Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে মানুষটি হারিয়ে যাওয়া খেলনাগুলোর বিচার করতেন।

শহরের এক কোণে ছিল শিশুদের জন্য একটি ছোট্ট মেরামতির দোকান। দোকানটির নাম ‘নতুন করে’। সেখানে ঘড়ি বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র নয়, মেরামত করা হত ভাঙা খেলনা—একচোখো পুতুল, চাকা-খোলা গাড়ি, হাতভাঙা রোবট, ছেঁড়া কাপড়ের ভালুক আর কত কী!

দোকানের মালিক ছিলেন অরুণাভ পাল। একসময় তিনি একটি বড় খেলনা তৈরির কারখানায় কাজ করতেন। অবসরের পরে নিজের সঞ্চয়ের সামান্য টাকা দিয়ে এই দোকানটি খুলেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোনও জিনিস ভেঙে গেলেই তাকে ফেলে দিতে হয় না। অনেক সময় একটু যত্ন পেলেই সে আবার আনন্দ ফিরিয়ে দিতে পারে।

দোকানে একটি অদ্ভুত নিয়ম ছিল। যে শিশু খেলনা মেরামত করতে আসত, অরুণাভ প্রথমেই তাকে জিজ্ঞাসা করতেন, “তোমার খেলনাটা কীভাবে ভাঙল?”

কেউ বলত, ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করতে গিয়ে ছুড়ে ফেলেছে। কেউ বলত, খেলতে খেলতে হাত থেকে পড়ে গেছে। আবার কেউ চুপ করে থাকত।

অরুণাভ কখনও বকাঝকা করতেন না। তিনি বলতেন, “ভুল করলে সমস্যা নেই। কিন্তু ভুল থেকে কিছু শিখলে তবেই লাভ।”

একদিন দোকানে এল আট বছরের মেয়ে পিউ। তার হাতে ছিল একটি কাঠের রেলগাড়ি। গাড়িটির সামনের অংশ ভেঙে গিয়েছিল, আর একটি চাকা খুলে পড়েছিল।

পিউ গাড়িটি টেবিলে রেখে বলল, “কাকু, এটা ঠিক করে দেবেন? বাবা জন্মদিনে দিয়েছিল।”

অরুণাভ খেলনাটি হাতে নিয়ে দেখলেন। কাঠের গায়ে ছোট ছোট আঁচড়, রঙ উঠে যাওয়া জায়গা, আর একটি কোণে পেনসিল দিয়ে লেখা—‘পিউ’।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “এটা কীভাবে ভাঙল?”

পিউ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি রাগ করে মেঝেতে ছুড়ে মেরেছিলাম। আমার বন্ধু রিয়া খেলনাটা নিতে চেয়েছিল। আমি দিতে চাইনি। তারপর বাবা আমাকে বকেছিল। রাগে আরও জোরে ছুড়ে ফেলি।”

অরুণাভ গাড়িটি নামিয়ে রাখলেন।

“তুমি কি খেলনাটা ঠিক করতে চাও, নাকি শুধু আগের মতো দেখতে চাও?”

পিউ অবাক হয়ে বলল, “দুটোই চাই!”

অরুণাভ হেসে বললেন, “তাহলে তোমাকেও একটু কাজ করতে হবে।”

তিনি পিউকে একটি ছোট কাঠের টুকরো, আঠা ও কয়েকটি সরঞ্জাম দেখালেন। কীভাবে ভাঙা অংশের মাপ নিতে হয়, কীভাবে চাকা বসাতে হয়, তা ধীরে ধীরে শেখাতে লাগলেন। পিউ প্রথমে অস্থির হয়ে পড়ছিল। আঠা ঠিক জায়গায় লাগছিল না, চাকা বারবার বেঁকে যাচ্ছিল। কিন্তু অরুণাভ তাকে তাড়া দিলেন না।

প্রায় এক ঘণ্টা পরে রেলগাড়িটি আবার দাঁড়াল চারটি চাকার ওপর। আগের মতো নিখুঁত ছিল না, কিন্তু চলছিল।

পিউ আনন্দে গাড়িটিকে টেবিলের ওপর চালিয়ে দিল।

“কাকু, এখন কি আমি এটা রিয়াকে দেখাতে পারি?”

অরুণাভ বললেন, “অবশ্যই। আর যদি তুমি চাও, একদিন ওকে সঙ্গে নিয়ে এসে দুজনে মিলে নতুন কিছু বানাতে পারো।”

পরের সপ্তাহে পিউ সত্যিই রিয়াকে নিয়ে এল। দুজনে মিলে পুরোনো বাক্স, বোতলের ঢাকনা ও কাঠের টুকরো দিয়ে একটি ছোট্ট ট্রেন বানাল। দোকানে বসে কাজ করতে করতে তাদের ঝগড়ার কথাও আর মনে রইল না।

এরপর থেকে দোকানে একটি নতুন ব্যবস্থা চালু হল। যে শিশুরা চাইত, তারা নিজেরাই নিজেদের খেলনা মেরামত করতে শিখতে পারত। অরুণাভ তাদের বুঝিয়ে দিতেন, কোন জিনিস নিরাপদে মেরামত করা যায়, আর কোন ক্ষেত্রে বড়দের সাহায্য দরকার। ধারালো সরঞ্জাম ও বৈদ্যুতিক অংশের কাজ তিনি নিজেই করতেন।

ধীরে ধীরে পাড়ার অনেক শিশু সেখানে আসতে শুরু করল। কেউ খেলনা সারাত, কেউ পুরোনো জিনিস দিয়ে নতুন কিছু বানাত। তারা শিখল, নিজের জিনিসের যত্ন নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনই অন্যের জিনিসের প্রতিও সম্মান থাকা দরকার।

একদিন এক অভিভাবক অরুণাভকে বললেন, “আপনি তো শুধু খেলনা মেরামত করছেন না, বাচ্চাদের স্বভাবও বদলে দিচ্ছেন!”

অরুণাভ মৃদু হেসে বললেন, “আমি ওদের স্বভাব বদলাই না। শুধু একটু সময় দিই, যাতে ওরা নিজেরাই বুঝতে পারে—রাগের মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফল কী হতে পারে।”

বছর ঘুরে গেল। দোকানটি বড় হয়নি, আয়ও খুব বেশি ছিল না। কিন্তু তার দরজার পাশে একটি কাঠের ফলক ঝুলত। সেখানে লেখা ছিল—

‘ভাঙা জিনিস নিয়ে আসুন। নতুন করে গড়ার চেষ্টা করুন।’

অরুণাভ জানতেন, সব খেলনা মেরামত করা যায় না। কিছু জিনিস সত্যিই আর আগের অবস্থায় ফেরে না। তবু যতক্ষণ চেষ্টা করার সুযোগ আছে, ততক্ষণ হাল ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

আর পিউ? সে বড় হয়ে খেলনা ডিজাইনার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। তার প্রথম নকশার খাতার প্রথম পাতায় সে লিখেছিল—‘যে জিনিস ভেঙে যায়, তার গল্প সেখানেই শেষ হয় না।’

শিক্ষা: রাগের মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় অনুশোচনার কারণ হয়। ধৈর্য, যত্ন ও দায়িত্ববোধ আমাদের ভুল সংশোধন করতে শেখায়। আর কোনও কিছু মেরামত করার চেষ্টা শুধু জিনিসকে নয়, সম্পর্ককেও নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ দেয়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *