সকাল ন’টা পঁয়তাল্লিশ।
পুরোনো মেডিক্যাল কলেজের পিছনের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নন্দিতা বারবার হাতঘড়ি দেখছিল। রাতের বৃষ্টির পর আকাশ পরিষ্কার হয়েছে, কিন্তু বাতাসে এখনও ভেজা মাটির গন্ধ। রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে কয়েকজন লোক বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। হাসপাতালের ভিতরে রোগীর আত্মীয়দের ব্যস্ত যাতায়াত।
নন্দিতার হাতে বাবার লাল ডায়েরি। ব্যাগের ভিতরে আগের রাতের সেই পুরোনো ছবি।
তার পাশে ঋদ্ধি।
রাতের ঘটনার পর দুজনের কেউই ভালো করে ঘুমোতে পারেনি। বাড়িতে ফিরে তারা দেখেছিল, সদর দরজার তালা ভাঙা। দোতলার ঘরের বইপত্র ছড়িয়ে রয়েছে। টেবিলের ড্রয়ার উপড়ে ফেলা হয়েছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, বাড়ির অন্য কোনও জিনিসে হাত দেওয়া হয়নি।
যারা এসেছিল, তারা শুধু ডায়েরিটাই খুঁজছিল।
“আপনি কি নিশ্চিত, ওই বৃদ্ধ এখানে আসতে বলেছিলেন?” ঋদ্ধি প্রশ্ন করল।
“হ্যাঁ।”
“আর আপনি তাঁকে বিশ্বাস করেন?”
নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “না। কিন্তু আমার কাছে আর কোনও পথ নেই।”
ঠিক দশটা বাজতেই হাসপাতালের পিছনের গেট দিয়ে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা বেরিয়ে এলেন। পরনে সাদা শাড়ি, কাঁধে কালো ব্যাগ। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। তিনি চারদিকে তাকিয়ে নন্দিতার দিকে এগিয়ে এলেন।
“তুমি নন্দিতা?”
“জি। আপনি কে?”
মহিলা ব্যাগ থেকে একটি পরিচয়পত্র বের করলেন।
“আমার নাম ডা. মীরা বসু। একসময় এই হাসপাতালের শিশু বিভাগে কাজ করতাম। তোমার বাবাকে চিনতাম।”
নন্দিতার বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।
“আমার বাবা কি আপনার কাছে কোনও কথা বলে গিয়েছিলেন?”
“শুধু কথা নয়। কিছু নথিও রেখে গিয়েছিলেন। আমি জানতাম, একদিন তুমি আসবে।”
ঋদ্ধি সতর্ক দৃষ্টিতে মহিলার দিকে তাকাল।
“আপনি কীভাবে জানলেন, আজ নন্দিতা আসবে?”
ডা. মীরা মৃদু হাসলেন।
“কারণ গতকাল রাতে তোমাদের বাড়িতে যারা গিয়েছিল, তাদের একজন আমার পরিচিত। সে ভেবেছিল, ডায়েরিটা তোমাদের কাছ থেকে নিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু তোমরা পালিয়ে যাওয়ায় তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।”
“তাহলে আপনি কি তাদের সঙ্গে যুক্ত?” নন্দিতা প্রশ্ন করল।
মীরার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“না। আমি বহু বছর ধরে এই অপরাধের বিরুদ্ধে লড়েছি। কিন্তু কিছু সত্যি আছে, যেগুলো প্রকাশ করার জন্য প্রমাণ দরকার। শুধু স্মৃতি বা সন্দেহ দিয়ে কাউকে অপরাধী করা যায় না।”
তিনি তাঁদের হাসপাতালের পুরোনো ভবনের দিকে নিয়ে গেলেন। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে একটি ছোট ঘরের সামনে থামলেন। দরজার গায়ে লেখা—‘রেকর্ড বিভাগ’।
ঘরের ভিতরে ঢুকে মীরা দরজা বন্ধ করে দিলেন।
“তোমার বাবা অমিয়কুমার দত্ত ছিলেন সৎ মানুষ। তিনি স্কুলে ইতিহাস পড়াতেন ঠিকই, কিন্তু একসময় শিশুদের বেআইনি দত্তক দেওয়ার একটি ঘটনার সাক্ষী হয়ে পড়েন। তাঁর এক ছাত্রের ছোট ভাই জন্মের পর হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। সেই পরিবার সাহায্যের জন্য তোমার বাবার কাছে এসেছিল।”
নন্দিতা অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু আমার বাবা তো কখনও এসব বলেননি!”
“তখন তিনি বুঝতে পারেননি, ঘটনাটা কত বড়। প্রথমে ভেবেছিলেন, হাসপাতালের ভুল বা অবহেলার কারণে শিশুটি হারিয়ে গেছে। পরে তিনি জানতে পারেন, কিছু অসাধু কর্মী অসহায় পরিবারের সন্তানদের অন্য পরিচয়ে অন্যত্র পাঠাচ্ছে। সেই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়েই তিনি আরও একটি অদ্ভুত তথ্য পান।”
মীরা আলমারি খুলে একটা পুরোনো ফাইল বের করলেন।
“তোমার জন্মের রাতে এই হাসপাতালের মাতৃবিভাগে দুটো শিশু জন্মেছিল।”
নন্দিতার মুখ শুকিয়ে গেল।
“দুটো?”
“হ্যাঁ। হাসপাতালের প্রথম নথিতে দুটি শিশুর উল্লেখ আছে। কিন্তু পরের নথিতে দেখা যায়, একটি শিশুর জন্মের তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। অন্য শিশুটির নাম রাখা হয়েছে নন্দিতা দত্ত।”
ঋদ্ধি বলল, “তাহলে নন্দিতার যমজ ভাই বা বোন ছিল?”
“সম্ভবত। কিন্তু এই নথিতে শিশুটির লিঙ্গ স্পষ্ট নয়। কিছু কাগজ নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু কাগজ ইচ্ছাকৃতভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।”
নন্দিতা চেয়ারে বসে পড়ল।
“আমার মা কোথায়? ছবিতে তাঁকে দেখা গিয়েছে। আপনি বলছেন, তিনি মারা যাননি। তাহলে এত বছর তিনি কোথায় ছিলেন?”
মীরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তোমার মায়ের নাম ছিল মাধবী দত্ত। তিনি তোমার জন্মের তিন বছর পর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। অন্তত আমার জানা তথ্য তাই বলে।”
“তিন বছর পর?”
“হ্যাঁ। তোমার বাবা তখন একটা মামলার জন্য প্রমাণ সংগ্রহ করছিলেন। মাধবীও তাঁকে সাহায্য করছিলেন। একদিন হঠাৎ দুজনের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তোমার বাবা বলেছিলেন, মাধবীকে নিরাপদ জায়গায় পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তিনি কোথায় গিয়েছেন, তা কখনও জানাননি।”
নন্দিতার চোখে জল এসে গেল।
“আমাকে তাহলে কে বড় করল? আমার বাবা তো বলতেন, মা আমাকে জন্ম দিতে গিয়েই মারা গিয়েছেন!”
মীরা নরম গলায় বললেন, “সম্ভবত তোমার বাবা তোমাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কেন এই মিথ্যে বলেছিলেন, তার সম্পূর্ণ উত্তর আমার কাছে নেই।”
নন্দিতা ডায়েরিটা খুলে শেষ পাতার ঠিকানাটি দেখাল।
“এখানে ডা. সুশান্ত রায়ের নাম লেখা। উনি কে?”
নামটি দেখেই মীরার মুখ বদলে গেল।
তিনি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন, “ডা. সুশান্ত রায় ছিলেন এই হাসপাতালের তৎকালীন প্রশাসনিক প্রধান। তাঁর বিরুদ্ধে শিশুদের পরিচয় বদলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু কোনও প্রমাণ না পাওয়ায় মামলা এগোয়নি। বহু বছর আগে তিনি শহর ছেড়ে চলে যান।”
“তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন?”
“জানি না। তবে তোমার বাবার ডায়েরিতে তাঁর নাম থাকা মানে, অমিয়বাবু এমন কিছু জানতেন যা অন্য কেউ জানত না।”
মীরা ফাইলের ভিতর থেকে একটি ছোট ছবি বের করলেন।
ছবিতে হাসপাতালের একটি ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন কর্মী। তাঁদের মধ্যে একজনের কোলে নবজাতক শিশু। ছবির পিছনে তারিখ—১৮ জুন, ১৯৯৯।
নন্দিতা ছবির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।
“এই লোকটা!”
ঋদ্ধি তার হাত থেকে ছবিটা নিয়ে দেখল।
“কাকে চিনতে পেরেছেন?”
“গত রাতে যে বৃদ্ধ আমাকে চাবি দিয়েছিল, ছবিতে সে-ই আছে!”
মীরা অবাক হয়ে ছবিটা দেখলেন।
“অসম্ভব! এই ছবির মানুষটির নাম হরিপদ নস্কর। তিনি হাসপাতালের পুরোনো কর্মী ছিলেন। প্রায় পঁচিশ বছর আগে তাঁর চাকরি চলে যায়। তারপর থেকে কেউ তাঁকে দেখেনি।”
নন্দিতার মাথা ঘুরে উঠল।
“কিন্তু উনি তো কাল রাতে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন!”
মীরা ধীরে বললেন, “তাহলে তিনি এত বছর কোথায় ছিলেন, আর এখন কেন ফিরে এসেছেন—সেটা আমাদের জানতে হবে।”
ঠিক সেই সময় ঋদ্ধির ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
সে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে চাপা গলা শোনা গেল।
“আপনি কি ঋদ্ধি সেন বলছেন?”
“হ্যাঁ। কে বলছেন?”
“আপনারা ডা. মীরা বসুর ঘরে আছেন, তাই তো?”
ঋদ্ধি চমকে উঠে মীরার দিকে তাকাল।
“আপনি কে?”
“আপনারা যে নথি খুঁজছেন, তার অর্ধেক আপনাদের কাছে আছে। বাকি অর্ধেক পেতে হলে আজ সন্ধ্যা ছ’টায় বাগবাজারের পুরোনো ঘাটে আসুন। তবে সাবধান—যাকে মৃত বলে জানেন, সে সব সময় মৃত নয়। আর যাকে জীবিত ভাবছেন, সে হয়তো বহু আগেই অন্য পরিচয়ে বেঁচে আছে।”
ফোন কেটে গেল।
ঘরের মধ্যে কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না।
নন্দিতা ধীরে বলল, “ওরা আমাদের সব সময় নজরে রাখছে।”
ঋদ্ধি ফোনের নম্বরটা পরীক্ষা করল। নম্বরটি কিছুক্ষণ পরেই বন্ধ হয়ে গেল।
মীরা বললেন, “এখন থেকে সাবধানে থাকতে হবে। তোমাদের কাছে যে তথ্য আছে, তা প্রকাশ হলে অনেক মানুষের মুখোশ খুলে যেতে পারে।”
নন্দিতা বাবার ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।
“আমি আর পিছিয়ে যাব না। আমার মা কোথায়, আমার জন্মের রাতে কী ঘটেছিল, আর আমার ভাই বা বোন কোথায়—সব জানতে চাই।”
মীরা তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন।
“তাহলে আজ সন্ধ্যায় বাগবাজারে যাওয়ার আগে একটা কাজ করো। তোমার বাবার বাড়িতে ফিরে তাঁর পুরোনো বইয়ের আলমারিটা ভালো করে দেখো। অমিয়বাবু আমাকে একবার বলেছিলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ তিনি এমন জায়গায় রেখেছেন, যেখানে কেউ খুঁজবে না।”
“কোথায়?”
“তিনি বলেছিলেন, ‘ইতিহাসের ভিতরে ইতিহাস লুকিয়ে রেখেছি।’”
ঋদ্ধি বুঝতে চেষ্টা করল কথাটার অর্থ।
“ইতিহাসের ভিতরে ইতিহাস?”
মীরা বললেন, “তোমার বাবা ইতিহাস পড়াতেন। হয়তো কোনও বইয়ের ভিতরে, অথবা বইয়ের তাকের পিছনে, এমন কিছু আছে যা আমরা এখনও পাইনি।”
দুপুর একটা।
নন্দিতা ও ঋদ্ধি বাড়িতে ফিরে এল।
আগের রাতের তছনছ করা ঘর দেখে নন্দিতার চোখে আবার রাগ জমল। তার মনে হচ্ছিল, বাবার স্মৃতির ওপর কেউ যেন ইচ্ছা করে আঘাত করেছে।
দোতলার ঘরে ঢুকে ঋদ্ধি বইয়ের তাকগুলো পরীক্ষা করতে শুরু করল। ইতিহাস, ভূগোল, বাংলা সাহিত্য, পুরোনো পত্রিকা—বইয়ের সংখ্যা অসংখ্য।
“ইতিহাসের ভিতরে ইতিহাস,” সে বিড়বিড় করে বলল। “আপনার বাবা হয়তো কোনও নির্দিষ্ট বইয়ের কথা বলতে চেয়েছেন।”
নন্দিতা তাকের সামনে দাঁড়িয়ে বাবার বইগুলো দেখতে লাগল।
একটি বইয়ের মলাটে লেখা—‘বাংলার সামাজিক ইতিহাস’। আরেকটি—‘উনিশ শতকের কলকাতা’। তৃতীয়টি—‘ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন’।
হঠাৎ তার চোখে পড়ল, তাকের একেবারে নীচে রাখা একটি মোটা বইয়ের মলাট অন্যগুলোর তুলনায় অস্বাভাবিক রকম পরিষ্কার। যেন কেউ বইটিকে সম্প্রতি হাতে নিয়েছে।
বইটির নাম—‘বাংলার হারিয়ে যাওয়া জনপদ’।
নন্দিতা বইটা টেনে বের করতেই পিছন থেকে একটি ছোট খাম মেঝেতে পড়ল।
খামের ওপর লেখা—
“আমার মেয়ের জন্য—যেদিন সে সত্যি জানতে চাইবে।”
নন্দিতা কাঁপা হাতে খামটা খুলল।
ভিতরে একটি চিঠি আর একটি ছোট পেনড্রাইভ।
চিঠিতে লেখা—
“নন্দিতা,
যদি তুই এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব, আমার সব চেষ্টা সত্ত্বেও সত্যিটা তোর কাছে পৌঁছে গেছে।
আমি জানি, তুই আমাকে বিশ্বাসঘাতক ভাবতে পারিস। ভাবতেই পারিস। কারণ তোকে রক্ষা করার নামে আমি তোকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করেছি।
কিন্তু তোর জন্মের রাতের ঘটনাটা শুধু একটি শিশুর হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ছিল না। সেই রাতে যে শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে তোর যমজ ভাই নয়।
সে ছিল তোর যমজ বোন।
তার নাম আমি রেখেছিলাম—নন্দিনী।
আমি নিজের হাতে তাকে কোলে নিয়েছিলাম। তার ডান কানের পিছনে ছোট্ট একটি জন্মদাগ ছিল। তার গলায় বাঁধা ছিল লাল সুতো। আর তোর গলায় ছিল নীল সুতো।
আমি জানি না, আজ সে কোথায় আছে। কিন্তু আমি জানি, সে বেঁচে আছে।
যদি কখনও তার সঙ্গে দেখা হয়, তাকে বলিস, তার মা তাকে কোনও দিন ভুলে যায়নি।
আর পেনড্রাইভে যে ভিডিওটি আছে, তা একা দেখিস না। কারণ সেখানে এমন একজনের মুখ দেখতে পাবি, যাকে তুই এত দিন নিজের পরিবারের মানুষ বলে জেনে এসেছিস।”
চিঠিটা পড়ে নন্দিতার হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল।
“আমার একটা যমজ বোন আছে…”
ঋদ্ধি তার পাশে এসে দাঁড়াল।
“আমরা ওকে খুঁজে বের করব।”
“কিন্তু চিঠির শেষ কথাটার মানে কী? আমাদের পরিবারের এমন কে আছে, যে এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত?”
ঋদ্ধি পেনড্রাইভটা হাতে নিল।
“ভিডিওটা না দেখলে জানা যাবে না।”
তারা ল্যাপটপ খুলে পেনড্রাইভটি লাগাল।
একটি মাত্র ভিডিও ফাইল।
তারিখ—১৮ জুন, ১৯৯৯।
ভিডিওতে দেখা গেল, হাসপাতালের একটি ঘর। ক্যামেরা স্থির। দরজা খুলে একজন চিকিৎসক ঢুকলেন। তাঁর সঙ্গে একজন তরুণী। তরুণীর মুখ স্পষ্ট নয়, কিন্তু তিনি একটি শিশুকে কোলে ধরে আছেন।
তারপর ঘরে প্রবেশ করলেন আরেকজন মানুষ।
নন্দিতা পর্দার দিকে তাকিয়ে জমে গেল।
লোকটি তার বাবার পুরোনো বন্ধু হরিপদ নস্কর নন।
লোকটি তার নিজের মামা—মায়ের ভাই, প্রদীপ দত্ত।
নন্দিতার মামা প্রদীপ গত কয়েক বছর ধরে তাদের বাড়ির দেখাশোনা করতেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনিই ব্যাংকের কাগজপত্র, জমিজমা এবং মায়ের পুরোনো নথি গুছিয়ে দিয়েছিলেন। নন্দিতা তাঁকে বিশ্বাস করত। ছোটবেলায় তিনিই তাকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন, জন্মদিনে উপহার কিনে দিতেন।
ভিডিওতে প্রদীপ চিকিৎসকের হাতে একটি খাম দিলেন।
তারপর বললেন, “এই শিশুটির নাম আর কোনও নথিতে থাকবে না। কাগজপত্র ঠিক করে দিন। কেউ যেন ওকে খুঁজে না পায়।”
চিকিৎসক মাথা নাড়লেন।
ক্যামেরার সামনে প্রদীপের মুখ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।
ভিডিও শেষ হয়ে গেল।
নন্দিতা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গিয়েছিল।
“আমার মামা… তিনি এটা করতে পারেন?”
ঋদ্ধি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমাদের এখনও পুরো ঘটনা জানা নেই। ভিডিওটা প্রমাণ করে, তিনি ওই ঘরে ছিলেন এবং শিশুটির পরিচয় গোপন করার কথা বলেছেন। কিন্তু কেন বলেছেন, সেটাও জানতে হবে।”
নন্দিতা চোখ মুছল।
“আমি আজই মামার সঙ্গে কথা বলব।”
“সাবধানে। তিনি যদি সত্যিই এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে তিনি জানেন আমরা কী খুঁজছি।”
নন্দিতা দৃঢ় গলায় বলল, “তাহলে আজ সন্ধ্যায় বাগবাজারে যাওয়ার আগে আমি তাঁর কাছে যাব।”
ঋদ্ধি মাথা নাড়ল।
“আমি তোমার সঙ্গে থাকব।”
বিকেল পাঁচটা।
প্রদীপ দত্তের বাড়ি দক্ষিণ কলকাতার একটি শান্ত আবাসনে। নন্দিতা ছোটবেলা থেকে বহুবার এই বাড়িতে এসেছে। দরজার সামনে পরিচিত নামফলক, বারান্দায় তুলসীগাছ, ভিতরে পুরোনো কাঠের আসবাব।
দরজা খুললেন প্রদীপ নিজেই।
“আরে, নন্দু! এই সময়ে? আগে ফোন করিসনি কেন?”
নন্দিতা তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটিই কি সেই ভিডিওতে দেখা লোক?
“মামা, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।”
প্রদীপ ঋদ্ধির দিকে তাকালেন।
“ইনি কে?”
“আমার বন্ধু। সাংবাদিক।”
প্রদীপের মুখের হাসি সামান্য ম্লান হয়ে গেল।
“ভিতরে আয়।”
তারা বসার ঘরে বসল। প্রদীপ চা আনতে বললেন। নন্দিতা সরাসরি ব্যাগ থেকে পেনড্রাইভ বের করে টেবিলের ওপর রাখল।
“মামা, তুমি কি এই ভিডিওটা চেনো?”
প্রদীপের চোখ পেনড্রাইভের ওপর পড়তেই তাঁর হাত থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড কোনও কথা বললেন না।
তারপর ধীরে বললেন, “তুই এটা কোথায় পেলি?”
“বাবার ঘরে।”
প্রদীপ চোখ বন্ধ করলেন।
“তাহলে অমিয়দা শেষ পর্যন্ত সব রেখে গিয়েছিলেন।”
“তুমি কি আমার বোনকে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে দিয়েছিলে?”
প্রদীপ মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
“নন্দু, সব কথা এত সহজ নয়।”
“সহজ করে বলো না, মামা। সত্যি করে বলো। আমার বোন কোথায়?”
প্রদীপের চোখে জল এসে গেল।
“আমি জানি না।”
নন্দিতা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
“মিথ্যে বলছ!”
“আমি শপথ করে বলছি, আমি জানি না সে এখন কোথায়। আমি শুধু জানতাম, তাকে ওই হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। তখন আমাকে বলা হয়েছিল, শিশুটিকে এমন একটি পরিবারের কাছে পাঠানো হবে যারা তাকে নিজের সন্তানের মতো বড় করবে।”
“তাহলে তুমি মাকে কেন বলেছিলে, বাচ্চাটা মারা গেছে?”
প্রদীপ মুখ ঢেকে ফেললেন।
“কারণ আমাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তারা বলেছিল, আমি যদি সত্যিটা বলি, তাহলে তোরও ক্ষতি হবে। তোর মাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য তারা মিথ্যে মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়েছিল। পরে মাধবীদি সব জানতে পেরে প্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করেন। সেই কারণেই তাঁকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল।”
“তাহলে মা কোথায়?”
প্রদীপ মুখ তুললেন।
“আমি জানি না, নন্দু। কিন্তু শেষবার যখন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, একদিন তুই নিজেই সব খুঁজে বের করবি।”
ঋদ্ধি এবার প্রশ্ন করল, “এই ঘটনার পিছনে কারা ছিল?”
প্রদীপ কিছুক্ষণ দ্বিধা করলেন।
তারপর বললেন, “ডা. সুশান্ত রায় আর হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী। তবে তাদের সাহায্য করেছিল এমন একজন, যাকে কেউ সন্দেহ করেনি। সেই মানুষটি শুধু শিশুদের পরিচয় বদলায়নি, যারা সত্যিটা জানত তাদেরও একে একে সরিয়ে দিয়েছিল।”
“কে সে?” নন্দিতা প্রশ্ন করল।
প্রদীপ উত্তর দেওয়ার আগেই তাঁর ফোন বেজে উঠল।
তিনি ফোনের পর্দা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন।
“না… এখন নয়।”
ফোন কেটে দিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
“তোদের এখনই এখান থেকে চলে যেতে হবে।”
“কেন?”
“কারণ তারা জেনে গেছে, তুই ভিডিওটা পেয়েছিস।”
ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল।
প্রদীপ জানালার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “ওরা এসে গেছে।”
নন্দিতা দরজার দিকে এগিয়ে গেল, কিন্তু প্রদীপ তাকে আটকে দিলেন।
“পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যা। বাগবাজারে যে লোকটা তোকে ডাকেছে, তার কাছে একটা কাগজ আছে। সেই কাগজেই তোর বোনের নতুন পরিচয়ের সূত্র লেখা।”
“মামা, তুমি আমাদের সঙ্গে চলো!”
প্রদীপ মাথা নাড়লেন।
“আমি এত বছর পালিয়ে বেড়িয়েছি। এবার পালাব না। তুই শুধু একটা কথা মনে রাখিস—তোর বোনের নাম বদলে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তার জন্মদাগ বদলানো যায়নি।”
নন্দিতা আর কিছু বলতে পারল না।
ঋদ্ধি তাকে নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।
দূরে বাগবাজারের দিকে আকাশে কালো মেঘ জমছিল।
ঘড়িতে তখন পাঁচটা বেয়াল্লিশ।
তাদের হাতে মাত্র আঠারো মিনিট।
আর সেই আঠারো মিনিটের মধ্যে তাদের পৌঁছতে হবে এমন একজন মানুষের কাছে, যিনি হয়তো জানেন—নন্দিনীর আসল পরিচয় কোথায় লুকিয়ে আছে।
কিন্তু নন্দিতা জানত না, বাগবাজারের ঘাটে তাদের জন্য শুধু উত্তর অপেক্ষা করছে না।
অপেক্ষা করছে এমন এক মুখোমুখি সংঘর্ষ, যা তার নিজের পরিবার সম্পর্কে শেষ বিশ্বাসটুকুও ভেঙে দিতে পারে।
চলবে…