Categories
গল্প বিবিধ

গল্প ১৬৬: যে বীজে ফুটেছিল ক্ষমার ফুল।।

শিউলিপুর গ্রামের এক প্রান্তে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল দুটি বাড়ি। একটি বাড়িতে থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত ডাককর্মী হরিপদবাবু, আর অন্যটিতে তাঁর প্রতিবেশী নরেনবাবু। একসময় দুজনের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ভালো। গ্রামের মানুষ বলত, তাঁদের বন্ধুত্ব দেখলে মনে হয়, তাঁরা বুঝি একই পরিবারের সদস্য।

কিন্তু একটি ছোট্ট ঘটনার পর সেই সম্পর্কের মধ্যে এমন একটি দেওয়াল উঠে গেল, যা দিনের পর দিন আরও উঁচু হতে লাগল।

ঘটনাটি ঘটেছিল বর্ষার এক সকালে। হরিপদবাবুর বাড়ির পাশে ছিল একটি পুরোনো আমগাছ। গাছটির কয়েকটি ডাল নরেনবাবুর উঠোনের দিকে ঝুঁকে ছিল। একদিন ঝড়ে একটি বড় ডাল ভেঙে নরেনবাবুর বাগানের বেড়া ক্ষতিগ্রস্ত করল। সেই বেড়ার পাশে নরেনবাবু যত্ন করে লাগিয়েছিলেন কয়েকটি দুর্লভ ফুলের গাছ।

ক্ষতি দেখে তিনি রাগে ফেটে পড়লেন।

—আপনার গাছের জন্য আমার বাগানটা নষ্ট হয়ে গেল! কতবার বলেছি, ডালগুলো ছাঁটুন। আপনি কোনো কথাই শোনেন না!

হরিপদবাবুও অপমানিত বোধ করলেন।

—ঝড়ে ডাল ভেঙেছে, আমি তো ইচ্ছে করে ভাঙিনি। এত বছর ধরে গাছটা আছে, কখনো তো এমন হয়নি!

—আপনার কাছে গাছের দাম আছে, অন্যের পরিশ্রমের দাম নেই!

কথাগুলো হরিপদবাবুর মনে গভীর আঘাত করল। তিনি আর উত্তর দিলেন না। পরদিন থেকেই দুই বাড়ির মাঝখানের ছোট পথটি যেন অদৃশ্য সীমান্তে পরিণত হলো। কেউ কারও বাড়িতে যেতেন না, উৎসবে দেখা হলেও মুখ ফিরিয়ে নিতেন।

গ্রামের কয়েকজন তাঁদের মিটমাট করানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দুজনেরই মনে ছিল অভিমান। প্রত্যেকেই ভাবতেন, প্রথমে ক্ষমা চাইতে হবে অন্যজনকে।

সময় গড়িয়ে গেল। আমগাছের ডাল ছাঁটা হলো, বেড়াও মেরামত করা হলো। কিন্তু সম্পর্কের ভাঙা বেড়াটি আর জোড়া লাগল না।

এই গ্রামেরই বাসিন্দা ছিল নরেনবাবুর নাতনি মেঘলা। সে তখন কলেজে পড়ে। গাছপালা আর ফুলের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ছিল। ছুটিতে বাড়ি এসে সে দাদুর বাগানের যত্ন নিত। একদিন বাগানের মাটি খুঁড়তে গিয়ে সে একটি ছোট টিনের বাক্স পেল। বাক্সটির ভেতরে ছিল কয়েকটি শুকনো বীজ আর একটি কাগজে লেখা নামের তালিকা।

মেঘলা দাদুকে জিজ্ঞেস করল, —দাদু, এই বীজগুলো কার?

নরেনবাবু বাক্সটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—অনেক দিনের পুরোনো। তোর ঠাকুমা বিভিন্ন জায়গা থেকে ফুলের বীজ সংগ্রহ করতেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল, বাড়ির চারপাশটা নানা রঙের ফুলে ভরে উঠুক। কিছু বীজ রয়ে গেছে, কিছু আর অঙ্কুরিত হয় না।

—আমি চেষ্টা করে দেখব?

নরেনবাবু হেসে বললেন, —চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? তবে এত পুরোনো বীজ থেকে গাছ হবে কি না, বলা যায় না।

মেঘলা বাক্সটি নিজের ঘরে নিয়ে গেল। কাগজে লেখা নামগুলো পড়ে সে বুঝল, কয়েকটি বীজ ছিল এমন ফুলের, যেগুলো এখন তাদের গ্রামে খুব একটা দেখা যায় না। সে কলেজের উদ্ভিদবিদ্যার শিক্ষিকার সঙ্গে যোগাযোগ করল। শিক্ষিকা তাকে বীজগুলো পরীক্ষা করার কিছু সহজ পদ্ধতি শেখালেন। সব বীজ যে বেঁচে আছে, তা নয়। তবু কয়েকটি বীজ যত্ন করে ভিজিয়ে, উপযুক্ত মাটিতে রেখে সে অপেক্ষা করতে লাগল।

প্রথম কয়েক দিন কিছুই হলো না। মেঘলা প্রতিদিন সকালে টবগুলোর কাছে গিয়ে মাটি পরীক্ষা করত। এক সপ্তাহ পর একটি টবে ছোট্ট সবুজ অঙ্কুর দেখা দিল। সে আনন্দে দাদুকে ডাকল।

—দাদু, দেখো! বীজটা জেগে উঠেছে!

নরেনবাবু এগিয়ে এসে অঙ্কুরটির দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল।

—তোর ঠাকুমা থাকলে খুব খুশি হতেন।

মেঘলা সেই অঙ্কুরের ছবি তুলে কলেজের বন্ধুদের দেখাল। কয়েকজন বন্ধু এসে তাকে সাহায্য করতে লাগল। কেউ মাটি তৈরি করল, কেউ ছোট টব জোগাড় করল, কেউ আবার বিভিন্ন গাছের পরিচর্যার তথ্য এনে দিল।

একদিন মেঘলা খেয়াল করল, হরিপদবাবুর আমগাছের নিচে কয়েকটি পুরোনো ফুলের গাছ এখনও বেঁচে আছে। ঝড়ের পরে সেগুলো প্রায় অবহেলায় পড়ে ছিল। তবু মাটির কাছাকাছি কয়েকটি নতুন পাতা বেরিয়েছে।

সে গাছগুলোর ছবি তুলতে গিয়ে দেখল, হরিপদবাবু উঠোনে বসে আছেন।

—কাকু, এই গাছগুলো কি আপনি লাগিয়েছিলেন?

হরিপদবাবু অবাক হয়ে তাকালেন।

—কিছু আমি লাগিয়েছিলাম, কিছু আমার স্ত্রী। কেন বলো তো?

—আমি ফুলের পুরোনো বীজ নিয়ে কাজ করছি। এগুলোর মধ্যে কিছু গাছের সঙ্গে মিল থাকতে পারে। একটু জানতে চেয়েছিলাম।

হরিপদবাবুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

—তোমার ঠাকুমার বাগানের গাছের কথা বলছ? নরেনের বাড়িতেও ছিল এমন কয়েকটি। একসময় আমরা দুজনে মিলে কত গাছ লাগিয়েছি!

কথাটি বলেই তিনি থেমে গেলেন। নিজের অজান্তেই বহু দিনের বন্ধুর নাম তাঁর মুখে চলে এসেছিল।

মেঘলা লক্ষ করল, হরিপদবাবুর চোখে কেবল স্মৃতি নয়, কিছুটা দুঃখও জমে আছে।

সে বলল, —আপনার কাছে কি গাছগুলোর পুরোনো কোনো ছবি আছে? থাকলে আমাকে দেবেন? আমি একটা ছোট প্রদর্শনী করতে চাই।

হরিপদবাবু ভেতরে গিয়ে একটি পুরোনো অ্যালবাম নিয়ে এলেন। তাতে দেখা গেল, বহু বছর আগে তিনি ও নরেনবাবু একসঙ্গে দাঁড়িয়ে বাগানে গাছ লাগাচ্ছেন। ছবির পেছনে তারিখ লেখা ছিল।

ছবিটি দেখে মেঘলা অবাক হলো।

—আপনারা তো সত্যিই খুব ভালো বন্ধু ছিলেন!

হরিপদবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—ছিলাম মা। কখনো কখনো ছোট্ট একটা ঘটনার জন্য মানুষ বড় সম্পর্কটাকেও হারিয়ে ফেলে।

মেঘলা কিছু বলল না। কিন্তু তার মনে একটি পরিকল্পনা জন্ম নিল।

কয়েক সপ্তাহ ধরে সে ও তার বন্ধুরা গ্রামের শিশুদের নিয়ে একটি ছোট ফুলের প্রদর্শনীর আয়োজন করল। সেখানে থাকবে পুরোনো বীজ থেকে জন্মানো গাছ, বিভিন্ন ফুলের পরিচিতি, গাছের যত্নের নিয়ম এবং গ্রামের প্রবীণদের বাগানের পুরোনো ছবি। প্রদর্শনীর নাম রাখা হলো—‘ফুলের স্মৃতি, নতুনের শুরু’।

মেঘলা ইচ্ছে করেই প্রদর্শনীর জন্য এমন একটি জায়গা বেছে নিল, যা দুই বাড়ির মাঝখানে অবস্থিত গ্রামের খোলা মাঠ। সে জানত, হরিপদবাবু ও নরেনবাবু দুজনেই ফুল ভালোবাসেন। কিন্তু তারা একসঙ্গে আসবেন কি না, তা নিয়ে তার মনে সংশয় ছিল।

প্রদর্শনীর দিন সকালে মাঠটি রঙিন ফুলে ভরে উঠল। শিশুরা নিজেদের হাতে লেখা ছোট ছোট পরিচয়পত্র গাছের পাশে লাগিয়ে দিল। একটি টেবিলে রাখা হলো পুরোনো ছবিগুলো।

হরিপদবাবু এসে ছবির সামনে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ পর নরেনবাবুও এলেন। দুজনের চোখাচোখি হলো। তারপর দুজনেই অন্য দিকে তাকিয়ে রইলেন।

মেঘলা এগিয়ে এসে বলল, —দাদু, হরিপদ কাকু, এই ছবিটা দেখুন। এখানে আপনারা দুজনে একসঙ্গে একটা গাছ লাগাচ্ছেন। গাছটা এখনও আছে কি না, সেটা জানার খুব ইচ্ছে আমার।

ছবিটি হাতে নিয়ে নরেনবাবু চুপ করে গেলেন। হরিপদবাবুও কাছে এগিয়ে এলেন।

নরেনবাবু আস্তে করে বললেন, —গাছটা এখনও আছে। তবে আর আগের মতো নেই।

হরিপদবাবু মাথা নিচু করে বললেন, —গাছটা বেঁচে আছে, এটাই তো বড় কথা।

কথাটা শুনে নরেনবাবুর মুখের কঠোর ভাব কিছুটা নরম হলো।

—সেদিন রাগের মাথায় অনেক কথা বলেছিলাম। তোমাকে দোষ দেওয়ার আগে ভাবা উচিত ছিল, ঝড় তো কারও কথা শুনে আসে না।

হরিপদবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, —আমিও তোমার কষ্টটা বুঝতে চাইনি। তোমার বাগানের ক্ষতি হয়েছিল, আমার উচিত ছিল সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য করা।

দুজনের কেউই নাটকীয়ভাবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন না। শুধু হাত বাড়িয়ে দিলেন। অন্যজন সেই হাত ধরে রাখলেন কয়েক মুহূর্ত।

কিন্তু ওই কয়েক মুহূর্তেই বহু বছরের দূরত্ব কিছুটা কমে গেল।

প্রদর্শনীর শেষে মেঘলা একটি ছোট টব দুজনের হাতে তুলে দিল। টবে ছিল সেই পুরোনো বাক্স থেকে জন্মানো একটি ফুলের চারা।

—এটা আপনাদের দুজনের জন্য। আমি চাই, গাছটা এমন জায়গায় লাগানো হোক, যেখানে দুজনেই প্রতিদিন দেখতে পাবেন।

পরদিন সকালে হরিপদবাবু ও নরেনবাবু মিলে দুই বাড়ির মাঝখানের সীমানার পাশে একটি উপযুক্ত জায়গা বেছে নিলেন। মাটি খুঁড়লেন, সার মেশালেন, চারাটি বসালেন। হরিপদবাবু জল দিলেন, নরেনবাবু মাটি আলতো করে চেপে দিলেন।

তারপর নরেনবাবু হেসে বললেন, —এবার কিন্তু গাছের যত্ন দুজনকেই নিতে হবে।

হরিপদবাবু বললেন, —নিশ্চয়ই। তবে ডাল যদি আবার তোমার দিকে বাড়ে, আগে থেকেই বলে দিয়ো!

দুজনেই হেসে উঠলেন। অনেক দিন পর সেই হাসি দুই বাড়ির উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল।

মাস কয়েক পরে চারাগাছে প্রথম ফুল ফুটল। ফুলটি খুব বড় ছিল না, তার রংও খুব চমকপ্রদ ছিল না। তবু প্রতিদিন সকালে দুই বৃদ্ধ গাছটির কাছে এসে দাঁড়াতেন। কখনো জল দিতেন, কখনো শুকনো পাতা সরাতেন, কখনো পুরোনো দিনের গল্প করতেন।

মেঘলা দূর থেকে তাদের দেখে বুঝতে পারল, গাছটির আসল সৌন্দর্য ফুলের রঙে নয়। তার সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সেই সম্পর্কের মধ্যে, যা একসময় অভিমানের আগাছায় ঢেকে গিয়েছিল, আর এখন যত্নের জলে আবার বেঁচে উঠেছে।

বছর ঘুরে বসন্ত এল। গাছটি আরও বড় হলো। তার ছায়ায় গ্রামের শিশুরা বসে ছবি আঁকত, গল্প করত। দুই বৃদ্ধের বন্ধুত্বও নতুন রূপ পেল। অতীতের ঘটনাটি তারা ভুলে যাননি, কিন্তু সেই ঘটনা আর তাদের বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করত না।

একদিন মেঘলা দাদুকে জিজ্ঞেস করল, —দাদু, মানুষ কি সত্যিই সব ভুল ক্ষমা করতে পারে?

নরেনবাবু ফুলটির দিকে তাকিয়ে বললেন, —সব ভুল হয়তো সহজে ভোলা যায় না। কিন্তু ক্ষমা করার মানে সবকিছু ভুলে যাওয়া নয়, মেঘলা। ক্ষমা করার মানে হলো, পুরোনো কষ্টকে আর নতুন দিনের ওপর রাজত্ব করতে না দেওয়া।

মেঘলা কথাটা মনে রাখল।

আর গ্রামের মানুষ শিখল, একটি ছোট্ট চারা যেমন যত্ন পেলে বড় গাছে পরিণত হয়, তেমনই একটি সম্পর্কও একটু আন্তরিকতা, সামান্য অনুশোচনা আর ক্ষমার সাহস পেলে আবার নতুন করে ফুল ফোটাতে পারে।

শিক্ষা: রাগের মুহূর্তে বলা একটি কথা বহু বছরের সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে। ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়, বরং সাহসের পরিচয়। ক্ষমা মানে অন্যায়কে সমর্থন করা নয়; বরং অতীতের কষ্টকে বর্তমানের শান্তি কেড়ে নিতে না দেওয়া।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *