Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ বাড়ির জানালায় (তৃতীয় পর্ব: শেষ দরজার ওপারে)।

“অর্ক, দরজাটা খুলিস না। আমি এখনও ভেতরে আছি!”

মায়ের কণ্ঠস্বর শুনে অর্কর শরীর অবশ হয়ে গেল।

মা তো তিন বছর আগে মারা গেছেন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি শেষবার অর্কর হাত ধরে বলেছিলেন, “কোনোদিন শেষ বাড়িতে ফিরতে হলে একা ফিরিস না।”

তাহলে এই কণ্ঠস্বর কার?

অর্ক বাড়িটার দিকে এগোতে গেল। কমলা তার হাত শক্ত করে ধরে ফেললেন।

—না, বাবা! ওই আওয়াজের পেছনে ছুটলে তুই আর ফিরতে পারবি না।

—কিন্তু ওটা আমার মায়ের গলা!

—আমি জানি। এই বাড়ির প্রতিটি ঘরে এমন কিছু রাখা আছে, যা মানুষের স্মৃতি আর ভয়কে ব্যবহার করে তাকে নিজের দিকে টেনে আনে। তোর মা এই বাড়িতে শেষবার এসেছিলেন বারো বছর আগে। তাঁর কণ্ঠস্বরও এখানে রেকর্ড করা হয়েছিল।

অর্ক অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

—কেন?

কমলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, —কারণ তোর মা জানতেন, একদিন তুই সত্যিটা খুঁজতে ফিরবি। তিনি চেয়েছিলেন, তুই যেন সবকিছু জানার আগে নিজের আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত না নিস।

অর্কর মনে হলো, তার জীবনটা যেন একের পর এক মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যে বাবাকে মৃত ভেবেছে, তিনি কি সত্যিই মারা গেছেন? যে ভাইকে কখনও দেখেনি, সে কি আদৌ তার ভাই? আর যে মায়ের মৃত্যুর পর সে পৃথিবীতে একা হয়ে গিয়েছিল, তাঁর কণ্ঠস্বর আজও এই বাড়িতে কেন ঘুরে বেড়াচ্ছে?

কমলা তাকে নিয়ে বাগানের শেষ প্রান্তে চলে এলেন। সেখানে একটি ভাঙা শেডের নিচে পুরোনো সাইকেল, কাঠের বাক্স আর মরচে ধরা যন্ত্রপাতি পড়ে ছিল।

কমলা একটি বাক্স সরিয়ে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা লোহার দরজা বের করলেন।

—এই পথটা বাড়ির পুরোনো ভূগর্ভস্থ ঘরে যায়। আগে এই বাড়িতে একটা ছোট্ট ব্যক্তিগত পরীক্ষাগার ছিল। অমিতাভ আর অভিজিৎ সেখানে কিছু যন্ত্রপাতি তৈরি করেছিল।

—কীসের পরীক্ষাগার?

—শব্দ আর স্মৃতি সংরক্ষণের যন্ত্র। তারা দুজনেই একসময় শব্দ-প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করত। সেই যন্ত্রের সাহায্যে কথোপকথন রেকর্ড করা যেত, এমনকি পুরোনো রেকর্ডিংকে এমনভাবে চালানো যেত যে মনে হতো কেউ সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। কিন্তু পরে সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছিল।

অর্ক অবাক হয়ে বলল, —তাহলে যে শিশুটি আমাকে দাদা বলে ডাকছিল…

—সে তোর ভাইয়ের পুরোনো রেকর্ডিং। তোর ভাই যখন ছোট ছিল, তখন এই বাড়িতে তার কণ্ঠস্বর রেকর্ড করা হয়েছিল। কেউ সেই রেকর্ডিংগুলো রেখে দিয়েছিল, আর এখন সেগুলো ব্যবহার করছে।

অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

এতক্ষণ যে অজানা আতঙ্ক তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল, তার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। কিন্তু তাতে রহস্য কমল না। বরং আরও গভীর হলো।

কমলা লোহার দরজাটা খুললেন।

নিচে সরু সিঁড়ি। স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালে শ্যাওলা জমেছে। তারা টর্চ জ্বালিয়ে নামতে লাগল। সিঁড়ির শেষে একটি ছোট ঘর। ঘরের মাঝখানে কাঠের টেবিল, তার ওপর পুরোনো টেপ রেকর্ডার, কয়েকটি ক্যাসেট এবং একটি লাল খাতা।

দেওয়ালের এক পাশে ছোট্ট জানালা। সেই জানালার কাচ দিয়ে ওপরের বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে।

অর্ক টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

লাল খাতার প্রথম পাতায় লেখা—

“শেষ বাড়ির জানালায় আলো জ্বললে বুঝতে হবে, অতীত আবার ফিরে এসেছে।”

তার নিচে বাবার স্বাক্ষর।

অর্ক খাতাটা খুলল। পাতায় পাতায় লেখা ছিল তার পরিবারের ইতিহাস। কিন্তু শেষের কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে।

—এই পাতাগুলো কে ছিঁড়েছে? —অর্ক জিজ্ঞেস করল।

কমলা বললেন, —যে সত্যিটা লুকিয়ে রাখতে চায়, সে-ই।

ঠিক তখনই ঘরের অন্ধকার কোণ থেকে একটি গলা ভেসে এল।

—কিন্তু সত্যি কখনও পুরোপুরি লুকিয়ে রাখা যায় না।

অর্ক চমকে ঘুরে দাঁড়াল।

দরজার পাশে একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। বয়স আনুমানিক ত্রিশ। পরনে কালো জ্যাকেট, চোখে ক্লান্তি। তার ডান হাতে কালো সুতো বাঁধা।

অর্কর বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।

ছবির সেই শিশুটির হাতেও ছিল কালো সুতো।

যুবকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

—তুই অর্ক?

অর্ক উত্তর দিল না।

যুবকটি মৃদু হাসল।

—আমার নাম অরুণ। ছোটবেলায় আমার নাম ছিল অন্য কিছু। কিন্তু সেই নামটা আমি বহু বছর আগে হারিয়ে ফেলেছি।

অর্কর গলা শুকিয়ে গেল।

—তুমি কি আমার ভাই?

অরুণ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—সেই উত্তরটাই তো আমি এত বছর ধরে খুঁজছি।

কমলা এগিয়ে এসে বললেন, —অরুণ, এবার আর কিছু লুকিয়ে লাভ নেই। ওকে সব বলার সময় এসেছে।

অরুণ মাথা নাড়ল।

—আমি ছোটবেলায় এই বাড়িতে থাকতাম। মা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু একদিন আমাকে বলা হলো, আমি অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য অন্য শহরে যেতে হবে। আমাকে নিয়ে যাওয়ার সময় মা কাঁদছিলেন। বাবা বলেছিলেন, কয়েক দিনের মধ্যে ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু আমি আর ফিরিনি।

—তোমাকে কে নিয়ে গিয়েছিল? —অর্ক জিজ্ঞেস করল।

—ডা. শৌভিক বসু। তিনি বলেছিলেন, আমার নতুন নাম হবে অরুণ। আমাকে একটি আবাসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রাখা হয়। পরে এক দম্পতি আমাকে নিজেদের কাছে নিয়ে যান। তাঁরা আমাকে ভালোবাসতেন, আমার কোনো অভাব রাখেননি। কিন্তু আমার অতীত সম্পর্কে তাঁরা কিছুই জানতেন না।

অর্কর চোখে জল এসে গেল।

—তুমি কি কখনও আমাদের খুঁজেছ?

—খুঁজেছি। অনেকবার। কিন্তু আমার জন্মের নথিতে অন্য নাম ছিল। বাবা-মায়ের নামও বদলে দেওয়া হয়েছিল। আমি বড় হওয়ার পর পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে কিছু অসংগতি পাই। তারপর ধীরে ধীরে এই বাড়ির সন্ধান পাই।

—তাহলে তুমি আজ এখানে কেন?

অরুণ টেবিলের ওপর একটি খাম রাখল।

—কারণ আমার কাছে এমন একটি চিঠি এসেছে, যেখানে লেখা ছিল, তোর বাবার মৃত্যুর সত্যি জানতে হলে শেষ বাড়িতে ফিরতে হবে।

অর্ক অবাক হয়ে বলল, —আমিও একই ধরনের চিঠি পেয়েছি!

দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।

একই চিঠি। একই বাড়ি। একই রহস্য।

কিন্তু কে তাদের এখানে ফিরিয়ে আনছে?

অরুণ খাম থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল। ছবিতে অমিতাভ সেন এবং অভিজিৎ সেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের পিছনে হাসপাতালের একটি সাইনবোর্ড।

ছবির পেছনে লেখা—

“১৮ জুন, ১৯৯৯। শেষ সিদ্ধান্তের দিন।”

অর্ক ছবিটা হাতে নিয়ে বলল, —এই তারিখটা কীসের?

অরুণ উত্তর দিল, —সেদিন আমাদের পরিবারে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার পর সবকিছু বদলে যায়। বাবা নাকি সেই দিন একটি শিশুকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু পরে সেই শিশুর পরিচয় নিয়ে গোলমাল হয়।

—কোন শিশু?

অরুণ মাথা নাড়ল।

—আমি জানি না। তবে আমার ধারণা, সেই শিশুটিই এই রহস্যের চাবিকাঠি।

কমলা ধীরে ধীরে বললেন, —শিশুটি ছিল তোমাদের পরিবারের কেউ নয়। সে ছিল এমন এক পরিবারের সন্তান, যাদের সঙ্গে ডা. শৌভিক বসুর পুরোনো বিরোধ ছিল। অমিতাভ শিশুটিকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অভিজিৎ অন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অর্ক চমকে উঠল।

—অভিজিৎ কাকু?

কমলা চোখ নামিয়ে নিলেন।

—হ্যাঁ। অমিতাভর যমজ ভাই অভিজিৎ। দুজনের চেহারা একই রকম হলেও তাদের চিন্তাভাবনা ছিল আলাদা। অমিতাভ সত্যি প্রকাশ করতে চাইতেন। অভিজিৎ বিশ্বাস করতেন, কিছু সত্যি চাপা থাকাই ভালো।

—তাহলে বাবা মারা যাওয়ার পর যিনি আমার সামনে এসেছিলেন, তিনি অভিজিৎ কাকু?

—সম্ভবত। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই, কারণ সেদিন অন্ধকারে আমি তাঁর মুখ ভালো করে দেখতে পাইনি।

অর্কর মাথায় আবার হাজার প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।

যদি সেই ব্যক্তি অভিজিৎ হন, তবে তিনি কেন নিজেকে অমিতাভ বলে পরিচয় দিয়েছিলেন? আর কেন তাকে বলেছিলেন, সত্যি প্রকাশ করতে হবে?

ঠিক তখনই ঘরের পুরোনো টেপ রেকর্ডারটি নিজে থেকেই চালু হয়ে গেল।

প্রথমে শোঁ শোঁ শব্দ। তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ।

“অর্ক, যদি তুই এই রেকর্ডিং শুনিস, তাহলে বুঝবি, আমি আর তোর কাছে সত্যিটা লুকিয়ে রাখতে পারিনি। তোর বাবার মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না। কিন্তু তাঁকে কে হত্যা করেছে, সেটা জানার আগে তোকে জানতে হবে, অভিজিৎ কেন নিজের পরিচয় বদলেছিল।”

অর্ক রেকর্ডারের কাছে এগিয়ে গেল।

কণ্ঠস্বরটি আবার বলল—

“অভিজিৎ আমার যমজ ভাই। সে আমাকে ঘৃণা করত না। বরং সে আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু একদিন এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, যার ফলে আমাদের দুজনের জীবনই বদলে যায়। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি শিশুর পরিচয়, একটি হাসপাতালের নথি এবং একটি কালো খাম।”

তারপর রেকর্ডিংয়ে কিছুক্ষণ নীরবতা।

এরপর আরেকটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

এবার কণ্ঠস্বরটি অমিতাভর নয়।

একজন নারীর।

“অমিতাভ, তুমি যদি এই কথাগুলো রেকর্ড করে রাখো, তাহলে বুঝব তুমি আমাকে আর বিশ্বাস করছ না। কিন্তু আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। তোমার ছেলে অর্ককে সত্যিটা বলো। সে সবকিছু জানার অধিকার রাখে।”

অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।

—এটা তো মায়ের গলা!

কমলা মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ। এই রেকর্ডিং তোমার মা করেছিলেন।

রেকর্ডিং চলতে থাকল।

“অর্ক, তুই যখন এই কথা শুনবি, তখন হয়তো আমি আর বেঁচে থাকব না। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস। তোর পরিবারের কেউই পুরোপুরি নির্দোষ নয়, আবার কেউই পুরোপুরি অপরাধী নয়। মানুষ অনেক সময় ভয় পেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই ভুলের দায় থেকে পালিয়ে গেলে অন্যায় আরও বড় হয়।”

রেকর্ডিং থেমে গেল।

ঘরের মধ্যে গভীর নীরবতা নেমে এল।

অর্ক চোখ মুছল।

—মা সব জানতেন। তবু আমাকে কিছু বলেননি।

অরুণ বলল, —হয়তো তিনি চেয়েছিলেন, তুই নিজে সত্যিটা খুঁজে বের করিস। শুধু অন্যের মুখে শোনা গল্প বিশ্বাস না করিস।

অর্ক লাল খাতাটা আবার খুলল। শেষের পাতায় একটি ঠিকানা লেখা ছিল।

“কলকাতা, বউবাজার। পুরোনো ছাপাখানা। কালো খাম।”

অর্ক ঠিকানাটা পড়ে বলল, —আমাদের সেখানে যেতে হবে।

অরুণ মাথা নাড়ল।

—হ্যাঁ। কারণ কালো খামের মধ্যে এমন একটি নথি আছে, যা প্রমাণ করবে, আমাদের পরিবারের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল।

কমলা হঠাৎ দরজার দিকে তাকালেন।

—কিন্তু তোমরা দুজন সেখানে যাওয়ার আগে একটা কথা জানা দরকার।

—কী কথা? —অর্ক জিজ্ঞেস করল।

কমলা ধীরে ধীরে বললেন, —ডা. শৌভিক বসু মারা যাননি। তিনি এখনও বেঁচে আছেন। আর আজ রাতেই তিনি এই বাড়িতে ফিরে আসবেন।

অর্কর বুকের মধ্যে যেন পাথর চেপে বসল।

—কেন?

কমলা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, —কারণ কালো খামটা এখনও তাঁর কাছে নেই। তিনি জানেন, তোমরা সেটার সন্ধান পেয়েছ। আর তিনি কোনোভাবেই চান না, সেই খাম তোমাদের হাতে পৌঁছক।

দূরে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ শোনা গেল।

তারপর বাড়ির প্রধান দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ।

একজন মানুষ ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে।

প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে অর্কর বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে।

দরজার সামনে এসে লোকটি থামল।

তারপর শান্ত গলায় বলল—

—অর্ক, অরুণ, তোমরা দুজনেই এখানে আছ জেনে ভালো লাগল।

লোকটি ঘরে ঢুকতেই অর্ক তাকে চিনতে পারল।

সাদা চুল, গোল চশমা, পরিচিত মুখ।

ডা. শৌভিক বসু।

যে মানুষটিকে সে ছোটবেলায় বাবার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বলে জানত।

ডা. বসু মৃদু হাসলেন।

—তোমরা অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছ। কিন্তু একটা প্রশ্ন এখনও করোনি।

অর্ক শক্ত গলায় বলল, —কী প্রশ্ন?

ডা. বসু টেবিলের ওপর একটি কালো খাম রাখলেন।

—তোমাদের মধ্যে আসল অমিতাভ কে?

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

অর্ক আর অরুণ একে অপরের দিকে তাকাল।

ডা. বসু আবার বললেন—

—কারণ বারো বছর আগে যে মানুষটিকে তোমরা অমিতাভ বলে চিনতে, সে আসলে অমিতাভ ছিল না।

তিনি খামটা খুললেন।

ভেতর থেকে একটি পুরোনো হাসপাতালের নথি বের করলেন।

সেখানে দুটি নাম পাশাপাশি লেখা—

অমিতাভ সেন।

অভিজিৎ সেন।

আর দুজনের নামের পাশে একই জন্মতারিখ।

কিন্তু নথির নিচে লাল কালিতে লেখা একটি বাক্য দেখে অর্কর সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

“জন্মের সময় দুই শিশুর পরিচয় বদলানো হয়েছিল।”

অর্ক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

ডা. বসু তার দিকে তাকিয়ে বললেন—

—এবার বুঝতে পারছ? তোমাদের পরিবারের ইতিহাসে শুধু একজন হারিয়ে যাওয়া ছেলে নেই। এমন একজন মানুষও আছে, যে সারাজীবন ভুল পরিচয়ে বেঁচে এসেছে।

তারপর তিনি কালো খাম থেকে আরেকটি ছবি বের করলেন।

ছবিতে দুই শিশুর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন অর্কর মা মৃণালিনী।

আর ছবির পেছনে লেখা—

“এই দুই শিশুর মধ্যে একজন অমিতাভর ছেলে নয়।”

অর্কর চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

তাহলে সে নিজেই কি নিজের পরিবারের আসল সন্তান নয়?

আর যদি তাই হয়, তবে তার জন্মের সত্যিটা কী?

ডা. বসু ধীরে ধীরে বললেন—

—আগামীকাল সকালে সব জানবে। কিন্তু তার আগে তোমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সত্যিটা জানার পর তোমরা কি এখনও একে অপরকে ভাই বলে ডাকতে পারবে?

অর্ক অরুণের দিকে তাকাল।

অরুণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার হাত বাড়িয়ে দিল।

—রক্তের সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক, আমি তোকে ভাই বলেই ডাকব।

অর্ক তার হাত ধরল।

কিন্তু তাদের কেউই জানত না, কালো খামের শেষ পাতায় এমন একটি নাম লেখা আছে, যা প্রকাশ্যে এলে শুধু তাদের পরিবারের ইতিহাস নয়, তাদের নিজেদের পরিচয়ও চিরদিনের জন্য বদলে যাবে।

আর সেই নামটি পড়ার আগেই ডা. শৌভিক বসু ঘরের আলো নিভিয়ে দিলেন।

অন্ধকারের মধ্যে তাঁর শেষ কথাটি শোনা গেল—

“এবার তোমাদের সত্যিকারের বাড়িতে ফিরতে হবে।”

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *