ঘড়ির কাঁটা তখনও থেমে আছে—রাত দুটো বেজে তেরো মিনিট।
শান্তিনিকেতন বাড়ির ভেতরে ঘন অন্ধকার। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, অথচ জানালাগুলো বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ঘরের মেঝেতে জমছে জল। অরিত্রর হাতে ধরা পুরোনো ছবিটা কাঁপছে। ছবির পেছনে লেখা সেই বাক্যটা যেন তার চোখের সামনে জ্বলছে—
“যে শিশুটিকে অমলেন্দু নিয়ে গিয়েছিল, সে অরিত্র ছিল না।”
আর ঠিক তার কয়েক মুহূর্ত আগে অচেনা অথচ পরিচিত মুখের মানুষটি বলেছে, “তুমি সেই শিশুটি, যে পঁচিশ বছর আগে এই বাড়িতে মারা গিয়েছিল।”
অরিত্র কথা বলতে পারছিল না।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ অবিকল তার মৃত বাবা অমলেন্দু সেনের মতো। একই চোখ, একই নাক, একই কপালের ভাঁজ। কিন্তু অমলেন্দু তো মারা গেছেন দশ বছর আগে! নিজের চোখে বাবার নিথর দেহ দেখেছিল অরিত্র। তাহলে এই মানুষটি কে?
“আপনি কে?” অরিত্রর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
লোকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার পায়ের শব্দ হচ্ছিল না। ভেজা মেঝের ওপর দিয়ে হাঁটলেও পায়ের ছাপ পড়ছিল না।
“যে প্রশ্নটা তোমার এত বছর আগে করা উচিত ছিল, সেটা আজ করছ?”
“আমার বাবা মারা গেছেন।”
“তোমার বাবা অমলেন্দু সেন মারা গেছেন। কিন্তু আমি অমলেন্দু নই।”
“তাহলে তাঁর মতো দেখতে কেন?”
লোকটি উত্তর দিল না। বরং অরিত্রর হাতে থাকা ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ছবিটা ভালো করে দেখো। তিনজন মানুষ আর একটা শিশু। তুমি কি লক্ষ করেছ, ছবিতে দুটো শিশুর অস্তিত্বের ইঙ্গিত রয়েছে?”
অরিত্র ছবিটা আলোয় ধরল। ছবিতে ছিল হেমন্ত রায়ের মেয়ে মৃণালিনী, অমলেন্দু সেন এবং তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সাত বছরের ছেলে। ছেলেটির মুখ অরিত্রর মতোই। কিন্তু ছবির ডানদিকের কোণে, জানালার কাচে, অস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে আরেকটি ছোট শিশুর মুখ।
সে শিশুটি যেন ছবির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।
“ও কে?” অরিত্র ফিসফিস করে বলল।
“তোমার প্রশ্নের উত্তর ওই মুখটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে।”
ঠিক তখনই পশ্চিমের দেওয়ালের ভেতর থেকে তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক!
ঠক!
ঠক!
অরিত্র ঘুরে তাকাল। যে গোপন কুঠুরির দরজা দিয়ে সে এই ঘরে ঢুকেছে, সেটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দরজার ফাঁকে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট মেয়েটি—তিতলি।
কিন্তু তার মুখে আর আগের সেই শিশুসুলভ হাসি নেই।
“দাদা,” তিতলি বলল, “তুমি ওর কথা বিশ্বাস কোরো না।”
অরিত্রর বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
“কেন? কে এই লোক?”
তিতলি মাথা নিচু করল।
“ও তোমাকে সত্যিটা বলবে না। কারণ সত্যিটা জানলে ও আর এই বাড়িতে থাকতে পারবে না।”
লোকটি এবার তিতলির দিকে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত এক ক্রোধ ফুটে উঠল।
“তিতলি, তুমি আবার নিয়ম ভাঙছ!”
“আমি আর ভয় পাই না,” মেয়েটি জবাব দিল।
তারপর সে অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “দাদা, তোমার জন্মদিন আসলে তেইশে নভেম্বর নয়। তোমার জন্মের দিনটা কেউ বদলে দিয়েছিল। কিন্তু কেন বদলেছিল, সেটা জানতে হলে তোমাকে মায়ের ঘরে যেতে হবে।”
“মায়ের ঘর কোথায়?”
তিতলি পশ্চিমের দেওয়ালের দিকে আঙুল তুলল।
“এই দেওয়ালের ওপারে আরেকটা ঘর আছে। যে ঘরে পঁচিশ বছর ধরে কেউ ঢোকেনি। সেখানে একটা দোলনা আছে। আর দোলনার পাশে রাখা আছে তোমার আসল জন্মের প্রমাণ।”
অরিত্র ঘুরে লোকটির দিকে তাকাল।
কিন্তু সেখানে কেউ নেই।
ঘরটা আবার ফাঁকা।
শুধু মেঝের ওপর পড়ে রয়েছে একটি পুরোনো রুপোর চাবি।
অরিত্র চাবিটা তুলে নিল। চাবির গায়ে খোদাই করা—১৭-০৮-২০০১।
১. পশ্চিমের দেওয়ালের ওপারে
তিতলির দেখানো পথ ধরে অরিত্র এগিয়ে গেল। গোপন ঘরের শেষ প্রান্তে একটা কাঠের আলমারি। বাইরে থেকে দেখে মনে হয় বহু বছর ধরে সেটি খোলা হয়নি। কিন্তু আলমারির পেছনে হাত রাখতেই অরিত্র বুঝতে পারল, কাঠের পাটাতনটি আসলে একটা দরজা।
রুপোর চাবিটা তালায় ঢোকাতেই খট করে শব্দ হল।
দরজা খুলে গেল।
ভেতরে ছোট্ট একটা ঘর। ছাদের কোণ থেকে মাকড়সার জাল ঝুলছে। একটা কাঠের দোলনা, পাশে শিশুর পোশাক, একটা ভাঙা খেলনা গাড়ি এবং দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ—আগস্ট, ২০০১।
সতেরো তারিখটিতে লাল কালি দিয়ে গোল দাগ দেওয়া।
ঘরের মাঝখানে রাখা একটি টেবিলের ওপর ছিল তিনটি জিনিস—একটি হাসপাতালের নথি, একটি ছোট্ট শিশুর হাতের ছাপ এবং একটি ক্যাসেট।
অরিত্র হাসপাতালের নথিটা খুলল।
রোগীর নাম: মৃণালিনী রায়।
তারিখ: ১৭ আগস্ট, ২০০১।
জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা: দুই।
প্রথম শিশু—পুত্র। জন্মের সময়: রাত ২টা ১৩ মিনিট।
দ্বিতীয় শিশু—পুত্র। জন্মের সময়: রাত ২টা ১৭ মিনিট।
অরিত্রর হাত থেকে কাগজটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
যমজ!
তার মা একই রাতে দুটি সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন।
কিন্তু অরিত্র তো জানত, তার কোনো ভাই নেই।
নথির নিচে একজন চিকিৎসকের স্বাক্ষর। তার পাশে হাতে লেখা একটি মন্তব্য—
“প্রথম শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে। দ্বিতীয় শিশুটিকে নিরাপদে স্থানান্তর করা হয়েছে।”
অরিত্রর চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
প্রথম শিশুটি যদি মৃত হয়, তবে সে কে?
আর দ্বিতীয় শিশুটিকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?
সে হাসপাতালের নথির সঙ্গে রাখা আরেকটি কাগজ খুলল। সেখানে অমলেন্দু সেনের স্বাক্ষর। নিচে লেখা—
“শিশুটিকে আমার জিম্মায় নেওয়া হল। জন্মের নথিতে নতুন তারিখ নথিভুক্ত করা হবে।”
অরিত্রর মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল। তার বাবা কি তাকে অন্য একটি শিশুর পরিচয়ে বড় করেছিলেন? কিন্তু কেন?
হঠাৎ পেছন থেকে মৃণালিনীর কণ্ঠ ভেসে এল।
“কারণ তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমাকে একজনকে মরতে হয়েছে।”
অরিত্র ঘুরে দাঁড়াল।
মৃণালিনী দরজায় দাঁড়িয়ে। তার চোখে জল। বয়সের ভারে মুখে অসংখ্য রেখা পড়েছে, কিন্তু চোখের মধ্যে সেই অদ্ভুত মায়া, যা অরিত্র নিজের শৈশবের অস্পষ্ট স্মৃতিতে অনুভব করেছিল।
“মা?” শব্দটা অরিত্রর ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এল।
মৃণালিনী কেঁপে উঠলেন। তারপর এগিয়ে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।
পঁচিশ বছরের জমে থাকা কান্না যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল।
“আমার ছেলে,” তিনি ফিসফিস করে বললেন, “তুই সত্যিই ফিরে এসেছিস!”
অরিত্র তাঁকে আঁকড়ে ধরে বলল, “আমাকে সব বলো, মা। আমি কে? আমার ভাই কোথায়? আর সবাই কেন বলছে, আমি পঁচিশ বছর আগে মারা গিয়েছিলাম?”
মৃণালিনী ধীরে ধীরে তাকে বসালেন।
“তুই আর তোর ভাই—দুজনেই আমার সন্তান। তোদের জন্মের রাতেই এই বাড়িতে একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল। তোর দাদু হেমন্ত রায় একটা গোপন পরীক্ষা চালাতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের স্মৃতি মৃত্যুর পরেও কোনোভাবে ধরে রাখা যায়। এই বাড়ির পশ্চিম দিকের ঘরটা ছিল তাঁর সেই পরীক্ষার কেন্দ্র।”
“মানুষের স্মৃতি ধরে রাখা যায়?”
“বিজ্ঞান আর কুসংস্কারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি এমন কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন, যার ফল তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। ওই ঘরে এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন, যা মানুষের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেত রেকর্ড করার জন্য বানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই যন্ত্রের সঙ্গে তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন বাড়ির পুরোনো ঘড়ি, বিদ্যুতের তার এবং একটা অদ্ভুত ধাতব বাক্স।”
“তারপর?”
“সেই রাতে বিদ্যুৎ চলে যায়। যন্ত্রটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ঘড়ি থেমে যায় রাত দুটো বেজে তেরো মিনিটে। আর তারপর…”
মৃণালিনী চোখ বন্ধ করলেন।
“তারপর তোর ভাইয়ের কান্না থেমে যায়।”
২. যে শিশুটি ফিরে আসেনি
অরিত্র স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
“আমার ভাই মারা গিয়েছিল?”
মৃণালিনী মাথা নাড়লেন।
“চিকিৎসক বলেছিলেন, প্রথম শিশুটি আর বেঁচে নেই। কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনি। আমি ওকে কোলে নিয়েছিলাম। ওর শরীর ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ওর আঙুল আমার হাত চেপে ধরেছিল। আমি অনুভব করেছিলাম, ও তখনও আমাকে ছাড়তে চাইছে না।”
“তাহলে ওকে কোথায় রাখা হয়েছিল?”
“পশ্চিমের ঘরে।”
“কেন?”
“তোর দাদু বলেছিলেন, ওই ঘরে কিছু সময়ের জন্য শিশুটিকে রাখা হলে তার শরীরের সংকেত আবার ফিরে আসতে পারে। আমি তখন অসহায়। মা হিসেবে শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরেছিলাম। কিন্তু যখন ফিরে এলাম, তখন ঘর বন্ধ। দরজার ওপাশ থেকে তোর ভাইয়ের কান্না শুনতে পাচ্ছিলাম।”
মৃণালিনীর গলা ভেঙে গেল।
“আমি দরজা খুলতে চেয়েছিলাম। হেমন্ত আমাকে বাধা দিলেন। বললেন, এখন দরজা খুললে আরও বড় বিপদ হবে। আমি চিৎকার করেছিলাম, কেঁদেছিলাম, তাঁর পায়ে পড়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে ঘর থেকে বের করে দিলেন।”
“তারপর?”
“তারপর রাত দুটো বেজে তেরো মিনিটে বাড়ির সব ঘড়ি থেমে গেল। পশ্চিমের দেওয়াল থেকে একটা তীব্র শব্দ হল। তারপর আর কোনো কান্না শোনা গেল না।”
অরিত্রর মনে পড়ল, ছোটবেলায় সে প্রায়ই একটা স্বপ্ন দেখত। অন্ধকার ঘর, কাঠের দোলনা, আর দেওয়ালের ওপাশ থেকে কেউ তাকে ডাকছে—‘দাদা, আমাকে নিয়ে যাও।’
সে এত দিন ভেবেছে, সেটা নিছক শিশুমনের কল্পনা।
“আমার ভাইয়ের নাম কী ছিল?”
মৃণালিনী উত্তর দিলেন না।
তিনি টেবিলের ওপর রাখা ক্যাসেটটি তুলে নিলেন।
“ওর নাম ছিল অরুণ।”
অরিত্রর শরীরের ভেতর দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল।
অরুণ।
নামটা সে আগে শুনেছে।
তার বাবা অমলেন্দু মৃত্যুর আগে একবার জ্বরের ঘোরে এই নাম উচ্চারণ করেছিলেন। তখন অরিত্র ভেবেছিল, কোনো পুরোনো বন্ধুর নাম। কিন্তু বাবার মুখে সেই নাম শোনার পর তিনি ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েছিলেন।
“অরুণ কি সত্যিই মারা গিয়েছিল?” অরিত্র প্রশ্ন করল।
“আমি জানি না,” মৃণালিনী বললেন। “আমি শুধু জানি, সেই রাতের পর থেকে বাড়িতে এমন কিছু ঘটতে শুরু করে, যা কোনো যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা যায় না। যে ঘরে অরুণকে রাখা হয়েছিল, সেই ঘরের ভেতর থেকে মাঝেমধ্যে শিশুর হাসি শোনা যেত। কখনও কান্না। কখনও দরজায় টোকা। আর প্রতি বছর সতেরোই আগস্ট, রাত দুটো বেজে তেরো মিনিটে, পশ্চিমের দেওয়ালে একটা ছায়া দেখা যেত।”
“কীসের ছায়া?”
“একটি শিশুর।”
মৃণালিনী অরিত্রর হাত চেপে ধরলেন।
“তোর মতো দেখতে একটি শিশুর।”
৩. ক্যাসেটের ভেতরের কণ্ঠ
ঘরের এক কোণে পুরোনো টেপ রেকর্ডার পড়ে ছিল। অরিত্র সেটি পরিষ্কার করে ক্যাসেট ঢোকাল। অনেকক্ষণ বোতাম টিপেও কিছু হল না। তারপর হঠাৎ একটা খসখসে শব্দের পর রেকর্ডিং শুরু হল।
প্রথমে শোনা গেল একজন বৃদ্ধের কণ্ঠ।
“১৭ আগস্ট, ২০০১। পরীক্ষার শেষ পর্যায়। আজ দুই শিশুর জন্ম হয়েছে। আমি নিশ্চিত, সময়ের ব্যবধানটাই আমাদের দরজা খুলে দেবে। একটি শিশু থাকবে এই পাশে, অন্যটি যাবে ওপারে। কিন্তু ওপার বলতে ঠিক কী বোঝায়, তা এখনও স্পষ্ট নয়।”
কণ্ঠটা হেমন্ত রায়ের।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর আবার কণ্ঠ শোনা গেল।
“অমলেন্দু আমাকে সাহায্য করতে রাজি হয়েছে। সে বলেছে, কোনো বিপদ ঘটলে অন্তত একটি শিশুকে সে নিয়ে যাবে। কিন্তু মৃণালিনী কিছু জানতে পারবে না। সে যদি জানতে পারে, পরীক্ষাটি বন্ধ করে দেবে।”
অরিত্রর বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
রেকর্ডিং চলতে থাকল।
“রাত ২টা ১৩ মিনিট। প্রথম শিশুর হৃদস্পন্দন বন্ধ। কিন্তু যন্ত্রে সংকেত রয়েছে। শিশুটির মস্তিষ্কে এমন একটি প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। সে যেন একই সঙ্গে দুটি স্থানে উপস্থিত।”
তারপর হঠাৎ বিকট শব্দ।
মৃণালিনী কান চেপে ধরলেন। অরিত্র টেপ রেকর্ডারের শব্দ কমাতে গেল, কিন্তু যন্ত্রটি নিজে থেকেই চলতে থাকল।
কয়েক মুহূর্ত পর এক শিশুর কান্না শোনা গেল।
তারপর আরেকটি কণ্ঠ।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কণ্ঠ, অথচ সে বলছে—
“দাদা, তুমি কোথায়?”
অরিত্রর হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
ক্যাসেটের মধ্যে আবার হেমন্ত রায়ের কণ্ঠ শোনা গেল।
“এটা অসম্ভব। দ্বিতীয় শিশুটি এখনও জন্মায়নি। তাহলে প্রথম শিশুটি কাকে ডাকছে?”
তারপর তীব্র ধাতব শব্দ।
রেকর্ডিংয়ে কেউ চিৎকার করে উঠল।
“দরজা বন্ধ করো! দরজাটা বন্ধ করো!”
তারপর নিস্তব্ধতা।
অরিত্র টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে দিল।
“মা, এই যন্ত্রটা কী করেছিল?”
মৃণালিনী মাথা নাড়লেন।
“আমি জানি না। আমি শুধু জানি, সেই রাতে বাড়ির চারজন মানুষ নিখোঁজ হয়েছিলেন। আমার বাবা, আমার স্বামী, আমার ছেলে অরুণ এবং… আমি।”
“কিন্তু তুমি তো এখানে আছ!”
“আমি এখানে আছি কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরও আমার জানা নেই।”
অরিত্র তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
মৃণালিনী ধীরে ধীরে বললেন, “আমি পঁচিশ বছর ধরে এই ঘরে বন্দি। কখনও মনে হয়, কয়েক মিনিট কেটেছে। কখনও মনে হয়, কয়েক যুগ। বাইরে কী হচ্ছে, তা আমি দেখতে পাই না। কখনও দরজা খুলে যায়, আবার বন্ধ হয়ে যায়। শুধু একটা সময়ে আমি তোকে দেখতে পাই—প্রতি বছর তোর জন্মদিনের রাতে।”
“কিন্তু আমার জন্মদিন তো তেইশে নভেম্বর!”
“ওটা তোর আসল জন্মদিন নয়। অমলেন্দু তোকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর সেই তারিখ নথিভুক্ত করেছিল। কিন্তু তুই যখনই ঘুমের মধ্যে কাঁদতিস, আমি এই ঘরে বসে সেই কান্না শুনতে পেতাম।”
অরিত্রর চোখে জল এসে গেল।
“তাহলে তুমি এত বছর আমাকে খুঁজলে না কেন?”
মৃণালিনী তাঁর মুখে হাত রাখলেন।
“আমি তোকে খুঁজিনি, কারণ আমি জানতাম না, তোকে খুঁজতে গেলে তোর কী ক্ষতি হবে। এই বাড়ির দরজা খুলে দেওয়ার ক্ষমতা আমার ছিল না। আমি শুধু অপেক্ষা করেছি।”
“কিসের অপেক্ষা?”
“তুই ফিরে আসবি। আর সত্যিটা জানবি।”
৪. যে মানুষটি নিজের পরিচয় জানে না
হঠাৎ বাইরে থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
ধীর, ভারী পদক্ষেপ।
অরিত্র দরজার দিকে তাকাল। তিতলি নেই। মৃণালিনীও যেন মুহূর্তে বদলে গেলেন। তাঁর মুখে আতঙ্ক।
“ও এসেছে,” তিনি ফিসফিস করে বললেন।
“কে?”
“যে নিজেকে অমলেন্দু বলে পরিচয় দিয়েছে।”
“কিন্তু তুমি তো বললে, সে অমলেন্দু নয়!”
“আমি বলিনি সে অমলেন্দু নয়। আমি বলেছি, আমি নিশ্চিত নই।”
দরজার বাইরে থেকে কণ্ঠ ভেসে এল।
“অরিত্র, দরজা খোলো। তোমার জানার মতো আরও অনেক কিছু আছে।”
অরিত্র দরজার কাছে এগিয়ে গেল। মৃণালিনী তার হাত ধরে টেনে থামালেন।
“দরজা খুলিস না। ও যদি ভেতরে ঢোকে, তুই আর বেরোতে পারবি না।”
“কিন্তু ও কে?”
মৃণালিনী কাঁপা গলায় বললেন, “ও হয়তো তোর বাবা। হয়তো তোর ভাই। হয়তো এমন কেউ, যে নিজের স্মৃতিকে অন্যের শরীরে বাঁচিয়ে রেখেছে।”
বাইরে থেকে আবার ডাক এল।
“অরিত্র, তুমি কি জানতে চাও, অমলেন্দু সেন তোমাকে কেন নিয়ে গিয়েছিল? তুমি কি জানতে চাও, তোমার ভাইয়ের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল?”
অরিত্র দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
“বলুন!”
বাইরের কণ্ঠ এবার আরও কাছে এল।
“কারণ তোমাদের মধ্যে একজনকে এই পৃথিবীতে থাকতে হতো। আর অন্যজনকে থাকতে হতো এমন এক জায়গায়, যেখানে সময় থেমে থাকে।”
“কোন জায়গা?”
“এই বাড়ির ভেতরে। এই অন্ধকারে।”
অরিত্রর বুকের মধ্যে যেন কেউ পাথর চাপিয়ে দিল।
“আমার ভাই কি এখনও বেঁচে আছে?”
দরজার ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর উত্তর এল—
“সে বেঁচে আছে। কিন্তু সে আর শিশু নেই।”
অরিত্রর মনে পড়ল, অন্ধকারে শোনা সেই কণ্ঠ—‘এবার আমার পালা, দাদা।’
তার ভাই কি সত্যিই পঁচিশ বছর ধরে এই বাড়িতে বড় হয়েছে? যদি তাই হয়, তবে তার শরীরের বয়স কীভাবে বেড়েছে? সময় কি সত্যিই এখানে থেমে আছে, নাকি এই বাড়ি সময়ের অন্য কোনো নিয়মে চলে?
অরিত্র দরজার কড়ায় হাত রাখল।
মৃণালিনী তার হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন।
“দয়া করে, অরিত্র। আর একটু অপেক্ষা কর।”
কিন্তু ততক্ষণে দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে একটা কাগজ ভেতরে ঢুকে এসেছে।
অরিত্র সেটি তুলে নিল।
কাগজে লেখা—
“তোমার জন্মের রাতের দ্বিতীয় সাক্ষী এখনও জীবিত। সে নায়নপুরেই আছে। তার নাম সুধাংশু পাল।”
অরিত্রর চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
সুধাংশু পাল! সেই বৃদ্ধ, যিনি প্রথম দিনেই তাকে সতর্ক করেছিলেন। যিনি বলেছিলেন, তার জন্মের নথিতে অসংগতি আছে।
কাগজের নিচে আরও একটি বাক্য—
“কিন্তু তাঁর স্মৃতিতে বিশ্বাস কোরো না। কারণ সেই রাতের দরজা প্রথম তিনিই খুলেছিলেন।”
৫. সুধাংশু পালের স্বীকারোক্তি
পরের মুহূর্তে ঘরের আলো জ্বলে উঠল।
অরিত্র চোখ মেলে দেখল, সে আর পশ্চিমের গোপন ঘরে নেই। সে শান্তিনিকেতনের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। বৃষ্টি থেমে গেছে। ভোরের আলো ফুটছে।
তার পাশে কেউ নেই।
মৃণালিনী নেই। তিতলি নেই। দরজার বাইরের সেই মানুষটিও নেই।
তার হাতে শুধু হাসপাতালের নথি, ক্যাসেট এবং সেই কাগজটি।
অরিত্র দৌড়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল। রাস্তার ওপারে প্রাচীন বটগাছের নিচে সুধাংশু পাল দাঁড়িয়ে আছেন। যেন তিনি অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলেন।
“আপনি জানতেন?” অরিত্র তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। “আমার জন্মের রাতের কথা জানতেন?”
বৃদ্ধ মাথা নিচু করলেন।
“হ্যাঁ।”
“আপনি কি সেই রাতে দরজা খুলেছিলেন?”
সুধাংশু দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আমি শুধু দরজা খুলিনি, অরিত্র। আমি সেই শিশুটিকে ঘর থেকে বের করে এনেছিলাম।”
“কোন শিশুটিকে?”
“যে শিশুটিকে সবাই মৃত বলে ধরে নিয়েছিল।”
অরিত্রর বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
“আমার ভাই অরুণকে?”
বৃদ্ধ চোখ তুলে তাকালেন।
“না। তোমাকে।”
অরিত্র পিছিয়ে গেল।
“কিন্তু আমাকে তো অমলেন্দু সেন নিয়ে গিয়েছিলেন!”
“অমলেন্দু তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন, ঠিক। কিন্তু তার আগে আমি তোমাকে পশ্চিমের ঘর থেকে বের করেছিলাম। তোমার শরীরে তখন কোনো স্পন্দন ছিল না। কিন্তু তোমার চোখ খোলা ছিল। তুমি আমার দিকে তাকিয়ে এমন একটা কথা বলেছিলে, যা আজও আমি ভুলতে পারিনি।”
“কী বলেছিলাম?”
সুধাংশু পালের চোখে জল এসে গেল।
“তুমি বলেছিলে, ‘কাকু, দাদাকে একা রেখো না।’”
অরিত্রর গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।
“আমি তোমাকে কোলে তুলে নিয়েছিলাম। সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতর থেকে আরেকটি শিশুর কান্না শুনতে পাই। দরজা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। আমি তোমাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। কিছুক্ষণ পর অমলেন্দু আসে। সে তোমাকে নিয়ে চলে যায়। কিন্তু যাওয়ার আগে আমাকে শপথ করায়, যেন কাউকে কিছু না বলি।”
“কেন?”
“কারণ সে বিশ্বাস করত, তোমাকে এই বাড়ির বাইরে নিয়ে যেতে পারলে তুমি বেঁচে থাকবে। আর তোমার ভাইকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলে তুমি আবার মারা যাবে।”
“আমার ভাইকে ফিরিয়ে আনা মানে কী?”
সুধাংশু উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর পেছনে একটা ছায়া পড়ল।
অরিত্র তাকিয়ে দেখল, বটগাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে একটি যুবক। তার বয়স আনুমানিক বত্রিশ। মুখ অরিত্রর মতোই, কিন্তু চোখে অদ্ভুত শূন্যতা। পরনে পুরোনো দিনের জামা। চুল ভেজা, মুখে কাদা লেগে আছে।
যুবকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
সুধাংশু ভয়ে পিছিয়ে গেলেন।
“না… তুমি এখানে আসতে পারো না!”
যুবকটি বৃদ্ধের দিকে তাকাল না। সে শুধু অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল—
“দাদা, এবার বাড়ি চলো।”
অরিত্রর পা যেন মাটিতে গেঁথে গেল।
“তুমি… অরুণ?”
যুবকটি মৃদু হাসল।
“তুমি এত বছর আমাকে খুঁজেছ। এবার আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি।”
“তুমি পঁচিশ বছর ধরে ওই বাড়িতে ছিলে?”
“ওই বাড়িতে সময় থেমে আছে, দাদা। কিন্তু আমার জন্য নয়।”
“তাহলে তোমার বয়স বাড়ল কীভাবে?”
অরুণ উত্তর দিল না। সে শুধু নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল।
তার কবজিতে একটি পুরোনো ঘড়ি।
ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে রাত দুটো বেজে তেরো মিনিটে।
“চলো,” অরুণ বলল। “আমাদের দুজনের মধ্যে একজনকে আবার সেই ঘরে ফিরতে হবে।”
“কেন?”
অরুণের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“কারণ দরজা এবার পুরোপুরি খুলে গেছে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে দূরে শান্তিনিকেতন বাড়ির দিক থেকে প্রচণ্ড শব্দ হল। যেন বাড়ির ভেতরে বিশাল কোনো কাচ ভেঙে পড়েছে।
আকাশের রং বদলে গেল। দিনের আলো নিভে গিয়ে চারদিকে নেমে এল অস্বাভাবিক অন্ধকার।
আর গ্রামের সমস্ত ঘড়ি একসঙ্গে থেমে গেল।
রাত দুটো বেজে তেরো মিনিট।
অরুণ অরিত্রর হাত ধরে ফিসফিস করে বলল—
“দাদা, এবার যদি আমরা ভুল করি, তাহলে শুধু আমরা দুজন নয়—পুরো নায়নপুর এই অন্ধকারের মধ্যে আটকে যাবে।”
তারপর সে অরিত্রকে নিয়ে শান্তিনিকেতন বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
বাড়ির পশ্চিমের জানালায় তখন একটি শিশুর মুখ দেখা যাচ্ছে।
সেই মুখ অরিত্রর মতো।
কিন্তু শিশুটির ঠোঁটে হাসি নেই।
সে কাচের ওপার থেকে আঙুল তুলে অরিত্রকে ইশারা করল।
যেন বলছে—
‘আমাকে ভুলে যেও না।’
চলবে…