Categories
উপন্যাস বিবিধ

অন্ধকারের ওপারে (প্রথম পর্ব: যে বাড়িতে কেউ ফিরে আসে না)।

শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে ছোট্ট একটি গ্রাম—নয়নপুর। দিনের বেলায় গ্রামটিকে আর পাঁচটা সাধারণ গ্রামের মতোই মনে হয়। সরু মাটির রাস্তা, দুপাশে ধানখেত, পুকুরের ধারে নারকেল গাছ, আর সন্ধ্যা নামলেই বাড়ি ফেরা গরুর গলার ঘণ্টা।

কিন্তু নয়নপুরের দক্ষিণ প্রান্তে এমন একটি বাড়ি ছিল, যার সামনে দিয়ে রাতের বেলা কেউ হাঁটতে চাইত না।

বাড়িটার নাম ছিল ‘শান্তিনিকেতন’।

নাম শুনে শান্তির কথা মনে হলেও, বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা। প্রায় পঁচিশ বছর আগে এক বর্ষার রাতে বাড়ির মালিক হেমন্ত রায়, তাঁর স্ত্রী সুলেখা এবং তাঁদের দুই সন্তান হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। পরদিন সকালে বাড়ির দরজা খোলা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। রান্নাঘরে তখনও চুলোর ওপর দুধ ফুটছিল। বসার ঘরে টেবিলের ওপর রাখা ছিল চারটি থালা। দেওয়ালের ঘড়িটা থেমে ছিল রাত দুটো বেজে তেরো মিনিটে।

কিন্তু বাড়ির ভেতরে একজন মানুষও ছিল না।

পুলিশ এসেছিল। তদন্ত হয়েছিল। আশপাশের পুকুর, নদী, জঙ্গল—সব জায়গায় খোঁজ চালানো হয়েছিল। হেমন্ত রায়ের জমিজমা নিয়ে বিরোধের কথাও উঠেছিল। তবু কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সময়ের সঙ্গে ঘটনাটা লোকের মুখে মুখে কিংবদন্তি হয়ে ওঠে।

গ্রামের বয়স্করা বলতেন, বাড়িটা অভিশপ্ত। রাতের বেলা জানলায় আলো জ্বলে, ভেতর থেকে শিশুদের হাসির শব্দ শোনা যায়, আর কখনও কখনও কেউ একজন বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

তবে এসব কথায় বিশ্বাস করত না অরিত্র সেন।

বয়স বত্রিশ। পেশায় স্থপতি। পুরোনো বাড়ি সংস্কার করাই তার কাজ। কলকাতার একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। কিন্তু কয়েক মাস আগে বাবার মৃত্যুর পর সে নিজের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল। শহরের কোলাহল থেকে দূরে কিছুদিন থাকার ইচ্ছা থেকেই নয়নপুরে আসা।

গ্রামে তার পৈতৃক বাড়ি ছিল না। তবে হেমন্ত রায়ের বাড়িটি সংস্কারের কাজের জন্য একটি সংস্থা তাকে নিয়োগ করেছিল। বাড়িটি কিনেছিলেন এক ব্যবসায়ী। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, পুরোনো বাড়িটিকে সংস্কার করে একটি হেরিটেজ হোটেল তৈরি করবেন।

অরিত্রর কাজ ছিল বাড়িটির কাঠামো পরীক্ষা করা, পুরোনো নকশা সংগ্রহ করা এবং সংস্কারের পরিকল্পনা তৈরি করা।

কাজটা শুনতে সহজ হলেও প্রথম দিন থেকেই সে বুঝতে পারল, বাড়িটিকে ঘিরে কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার রয়েছে।

বাড়ির সামনের বিশাল লোহার গেট খুলতেই একটা দীর্ঘ, কর্কশ শব্দ হয়েছিল। উঠোনের ঘাস কোমর পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বারান্দার থামগুলোতে শ্যাওলা জমেছে। জানলার পাল্লায় মরচে ধরা লোহার কবজা।

বাড়ির মূল দরজার চাবি তাকে দিয়েছিলেন গ্রামের পঞ্চায়েতের এক কর্মী, নাম নিতাই মণ্ডল।

চাবি দেওয়ার সময় লোকটি অরিত্রকে বলেছিল, “বাবু, দিনের বেলায় কাজ করবেন। সন্ধ্যার পর বাড়িটার মধ্যে থাকবেন না।”

অরিত্র হেসে বলেছিল, “কেন? সাপ আছে?”

নিতাই মাথা নেড়েছিল।

“সাপ থাকলে তাও ভালো ছিল। সাপকে অন্তত চোখে দেখা যায়।”

অরিত্র আর কথা বাড়ায়নি।

সেদিন দুপুরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে সে প্রথমেই লক্ষ করেছিল, আসবাবপত্রগুলো আশ্চর্যজনকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ বাড়িতে সাধারণত কাঠ পচে যায়, কাপড় নষ্ট হয়, দেওয়ালে ছত্রাক ধরে। এখানে সেসব থাকলেও অনেক জিনিস যেন যত্ন করে রাখা হয়েছে।

বসার ঘরে একটি বড় কাঠের আলমারি। তার পাশে পুরোনো গ্রামোফোন। দেওয়ালে হেমন্ত রায়ের পরিবারের একটি ছবি।

ছবিতে হেমন্ত, সুলেখা এবং তাঁদের দুই সন্তান। বড় মেয়ের নাম ছিল মৃণালিনী। ছোট ছেলের নাম অর্ক।

ছবির চারজনই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু অরিত্রর চোখ আটকে গেল মৃণালিনীর মুখে।

মেয়েটির বয়স ছবিতে ষোলো-সতেরোর বেশি নয়। লম্বা চুল, শান্ত চোখ, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি।

কেন জানি না, মুখটা অরিত্রর পরিচিত মনে হলো।

সে ছবির নিচে লেখা তারিখ পড়ল।

১৭ আগস্ট, ২০০১।

অর্থাৎ নিখোঁজ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে ছবিটি তোলা হয়েছিল।

অরিত্র নিজের নোটবুকে তারিখটা লিখে রাখল।

তারপর বাড়ির নকশা পরীক্ষা করতে শুরু করল।

বাড়িটির তিনটি প্রধান অংশ—সামনের বসার ঘর, মাঝখানের শোবার ঘর এবং পেছনের দিকে রান্নাঘর ও গুদামঘর। দোতলায় চারটি ঘর। সব মিলিয়ে বাড়ির কাঠামো খুব সাধারণ।

তবু একটি জিনিস তার নজর এড়াল না।

দোতলার পশ্চিম দিকের দেওয়ালটি অন্য দেওয়ালের তুলনায় অনেক মোটা।

সে মাপ নিয়ে দেখল, নকশায় যেখানে একটি সাধারণ দেওয়াল থাকার কথা, সেখানে প্রায় পাঁচ ফুট গভীর একটি অংশ রয়েছে।

কিন্তু তার কোনো দরজা নেই।

অরিত্র দেওয়ালে হাত দিয়ে চাপ দিল। কোথাও ফাঁপা শব্দ পাওয়া গেল না। তবু তার মনে হলো, দেওয়ালের পেছনে কিছু একটা আছে।

সে নকশায় জায়গাটিকে চিহ্নিত করে রাখল।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার সময় সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছিল। ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

“আপনি কি বাড়িটা ভেঙে ফেলবেন?”

অরিত্র ঘুরে দাঁড়াল।

গেটের বাইরে একজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। বয়স সাতাশ-আঠাশ। পরনে সাদা কুর্তি, হাতে কয়েকটি বই। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।

অরিত্র বলল, “না। ভাঙব কেন? সংস্কার করব।”

মেয়েটি কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

“সংস্কার করার সময় পশ্চিম দিকের দেওয়ালটা খুলবেন না।”

অরিত্র অবাক হলো।

“আপনি কী করে জানলেন আমি ওই দেওয়ালটা দেখেছি?”

মেয়েটি উত্তর না দিয়ে বলল, “ওখানে কিছু নেই। অন্তত আপনার খোঁজার মতো কিছু নেই।”

“আপনি কি এই বাড়িতে থাকতেন?”

“না। তবে এই বাড়ির ইতিহাস জানি।”

“আপনার নাম?”

“ঈশিতা।”

“আমি অরিত্র। স্থপতি।”

ঈশিতা মাথা নাড়ল।

“জানি।”

অরিত্র ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

“আমাকে চেনেন?”

“আপনার কাজের কথা শুনেছি। কলকাতা থেকে এসেছেন, তাই তো?”

“হ্যাঁ। কিন্তু আপনি দেওয়ালটা খুলতে নিষেধ করছেন কেন?”

ঈশিতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “কারণ এই বাড়ির ভেতরে যা লুকিয়ে আছে, সেটা বেরিয়ে এলে অনেক মানুষের জীবন বদলে যাবে।”

“কী লুকিয়ে আছে?”

“সেটা আমি জানি না।”

“তাহলে এত নিশ্চিতভাবে নিষেধ করছেন কীভাবে?”

ঈশিতা বইগুলো বুকে চেপে ধরল।

“কারণ আমার মা মৃত্যুর আগে আমাকে ঠিক এই কথাটাই বলেছিলেন।”

অরিত্র কিছু বলার আগেই মেয়েটি রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল।

“একটা কথা মনে রাখবেন, মিস্টার সেন। বাড়ির সব বন্ধ দরজা খোলার জন্য নয়।”

সে চলে গেল।

অরিত্র অনেকক্ষণ গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

তার মনে হলো, নয়নপুরে আসার আগে সে যতটা ভেবেছিল, বাড়িটা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।


পরদিন সকালে অরিত্র আবার শান্তিনিকেতনে গেল।

এবার সঙ্গে ছিল তার সহকারী প্রদীপ। ছেলেটি স্থানীয় বাসিন্দা। বয়স চব্বিশ। বাড়ির ভৌতিক গল্প শুনে সে প্রথম দিন থেকেই ভয়ে ছিল।

“দাদা, সত্যি বলছি, এই বাড়িতে কাজ না করলেও চলত,” প্রদীপ বলল।

অরিত্র হাসল।

“ভূত যদি থাকে, তাকে বলব সংস্কারের খরচটা দিতে।”

প্রদীপ হাসল না।

তারা প্রথমে দোতলার ঘরগুলো মাপল। পুরোনো কাঠের মেঝে কয়েক জায়গায় নরম হয়ে গেছে। ছাদের বিম পরীক্ষা করতে হবে। জানলার ফ্রেমও বদলাতে হবে।

তারপর অরিত্র পশ্চিম দিকের দেওয়ালের কাছে গেল।

দেওয়ালের ওপর একটি পুরোনো আলমারি ঠেস দিয়ে রাখা। আলমারিটা সরাতেই পেছনে ছোট্ট একটি কাঠের ফলক দেখা গেল।

ফলকের ওপর ধুলো জমে ছিল। অরিত্র কাপড় দিয়ে মুছে দেখল, সেখানে খোদাই করা রয়েছে একটি সংখ্যা—

২১৩।

প্রদীপ বলল, “দাদা, এটা কী?”

অরিত্র উত্তর দিল না।

সে দেওয়ালের নিচের অংশ পরীক্ষা করল। কাঠের ফলকটা একটু চাপ দিতেই ভেতর থেকে মৃদু শব্দ হলো।

টক।

দেওয়ালের একটা অংশ যেন সামান্য কেঁপে উঠল।

অরিত্র আবার চাপ দিল।

এবার একটা সরু ফাটল দেখা গেল।

সে নিজের ব্যাগ থেকে ছোট্ট ধাতব যন্ত্র বের করে ফাটলের মধ্যে ঢোকাল। কয়েক মিনিট চেষ্টা করার পর দেওয়ালের প্যানেলটা ধীরে ধীরে বাইরে সরে এল।

পেছনে একটি সরু ফাঁকা জায়গা।

তার মধ্যে একটি কাঠের বাক্স রাখা।

প্রদীপ পিছিয়ে গেল।

“দাদা, এটা খোলা ঠিক হবে?”

অরিত্র বলল, “এটা বাড়ির অংশ। আমাদের কাজের মধ্যেই পড়ে।”

সে বাক্সটা বাইরে বের করল।

বাক্সের ওপর কোনো তালা নেই। শুধু একটি পুরোনো কাপড় দিয়ে মোড়ানো। কাপড় সরাতেই দেখা গেল, ঢাকনার ওপর খোদাই করা আছে একটি নাম—

মৃণালিনী রায়।

অরিত্র বাক্স খুলল।

ভেতরে কয়েকটি চিঠি, একটি ছোট্ট ডায়েরি, আর একটি কালো-সাদা ছবি।

ছবিতে মৃণালিনী দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির পেছনের বাগানে। তার পাশে এক তরুণ। তরুণটির মুখের অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা।

ছবির পেছনে লেখা—

‘যদি আমি ফিরে না আসি, তবে অর্ককে সত্যিটা জানিও।’

অরিত্রর বুকের মধ্যে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল।

অর্ক ছিল মৃণালিনীর ছোট ভাই। পরিবারের সঙ্গে সে-ও নিখোঁজ হয়েছিল।

কিন্তু ছবিতে তরুণটি কে?

সে ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

‘আমি জানি, কেউ আমার লেখা পড়ছে। তবু লিখছি। কারণ একদিন হয়তো এমন কেউ আসবে, যে আমার কথাগুলো বিশ্বাস করবে।’

পরের পাতায় কয়েকটি তারিখ, কিছু নাম এবং বাড়ির ভেতরের নকশা আঁকা।

তারপর একটি লাইন—

‘বাবা বলছেন, বাড়ির ভেতরে কেউ নেই। কিন্তু গত রাতে আমি আবার সেই ঘর থেকে কান্নার শব্দ শুনেছি।’

অরিত্র পাতাটা উল্টে দিল।

‘মা আমাকে বলেছিলেন, পশ্চিমের দেওয়ালের কাছে যেতে নেই। কিন্তু আমি জানি, ওই দেওয়ালের পেছনে একটা ঘর আছে। সেখানে এমন কিছু রাখা হয়েছে, যা আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে।’

আরেকটি পাতায় লেখা—

‘গতকাল আমি অর্ককে নিয়ে ঘরটা খুঁজতে গিয়েছিলাম। আমরা একটা ছোট্ট দরজা পেয়েছি। দরজার ওপাশে একজন মানুষ বসে ছিলেন। তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা কথা বললেন—তোমরা এখানে আসার কথা ছিল না।’

অরিত্রর হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

পরের পাতাটা ছেঁড়া।

ডায়েরির শেষের দিকে কয়েকটি শব্দ বারবার লেখা হয়েছে—

‘দুইটা বেজে তেরো।’

‘দুইটা বেজে তেরো।’

‘দুইটা বেজে তেরো।’

অরিত্র দেওয়ালের ঘড়ির কথা মনে করল।

নিখোঁজ হওয়ার রাতেও ঘড়িটা থেমে ছিল রাত দুটো বেজে তেরো মিনিটে।

সে বাক্সের ভেতর থেকে চিঠিগুলো বের করল।

প্রথম চিঠিটি হেমন্ত রায়ের লেখা। তারিখ ১২ আগস্ট, ২০০১।

‘মৃণালিনী,

তুমি যা দেখেছ, তা ভুলে যাও। ওই ঘর সম্পর্কে কাউকে কিছু বলবে না। তোমার মা-ও জানে না, সেখানে কী রয়েছে। তোমার ভাইকে এসবের মধ্যে জড়িয়ো না।

আমাদের পরিবারের নিরাপত্তার জন্য তোমাকে চুপ থাকতে হবে।’

দ্বিতীয় চিঠিতে কোনো প্রেরকের নাম নেই।

‘মৃণালিনী,

তোমার বাবাকে বিশ্বাস কোরো না। তিনি তোমাকে রক্ষা করছেন না। তিনি এমন একটি সত্য লুকিয়ে রেখেছেন, যার জন্য নিরপরাধ মানুষকে সারাজীবন মূল্য দিতে হচ্ছে।

তুমি যদি সত্য জানতে চাও, তবে ১৭ আগস্ট রাত ২টা ১৩ মিনিটে পশ্চিমের দেওয়ালের সামনে দাঁড়াবে।

কেউ তোমাকে সাহায্য করতে আসবে।

কিন্তু তার মুখ দেখে বিশ্বাস কোরো না।’

অরিত্র চিঠিটা নামিয়ে রাখল।

১৭ আগস্ট।

যে দিন পরিবারের শেষ ছবিটি তোলা হয়েছিল।

আর রাত দুটো বেজে তেরো মিনিট—যে সময় বাড়ির ঘড়ি থেমে গিয়েছিল।

“দাদা,” প্রদীপ ফিসফিস করে বলল, “আমরা কি এখন বাড়ি যাব?”

অরিত্র উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

ধড়াম!

তারপর সিঁড়িতে কারও পায়ের আওয়াজ।

একজন নয়।

দুজন।

ধীরে ধীরে তারা দোতলার দিকে উঠে আসছে।

প্রদীপের মুখ শুকিয়ে গেল।

“দাদা, কেউ এসেছে!”

অরিত্র বাক্সের জিনিসগুলো ব্যাগে ঢোকাল। তারপর ঘরের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

সিঁড়ির মাথায় প্রথমে দেখা গেল একটি হাত।

তারপর একটি মুখ।

ঈশিতা।

তার সঙ্গে একজন বয়স্ক পুরুষ। পরনে ধূসর পাঞ্জাবি, হাতে কালো ছাতা।

ঈশিতা অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আপনাকে নিষেধ করেছিলাম।”

অরিত্র বলল, “আপনি জানতেন এখানে বাক্সটা রয়েছে?”

ঈশিতা উত্তর দিল না।

বয়স্ক মানুষটি এগিয়ে এসে বললেন, “আপনি যা পেয়েছেন, তা আমাদের হাতে দিন।”

“আপনি কে?”

“আমি এই গ্রামের একজন পুরোনো বাসিন্দা।”

“নাম?”

লোকটি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, “সুধাংশু পাল।”

নামটা শুনেই ঈশিতার মুখের ভাব বদলে গেল।

অরিত্র সেটা লক্ষ করল।

“আপনি কি হেমন্ত রায়কে চিনতেন?”

সুধাংশু মাথা নাড়লেন।

“খুব ভালো করে।”

“তাঁর পরিবার কোথায় গেল, জানেন?”

বৃদ্ধের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।

“কিছু প্রশ্নের উত্তর না জানাই ভালো।”

অরিত্র শান্তভাবে বলল, “আমি একজন স্থপতি। বাড়ির ভেতরে যা পেয়েছি, সেটা আমার কাজের অংশ। আমি কাউকে কিছু না জানিয়ে তুলে দিতে পারি না।”

সুধাংশু কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন, “তাহলে অন্তত এই ডায়েরিটা পড়বেন না।”

“কেন?”

“কারণ মৃণালিনী যা লিখেছিল, তার শেষ অংশ পড়ার পর যারা সত্যিটা জানার চেষ্টা করেছে, তাদের কেউ আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেনি।”

অরিত্র হেসে বলল, “আপনি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”

সুধাংশু কোনো উত্তর দিলেন না।

বরং তিনি পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করে অরিত্রর সামনে ধরলেন।

ছবিটিতে চারজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। হেমন্ত রায়, সুলেখা, মৃণালিনী এবং অর্ক।

ছবির ডান পাশে আরও একজন দাঁড়িয়ে আছেন।

একজন তরুণ।

অরিত্রর চোখ বড় হয়ে গেল।

তরুণটির মুখ অবিকল তার নিজের মতো।

একই চোখ, একই নাক, একই কপালের গঠন।

শুধু চুলের ধরন আলাদা।

ছবির পেছনে লেখা—

‘হেমন্ত রায়ের পরিবারের সঙ্গে অরিত্র সেন। ১৭ আগস্ট, ২০০১।’

অরিত্র ছবিটা হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “এটা কীভাবে সম্ভব?”

তার জন্ম ১৯৯৪ সালে। ২০০১ সালে তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর।

ছবির তরুণটি অন্তত পঁচিশ বছরের।

আর ছবিতে তার নাম লেখা রয়েছে।

অরিত্র সেন।

“এই ছবিতে আমি কী করছি?” সে প্রশ্ন করল।

সুধাংশু ধীরে ধীরে বললেন, “সেটা জানতেই তো আপনাকে এখানে আসতে হয়েছে।”

“আপনি আমার সম্পর্কে কী জানেন?”

বৃদ্ধ অরিত্রর চোখের দিকে তাকালেন।

“আপনি নিজের জন্মের ইতিহাস জানেন?”

“অবশ্যই। আমি কলকাতায় জন্মেছি। আমার বাবা-মা—”

“আপনার বাবা-মায়ের বিয়ে কবে হয়েছিল?”

অরিত্র থেমে গেল।

তার বাবা-মায়ের বিয়ের তারিখ সে জানত না। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ার পর বাবা আর কখনও এ বিষয়ে কথা বলেননি।

সুধাংশু বললেন, “আপনার বাবার পুরোনো কাগজপত্র খুঁজে দেখুন। আপনি যে বছর জন্মেছেন, সেই বছরের হাসপাতালের নথি আর আপনার স্কুলে ভর্তি হওয়ার কাগজের মধ্যে একটা বড় অসংগতি আছে।”

অরিত্র রেগে উঠল।

“আপনি আমার পরিবার নিয়ে মিথ্যে কথা বলছেন!”

সুধাংশু শান্ত গলায় বললেন, “আমি মিথ্যে বলছি কি না, সেটা আপনি নিজেই যাচাই করতে পারবেন। তবে একটা কথা মনে রাখবেন—আপনি যদি সত্যিই জানতে চান, তবে আজ রাত দুটো বেজে তেরো মিনিটে আবার এই বাড়িতে আসবেন।”

তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন।

ঈশিতা যাওয়ার আগে অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি যদি আসেন, তাহলে একা আসবেন না।”

অরিত্র অবাক হলো।

“কেন?”

ঈশিতা ফিসফিস করে বলল, “কারণ ওই বাড়ির ভেতরে যে মানুষটা আছে, সে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে না।”

“তাহলে কার জন্য?”

ঈশিতা চলে যেতে যেতে বলল—

“আপনার জন্য নয়। আপনার অন্য পরিচয়ের জন্য।”


সন্ধ্যার পর অরিত্র গ্রামের একটি ছোট্ট অতিথিশালায় ফিরে এল।

প্রদীপ বাড়ি চলে গেছে। অরিত্র নিজের ঘরে বসে বাক্স থেকে পাওয়া জিনিসগুলো আবার পরীক্ষা করতে লাগল।

ছবিটা সামনে রেখে সে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল।

ছবির তরুণটি তার মতো দেখতে হলেও সম্পূর্ণ এক নয়। চোখের কোণে একটি ছোট্ট দাগ রয়েছে, যা অরিত্রর নেই। আর তরুণটির ডান হাতে একটি রুপোর আংটি।

অরিত্রর কাছে তার বাবার দেওয়া একটি পুরোনো আংটি আছে। বাবার মৃত্যুর পর সেটি সে নিজের কাছে রেখেছে।

সে পকেট থেকে আংটিটা বের করল।

ছবির আংটির সঙ্গে আশ্চর্যরকম মিল।

একই নকশা। একই বৃত্তের মধ্যে ছোট্ট একটি চিহ্ন।

অরিত্র নিজের আঙুল থেকে আংটিটা খুলে ছবির ওপর রাখল।

নকশা মিলে গেল।

তারপর সে বাবার পুরোনো ব্যাগ থেকে আনা কিছু কাগজপত্র বের করল। বাবার নাম ছিল অমলেন্দু সেন। তিনি জীবনের শেষ কয়েক বছর অসুস্থ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর অরিত্র কাগজপত্রগুলো ঠিকমতো দেখেনি।

একটি ফাইলে হাসপাতালের নথি পাওয়া গেল।

তারিখ—১৯৯৪ সালের ২২ নভেম্বর।

কিন্তু অরিত্রর জন্মতারিখ সরকারি কাগজে ২৩ নভেম্বর।

হাসপাতালের নথিতে শিশুর নাম লেখা নেই। শুধু লেখা—

‘পুরুষ শিশু। সময়: রাত ২টা ১৩ মিনিট।’

অরিত্রর মাথা ঘুরে গেল।

সে নিজের জন্মের সময় কখনও জানত না।

তার মা সবসময় বলতেন, সে ভোরের দিকে জন্মেছিল।

তাহলে রাত দুটো বেজে তেরো মিনিটের এই নথি কোথা থেকে এল?

ফাইলের মধ্যে আরও একটি কাগজ ছিল।

একটি পুরোনো চিঠি।

অমলেন্দু সেনের লেখা।

‘যদি কোনোদিন অরিত্র এই কাগজগুলো পড়ে, তবে তাকে বলো, আমি তাকে কখনও মিথ্যে বলতে চাইনি। কিন্তু সত্যিটা জানালে তার জীবন বিপন্ন হতো।

শান্তিনিকেতনের বাড়িতে যা ঘটেছিল, তার সঙ্গে তার জন্মের সম্পর্ক আছে।

আমি তাকে নিজের সন্তান হিসেবে বড় করেছি। কিন্তু তাকে জন্ম দেওয়ার সময় আমি সেখানে ছিলাম না।

আমি শুধু তাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম।’

অরিত্র চিঠিটা পড়ে স্থির হয়ে গেল।

বাবা তাকে জন্ম দেননি?

তাহলে তার প্রকৃত মা কে?

তার জীবনের এত বড় সত্য কেন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল?

ঠিক তখনই তার মোবাইল বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

অরিত্র ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে একটি ছোট্ট মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল।

“আপনি কি অরিত্র কাকু?”

“হ্যাঁ। কে বলছ?”

“আমি তিতলি। আমার মা বলেছে, আপনাকে একটা কথা বলতে।”

“তোমার মা কে?”

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “আমার মা মৃণালিনী রায়।”

অরিত্রর হাত থেকে ফোনটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।

“কী বললে?”

“মা বলেছে, আপনি যদি সত্যিটা জানতে চান, তাহলে আজ রাত দুটো বেজে তেরো মিনিটে শান্তিনিকেতনের বাড়ির পশ্চিমের দেওয়ালের সামনে দাঁড়াবেন।”

“তোমার মা কোথায়?”

মেয়েটি কাঁদতে শুরু করল।

“মা ওই বাড়ির ভেতরে আটকে আছে।”

“তুমি কোথা থেকে ফোন করছ?”

“আমি জানি না। এখানে সব অন্ধকার। মা বলেছে, কাউকে বিশ্বাস করবেন না।”

তারপর ফোনের ওপাশে একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।

“তিতলি! ফোনটা দাও!”

মেয়েটি চিৎকার করে উঠল।

“কাকু, উনি এসে গেছেন!”

ফোন কেটে গেল।

অরিত্র কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

তারপর ঘড়ির দিকে তাকাল।

রাত একটা বেজে সাতচল্লিশ মিনিট।

আর মাত্র ছাব্বিশ মিনিট পর রাত দুটো বেজে তেরো।

সে দ্রুত নিজের ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

বাইরে আকাশ পরিষ্কার। রাস্তার আলোয় ভেজা গাছের পাতা চকচক করছে। গ্রামের রাস্তা প্রায় জনশূন্য।

শান্তিনিকেতনের গেটের সামনে পৌঁছতেই সে লক্ষ করল, গেটটা খোলা।

বাড়ির দোতলার একটি জানলায় আলো জ্বলছে।

সেই ঘরটাই, যার পশ্চিম দিকের দেওয়ালটি অন্য দেওয়ালের তুলনায় মোটা।

অরিত্র বাড়ির ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল।

দোতলার করিডরে পৌঁছে দেখল, দেওয়ালের সামনে একটি ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বয়স আট-নয় বছর।

পরনে লাল ফ্রক।

চুল দুটি বেণি করা।

মেয়েটি অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি এসেছেন?”

অরিত্র ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেল।

“তোমার নাম তিতলি?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“তোমার মা কোথায়?”

তিতলি পশ্চিমের দেওয়ালের দিকে আঙুল দেখাল।

“ওই ঘরের ভেতরে।”

“কিন্তু এখানে তো কোনো দরজা নেই!”

তিতলি দেওয়ালের কাছে গিয়ে হাত রাখল।

“দরজা আছে। শুধু সবাই দেখতে পায় না।”

তারপর সে দেওয়ালের একটি ছোট্ট অংশে চাপ দিল।

মৃদু শব্দ হলো।

দেওয়ালের মাঝখানে একটি সরু রেখা ফুটে উঠল।

অরিত্র নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।

দেওয়ালের প্যানেলটা ধীরে ধীরে সরে গেল।

ভেতরে একটি ছোট্ট ঘর।

ঘরের মাঝখানে কাঠের চেয়ারে বসে আছেন একজন মহিলা। মুখ ফ্যাকাশে, চুল এলোমেলো, চোখে ক্লান্তি।

কিন্তু তাঁর মুখের গঠন অরিত্রর ছবিতে দেখা মৃণালিনীর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

মহিলা মাথা তুললেন।

“অরিত্র?”

অরিত্রর গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।

মৃণালিনী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “তুমি অবশেষে ফিরে এসেছ!”

“আপনি কে?”

মহিলা তার দিকে হাত বাড়ালেন।

“আমি তোমার মা।”

অরিত্র পিছিয়ে গেল।

“অসম্ভব! মৃণালিনী রায় তো পঁচিশ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন!”

মৃণালিনী মাথা নাড়লেন।

“আমি নিখোঁজ হইনি, অরিত্র। আমাকে এই বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল।”

“কে আপনাকে আটকে রেখেছে?”

মৃণালিনী উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের পেছনের অন্ধকার থেকে একজন পুরুষ বেরিয়ে এলেন।

পরনে সাদা পাঞ্জাবি, মুখে গভীর বলিরেখা।

অরিত্রর বুকের ভেতরটা থেমে গেল।

লোকটি তার বাবা অমলেন্দু সেনের মতো দেখতে।

কিন্তু অমলেন্দু তো মারা গেছেন!

লোকটি মৃদু হেসে বললেন, “অবশেষে দেখা হলো, অরিত্র।”

অরিত্র কাঁপা গলায় বলল, “আপনি কে?”

লোকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

“আমি সেই মানুষ, যে তোমাকে জন্মের পর এই বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়েছিল।”

“কেন?”

লোকটি অরিত্রর চোখের দিকে তাকালেন।

“কারণ তোমার জন্মের রাতেই এই বাড়িতে একটি খুন হয়েছিল। আর সেই খুনের দায় তোমার মায়ের ওপর চাপানো হয়েছিল।”

মৃণালিনী চিৎকার করে উঠলেন, “চুপ করো! তুমি এখনও ওকে সত্যিটা বলার অধিকার রাখো না!”

লোকটি হেসে বললেন, “সত্যি তো ওরই জানা দরকার।”

তারপর তিনি অরিত্রর হাতে একটি পুরোনো ছবি তুলে দিলেন।

ছবিতে তিনজন মানুষ।

মৃণালিনী।

অমলেন্দু সেন।

আর মাঝখানে সাত বছরের একটি ছেলে।

ছেলেটির মুখ অবিকল অরিত্রর মতো।

কিন্তু ছবির নিচে লেখা তারিখ—

১৭ আগস্ট, ২০০১।

আর ছবির পেছনে একটি বাক্য—

“যে শিশুটিকে অমলেন্দু নিয়ে গিয়েছিল, সে অরিত্র ছিল না।”

অরিত্রর সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেল।

সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

“তাহলে আমি কে?”

লোকটি তার দিকে তাকিয়ে বললেন—

“তুমি সেই শিশুটি, যে পঁচিশ বছর আগে এই বাড়িতে মারা গিয়েছিল।”

ঠিক তখনই বাড়ির দেওয়ালের ঘড়িতে দুটো বেজে তেরো মিনিট হলো।

ঘরের সব আলো নিভে গেল।

আর অন্ধকারের মধ্যে অরিত্র শুনতে পেল, একটি শিশুর কণ্ঠ তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে—

“এবার আমার পালা, দাদা।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *