Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : ঘড়ির কাঁটা যখন থেমে যায় (প্রথম পর্ব: রাত বারোটার সাক্ষী)।

শহরের পুরোনো ঘড়িগুলো নাকি শুধু সময় দেখায় না, কিছু কিছু ঘড়ি মানুষের গোপন কথাও মনে রাখে।

কথাটা প্রথম শুনেছিল নীলাঞ্জনা তার দাদুর মুখে। তখন তার বয়স মাত্র দশ। দাদু ছিলেন ঘড়ি সারানোর কারিগর। উত্তর কলকাতার একটি সরু গলির শেষে তাঁর ছোট্ট দোকান ছিল—‘সময়ঘর’। দোকানের দেওয়ালজুড়ে ঝুলত নানা আকারের ঘড়ি। কারও কাঠের গায়ে খোদাই করা ফুল, কারও কাচে আঁকা পাখি, আবার কোনও কোনও ঘড়ির কাঁটা এত সূক্ষ্ম যে দূর থেকে মনে হতো, কাচের ভেতরে দুটি কালো সুতো ঝুলছে।

দাদু বলতেন, “মানুষ ভুলে যায়, নীলা। কিন্তু সময় কখনও কিছু ভুলে যায় না।”

নীলাঞ্জনা তখন কথাটার অর্থ বুঝত না। তার কাছে ঘড়ি মানেই স্কুলে যাওয়ার সময়, পরীক্ষার ঘণ্টা, জন্মদিনের অপেক্ষা কিংবা সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার তাড়া।

কিন্তু আজ, পনেরো বছর পর, সেই কথাটাই তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হয়ে ফিরে এল।

রাত তখন এগারোটা আটান্ন।

কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে বসে নীলাঞ্জনা তার মায়ের শয্যার পাশে অপেক্ষা করছিল। মা, সুদেষ্ণা, গত তিন দিন ধরে কোমায়। চিকিৎসকেরা স্পষ্ট কিছু বলতে পারছেন না। কখনও বলছেন, অবস্থার উন্নতি হচ্ছে, আবার কখনও বলছেন, পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নীলাঞ্জনা মায়ের হাত ধরে বসে ছিল।

“মা, তুমি একবার চোখ খোলো। আমার সঙ্গে কথা বলো। তুমি তো বলেছিলে, দাদুর দোকানের চাবিটা আমাকে দেবে। কতদিন হয়ে গেল দোকানটা বন্ধ। আমি আবার খুলব, মা। তুমি শুধু একবার উঠে বসো।”

কোনও উত্তর এল না।

বিছানার পাশে রাখা মনিটরে নিয়মিত শব্দ হচ্ছিল।

বিপ।

বিপ।

বিপ।

ঠিক রাত বারোটা বাজতেই হাসপাতালের করিডরের সব আলো একসঙ্গে নিভে গেল।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

তারপর আবার আলো জ্বলে উঠল।

নীলাঞ্জনা প্রথমে ভাবল, বিদ্যুতের সমস্যা। কিন্তু তার পরেই সে শুনতে পেল একটি অদ্ভুত শব্দ।

টং।

একটা ঘড়ি বাজল।

সে চারদিকে তাকাল। হাসপাতালের ঘরে কোনও দেওয়ালঘড়ি নেই। তার নিজের হাতঘড়িটাও নষ্ট, কাঁটা আটকে আছে রাত এগারোটা বেয়াল্লিশে।

তবু শব্দটা স্পষ্ট।

টং।

টং।

টং।

বারোবার ঘণ্টা বাজার পর মনিটরের শব্দ থেমে গেল।

নীলাঞ্জনা চমকে উঠে দাঁড়াল।

“নার্স! ডাক্তার!”

সে মায়ের হাত চেপে ধরল। মনিটরের পর্দায় রেখা এক মুহূর্তের জন্য সোজা হয়ে গিয়েছিল। তারপর আবার ওঠানামা শুরু হলো।

ঠিক তখনই মায়ের আঙুল নড়ে উঠল।

নীলাঞ্জনা ঝুঁকে পড়ল।

“মা?”

সুদেষ্ণার ঠোঁট সামান্য কাঁপল। বহু কষ্টে তিনি চোখ খুললেন। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা, কিন্তু আতঙ্কে ভরা।

“নীলা…”

“মা, আমি এখানে আছি।”

সুদেষ্ণা তার হাত এমন শক্ত করে ধরলেন যে নীলাঞ্জনা ব্যথায় কেঁপে উঠল।

“দাদুর দোকান… খুলিস না।”

নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে তাকাল।

“কী বলছ, মা?”

“ঘড়িটা… বারোটার আগে থামাতে হবে।”

“কোন ঘড়ি?”

মায়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“যে ঘড়িতে… তোর বাবার মৃত্যুর সময় লেখা আছে।”

নীলাঞ্জনা কিছু বলার আগেই সুদেষ্ণা আবার চোখ বন্ধ করে ফেললেন।

মনিটরে শব্দ স্বাভাবিক হয়ে এল।

কয়েক মিনিট পর চিকিৎসক এসে জানালেন, রোগীর অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল। কিন্তু নীলাঞ্জনার মাথার মধ্যে তখন শুধু একটি বাক্য ঘুরছিল—

‘তোর বাবার মৃত্যুর সময় লেখা আছে।’

তার বাবা অরিন্দম সেন মারা গিয়েছিলেন পনেরো বছর আগে।

একটি সড়ক দুর্ঘটনায়।

অন্তত এতদিন নীলাঞ্জনা সেটাই জানত।


পরদিন সকালে নীলাঞ্জনা বাড়ি ফিরল। রাতভর হাসপাতালের চেয়ারে বসে থাকার কারণে শরীর ভেঙে গেছে। কিন্তু ঘুমানোর মতো মানসিক অবস্থা তার ছিল না।

বাড়ির দরজা খুলতেই সে দেখল, টেবিলের ওপর একটি বাদামি খাম রাখা।

খামটা কে রেখে গেছে, সে জানে না। বাড়িতে তাদের সঙ্গে আর কেউ থাকে না। কাজের মহিলা দুপুরে আসেন, দারোয়ান নিচের ঘরে থাকেন। দরজা বন্ধ করে যাওয়ার সময় নীলাঞ্জনা নিজেই তালা লাগিয়েছিল।

খামের ওপর লেখা—

‘নীলাঞ্জনার জন্য। জরুরি।’

ভেতরে ছিল একটি ছোট্ট পিতলের চাবি এবং পুরোনো একটি ছবি।

ছবিতে তার দাদু হরিহর সেন দাঁড়িয়ে আছেন ‘সময়ঘর’ দোকানের সামনে। পাশে নীলাঞ্জনার বাবা অরিন্দম। দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি অচেনা মেয়ে।

মেয়েটির বয়স নীলাঞ্জনার কাছাকাছি। পরনে সাদা পোশাক, গলায় কালো ফিতে। তার চোখ দুটো ক্যামেরার দিকে নয়, বরং ছবির বাইরে কোথাও তাকিয়ে আছে।

ছবির পেছনে লেখা—

‘১৮ অক্টোবর ২০১১। শেষবারের মতো সবাই একসঙ্গে।’

নীলাঞ্জনা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

১৮ অক্টোবর ২০১১।

সেই দিনই তার বাবার মৃত্যুর খবর এসেছিল।

কিন্তু ছবিতে বাবা বেঁচে আছেন।

ছবির সময় আর তারিখের মধ্যে কোনও অসংগতি নেই। পেছনে দাদুর দোকানের ক্যালেন্ডারেও একই তারিখ দেখা যাচ্ছে।

তাহলে ছবিটা কি বাবার মৃত্যুর আগের?

কিন্তু অচেনা মেয়েটি কে?

নীলাঞ্জনা ছবিটা ফোনে তুলে তার স্কুলের পুরোনো বন্ধু অয়নকে পাঠাল। অয়ন এখন পুলিশ বিভাগের অপরাধ-তথ্য বিশ্লেষণ শাখায় কাজ করে। ছোটবেলা থেকে নীলাঞ্জনার পরিবারের সঙ্গে তার পরিচয়।

কিছুক্ষণ পর অয়নের ফোন এল।

“ছবিটা কোথায় পেলি?”

“আজ সকালে বাড়িতে এসেছে।”

“কে পাঠিয়েছে?”

“জানি না। কিন্তু একটা কথা বল—মেয়েটাকে চিনতে পারছিস?”

অয়ন চুপ করে রইল।

“অয়ন?”

“নীলা, তুই কি নিশ্চিত, ছবিটা আসল?”

“কেন?”

“কারণ মেয়েটাকে আমি আগে দেখেছি।”

নীলাঞ্জনার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

“কোথায়?”

“তোর বাবার পুরোনো কেসের ফাইলে।”

“কী বলছিস?”

অয়ন ধীরে ধীরে বলল, “তোর বাবার দুর্ঘটনার তদন্তের সময় একটি অজ্ঞাতপরিচয় মেয়ের কথা উঠে এসেছিল। পুলিশ সন্দেহ করেছিল, দুর্ঘটনার আগে তোর বাবা তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু মেয়েটির কোনও পরিচয় পাওয়া যায়নি। পরে মামলাটা বন্ধ হয়ে যায়।”

“তাহলে ছবিতে সে আছে কীভাবে?”

“সেটাই তো জানতে হবে।”

নীলাঞ্জনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি দাদুর দোকানে যাচ্ছি।”

“একাই যাবি না।”

“তুই আসতে পারবি?”

“এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাব।”

ফোন কেটে নীলাঞ্জনা আলমারির ওপর রাখা ছোট বাক্সটা নামাল। তার মধ্যে দাদুর রেখে যাওয়া কয়েকটি পুরোনো জিনিস ছিল। দাদু মারা যাওয়ার পর মা বাক্সটা খুলতে দেননি। বলেছিলেন, সময় হলে সব বুঝিয়ে দেবেন।

কিন্তু সেই সময় আর আসেনি।

বাক্সের মধ্যে ছিল একটি পুরোনো পকেটঘড়ি, কয়েকটি মরচে ধরা চাবি, একটি কালো নোটবুক এবং দাদুর হাতের লেখা ছোট্ট চিরকুট।

চিরকুটে লেখা—

‘যেদিন আমার দোকানের ঘড়ি নিজে থেকে বারোটা বাজাবে, সেদিন বুঝবি, কেউ ফিরে এসেছে।’

নীলাঞ্জনা পকেটঘড়িটা হাতে নিল।

ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে রাত বারোটা সতেরো মিনিটে।

কিন্তু ঘড়ির পেছনের ঢাকনা খুলতেই সে দেখতে পেল, ভেতরে খুব ছোট অক্ষরে খোদাই করা একটি নাম—

‘মীরা।’


‘সময়ঘর’ দোকানটি বহু বছর ধরে বন্ধ।

উত্তর কলকাতার পুরোনো গলির শেষে দাঁড়িয়ে থাকা দোকানটির কাঠের সাইনবোর্ডে ধুলো জমেছে। দরজার সামনে শুকনো পাতার স্তূপ। জানলার কাচের ভেতর দিয়ে দেখা যায়, দেওয়ালে এখনও অসংখ্য ঘড়ি ঝুলছে।

কেউ কোনও ঘড়ি নামায়নি।

কেউ দোকান পরিষ্কার করেনি।

দাদু মারা যাওয়ার পর মা একবার দোকান বিক্রি করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিন পরেই অদ্ভুতভাবে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। তারপর থেকে দোকানের কথা উঠলেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন।

নীলাঞ্জনা পিতলের চাবিটা তালায় ঢোকাল।

চাবি ঘুরতেই তালা খুলে গেল।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ধুলো আর পুরোনো কাঠের গন্ধ নাকে এল। জানলার পর্দা টেনে রাখা। ঘরের মধ্যে দিনের আলো ঢুকছে না। নীলাঞ্জনা মোবাইলের টর্চ জ্বালল।

দেওয়ালে ঝুলছে অন্তত পঞ্চাশটি ঘড়ি।

কোনওটির কাঁটা এগোচ্ছে না।

কোনওটির কাঁটা থেমে আছে তিনটে সাত মিনিটে।

কোনওটি আবার ছয়টা বাজিয়ে আটকে আছে।

দোকানের মাঝখানে একটা বড় পেন্ডুলাম ঘড়ি। কালো কাঠের গায়ে রুপোর নকশা। কাচের ভেতরে দুলতে থাকা পেন্ডুলামটা স্থির।

নীলাঞ্জনা এগিয়ে গিয়ে ঘড়িটার নিচে হাঁটু গেড়ে বসল।

কাঠের গায়ে একটি ছোট্ট লেখা খোদাই করা—

‘যে সময়ে মৃত্যু ঘটে, সেই সময়েই সত্যের জন্ম।’

সে পেন্ডুলাম ঘড়ির দরজা খুলল। ভেতরে পেন্ডুলামের পেছনে একটি ছোট খোপ। খোপের মধ্যে ভাঁজ করা কাগজ এবং একটি কালো চাবি।

কাগজটা খুলতেই দাদুর হাতের লেখা দেখতে পেল।

‘নীলা,

যদি তুই এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব আমি যে সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছিলাম, সেটা আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

তোর বাবার মৃত্যু কোনও দুর্ঘটনা ছিল না।

কিন্তু তাকে কে হত্যা করেছিল, তা জানার আগে তোকে জানতে হবে, মীরা কে।

মীরাকে খুঁজে পেলে তুই জানতে পারবি, কেন ১৮ অক্টোবর ২০১১-র রাত বারোটায় এই দোকানের সব ঘড়ি একসঙ্গে থেমে গিয়েছিল।

কিন্তু সাবধান, নীলা। যে সময় একবার থেমে যায়, তাকে আবার চালু করলে সবকিছু আগের মতো থাকে না।’

নীলাঞ্জনার হাত কেঁপে উঠল।

বাবার মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না!

সে আবার চিঠির দিকে তাকাল। কাগজের নিচে আরও একটি লাইন লেখা—

‘কালো চাবি দিয়ে ঘরের নীচের দরজা খুলবি। তবে তার আগে নিজের জন্মের শংসাপত্রটা দেখে নিস।’

নীলাঞ্জনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার জন্মের শংসাপত্র?

এতে আবার কী আছে?

ঠিক তখনই দোকানের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

নীলাঞ্জনা দরজার দিকে তাকাল।

একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। মাথায় ধূসর চুল, গায়ে পুরোনো কোট, চোখে মোটা চশমা। তাঁকে দেখে নীলাঞ্জনার প্রথমে মনে হলো, হয়তো কোনও পুরোনো ক্রেতা।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকলেন।

“দোকানটা খুলেছ?”

“জি। আপনি কি দাদুকে চিনতেন?”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

“তোর দাদুকে আমি পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে চিনতাম। এই দোকানের প্রতিটি ঘড়ির ইতিহাস আমার জানা।”

“আপনি কে?”

“আমার নাম শশাঙ্ক রায়। একসময় এই দোকানে কাজ করতাম।”

নীলাঞ্জনা অবাক হলো।

“দাদু তো কখনও আপনার কথা বলেননি।”

শশাঙ্কবাবুর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“সব কথা সবাইকে বলা যায় না, মা।”

তিনি দোকানের মাঝখানের বড় ঘড়িটার দিকে তাকালেন।

“এটা এখনও আছে?”

“আপনি ঘড়িটাকে চেনেন?”

“চিনি। এই ঘড়িটাই তোর বাবার মৃত্যুর সাক্ষী।”

নীলাঞ্জনার মনে হলো, বুকের ভেতরটা কেউ চেপে ধরেছে।

“আপনি জানেন, আমার বাবা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?”

শশাঙ্কবাবু ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“আমি জানি, সেদিন রাতে তিনি এখানে এসেছিলেন। রাত বারোটা সতেরো মিনিটে এই ঘড়িটা থেমে যায়। আর ঠিক তার সাত মিনিট পর খবর আসে, তোর বাবা মারা গেছেন।”

“তাহলে ঘড়িটা থেমেছিল কেন?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। বরং নীলাঞ্জনার হাতে থাকা পকেটঘড়িটার দিকে তাকালেন।

“এটা কোথায় পেলি?”

“দাদুর বাক্সে।”

“পেছনে নামটা দেখেছিস?”

“মীরা।”

শশাঙ্কবাবু চোখ বন্ধ করলেন।

“তাহলে সে ফিরে এসেছে।”

“কে ফিরে এসেছে?”

বৃদ্ধ উত্তর দেওয়ার আগেই দোকানের সব ঘড়ি একসঙ্গে শব্দ করতে শুরু করল।

টিক।

টিক।

টিক।

যে ঘড়িগুলো এত বছর ধরে থেমে ছিল, সেগুলোর কাঁটা ধীরে ধীরে নড়তে লাগল।

দেওয়ালের ঘড়ি, টেবিলের ঘড়ি, পেন্ডুলাম ঘড়ি—সব একসঙ্গে চলতে শুরু করল।

শশাঙ্কবাবু আতঙ্কে পিছিয়ে গেলেন।

“না! এটা হওয়ার কথা নয়!”

নীলাঞ্জনা চিৎকার করে বলল, “কী হচ্ছে?”

বৃদ্ধ তার হাত চেপে ধরলেন।

“দোকান থেকে বেরিয়ে যা! এখনই!”

“কিন্তু—”

“যদি বাঁচতে চাস, এখনই বেরিয়ে যা!”

ঠিক তখনই বড় ঘড়িটার কাচের ভেতর থেকে একটা শব্দ এল।

টক।

তারপর কাচের ওপর ফুটে উঠল কয়েকটি অক্ষর।

‘মীরা ফিরে এসেছে।’

নীলাঞ্জনা পেছনে সরে গেল।

দোকানের দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।

আর সব ঘড়ির কাঁটা একসঙ্গে এসে থামল রাত বারোটা সতেরো মিনিটে।


দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে নীলাঞ্জনা চিৎকার করছিল।

“দরজা খুলুন! কেউ আছেন?”

শশাঙ্কবাবু বড় ঘড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে কিছু বলছিলেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপছে। মুখে আতঙ্ক।

নীলাঞ্জনা ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল, দোকানের পেছনের দেওয়ালে একটা সরু দরজা দেখা যাচ্ছে। এতক্ষণ সেখানে কোনও দরজা ছিল না। কাঠের ওপর কালো রঙে লেখা—

‘নীচে নামার আগে নিজের নাম মনে করো।’

নীলাঞ্জনা দরজার কাছে গেল।

“এটা কী?”

শশাঙ্কবাবু চিৎকার করে উঠলেন, “ওটা খুলিস না!”

“কেন?”

“ওখানে যা আছে, সেটা দেখার জন্য তুই প্রস্তুত নোস।”

“আমার বাবা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন, সেটা জানতে চাই। আমার মা কেন ভয় পাচ্ছেন, জানতে চাই। মীরা কে, সেটাও জানতে চাই। আমাকে আর কেউ আটকাতে পারবে না।”

নীলাঞ্জনা কালো চাবিটা তালায় ঢোকাল।

চাবি ঘোরাতেই দরজা খুলে গেল।

ভেতরে সরু সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে। সিঁড়ির দুপাশের দেওয়ালে অসংখ্য ঘড়ি বসানো। প্রতিটি ঘড়ির কাচের পেছনে একটা করে ছবি।

কোথাও একটি শিশুর জন্মের দৃশ্য।

কোথাও হাসপাতালের করিডর।

কোথাও একটি গাড়ি রাস্তার ধারে উল্টে পড়ে আছে।

আর একটি ঘড়ির পেছনে নীলাঞ্জনা দেখল নিজের ছবি।

ছবিতে সে ছোট্ট মেয়ে। বয়স পাঁচ বা ছয়। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে তার বাবা অরিন্দম দাঁড়িয়ে।

কিন্তু ছবির তারিখ—

১৮ অক্টোবর ২০১১।

বাবার মৃত্যুর দিন।

নীলাঞ্জনা থমকে দাঁড়াল।

“আমি সেদিন হাসপাতালে ছিলাম?”

শশাঙ্কবাবু পেছন থেকে বললেন, “তোর মনে নেই?”

“না। আমি তো ভেবেছিলাম, বাবা দুর্ঘটনার সময় অফিসে ছিলেন। আমি বাড়িতে ছিলাম।”

“তোর মা তোকে সেটাই বলেছিলেন।”

নীলাঞ্জনার গলা শুকিয়ে এল।

“সত্যিটা কী?”

বৃদ্ধ মাথা নিচু করলেন।

“সত্যিটা জানতে হলে শেষ ঘড়িটা দেখতে হবে।”

সিঁড়ির শেষ প্রান্তে একটা ছোট ঘর। ঘরের মাঝখানে কাচের বাক্সে রাখা একটি ঘড়ি। ঘড়িটার কাঠের গায়ে খোদাই করা—

‘অরিন্দম সেন—শেষ সময়।’

কাচের বাক্সের পাশে একটি ফাইল।

নীলাঞ্জনা ফাইল খুলতেই তার জন্মের শংসাপত্র বেরিয়ে এল।

নাম—নীলাঞ্জনা সেন।

জন্মতারিখ—১৮ অক্টোবর ২০১১।

পিতার নাম—অরিন্দম সেন।

মাতার নাম—সুদেষ্ণা সেন।

নীলাঞ্জনা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।

কিন্তু ফাইলের পরের পাতায় ছিল আরেকটি জন্মের শংসাপত্র।

একই নাম।

একই জন্মতারিখ।

একই বাবা-মা।

শুধু একটি পার্থক্য।

দ্বিতীয় শংসাপত্রে লেখা—

‘মৃত।’

নীলাঞ্জনার পা থেকে যেন মাটি সরে গেল।

“এটা কী?”

শশাঙ্কবাবু ধীরে ধীরে বললেন, “তোর জন্মের দিন দুটি শিশু জন্মেছিল। একটি শিশু বেঁচে ছিল, অন্যটি মারা গিয়েছিল বলে নথিতে লেখা হয়। কিন্তু হাসপাতালের নার্সদের একজন দাবি করেছিলেন, দুটি শিশুই জীবিত ছিল।”

“তাহলে অন্য শিশুটি কোথায়?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

নীলাঞ্জনা কাচের বাক্সের ভেতরের ঘড়িটার দিকে তাকাল।

কাঁটা স্থির—বারোটা সতেরো মিনিট।

তারপর সে দেখল, ঘড়ির নিচে একটা ছোট খোপ আছে। খোপ খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি লাল ফিতে এবং ছোট্ট একটি কাগজ।

কাগজে লেখা—

‘মীরা সেন। জন্ম: ১৮ অক্টোবর ২০১১।’

নীলাঞ্জনার মাথা ঘুরে উঠল।

মীরা তার যমজ বোন?

কিন্তু তার তো কোনও বোন ছিল না!

সে কাগজটা হাতে নিয়ে শশাঙ্কবাবুর দিকে তাকাল।

“আপনি জানতেন?”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“আমি শুধু জানি, তোর বাবা তোর বোনকে খুঁজতে গিয়েছিলেন। আর সেই রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।”

“তাহলে মীরা কোথায়?”

শশাঙ্কবাবু মুখ খুললেন, কিন্তু ঠিক সেই সময় ওপরের ঘড়িগুলো আবার বাজতে শুরু করল।

একটি।

দুটি।

তিনটি।

ক্রমশ সব ঘড়ির কাঁটা পিছনের দিকে ঘুরতে লাগল।

নীলাঞ্জনা কাচের বাক্সের দিকে তাকিয়ে দেখল, ঘড়ির কাঁটা বারোটা সতেরো থেকে পিছিয়ে এগারোটা পঞ্চান্নতে এসে থামল।

তারপর ঘরের আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে একটি শিশুর কণ্ঠ ভেসে এল।

“দিদি…”

নীলাঞ্জনার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল।

কণ্ঠটা আবার শোনা গেল।

“দিদি, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না?”

“কে তুমি?”

অন্ধকারের মধ্যে যেন কেউ হাসল।

“আমি মীরা। তুমি আমাকে ভুলে গেছ।”

নীলাঞ্জনা কাঁপা গলায় বলল, “তুমি কোথায়?”

“তোমার খুব কাছেই।”

“আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না!”

“কারণ তুমি এখনও সেই রাতটাকে মনে করতে পারোনি।”

হঠাৎ ঘরের এক কোণে আলো জ্বলে উঠল।

সেখানে দাঁড়িয়ে একটি ছোট্ট মেয়ে। সাদা পোশাক, চুলে লাল ফিতে, হাতে একটি পকেটঘড়ি।

নীলাঞ্জনা তার দিকে তাকিয়ে রইল।

মেয়েটির মুখ অবিকল তার নিজের ছোটবেলার মতো।

মীরা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল, “দিদি, তুমি কি মনে করতে পারো, সেদিন বাবা আমাদের দুজনকে নিয়ে কোথায় গিয়েছিলেন?”

নীলাঞ্জনা কিছু বলতে পারল না।

মীরা পকেটঘড়িটা তার হাতে দিল।

“তাহলে মনে করিয়ে দিই।”

ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে শুরু করল।

টিক।

টিক।

টিক।

আর ঘরের দেওয়ালে একের পর এক দৃশ্য ফুটে উঠতে লাগল।

একটি হাসপাতাল।

একটি রাত।

দুটি শিশু।

একজন আতঙ্কিত বাবা।

একজন কাঁদতে থাকা মা।

তারপর একটি গাড়ি ছুটে চলেছে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে।

গাড়ির চালকের আসনে অরিন্দম সেন।

পেছনের সিটে দুটি ছোট মেয়ে।

একটি মেয়ে কাঁদছে।

অন্যটি চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে।

হঠাৎ সামনে একটি ট্রাক এসে পড়ল।

চিৎকার।

ধাক্কা।

কাচ ভাঙার শব্দ।

তারপর সব অন্ধকার।

নীলাঞ্জনা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তার স্মৃতির মধ্যে যেন কোথাও একটা দরজা খুলে গেল।

সেই রাত।

সেই গাড়ি।

বাবার রক্তাক্ত মুখ।

আর তার নিজের কণ্ঠ—

‘বাবা, মীরাকে বাঁচাও!’

নীলাঞ্জনা কাঁদতে কাঁদতে মাথা চেপে ধরল।

“না… না… আমি কিছু মনে করতে চাই না!”

মীরা তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

“তুমি ভুলে গেছ, দিদি। কিন্তু আমি ভুলিনি।”

“তুমি কি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলে?”

মীরা উত্তর দিল না।

বরং বলল, “বাবা আমাকে বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু তুমি আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলে।”

নীলাঞ্জনা মাথা তুলে তাকাল।

“আমি? আমি তো শিশু ছিলাম!”

মীরার চোখে জল এসে গেল।

“আমি জানি। কিন্তু যে মানুষটা আমাদের দুজনকে আলাদা করেছিল, সে তোমাকে বলেছিল আমি মারা গেছি।”

“কে?”

মীরা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল।

সিঁড়ির মুখে একজন দাঁড়িয়ে আছেন।

সুদেষ্ণা সেন।

নীলাঞ্জনার মা।

কিন্তু তিনি তো হাসপাতালে কোমায় ছিলেন!

নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।

সুদেষ্ণা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন। তাঁর মুখে কোনও অসুস্থতার চিহ্ন নেই। চোখে এক অদ্ভুত কঠোরতা।

“মীরা, আর নয়।”

মীরা পিছিয়ে গেল।

“মা, তুমি আবার আমাকে থামাতে এসেছ?”

নীলাঞ্জনা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি এখানে কীভাবে এলে? তুমি তো হাসপাতালে!”

সুদেষ্ণা তার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না।

তিনি নীলাঞ্জনার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

“নীলা, তুই যা দেখেছিস, তার সবটা সত্যি নয়।”

নীলাঞ্জনার গলা কেঁপে উঠল।

“তাহলে সত্যিটা কী?”

সুদেষ্ণা চোখ বন্ধ করলেন।

“সত্যিটা হলো, তোর বাবা দুর্ঘটনায় মারা যাননি।”

নীলাঞ্জনা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

“তাহলে?”

সুদেষ্ণা ধীরে ধীরে বললেন—

“তোর বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল। আর সেই হত্যার সাক্ষী ছিলে তুই।”

নীলাঞ্জনা পেছনে সরে গেল।

“আমি?”

“হ্যাঁ। তুই। আর মীরা।”

মীরা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “মা, এবার সব বলে দাও।”

সুদেষ্ণা মেয়েদের দুজনের দিকে তাকালেন।

“সেদিন তোর বাবা জানতে পেরেছিলেন, হাসপাতালের নথিতে দুটি শিশুর পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছে। তিনি পুলিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নথি বদলানোর সঙ্গে যুক্ত ছিল এমন একজন, যাকে আমরা পরিবারের মানুষ বলে বিশ্বাস করতাম।”

“কে?” নীলাঞ্জনা জিজ্ঞেস করল।

সুদেষ্ণা উত্তর দেওয়ার আগেই ওপরের ঘড়িগুলো আবার একসঙ্গে বাজতে শুরু করল।

টং।

টং।

টং।

দ্বাদশ ঘণ্টার শব্দের সঙ্গে সঙ্গে ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

সুদেষ্ণার মুখের রং বদলে গেল।

“না! সে এসে গেছে!”

নীলাঞ্জনা চমকে উঠল।

“কে?”

দরজার ওপাশ থেকে একজন পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল।

“সুদেষ্ণা, দরজা খোলো। অনেক বছর হয়ে গেছে।”

সুদেষ্ণা কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে গেলেন।

মীরা নীলাঞ্জনার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল—

“দিদি, লোকটা যদি ঘরে ঢোকে, তাহলে ঘড়ির কাঁটা আবার চলতে শুরু করবে।”

“তাতে কী হবে?”

মীরা তার দিকে তাকাল।

“তাহলে আমরা সেই রাতেই ফিরে যাব।”

দরজার হাতল ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল।

বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি আবার বলল—

“নীলাঞ্জনা, তুই কি জানতে চাস, তোর বাবাকে কে মেরেছিল?”

নীলাঞ্জনা কোনও উত্তর দিল না।

লোকটি এবার হেসে উঠল।

“তাহলে আয়নাটার দিকে তাকিয়ে দেখ।”

ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো পুরোনো আয়নাটার কাচে ধীরে ধীরে একটি মুখ ফুটে উঠল।

সেই মুখ দেখে নীলাঞ্জনার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।

কারণ আয়নায় দেখা যাচ্ছে—

তার নিজের মুখ।

কিন্তু তার চোখের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি ছায়া।

একজন পুরুষের ছায়া।

যে দেখতে অবিকল তার মৃত বাবা অরিন্দম সেনের মতো।

আর আয়নার কাচের ওপর ধীরে ধীরে ফুটে উঠল চারটি শব্দ—

‘আমি এখনও বেঁচে আছি।’

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *