নীলকুঠির ভাঙা ঘণ্টাটা আবার বেজে উঠল।
একবার।
তারপর আরও একবার।
মেঘলা বুঝতে পারল, শব্দটা বাইরে থেকে আসছে না। কুঠির ভেতরের অন্ধকারে কোথাও একটা পুরোনো ঘণ্টা ঝুলছে, আর কেউ ইচ্ছে করেই সেটাকে বাজাচ্ছে।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটির হাতে তখনও সেই ছবির অর্ধেকটা। ছবিতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটো শিশুর মুখ প্রায় একই রকম। একই চোখ, একই নাক, একই কপাল। শুধু একজনের ডান গালে ছোট্ট একটা কালো তিল।
মেঘলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এরা কারা?”
যুবকটি উত্তর দিল না।
“আপনি বলেছিলেন, আমার আসল দাদাকে চেনেন। কোথায় সে? আর আপনি কে?”
যুবকটি ধীরে ধীরে ছবিটা উল্টে দিল। পেছনে পেনসিলে লেখা—‘১৭ আগস্ট, ১৯৯৮। একজনকে বাঁচাতে হলে অন্যজনকে হারাতে হবে।’
মেঘলার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“এই কথার মানে কী?”
“তার উত্তর আপনার মা দিতে পারবেন। কিন্তু তার আগে একটা কথা জানা দরকার। আপনি কি কখনও ভেবেছেন, আপনার দাদার জন্মদিন নিয়ে এত অসংগতি কেন?”
মেঘলা মাথা নাড়ল।
“আপনার বাড়ির অ্যালবামে লেখা, অরিন্দমের ষষ্ঠ জন্মদিন ১২ ডিসেম্বর, ১৯৯৬। অথচ পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ১৭ আগস্ট, ১৯৯০। এই দুটো তারিখের মধ্যে শুধু ভুল নেই। লুকিয়ে আছে একটা পরিকল্পনা।”
“কীসের পরিকল্পনা?”
যুবকটি একটু কাছে এগিয়ে এল।
“একটা শিশুকে অন্য শিশুর পরিচয়ে বাঁচিয়ে রাখার পরিকল্পনা।”
মেঘলার মনে হলো, মাটিটা যেন পায়ের তলা থেকে সরে যাচ্ছে।
“আপনি কি বলতে চাইছেন, আমার দাদা আসলে আমার দাদা নয়?”
“আমি বলছি, আপনি যাকে এত বছর ধরে অরিন্দম বলে চিনেছেন, তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ আছে।”
“তাহলে আমার আসল দাদা কে?”
যুবকটি এবার চোখ তুলে সরাসরি মেঘলার দিকে তাকাল।
“আমি।”
মেঘলা কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না। তারপর হঠাৎ হেসে উঠল। হাসিটা আনন্দের নয়, অবিশ্বাসের।
“এটা কোনো নাটক নয়। আমার বাবা মারা গেছেন। আমার পরিবার ভেঙে পড়েছে। আপনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলছেন, যার কোনো মাথামুণ্ডু নেই!”
যুবকটি প্রতিবাদ করল না।
শুধু বলল, “আপনার বাঁ-হাতের কবজিতে যে ছোট্ট জন্মদাগটা আছে, সেটা আপনার মায়েরও আছে। আমারও আছে।”
মেঘলা স্বভাবতই নিজের কবজির দিকে তাকাল। জন্মদাগটা সে ছোটবেলা থেকেই দেখেছে। মা বলতেন, এটা নাকি তাদের পরিবারের চিহ্ন।
“আপনি আমার সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন বলেই এসব জানেন।”
“ঠিক কথা। তাই বলে কি আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর বদলে যায়?”
যুবকটি পকেট থেকে একটি পুরোনো কাগজ বের করল। কাগজের ভাঁজে ভাঁজে হলদে দাগ। তাতে একটি নার্সিংহোমের সিল, তারিখ ১৭ আগস্ট, ১৯৯০।
মেঘলা কাগজটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল।
নবজাতক—পুরুষ। জন্মের সময়—রাত ১১টা ৪০ মিনিট। মায়ের নাম—সুপর্ণা রায়।
তার নিচে আরেকটি নাম লেখা ছিল, কিন্তু কালি দিয়ে সেটি মুছে ফেলা হয়েছে।
“এটা কী?” মেঘলা ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল।
“আপনার মায়ের প্রথম সন্তানের জন্মের নথি।”
“প্রথম সন্তান?”
“হ্যাঁ। কিন্তু আপনার মা যাকে প্রথম সন্তান বলে জানতেন, তার গল্পটা পুরো নয়।”
মেঘলা কাগজটা শক্ত করে ধরে বলল, “আমার দাদা অরিন্দমের জন্ম ১৯৯০ সালের ১৭ আগস্ট। আমি ১৯৯৮ সালের অনেক পরে জন্মেছি। তাহলে—”
“তাহলে আপনার মা আপনাকে যা বলেছেন, তার সবটাই সত্যি নয়।”
“আপনি আমার দাদা হলে এত বছর কোথায় ছিলেন?”
যুবকটির চোখে প্রথমবারের মতো গভীর ক্লান্তি ফুটে উঠল।
“আমি কোথায় ছিলাম, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আপনাকে জানতে হবে, ১৭ আগস্ট, ১৯৯৮-এর রাতে কী ঘটেছিল।”
নীলকুঠির ভেতরের ঘরটিতে ঢুকতেই মেঘলার নাকে পুরোনো কাগজ, স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল আর বহুদিন বন্ধ থাকা কাঠের আসবাবের গন্ধ এসে লাগল।
ঘরের মাঝখানে একটি টেবিল। তার ওপর লণ্ঠন, কয়েকটি ফাইল এবং একটি ছোট্ট কাঠের বাক্স।
যুবকটি লণ্ঠন জ্বালিয়ে বলল, “আমার নাম অভীক।”
“অভীক কী?”
“অভীক সেন। অন্তত এত বছর ধরে এই নামেই বেঁচে আছি।”
“আপনি কি অরিন্দম?”
অভীক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমার জন্মের সময় আমাকে অরিন্দম নাম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আট বছর বয়সে সেই নামটা আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়।”
মেঘলা স্থির হয়ে গেল।
“কেন?”
অভীক বাক্সটা খুলল।
ভেতরে ছিল কয়েকটি স্কুলের শংসাপত্র, পুরোনো পরিচয়পত্র, একটি ভাঙা খেলনা গাড়ি এবং ছোট্ট একটি নীল রঙের জামা। জামাটির বুকের কাছে সেলাই করা ছিল—‘অরিন্দম’।
মেঘলার মনে পড়ল, ছোটবেলায় মায়ের আলমারিতে এমন একটি জামা দেখেছিল সে। মা বলেছিলেন, সেটা তার হারিয়ে যাওয়া দাদার শেষ জন্মদিনের পোশাক।
“১৭ আগস্ট, ১৯৯৮-এর রাতে আমাদের বাড়িতে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল,” অভীক বলতে শুরু করল। “আপনার বাবা তখন ইংলিশ বাজারের পুরোনো ডাকঘরে কাজ করতেন। মা অসুস্থ ছিলেন। আর বাড়িতে ছিলেন একজন আত্মীয়, যাঁকে আপনার পরিবার বহু বছর ধরে মৃত বলে জানে।”
“কে?”
“আপনার কাকা, অনির্বাণ রায়।”
মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।
“আমার তো কোনো কাকা নেই!”
“আপনাকে তাই বলা হয়েছে। অনির্বাণ কাকা ছিলেন আপনার বাবার ছোট ভাই। জমিজমা আর পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে তাঁদের মধ্যে বহুদিন ধরে বিরোধ চলছিল। কিন্তু সেই বিরোধের সঙ্গে আপনার জন্মের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্কটা তৈরি হয় অরিন্দমকে নিয়ে।”
অভীক একটু থামল।
“সেই রাতে বাড়িতে আগুন লেগেছিল। আগুনের উৎস নিয়ে আজও সরকারি নথিতে স্পষ্ট কিছু লেখা নেই। আপনার মা বলেছিলেন, অরিন্দম ঘরের ভেতরে আটকে পড়েছিল। অনেক খোঁজ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। কিছু পোড়া জিনিস উদ্ধার হয়েছিল, আর পরিবারের সবাই ধরে নিয়েছিল, ছেলেটা আর বেঁচে নেই।”
“কিন্তু আপনি তো বেঁচে ছিলেন!”
“আমি বেঁচে ছিলাম। কিন্তু আমার পরিচয় তখন আর আমার ছিল না।”
মেঘলা টেবিলের ওপর হাত রাখল। তার আঙুল ঠান্ডা হয়ে আসছিল।
“একটু পরিষ্কার করে বলুন।”
অভীক বলল, “সেই রাতে শুধু একজন শিশু ছিল না। আপনার বাবা-মায়ের বাড়িতে আরেকটি শিশুও ছিল। সে ছিল অনির্বাণ কাকার ছেলে। জন্মের পর তার মা মারা গিয়েছিলেন। পারিবারিক কলহের কারণে শিশুটিকে গোপনে আপনার বাড়িতে আনা হয়েছিল। দুই শিশুর বয়স কাছাকাছি ছিল, আর চেহারাতেও আশ্চর্য মিল ছিল।”
“তার মানে, আমার দাদা আর সেই শিশুটি—”
“একই রকম দেখতে ছিল। কিন্তু তারা যমজ ছিল না। একজনের জন্ম হয়েছিল সুপর্ণা রায়ের গর্ভে। অন্যজনের জন্ম অন্য পরিবারে। আর সেই রাতের আগুনের পরে পরিচয় বদলে দেওয়া হয়।”
মেঘলার মাথায় যেন হাজারটা প্রশ্ন একসঙ্গে আছড়ে পড়ল।
“কিন্তু কেন? একটা শিশুর পরিচয় বদলে দেওয়ার দরকার কী ছিল?”
অভীক জানালার দিকে তাকাল।
“কারণ সেই রাতের আগুন নিছক দুর্ঘটনা ছিল না।”
১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্ট।
সেই রাতের কথা অভীক কখনও ভুলতে পারেনি।
তার বয়স তখন আট। সে জানত, তার নাম অরিন্দম। জানত, তার মা সুপর্ণা তাকে পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। আর জানত, তার বাবা অনিরুদ্ধ রায় খুব কম কথা বললেও তাকে কখনও মিথ্যে বলেন না।
সেই রাতে বাড়ির পেছনের ঘরে একটা ঝগড়া হচ্ছিল। অনির্বাণ কাকা বাবাকে বলছিলেন, তিনি নাকি এমন কিছু কাগজ লুকিয়ে রেখেছেন, যেগুলো প্রকাশ্যে এলে বহু মানুষের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে।
অভীক দরজার আড়াল থেকে কথাগুলো শুনেছিল।
তারপর আচমকা একটা শব্দ।
কাচ ভাঙার শব্দ।
চিৎকার।
ধোঁয়া।
সে দৌড়ে মায়ের ঘরের দিকে গিয়েছিল। কিন্তু মাঝপথে কেউ তার মুখ চেপে ধরে টেনে নিয়ে যায়। মুখের ওপর ভেজা কাপড় চাপা পড়েছিল। সে লড়াই করেছিল, আঁচড়েছিল, কামড়েছিল। তবু তাকে একটা গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
শেষবার সে বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেছিল, জানালার ওপরে লাল আগুনের আলো।
তারপর বহু ঘণ্টা অন্ধকার।
চোখ খুলে সে নিজেকে দেখতে পেয়েছিল একটা অচেনা ঘরে। সামনে বসে ছিলেন অনির্বাণ কাকা। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক অপরিচিত মহিলা।
“আজ থেকে তোর নাম অভীক,” অনির্বাণ বলেছিলেন। “অরিন্দম বলে কেউ ছিল না। বুঝেছিস?”
অভীক মাথা নেড়েছিল।
কিন্তু সে বিশ্বাস করেনি।
কারণ তার বুকের কাছে তখনও আঁকড়ে ধরা ছিল মায়ের দেওয়া ছোট্ট কাঠের বাঁশি। বাঁশিটার গায়ে খোদাই করা ছিল—‘অরিন্দম, মায়ের সোনা’।
পরের কয়েক মাস তাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। তার স্কুল বদলে যায়, পরিচয় বদলে যায়, অতীত বদলে যায়। তাকে শেখানো হয়েছিল, সে অনির্বাণ সেনের ছেলে। কেউ তার পুরোনো নাম জানতে চাইলে বলতে হবে, সে কিছুই জানে না।
একদিন সে পালানোর চেষ্টা করেছিল।
ধরা পড়ার পর তাকে বলা হয়েছিল, তার মা মারা গেছেন, আর বাবাও আর নেই।
সেই মিথ্যে কথাটাই সে বছরের পর বছর বিশ্বাস করে এসেছে।
যতদিন না, ২০১২ সালে এক বৃদ্ধ ডাকপিয়ন তার হাতে একটি খাম তুলে দেন।
খামের ওপরে লেখা ছিল—‘অরিন্দম রায়ের জন্য’।
ভেতরে ছিল মাত্র একটি লাইন।
‘তুই যদি বেঁচে থাকিস, তবে জানিস, তোর মা এখনও প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে।’
চিঠিতে কোনো স্বাক্ষর ছিল না।
কিন্তু হাতের লেখাটা সে চিনেছিল।
তার বাবার হাতের লেখা।
“তাহলে আপনি এত বছর পরে ফিরে এলেন না কেন?” মেঘলা প্রশ্ন করল।
অভীক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আমি ফিরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার কাছে তখন কোনো পরিচয়পত্র ছিল না, কোনো প্রমাণ ছিল না। আর যে লোকেরা আমাকে অন্য পরিচয়ে বড় করেছিল, তারা আমাকে বারবার বোঝাত, আমার পুরোনো পরিবার আমাকে চায় না। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো সত্যিই তাই।”
“কিন্তু আমার বাবা তো আপনাকে খুঁজছিলেন!”
“হ্যাঁ। অনেক পরে সেটা বুঝতে পেরেছি। আপনার বাবা গোপনে আমাকে খুঁজে বের করেছিলেন। প্রথমবার দেখা হয়েছিল ২০১৮ সালে। তিনি আমাকে দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। কিন্তু আমাকে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার বদলে বলেছিলেন, আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে।”
“কেন?”
অভীক টেবিলের ফাইল থেকে একটি চিঠি বের করল।
“কারণ তিনি জানতেন, যে রাতে আমার পরিচয় বদলানো হয়েছিল, সেই রাতের অপরাধ এখনও জীবিত।”
মেঘলা চিঠিটা হাতে নিল।
চিঠির ওপরে তার বাবার নাম। নিচে লেখা—
‘অভীক,
আমি জানি, তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার অধিকারও হয়তো আমার নেই। তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে তোমার শৈশব কেড়ে নিয়েছি। কিন্তু আমি যে সত্যিটা এত বছর লুকিয়ে রেখেছি, সেটা প্রকাশ্যে এলে শুধু অনির্বাণ নয়, তোমার মাও বিপদে পড়বেন।
সুপর্ণা তোমাকে হারাননি। তিনি জানতেন, তুমি বেঁচে আছ। কিন্তু তিনি জানতেন না, তোমাকে কোথায় রাখা হয়েছে।
আর যাকে সবাই অরিন্দম বলে চিনেছে, সে আসলে অনির্বাণের ছেলে। তাকে তোমার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তোমার পরিচয়ে। সেই শিশুটির কোনো অপরাধ ছিল না। অপরাধ ছিল বড়দের।
একদিন মেঘলা সব জানতে চাইবে। সেদিন তাকে সত্যিটা বলো। তবে তার আগে শেষ খামটা খুঁজে বের করো।’
মেঘলা চিঠিটা নামিয়ে রাখল।
“আমার বাবা জানতেন, আমি একদিন সব জানতে পারব?”
“তিনি জানতেন, আপনার প্রশ্ন করার স্বভাব আছে। আপনার বাবার কাছে আপনি কখনও কোনো উত্তর না পেলে থেমে থাকতেন না।”
মেঘলার চোখে জল চলে এল। বাবার মৃত্যুর পর এই প্রথম মনে হলো, তিনি যেন এখনও তার সঙ্গে কথা বলছেন।
কিন্তু চিঠির একটি বাক্য তার মনে কাঁটার মতো বিঁধে রইল।
‘সুপর্ণা তোমাকে হারাননি।’
তার মা সব জানতেন?
তাহলে এত বছর তিনি কাকে হারিয়ে কেঁদেছেন?
আর মেঘলা নিজে এই পরিবারের ঠিক কে?
দুপুরের দিকে মেঘলা বাড়ি ফিরল।
সুপর্ণা তখন ঠাকুরঘরে বসে ছিলেন। মেয়েকে দেখে তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“তুই কোথায় গিয়েছিলি?”
“নীলকুঠিতে।”
মায়ের হাত থেকে প্রদীপটা পড়ে গেল।
“তুই সেখানে গিয়েছিলি?”
“হ্যাঁ। আর আমি অরিন্দমদাকে খুঁজে পেয়েছি।”
সুপর্ণা উঠে দাঁড়াতে গিয়ে টাল সামলাতে পারলেন না। মেঘলা তাঁকে ধরে ফেলল।
“মা, তুমি জানতেই যে দাদা বেঁচে আছে?”
সুপর্ণা কিছু বললেন না।
“মা, আমার দিকে তাকাও।”
ধীরে ধীরে তিনি মেয়ের দিকে মুখ ফেরালেন। তাঁর চোখে জল, ঠোঁট কাঁপছে।
“তুই কি ওকে দেখেছিস?”
“হ্যাঁ। ওর নাম অভীক। কিন্তু জন্মের সময় ওর নাম ছিল অরিন্দম।”
সুপর্ণা দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলেন।
“আমি জানতাম, একদিন এই দিন আসবে।”
মেঘলা মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
“তাহলে তুমি আমাকে মিথ্যে বলেছ কেন? এত বছর ধরে কেন বলেছ, আমার দাদা হারিয়ে গেছে?”
“কারণ আমি ওকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।”
“কাকে? অভীককে, না যে ছেলেটাকে তুমি অরিন্দম বলে বড় করেছ তাকে?”
সুপর্ণা চমকে তাকালেন।
মেঘলা বুঝল, প্রশ্নটা ঠিক জায়গায় লেগেছে।
“মা, তুমি কি অনির্বাণ কাকার ছেলেকে নিজের ছেলে বলে বড় করেছ?”
সুপর্ণা দীর্ঘক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন, “ওর নাম ছিল সৌরভ।”
“সৌরভ?”
“হ্যাঁ। অনির্বাণের ছেলে। ওর মা মারা যাওয়ার পর অনির্বাণ ওকে আমাদের বাড়িতে রেখে গিয়েছিল। তখন তোমার বাবা বলেছিলেন, শিশুটাকে কিছুদিন আমাদের কাছে রাখতে। কিন্তু অনির্বাণের সঙ্গে তোমার বাবার সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাওয়ার পরে সে আর ওকে নিতে আসেনি।”
“তাহলে অরিন্দম নামটা কে দিল?”
“আমি।”
মেঘলা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
“তুমি?”
সুপর্ণা চোখ বন্ধ করলেন।
“আমি তখন নিজের সন্তানকে হারানোর ভয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। অনির্বাণ আমাকে বলেছিল, যদি আমি মুখ বন্ধ রাখি, তাহলে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু সেই রাতে যা ঘটেছিল, তার পরে কেউ আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারেনি।”
“কী ঘটেছিল, মা?”
সুপর্ণা উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির সামনের দরজায় জোরে ধাক্কা পড়ল।
একবার।
দুবার।
তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।
“সুপর্ণা! দরজা খোলো। এত বছর যে সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছ, সেটা এবার শেষ করতে হবে।”
সুপর্ণার মুখের রং বদলে গেল।
মেঘলা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু মা তার হাত শক্ত করে ধরে ফেললেন।
“না, মেঘলা! দরজা খুলিস না!”
“কেন?”
“কারণ ও ফিরে এসেছে।”
“কে?”
সুপর্ণা কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “অনির্বাণ।”
মেঘলা স্থির হয়ে গেল।
“কিন্তু অভীক বলেছিল, অনির্বাণ কাকা—”
“অভীক সব জানে না!” সুপর্ণা প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। “যে মানুষটা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, সে শুধু তোর কাকা নয়। সে তোর বাবার মৃত্যুর কারণও হতে পারে।”
বাইরে আবার ধাক্কা পড়ল।
এবার দরজার নিচ দিয়ে একটি খাম ভেতরে ঢুকে এল।
মেঘলা ঝুঁকে খামটা তুলে নিল।
খামের ওপরে লেখা ছিল—‘মেঘলার জন্য’।
ভেতরে একটি ছবি। ছবিতে তার বাবা অনিরুদ্ধ, মা সুপর্ণা এবং দুই শিশু। পেছনে তারিখ—১৭ আগস্ট, ১৯৯৮।
কিন্তু ছবির এক কোণে লাল কালিতে লেখা ছিল—
‘আগুন লাগার আগে যে শিশুটিকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে অরিন্দম ছিল না।’
মেঘলার হাত কাঁপতে লাগল।
ছবির নিচে আরেকটি লাইন—
‘তোমার আসল দাদা এখনও নীলকুঠিতে নেই। সে তোমার খুব কাছেই আছে।’
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
অজানা নম্বর।
মেঘলা কল ধরতেই ওপাশ থেকে অভীকের কণ্ঠ শোনা গেল।
“মেঘলা, তুমি কি বাড়িতে?”
“হ্যাঁ। কী হয়েছে?”
“যে লোকটা তোমার বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, তাকে কোনোভাবেই ভেতরে ঢুকতে দিও না।”
“কেন?”
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর অভীক ফিসফিস করে বলল—
“কারণ সে অনির্বাণ নয়।”
মেঘলার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
“তাহলে কে?”
অভীক উত্তর দিল, “সে সেই মানুষ, যাকে তোমার বাবা এত বছর ধরে মৃত বলে চালিয়ে এসেছেন।”
ফোনের ওপাশে হঠাৎ একটা শব্দ হলো। যেন কেউ অভীকের হাত থেকে ফোন কেড়ে নিচ্ছে।
তারপর অপরিচিত এক কণ্ঠ ভেসে এল—
“মেঘলা, তোমার মাকে জিজ্ঞাসা করো, ১৭ আগস্টের রাতে আসলে কোন শিশুটির মৃত্যু হয়েছিল।”
কল কেটে গেল।
বাইরে দরজায় আবার ধাক্কা পড়ল।
সুপর্ণা মেঘলাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
“আমাকে ক্ষমা করিস, মা। আমি তোকে সব বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সত্যিটা জানলে তুই হয়তো আমাকেও আর মা বলে ডাকতে পারবি না।”
মেঘলা মায়ের হাত সরিয়ে দিল না। শুধু তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি সব শুনব। আজই। আর তুমি কিছুই লুকোবে না।”
সুপর্ণা ঠোঁট খুললেন।
কিন্তু প্রথম শব্দটা উচ্চারণ করার আগেই বাইরে থেকে গুলির শব্দ শোনা গেল।
একটি গুলি।
তারপর নিস্তব্ধতা।
মেঘলা দরজার দিকে ছুটে গেল। দরজা খুলতেই দেখল, বারান্দার মেঝেতে একজন মানুষ পড়ে আছে। তার পাশে ছড়িয়ে রয়েছে রক্তমাখা কাগজ।
মানুষটির মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার ডান হাতের মুঠোয় ধরা রয়েছে একটি পুরোনো ডাকঘরের সিলমোহর।
সেই একই সিলমোহর, যা তার বাবা মৃত্যুর আগের রাতে ব্যবহার করেছিলেন।
আর রক্তমাখা কাগজের ওপর কাঁপা হাতে লেখা—
‘শেষ খামটা এখনও খোলা হয়নি।’
চলবে…