জেলার দাবা প্রতিযোগিতায় সাতাশ নম্বর বোর্ডটির সামনে বসে ছিল অনিরুদ্ধ। বয়স মাত্র ষোলো। স্কুলের বন্ধুদের কাছে সে ছিল শান্ত স্বভাবের ছেলে, কিন্তু দাবার বোর্ডে বসলে তার চোখে অন্য রকম তীক্ষ্ণতা দেখা যেত। প্রতিপক্ষের চালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাগুলো খুঁজে বের করতে সে ভালোবাসত।
এবারের প্রতিযোগিতায় তার লক্ষ্য ছিল জেলা চ্যাম্পিয়ন হওয়া। গত এক বছর ধরে সে নিয়মিত অনুশীলন করেছে। বাড়ির ছোট ঘরটিতে দেওয়ালজুড়ে সাজানো ছিল দাবার বিখ্যাত খেলোয়াড়দের ছবি। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত দু’ঘণ্টা সে দাবা খেলত।
প্রতিযোগিতার শেষ দিনের সকালে আয়োজকরা ঘোষণা করলেন, আজকের খেলায় যে জিতবে, সে পরের বছরের রাজ্যস্তরের প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
অনিরুদ্ধের প্রতিপক্ষ ছিল রুদ্রাংশু। সে বয়সে বড়, অভিজ্ঞ এবং গতবারের জেলা চ্যাম্পিয়ন। খেলা শুরু হওয়ার পর প্রথম কয়েকটি চালেই বোঝা গেল, দু’জনের মধ্যে লড়াই সহজ হবে না।
প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে খেলা চলল। বোর্ডের চারপাশে দর্শকেরা নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। একসময় রুদ্রাংশু নিজের একটি ঘুঁটি এমন জায়গায় রাখল, যেখান থেকে অনিরুদ্ধের রানি বিপদের মুখে পড়তে পারে।
অনিরুদ্ধ কয়েকটি সম্ভাব্য চাল হিসাব করল। তার মনে হলো, প্রতিপক্ষের পরের চালেই সে বড় সুবিধা পেয়ে যাবে। কিন্তু একটু মন দিয়ে দেখতেই তার চোখে পড়ল, রুদ্রাংশুর আগের চালের মধ্যে একটি অদ্ভুত অসংগতি রয়েছে।
ঘুঁটিটি যে ঘরে রাখা হয়েছে, সেখানে পৌঁছতে হলে নিয়ম অনুযায়ী অন্য একটি ঘুঁটির বাধা অতিক্রম করতে হয়। দাবার নিয়মে সেই চাল বৈধ নয়।
অনিরুদ্ধ সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলল।
“বিচারক মহাশয়, আমার একটি আপত্তি আছে।”
প্রধান বিচারক এসে বোর্ড পরীক্ষা করলেন। রুদ্রাংশু প্রথমে বলল, সে ঘুঁটিটি ঠিকভাবেই চালিয়েছে। কিন্তু বিচারক বোর্ডের অবস্থান এবং চালের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করে বুঝলেন, চালটি বৈধ ছিল না।
খেলা থামিয়ে দেওয়া হলো। নিয়ম অনুযায়ী, বিচারকদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আগের অবস্থান ফিরিয়ে আনা হবে কি না এবং পরবর্তী ব্যবস্থা কী হবে, তা নির্ধারণ করা হলো। রুদ্রাংশু বিরক্ত হয়ে অনিরুদ্ধের দিকে তাকাল।
“তুমি তো বুঝতেই পারছিলে আমি জিততে চলেছি। একটু অপেক্ষা করতে পারতে। হয়তো খেলা শেষ হয়ে যেত।”
অনিরুদ্ধ শান্তভাবে বলল, “আমি জিতব কি হারব, সেটা আলাদা কথা। কিন্তু খেলা যদি নিয়ম মেনে না হয়, তাহলে ফলাফলের মূল্য কোথায়?”
রুদ্রাংশু আর কিছু বলল না।
বিচারকদের সিদ্ধান্তের পর খেলা আবার শুরু হলো। এবার অনিরুদ্ধ আগের মতো আক্রমণাত্মক খেলল না। সে ধীরে ধীরে নিজের ঘুঁটিগুলো সাজাল, প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য চালগুলো পরীক্ষা করল এবং কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বোর্ডের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘর দেখল।
শেষ পর্যন্ত খেলাটি ড্র হলো।
দর্শকদের অনেকেই অবাক হলেন। অনিরুদ্ধ জিততে পারেনি, কিন্তু তার আচরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। কেউ বললেন, সে চাইলে আপত্তি না জানিয়ে নিজের সুবিধা নিতে পারত। আবার কেউ বললেন, দাবায় নিয়ম মানাই তো খেলার মূল ভিত্তি।
প্রতিযোগিতা শেষে পুরস্কার বিতরণের সময় প্রধান বিচারক মঞ্চে উঠে একটি বিশেষ ঘোষণা করলেন।
“এবারের প্রতিযোগিতায় সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার অন্য কেউ পেয়েছে। কিন্তু খেলায় সততা ও নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধার জন্য আমরা অনিরুদ্ধকে বিশেষ সম্মান জানাচ্ছি।”
অনিরুদ্ধ মঞ্চে উঠল। তার হাতে তুলে দেওয়া হলো একটি ছোট ট্রফি। তাতে লেখা ছিল—‘ন্যায্য খেলার সম্মান’।
বাড়ি ফেরার পথে তার বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, “জেলা চ্যাম্পিয়ন হতে না পেরে তোমার কি খারাপ লাগছে?”
অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “লাগছে। আমি জিততে চেয়েছিলাম। কিন্তু যদি ভুল চালের সুযোগ নিয়ে জিততাম, তাহলে ট্রফিটা বাড়িতে রাখতে পারতাম ঠিকই, নিজের কাছে তার ব্যাখ্যা দিতে পারতাম না।”
বাবা ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “জেতার আনন্দ অনেক বড়, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারার আনন্দও কম নয়।”
পরের কয়েক সপ্তাহ অনিরুদ্ধ আবার অনুশীলন শুরু করল। এবার সে শুধু চাল মুখস্থ করত না; প্রতিটি অবস্থানে কেন একটি চাল ভালো, কেন অন্যটি বিপজ্জনক—তা বোঝার চেষ্টা করত। নিজের ভুলগুলোও খাতায় লিখে রাখত।
একদিন তার দাবার প্রশিক্ষক বললেন, “তুমি এখন আগের চেয়ে ভালো খেলছ। কারণ, তুমি শুধু প্রতিপক্ষকে হারানোর কৌশল শিখছ না, নিজের বিচারবুদ্ধিকেও শাণিত করছ।”
অনিরুদ্ধ হাসল।
পরের বছর সে আবার জেলা প্রতিযোগিতায় অংশ নিল। এবারও কঠিন প্রতিপক্ষ ছিল, ভুলও করল কয়েকটি। কিন্তু তাড়াহুড়ো না করে সে নিজের ভুল বুঝে নিল, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করল এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করল।
পুরস্কার নেওয়ার সময় তার মনে পড়ল আগের বছরের সেই ড্র হওয়া খেলাটির কথা। সে বুঝল, সেদিনের বিশেষ সম্মান তাকে শুধু সততার মূল্য শেখায়নি; হার মেনে নিয়ে আরও ভালো হওয়ার সাহসও দিয়েছিল।
সাতাশ নম্বর বোর্ডটি আজও সেই দাবা ক্লাবের ঘরে রাখা আছে। বোর্ডটির কোনও বিশেষ ক্ষমতা নেই, কিন্তু ক্লাবের নতুন খেলোয়াড়দের অনিরুদ্ধ প্রায়ই সেখানে বসিয়ে একটি কথা বলে—
“দাবায় প্রতিটি ঘর গুরুত্বপূর্ণ। আর জীবনে প্রতিটি সিদ্ধান্তেরও একটা মূল্য আছে।”
শিক্ষা: সাফল্য শুধু জয়ের নাম নয়। ন্যায্য পথে এগোনো, ভুল স্বীকার করা এবং পরাজয় থেকে শিক্ষা নেওয়াও প্রকৃত সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।