আয়নার গায়ে লেখা কথাগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল।
“আমি এখনও বেঁচে আছি।”
নীলাঞ্জনা সেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সামনে পুরোনো আয়না, পায়ের কাছে ধুলো জমে থাকা মেঝে, মাথার ওপরে অসংখ্য বন্ধ ঘড়ি। অথচ আয়নার ভেতরে যে ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে, তাকে সে ভুলতে পারে না। ওই মুখ, ওই চোখ, ওই কপালের পাশে কাটা দাগ—ছোটবেলায় যে মুখের ছবি সে বারবার দেখেছে, সেটাই তার বাবার মুখ।
অরিন্দম সেন।
যে মানুষটির মৃত্যু হয়েছে পনেরো বছর আগে।
“এটা কীভাবে সম্ভব?” নীলা ফিসফিস করে বলল। “বাবা তো মারা গিয়েছিলেন!”
তার পিছন থেকে পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল।
“তোমাকে যা বিশ্বাস করানো হয়েছে, তুমি সেটাকেই সত্যি বলে মেনে নিয়েছ।”
নীলা ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। ঘরের একমাত্র হলুদ আলোটা বারবার কেঁপে উঠছিল। লোকটির গায়ে কালো কোট, মাথায় সামান্য পাকা চুল, ডান হাতে রুপোর মাথাওয়ালা একটি লাঠি। তার মুখের অর্ধেকটা অন্ধকারে ঢাকা।
“আপনি কে?” নীলা প্রশ্ন করল।
লোকটি একটু এগিয়ে এল।
“যে প্রশ্নটা পনেরো বছর আগে করা উচিত ছিল, সেটা আজ করছিস?”
‘করছিস’ সম্বোধনটা শুনে নীলার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। এইভাবে তাকে শেষবার কেউ ডেকেছিল তার বাবা। অথচ এই লোকটির মুখের সঙ্গে বাবার মুখের কোনো মিল নেই।
“আপনি আমার বাবাকে চিনতেন?”
“চিনতাম। তোমার বাবাকে, তোমার মাকে, তোমার দাদুকে। এমনকি তোমার সেই বোনকেও, যার অস্তিত্ব পৃথিবীর কাছে মুছে ফেলা হয়েছে।”
মীরার নাম শুনতেই নীলা এক পা পিছিয়ে গেল।
“মীরা কোথায়?”
লোকটি উত্তর দিল না। বরং আয়নার দিকে তাকাল।
“ওকে দেখতে পাচ্ছিস?”
নীলা ফিরে তাকাল। আয়নায় এবার তার নিজের মুখ ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু কাচের ঠিক মাঝখানে সরু একটি ফাটল দেখা দিয়েছে। সেই ফাটলটি ওপর থেকে নিচে নেমে এসে দুটো অসমান অংশে আয়নাটাকে ভাগ করেছে।
“একটা কথা মনে রাখিস,” লোকটি বলল, “সময় কখনও মিথ্যে বলে না। মানুষ সময়ের হিসাব বদলে দেয়।”
“আমার বাবাকে কে মেরেছে?”
“এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে তোকে প্রথমে জানতে হবে, সেদিন গাড়িতে ঠিক কতজন ছিল।”
নীলা চোখ বন্ধ করল।
একটা ভাঙাচোরা স্মৃতি তার মাথার ভেতরে জেগে উঠল।
বৃষ্টি পড়ছিল। গাড়ির কাচে জল গড়িয়ে পড়ছিল। সামনের আসনে বাবা গাড়ি চালাচ্ছেন। পিছনের আসনে দুটো ছোট্ট মেয়ে। একটির হাতে লাল রঙের খেলনা ঘড়ি, অন্যটির হাতে নীল ফিতে বাঁধা পুতুল।
তারপর হঠাৎ ব্রেকের শব্দ।
চিৎকার।
একটি ধাক্কা।
আর অন্ধকার।
নীলা চোখ খুলে হাঁপাতে লাগল।
“গাড়িতে আমরা তিনজন ছিলাম,” সে বলল। “আমি, মীরা আর বাবা।”
লোকটি মাথা নাড়ল।
“না। গাড়িতে চারজন ছিল।”
“চতুর্থ জন কে?”
“যে লোকটি দুর্ঘটনার পরে পুলিশকে খবর দিয়েছিল। যে লোকটি তোমাদের হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিল। যে লোকটি তোমার বাবার মৃত্যুর কাগজে সাক্ষী হিসেবে সই করেছিল।”
নীলার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“শশাঙ্ক রায়?”
লোকটির মুখে প্রথমবারের মতো অদ্ভুত একটা হাসি ফুটল।
“তুই নামটা নিজেই বললি।”
ঠিক তখনই ঘরের কোথাও একটা ঘড়ি বেজে উঠল।
ঢং।
ঢং।
ঢং।
নীলা ঘড়ির দিকে তাকাল। দেওয়ালের কোণে ঝুলে থাকা বিশাল পেন্ডুলাম ঘড়িটির কাঁটা দাঁড়িয়ে আছে বারোটা সতেরো মিনিটে। অথচ তার ভেতর থেকে ঘণ্টার শব্দ আসছে।
“এটা কীভাবে হচ্ছে?”
“এই ঘড়িটা সময় দেখায় না,” লোকটি বলল। “এটা সেই মুহূর্তের সাক্ষী, যেদিন সময়কে হত্যা করা হয়েছিল।”
“আপনি কে, সেটা অন্তত বলুন!”
লোকটি আর উত্তর দিল না। সে পকেট থেকে একটি ছোট্ট ধাতব বাক্স বের করে নীলার হাতে দিল।
“তোর দাদু এটা লুকিয়ে রেখেছিলেন। শশাঙ্ক যাতে কখনও খুঁজে না পায়।”
“এর মধ্যে কী আছে?”
“তোর বাবার শেষ রেকর্ডিং।”
নীলা বাক্সটা খুলল। ভেতরে একটি পুরোনো মাইক্রোক্যাসেট, সঙ্গে ছোট্ট কাগজে লেখা একটি তারিখ—১৮ অক্টোবর, ২০১১। ক্যাসেটের গায়ে বাবার হাতের লেখায় মাত্র দুটি শব্দ:
‘নীলার জন্য।’
নীলার চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
“বাবা কি জানতেন, আমি বেঁচে থাকব?”
লোকটি এবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
“তোর বাবা জানতেন, তোকে বাঁচিয়ে রাখা হবে। কিন্তু তিনি জানতেন না, তোকে কী বানিয়ে রাখা হবে।”
কথাটা বুঝতে পারল না নীলা।
“কী বলতে চাইছেন?”
“নিজের জন্মের কাগজটা ভালো করে দেখিস। তারপর মীরার কাগজটা। দুটো কাগজে একই নাম, একই বাবা-মা, একই জন্মতারিখ। কিন্তু দুটো শিশুর পরিণতি আলাদা লেখা। এটা কেবল হাসপাতালের ভুল নয়। কেউ একজন ইচ্ছা করে তোদের পরিচয় বদলে দিয়েছিল।”
“কেন?”
“কারণ তোদের মধ্যে একজন এমন কিছু দেখেছিল, যা তার দেখা উচিত ছিল না।”
“আমি? না মীরা?”
লোকটি দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
“সেই উত্তরটা তোর নিজের স্মৃতির মধ্যে লুকিয়ে আছে।”
“দাঁড়ান!”
নীলা তার হাত ধরতে এগিয়ে গেল। কিন্তু হাত বাড়ানোর মুহূর্তে আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে একটা ধাতব শব্দ হলো। তারপর দূরে কোথাও দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ।
কয়েক সেকেন্ড পর আলো ফিরে এল।
লোকটি নেই।
দরজার বাইরে যাওয়ার পথও ফাঁকা।
শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটি ছোট্ট রুপোর বোতাম। নীলা সেটি তুলে নিল। বোতামের পেছনে খোদাই করা একটি ইংরেজি অক্ষর—‘A’।
তারপর সে নিজের হাতের দিকে তাকাল।
ধাতব বাক্সটি নেই।
ক্যাসেটটিও নেই।
শুধু সেই কাগজটা পড়ে আছে, যেখানে লেখা ছিল—‘নীলার জন্য’।
নীলা বুঝতে পারল, এই ঘরে সে একা নয়। কেউ তাকে সাহায্য করছে, কেউ তাকে ভয় দেখাচ্ছে, আর কেউ তার হাতে পৌঁছনোর আগেই প্রমাণ সরিয়ে নিচ্ছে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, সে জানে না—এই তিনজন আসলে আলাদা, নাকি একই মানুষ।
১. হাসপাতালের বিছানায় দ্বিতীয় ছায়া
ভোর চারটে নাগাদ নীলা ‘সময়ঘর’ থেকে বেরিয়ে এল।
কলকাতার উত্তর দিকের পুরোনো গলিগুলো তখনও ঘুমিয়ে। রাস্তার পাশে জমে থাকা বৃষ্টির জল, বন্ধ দোকানের শাটার, দূরে দু-একটি চায়ের দোকানে চুলা জ্বলার প্রস্তুতি। পকেটে দাদুর দেওয়া পিতলের চাবি, হাতে রুপোর বোতাম।
তার মাথার মধ্যে কেবল একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—মা কি সত্যিই হাসপাতালে অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছেন?
যদি তাই হয়, তবে একটু আগে বেসমেন্টে তিনি তার সামনে এলেন কীভাবে?
সেটা কি স্মৃতি? কল্পনা? নাকি এমন কিছু, যার ব্যাখ্যা এখনও তার জানা নেই?
নীলা সরাসরি হাসপাতালে পৌঁছল।
মায়ের কেবিনের বাইরে বসে থাকা নার্স তাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, “আপনি এত সকালে?”
“মায়ের জ্ঞান ফিরেছে?”
নার্স মাথা নাড়লেন।
“না। রাত থেকে একই অবস্থা। তবে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।”
নীলার বুক ধক করে উঠল।
“কী ঘটনা?”
“রাত বারোটা সতেরো মিনিটে আপনার মায়ের হার্ট মনিটরে কয়েক সেকেন্ডের জন্য অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। ডাক্তার পরীক্ষা করে বিশেষ কিছু পাননি। কিন্তু সেই সময় উনি চোখ খুলেছিলেন বলে একজন নার্স দাবি করেছেন।”
“উনি কিছু বলেছিলেন?”
“স্পষ্ট নয়। বারবার একটা নাম বলছিলেন।”
“কোন নাম?”
নার্স ফাইল দেখে বললেন, “অরিন্দম।”
নীলার মনে হলো, হাসপাতালের করিডরটা হঠাৎ সরু হয়ে এসেছে।
“আর কিছু?”
নার্স একটু ইতস্তত করে বললেন, “হ্যাঁ। উনি বলেছিলেন, ‘দ্বিতীয়জনকে ঘরে ঢুকতে দিও না।’ আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো প্রলাপ বকছেন।”
“দ্বিতীয়জন?”
“হ্যাঁ। দ্বিতীয়জন।”
নীলা মায়ের কেবিনে ঢুকল।
সুদেষ্ণা সেন শুয়ে আছেন। চোখ বন্ধ, মুখ ফ্যাকাশে, হাতে স্যালাইনের নল। মনিটরে নিয়মিত ওঠানামা করছে হৃদস্পন্দনের রেখা।
নীলা বিছানার পাশে বসে মায়ের হাত ধরল।
“মা, আমি নীলা। তুমি শুনতে পাচ্ছ?”
কোনও সাড়া নেই।
“তুমি বলেছিলে, দাদুর দোকান খুলতে না। কিন্তু আমি খুলেছি। সেখানে আমি মীরার কথা জানতে পেরেছি। বাবার কথা জানতে পেরেছি। তুমি আমাকে সব সত্যি বলোনি, মা।”
তার গলা কেঁপে উঠল।
“মীরা কি সত্যিই আমার বোন? ও কি বেঁচে আছে?”
সুদেষ্ণার আঙুলে সামান্য নড়াচড়া হলো।
নীলা ঝুঁকে পড়ল।
মায়ের ঠোঁট কাঁপল। অস্পষ্ট শব্দ বেরিয়ে এল।
“ঘড়ি… থামা…”
“কোন ঘড়ি, মা?”
“বারোটা… সতেরো…”
নীলা মায়ের হাত শক্ত করে ধরল।
“ওই সময়ে কী হয়েছিল?”
সুদেষ্ণা চোখ না খুলেই বললেন, “ও… ফিরে এসেছে…”
“কে ফিরে এসেছে?”
মায়ের ঠোঁট থেকে এবার যে নামটি বেরিয়ে এল, তা শুনে নীলা জমে গেল।
“অয়ন…”
ঠিক সেই মুহূর্তে কেবিনের দরজায় কেউ টোকা দিল।
নীলা মুখ তুলে তাকাল।
দরজার বাইরে অয়ন দাঁড়িয়ে।
তার হাতে একটি ফাইল, চোখে গভীর উদ্বেগ।
“নীলা, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।”
“কী হয়েছে?”
অয়ন কেবিনে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
“তোমার বাবার দুর্ঘটনার ফাইলটা আবার খুঁজে পেয়েছি।”
“তাতে কী লেখা আছে?”
অয়ন ফাইল খুলল। প্রথম পাতায় গাড়ির নম্বর, দুর্ঘটনার সময়, পুলিশের রিপোর্ট। দ্বিতীয় পাতায় হাসপাতালের নথি। তৃতীয় পাতায় একটি সাক্ষীর বিবৃতি।
নীলা পড়তে শুরু করল।
সাক্ষীর নাম—শশাঙ্ক রায়।
বিবৃতিতে লেখা ছিল, দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং দুই শিশু ছিল। পুরুষটি ঘটনাস্থলেই মারা যান। দুই শিশুকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। একজন শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল।
“এখানে তো চারজনের কথা নেই,” নীলা বলল।
“সেটাই অদ্ভুত,” অয়ন বলল। “আমি পুরোনো অ্যাম্বুল্যান্স লগ খুঁজে পেয়েছি। সেখানে লেখা আছে, ঘটনাস্থল থেকে তিনজন নয়, চারজনকে উদ্ধার করা হয়েছিল।”
“চতুর্থজন কে?”
অয়ন পরের পাতাটি বের করল।
সেখানে একটি নাম লেখা ছিল, কিন্তু কালো কালি দিয়ে সেটি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আলোয় কাগজটা কাত করে ধরতেই কয়েকটি অক্ষর স্পষ্ট হলো।
‘সু… সেন।’
নীলার গলা শুকিয়ে গেল।
“সুদেষ্ণা সেন?”
অয়ন ধীরে মাথা নাড়ল।
“সম্ভবত। কিন্তু আরও একটা বিষয় আছে।”
সে ফাইলের শেষ পাতাটি সামনে রাখল। সেটি ছিল দুর্ঘটনার পর তোলা একটি ছবি। ভাঙা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তিনজন পুলিশকর্মী। পিছনে রাস্তার ধারে একটি সাদা অ্যাম্বুল্যান্স।
আর অ্যাম্বুল্যান্সের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন এক মহিলা।
মহিলার মুখ রক্তে ঢাকা। তাঁর কোলে একটি শিশু।
নীলা ছবিটা নিজের চোখের কাছে তুলে ধরল।
মহিলাটি তার মা।
কিন্তু মায়ের কোলে থাকা শিশুটি নীলা নয়।
শিশুটির হাতে বাঁধা রয়েছে নীল ফিতে।
“মীরা,” নীলা ফিসফিস করে বলল।
অয়ন তার দিকে তাকাল।
“নীলা, তোমাকে একটা কথা বলিনি। এই ছবিটা আমি গতকাল রাতেই খুঁজে পেয়েছি। আর ছবির পেছনে যে তারিখ লেখা আছে, সেটা দুর্ঘটনার তারিখ নয়।”
“তাহলে?”
“ছবিটা তোলা হয়েছিল তার পরের দিন। ১৯ অক্টোবর, ২০১১।”
“তার মানে মা দুর্ঘটনার পরেও বেঁচে ছিলেন?”
“শুধু বেঁচে ছিলেন না। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু সেই হাসপাতালে তাঁর নামে কোনও রোগীর রেকর্ড নেই।”
নীলা এবার মায়ের দিকে তাকাল।
হঠাৎ মনিটরের শব্দ দ্রুত হতে শুরু করল।
বিপ… বিপ… বিপ…
সুদেষ্ণার চোখ খুলে গেল।
তিনি প্রথমে নীলার দিকে তাকালেন, তারপর অয়নের দিকে। তাঁর চোখে এমন আতঙ্ক ফুটে উঠল, যেন অয়নকে তিনি আগে থেকেই চেনেন।
“তুমি এখানে কেন?” সুদেষ্ণা ক্ষীণ গলায় বললেন।
অয়ন এগিয়ে গেল।
“মাসিমা, আমি অয়ন। নীলার বন্ধু।”
“মিথ্যে!”
শব্দটা এত জোরে বেরোল যে নীলা চমকে উঠল।
সুদেষ্ণা বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করলেন। মনিটরের তার টান পড়ল। নার্স ছুটে এলেন। কিন্তু তার আগেই সুদেষ্ণা নীলার হাত চেপে ধরে বললেন—
“ওর থেকে দূরে থাকিস!”
“কিন্তু মা—”
“ওকে বিশ্বাস করিস না। ওর বাবা… ওর বাবা সেদিন গাড়িতে ছিল!”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো কেবিন স্তব্ধ হয়ে গেল।
অয়নের মুখ সাদা হয়ে গেল।
নীলা ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরল।
“অয়ন, তোমার বাবা কে?”
অয়ন কোনও উত্তর দিল না।
তার চোখের দৃষ্টি পাল্টে গেছে। এত দিনের বন্ধুত্বের পরিচিত কোমলতা নেই সেখানে। বরং রয়েছে এমন এক আতঙ্ক, যা মানুষ নিজের অতীতের মুখোমুখি হলে লুকোতে পারে না।
“নীলা, আমি সবটা জানি না,” সে বলল। “কিন্তু তোমার মাকে এখন উত্তেজিত করা ঠিক হবে না।”
“আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। তোমার বাবা কে?”
অয়ন ঠোঁট কামড়ে ধরল।
“আমার বাবার নাম অনিরুদ্ধ রায়।”
নীলা নামটা মনে মনে আওড়াল।
অনিরুদ্ধ রায়।
শশাঙ্ক রায়।
দুটো নামের মধ্যে অদ্ভুত মিল।
“শশাঙ্ক রায়ের সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক?”
অয়ন চোখ নামিয়ে নিল।
“উনি আমার কাকা।”
২. মৃত মানুষের স্বাক্ষর
নীলা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসার সময় সকাল হয়ে গেছে।
অয়ন তার সঙ্গে আসতে চেয়েছিল। নীলা রাজি হয়নি।
“আমার একটু একা থাকতে হবে,” সে বলেছিল।
অয়ন আর জোর করেনি। শুধু যাওয়ার আগে বলেছিল, “যা-ই জানতে পারো, মনে রেখো—তোমার বাবার মৃত্যু নিয়ে যে গল্পটা সবাই জানে, তার সবটাই মিথ্যে নয়। কিন্তু পুরো সত্যিটাও নয়।”
কথাটা নীলার মনে গেঁথে রইল।
বাড়িতে ফিরে সে দাদুর পুরোনো ট্রাঙ্ক খুলল। বহুদিনের জমে থাকা চিঠি, ঘড়ির যন্ত্রাংশ, বিবর্ণ ছবি আর পুরোনো কাগজের মধ্যে সে বাবার নাম খুঁজতে লাগল।
হঠাৎ একটা মোটা খাতার পাতা থেকে একটি খাম মেঝেতে পড়ে গেল।
খামের ওপর লেখা—
‘যদি নীলা কোনওদিন দ্বিতীয় ঘড়ির শব্দ শুনতে পায়।’
নীলার হাত কেঁপে উঠল।
খামের ভিতরে ছিল একটি চিঠি। হাতের লেখা দাদুর।
‘নীলা,
তুই যখন এই চিঠি পড়বি, তখন হয়তো আমি আর থাকব না। তোকে অনেক কিছু বলতে চেয়েও বলিনি। কারণ কিছু সত্যি এমন সময়ে বলতে হয়, যখন মানুষ তা সহ্য করার মতো শক্তি অর্জন করে।
তোর বাবার মৃত্যুর পর আমি একটা ভুল করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, তোকে সত্যিটা থেকে দূরে রাখলে তুই নিরাপদে থাকবি। কিন্তু মানুষকে মিথ্যে দিয়ে রক্ষা করতে গেলে একদিন সেই মিথ্যেই তাকে গ্রাস করে।
তোর বাবা মারা যাওয়ার আগে আমার দোকানে এসেছিল। তার হাতে ছিল একটি ঘড়ি। ঘড়িটা দেখতে সাধারণ, কিন্তু তার ভেতরে এমন একটি যন্ত্র ছিল, যা আমি আগে কখনও দেখিনি। সে বলেছিল, ওই যন্ত্রের সাহায্যে কিছু পুরোনো ঘটনার সময় নির্ধারণ করা সম্ভব। কিন্তু সময় বদলানো সম্ভব নয়।
আমি তাকে বিশ্বাস করিনি।
সেদিন রাতে সে আর বাড়ি ফেরেনি।
পরদিন পুলিশ জানাল, সে দুর্ঘটনায় মারা গেছে। কিন্তু আমি তার মৃতদেহ দেখেছিলাম কি না, তা আজ আর নিশ্চিত করে বলতে পারি না। আমার স্মৃতির মধ্যে একটা ফাঁক তৈরি হয়েছে। যেন কেউ ইচ্ছা করে সেই রাতের কয়েক ঘণ্টা আমার জীবন থেকে মুছে দিয়েছে।
একটি কথা মনে রাখিস—ঘড়ির কাঁটা বারোটা সতেরো মিনিটে থেমে গেলে দ্বিতীয় ঘড়িটাকে খুঁজবি। প্রথম ঘড়ি তোকে অতীত দেখাবে। দ্বিতীয় ঘড়ি দেখাবে, অতীত থেকে কে ফিরে এসেছে।
আর যদি কোনওদিন তোর সামনে এমন একজন দাঁড়ায়, যে নিজের মৃত্যুর কথা জানে না, তাকে নিজের বাবা বলে বিশ্বাস করার আগে তার ছায়ার দিকে তাকাবি।
কারণ সব মানুষের ছায়া আলোয় পড়ে না।
— তোর দাদু, হরিহর সেন।’
নীলা চিঠিটা নামিয়ে রাখল।
শেষের লাইনটা পড়ে তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
‘নিজের মৃত্যুর কথা জানে না’—এই কথার অর্থ কী?
আয়নায় দেখা মানুষটি কি সত্যিই তার বাবা? নাকি বাবার মুখ নিয়ে অন্য কেউ তার সামনে এসেছে?
আর দ্বিতীয় ঘড়িটাই বা কোথায়?
সে ট্রাঙ্কের তলায় হাত ঢোকাতেই কাঠের পাতের নিচে একটি ছোট্ট গোপন খোপ অনুভব করল। পিতলের চাবিটা সেখানে লাগাতেই খোপ খুলে গেল।
ভেতরে একটি পকেট ঘড়ি।
ঘড়িটির কাচ কালচে। সোনালি কাঁটা বারোটা সতেরো মিনিটে থেমে আছে। পিছনের ঢাকনায় খোদাই করা—
‘A.S. — 18.10.2011’
অরিন্দম সেন।
নীলা ঘড়িটা হাতে নিয়ে কান পাতল।
কোনও শব্দ নেই।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর তার ভেতর থেকে ক্ষীণ একটা টিকটিক শব্দ শোনা গেল।
টিক।
টিক।
টিক।
নীলা ঘড়ির ঢাকনা খুলতেই ভিতরের কাচের নিচে একটি ক্ষুদ্র কাগজ দেখতে পেল। কাগজটা এত ছোট যে পিন দিয়ে তুলে আনতে হলো।
সেখানে লেখা—
‘সময়ঘর নয়। পুরোনো নার্সিংহোম। ঘর নম্বর ১৭।’
তার নিচে একটি নাম।
‘ডাঃ দেবব্রত মুখার্জি।’
নীলা মোবাইল বের করে নামটা খুঁজতে গেল। কিন্তু ইন্টারনেটে কোনও সাম্প্রতিক তথ্য পেল না। কয়েকটি পুরোনো চিকিৎসক-নিবন্ধে নামটি আছে। পনেরো বছর আগে তিনি উত্তর কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে কাজ করতেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে নবজাতকের পরিচয় বদলানোর অভিযোগ উঠেছিল। মামলাটি শুরু হওয়ার আগেই তিনি নিখোঁজ হন।
নার্সিংহোমটির নাম—‘শান্তিনিকেতন মাতৃসদন’।
এখন সেখানে একটি বহুতল আবাসন তৈরি হয়েছে।
কিন্তু নীলা জানত, পুরোনো ভবনটি পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়নি। পেছনের অংশে একটি পরিত্যক্ত ব্লক এখনও দাঁড়িয়ে আছে।
সে সিদ্ধান্ত নিল, সেখানেই যাবে।
৩. ঘর নম্বর সতেরো
দুপুরের দিকে নীলা পৌঁছল পুরোনো নার্সিংহোমের সামনে।
বাইরে এখন আধুনিক আবাসনের বড় গেট। নিরাপত্তারক্ষী প্রথমে তাকে ঢুকতে দিতে চাইল না। নীলা সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পুরোনো ভবনের ছবি তোলার কথা বলতেই লোকটি বিরক্ত মুখে বলল, “ওদিকে কেউ যায় না। বিপজ্জনক বাড়ি।”
“কেন?”
“ছাদ ভাঙা, সিঁড়ি নড়বড়ে। তাছাড়া, ওখানে রাতে আলো জ্বলে।”
নীলা থমকে গেল।
“আলো জ্বলে?”
“হ্যাঁ। কিন্তু ভেতরে কেউ নেই। অন্তত আমরা কাউকে দেখিনি।”
শেষ কথাটা বলার সময় নিরাপত্তারক্ষীর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। সে আর কথা বাড়াতে চাইল না।
নীলা পিছনের সরু গলি দিয়ে পরিত্যক্ত ব্লকে ঢুকল।
ভেতরে পচা কাঠের গন্ধ, ভাঙা কাচ, দেওয়ালে শ্যাওলা। একসময় যেখানে রোগীদের বিছানা ছিল, সেখানে এখন ভাঙা আলমারি আর পুরোনো হাসপাতালের সরঞ্জাম পড়ে আছে।
দ্বিতীয় তলায় ওঠার সিঁড়ির পাশে একটি মরচে ধরা ফলক।
‘নবজাতক বিভাগ।’
নীলার মনে পড়ল, মায়ের কথা—হাসপাতালের রেকর্ড বদলে দেওয়া হয়েছিল। দুই শিশুর পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল।
ঘর নম্বর সতেরো খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগল না।
দরজায় তালা ঝুলছে। কিন্তু তালার নিচে নতুন আঁচড়ের দাগ। যেন সম্প্রতি কেউ সেটি খুলেছে।
নীলা পকেট থেকে দাদুর পিতলের চাবি বের করল।
চাবিটা তালায় ঢুকতেই ঘুরে গেল।
দরজা খুলে গেল ধীরে ধীরে।
ঘরের ভিতরে ঢুকে নীলা দেখল, মাঝখানে একটি পুরোনো ধাতব টেবিল। দেওয়ালের পাশে ফাইল রাখার তাক। জানালার কাচ কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। টেবিলের ওপর ধুলো জমে থাকলেও মাঝখানে একটি অংশ পরিষ্কার।
সেখানে রাখা একটি ছোট্ট রেকর্ডার।
তার পাশে একটি কাগজ।
‘যে সত্যি জানতে এসেছে, সে যেন প্রথমে নিজের নাম বলে।’
নীলা কাগজটা পড়ে বিরক্ত হয়ে বলল, “আমার নাম নীলাঞ্জনা সেন।”
ঘরের ভিতর কোনও শব্দ হলো না।
সে রেকর্ডারটা চালু করল।
প্রথমে শোঁ-শোঁ শব্দ। তারপর এক বৃদ্ধ পুরুষের কণ্ঠ।
“রোগী নম্বর ১৭। জন্ম ১৮ অক্টোবর, ২০১১। দুই কন্যাশিশু। পরিচয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমার ছিল। কিন্তু সেই রাতে আমাকে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা চিকিৎসকের শপথের বিরুদ্ধে।”
নীলা নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে লাগল।
“প্রথম শিশুটির ডান কাঁধের কাছে জন্মদাগ ছিল। দ্বিতীয় শিশুটির বাঁ হাতের কবজিতে ছোট্ট কালো তিল। তাদের মায়ের নাম সুদেষ্ণা সেন। বাবার নাম অরিন্দম সেন।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর আবার কণ্ঠ।
“রাত বারোটা সতেরো মিনিটে একজন পুরুষ আমাকে দেখতে আসে। সে বলে, একটি শিশুর পরিচয় বদলাতে হবে। যে শিশুটি মারা গেছে বলে ঘোষণা করা হবে, তার নাম হবে মীরা সেন। অন্য শিশুটির নাম নীলাঞ্জনা সেন। কিন্তু দুই শিশুই তখন জীবিত ছিল।”
নীলার চোখের সামনে যেন সবকিছু ঘুরে উঠল।
মীরা মৃত ছিল না।
কেউ তাকে মৃত ঘোষণা করেছিল।
কেন?
রেকর্ডিং চলতে লাগল।
“আমি প্রথমে অস্বীকার করি। কিন্তু লোকটি আমাকে একটি ছবি দেখায়। ছবিতে আমার নিজের ছেলেকে দেখা যাচ্ছিল। তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল আরেকজন পুরুষ। লোকটি বলে, নির্দেশ না মানলে আমার ছেলেকে আর খুঁজে পাব না।”
বৃদ্ধের গলায় কান্নার আভাস।
“আমি ভয় পেয়ে যাই। কাগজ বদলে দিই। কিন্তু একটি ভুল করে ফেলি। দুই শিশুর কবজিতে বাঁধা পরিচয়-ফিতেগুলো বদলাতে গিয়ে আমি একটি ফিতে নিজের কাছে রেখে দিই। সেটি প্রমাণ হিসেবে রেখে দিয়েছিলাম। পরে বুঝলাম, ওই ফিতেই আমার মৃত্যুর কারণ হতে পারে।”
রেকর্ডিং হঠাৎ থেমে গেল।
নীলা রেকর্ডারের বোতাম চাপল। আর কোনও শব্দ নেই।
টেবিলের ড্রয়ার খুলে সে একটি পুরোনো খাম পেল। খামের ভিতরে হাসপাতালের দুটি পরিচয়-ফিতে।
একটিতে লেখা ‘নীলাঞ্জনা সেন’।
অন্যটিতে ‘মীরা সেন’।
নীলা নিজের বাঁ হাতের কবজির দিকে তাকাল। ছোট্ট একটি কালো তিল—জন্ম থেকেই আছে।
তারপর সে ডান কাঁধের কাছে হাত নিয়ে গেল। সেখানে একটি জন্মদাগ আছে কি না, তা সে ছোটবেলা থেকে জানে না। মায়ের কাছেও কখনও জানতে চায়নি।
তার মনে হলো, সে হয়তো নিজের পরিচয়ই এতদিন ভুল করে এসেছে।
হঠাৎ ঘরের বাইরে পায়ের শব্দ।
একজন নয়, একাধিক মানুষ।
নীলা দ্রুত রেকর্ডার আর ফিতেগুলো ব্যাগে ঢোকাল। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস আটকে রইল।
বাইরে একজন বলল, “ঘরটা খোলা কেন?”
আরেকজনের উত্তর এল, “ও এসেছে।”
“কে?”
“হরিহরের নাতনি।”
নীলার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
দরজার হাতল ঘুরল।
সে ঘরের পিছনের জানালার দিকে তাকাল। জানালার বাইরে সরু কার্নিশ, তার নিচে নিচতলার ছাদ। ঝুঁকি আছে, কিন্তু অন্য পথ নেই।
দরজা খুলে গেল।
দুজন লোক ভেতরে ঢুকল। একজনের হাতে টর্চ, অন্যজনের হাতে কালো ব্যাগ।
“কোথায় গেল?” প্রথম লোকটি বলল।
নীলা জানালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
কার্নিশে পা রাখতেই নিচে তাকিয়ে মাথা ঘুরে গেল। তিনতলার সমান উঁচু। সে ধীরে ধীরে পাশের দেওয়াল ধরে এগোল। ঠিক তখনই ঘরের ভিতর থেকে চিৎকার এল—
“ওই যে! জানালায়!”
একটি হাত তার জামার পেছনটা ধরে ফেলল।
নীলা মরিয়া হয়ে ঘুরে লোকটির হাতে নখ বসিয়ে দিল। লোকটি গালাগাল করে হাত ছেড়ে দিল। নীলা পাশের ছাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা হলো, কিন্তু সে থামল না।
ছাদের অন্য প্রান্তে একটি সিঁড়ি ছিল। সেখান দিয়ে নেমে গলিতে এসে সে দৌড়তে শুরু করল।
কয়েক মিনিট পর একটি বন্ধ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।
তার ব্যাগে এখন এমন প্রমাণ রয়েছে, যা হয়তো পনেরো বছরের মিথ্যে ভেঙে দিতে পারে।
কিন্তু সে জানে না, সেই প্রমাণ কার হাতে তুলে দেবে।
অয়নকে?
যার বাবা ওই রাতের সঙ্গে জড়িত?
পুলিশকে?
যে পুলিশ একসময় দুর্ঘটনার তদন্ত করেও সত্যি খুঁজে পায়নি?
নাকি নিজের কাছে রেখে দেবে?
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
অজানা নম্বর।
নীলা ফোন ধরল।
ওপাশ থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।
“দিদি?”
নীলার বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ছিঁড়ে গেল।
“মীরা?”
“তুমি ঘর নম্বর সতেরোতে গিয়েছিলে?”
“তুমি কোথায়?”
“ওরা তোমাকে খুঁজছে।”
“কারা?”
“যারা বাবাকে মেরেছিল।”
নীলা কাঁপা গলায় বলল, “তুমি বেঁচে আছ, মীরা? তুমি সত্যিই বেঁচে আছ?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর মীরা বলল, “আমি বেঁচে আছি। কিন্তু তুমি যাকে বাবা বলে খুঁজছ, তিনি তোমার বাবা নন।”
নীলা কথা বলতে পারল না।
“কী বলছ তুমি?”
“আয়নায় যাকে দেখেছ, সে তোমার বাবার মুখ নিয়ে ফিরে এসেছে। কিন্তু সে অরিন্দম সেন নয়।”
“তাহলে আমার বাবা কোথায়?”
মীরার গলা এবার ভেঙে এল।
“সেই প্রশ্নের উত্তর জানে একমাত্র মানুষটি, যাকে আমরা দুজনেই মৃত বলে বিশ্বাস করি।”
“কে?”
“দাদু।”
নীলা স্তব্ধ।
হরিহর সেন তো বহু বছর আগে মারা গেছেন। তাঁর শেষকৃত্যও হয়েছে। নিজের চোখে সে দাদুর ছবি দেখেছে, তাঁর মৃত্যুর কথা শুনেছে।
“মীরা, তুমি কী বলছ?”
“দাদু মারা যাননি, দিদি। তাঁকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আর তিনি কোথায় আছেন, সেটা জানার একটাই উপায়।”
“কী উপায়?”
ওপাশে হঠাৎ একটা শব্দ হলো। যেন কেউ দরজা ভেঙে ঢুকেছে।
মীরা দ্রুত ফিসফিস করে বলল, “সময়ঘরের দ্বিতীয় ঘড়িটা খুঁজে বের করো। কিন্তু মনে রেখো—রাত বারোটা সতেরো মিনিটে সেটা বাজলে কোনও দরজা খুলবে না। যেই ডাকুক, না।”
“মীরা! তুমি কোথায়?”
“দিদি, আর একটা কথা—”
তারপরেই ফোনের ওপাশে ভয়ংকর একটা চিৎকার।
ফোন কেটে গেল।
নীলা বারবার কল করল। নম্বরটি বন্ধ।
তার চোখের সামনে রাস্তার ওপারের কাচের জানালায় নিজের প্রতিবিম্ব ভেসে উঠল।
কিন্তু প্রতিবিম্বের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন।
কালো কোট পরা সেই অচেনা লোক।
নীলা ঘুরে তাকাল।
কেউ নেই।
আবার কাচের দিকে তাকাতেই লোকটি আয়নার মতো প্রতিবিম্বের ভিতর থেকে ঠোঁট নাড়ল।
সে কোনও শব্দ করল না।
তবু নীলা স্পষ্ট বুঝতে পারল, লোকটি বলছে—
“বারোটা সতেরো মিনিটের আগেই সময় শেষ হয়ে যাবে।”
দূরে কোনও ঘড়িতে ঘণ্টা বাজল।
সন্ধ্যা ছয়টা।
নীলা জানত, তার হাতে মাত্র ছয় ঘণ্টা।
আর এই ছয় ঘণ্টার মধ্যে তাকে খুঁজে বের করতে হবে সেই দ্বিতীয় ঘড়ি, যার কথা দাদু চিঠিতে লিখেছিলেন।
কারণ সেই ঘড়ির ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে তার বাবার মৃত্যুর সত্যি, মীরার বেঁচে থাকার প্রমাণ, আর এমন এক রহস্য—যা উন্মোচিত হলে বদলে যাবে নীলাঞ্জনার নিজের পরিচয়ও।
কিন্তু সময়ঘরে ফিরে যাওয়ার পথে নীলা জানত না, সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে আরও ভয়ংকর কিছু।
কারণ সেই রাতেই, বহু বছর পর, বন্ধ দোকানের সমস্ত ঘড়ি একসঙ্গে চলতে শুরু করবে।
আর তাদের কাঁটা থামবে না বারোটা সতেরো মিনিটে।
থামবে এমন এক সময়ে, যার অস্তিত্ব কোনও ক্যালেন্ডারে নেই।
চলবে…