সন্ধ্যা তখন প্রায় ছটা। আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বৃষ্টির জল জমে থাকা রাস্তা পেরিয়ে নন্দিতা আর ঋদ্ধি যখন বাগবাজারের পুরোনো ঘাটে পৌঁছল, তখন গঙ্গার জল অন্ধকারে প্রায় কালো দেখাচ্ছিল।
ঘাটের সিঁড়িতে কেউ নেই। শুধু একটা পুরোনো লণ্ঠন জ্বলছে।
নন্দিতা হাঁপাতে হাঁপাতে চারদিকে তাকাল।
—কেউ তো নেই, ঋদ্ধি!
ঋদ্ধি মোবাইলের সময় দেখল। ছটা বেজে এক মিনিট।
—আমাদের এখানে আসতে বলেছে। নিশ্চয়ই কেউ আসবে।
ঠিক তখনই ঘাটের শেষ সিঁড়ির কাছে একটা ছাতা নড়ে উঠল। ছাতার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন হরিপদ নস্কর। তাঁর হাতে একটি পুরোনো বাদামি খাম।
নন্দিতা ছুটে গেল তাঁর কাছে।
—আপনি জানেন আমার বোন কোথায়? আমার মা কোথায়? এতদিন ধরে সবাই কেন আমাদের কাছে সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছে?
হরিপদ কিছুক্ষণ নন্দিতার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, —তোমার প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে আছে। কিন্তু উত্তর শোনার আগে একটা কথা মনে রেখো, মা। সত্যি জানার যন্ত্রণা অনেক সময় মিথ্যে বিশ্বাস করে বেঁচে থাকার যন্ত্রণার চেয়েও বেশি।
—আমি আর অন্ধকারে থাকতে চাই না।
—তাহলে শোনো।
হরিপদ খামটা নন্দিতার হাতে দিলেন।
খামের মধ্যে ছিল একটি পুরোনো হাসপাতালের নথির অনুলিপি, একটি ছবি, একটি চিঠি এবং একটি ছোট্ট কাগজে লেখা নাম।
“নন্দিনী দত্ত নয়। নন্দিনী সেনগুপ্ত।”
নন্দিতার হাত কেঁপে উঠল।
—নন্দিনী সেনগুপ্ত?
—হ্যাঁ। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর শিশুটিকে একটি দম্পতির কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের বলা হয়েছিল, শিশুটির জন্মদাত্রী মা মারা গেছেন এবং তার পরিবারের কেউ তাকে নিতে চাননি। তাঁরা মেয়েটিকে নিজেদের সন্তানের মতো বড় করেছেন। নতুন নাম দিয়েছেন নন্দিনী সেনগুপ্ত।
ঋদ্ধি দ্রুত প্রশ্ন করল, —ওঁরা কি জানতেন, শিশুটিকে বেআইনিভাবে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে আনা হয়েছিল?
—না। অন্তত প্রথম দিকে জানতেন না। যে কাগজপত্র তাঁদের দেখানো হয়েছিল, তাতে সবকিছু বৈধ বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর পর তাঁরা কিছু অসংগতি বুঝতে পারেন। তখন তাঁরা দত্তক নেওয়ার প্রক্রিয়ার কাগজপত্র খুঁজতে শুরু করেন। সেই সময়ই তাঁদের হাতে আসে একটি চিঠি।
—চিঠিটা কার লেখা?
—মাধবীর।
মায়ের নাম শুনেই নন্দিতার চোখ ভিজে উঠল।
—মা বেঁচে আছেন?
হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন।
—হ্যাঁ, নন্দিতা। তোমার মা বেঁচে আছেন।
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের সমস্ত শব্দ যেন থেমে গেল। গঙ্গার ঢেউ, বৃষ্টির শব্দ, দূরের ট্রেনের হুইসেল—সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নন্দিতা শুধু ওই একটি কথাই শুনতে পেল।
তার মা বেঁচে আছেন!
যে মাকে সে সারাজীবন মৃত বলে জেনেছে, যার মুখ কল্পনা করতে করতে অসংখ্য রাতে ঘুমিয়ে পড়েছে, সেই মা কোথাও বেঁচে ছিলেন!
—তিনি কোথায়? আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে চলুন!
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
—একটু ধৈর্য ধরো। তোমার মা নিজেই তোমার কাছে আসতে চেয়েছেন। কিন্তু তার আগে একটা বিপদ শেষ করা দরকার। যারা তোমার বাবার ডায়েরি খুঁজছিল, তারা এখনও থেমে নেই।
ঋদ্ধি বলল, —ডা. সুশান্ত রায়?
—সুশান্ত রায় এই চক্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিল। সে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী এবং বাইরের কিছু লোকের সঙ্গে মিলে নবজাতকদের পরিচয় বদলে দেওয়ার ব্যবস্থা করত। নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে শিশুকে দেওয়ার কথা বলে বিপুল টাকা নেওয়া হতো। কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত দত্তকপ্রক্রিয়ার আড়ালেও অনিয়ম লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আর যেসব শিশুর পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারত, তাদের জন্মের নথি বদলে দেওয়া হতো।
নন্দিতা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, —আমার বোনের সঙ্গেও তাই হয়েছে।
—হ্যাঁ। তোমার বাবা বিষয়টা জেনে ফেলেছিলেন। তিনি ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু পুরোনো নথি পরীক্ষা করার অভ্যাস ছিল তাঁর। একদিন হাসপাতালের একটি নথির সঙ্গে আরেকটি নথির অসংগতি তাঁর চোখে পড়ে। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল অনুসন্ধান।
—কিন্তু বাবা তো মারা গেলেন। তিনি কি সত্যিটা প্রকাশ করতে পেরেছিলেন?
হরিপদ কিছুক্ষণ গঙ্গার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
—তিনি চেষ্টা করেছিলেন। মৃত্যুর আগে তাঁর হাতে যথেষ্ট প্রমাণ ছিল। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, একা প্রকাশ্যে এলে তোমারও বিপদ হতে পারে। তাই প্রমাণগুলো আলাদা আলাদা জায়গায় রেখে গিয়েছিলেন। লাল ডায়েরি, তোমার বাবার চিঠি, ভিডিও—সবকিছুই ছিল সেই পরিকল্পনার অংশ।
—তাহলে বাবাকে কি ওরা মেরে ফেলেছিল?
হরিপদ চোখ নামিয়ে নিলেন।
—আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগে হুমকি পেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি উধাও হয়ে যায়। কিন্তু মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ তখন আমাদের হাতে ছিল না। এখন নতুন প্রমাণ পাওয়া গেছে। পুলিশ তদন্ত করলে সত্যিটা জানা যেতে পারে।
নন্দিতার বুকের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ আরও গভীর হলো। এত বছর ধরে সে ভেবেছে, বাবা-মায়ের স্মৃতি ছাড়া তার জীবনে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। অথচ তার নিজের পরিবারের ইতিহাসই ছিল এক অন্ধকার ষড়যন্ত্রে ভরা।
ঋদ্ধি খাম থেকে পাওয়া ছবিটি হাতে নিল। ছবিতে এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে একটি বাড়ির বারান্দায়। তার কোলে একটি ছোট্ট মেয়ে। ছবির পিছনে লেখা—
“নন্দিনী, তোমাকে যে নামেই ডাকা হোক, তুমি আমার মেয়ে। তোমাকে আমি কোনোদিন ভুলিনি। —মা।”
নন্দিতা ছবিটা বুকে চেপে ধরল।
—মা কি এই ছবিটা তুলেছিলেন?
—হ্যাঁ, —হরিপদ বললেন। —তোমার মা মেয়েটিকে একবার দূর থেকে দেখেছিলেন। কিন্তু নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে পারেননি। তিনি জানতেন, তাতে শিশুটির নতুন পরিবার বিপদে পড়তে পারে। আর যারা তাকে সরিয়ে দিয়েছিল, তারা আবার তাকে নিয়ে যেতে পারে।
—তাহলে এত বছর তিনি চুপ করে ছিলেন কেন?
—কারণ তিনি শুধু নিজের সন্তানের কাছে ফিরতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। তিনি জানতেন, শুধু আবেগ দিয়ে এই লড়াই জেতা যাবে না। প্রমাণ দরকার, আইনি ব্যবস্থা দরকার।
হঠাৎ ঘাটের ওপরের রাস্তা থেকে একটি গাড়ির আলো এসে পড়ল। তিনজন লোক দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল।
হরিপদ চমকে উঠলেন।
—ওরা এসে গেছে!
ঋদ্ধি নন্দিতার হাত ধরে টেনে বলল, —চলো!
কিন্তু নন্দিতা এবার পালাল না।
সে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
—না। আর পালাব না। এতদিন সবাই আমাদের ভয় দেখিয়ে সত্যিটা চাপা দিয়েছে। আজ নয়।
লোকগুলোর একজন এগিয়ে এসে বলল, —খামটা আমাদের হাতে দাও। তোমাদের সঙ্গে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই। প্রমাণগুলো দিয়ে বাড়ি ফিরে যাও।
ঋদ্ধি শান্ত গলায় বলল, —আপনারা কে?
লোকটি উত্তর দিল না।
নন্দিতা বলল, —আমার বোনকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন? আমার মাকে কেন লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করেছিলেন? আমার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে আপনাদের কী সম্পর্ক?
লোকটির মুখ শক্ত হয়ে গেল।
—শেষবার বলছি, কাগজগুলো দাও।
ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার দিক থেকে পুলিশের গাড়ির সাইরেন শোনা গেল। কয়েকজন পুলিশকর্মী ঘাটে নেমে এলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন এক মহিলা পুলিশ আধিকারিক।
লোকগুলো পালানোর চেষ্টা করতেই পুলিশ তাদের ঘিরে ফেলল।
ঋদ্ধি নন্দিতার দিকে তাকিয়ে বলল, —আমি বিকেলেই সমস্ত তথ্যের কপি আমার সম্পাদক এবং পুলিশের কাছে পাঠিয়েছিলাম। তোমার মামার দেওয়া ভিডিওটাও নিরাপদে রয়েছে। কেউ আর এগুলো মুছে ফেলতে পারবে না।
নন্দিতা প্রথমবারের মতো একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
পুলিশের জেরায় আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে আরও কিছু নথি উদ্ধার হলো। সেগুলোর সূত্র ধরে তদন্তকারীরা ডা. সুশান্ত রায়ের পুরোনো যোগাযোগ, হাসপাতালের রেকর্ড বদলানোর প্রক্রিয়া এবং কয়েকজন সহযোগীর পরিচয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেলেন। তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য তখনই প্রকাশ করা হয়নি। তবে নন্দিতা বুঝতে পারল, বহু বছর ধরে যে অন্ধকার তাকে ঘিরে ছিল, সেখানে এবার আলো ঢুকছে।
কিন্তু তার সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর এখনও বাকি।
নন্দিনী কোথায়?
দুদিন পর।
কলকাতার এক শান্ত পাড়ায় একটি পুরোনো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নন্দিতা বারবার নিজের হাতের তালু মুছছিল। বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ।
বাড়ির দরজা খুললেন এক মধ্যবয়সি ভদ্রলোক। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক মহিলা।
হরিপদ তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিলেন।
—এঁরা অরিন্দম সেনগুপ্ত এবং মৈত্রেয়ী সেনগুপ্ত। নন্দিনীকে ছোট থেকে মানুষ করেছেন।
মৈত্রেয়ী দেবী নন্দিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, —তুমি নন্দিতাই তো?
নন্দিতা মাথা নাড়ল।
—হ্যাঁ।
মহিলার চোখে জল এসে গেল।
—আমরা অনেক বছর ধরে জানতাম, ওর জন্মের কাগজপত্রে কিছু ভুল আছে। কিন্তু আমরা কখনও ওকে আমাদের মেয়ে হিসেবে কম ভালোবাসিনি। ও আমাদের কাছে শুধু দত্তক নেওয়া একটি শিশু নয়। ও আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।
নন্দিতা দ্রুত বলল, —আমি আপনাদের কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিতে আসিনি। আমি শুধু আমার বোনকে খুঁজছি। ওর নিজের পরিচয়টা জানার অধিকার আছে।
অরিন্দমবাবু শান্ত গলায় বললেন, —আমরা সেটাই চাই। ও সত্যিটা জানুক। তবে ওর জীবন, ওর সিদ্ধান্ত—সবকিছুর প্রতি আমাদের সম্মান থাকবে।
ঠিক তখনই ভেতরের ঘর থেকে একজন তরুণী বেরিয়ে এল।
তার বয়স নন্দিতার কাছাকাছি। পরনে সাধারণ সালোয়ার-কামিজ। মুখে বিস্ময় আর উদ্বেগের ছাপ। সে প্রথমে হরিপদর দিকে তাকাল, তারপর নন্দিতার দিকে।
—আপনি নন্দিতা?
নন্দিতা কোনো উত্তর দিতে পারল না।
তরুণীটি ধীরে ধীরে কাছে এল।
—আমার মা-বাবা বলেছেন, আপনি আমার জন্মের সময়কার কিছু সত্যি জানতে পেরেছেন। আমি কি সত্যিই অন্য কারও মেয়ে?
নন্দিতা কাঁপা গলায় বলল, —তুমি আমার বোন। তোমার জন্মের নাম নন্দিনী। তোমার জন্মের পর আমাদের সবাইকে বলা হয়েছিল, তুমি বেঁচে নেই। আমি এত বছর ধরে জানতাম না, তুমি কোথায় আছ।
নন্দিনী যেন কথাগুলো বুঝতে পারছিল, অথচ মেনে নিতে পারছিল না।
—তাহলে আমার এত দিনের জীবনটা কি মিথ্যে?
নন্দিতা মাথা নাড়ল।
—না। তোমার জীবন মিথ্যে নয়। তোমার মা-বাবা তোমাকে ভালোবেসে বড় করেছেন। তাঁদের ভালোবাসা সত্যি। কিন্তু তোমার জন্মের সময় তোমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছিল। সেই সত্যিটা তোমার জানার অধিকার আছে।
নন্দিনী চুপ করে রইল। তারপর অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে নিজের ডান কানটার পিছনে হাত রাখল।
—আমার এখানে ছোট্ট একটা জন্মদাগ আছে। মা বলেন, জন্মের পর থেকেই এটা আছে।
নন্দিতার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
তার বাবার চিঠির কথাগুলো মনে পড়ল—ডান কানের পিছনে জন্মদাগ, গলায় লাল সুতো।
—তোমার ছোটবেলায় গলায় লাল সুতো বাঁধা ছিল?
নন্দিনী বিস্মিত হয়ে বলল, —হ্যাঁ। আমার মা-বাবা একটা পুরোনো কাপড়ের বাক্সে সেটা রেখে দিয়েছেন। তাঁরা জানতেন না, ওটার সঙ্গে আমার জন্মের কোনো সম্পর্ক আছে কি না।
মৈত্রেয়ী দেবী ভেতর থেকে একটি ছোট্ট বাক্স নিয়ে এলেন। বাক্সের মধ্যে সযত্নে রাখা একটি বিবর্ণ লাল সুতো।
নন্দিতা তার নিজের গলার নীল সুতোটির দিকে তাকাল। ছোটবেলায় বাবা বলেছিলেন, এটি তার জন্মের সময়কার একটি স্মৃতি। কেন তিনি কখনও বলেননি, তার যমজ বোনের গলায় ছিল লাল সুতো?
নন্দিনী বাক্সটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে বসে পড়ল।
—তাহলে আমার সত্যিই একটা বোন ছিল? না, আছে?
নন্দিতা তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
—আছে। আমি আছি।
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই নন্দিনী তাকে জড়িয়ে ধরল।
দুজনের কান্না মিশে গেল একসঙ্গে। এত বছরের বিচ্ছেদ, মুছে দেওয়া পরিচয়, অজানা শৈশব—সবকিছু যেন সেই আলিঙ্গনের মধ্যে এসে জমা হলো।
কিন্তু নন্দিতার বুকের মধ্যে তখনও একটি শূন্যতা রয়ে গেছে।
মা কোথায়?
সেদিন বিকেলেই হরিপদ নন্দিতা ও নন্দিনীকে নিয়ে গেলেন উত্তর কলকাতার একটি পুরোনো বাড়িতে। বাড়িটির সামনে ছোট্ট বাগান। জানালার পাশে শিউলি গাছ। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বৃদ্ধা।
সাদা শাড়ি, পাকা চুল, চোখে পাতলা চশমা।
নন্দিতা তাঁকে দেখেই থমকে গেল।
মায়ের মুখ সে কোনোদিন মনে করতে পারেনি। বাবার পুরোনো ছবিতে যে তরুণীকে দেখেছে, তার সঙ্গে এই বৃদ্ধার মুখের মিল খুঁজে পেতে কয়েক মুহূর্ত লাগল। কিন্তু চোখ দুটো—সেই চোখের গভীরে এমন এক পরিচিত মমতা ছিল, যা ছবির মধ্যেও সে বহুবার কল্পনা করেছে।
বৃদ্ধা এগিয়ে এলেন।
—নন্দিতা?
এই একটি শব্দে নন্দিতার সমস্ত অভিমান ভেঙে পড়ল।
সে দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।
—মা!
মাধবী দেবী মেয়েকে দুহাতে আঁকড়ে ধরলেন। তাঁর শরীর কাঁপছিল। চোখের জল থামছিল না।
—আমার মেয়ে! আমার নন্দিতা! এত বছর পর তোকে ছুঁতে পারছি!
নন্দিতা মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, —তুমি কোথায় ছিলে, মা? কেন আমাকে বললে না তুমি বেঁচে আছ? কেন আমাকে সারাজীবন ভাবতে দিলে যে তুমি আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছ?
মাধবী দেবী চোখ বন্ধ করলেন।
—আমি জানি, তোর কাছে আমার কোনো ক্ষমা পাওয়ার অধিকার নেই। কিন্তু আমি তোকে ছেড়ে যাইনি, মা। আমাকে যেতে হয়েছিল।
—কেন?
মাধবী ধীরে ধীরে সব বলতে শুরু করলেন।
নন্দিতার জন্মের পর তিনি জানতে পারেন, একই রাতে জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় শিশুটিকে হাসপাতালের রেকর্ডে মৃত দেখানো হয়েছে। অথচ শিশুটি বেঁচে ছিল। হাসপাতালের এক নার্স গোপনে তাঁকে বিষয়টি জানান। মাধবী তখনই বুঝতে পারেন, তাঁর দ্বিতীয় সন্তানকে তাঁর কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তিনি স্বামী অমিয়কুমারের সঙ্গে কথা বলেন। অমিয়কুমার প্রমাণ সংগ্রহ করতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁদের আশপাশের কয়েকজন মানুষ তখন ওই চক্রের সঙ্গে যুক্ত। মাধবীকে হুমকি দেওয়া হয়—তিনি মুখ খুললে নন্দিতারও ক্ষতি হবে।
এক রাতে তাঁর বাড়িতে হামলার চেষ্টা হয়। অমিয়কুমার বুঝতে পারেন, স্ত্রীকে আড়ালে সরিয়ে না রাখলে বিপদ আরও বাড়বে। মাধবীকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাইরে প্রচার করা হয়, তিনি মারা গেছেন। সেই মিথ্যে মৃত্যুসংবাদে নন্দিতার জীবনও একা হয়ে পড়ে, কিন্তু অন্তত শত্রুরা তাকে খুঁজে পায়নি।
—আমি তোকে দেখতে চাইতাম, মা, —মাধবী কাঁদতে কাঁদতে বললেন। —তোর স্কুলের অনুষ্ঠানে দূর থেকে দাঁড়িয়ে থেকেছি। তোর বড় হয়ে ওঠার খবর পেয়েছি। কিন্তু কাছে যেতে পারিনি। আমি ভয় পেতাম, আমার জন্য তোকে আবার বিপদে পড়তে হবে।
নন্দিতা মায়ের হাত শক্ত করে ধরল।
—আর বাবা?
মাধবীর চোখে গভীর বেদনা নেমে এল।
—তোর বাবা শেষ পর্যন্ত প্রমাণগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, সত্যিটা একদিন প্রকাশ করতেই হবে। তাঁর মৃত্যুর পর আমি আরও ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কিছু নথি আমার কাছে ছিল, কিন্তু একা সব প্রকাশ করার সাহস পাইনি। হরিপদবাবু আমাকে সাহায্য করেছেন। এতদিন তিনি গোপনে প্রমাণগুলো নিরাপদে রাখছিলেন।
—বাবার মৃত্যু কি স্বাভাবিক ছিল?
মাধবী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
—আমি নিশ্চিত নই। তিনি মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, তাঁকে অনুসরণ করা হচ্ছে। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আমার কাছে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ নেই। আমি চাই, তদন্তে সত্যিটা বেরিয়ে আসুক। কাউকে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে দোষী বলা ঠিক হবে না।
নন্দিতা মায়ের কোলের কাছে বসে পড়ল। তার চোখে জল, কিন্তু সেই জলের মধ্যে এবার আর শুধু দুঃখ নেই। আছে স্বস্তি, রাগ, প্রশ্ন আর নতুন করে বেঁচে ওঠার আকাঙ্ক্ষা।
নন্দিনী এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিল। সে এগিয়ে এসে মাধবীর সামনে দাঁড়াল।
—আপনি কি আমার মা?
মাধবী যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলেন।
—হ্যাঁ, মা। আমি তোর জন্মদাত্রী মা।
নন্দিনী চোখ নামিয়ে বলল, —আমি ছোটবেলা থেকে মাকে মা বলে ডেকেছি। আমি তাঁকে ছেড়ে যেতে পারব না।
মাধবী তৎক্ষণাৎ তার হাত ধরে ফেললেন।
—কেউ তোকে ছেড়ে যেতে বলছে না। যে মানুষ তোকে ভালোবেসে বড় করেছে, সে-ও তোর মা। মায়ের ভালোবাসা কখনও ভাগ হয়ে যায় না, মা। তোর জীবনে যতজন তোকে ভালোবেসেছে, তাদের প্রত্যেকের ভালোবাসার জায়গা থাকবে।
নন্দিনী কেঁদে ফেলল।
—আমি কি আপনাকে মা বলে ডাকতে পারি?
মাধবী তাকে বুকে টেনে নিলেন।
—এ প্রশ্ন আর কোনোদিন করিস না। তুই আমার মেয়ে। জন্মের দিন থেকে আজ পর্যন্ত, প্রতিটি দিন।
সেই ছোট্ট ঘরে চারজন মানুষ একসঙ্গে কাঁদছিলেন। এত বছর ধরে যে পরিবারকে আলাদা করে রাখা হয়েছিল, সেই পরিবার আবার একত্রিত হলো। কেউ কারও জায়গা কেড়ে নিল না। বরং প্রত্যেকে বুঝতে পারল, ভালোবাসা সত্যিকে মুছে দেয় না—সত্যিকে গ্রহণ করার শক্তি দেয়।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে তদন্ত এগিয়ে চলল।
ঋদ্ধির সংবাদপত্রে প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদনে হাসপাতালের পুরোনো নথির অসংগতি, নবজাতকের পরিচয় বদলের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠল। প্রতিবেদন প্রকাশের আগে প্রমাণগুলো আইনজীবী ও তদন্তকারীদের কাছে যাচাই করানো হয়েছিল। নন্দিতা নিজেও পুলিশের কাছে সাক্ষ্য দিল।
প্রদীপ দত্ত প্রথমে অনেক কথা অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করলেন, তিনি শিশুটিকে অন্যত্র পাঠানোর ঘটনাটি জানতেন এবং ভয়ে সত্যিটা গোপন করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তদন্তকারীরা তাঁর বক্তব্য যাচাই করতে শুরু করলেন। তাঁর সহযোগিতায় আরও কয়েকটি পুরোনো নথি উদ্ধার হলো।
ডা. সুশান্ত রায়ের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলল। হাসপাতালের কিছু প্রাক্তন কর্মীর বক্তব্য, নথির অসংগতি এবং ভিডিওতে ধরা পড়া কথোপকথন তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। বহুদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে লাগল।
তবে নন্দিতা জানত, আইনের পথ দীর্ঘ। সব প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া যায় না। বাবার মৃত্যুর রহস্যও তদন্তের অপেক্ষায় রয়ে গেল। কিন্তু এবার আর সে একা নয়। তার পাশে মা, বোন, ঋদ্ধি এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষ রয়েছে।
একদিন ঋদ্ধি তাকে জিজ্ঞেস করল, —এখন কেমন লাগছে?
নন্দিতা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, —মনে হচ্ছে, এতদিন আমি একটা বন্ধ ঘরের মধ্যে আটকে ছিলাম। দরজা খুলেছে, কিন্তু বাইরে বেরোতে এখনও শিখছি।
ঋদ্ধি মৃদু হাসল।
—তুমি পারবে।
—জানো, ছোটবেলায় বৃষ্টি হলেই আমি মাকে মনে করতাম। ভাবতাম, মা বেঁচে থাকলে বৃষ্টির দিনে আমার মাথায় ছাতা ধরতেন। আর এখন বৃষ্টি হলে মনে হয়, এই বৃষ্টিই আমাকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।
ঋদ্ধি কিছু বলল না। শুধু তার পাশে এসে দাঁড়াল।
কয়েক মাস পরে।
সেদিন কলকাতায় আবার বৃষ্টি হচ্ছিল। শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল নন্দিতা, পাশে নন্দিনী। তাঁদের মা একটু দূরে বসে ছিলেন, হাতে একটি পুরোনো ছাতা। ছাতাটি অমিয়কুমারের ছিল।
স্টেশনের ঘোষণায় ট্রেন আসার কথা জানানো হলো। যাত্রীরা ব্যস্ত হয়ে উঠল। কেউ ছুটল, কেউ লাগেজ গুছিয়ে নিল, কেউ ফোনে কথা বলতে লাগল।
নন্দিনী হঠাৎ বলল, —দিদি, তুমি কি প্রথমবার এখানেই আমাকে দেখেছিলে?
নন্দিতা হেসে মাথা নাড়ল।
—না। এখানে আমি তোমাকে দেখিনি। এখানে আমি শুধু তোমার খোঁজ পাওয়ার প্রথম সূত্রটা পেয়েছিলাম।
—তাহলে এই প্ল্যাটফর্মের মেয়েটি কে?
নন্দিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, —হয়তো সেই মেয়েটি, যে নিজের অতীতের জন্য অপেক্ষা করছিল। সে জানত না, অপেক্ষার শেষে কী আছে। শুধু জানত, একদিন তাকে সত্যির মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।
নন্দিনী তার হাত ধরল।
—আর এখন?
—এখন সে আর একা নয়।
দূরে একটি ট্রেন এসে থামল। দরজা খুলে যাত্রীরা নামতে শুরু করল। প্ল্যাটফর্মের ওপর বৃষ্টির জল জমে ছোট ছোট আয়না তৈরি করেছে। সেই আয়নায় তিনটি মুখ পাশাপাশি প্রতিফলিত হলো—একজন মা, তাঁর দুই মেয়ে।
মাধবী দেবী এগিয়ে এসে দুজনের মাথায় হাত রাখলেন।
—চলো, বাড়ি যাই।
নন্দিতা মায়ের হাত ধরল। নন্দিনী ধরল অন্য হাতটি।
তিনজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
তাদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া বছরগুলো আর ফিরে আসবে না। বাবার অনুপস্থিতি মুছে যাবে না। মিথ্যে পরিচয়ের আঘাতও একদিনে সেরে উঠবে না। কিন্তু সত্যি আর গোপন নেই। দুই বোন জানে তারা কারা। মা জানেন, তাঁর দুই মেয়ে আবার তাঁর পাশে। আর যারা অন্যায়ের শিকার হয়েছিল, তাদের গল্প অবশেষে নীরবতার বাইরে এসেছে।
স্টেশনের বাইরে তখন বৃষ্টি আরও জোরে নামছে।
মাধবী ছাতাটা খুলে দিলেন।
দুই মেয়ে মায়ের দুপাশে এসে দাঁড়াল।
এবার আর কেউ বৃষ্টিতে একা ভিজল না।
কারণ কিছু অপেক্ষার শেষ হয় ট্রেন এসে থামলে, আর কিছু অপেক্ষার শেষ হয় যখন হারিয়ে যাওয়া মানুষ ফিরে এসে হাত ধরে বলে—
“চলো, এবার বাড়ি যাই।”
— সমাপ্ত —