলেন। তাঁর মনে হল, জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ সব সময় বড় কোনও পদে বসে করা যায় না। কখনও কখনও কারও কথা মন দিয়ে শোনাই তার জীবনে পরিবর্তনের প্রথম দরজা খুলে দেয়।
শিক্ষা: প্রত্যেক মানুষের কথা শোনার মূল্য আছে। কাউকে সাহায্য করার অর্থ শুধু তার সমস্যার সমাধান করা নয়, নিজের অধিকার বুঝে কথা বলার সাহস ও সুযোগ তৈরি করে দেওয়াও।