মালদার ছোট্ট শহর ইংরেজবাজারের পুরোনো ডাকঘরটা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এক বর্ষার সকালে।
বহু বছর ধরে সেখানে আর আগের মতো চিঠির ভিড় জমত না। মানুষ এখন ফোনে কথা বলে, বার্তা পাঠায়, মুহূর্তের মধ্যে দূরের মানুষকে কাছে পেয়ে যায়। সেই তুলনায় ডাকঘরের ধীরগতির জীবন যেন অনেক আগেই অতীতের পাতায় হারিয়ে গেছে।
তবু ডাকঘরটির একটা আলাদা পরিচয় ছিল।
শহরের প্রবীণ মানুষদের কাছে এই বাড়িটা শুধু চিঠি আদানপ্রদানের জায়গা ছিল না। কারও চাকরির নিয়োগপত্র, কারও বিয়ের নিমন্ত্রণ, কারও বিদেশে থাকা সন্তানের খবর—অসংখ্য মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ এই বাড়ির কাঠের কাউন্টার, লোহার আলমারি আর ধুলোমাখা তাকের মধ্যে জমে ছিল।
সেই ডাকঘরেই শেষ কর্মদিবসে হাজির হয়েছিল সাতাশ বছরের মেঘলা রায়।
মেঘলা পেশায় সাংবাদিক। কলকাতার একটি সংবাদমাধ্যমে কাজ করত। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে মালদায় ফিরে এসেছিল। তার বাবা অনিরুদ্ধ রায় এই ডাকঘরের পোস্টমাস্টার ছিলেন। টানা তেত্রিশ বছর কাজ করার পর অবসর নিয়েছিলেন মাত্র পাঁচ বছর আগে।
বাবা মারা যাওয়ার তিন সপ্তাহ হয়েছে।
তাঁর মৃত্যুর পর বাড়ির আলমারি গোছাতে গিয়ে মেঘলা একটি ছোট্ট চাবি পেয়েছিল। চাবির সঙ্গে বাঁধা ছিল হলুদ কাগজের টুকরো। বাবার হাতের লেখা মাত্র দুটি লাইন—
“শেষ খামটা খুঁজে পেলে পড়িস। কিন্তু তার আগে নিজের মাকে প্রশ্ন করিস—১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্ট রাতে তিনি কোথায় ছিলেন?”
মেঘলা প্রথমে ভেবেছিল, মৃত্যুর আগে বাবা হয়তো কোনো পুরোনো ঘটনার কথা লিখে গেছেন। কিন্তু তারিখটা দেখেই সে থমকে গিয়েছিল।
১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্ট।
সেই তারিখটি তার পরিবারের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ মেঘলার বড় দাদা, অরিন্দম, হারিয়ে গিয়েছিল ওই দিনেই।
তখন অরিন্দমের বয়স ছিল মাত্র আট বছর। মা তাকে নিয়ে বাজারে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় মা একা বাড়ি ফিরেছিলেন। বলেছিলেন, ভিড়ের মধ্যে দাদার হাত ছুটে গিয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজি হয়েছিল, থানায় অভিযোগ জানানো হয়েছিল, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল। কিন্তু অরিন্দমকে আর কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সেই ঘটনার পর মেঘলার জন্ম হয়েছিল। পরিবারে দাদার নাম খুব কম উচ্চারিত হতো। মা, সুপর্ণা রায়, কখনও কখনও গভীর রাতে ছেলের পুরোনো জামা বুকে জড়িয়ে কাঁদতেন। বাবা তখন চুপচাপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
মেঘলা বড় হওয়ার পর বহুবার জানতে চেয়েছিল, দাদার নিখোঁজ হওয়ার দিন ঠিক কী ঘটেছিল।
প্রতিবারই মা একই উত্তর দিয়েছেন—
“সব কথা জানলে মানুষ বাঁচতে পারে না, মেঘলা।”
কিন্তু বাবা মৃত্যুর আগে কেন সেই রাতের কথা আবার মনে করিয়ে গেলেন?
আর শেষ খামটাই বা কী?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই মেঘলা সেদিন পুরোনো ডাকঘরে এসেছিল।
ডাকঘরের ভিতরে ঢুকে সে দেখল, কাউন্টারের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন বৃদ্ধ কর্মচারী হরিপদ পাল। তাঁর বয়স প্রায় সত্তর। বাবার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। মেঘলাকে দেখে তিনি চশমাটা খুলে বললেন, —তুই এসেছিস, ভালো হয়েছে মা। তোর বাবার একটা জিনিস তোকে দেওয়ার ছিল।
মেঘলা অবাক হলো।
—আমাকে? কী জিনিস?
হরিপদবাবু কাউন্টারের নিচ থেকে একটা ছোট্ট টিনের বাক্স বের করলেন। বাক্সটা মরচে ধরা, ঢাকনার ওপর সাদা রঙে লেখা—‘অপ্রেরিত পত্র’।
—তোর বাবা এই বাক্সটা আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ডাকঘর বন্ধ হওয়ার দিন যদি তুই আসিস, তাহলে তোকে দেব।
মেঘলা বাক্সটা হাতে নিল।
—এর মধ্যে কী আছে?
—জানি না। খুলতে বারণ করেছিলেন।
মেঘলা বাবার দেওয়া চাবিটা বের করে তালায় লাগাল। চাবি ঘোরাতেই তালাটা খুলে গেল।
বাক্সের ভেতরে ছিল অসংখ্য পুরোনো খাম। কিছু খামের ওপর ঠিকানা লেখা, কিছুতে শুধু নাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কোনো খামেই ডাকটিকিট লাগানো ছিল না।
সবচেয়ে নিচে রাখা ছিল একটি সাদা খাম।
খামের ওপর লেখা—
“মেঘলা রায়ের জন্য। ২১ বছর পূর্ণ হলে খুলবে।”
মেঘলার বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।
তার বয়স এখন সাতাশ। অর্থাৎ চিঠিটা ছয় বছর আগেই খোলার কথা ছিল।
সে কাঁপা হাতে খামটা খুলল।
ভেতরে একটি মাত্র বাক্য—
“তোমার দাদা বেঁচে আছে। কিন্তু সে নিজেই তোমার পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকতে চেয়েছে।”
মেঘলার হাত থেকে চিঠিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
দাদা বেঁচে আছে!
যে মানুষটির জন্য তাদের পরিবার উনত্রিশ বছর ধরে অপেক্ষা করেছে, যে ছেলেটির জন্য মা প্রতিটি দুর্গাপুজোয় নতুন জামা কিনে আলমারিতে রেখে দিতেন, সে বেঁচে আছে!
কিন্তু সে ফিরে আসেনি কেন?
কেন সে নিজেই দূরে থাকতে চেয়েছে?
মেঘলা হরিপদবাবুর দিকে তাকাল।
—আপনি জানতেন?
বৃদ্ধ মানুষটি চোখ নামিয়ে নিলেন।
—কিছুটা জানতাম। কিন্তু পুরো সত্যিটা জানতাম না।
—তাহলে এতদিন কেউ আমাদের বলেনি কেন?
হরিপদবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—কারণ তোর বাবা কথা দিয়েছিলেন, একটা নির্দিষ্ট সময়ের আগে কিছু বলা যাবে না। তিনি বিশ্বাস করতেন, তোর দাদা নিজে ফিরে না এলে তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করলে আরও বিপদ হতে পারে।
—কীসের বিপদ?
হরিপদবাবু উত্তর দিলেন না। তিনি শুধু বাক্সের ভেতর থেকে একটি কালচে খাম বের করে মেঘলার হাতে দিলেন।
—এই চিঠিটা তোর বাবার কাছে এসেছিল প্রায় পনেরো বছর আগে। পাঠানোর ঠিকানা নেই। শুধু ডাকঘরের সিল রয়েছে। চিঠিটা পড়লে হয়তো বুঝতে পারবি কেন তোর দাদা ফিরে আসেনি।
মেঘলা খাম খুলল।
ভেতরে লেখা—
“অনিরুদ্ধবাবু,
আমি জানি, আপনি আমার নাম জানেন। আপনি এটাও জানেন, আমি কোথায় থাকি। কিন্তু আমি চাই না, আমার পরিবার আমার কাছে আসুক। আমি তাদের ভুলে যাইনি। প্রতিদিন মনে পড়ে।
তবু ফিরে যেতে পারব না।
কারণ আমার ফিরে যাওয়ার অর্থ হবে সেই রাতের সত্যিটা প্রকাশ্যে চলে আসা। আর সেই সত্যি জানলে আমার মা হয়তো আমাকে আর নিজের ছেলে বলে মেনে নিতে পারবেন না।
আমি জানি, আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেছে। আমি আর আগের মানুষটি নেই।
আমাকে খুঁজবেন না।
শুধু মেঘলাকে বলবেন, তার দাদা তাকে কোনোদিন ভুলে যায়নি।
—একজন অপরাধী।”
চিঠির শেষ শব্দটি পড়ে মেঘলার চোখ আটকে গেল।
একজন অপরাধী!
তার দাদা নিজেকে অপরাধী বলছে কেন?
সে কি কোনো অপরাধ করেছিল? নাকি কেউ তাকে এমন কিছু করতে বাধ্য করেছিল, যার দায় সে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে?
মেঘলা চিঠিটা ভাঁজ করে ব্যাগে রাখল।
—আমাকে ঠিকানা দিন। আমি ওকে খুঁজে বের করব।
হরিপদবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, —ঠিকানা আমার কাছে নেই। তবে একটা নাম আছে। তোর বাবা বারবার এই নামটা লিখতেন।
তিনি কাউন্টারের ভেতর থেকে একটি পুরোনো খাতা বের করলেন। খাতার মাঝখানে লাল কালিতে লেখা—
“নীলকুঠি, গাজোল। ঘর নম্বর ১২।”
মেঘলা নামটা পড়ে বলল, —নীলকুঠি কোথায়?
—গাজোলের পুরোনো রাস্তার পাশে একটা পরিত্যক্ত নীলকরদের বাড়ি আছে। এখন সেখানে কেউ থাকে না। অন্তত সবাই তাই বলে।
মেঘলা একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, —আমার দাদা কি সেখানে থাকে?
হরিপদবাবু ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
—জানি না। তবে তোর বাবা শেষবার সেখানে গিয়েছিলেন মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগে।
মেঘলার বুকের মধ্যে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
বাবা মৃত্যুর আগে নীলকুঠিতে গিয়েছিলেন।
তার মানে এই রহস্যের সঙ্গে বাবার মৃত্যুরও সম্পর্ক থাকতে পারে।
সে আর দেরি করল না। বাক্সটা বন্ধ করে ব্যাগে রাখল। তারপর ডাকঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
কিন্তু বাইরে এসে দেখল, রাস্তার ওপারে একটা কালো মোটরবাইক দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি হেলমেট পরা। মেঘলা বেরোতেই সে মোবাইল বের করে কারও সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।
মেঘলা প্রথমে বিশেষ গুরুত্ব দিল না। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই লোকটি বাইকে উঠে তার পিছু নিল।
সে রাস্তার মোড় ঘুরে দ্রুত হাঁটতে লাগল। বাইকটাও ঘুরল।
মেঘলা এবার বুঝতে পারল, কেউ তাকে অনুসরণ করছে।
সে একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ পিছনে তাকাল। বাইকটি কিছুটা দূরে থেমে গেল। হেলমেট পরা লোকটি হাত তুলে ইশারা করল, যেন তাকে কোথাও যেতে নিষেধ করছে।
মেঘলা ভয় পেলেও থামল না।
একটি অটোয় উঠে বাড়ির দিকে রওনা হলো।
বাড়িতে পৌঁছে দেখল, মা বারান্দায় বসে পুরোনো কাপড় সেলাই করছেন। মেঘলাকে দেখে তিনি বললেন, —এত দেরি করলি কেন?
মেঘলা ব্যাগ থেকে বাবার লেখা কাগজটা বের করল।
—মা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
সুপর্ণা সেলাই থামালেন।
—কী কথা?
মেঘলা কাগজটা তাঁর সামনে রাখল।
“১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্ট রাতে তিনি কোথায় ছিলেন?”
মায়ের মুখের রং মুহূর্তে বদলে গেল।
হাতে ধরা সূচটা মেঝেতে পড়ে গেল।
—এই কাগজ তুই কোথায় পেলি?
—বাবার আলমারিতে। আর আজ ডাকঘরে একটা চিঠি পেয়েছি। দাদা বেঁচে আছে, মা।
সুপর্ণা এমনভাবে মেঘলার দিকে তাকালেন, যেন মেয়ের মুখে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর কথাটা শুনেছেন।
—কী বললি?
—দাদা বেঁচে আছে। বাবা সব জানতেন। তুমি কি জানো দাদা কোথায়?
সুপর্ণা উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর ঠোঁট কাঁপছে।
—তুই ওই চিঠি কোথায় পেয়েছিস?
—ডাকঘরে। মা, তুমি আমাকে কিছু লুকিয়েছ?
সুপর্ণা হঠাৎ মেঘলার হাত ধরে বললেন, —তুই আর কোথাও যাবি না। কাউকে কিছু বলবি না। ওই চিঠি ভুলে যা।
মেঘলা বিস্ময়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
—কিন্তু কেন? দাদা বেঁচে থাকলে আমরা তাকে ফিরিয়ে আনব না কেন?
মা চোখ বন্ধ করলেন।
—কারণ তোর দাদা যদি ফিরে আসে, তাহলে এই বাড়ির একজন মানুষকে জেলে যেতে হবে।
—কে?
সুপর্ণা উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু মেঘলার ব্যাগটা টেনে নিয়ে চিঠিগুলো বের করতে চাইলেন। মেঘলা ব্যাগটা সরিয়ে নিল।
—মা, তুমি কী করছ?
সুপর্ণা এবার প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, —আমি তোকে বাঁচাতে চাইছি!
বাড়ির ভেতরে নীরবতা নেমে এল।
কয়েক মুহূর্ত পর সুপর্ণা নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর মেয়ের মুখে হাত রেখে বললেন, —মেঘলা, তুই আমার একমাত্র মেয়ে। আমি আর কাউকে হারাতে পারব না। তোর দাদাকে খুঁজতে যাস না।
মেঘলা মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এই ভয়ের পেছনে এমন কিছু আছে, যা সে এখনও জানে না।
সেদিন রাতে সে ঘুমোতে পারল না।
বাবার বাক্স থেকে পাওয়া চিঠিগুলো বিছানায় ছড়িয়ে রাখল। একে একে খাম খুলতে লাগল। অধিকাংশ চিঠিই অসম্পূর্ণ, কোথাও তারিখ নেই, কোথাও প্রেরকের নাম নেই। কিন্তু সব চিঠির মধ্যে একটি বিষয় মিল ছিল—প্রত্যেকটিতে পরিবারের কোনো না কোনো গোপন ঘটনার ইঙ্গিত রয়েছে।
একটি চিঠিতে লেখা—
“মেঘলার জন্মের আগের সত্যিটা যদি কোনোদিন প্রকাশ পায়, তাহলে সবাই বুঝবে, অরিন্দমকে হারিয়ে যাওয়ার জন্য কেউ দায়ী ছিল না। কিন্তু তাকে ফিরে আসতে বাধা দেওয়ার জন্য একজন দায়ী।”
আরেকটি চিঠিতে লেখা—
“সেই রাতে ঘড়িতে সময় ছিল রাত ১১টা ১৭ মিনিট। দরজায় তিনবার ধাক্কা পড়েছিল। দরজা খুলেছিলেন মেঘলার মা। কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি অরিন্দম ছিল না।”
মেঘলার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
কীভাবে সম্ভব?
অরিন্দম হারিয়ে যাওয়ার রাতের কথা এত বিস্তারিতভাবে কে লিখেছে?
আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি যদি অরিন্দম না হয়, তাহলে সে কে ছিল?
রাত বাড়তে লাগল।
ঘড়িতে যখন একটা বেজে দশ মিনিট, তখন মেঘলার ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে বার্তা এল।
“তুমি যদি সত্যিই তোমার দাদাকে খুঁজতে চাও, তাহলে কাল সকাল ছটায় নীলকুঠিতে এসো। একা আসবে। সঙ্গে কোনো চিঠি আনবে না।”
বার্তার শেষে আরও একটি লাইন—
“আর তোমার মাকে জিজ্ঞেস কোরো না, অরিন্দমের জন্মদিন কবে।”
মেঘলা স্তব্ধ হয়ে গেল।
দাদার জন্মদিন জিজ্ঞেস করতে নিষেধ করছে কেন?
সে তো জানে, অরিন্দমের জন্মদিন ১২ ডিসেম্বর।
তাহলে কি সেই তারিখটাও মিথ্যে?
মেঘলা উঠে আলমারির ওপর রাখা পারিবারিক অ্যালবামটা নামাল। পুরোনো ছবির পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে অরিন্দমের জন্মদিনের একটি ছবি পেল। ছবিতে ছোট্ট অরিন্দমের সামনে কেক রাখা। কেকের ওপর মোমবাতি জ্বলছে।
ছবির পেছনে বাবার হাতের লেখা—
“অরিন্দমের ষষ্ঠ জন্মদিন। ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬।”
মেঘলা ছবিটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখল।
ছবির কোণে আরেকটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে।
শিশুটি অরিন্দমের মতো দেখতে।
একই চোখ, একই নাক, একই মুখের গঠন।
কিন্তু তার গলায় ঝুলছে একটি ছোট্ট পরিচয়পত্র, যেখানে লেখা—
“অরিন্দম রায়—জন্ম ১৭ আগস্ট ১৯৯০।”
মেঘলার মাথা ঘুরে গেল।
দুটি জন্মতারিখ!
একই নামের দুটি শিশু!
সে আবার ছবিটার পেছনটা দেখল। এবার আলোয় ধরতেই একটি মুছে যাওয়া বাক্য স্পষ্ট হলো।
“একজন আমাদের ছেলে। অন্যজনকে আমরা শুধু বাঁচিয়ে রাখছি।”
মেঘলা ছবিটা শক্ত করে ধরে বসে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, এতদিন যে দাদাকে খুঁজেছে, হয়তো সেই দাদা বলে পরিচিত মানুষটির অস্তিত্বই ছিল একটি বড় রহস্যের অংশ।
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
মেঘলা ব্যাগে চিঠি, ছবি আর বাবার দেওয়া চাবিটা রাখল। সে জানত, নীলকুঠিতে যাওয়া বিপজ্জনক। কিন্তু আর পিছিয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
সকাল ছটা বাজতে দশ মিনিট বাকি থাকতে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
দরজার কাছে এসে একবার পিছনে তাকাল।
মা তখনও ঘুমিয়ে আছেন বলে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু বারান্দার পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটা দেখে মেঘলা বুঝল, মা জেগে আছেন।
তিনি তাকে যেতে দেখছেন।
তবু আটকাচ্ছেন না।
গাজোলের পথে অটো চলতে শুরু করল। রাস্তার দুপাশে ধানখেত, ছোট ছোট দোকান আর কুয়াশায় ঢাকা গাছপালা। শহর ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে রইল।
নীলকুঠির কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে সকাল ছটা বেজে পাঁচ।
বাড়িটা দূর থেকেই চোখে পড়ল। বিশাল লাল ইটের দালান, ভাঙা বারান্দা, শ্যাওলা ধরা দেওয়াল। জানালার অধিকাংশই কাঠ দিয়ে বন্ধ। সামনে একটি শুকনো পুকুর, তার পাশে বিশাল বটগাছ।
মেঘলা গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
দরজার সামনে একটি সাদা খাম পড়ে আছে।
খামের ওপর লেখা—
“যে চিঠি কখনও পাঠানো হয়নি, তার উত্তর এখানেই আছে।”
মেঘলা খামটা খুলল।
ভেতরে একটি পুরোনো চিঠি।
চিঠির প্রথম লাইন পড়েই তার হাত কেঁপে উঠল।
“মা, তুমি যদি এই চিঠি পড়ো, তাহলে বুঝবে আমি আর তোমার ছেলে নই। আমাকে যে নামে ডাকতে, সেই নামটা আজ থেকে অন্য কারও।”
চিঠির নিচে স্বাক্ষর—
অরিন্দম।
কিন্তু চিঠির তারিখ ১৭ আগস্ট ১৯৯৮ নয়।
তারিখ লেখা ছিল—
১৮ আগস্ট ১৯৯৮।
আর চিঠির শেষ বাক্যটি পড়ে মেঘলার বুকের ভেতরটা শূন্য হয়ে গেল।
“মা, যে ছেলেটাকে তুমি হারিয়েছ বলে কাঁদছ, সে তোমার বাড়িতেই আছে। কিন্তু তুমি তাকে চিনতে পারছ না।”
ঠিক তখনই নীলকুঠির ভেতর থেকে একটি দরজা খুলে গেল।
একজন যুবক বেরিয়ে এল।
মেঘলার বয়সের কাছাকাছি। চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে পরিচিত। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে থামল।
—তুমি মেঘলা?
মেঘলা মাথা নাড়ল।
যুবকটি তার দিকে তাকিয়ে বলল—
—আমি তোমার দাদা অরিন্দম নই।
মেঘলা কিছু বলার আগেই সে যোগ করল—
—কিন্তু তোমার আসল দাদা কোথায় আছে, সেটা আমি জানি।
তারপর সে মেঘলার হাতে একটি পুরোনো ছবির অর্ধেক তুলে দিল।
ছবির একদিকে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট অরিন্দম। অন্যদিকে আরেকটি শিশু। দুজনের মুখ একেবারে একই রকম।
ছবির নিচে লেখা—
“একজন জন্মেছিল। অন্যজনকে তৈরি করা হয়েছিল।”
যুবকটি ধীরে ধীরে বলল—
—এবার তোমাকে তোমার মায়ের কাছে ফিরে যেতে হবে। কারণ এই রহস্যের শেষ চিঠিটা তিনিই লিখেছিলেন। আর সেই চিঠিতে এমন একটি সত্যি আছে, যা জানার পর তুমি আর কোনোদিন তোমার মাকে আগের মতো দেখতে পারবে না।
মেঘলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কে?
তার দাদা কোথায়?
আর কীভাবে একজন মানুষকে তৈরি করা যায়, যার মুখ আর পরিচয় অন্য একজনের মতো?
নীলকুঠির ভেতর থেকে তখন হঠাৎ একটি পুরোনো ডাকঘরের ঘণ্টা বেজে উঠল।
ঢং।
ঢং।
ঢং।
যেন বহু বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকা কোনো চিঠি অবশেষে তার প্রাপকের কাছে পৌঁছতে চলেছে।
চলবে…