Categories
অনুগল্প বিবিধ

যে রান্নাঘরে অপচয়ের হিসাব রাখা হতো।

শহরের একটি সরকারি আবাসিক বিদ্যালয়ে প্রতিদিন প্রায় আটশো ছাত্রছাত্রীর রান্না হতো। সকাল থেকে বিশাল রান্নাঘরে ব্যস্ততা চলত। কেউ চাল ধুতেন, কেউ সবজি কাটতেন, কেউ ডাল বসাতেন। দুপুরের ঘণ্টা বাজলে খাবারের গন্ধে ভরে উঠত বিদ্যালয়ের উঠোন।

কিন্তু রান্নাঘরের বাইরে প্রতিদিন একটি দৃশ্য দেখা যেত। খাবার শেষ হওয়ার পরে বড় বড় পাত্রে জমে থাকত অব্যবহৃত ভাত, ডাল এবং তরকারি। কিছু খাবার নষ্ট হয়ে যেত, কিছু আবার ফেলে দিতে হতো।

বিদ্যালয়ের নতুন খাদ্যতালিকা ও সরবরাহ ব্যবস্থার দায়িত্ব পেয়েছিল তিরিশ বছরের অনির্বাণ। সে রান্না করত না, কিন্তু কোন দিন কতটা চাল, ডাল, তেল ও সবজি লাগবে, তার হিসাব রাখত। প্রথম কয়েক দিন সে ভেবেছিল, এত বড় বিদ্যালয়ে সামান্য খাবার নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। পরে সে বুঝতে পারল, প্রতিদিনের সামান্য অপচয় মাসের শেষে অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়।

একদিন দুপুরে সে দেখল, রান্নাঘরের কর্মী শেফালি দেবী একটি পাত্রে জমে থাকা ভাতের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।

অনির্বাণ জিজ্ঞাসা করল, “এত ভাত বেঁচে গেল কেন?”

শেফালি দেবী বললেন, “আজ ছাত্রদের উপস্থিতি কম ছিল। কিন্তু আমরা তো আগের হিসাব অনুযায়ী রান্না করেছি। আবার কোনও দিন হঠাৎ বেশি ছাত্র খেতে আসে। তখন খাবার কম পড়ে যায়। আগে থেকে ঠিক বোঝা কঠিন।”

অনির্বাণ কথাটা গুরুত্ব দিয়ে নিল।

পরের দিন থেকে সে শুধু বাজারের খরচের হিসাব না রেখে খাবারের অপচয়ের হিসাবও রাখতে শুরু করল। প্রতিটি খাবারের আগে কতজন ছাত্র উপস্থিত ছিল, কতটা রান্না হয়েছিল, কতটা পরিবেশন করা হয়েছিল এবং কতটা অবশিষ্ট ছিল—সব লিখে রাখল।

প্রথম সপ্তাহে কয়েকজন কর্মী বিরক্ত হলেন।

“এত বছর ধরে রান্না করছি,” একজন বললেন, “এখন কি আমাদের শেখাতে হবে কতটা ভাত বসাতে হবে?”

অনির্বাণ বুঝতে পারল, নতুন ব্যবস্থা চালু করতে গেলে কাউকে অপমান করা চলবে না। সে বলল, “আপনাদের অভিজ্ঞতার ওপরই এই হিসাব দাঁড়াবে। আমি শুধু সংখ্যাগুলো এক জায়গায় রাখছি, যাতে আপনাদের কাজ আরও সহজ হয়।”

শেফালি দেবী তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। তিনি জানালেন, সোমবার সাধারণত অনেক ছাত্র বাড়ি থেকে ফিরে আসে না। পরীক্ষার দিন দুপুরের খাবার কম লাগে। আবার খেলাধুলার প্রতিযোগিতা থাকলে অনেকের খিদে বেশি পায়।

এই অভিজ্ঞতাগুলোকে উপস্থিতির নথির সঙ্গে মিলিয়ে অনির্বাণ একটি সহজ হিসাব তৈরি করল। প্রতিদিনের উপস্থিতি, খাবারের ধরন এবং আগের দিনের অবশিষ্ট খাবারের পরিমাণ দেখে রান্নার আনুমানিক পরিমাণ ঠিক করা হতো। তবে জরুরি পরিস্থিতির জন্য কিছু অতিরিক্ত খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হলো।

এতেই সব সমস্যার সমাধান হলো না। কয়েকজন ছাত্র অভিযোগ করল, তাদের প্রিয় তরকারি খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়, অথচ অন্য তরকারি পড়ে থাকে।

অনির্বাণ বুঝল, শুধু কতটা খাবার রান্না হচ্ছে, তা নয়—কোন খাবার কতটা গ্রহণ করা হচ্ছে, সেটাও জানা দরকার।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে সে একটি ছোট সমীক্ষার ব্যবস্থা করল। ছাত্রছাত্রীরা জানাল, কোন খাবার তাদের ভালো লাগে, কোন খাবারে অতিরিক্ত তেল থাকে বলে তারা খেতে চায় না এবং কোন সবজি অন্যভাবে রান্না করলে ভালো খাবে।

রান্নাঘরের কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে কয়েকটি পদে সামান্য পরিবর্তন আনা হলো। খাবারের স্বাদ বজায় রেখে অতিরিক্ত তেল কমানো হলো, আর কিছু সবজি রান্নার পদ্ধতি বদলে পরিবেশন করা শুরু হলো। ছাত্রদেরও বোঝানো হলো, খাবার যতটা খেতে পারবে, ততটাই প্রথমে নিতে হবে; প্রয়োজন হলে পরে আবার নেওয়া যাবে।

এক মাস পরে হিসাবের খাতা খুলে অনির্বাণ দেখল, অবশিষ্ট খাবারের পরিমাণ কমেছে। বাজারের খরচও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সবচেয়ে বড় কথা, খাবার কম পড়ার ঘটনাও আগের তুলনায় কমেছে।

কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন এসেছিল রান্নাঘরের কর্মীদের মনোভাবে। তাঁরা নিজেরাই এখন পরের দিনের উপস্থিতি জানতে চাইতেন, আগের দিনের হিসাব দেখতেন এবং রান্নার পরিমাণ নিয়ে আলোচনা করতেন।

একদিন বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল। বাইরের অতিথি ও অতিরিক্ত ছাত্রছাত্রীর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অনির্বাণ ও শেফালি দেবী আলাদা পরিকল্পনা করলেন। প্রথমে নিয়মিত ছাত্রদের খাবার তৈরি হলো, পরে উপস্থিতির ভিত্তিতে অতিরিক্ত খাবার প্রস্তুত করা হলো। ফলে শেষ পর্যন্ত কারও খাবার কম পড়ল না, আবার প্রচুর খাবারও নষ্ট হলো না।

প্রধান শিক্ষক সভায় অনির্বাণকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, “তুমি আমাদের নতুন কোনও যন্ত্র এনে দাওনি। তুমি আমাদের নিজেদের কাজকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছ।”

অনির্বাণ উত্তর দিল, “আমি একা কিছু করিনি। শেফালি দেবী ও রান্নাঘরের সবাই নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহায্য করেছেন। হিসাবটা তখনই কাজে লেগেছে, যখন আমরা সবাই মিলে তা ব্যবহার করেছি।”

বছর শেষে বিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে খাবারের অপচয় কমানোর উদ্যোগটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হলো। পরে পাশের আরেকটি আবাসিক বিদ্যালয়ও তাদের কাছ থেকে হিসাব রাখার পদ্ধতি শিখে নিল।

অনির্বাণের কাছে সেই দিনটি ছিল বিশেষ। সে বুঝেছিল, বড় পরিবর্তন সব সময় বড় আবিষ্কার দিয়ে শুরু হয় না। কখনও কখনও একটি খাতা, কয়েকটি সঠিক প্রশ্ন এবং মানুষের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করার মানসিকতাই যথেষ্ট।

রান্নাঘরে এখনও প্রতিদিন ভাতের গন্ধ ওঠে, ডাল ফুটতে থাকে, সবজি কাটা হয়। তবে এখন প্রতিটি পাত্রের সঙ্গে জুড়ে গেছে একটি নতুন অভ্যাস—প্রয়োজন বুঝে রান্না করা এবং খাবারের মূল্যকে সম্মান করা।

শিক্ষা: অপচয় কমাতে শুধু ভালো ইচ্ছা নয়, সঠিক হিসাব, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সম্পদের মূল্য বুঝে ব্যবহার করতে পারলে সামান্য পরিবর্তনও বড় উপকার আনতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *