১. ভোরের আগের অন্ধকার
রাত তখন তিনটে বেজে সতেরো মিনিট।
নীলকুঠির দোতলার করিডরে দাঁড়িয়ে অদিতির মনে হচ্ছিল, সে আর কোনো বাস্তব বাড়ির মধ্যে নেই। চারপাশের দেয়ালগুলো যেন ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে। পুরোনো ছবিগুলোর চোখ তার দিকে স্থির হয়ে আছে। আর করিডরের শেষ প্রান্তে সেই নীল দরজা—যার ফাঁক দিয়ে এমন এক অন্ধকার বেরিয়ে আসছে, যা আলোকে শুধু গ্রাস করে না, মানুষের স্মৃতিকেও মুছে দিতে পারে।
হরিপদ তখনও অদিতির হাত ধরে আছে।
“দিদিমণি, আমাদের এখান থেকে বেরোতে হবে,” বৃদ্ধ ফিসফিস করে বলল।
অদিতি তার দিকে তাকাল।
“আপনি আমাকে নিয়ে পালাতে চান কেন? আমার ঠাকুমার কবর খুঁড়তে হবে। দরজার ওপাশের মেয়েটিও সেটাই বলেছে।”
“ও যা বলেছে, তার সবটাই বিশ্বাস করবেন না।”
“আপনি কি জানেন, আমার ঠাকুমার দেহ কোথায়?”
হরিপদ চোখ নামিয়ে নিল।
এই নীরবতাই অদিতির কাছে উত্তরের মতো মনে হলো।
“আপনি জানেন!” সে বলল।
“জানি না, দিদিমণি। তবে একটা কথা জানি—আপনার ঠাকুমার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না।”
অদিতির বুকের মধ্যে ধাক্কা লাগল।
“কী বললেন?”
“তিনি মারা যাওয়ার আগের রাতে আমাকে ডেকে বলেছিলেন, পরদিন যদি তাঁর মৃত্যু হয়, তাহলে যেন তাঁর কবর খোঁড়া না হয়। তাঁর কথামতোই আমি সব ব্যবস্থা করেছিলাম। কিন্তু কবর দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে এক রাতে আমি এই বাড়ির পেছন থেকে তাঁর গলার আওয়াজ শুনেছিলাম।”
“আপনি কী শুনেছিলেন?”
“তিনি বলছিলেন, ‘হরিপদ, আমাকে বের করো। আমি এখনও বেঁচে আছি।’”
অদিতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “আপনি কি তাঁকে সাহায্য করেছিলেন?”
হরিপদ মাথা নাড়ল।
“আমি ভয় পেয়েছিলাম। পরদিন সকালে গিয়ে দেখি, সমাধিক্ষেত্রের মাটি অক্ষত। কিন্তু কবরের ফলকে একটা নতুন দাগ পড়েছে। সেই দাগের মধ্যে লেখা ছিল—‘যে আমাকে ফিরিয়ে আনবে, সে তার নিজের মুখ হারাবে।’”
“তাহলে আপনি পালিয়ে গিয়েছিলেন?”
“না। আমি এই বাড়িতেই থেকে গিয়েছিলাম। কারণ আমার মনে হয়েছিল, পালিয়ে গেলে একদিন সেই ডাক আমার বাড়িতেও পৌঁছবে।”
অদিতি নীল দরজার দিকে তাকাল।
দরজাটি এবার বন্ধ।
কিন্তু তার গায়ে একটি সরু কালো রেখা দেখা যাচ্ছে। রেখাটি ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠছে, যেন কাঠের ভেতর থেকে কেউ আঙুল দিয়ে আঁচড় কাটছে।
অদিতি দৃঢ় গলায় বলল, “আমি ঠাকুমার কবর খুঁড়ব।”
হরিপদ বাধা দিল না।
শুধু বলল, “তাহলে একটা কথা মনে রাখবেন। কবরের ভেতরে যা দেখবেন, তাকে স্পর্শ করার আগে নিজের নাম তিনবার বলবেন। আর যদি কবরের ভেতর থেকে আপনার নিজের গলায় কেউ সাহায্য চায়, কোনো উত্তর দেবেন না।”
অদিতি আর প্রশ্ন করল না।
কারণ সে বুঝতে পেরেছিল, এই বাড়িতে প্রতিটি উত্তরের পেছনে আরও ভয়ংকর একটি প্রশ্ন অপেক্ষা করছে।
২. খালি কফিনের রহস্য
নীলকুঠির পেছনের সমাধিক্ষেত্রে পৌঁছতে তাদের দশ মিনিট লাগল।
আকাশে চাঁদ নেই। মেঘের আড়ালে তারাগুলোও অদৃশ্য। কেবল হরিপদের লণ্ঠনের ক্ষীণ আলোয় কবরগুলোর পাথরের ফলক দেখা যাচ্ছে।
অদিতি নিজের ফোনের আলো জ্বালাল।
সুবর্ণলতা সেনের কবরটি সমাধিক্ষেত্রের একেবারে উত্তর দিকে। পুরোনো বটগাছের নিচে। ফলকের ওপর জমে থাকা শ্যাওলা সরিয়ে সে আবার নামটি পড়ল।
সুবর্ণলতা সেন।
জন্ম: ১৯৪৮।
মৃত্যু: ২০২১।
অদিতি হাঁটু গেড়ে বসে মাটিতে হাত রাখল।
মাটি ভেজা।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, চারপাশের জমি শুকনো। শুধু এই কবরের ওপরের মাটি ভিজে আছে, যেন একটু আগেই কেউ জল ঢেলে গেছে।
“এখানে কি কেউ এসেছিল?” অদিতি জিজ্ঞাসা করল।
হরিপদ মাথা নাড়ল।
“এই সমাধিক্ষেত্রে বহু বছর কেউ আসে না।”
অদিতি কোদাল হাতে নিল।
প্রথম আঘাতেই মাটির ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ উঠল।
টং!
যেন কোদাল মাটিতে নয়, ধাতুর ওপর পড়েছে।
দুজনেই থমকে গেল।
অদিতি আবার মাটি সরাল। অল্পক্ষণের মধ্যেই কফিনের ঢাকনা দেখা গেল।
কফিনটি পুরোনো হলেও অস্বাভাবিকভাবে অক্ষত। তার ওপর কালো কাপড় পেঁচানো। কাপড়ের গায়ে লাল সুতো দিয়ে একটি চিহ্ন সেলাই করা।
একটি বৃত্তের মধ্যে দুটি মুখ।
একটি মুখের চোখ বন্ধ।
অন্যটির চোখ খোলা।
অদিতি চিহ্নটি দেখে নিজের বুকের ওপর হাত রাখল। তার মনে হলো, কোথাও এই চিহ্ন সে আগেও দেখেছে।
“ঢাকনাটা খুলুন,” সে বলল।
হরিপদ কাঁপতে কাঁপতে কফিনের ঢাকনা সরাতে সাহায্য করল।
ঢাকনা খুলতেই একটি তীব্র গন্ধ বেরিয়ে এল। পচা মাটির গন্ধ নয়, পোড়া কাঠের গন্ধ। যেন বহু বছর আগে কোনো ঘর আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর সেই ছাই এখানে জমা করে রাখা হয়েছে।
কফিনের ভেতরে কোনো দেহ নেই।
আছে একটি সাদা শাড়ি, একটি পুরোনো চিঠি, আর একটি ছোট্ট কাঠের বাক্স।
অদিতি বাক্সটি তুলে নিল।
বাক্সের ঢাকনায় লেখা—
“আমার অদিতির জন্য।”
তার হাত কেঁপে উঠল।
বাক্সটি খুলতেই ভেতর থেকে একটি শিশুর রুপোর নূপুর বেরিয়ে এল। নূপুরটির পাশে রাখা একটি সাদা-কালো ছবি।
ছবিতে দুটি শিশু পাশাপাশি শুয়ে আছে।
দুটি শিশুর মুখ একই রকম।
একটির হাতে রুপোর নূপুর।
অন্যটির হাতে একটি কালো সুতো।
ছবির পেছনে লেখা—
“১৮ অক্টোবর ১৯৯৬।
দুটি জন্ম। একটি মৃত্যু।
একটি জীবন।”
অদিতি ছবিটি বুকে চেপে ধরল।
“আমি কি যমজ ছিলাম?”
হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগেই কফিনের ভেতর থেকে একটি শব্দ এল।
খসখস।
যেন কাগজের নিচে কেউ নড়ছে।
অদিতি নিচু হয়ে দেখল, কফিনের কাঠের তলায় একটি ছোট্ট দরজা রয়েছে। দরজাটির গায়ে নীল রঙের চিহ্ন।
সে আঙুল দিয়ে চিহ্নটি স্পর্শ করতেই দরজাটি নিজে থেকে খুলে গেল।
ভেতরে একটি পাতলা খাতা।
খাতার প্রথম পাতায় লেখা—
“রুদ্রাণীর জন্মদিনের ডায়েরি।”
৩. ঠাকুমার শেষ স্বীকারোক্তি
খাতাটি খুলতেই অদিতির চোখে পড়ল তারিখ।
১৮ অক্টোবর, ১৯৯৬।
প্রথম পাতায় লেখা—
“আজ আমার নাতনি জন্মেছে।
মৃণালিনী বলেছিল, শিশুটির নাম হবে অদিতি। অমিতাভও সেই নামেই রাজি হয়েছিল। কিন্তু আজ রাতে এমন কিছু ঘটেছে, যা আমার সমস্ত বিশ্বাস ভেঙে দিয়েছে।
আগুন লাগার সময় আমি দুটি শিশুকে দেখেছি।
একটি শিশুকে আমি কোলে তুলে বাইরে নিয়ে এসেছি। অন্যটি ছিল ঘরের ভেতরে, নীল দরজার সামনে। আমি তাকে বাঁচাতে পারিনি।
কিন্তু আগুন নিভে যাওয়ার পরে যখন আবার ঘরে ঢুকলাম, তখন সেখানে কোনো শিশুর দেহ ছিল না।
শুধু দেয়ালে লেখা ছিল—
‘তুমি একজনকে বাঁচিয়েছ। অন্যজন তোমাকে মনে রাখবে।’”
অদিতির চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
সে পরের পাতা উল্টাল।
“১৯৯৭ সালের ১২ জানুয়ারি।
অদিতি আজ প্রথমবার আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে হাসল। কিন্তু আমি দেখলাম, আয়নার ভেতরের শিশুটি হাসেনি। সে কাঁদছিল।
আমি মৃণালিনীকে কিছু বলিনি। আমি জানি, সে এখনও বিশ্বাস করে তার সন্তান বেঁচে আছে। অথচ আমি জানি না, আমার কোলে যে শিশুটি আছে, সে কোন শিশুটি।
আমি কি ভুল শিশুকে ফিরিয়ে এনেছি?”
পরের পাতায় লেখা—
“২০০১ সালের ১৮ অক্টোবর।
অদিতির পঞ্চম জন্মদিন।
আজ রাতে সে ঘুমের মধ্যে অন্য একটি নাম বলেছে—রুদ্রাণী। তারপর ঘুম ভেঙে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে, ‘ঠাকুমা, আমার বোন কোথায়?’
আমি তাকে বলেছি, তার কোনো বোন নেই।
মিথ্যে বলেছি।
কিন্তু সত্যিটা বললে সে কীভাবে বাঁচবে?”
আরও কয়েকটি পাতা উল্টে অদিতি দেখল, ঠাকুমা বছরের পর বছর একই ভয়ে দিন কাটিয়েছেন।
“২০০৮ সালের ১৮ অক্টোবর।
আজ অদিতি বলেছে, সে প্রতিদিন স্বপ্নে একটি মেয়েকে দেখে। মেয়েটি তাকে ডাকে। বলে, তার নিজের ঘর, নিজের নাম, নিজের মা—সব ফিরিয়ে দিতে।
আমি বুঝতে পারছি, দরজার বন্ধন দুর্বল হয়ে আসছে।”
“২০১৫ সালের ১৮ অক্টোবর।
আজ অদিতি আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পায়নি। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপর সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
আমি জানি, সময় খুব কাছে।”
শেষের দিকের পাতাগুলোয় লেখা আরও অস্পষ্ট।
“২০২১ সালের ২ নভেম্বর।
আমার শরীর ভেঙে পড়ছে। আমি জানি, আর বেশিদিন বাঁচব না। মৃত্যুর আগে আমাকে সত্যিটা স্বীকার করতেই হবে।
আমি অদিতিকে ফিরিয়ে এনেছিলাম—কিন্তু কাকে?
যদি সে আমার আসল নাতনি হয়, তবে অন্য শিশুটি কোথায়?
আর যদি সে অন্য শিশুটি হয়, তবে আমার আসল নাতনি কি এখনও দরজার ওপারে অপেক্ষা করছে?
আমি কাউকে বাঁচাতে গিয়ে কাউকেই বাঁচাতে পারিনি।”
শেষ পাতায় লেখা—
“অদিতি, যদি কখনো এই খাতা তোর হাতে আসে, তবে মনে রাখিস—রুদ্রাণীকে ভয় পাবি না। সে তোর শত্রু নয়। সে সেই সত্য, যাকে আমি সারাজীবন লুকিয়ে রেখেছি।
তুই যদি তাকে অস্বীকার করিস, সে তোকে গ্রাস করবে।
আর যদি তাকে চিনতে পারিস, তবে হয়তো আমরা সবাই মুক্তি পাব।”
অদিতি খাতাটি বন্ধ করল।
তার মনে হচ্ছিল, এতদিন ধরে নিজের সম্পর্কে যে ধারণা নিয়ে সে বেঁচে ছিল, তার প্রতিটি ভিত্তি ভেঙে পড়ছে।
সে কি সত্যিই সুবর্ণলতার নাতনি?
মৃণালিনী কি সত্যিই তার মা?
আর রুদ্রাণী—সে কি তার যমজ বোন, নাকি তার নিজেরই অন্য কোনো জীবন?
হরিপদ ধীরে ধীরে বলল, “আপনার ঠাকুমা শেষ পর্যন্ত সত্যিটা লুকিয়ে রাখতে পারেননি।”
অদিতি তার দিকে তাকাল।
“আপনি কি জানতেন, আমার দুটি জন্ম হয়েছিল?”
বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করল।
“আমি শুধু আগুনের রাতটা দেখেছিলাম। দুটি শিশুকে দেখেছিলাম। কিন্তু কোনটি কোথায় গেল, তা কখনো জানতে পারিনি।”
“তাহলে এত বছর আমাকে মিথ্যে বললেন কেন?”
“কারণ আপনার ঠাকুমা আমাকে শপথ করিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আপনি যদি সত্যিটা জানতে পারেন, তাহলে নীল দরজা আবার খুলবে।”
অদিতি তিক্ত হাসল।
“কিন্তু দরজা তো খুলেই গেছে।”
হরিপদ মাথা নিচু করল।
“হ্যাঁ, দিদিমণি। কারণ সত্যি কখনো চিরকাল বন্ধ রাখা যায় না।”
৪. কবরের ভেতরের কণ্ঠ
ঠিক তখনই কফিনের ভেতর থেকে একটি শিশুর কান্না শোনা গেল।
অদিতি ও হরিপদ দুজনেই পিছিয়ে গেল।
কফিনটি তো খালি।
তবু কান্নার শব্দ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
“ঠাকুমা…”
অদিতির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
কণ্ঠটি তার নিজের শৈশবের মতো। ঠিক সেই স্বর, যেভাবে সে ছোটবেলায় ঠাকুমাকে ডাকত।
“ঠাকুমা, আমাকে বের করো…”
হরিপদ অদিতির হাত চেপে ধরল।
“কোনো উত্তর দেবেন না!”
কিন্তু অদিতি কফিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কান্নার শব্দ থেমে গেল।
তারপর একটি মেয়ের কণ্ঠ বলল—
“দিদি, তুমি কি আমাকে ভুলে গেছ?”
অদিতি ধীরে ধীরে কফিনের কাছে এগিয়ে গেল।
“তুমি রুদ্রাণী?”
কোনো উত্তর এল না।
তারপর কফিনের ভেতরের কাঠের তলায় একটি নাম ফুটে উঠল।
মৃণালিনী।
অদিতি চমকে উঠল।
“মা?”
কফিনের ভেতর থেকে এবার এক নারীর কণ্ঠ শোনা গেল।
“অদিতি, আমাকে খুঁজতে এসেছিস?”
“আপনি কোথায়?”
“আমি এমন এক জায়গায় আছি, যেখানে সময় থেমে গেছে। আমি আমার সন্তানদের দুজনকেই হারিয়েছি। একজনকে আগুন কেড়ে নিয়েছে, আরেকজনকে ভয়।”
অদিতি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আপনি কি আমাকে ভালোবাসতেন?”
কণ্ঠটি মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
তারপর বলল, “আমি তোকে জন্মের আগেই ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু তোকে বড় হতে দেখার সুযোগ পাইনি। তোর ঠাকুমা তোকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। আমি শুধু অপেক্ষা করেছি।”
“তাহলে আপনি আমাকে এতদিন ডাকেননি কেন?”
“আমি তোকে ডাকিনি, মা। তোকে ডেকেছে সেই মেয়ে, যে আমার অন্য সন্তান।”
অদিতির শরীর শীতল হয়ে গেল।
“রুদ্রাণী?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে সে আমার বোন?”
মৃণালিনীর কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“তুই যদি তাকে বোন বলে স্বীকার করিস, তাহলে তুই নিজের জীবন হারাবি না। কিন্তু তুই যদি তাকে অস্বীকার করিস, সে তোর জীবন নিতে চাইবে।”
অদিতি চোখ বন্ধ করল।
“আমি তাকে স্বীকার করি।”
এই কথাটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে কফিনের ভেতরের কান্না থেমে গেল।
কিন্তু পরক্ষণেই মাটির নিচ থেকে এক প্রচণ্ড ধাক্কা এল।
কফিনের কাঠ ফেটে গেল।
তার ভেতর থেকে একটি ছোট্ট হাত বেরিয়ে এসে অদিতির কবজি ধরে ফেলল।
হাতটি বরফের মতো ঠান্ডা।
অদিতি চিৎকার করে উঠল।
হরিপদ কোদাল দিয়ে হাতটিকে সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু হাতটি আরও শক্ত করে অদিতির কবজি চেপে ধরল।
তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ বলল—
“তুমি আমাকে বোন বলেছ। এবার আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো।”
অদিতি হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল।
“কোন বাড়ি?”
কণ্ঠটি উত্তর দিল—
“যে বাড়িতে আমার নাম লেখা আছে।”
ঠিক তখনই নীলকুঠির দিক থেকে ঘণ্টা বাজতে শুরু করল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
হরিপদ আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, “অসম্ভব! এই বাড়ির ঘণ্টা তো পঞ্চাশ বছর ধরে বাজে না!”
অদিতি ঘুরে তাকাল।
দূরের দ্বিতীয় তলার জানালায় নীল আলো জ্বলছে।
আর জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।
তার মুখ অদিতির মতো।
কিন্তু সে হাসছে।
৫. যে বাড়িতে দুটি অদিতি
অদিতি ও হরিপদ দ্রুত নীলকুঠিতে ফিরে এল।
বাড়ির সামনে এসে তারা দেখল, প্রধান দরজা খোলা। ভেতরের হলঘরে সমস্ত ছবি মেঝেতে পড়ে আছে। দেয়ালের ঘড়িগুলো উল্টো দিকে চলছে। সিঁড়ির ওপর কালো ছায়া জমে রয়েছে।
অদিতি দোতলায় উঠতেই একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখল।
করিডরের মাঝখানে দুটি আয়না পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
একটি আয়নায় তার নিজের মুখ।
অন্যটিতে রুদ্রাণীর মুখ।
কিন্তু দ্বিতীয় আয়নায় রুদ্রাণী আর একা নেই। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন মৃণালিনী। আর তাঁদের পেছনে একটি বৃদ্ধা—সুবর্ণলতা।
অদিতি আয়নার কাছে এগিয়ে গেল।
“ঠাকুমা!”
সুবর্ণলতা আয়নার ভেতর থেকে হাত বাড়ালেন।
“অদিতি, আমার কথা শোন। তুই যা দেখেছিস, তার সবটাই সত্যি নয়।”
“আপনি আমাকে মিথ্যে বলেছেন!”
“হ্যাঁ।”
“আমার জন্মের কথা লুকিয়েছেন!”
“হ্যাঁ।”
“আপনি কি আমাকে ফিরিয়ে এনেছিলেন?”
সুবর্ণলতা কাঁদতে লাগলেন।
“আমি তোকে হারাতে চাইনি, মা। তুই যখন আমার কোলে নিঃশ্বাসহীন হয়ে পড়েছিলি, আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, দরজার ওপাশে যে শক্তি আছে, সে আমাকে আমার নাতনিকে ফিরিয়ে দিতে পারবে।”
“কিন্তু আপনি দুজনকে এনেছিলেন?”
“আমি জানি না। আমি শুধু তোকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। পরে বুঝেছিলাম, আরেকটি জীবনও আমার সঙ্গে এসেছে। আমি দরজাটি বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, তাতে সব শেষ হবে।”
অদিতি চোখ মুছল।
“রুদ্রাণী কি আমার যমজ বোন?”
সুবর্ণলতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “তোমরা একই রাতের দুটি সম্ভাবনা। একটি শিশুর জীবন আগুনে শেষ হয়েছিল। অন্য জীবনটি বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু নীল দরজা সেই অসমাপ্ত জীবনটিকে ধরে রেখেছিল। তুই যে শরীরে বেঁচে আছিস, সে শরীরের স্মৃতি, পরিচয় আর অস্তিত্বের সঙ্গে রুদ্রাণীর বন্ধন রয়েছে। সে তোর বোনও, তোর প্রতিবিম্বও—কিন্তু কেবল যমজ বোন বললে পুরো সত্যি বলা হয় না।”
অদিতি মাথা নাড়ল।
“এত জটিল করে বলবেন না। আমি শুধু জানতে চাই, আমি কে?”
সুবর্ণলতার মুখে গভীর বেদনা ফুটে উঠল।
“তুই অদিতি। তুই আমার নাতনি। তুই মৃণালিনীর মেয়ে। তুই সেই শিশু, যাকে আমি বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোর জীবনের মধ্যে আরেকটি শিশুর কান্না রয়ে গেছে। তুই যদি সেই কান্নাকে চিরকাল অস্বীকার করিস, তাহলে একদিন সে তোকে গ্রাস করবে।”
“তাহলে আমি কী করব?”
সুবর্ণলতা আয়নার ভেতর থেকে নীল দরজার দিকে তাকালেন।
“তুই দরজার ওপাশে যাবি না। তুই দরজাটাকে চিনবি। আর রুদ্রাণীকে তার নাম ফিরিয়ে দিবি।”
অদিতি ঘুরে তাকাল।
নীল দরজাটি আবার খুলছে।
এবার দরজার ওপাশে অন্ধকার নয়, দেখা যাচ্ছে একটি পুরোনো ঘর। ঘরের মাঝখানে ছোট্ট একটি খাট। তার ওপর সাদা কাপড়ে মোড়া একটি শিশু।
খাটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্রাণী।
সে অদিতির দিকে তাকিয়ে বলল—
“এবার বুঝতে পেরেছিস, দিদি? এই বাড়ি শুধু আমারও নয়, তোরও নয়। এই বাড়ি আমাদের মায়ের। আর আমাদের দুজনের জীবন এখানেই শুরু হয়েছিল।”
অদিতি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
“তুমি কি আমাকে মেরে ফেলতে চাও?”
রুদ্রাণী মাথা নাড়ল।
“আমি চাই, তুমি আমার কষ্টটা বোঝো। আমি চাই, তুমি জানো কেমন লাগে, যখন সবাই বেঁচে থাকে, অথচ তোমাকে কেউ মনে রাখে না।”
“আমি তোমাকে মনে রাখব।”
রুদ্রাণী মৃদু হাসল।
“শুধু মনে রাখলেই হবে না। তোর ঠাকুমা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতির শেষটা তোকে পূরণ করতে হবে।”
“কী প্রতিশ্রুতি?”
রুদ্রাণী হাত তুলে দরজার ওপরের দিকে দেখাল।
সেখানে নতুন করে একটি বাক্য ফুটে উঠেছে—
“যে জীবন ধার করা, তাকে ফিরিয়ে দিতে হয়। যে জীবন অস্বীকার করা, তাকে স্বীকার করতে হয়।”
অদিতি বাক্যটি পড়তেই দরজার ওপাশের ঘরটি কেঁপে উঠল।
মৃণালিনীর কণ্ঠ ভেসে এল—
“অদিতি, সময় শেষ হয়ে আসছে। ভোরের আগে তোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
“কী সিদ্ধান্ত?”
কোনো উত্তর এল না।
শুধু রুদ্রাণী বলল—
“তুই কি নিজের জীবনকে বেছে নিবি, নাকি আমার জীবনকেও সত্যি বলে স্বীকার করবি?”
অদিতি তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এতদিন সে ভেবেছিল, সত্য খুঁজে পেলেই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারছে, সত্য জানা আর সত্যের দায়িত্ব নেওয়া এক জিনিস নয়।
তার সামনে দুটি পথ।
একটি পথ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে তার পরিচিত জীবনে, যেখানে সে অদিতি সেন—একজন স্থাপত্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ, যার অতীত সম্পর্কে বহু প্রশ্নের উত্তর নেই।
অন্য পথ তাকে নিয়ে যাবে নীল দরজার ওপারে, যেখানে তারই আরেকটি জীবন আটকে রয়েছে।
সে কি নিজের পরিচয় রক্ষা করবে?
নাকি নিজের জীবনের মধ্যে অন্য এক জীবনের অস্তিত্বকে স্বীকার করে এমন এক সত্যের মুখোমুখি হবে, যা তার সমস্ত বিশ্বাস বদলে দিতে পারে?
অদিতি চোখ বন্ধ করল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“আমি তোমাকে অস্বীকার করব না, রুদ্রাণী।”
দরজার ওপাশে রুদ্রাণীর মুখে হাসি ফুটল।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে অদিতি এমন কিছু দেখল, যা তার বুকের ভেতর বরফের মতো জমে গেল।
রুদ্রাণীর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মৃণালিনী মাথা নাড়ছেন।
তিনি চিৎকার করে কিছু বলতে চাইছেন।
কিন্তু তাঁর কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে না।
অদিতি চোখ বড় করে তাকাল।
রুদ্রাণী এবার খুব আস্তে বলল—
“তাহলে তুই প্রস্তুত। এবার তোকে আরেকটা সত্যি জানতে হবে।”
সে হাত বাড়িয়ে দিল।
“তোর ঠাকুমা শুধু আমাকে দরজার ওপাশে আটকে রাখেননি, দিদি। তিনি আমার জায়গায় তোকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।”
অদিতির শরীর অবশ হয়ে গেল।
“তার মানে?”
রুদ্রাণী এগিয়ে এল।
“তার মানে, তুই যদি জানতে চাস তোর জন্মের রাতে সত্যিই কে মারা গিয়েছিল, তাহলে তোকে নিজের জন্মের প্রথম স্মৃতিটা মনে করতে হবে।”
হঠাৎ ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।
অন্ধকারে একটি শিশুর কান্না শোনা গেল।
তারপর একটি নারীকণ্ঠ—
“অদিতি, চোখ খোল। আগুন আসছে!”
অদিতির মাথার ভেতর প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হলো।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আগুনে ঘেরা একটি ঘর। একটি শিশু কাঁদছে। আরেকটি শিশু নিঃশব্দে শুয়ে আছে।
দুটি শিশুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে সুবর্ণলতা।
তাঁর হাতে একটি ছোট্ট আয়না।
তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলছেন—
“একজনকে বাঁচাতে হলে অন্যজনকে ভুলে যেতে হবে।”
তারপর আয়নাটি ভেঙে যায়।
অদিতি চিৎকার করে উঠল।
যখন সে চোখ খুলল, তখন নীল দরজাটি বন্ধ।
রুদ্রাণী নেই।
মৃণালিনী নেই।
আয়নায় শুধু অদিতির নিজের মুখ।
কিন্তু তার কপালের ঠিক মাঝখানে একটি সরু কালো দাগ ফুটে উঠেছে।
দাগটির নিচে ধীরে ধীরে একটি শব্দ দেখা দিল—
“রুদ্রাণী।”
আর করিডরের শেষ প্রান্ত থেকে হরিপদের কণ্ঠ ভেসে এল—
“দিদিমণি, ভোর হয়ে যাচ্ছে। এখন আপনাকে ঠিক করতে হবে, আপনি এই বাড়ি ছেড়ে যাবেন, নাকি দরজার ওপাশে ফিরে যাবেন।”
অদিতি নীল দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার সামনে এখনও সময় আছে।
কিন্তু সে জানে না, সেই সময় তাকে বাঁচানোর জন্য, নাকি তার জীবনের শেষ সত্যটি প্রকাশ করার জন্য।
চলবে…