Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ ট্রেনের শেষ যাত্রী (দ্বিতীয় পর্ব: আয়নার ওপাশের মানুষ)।

অরিন্দমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই। যেন সে বহু বছর ধরে অপেক্ষা করছিল এই মুহূর্তটির জন্য। তার জামার বুকের কাছে পোড়া দাগ, ডান হাতের আঙুলে শুকনো রক্ত, আর চোখের গভীরে এমন এক শূন্যতা, যা কোনও জীবিত মানুষের চোখে থাকার কথা নয়।

অরিন্দম এক পা পিছিয়ে গেল।

“তুমি কে?”

লোকটি মৃদু হাসল।

“সত্যিই চিনতে পারছ না? এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?”

“আমার মুখ নিয়ে আমার সঙ্গে মজা করার চেষ্টা কোরো না!”

“তোমার মুখ?” লোকটি মাথা কাত করল। “তুমি নিশ্চিত, মুখটা তোমার?”

অরিন্দম উত্তর দিতে পারল না।

স্টেশনের ওপরে বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠেছে। দূরের শালগাছগুলোর মাথা অস্বাভাবিকভাবে দুলছে, অথচ বাতাসের কোনও শব্দ নেই। প্ল্যাটফর্মের বাতিগুলো একবার জ্বলে উঠছে, একবার নিভে যাচ্ছে। রেললাইনের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের জানালাগুলিতে একের পর এক মুখ ফুটে উঠছে।

সব মুখই অরিন্দমের পরিচিত।

কেউ তার ছোটবেলার বন্ধু, কেউ স্কুলের শিক্ষক, কেউ বহু বছর আগে মারা যাওয়া প্রতিবেশী। প্রত্যেকেই যেন জানালার ওপাশ থেকে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

তারপর শেষ জানালায় দেখা গেল অনন্যাকে।

মেয়েটি কাচে হাত রেখে চিৎকার করল, “দাদা, ওর কথা শুনবে না!”

কিন্তু শব্দটি অরিন্দমের কানে পৌঁছোল না। সে শুধু অনন্যার ঠোঁট নড়তে দেখল।

তার সামনে দাঁড়ানো দ্বিতীয় অরিন্দম বলল, “ওকে বাঁচাতে চাইলে আমার সঙ্গে এসো।”

“তুমি অনন্যাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলে?”

“আমি ওকে কোথাও নিয়ে যাইনি। তুমি নিয়ে গিয়েছিলে।”

“মিথ্যে!”

“তা হলে মনে করার চেষ্টা করো। বারো বছর আগে তুমি কেন সেদিন রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলে? অনন্যাকে তুমি কী বলেছিলে? সিগন্যাল কেবিনে ঢোকার আগে ওর হাতে কী দিয়েছিলে?”

অরিন্দম চোখ বন্ধ করল।

স্মৃতির ভেতর থেকে কিছু অস্পষ্ট ছবি ভেসে উঠল। দুর্গাপুজোর দশমী। বিসর্জনের ঢাক। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া রাস্তা। অনন্যার লাল ছাতা। তারপর একটা ছোট্ট বাক্স, যার ভেতরে ছিল রুপোর তৈরি একটি পায়েল।

পায়েলটি তাদের মায়ের।

মা মারা যাওয়ার আগে অনন্যাকে সেটি দিয়েছিলেন। অনন্যা কোনও দিন সেটি পা থেকে খুলত না।

কিন্তু সেই রাতে অরিন্দম নিজেই অনন্যার পায়েলটি খুলে নিজের পকেটে রেখেছিল।

কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর মনে পড়তেই তার মাথার মধ্যে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হল।

“থামো!” সে চিৎকার করে উঠল। “আমার মাথায় এসব ঢোকানোর চেষ্টা কোরো না!”

দ্বিতীয় অরিন্দমের হাসি মিলিয়ে গেল।

“আমি কিছু ঢোকাচ্ছি না। তোমার ভেতরে যা আছে, শুধু সেটাই বেরিয়ে আসছে।”

ঠিক তখনই বৃদ্ধ স্টেশনমাস্টার হরিপদ মণ্ডল দৌড়ে এসে অরিন্দমের সামনে দাঁড়ালেন।

“ওর দিকে তাকাবেন না! চোখ সরিয়ে নিন!”

দ্বিতীয় অরিন্দমের মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।

“হরিপদকাকু, এত বছর পরেও আপনি একই ভুল করছেন?”

বৃদ্ধের শরীর কেঁপে উঠল।

“তুমি এখানে আসতে পারো না।”

“কেন? এটা কি শুধু তোমার স্টেশন? এই লাইন কি তোমার বাবার?”

“তুমি মৃত!”

কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে যেতেই প্ল্যাটফর্মের সমস্ত আলো নিভে গেল।

অন্ধকারে অরিন্দম শুনতে পেল হরিপদবাবুর হাঁপানোর শব্দ। তারপর ধাতব কিছুর মাটিতে পড়ে যাওয়ার আওয়াজ।

কয়েক সেকেন্ড পরে আলো ফিরে এল।

দ্বিতীয় অরিন্দম নেই।

হরিপদবাবু মাটিতে পড়ে আছেন। তাঁর কপালে কেটে গেছে। অরিন্দম দ্রুত তাঁকে তুলে বসাল।

“আপনি ওকে চেনেন?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “চিনি। কারণ ওর জন্মের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম।”

অরিন্দম অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

“কী বলছেন?”

“আপনার জন্মের সময় আপনার মা যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন।”

অরিন্দমের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল।

“আমার তো কোনও ভাই ছিল না!”

“পরিবারের সবাই জানত, একটি সন্তানই বেঁচে আছে। অন্য সন্তানটি জন্মের পর মারা গিয়েছিল বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই রাতের ঘটনাটা স্বাভাবিক ছিল না।”

“আপনি এত দিন এসব গোপন করেছেন কেন?”

হরিপদবাবু কাঁপা হাতে কপালের রক্ত মুছলেন।

“কারণ আপনার বাবা আমাকে শপথ করিয়েছিলেন। আর কারণ, আমি নিজেও জানতাম না কোন শিশুটি বেঁচে আছে।”

অরিন্দমের মুখ শুকিয়ে গেল।

“কোন শিশুটি বেঁচে আছে মানে?”

“আপনার জন্মের কয়েক ঘণ্টা পর হাসপাতালের বিদ্যুৎ চলে যায়। সেই অন্ধকারে দুটো শিশুর কান্না শোনা গিয়েছিল। কিন্তু আলো ফিরে আসার পর একটি শিশুই ছিল। আপনার মা দাবি করেছিলেন, তিনি নিজের সন্তানকে চিনতে পারছেন। আপনার বাবা কোনও প্রশ্ন করেননি।”

“আর অন্য শিশুটি?”

“কেউ জানে না।”

হরিপদবাবু পকেট থেকে একটি পুরোনো চাবি বের করলেন। চাবিটির মাথায় খোদাই করা আছে ইংরেজি অক্ষর—S-13।

“এই চাবিটা নিন। তেরো নম্বর সিগন্যাল কেবিন খুলতে পারবেন।”

“সিগন্যাল কেবিন তো বারো বছর আগে পুড়ে গিয়েছিল!”

“বাইরের অংশ পুড়েছিল। নিচে একটা ঘর ছিল, যার কথা রেলের নথিতেও নেই। আপনার বোনের নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সেই ঘরের সম্পর্ক আছে।”

“আপনি আমাকে সেখানে যেতে বলছেন?”

“না। আমি আপনাকে সতর্ক করছি। সেখানে গেলে এমন কিছু জানতে পারবেন, যা জানার পর নিজের জীবনকে আর আগের মতো দেখতে পারবেন না।”

অরিন্দম চাবিটি হাতে নিল।

“আমার জীবন তো বারো বছর আগেই বদলে গেছে।”

বৃদ্ধ তার হাত চেপে ধরলেন।

“আর একটা কথা। রাত বারোটার আগে সেখানে পৌঁছোতে হবে। ঘড়ির কাঁটা বারোটায় পৌঁছোলেই এই স্টেশনের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।”

“কোন দরজা?”

হরিপদবাবু উত্তর দিলেন না।

তিনি শুধু রেললাইনের দিকে তাকালেন।

ট্রেনটি আর নেই।

কিন্তু তার রেখে যাওয়া রেললাইনের ওপর ধোঁয়ার মতো একটি কালো রেখা ভাসছে। রেখাটি ধীরে ধীরে সরে গিয়ে প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো লোহার দরজার আকার নিল।

অরিন্দম সেই দরজাটি আগে কখনও দেখেনি।

দরজার ওপরে লেখা—

সিগন্যাল কেবিন—১৩।


রাত এগারোটা পঞ্চান্ন।

অরিন্দম দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চাবিটি তালায় ঢোকাল। তালাটি যেন তার অপেক্ষাতেই ছিল। একবার ঘোরাতেই দরজা খুলে গেল।

ভেতরে নামার জন্য সরু সিঁড়ি।

সিঁড়ির দেওয়ালে জমাট কালো দাগ। কোথাও কোথাও পোড়া কাঠের গন্ধ। নিচ থেকে ভেসে আসছে একটা মেয়ের গুনগুন করে গান গাওয়ার শব্দ।

সুরটা শুনেই অরিন্দমের বুক ধক করে উঠল।

এই গান তার মা গাইতেন।

অনন্যা ছোটবেলায় সেই গান শুনে ঘুমোত।

অরিন্দম ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। প্রতিটি ধাপে মনে হচ্ছিল, সে নিজের জীবনের কোনও পুরোনো দিনের দিকে ফিরে যাচ্ছে।

নিচে পৌঁছে সে একটি ছোট ঘর দেখতে পেল।

ঘরের মাঝখানে কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর একটি কেরোসিনের লণ্ঠন, কিছু পুরোনো কাগজ, আর একটি টেপ রেকর্ডার। দেওয়ালে ঝুলছে বারোটি ঘড়ি। প্রত্যেকটির কাঁটা আলাদা সময়ে থেমে আছে।

ঘরের শেষ প্রান্তে বসে আছে অনন্যা।

তার হাতে লাল ছাতা নেই। পরনে বারো বছর আগের সেই নীল ফ্রক, যেটি পরে সে দশমীর রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল।

অরিন্দমের চোখে জল চলে এল।

“অনন্যা!”

মেয়েটি মুখ তুলল।

এবার তার চোখে কোনও অপরিচিতির ছায়া নেই।

“দাদা, তুমি এসেছ!”

অরিন্দম ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

কিন্তু পরক্ষণেই সে থমকে গেল।

অনন্যার শরীর বরফের মতো ঠান্ডা।

“তুই এতদিন কোথায় ছিলি?”

অনন্যা উত্তর না দিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

“দাদা, তুমি কি সব মনে করতে পেরেছ?”

“কিছু কিছু। কিন্তু কী হয়েছিল সেদিন? তোকে কে নিয়ে গিয়েছিল?”

অনন্যা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“কেউ আমাকে নিয়ে যায়নি। আমি নিজেই গিয়েছিলাম।”

“কোথায়?”

“যে জায়গায় তুমি আমাকে রেখে এসেছিলে।”

অরিন্দমের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

“আমি তোকে রেখে এসেছিলাম?”

“হ্যাঁ। তুমি বলেছিলে, একটু অপেক্ষা করতে। তারপর তুমি দরজা বন্ধ করে চলে গিয়েছিলে।”

“না! আমি তোকে ছেড়ে যাইনি!”

অনন্যার চোখে জল জমল।

“তুমি কি মনে করতে পারছ না, দাদা? আগুন লাগার আগে তুমি আমার হাত থেকে পায়েলটা খুলে নিয়েছিলে। তারপর বলেছিলে, ওটা তোমার দরকার।”

অরিন্দম নিজের পকেট হাতড়াল। তার কাছে কোনও পায়েল নেই।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার ডান হাতের তালুতে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হল। সে হাত খুলে দেখল, তালুর মাঝখানে একটি সরু লাল দাগ ফুটে উঠেছে। ঠিক যেন কোনও ধারালো ধাতু দিয়ে কেউ কেটে দিয়েছে।

অনন্যা তার হাতের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করল, “তুমি এখনও ওটা বহন করছ।”

“কী?”

“দরজা খোলার চাবি।”

ঘরের টেবিলের ওপর রাখা টেপ রেকর্ডারটি নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

প্রথমে শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর এক নারীর কণ্ঠ।

“যদি কেউ এই রেকর্ডিং শুনে থাকো, তা হলে বুঝতে হবে, সময় আবার ফিরে এসেছে। আমার দুই ছেলের মধ্যে একজন এই পৃথিবীতে আছে, অন্যজন আছে সময়ের বাইরে। কিন্তু তাদের মধ্যে কে আসল, আর কে ছায়া—তা কেউ জানে না।”

অরিন্দম নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে লাগল।

কণ্ঠটি তার মায়ের।

“আমি সত্যিটা লুকিয়েছিলাম। কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমি জানতাম, যে শিশুটি আমার কোলে ছিল, সে আমারই সন্তান। কিন্তু অন্য শিশুটিও আমার সন্তান ছিল। তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলাম। তার জন্যই তেরো নম্বর সিগন্যাল কেবিন তৈরি হয়েছিল।”

টেপে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর আবার কণ্ঠ শোনা গেল।

“কিন্তু দরজাটি খোলার পর যে মানুষটি ফিরে এল, সে আমার ছেলে ছিল না।”

অরিন্দমের শরীর অবশ হয়ে গেল।

“মা…”

রেকর্ডিং চলতে থাকল।

“সে আমার ছেলের মুখ নিয়ে এসেছিল। আমার ছেলের কণ্ঠে কথা বলেছিল। এমনকি আমার ছেলের স্মৃতিও তার ছিল। কিন্তু সে কখনও কাঁদত না। কখনও ঘুমোত না। আর প্রতি আঠারোই অক্টোবর সে জানালার বাইরে তাকিয়ে এমন একজনকে খুঁজত, যে কোনও দিন জন্মায়নি।”

হঠাৎ টেপের শব্দ কেঁপে উঠল।

একটি শিশুর কান্না শোনা গেল।

তারপর মায়ের কণ্ঠ খুব নিচু হয়ে এল।

“অরিন্দম, যদি তুমি এই রেকর্ডিং শুনে থাকো, তা হলে একটা কথা মনে রেখো। তুমি যাকে নিজের ভাই ভাবছ, সে তোমার ভাই নয়। সে তোমার ভবিষ্যৎও নয়। সে এমন একজন মানুষ, যে তোমার জীবনের একটি রাত চুরি করেছে।”

রেকর্ডিং থেমে গেল।

অরিন্দমের পা কাঁপছিল। সে টেবিলের ধার ধরে দাঁড়াল।

“অনন্যা, আমার মা এসব কী বলছেন?”

অনন্যা মুখ নামিয়ে বলল, “মা সব জানতেন।”

“তাহলে আমাকে কিছু বলেননি কেন?”

“কারণ মা জানতেন না, তুমি কোনজন।”

“কোনজন?”

অনন্যা এবার তার দিকে তাকাল।

“তুমি যে অরিন্দম, সেই অরিন্দম বারো বছর আগে আগুনে মারা গিয়েছিল।”

ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তে জমে গেল।

অরিন্দম কিছু বলতে পারল না।

অনন্যা তার হাত ধরে বলল, “তুমি যাকে দেখেছ, যে তোমার মুখ নিয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল, সে-ই আসল অরিন্দম। আর তুমি…”

“চুপ কর!”

অরিন্দমের চিৎকারে ঘরের দেওয়াল কেঁপে উঠল।

“আমি অরিন্দম! আমি আমার বাবা-মাকে চিনি, আমার শৈশবকে চিনি, আমার বোনকে চিনি! তুমি কীভাবে বলতে পারিস আমি অন্য কেউ?”

অনন্যা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “কারণ আমি তোমাকে সেই রাত থেকে চিনি, দাদা। তুমি আমার হাত ধরে আগুনের মধ্যে ঢুকেছিলে। তারপর তুমি আমাকে ঠেলে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলে। তুমি নিজে ভেতরে থেকে গিয়েছিলে।”

“না…”

“আমি ফিরে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলে। তারপর বিস্ফোরণ হয়েছিল। আমি যখন জ্ঞান ফিরে পাই, তখন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ট্রেনের শেষ কামরায় তুমি বসে ছিলে। তুমি আমাকে চিনতে পারোনি।”

অরিন্দমের চোখের সামনে সবকিছু ঘুরতে লাগল।

তার স্মৃতিতে আগুনের ছবি ফুটে উঠল। ধোঁয়া। চিৎকার। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছায়া। আর সেই ছায়ার মুখ—তার নিজের মুখ।

সে হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা একটি পুরোনো ফাইল দেখতে পেল। ফাইলের ওপরে লেখা—

দুর্ঘটনা প্রতিবেদন: ১৮ অক্টোবর, বারো বছর আগে।

ফাইল খুলতেই একটি ছবি বেরিয়ে এল।

ছবিতে দুটি দেহ পাশাপাশি পড়ে আছে। একজন কিশোরী—অনন্যা। অন্যজন এক কিশোর।

কিশোরটির মুখ অরিন্দমের মতো।

ছবির নিচে লাল কালিতে লেখা—

“দেহ দুটি শনাক্ত করা যায়নি। তবে স্থানীয় সাক্ষীর দাবি, ঘটনাস্থলে তিনজন উপস্থিত ছিল।”

অরিন্দমের চোখ আটকে গেল শেষ বাক্যে।

তিনজন?

সেদিন তো সেখানে ছিল সে আর অনন্যা।

তৃতীয় মানুষটি কে?

ঠিক তখনই ঘরের পেছনের দেওয়ালে একটি ছোট দরজা খুলে গেল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই দ্বিতীয় অরিন্দম।

তার মুখে এবার হাসি নেই।

সে অনন্যার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি ওকে সব বলে দিয়েছ?”

অনন্যা উঠে দাঁড়াল।

“এবার আর কিছু লুকোনোর নেই।”

দ্বিতীয় অরিন্দম ঘরে ঢুকল। তার হাতে সেই পোড়া লাল ছাতা। ছাতার ডগা থেকে কালো জল মেঝেতে পড়ছে।

সে অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি অনেক কিছু জানতে পেরেছ। কিন্তু একটা জিনিস এখনও জানো না।”

“কী?”

“যে মানুষটিকে তুমি বারো বছর ধরে নিজের বাবা বলে জেনে এসেছ, তিনি তোমার বাবা নন।”

অরিন্দমের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

“মিথ্যে বলছ!”

“তা হলে ওই ফাইলের শেষ পাতাটা দেখো।”

দ্বিতীয় অরিন্দম ফাইলের দিকে ইশারা করল।

অরিন্দম কাঁপা হাতে শেষ পাতাটি উল্টে দিল।

সেখানে একটি জন্মনিবন্ধনের নথির অনুলিপি। তারিখ—১৮ অক্টোবর, বারো বছর আগের নয়, তারও বহু আগে। দুটি শিশুর নাম লেখা। প্রথম শিশুর নাম অরিন্দম বসু। দ্বিতীয় শিশুর নাম লেখা ছিল না। শুধু একটি শব্দ—

“প্রতিচ্ছবি।”

নথির নিচে স্বাক্ষর করেছিলেন একজন চিকিৎসক।

ডা. নীলাঞ্জন রায়।

অরিন্দম নামটি চিনতে পারল। এই চিকিৎসকই তার জন্মের সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তিনি মারা গিয়েছিলেন বহু বছর আগে।

নথির পাশে একটি হাতে লেখা বাক্য—

“যদি দ্বিতীয় শিশুটি ফিরে আসে, তাকে কখনও আয়না দেখিও না।”

অরিন্দম ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

ঘরের একমাত্র জানালার কাচে তার প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু প্রতিচ্ছবিটি তার মতো নড়ছে না।

অরিন্দম ডান হাত তুলল।

কাচের ওপাশের মানুষটি বাঁ হাত তুলল।

অরিন্দম পিছিয়ে গেল।

প্রতিচ্ছবিটি হাসল।

তারপর কাচের ভেতর থেকে একটি হাত বেরিয়ে এল।

সেই হাতটি অরিন্দমের কবজি শক্ত করে ধরে ফেলল।

অনন্যা চিৎকার করে উঠল, “দাদা, চোখ বন্ধ করো!”

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

কাচের ওপাশ থেকে ভেসে এল একটি শিশুর কণ্ঠ—

“বাবা, আমি বাড়ি ফিরতে চাই।”

অরিন্দমের চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল।

জ্ঞান হারানোর ঠিক আগে সে দেখতে পেল, দ্বিতীয় অরিন্দম তার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

আর অনন্যা মাটিতে পড়ে থাকা লাল ছাতাটি তুলে নিয়ে ফিসফিস করে বলছে—

“এবার বুঝতে পারবে, কে আসল আর কে ছায়া।”


রাত বারোটা এক মিনিট।

শালবন জংশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ঘড়িটি আবার থেমে গেল।

স্টেশনমাস্টার হরিপদ মণ্ডল একা বসে ছিলেন। তাঁর সামনে একটি পুরোনো রেজিস্টার খোলা। তিনি কাঁপা হাতে নতুন একটি নাম লিখলেন—

অরিন্দম বসু—শেষ যাত্রার যাত্রী।

তারপর রেজিস্টার বন্ধ করে তিনি ফিসফিস করে বললেন, “এবার হয়তো একজন ফিরে আসবে।”

ঠিক সেই মুহূর্তে স্টেশনের দূর প্রান্ত থেকে একটি ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

কিন্তু ট্রেনটি আসছিল না।

ট্রেনটি চলে যাচ্ছিল।

আর তার শেষ কামরার জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি ছিল অরিন্দমের বাবা।

যিনি বারো বছর আগে মারা গিয়েছিলেন।

তাঁর হাতে একটি সাদা খাম।

খামের ওপরে লেখা—

“যে ছেলেটি এখনও জন্মায়নি, তার জন্য।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *