১. ফিরে আসার ডাক
১৮ অক্টোবর, ২০২৬।
কলকাতার আকাশে সেদিন সকাল থেকেই মেঘ জমেছিল। মাঝে মাঝে ঝোড়ো হাওয়া বইছিল, আর দূরে কোথাও বিদ্যুৎ চমকে উঠছিল। শহরের ব্যস্ত রাস্তা, মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন—সবকিছুর মাঝেও অদিতি সেনের মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটা অন্য রকম।
আজ তার তিরিশতম জন্মদিন।
সাধারণত জন্মদিন নিয়ে তার বিশেষ কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না। বাবা-মা দুজনকেই ছোটবেলায় হারানোর পর জন্মদিন তার কাছে আনন্দের চেয়ে বিষণ্ণতার দিন হয়ে উঠেছিল। প্রতি বছর এই দিনে ঠাকুমা সুবর্ণলতা তাকে একটি ছোট্ট উপহার দিতেন, কপালে চুমু খেয়ে বলতেন, “আর একটা বছর বড় হলি, অদিতি। এবার নিজের অতীতটাকে চিনতে শেখ।”
কিন্তু পাঁচ বছর আগে ঠাকুমার মৃত্যুর পর থেকে কেউ আর তাকে এ কথা বলেনি।
সেদিন সকালে ডাকবাক্সে একটি খাম পেয়ে অদিতি প্রথমে ভেবেছিল, কোনো পুরোনো জমির কাগজপত্র হবে। খামটির ওপর প্রেরকের নাম ছিল না। শুধু তার নাম ও ঠিকানা লেখা ছিল কালো কালিতে।
খাম খুলতেই একটি পুরোনো চাবি মেঝেতে পড়ে গেল।
চাবিটি ছিল অস্বাভাবিক ভারী। কালচে ধাতুর গায়ে নীল পাথরের মতো একটি ছোট্ট অংশ বসানো। তার সঙ্গে ভাঁজ করা একটি কাগজ।
কাগজে ঠাকুমার হাতের লেখা।
“অদিতি,
তোর তিরিশতম জন্মদিনে এই চাবি তোর কাছে পৌঁছবে, এমনটাই ঠিক করা ছিল। এত বছর আমি তোকে সত্যিটা বলতে পারিনি। ভেবেছিলাম, হয়তো একদিন সবকিছু নিজে থেকেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।
দক্ষিণ কলকাতার পুরোনো নীলকুঠিতে যা আছে, তার সঙ্গে তোর জন্মের সম্পর্ক রয়েছে। বাড়িটিতে যা কিছু দেখবি, সবকিছুকে চোখের দেখা বলে বিশ্বাস করিস না।
দোতলার শেষ ঘরে একটি নীল দরজা আছে। মনে রাখিস, কোনো অবস্থাতেই সেই দরজা খুলবি না।
দরজার ওপাশ থেকে কেউ যদি তোর নাম ধরে ডাকে, উত্তর দিবি না।
আর যদি আয়নায় নিজের মুখ দেখতে না পাস, তাহলে বুঝবি সময় এসে গেছে।
আমাকে ক্ষমা করিস।
—তোর ঠাকুমা।”
চিঠিটি পড়ে অদিতির বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
নীলকুঠি!
নামটা তার কাছে একেবারে অচেনা ছিল না। ছোটবেলায় ঠাকুমার মুখে এই বাড়ির কথা শুনেছিল। দক্ষিণ কলকাতার এক নির্জন এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরোনো জমিদারবাড়ি। বহু বছর আগে চৌধুরী পরিবারের বাসস্থান ছিল সেটি। এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পরিবারের প্রায় সবাই নিখোঁজ হয়ে যায়। তারপর থেকে বাড়িটি পরিত্যক্ত।
ঠাকুমা কখনোই নীলকুঠি নিয়ে বেশি কথা বলতেন না। অদিতি প্রশ্ন করলে তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে দিতেন।
কিন্তু আজ সেই বাড়ির চাবি তার হাতে।
আর চিঠিতে লেখা রয়েছে তার জন্মদিনের কথা।
অদিতি পেশায় স্থাপত্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ। পুরোনো বাড়ি, ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও পরিত্যক্ত ভবনের ইতিহাস অনুসন্ধান করা তার কাজ। ভূতপ্রেত বা অলৌকিক ঘটনা নিয়ে তার কোনো বিশ্বাস ছিল না। সে মনে করত, মানুষের ভয় এবং অজানা ইতিহাস মিলেই অধিকাংশ রহস্য তৈরি করে।
তবু চিঠির শেষ কয়েকটি লাইন তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
বিশেষ করে এই কথাটি—
“যদি আয়নায় নিজের মুখ দেখতে না পাস, তাহলে বুঝবি সময় এসে গেছে।”
কীসের সময়?
আর ঠাকুমা কেনই বা তাকে নীলকুঠিতে যেতে নিষেধ করেছিলেন?
অদিতি চাবিটি ব্যাগে রাখল। তারপর নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়ে ফেলল।
সেদিনই সে নীলকুঠিতে যাবে।
২. নীলকুঠির সামনে
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছিল, যখন অদিতির গাড়ি দক্ষিণ কলকাতার পুরোনো পাড়াটিতে এসে পৌঁছল।
রাস্তার দুপাশে ঘন গাছপালা। বহু পুরোনো বাড়ির দেওয়ালে শ্যাওলা জমেছে। কোথাও ভাঙা বারান্দা, কোথাও বন্ধ জানালা। রাস্তায় মানুষের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে।
গাড়ি থেকে নেমে অদিতি চারপাশে তাকাল।
রাস্তার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল বাড়িটি।
নীলকুঠি।
বাড়িটির বিশাল লোহার ফটক মরচে ধরে লালচে হয়ে গিয়েছে। ফটকের ওপর লতাপাতা জড়িয়ে রয়েছে। তার পেছনে দেখা যাচ্ছে একটি দোতলা প্রাসাদ, যার গায়ে সময়ের ক্ষত স্পষ্ট। দেওয়ালের নীল রং বহু জায়গায় উঠে গিয়ে ইট বেরিয়ে পড়েছে। ছাদের কার্নিশে বটগাছের শিকড় ঝুলছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি জানালায় আলো জ্বলছিল।
অদিতি ঘড়ির দিকে তাকাল।
সন্ধ্যা ছটা দশ।
এত বছর ধরে পরিত্যক্ত একটি বাড়িতে আলো জ্বলছে কেন?
ফটকের পাশে পাথরের একটি ফলক ছিল। ধুলো সরিয়ে অদিতি পড়ল—
“চৌধুরী নীলকুঠি।
প্রতিষ্ঠা: ১৮৭৪।
যে নিজের মুখ চিনতে পারে না, সে অন্যের সত্য চিনবে কীভাবে?”
শেষের বাক্যটির নিচে খোদাই করা তারিখটি দেখে অদিতি জমে গেল।
১৮ অক্টোবর, ১৯৯৬।
তার জন্মদিন।
তার জন্মের তারিখ কীভাবে এই বাড়ির ফলকে লেখা থাকতে পারে?
সে পাথরের গায়ে হাত বুলিয়ে দেখল। লেখাগুলো পুরোনো। তারিখটি নতুন করে খোদাই করা হয়েছে বলে মনে হলো না।
ঠিক তখনই ফটকের ওপাশ থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল।
“আপনি অনেক দেরি করে ফেলেছেন, দিদিমণি।”
অদিতি চমকে উঠল।
ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বৃদ্ধ। পরনে ময়লা সাদা ধুতি ও ফিকে বাদামি পাঞ্জাবি। মাথার চুল সাদা, মুখে গভীর বলিরেখা। হাতে একটি কেরোসিনের লণ্ঠন।
“আপনি কে?” অদিতি প্রশ্ন করল।
“আমি হরিপদ। এই বাড়ির দেখাশোনা করি।”
“এখানে কেউ থাকে?”
“থাকে তো। সবাই থাকে না, কিন্তু কেউ কেউ কখনো বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে না।”
বৃদ্ধের কথায় অদিতির ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আপনি কী বলতে চাইছেন?”
হরিপদ মৃদু হাসল।
“কিছু না, দিদিমণি। আসুন। আপনার ঘর তৈরি আছে।”
“আমার ঘর?”
“আপনি আসবেন, সেটা জানানো হয়েছিল।”
“কে জানিয়েছে?”
বৃদ্ধ উত্তর না দিয়ে ফটক খুলে দিল।
অদিতি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিজের পেশাগত কৌতূহলকে ভয়ের ওপর জয়ী হতে দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।
ফটক বন্ধ হওয়ার শব্দটি অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘক্ষণ ধরে প্রতিধ্বনিত হলো।
যেন বাড়িটি তাকে ভেতরে ঢুকতে দেখেই বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে নিজের সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিল।
৩. যে ছবিতে আমার মুখ
নীলকুঠির ভেতরে প্রবেশ করতেই অদিতির মনে হলো, সে যেন অন্য কোনো সময়ে এসে পড়েছে।
বিশাল প্রবেশপথ। মেঝেতে সাদা-কালো পাথরের নকশা। ছাদের মাঝখানে ঝাড়বাতি, যার অধিকাংশ কাচ ভাঙা। দেয়ালজুড়ে পুরোনো ছবি। কোথাও জমিদারদের প্রতিকৃতি, কোথাও অচেনা মানুষের পারিবারিক ছবি।
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, বাড়ির ভেতরে ধুলোর পরিমাণ খুব কম।
যেন কেউ প্রতিদিন ঘর পরিষ্কার করে।
হরিপদ লণ্ঠন হাতে এগিয়ে যাচ্ছিল। অদিতি তার পেছনে হাঁটতে হাঁটতে দেয়ালে টাঙানো একটি বড় ছবির সামনে থেমে গেল।
ছবিতে এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। পরনে নীল শাড়ি, কপালে ছোট্ট লাল টিপ, চোখে গভীর বিষণ্ণতা।
অদিতির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
ছবির মেয়েটির মুখ তার নিজের মুখের সঙ্গে অবিশ্বাস্য রকমের মিল।
শুধু চোখের দৃষ্টিতে কিছু একটা আলাদা। ছবির তরুণীর চোখে এমন এক শূন্যতা, যেন সে বহু বছর ধরে কারও জন্য অপেক্ষা করছে।
ছবির নিচে লেখা—
মৃণালিনী চৌধুরী।
১৯৭৪।
“এই মহিলা কে?” অদিতি প্রশ্ন করল।
হরিপদ পেছন ফিরে তাকাল। ছবিটি দেখেই তার মুখের রং বদলে গেল।
“ওঁর কথা জিজ্ঞাসা করবেন না।”
“কেন? উনি কি এই বাড়ির সদস্য ছিলেন?”
“ছিলেন।”
“কী হয়েছিল ওঁর?”
বৃদ্ধ লণ্ঠনটি একটু উঁচু করে ধরল।
“কেউ বলে, তিনি মারা গিয়েছিলেন। কেউ বলে, তিনি কখনো এই বাড়ি ছেড়েই যাননি।”
অদিতি ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
“ওঁর সঙ্গে আমার মুখের এত মিল কেন?”
হরিপদ এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল।
“আপনার ঠাকুমা কি আপনাকে কখনো আপনার মায়ের কথা বলেছেন?”
প্রশ্নটি শুনে অদিতি অস্বস্তি বোধ করল।
“আমার মা মারা গিয়েছিলেন, যখন আমি খুব ছোট। তাঁর নাম মৃণালিনী ছিল না।”
“আপনি কি নিশ্চিত?”
“অবশ্যই।”
“তাহলে ছবিটা ভুলে যান।”
এই বলে হরিপদ দ্রুত সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
অদিতি আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার মনে একটি সন্দেহ শিকড় গেড়ে বসল।
তার ঠাকুমা কি সত্যিই তার মায়ের সম্পর্কে সব কথা বলেছিলেন?
নাকি ছোটবেলা থেকে সে যে ইতিহাস শুনে এসেছে, সেটাই ছিল একটি সাজানো গল্প?
দোতলায় ওঠার আগে সে আরেকটি ছবি দেখতে পেল। ছবিতে এক বৃদ্ধ জমিদার, পাশে স্ত্রী ও কয়েকজন সন্তান। ছবির এক কোণে লাল কালি দিয়ে লেখা একটি বাক্য—
“যে ফিরে আসবে, সে নিজের নাম নিয়ে ফিরবে না।”
অদিতি বাক্যটি পড়ে ঘুরে দাঁড়াল।
সিঁড়ির মাথায় হরিপদ দাঁড়িয়ে ছিল।
“দিদিমণি, রাত হয়ে যাচ্ছে। আপনার ঘরে চলুন।”
৪. যে ঘরে আমার জন্য অপেক্ষা
দোতলার করিডরটি ছিল অস্বাভাবিক লম্বা। দুপাশে পরপর বন্ধ দরজা। দেয়ালের পুরোনো রং উঠে গিয়ে কালচে দাগ তৈরি হয়েছে। করিডরের শেষ প্রান্তে একটি জানালা, যার বাইরে ঘন অন্ধকার।
হরিপদ একটি ঘরের সামনে এসে থামল।
“এটাই আপনার ঘর।”
দরজার ওপর পিতলের ছোট্ট ফলকে লেখা—
অদিতি সেন।
অদিতি অবাক হয়ে ফলকটির দিকে তাকিয়ে রইল।
“আমার নাম এখানে কীভাবে এল?”
হরিপদ চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, “কিছু নাম আগে থেকেই লেখা থাকে, দিদিমণি। মানুষ শুধু পরে এসে সেগুলো পড়ে।”
ঘরের দরজা খুলতেই অদিতি একটি পুরোনো কিন্তু পরিপাটি শোবার ঘর দেখতে পেল। কাঠের খাট, আলমারি, একটি ছোট টেবিল এবং জানালার পাশে একটি বড় আয়না। ঘরের বাতাসে চন্দন ও পুরোনো কাঠের গন্ধ।
টেবিলের ওপর একটি কেক রাখা।
কেকের পাশে একটি কার্ড।
“শুভ তিরিশতম জন্মদিন, অদিতি।”
অদিতির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“এগুলো কে রেখেছে?”
“যিনি আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।”
“কে অপেক্ষা করছেন?”
হরিপদ এবার দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
“রাতে দরজা বন্ধ রাখবেন। কেউ ডাকলেও খুলবেন না।”
“কিন্তু—”
“বিশেষ করে যদি নিজের গলায় নিজের নাম শুনতে পান।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
অদিতি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ব্যাগ থেকে ঠাকুমার চিঠিটি বের করল। চিঠির কথাগুলো যেন আবার কানে বাজতে লাগল।
দোতলার শেষ ঘরে একটি নীল দরজা আছে।
অদিতি ঘর থেকে বেরিয়ে করিডরের দিকে তাকাল। তার ঘরটি শেষ ঘর নয়। করিডরের একেবারে শেষ প্রান্তে আরও একটি দরজা দেখা যাচ্ছে।
দরজাটি অন্য সব দরজার থেকে আলাদা।
গাঢ় নীল রং। মাঝখানে কালো ধাতুর হাতল। দরজার চারপাশে কোনো ধুলো নেই, কোনো শ্যাওলা নেই। যেন সেটি গতকালই তৈরি হয়েছে।
অদিতি দরজাটির দিকে এগিয়ে গেল।
হঠাৎ তার পেছন থেকে হরিপদের কণ্ঠ শোনা গেল—
“ওদিকে যাবেন না!”
বৃদ্ধ কোথা থেকে এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছে, অদিতি বুঝতেই পারেনি।
“এটাই কি সেই নীল দরজা?”
হরিপদ উত্তর দিল না।
“আমার ঠাকুমা আমাকে এই দরজা খুলতে নিষেধ করেছেন। কেন?”
“কারণ দরজার ওপাশে যা আছে, তা আপনার দেখার কথা নয়।”
“ওপাশে কী আছে?”
বৃদ্ধের চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।
“আপনি নিজে।”
অদিতি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে নিজের ঘরে ফিরে এল।
দরজাটি বন্ধ করার আগে সে একবার পেছনে তাকিয়েছিল।
নীল দরজার হাতলটি তখন খুব সামান্য নড়ে উঠল।
যেন ওপাশ থেকে কেউ সেটি ঘোরানোর চেষ্টা করছে।
৫. আয়নার ভেতরের মেয়ে
রাত বাড়তে লাগল।
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে। দূরে কোথাও বজ্রপাতের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
অদিতি ঘরের টেবিলে বসে নীলকুঠির ইতিহাস নিয়ে ইন্টারনেটে খোঁজার চেষ্টা করল। কিন্তু ফোনে কোনো নেটওয়ার্ক নেই। বাড়ির ওয়াই-ফাইও কাজ করছে না।
ঘড়িতে রাত এগারোটা পঞ্চান্ন।
অদিতির চোখ পড়ল আয়নার দিকে।
আয়নাটি একটি সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল।
সে কাপড়টি কখনো খেয়াল করেনি।
কেন একটি আয়না ঢেকে রাখা হয়েছে?
কৌতূহলবশত সে কাপড়টি সরিয়ে দিল।
প্রথমে নিজের মুখই দেখতে পেল।
ক্লান্ত চোখ, এলোমেলো চুল, উদ্বিগ্ন মুখ।
তারপর হঠাৎ ঘরের আলো একবার জ্বলে উঠে নিভে গেল।
আবার আলো জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে অদিতি দেখল, আয়নায় তার প্রতিবিম্ব নেই।
আয়নার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে সেই তরুণী—নীল শাড়ি পরা মৃণালিনী চৌধুরী।
অদিতি পিছিয়ে গেল।
“কে আপনি?”
আয়নার ভেতরের তরুণী চোখের জল মুছল।
“এত বছর পরেও আমাকে চিনতে পারলি না, অদিতি?”
“আপনি কীভাবে আমার নাম জানেন?”
“কারণ তুই আমার মেয়ে।”
অদিতি মাথা নাড়ল।
“না। আমার মা মারা গিয়েছিলেন।”
“তোর ঠাকুমা তোকে যা বলেছেন, তুই সেটাই বিশ্বাস করেছিস। কিন্তু সব সত্যি তোকে বলা হয়নি।”
অদিতির গলা কেঁপে উঠল।
“আপনি কি মৃণালিনী চৌধুরী?”
তরুণী মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু আমার মায়ের নাম ছিল অন্য।”
“তোর জন্মের আগে আমার নাম বদলে দেওয়া হয়েছিল। তোর ঠাকুমা চেয়েছিলেন, আমার অতীত যেন তোর জীবনে আর ফিরে না আসে।”
অদিতি আয়নার দিকে এগিয়ে গেল।
“আপনি কোথায় আছেন?”
মৃণালিনী হাত বাড়ালেন। তাঁর আঙুলগুলো আয়নার ভেতর থেকে কাচের ওপর এসে ঠেকল।
“আমি সেই জায়গায় আছি, যেখানে তুই একবার হারিয়ে গিয়েছিলি।”
“আমি কখনো এখানে আসিনি!”
“এসেছিলি। খুব ছোটবেলায়। তুই তখন কথা বলতে শিখিসনি। আগুনের মধ্যে তোর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তোর ঠাকুমা তোকে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু তিনি একা তোকে ফেরাননি।”
অদিতি বুঝতে পারছিল না, কী বিশ্বাস করবে।
“আপনি কী বলতে চাইছেন?”
মৃণালিনীর চোখের জল গড়িয়ে পড়ল।
“তোর মধ্যে আরেকজন আছে, অদিতি। তোরই মতো দেখতে, তোরই মতো নাম, তোরই মতো স্মৃতি। সে বিশ্বাস করে, এই জীবনটা তার। আর সে এবার ফিরে আসতে চায়।”
“কে সে?”
মৃণালিনী উত্তর দেওয়ার আগেই আয়নার কাচে ফাটল ধরল।
একটি সরু কালো রেখা কাচের ওপর ছড়িয়ে পড়তে লাগল। রেখাটি ধীরে ধীরে একটি নামের আকার নিল।
রুদ্রাণী।
নামটি পড়তেই আয়নার ভেতরের মৃণালিনী আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন।
“না! এই নাম উচ্চারণ করিস না!”
পরের মুহূর্তে ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।
অন্ধকারে অদিতি শুনতে পেল, আয়নার ভেতর থেকে কেউ নখ দিয়ে কাচ আঁচড়াচ্ছে।
খররর…
খররর…
তারপর একটি মেয়ের কণ্ঠ—
“দিদি, দরজাটা খুলে দাও।”
অদিতি চোখ বন্ধ করে দুহাতে কান চেপে ধরল।
কিন্তু কণ্ঠটি থামল না।
“আমি আর অন্ধকারে থাকতে পারছি না।”
৬. মৃত্যুর তারিখ
হঠাৎ ঘরের দরজায় তিনবার টোকা পড়ল।
টক।
টক।
টক।
অদিতি চমকে উঠল।
“কে?”
বাইরে থেকে একজন পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল।
“অদিতি, দরজা খোল।”
এই কণ্ঠ তার অচেনা নয়।
এ কণ্ঠ সে ছোটবেলায় পুরোনো অডিও রেকর্ডিংয়ে শুনেছে। ঠাকুমার আলমারিতে রাখা একটি ছবির পেছনে লেখা ছিল নাম—অমিতাভ সেন।
তার বাবা।
যাঁকে সে কখনো সচেতনভাবে দেখেনি।
“বাবা?” অদিতির ঠোঁট কেঁপে উঠল।
বাইরের কণ্ঠ বলল, “হ্যাঁ, মা। দরজা খোল। তোকে অনেক কথা বলতে হবে।”
অদিতি দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই ঠাকুমার চিঠির সতর্কবাণী মনে পড়ল।
দরজার ওপাশ থেকে কেউ ডাকলে উত্তর দিবি না।
বিশেষ করে যদি নিজের গলায় নিজের নাম শুনতে পাস।
কিন্তু এ তো তার বাবার কণ্ঠ!
সে দরজার হাতলে হাত রাখতেই আয়নার ভেতর থেকে মৃণালিনীর চিৎকার শোনা গেল—
“খুলিস না!”
অদিতি হাত সরিয়ে নিল।
বাইরের কণ্ঠ এবার বদলে গেল।
“তোর ঠাকুমা তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, অদিতি। কিন্তু তিনি যে আগুন জ্বালিয়েছিলেন, সেই আগুনই তোকে আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে।”
“আপনি সত্যিই আমার বাবা হলে বলুন, আমার শৈশবের প্রথম স্মৃতিটা কী?”
দরজার ওপাশে নীরবতা।
তারপর একটি হাসি।
“তোর প্রথম স্মৃতি ছিল আগুন। আর দ্বিতীয় স্মৃতি ছিল একটি নীল দরজা।”
অদিতির চোখে জল এসে গেল। তার মনে হলো, দূর অতীতের কোনো অস্পষ্ট ছবি মাথার মধ্যে ভেসে উঠছে। ধোঁয়ায় ভরা একটি ঘর। কারও হাত তাকে ধরে আছে। আর একটি ছোট্ট মেয়ে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
কিন্তু পরক্ষণেই দৃশ্যটি মিলিয়ে গেল।
বাইরের কণ্ঠ আবার বলল, “এবার নিজের ঘরের টেবিলের নিচে দেখ।”
অদিতি ধীরে ধীরে টেবিলের কাছে গেল।
টেবিলের নিচে একটি পুরোনো খাম পড়ে ছিল। সে খামটি খুলতেই একগুচ্ছ ছবি বেরিয়ে এল।
প্রথম ছবিতে ছোট্ট অদিতি, বয়স হয়তো তিন। দ্বিতীয় ছবিতে পাঁচ বছরের একটি মেয়ে। তৃতীয় ছবিতে স্কুলের পোশাকে অদিতি। চতুর্থ ছবিতে কিশোরী অদিতি।
প্রতিটি ছবির পেছনে একটি তারিখ লেখা।
প্রতিটি তারিখের শেষে একটি শব্দ—
মৃত্যু।
শেষ ছবিটি দেখে অদিতির বুকের ভেতরটা যেন থেমে গেল।
ছবিতে সে নিজেই দাঁড়িয়ে আছে। আজকের পোশাক, আজকের মুখ। ছবির নিচে লেখা—
অদিতি সেন।
জন্ম: ১৮ অক্টোবর ১৯৯৬।
মৃত্যু: ১৮ অক্টোবর ২০২৬।
আজকের তারিখ।
ছবিটি কয়েক ঘণ্টা আগেই তোলা হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল।
অদিতি কাঁপা হাতে ছবিটি উল্টে দিল।
পেছনে লেখা—
“তোর মৃত্যুর কারণ তুই নিজেই।”
তারপর ঘরের দরজায় আবার তিনটি টোকা পড়ল।
এবার কণ্ঠটি আর তার বাবার নয়।
এটি অদিতির নিজের কণ্ঠ।
“অদিতি, দরজা খোল। আমি তুই।”
৭. যে সত্যের অর্ধেক জানা
অদিতি দরজা থেকে দূরে সরে গেল।
“কে তুমি?”
বাইরের কণ্ঠ মৃদু হেসে বলল, “আমি সেই অদিতি, যে তোর আগে বেঁচে ছিল।”
“এটা অসম্ভব!”
“অসম্ভব কথাটা মানুষ তখনই বলে, যখন সত্যিটা তার বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে না।”
আয়নার কাচে আবার আলো জ্বলে উঠল। মৃণালিনী এবার আর আগের মতো স্পষ্ট নন। তাঁর মুখের একাংশ অন্ধকারে ঢাকা।
“অদিতি, মন দিয়ে শোন। তোর ঠাকুমা যখন তোকে আগুনের পর ফিরিয়ে আনলেন, তখন নীল দরজার ওপাশ থেকে একটি অসমাপ্ত জীবনও এই পৃথিবীতে প্রবেশ করেছিল। সে জীবন তোরই আরেকটি সম্ভাবনা। তোরই প্রতিচ্ছবি। কিন্তু সে তোর মতো এই পৃথিবীতে বড় হয়নি।”
“তাহলে সে কোথায় ছিল?”
“দরজার ওপাশে।”
“আর এখন?”
মৃণালিনী চোখ নামিয়ে নিলেন।
“এখন সে ফিরে আসতে চাইছে।”
“কেন?”
“কারণ সে বিশ্বাস করে, তুই তার জীবন নিয়ে বেঁচে আছিস।”
অদিতি মাথা নাড়ল।
“কিন্তু আমি তো কিছুই জানতাম না!”
“আমি জানি, মা। তুই অপরাধী নোস। কিন্তু সত্যি না জানলেও তার পরিণতি থেকে কেউ পালাতে পারে না।”
“তাহলে আমাকে কী করতে হবে?”
মৃণালিনী উত্তর দেওয়ার আগেই করিডরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
ধীরে ধীরে।
এক পা।
দুই পা।
তিন পা।
কেউ নীল দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
তারপর হরিপদের কণ্ঠ ভেসে এল—
“দিদিমণি, দরজাটা খুলবেন না। যাই শুনুন, খুলবেন না!”
অদিতি দরজার দিকে তাকাল।
“হরিপদবাবু, আপনি সব জানেন, তাই না? আমার ঠাকুমা কী করেছিলেন?”
বৃদ্ধের গলা কেঁপে উঠল।
“আপনার ঠাকুমা মৃতকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, যাকে ফিরিয়ে আনবেন, সে একা আসবে না।”
“রুদ্রাণী কে?”
দীর্ঘ নীরবতার পর হরিপদ বলল, “এই নামটা আমাদের বাড়িতে বহু বছর ধরে নিষিদ্ধ। কারণ রুদ্রাণী শুধু একটি মেয়ের নাম নয়। সে একটি প্রতিশ্রুতি, একটি অপরাধ, আর একটি অসমাপ্ত মৃত্যুর নাম।”
“আপনি তাকে দেখেছেন?”
“দেখেছি।”
“কখন?”
“যেদিন এই বাড়িতে আগুন লেগেছিল।”
অদিতির শ্বাস আটকে এল।
“আপনি তখনও এখানে ছিলেন?”
“আমি তখন তরুণ। আপনার ঠাকুমার নির্দেশে এই বাড়ির পেছনের ঘরে একটি আচার চলছিল। তিনি বলেছিলেন, মৃতদের ফিরিয়ে আনার পথ তিনি খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু সেই রাতেই আগুন লাগে। আমি পালিয়ে বেঁচেছিলাম। আর তারপর থেকে এই বাড়িতে ফিরে এসে পাহারা দিয়েছি—যাতে আর কেউ সেই দরজার কাছে না যায়।”
“তাহলে এত বছর আপনি এখানে কেন ছিলেন?”
বৃদ্ধের উত্তর এল খুব আস্তে—
“কারণ দরজার ওপাশ থেকে প্রতিদিন কেউ না কেউ আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, আমি পালিয়ে এসেছি। আর যাদের ফেলে এসেছিলাম, তারা এখনও অপেক্ষা করছে।”
৮. নীল দরজা খুলছে
ঘরের ভেতর হঠাৎ তীব্র ঠান্ডা নেমে এল।
অদিতি দেখল, তার পায়ের কাছে কালো তরল জমতে শুরু করেছে। তরলটি দরজার নিচ দিয়ে আসছে না; বরং মেঝের মাঝখান থেকেই উঠে আসছে।
তার ভেতর থেকে একের পর এক ছবি ভেসে উঠল।
একটি শিশুর মুখ।
একটি জ্বলন্ত ঘর।
একজন বৃদ্ধা, যিনি কাঁদতে কাঁদতে একটি ছোট্ট শরীরকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন।
আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি মেয়ে।
দুটি মেয়ের মুখ একই।
একটি কাঁদছে।
অন্যটি হাসছে।
ছবিগুলো মিলিয়ে যেতেই ঘরের দেয়ালে কালো অক্ষর ফুটে উঠল—
“একজনকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে দুজনকে হারানো হয়েছিল।”
অদিতি চিৎকার করে উঠল, “আমি আর কিছু শুনতে চাই না!”
কিন্তু তখনই নীল দরজার দিক থেকে একটি ভারী শব্দ এল।
ধড়াম!
দরজাটি কেঁপে উঠল।
তারপর আবার।
ধড়াম!
হরিপদ করিডর থেকে চিৎকার করল, “দিদিমণি, পিছিয়ে যান!”
অদিতি ঘর থেকে বেরিয়ে করিডরে এল।
নীল দরজার হাতলটি নিজে থেকেই ঘুরছে।
দরজার গায়ে একের পর এক অক্ষর ফুটে উঠছে।
প্রথমে লেখা হলো—
মৃণালিনী।
তারপর—
সুবর্ণলতা।
তারপর—
অমিতাভ।
সব নামের নিচে ধীরে ধীরে একটি নতুন নাম দেখা দিল।
রুদ্রাণী।
হরিপদ নামটি দেখেই মাটিতে বসে পড়ল।
“না! এই নাম ফিরতে পারে না!”
দরজার ওপাশ থেকে একটি মেয়ের হাসি ভেসে এল।
“কেন, হরিপদ? এত বছর পরেও কি তুমি আমাকে ভয় পাও?”
বৃদ্ধ কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি দোষী। কিন্তু আমি তোকে ফিরিয়ে আনতে পারব না!”
“আমি তো ফিরেই এসেছি।”
দরজার নিচে একটি সরু ফাটল দেখা দিল। তার ভেতর থেকে নীল আলো বেরিয়ে আসতে লাগল।
অদিতি বুঝতে পারল, ঠাকুমার দেওয়া চাবিটি শুধু একটি দরজা খোলার জন্য ছিল না। সেটি ছিল দরজাটিকে বন্ধ রাখার শেষ উপায়।
সে ব্যাগ থেকে চাবিটি বের করল।
কিন্তু চাবিটি তার হাতে আসতেই প্রচণ্ড গরম হয়ে উঠল।
অদিতি যন্ত্রণায় চাবিটি ফেলে দিল।
মেঝেতে পড়ে চাবিটি দু-টুকরো হয়ে গেল।
এক মুহূর্তে বাড়ির সমস্ত আয়নায় একই বাক্য ফুটে উঠল—
“রুদ্রাণী ফিরে এসেছে।”
নীল দরজাটি ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।
ওপাশে কোনো ঘর ছিল না।
ছিল এক বিশাল অন্ধকার, যার মধ্যে অসংখ্য মুখ ভেসে বেড়াচ্ছে। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ নিজের নাম ধরে ডাকছে।
সেই অন্ধকারের মাঝখান থেকে একটি মেয়ের অবয়ব এগিয়ে এল।
তার মুখ অদিতির মুখের মতো।
কিন্তু তার চোখে ছিল শত বছরের অভিমান।
সে দরজার ফাঁক দিয়ে অদিতির দিকে তাকিয়ে বলল—
“অবশেষে দেখা হলো, দিদি।”
অদিতি কথা বলতে পারল না।
মেয়েটি আরও এক পা এগিয়ে এল।
“তুই আমার জীবন নিয়ে বেঁচে আছিস। এবার আমার সময়।”
“তুমি কী চাও?”
মেয়েটি মৃদু হাসল।
“আমি শুধু আমার নামটা ফিরে চাই। আমার মুখটা ফিরে চাই। আর সেই জীবনটা, যেটা তোর ঠাকুমা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন।”
অদিতি পিছিয়ে গেল।
ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে আরেকটি কণ্ঠ ভেসে এল। কণ্ঠটি বৃদ্ধা সুবর্ণলতার মতো।
“অদিতি, ওকে বিশ্বাস করিস না! ও যা বলছে, তা সম্পূর্ণ সত্যি নয়!”
অদিতি হতবাক হয়ে গেল।
“ঠাকুমা?”
কণ্ঠটি আবার বলল—
“আমার কবর খুঁড়ে দেখ। আমার দেহ যেখানে থাকার কথা, সেখানে নেই। সত্যিটা জানতে হলে প্রথমে আমাকে খুঁজে বের কর।”
দরজার ওপাশের মেয়েটির মুখ মুহূর্তে বদলে গেল। তার চোখে রাগের বদলে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত শীতলতা।
“তোর ঠাকুমা আবার মিথ্যে বলছে, দিদি।”
তারপর সে হাত বাড়িয়ে দিল।
“আমার সঙ্গে আয়। আমি তোকে দেখাব, সেদিন আগুনের মধ্যে আসলে কী ঘটেছিল।”
অদিতি এক পা এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই হরিপদ তার হাত শক্ত করে ধরে চিৎকার করল—
“না! আপনি যদি ওপাশে যান, তাহলে আর কখনো ফিরে আসতে পারবেন না!”
অদিতি একদিকে তাকাল দরজার ওপাশে দাঁড়ানো নিজেরই মতো মেয়েটির দিকে, অন্যদিকে শুনতে পেল ঠাকুমার কণ্ঠ।
দুটো কণ্ঠই তাকে ডাকছে।
দুটো কণ্ঠই দাবি করছে, তারাই সত্যি।
আর অদিতি জানে না—কার কথা বিশ্বাস করবে।
নীল দরজার ফাঁক আরও প্রশস্ত হলো।
অন্ধকারের গভীর থেকে মেয়েটি শেষবারের মতো বলল—
“অদিতি, তুই যদি জানতে চাস কে বেঁচে আছে আর কে মৃত, তাহলে আজ রাতেই তোর ঠাকুমার কবর খুঁড়তে হবে। কারণ যে সত্যিটা তুই খুঁজছিস, তার উত্তর কবরের নিচে নয়—কবরের ভেতরে যে নেই, তার কাছে।”
হঠাৎ বাড়ির সমস্ত আলো নিভে গেল।
অন্ধকারে পরপর তিনটি শব্দ শোনা গেল—
টক।
টক।
টক।
তারপর এমন এক নিস্তব্ধতা নেমে এল, যেন পুরো পৃথিবী নিঃশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
অদিতি অনুভব করল, তার হাতের তালুতে কিছু একটা নড়ছে।
সে নিচে তাকাল।
ভাঙা চাবির একটি টুকরো তার হাতের মধ্যে নিজে থেকেই গলে যাচ্ছে। ধাতুর গায়ে নতুন করে একটি শব্দ ফুটে উঠেছে—
“রুদ্রাণী।”
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, বন্ধ হয়ে যাওয়া সমস্ত আয়নার ভেতর থেকে অদিতির নিজের কণ্ঠ ভেসে এল—
“দিদি, এবার তোর পালা।”
চলবে…