Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে চিঠি কখনও পাঠানো হয়নি (তৃতীয় পর্ব: শেষ খামের ভিতরে)।

গুলির শব্দটা যেন এখনও মেঘলার কানে বাজছিল।

বারান্দার মেঝেতে পড়ে থাকা মানুষটির শরীর রক্তে ভিজে যাচ্ছে। মুখটা একদিকে ঘোরানো, চোখ দুটো আধখোলা। ডান হাতে শক্ত করে ধরা পুরোনো ডাকঘরের সিলমোহর।

মেঘলা হাঁটু গেড়ে বসে তার মুখটা দেখতে গেল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে সুপর্ণা চিৎকার করে উঠলেন, “ওর কাছে যাস না!”

কিন্তু মেঘলা থামল না।

মানুষটির মুখ চিনতে পেরেই তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

এই মুখ সে আগে দেখেছে।

বাবার পুরোনো অ্যালবামে। একটি সাদা-কালো ছবিতে। ছবির নিচে লেখা ছিল—‘অনির্বাণ রায়, ১৯৮৯’।

কিন্তু এই মানুষটি কি সত্যিই তার কাকা?

মেঘলা তার নাকের কাছে হাত নিয়ে গেল। নিঃশ্বাস পড়ছে, খুব ক্ষীণ। সে দ্রুত পুলিশে খবর দিল। তারপর লোকটির মুঠো থেকে সিলমোহরটা আলতো করে ছাড়িয়ে নিল।

সিলমোহরের নিচে আটকে ছিল একটি ছোট্ট চাবি।

চাবির সঙ্গে বাঁধা কাগজে লেখা—‘ডাকঘর। লকার ১৭।’

মেঘলা কাগজটা মুঠোর মধ্যে লুকিয়ে ফেলল।

পেছন থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল, “চাবিটা তুই পেয়েছিস?”

মেঘলা ঘুরে দাঁড়াল।

সুপর্ণার চোখে তখন আর শুধু ভয় নেই। সেখানে এমন এক অপরাধবোধ, যা বহু বছরের পুরোনো।

“মা, তুমি এই চাবি চেনো?”

সুপর্ণা মাথা নাড়লেন।

“তোর বাবা মৃত্যুর আগে এটা খুঁজছিলেন। আমি তাঁকে থামানোর চেষ্টা করেছিলাম।”

“কেন?”

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কারণ ওই লকারে এমন একটা সত্যি আছে, যেটা এত বছর ধরে আমাদের সবাইকে আলাদা করে রেখেছে।”

“তাহলে এবার বলো। ১৭ আগস্ট, ১৯৯৮-এর রাতে কী ঘটেছিল?”

সুপর্ণা উত্তর দেওয়ার আগেই দূরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

সেদিন রাতে আর কোনো কথা হলো না।


পরদিন সকাল।

ইংলিশ বাজারের পুরোনো ডাকঘরটা এখনও আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। দেওয়ালের চুন খসে পড়েছে, কাঠের জানালায় ধুলোর আস্তরণ। কাউন্টারের পেছনে পুরোনো ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে বহুদিন।

মেঘলা একা সেখানে ঢুকল।

বাবার সহকর্মী অবসরপ্রাপ্ত ডাককর্মী হরিপদবাবু তাকে দেখে চমকে উঠলেন।

“তুমি এখানে? অনিরুদ্ধবাবুর মৃত্যুর পর তো ভেবেছিলাম, আর কেউ এই ঘরে আসবে না।”

মেঘলা চাবিটা দেখাল।

“লকার ১৭ কোথায়?”

হরিপদবাবুর মুখের রং বদলে গেল।

“এই চাবি তুমি কোথায় পেলে?”

“বাবার শেষ চিঠির সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে?”

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোমার বাবা আমাকে কথা দিয়েছিলেন, তাঁর অনুমতি ছাড়া যেন লকারটা কেউ না খোলে। কিন্তু তিনি এটাও বলেছিলেন, একদিন তাঁর মেয়ে আসবে। সেদিন তাকে আটকানো যাবে না।”

তিনি কাউন্টারের নিচ থেকে একটি ছোট্ট রেজিস্টার বের করলেন। পাতাগুলো উল্টে একটি নামের পাশে আঙুল রাখলেন।

‘লকার ১৭—অনিরুদ্ধ রায়।’

মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।

“বাবার নিজের নামে লকার?”

“এই ডাকঘরের কর্মীদের জন্য পুরোনো নথি রাখার একটা ব্যবস্থা ছিল। সরকারি কাগজের বাইরে কিছু ব্যক্তিগত নথিও রাখা যেত। তোমার বাবা সেখানে বহু বছর ধরে চিঠি জমিয়েছেন।”

“কাদের চিঠি?”

হরিপদবাবু ধীরে বললেন, “যাদের কাছে তিনি চিঠি পাঠাতে পারেননি।”

লকার খুলতেই একটা ধাতব শব্দ হলো।

ভেতরে ছিল একটি মোটা খাম, কয়েকটি পুরোনো ছবি, একটি ডায়েরি এবং নীল কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট প্যাকেট।

খামের ওপরে লেখা—‘আমার মেয়ে মেঘলার জন্য। যখন আর কিছু লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।’

মেঘলার আঙুল কাঁপতে লাগল।

সে খাম খুলল।

ভেতরে বাবার হাতের লেখা।

‘মেঘলা,

তুই যখন এই চিঠি পড়বি, তখন হয়তো আমি আর থাকব না। তোর কাছে আমার একটাই অনুরোধ—আমার ভুলগুলোকে ভালোবাসা বলে মেনে নিস না। আমি তোদের রক্ষা করতে গিয়ে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যেগুলো শেষ পর্যন্ত তোদের জীবনকেই বিষিয়ে দিয়েছে।

তুই জানতে চেয়েছিস, অরিন্দম কোথায়?

অরিন্দম বেঁচে আছে। কিন্তু সে শুধু হারিয়ে যাওয়া ছেলে নয়। সে এমন একজন মানুষ, যার পরিচয় অন্যের হাতে বদলে গিয়েছিল।

তুই জানতে চেয়েছিস, অভীক কে?

অভীক সেই নাম, যে নামের আড়ালে অরিন্দমকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। তবে এই সত্যিটা জানার পরও তোর প্রশ্ন শেষ হবে না। কারণ আগুনের রাতে যে শিশুটি মারা গিয়েছিল, তার পরিচয় আজও কেউ স্বীকার করেনি।

সেই শিশুটির মৃত্যু দুর্ঘটনা ছিল না।

আর এই ঘটনার সঙ্গে আমারও অপরাধ জড়িয়ে আছে।’

চিঠির শেষ লাইনটা পড়ে মেঘলা থমকে গেল।

বাবা নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন।

কিন্তু কী অপরাধ?

সে ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম কয়েকটি পাতায় সাধারণ হিসাব, কাজের নোট, ডাকঘরের রেজিস্টার সংক্রান্ত তথ্য। তারপর ১৯৯৮ সালের আগস্ট মাসের একটি পাতা।

১৭ আগস্ট।

তারিখের পাশে লেখা—

‘রাত ১১টা ৫৫। বাড়িতে ফিরলাম। আগুন তখন ছড়িয়ে পড়েছে। সুপর্ণা বারবার বলছে, দুটো বাচ্চার মধ্যে একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনির্বাণ বলছে, সে আগুন লাগার আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি জানি, সে মিথ্যে বলছে।’

পরের পাতায়—

‘১৮ আগস্ট। হাসপাতালে একটি শিশুর দেহ শনাক্ত করার জন্য আমাকে ডাকা হয়েছিল। মুখ চেনার উপায় ছিল না। পোশাক দেখে সবাই ধরে নিয়েছে, সে অরিন্দম। আমি প্রতিবাদ করিনি।’

মেঘলার চোখের সামনে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে এল।

তারপরের লাইন—

‘আমি জানতাম, পোশাকটি অরিন্দমের। কিন্তু শিশুটি অরিন্দম কি না, তা আমি জানতাম না।’

আরও একটি পাতা।

‘সুপর্ণা আমাকে বলেছে, সে তার ছেলেকে চিনতে পেরেছে। কিন্তু তার চোখে এমন এক ভয় দেখেছি, যা আমাকে বুঝিয়েছে, সে সত্যিটা বলছে না। আমি যদি তখন পুলিশকে সব জানাতাম, হয়তো একটা জীবন বাঁচত। হয়তো দুটো জীবনই বাঁচত। কিন্তু আমি চুপ করেছিলাম।’

মেঘলা ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।

বাবা শুধু সত্যি লুকিয়ে রাখেননি। তিনি জানতেন, সেই নীরবতার কারণে একটি শিশুর পরিচয় হারিয়ে গেছে।

কিন্তু সেই শিশুটি কে?

সে নীল কাপড়ে মোড়ানো প্যাকেটটা খুলল।

ভেতরে দুটি জিনিস।

একটি ছোট্ট রুপোর লকেট। তার ভেতরে দুটো শিশুর ছবি।

আর একটি জন্মের শংসাপত্র।

নাম—সৌরভ সেন।

জন্মতারিখ—১৭ আগস্ট, ১৯৯০।

মায়ের নামের জায়গায় লেখা—‘অজ্ঞাত’।

বাবার নাম—অনির্বাণ রায়।

মেঘলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছবির একটি শিশুর ডান গালে তিল। অন্যটির গালে নেই।

কিন্তু দুজনের চেহারা এতটাই এক যে, ছোটবেলায় পাশাপাশি দাঁড় করালে তাদের আলাদা করা কঠিন।

তাহলে কি সত্যিই সৌরভ আর অরিন্দমের পরিচয় বদলানো হয়েছিল?

মেঘলা লকারের তলায় হাত দিল। সেখানে আটকে ছিল আরেকটি ছোট্ট খাম।

খামের ওপর মাত্র একটি বাক্য—

‘যে শিশুটিকে সবাই মৃত বলে জানে, তার শেষ চিঠি।’


চিঠিটা খোলার আগে মেঘলা অনেকক্ষণ স্থির বসে রইল।

বাইরে ডাকঘরের ঘণ্টা বাজল। কেউ একটা পার্সেল জমা দিতে এসেছে। কাউন্টারে কথাবার্তা চলছে। অথচ তার কাছে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা থেমে গেছে।

শেষ পর্যন্ত সে খাম খুলল।

‘বাবা,

তুমি যদি এই চিঠি পাও, তাহলে বুঝবে, আমি আর বাড়ি ফিরতে পারব না।

আমি জানি, তুমি আমাকে খুঁজছ। মা-ও খুঁজছে। কিন্তু তোমাদের কাছে ফিরলে সৌরভকে মেরে ফেলা হবে। ওর কোনো দোষ নেই। ও শুধু আমার মতো দেখতে বলে আমার জীবনটা পেয়ে গেছে।

সেই রাতে আমি দেখেছিলাম, কাকা পেছনের ঘরে কেরোসিন ঢালছিল। আমি চিৎকার করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে ধরে ফেলেন। সৌরভ তখন ঘুমিয়ে ছিল। আমাকে একটা গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

আমি পালিয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু কাকা বলেছিলেন, আমি যদি বাড়ি ফিরি, সৌরভকে খুন করা হবে। আমি বিশ্বাস করিনি। পরে যখন শুনলাম, আগুনে একজন শিশু মারা গেছে, তখন বুঝলাম, তিনি সত্যিই পারবেন।

আমি জানি না, আগুনে কে মারা গিয়েছিল। আমি শুধু জানি, সেই রাতের পর আমাদের কেউ আর আগের মানুষটা থাকিনি।

বাবা, তুমি যদি কখনও মেঘলাকে সব বলো, ওকে বোলো—আমি ওকে কখনও দেখিনি, তবু ও আমার বোন। ও যেন আমাকে খুঁজতে গিয়ে নিজের জীবন নষ্ট না করে।

তোমার ছেলে, অরিন্দম।’

চিঠির তারিখ—১৯৯৯ সালের ৩ জানুয়ারি।

মেঘলা চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।

অরিন্দম বেঁচে ছিল। সে নিজের ইচ্ছায় হারিয়ে যায়নি। সে অন্য একজনকে বাঁচানোর জন্য নিজের পরিচয় ত্যাগ করেছিল।

কিন্তু আগুনে মারা গিয়েছিল কে?

সৌরভ?

নাকি অন্য কোনো শিশু?

আর অনির্বাণ কোথায়?

ঠিক তখনই হরিপদবাবু তাড়াহুড়ো করে ঘরে ঢুকলেন।

“মেঘলা, তোমাকে এখনই বাড়ি যেতে হবে।”

“কেন?”

“তোমার মায়ের বাড়িতে পুলিশ গেছে। গত রাতের আহত লোকটি মারা গেছে।”

মেঘলার হাত থেকে চিঠিটা পড়ে গেল।

“লোকটা কে ছিল?”

হরিপদবাবু ধীরে বললেন, “তার পরিচয় এখনও নিশ্চিত হয়নি। কিন্তু তার পকেটে একটা ছবি পাওয়া গেছে। ছবিতে তোমার বাবা, তোমার মা, আর দুই শিশুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন মহিলা।”

“কোন মহিলা?”

“তোমার মায়ের মতো দেখতে।”

মেঘলা স্তব্ধ হয়ে গেল।

হরিপদবাবু আরও বললেন, “আর ছবির পেছনে লেখা ছিল—‘সৌরভের মা এখনও বেঁচে আছে।’”


মেঘলা বাড়ি পৌঁছে দেখল, উঠোনে পুলিশের গাড়ি। কয়েকজন প্রতিবেশী বাইরে দাঁড়িয়ে। ঘরের ভেতর থেকে মায়ের কান্নার শব্দ আসছে।

সে ছুটে ঢুকল।

সুপর্ণা বিছানায় বসে আছেন। তাঁর সামনে একটি পুরোনো ছবি। ছবির মহিলাকে দেখেই মেঘলা বুঝল, হরিপদবাবু মিথ্যে বলেননি। মহিলার মুখের সঙ্গে তার মায়ের আশ্চর্য মিল।

“মা, উনি কে?”

সুপর্ণা মুখ তুললেন।

“আমার দিদি। সুনন্দা।”

“তোমার তো কোনো দিদি নেই বলে জানতাম!”

“আমরা বহু বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম। আমার বিয়ের আগে ও বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। অনির্বাণের সঙ্গে ওর সম্পর্ক ছিল। সৌরভ ওরই ছেলে।”

মেঘলা ছবিটা হাতে নিল।

“তাহলে সৌরভের মা মারা যাননি?”

সুপর্ণা মাথা নাড়লেন।

“না। সে বেঁচে ছিল। কিন্তু নিজের ছেলেকে ফিরিয়ে নেওয়ার সাহস তার ছিল না।”

“কেন?”

সুপর্ণার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“কারণ অনির্বাণ তাকে হুমকি দিয়েছিল। সে যদি কাউকে সত্যি বলে, তবে তার ছেলেকে আর কখনও দেখতে পাবে না। সুনন্দা ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আর আমরা সৌরভকে নিজের বাড়িতে রেখেছিলাম।”

মেঘলা বলল, “তাহলে তুমি তাকে অরিন্দম বলে ডাকতে শুরু করলে কেন?”

“আগুনের পর সবাই যখন ধরে নিল, অরিন্দম মারা গেছে, তখন অনির্বাণ বলল, সৌরভকে অরিন্দমের পরিচয়ে বড় করতে হবে। এতে সম্পত্তির বিরোধ মিটে যাবে, আর তার ছেলেও আমাদের বাড়িতে নিরাপদ থাকবে। আমি রাজি হইনি। কিন্তু তোমার বাবা বলেছিলেন, এতে অন্তত একটা শিশুকে বাঁচানো যাবে।”

“আর আমার আসল দাদা?”

সুপর্ণা মুখ ঢেকে কাঁদলেন।

“তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু অনির্বাণের লোকেরা আমাকে জানিয়েছিল, সে যদি ফিরে আসে, সৌরভকে মেরে ফেলা হবে। আমি একদিকে নিজের সন্তানকে হারিয়েছিলাম, অন্যদিকে আরেকটি শিশুর জীবনও আমার হাতে আটকে ছিল। আমি ভেবেছিলাম, সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“কিন্তু কিছুই ঠিক হয়নি, মা।”

“জানি।”

“বাবা কেন এত বছর পরে সত্যি প্রকাশ করতে চাইলেন?”

সুপর্ণা এবার মেঘলার দিকে তাকালেন।

“কারণ তিনি জানতে পেরেছিলেন, অরিন্দম ফিরে আসতে চাইছে। আর সুনন্দাও তাকে খুঁজছে। তোর বাবা ঠিক করেছিলেন, এবার সবাইকে একসঙ্গে বসিয়ে সব বলবেন। কিন্তু তার আগেই তিনি মারা গেলেন।”

মেঘলা চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল, “বাবার মৃত্যু কি স্বাভাবিক ছিল?”

সুপর্ণা উত্তর দিলেন না।

সেই নীরবতাই যথেষ্ট ছিল।


সেদিন রাতেই মেঘলা নীলকুঠিতে ফিরে গেল।

অভীক সেখানে নেই। ঘরটা খালি। টেবিলের ওপর শুধু একটি চিঠি পড়ে আছে।

‘মেঘলা,

যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তাহলে বুঝবে, আমি আবার চলে গেছি। তোমাকে না জানিয়ে যাওয়ার জন্য ক্ষমা চাইছি।

আমার নাম অরিন্দম। এই নামটা আমার জন্মের, কিন্তু এত বছর ধরে আমি অভীক নামেই বেঁচে আছি। এখন কোন নামটা আমার, তা আমি নিজেও জানি না।

তোমার বাবার মৃত্যুর আগে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, সব সত্যি প্রকাশ করবেন। আমি তাঁকে বাধা দিয়েছিলাম, কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম, সৌরভের জীবন আবার বিপন্ন হবে।

সেই রাতে আমি তাঁকে শেষবারের মতো দেখেছিলাম। তিনি আমাকে একটা খাম দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যদি তাঁর কিছু হয়, সেটা তোমার হাতে তুলে দিতে।

আমি খামটা লুকিয়ে রেখেছি। কারণ তাতে এমন একজনের নাম আছে, যে এখনও আমাদের কাছেই রয়েছে।

আমি চাইনি, তোমার জীবনেও আমার মতো অন্ধকার নেমে আসুক।

কিন্তু এখন আর সত্যি লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

তুমি আমাকে খুঁজো না। আমি নিজেই তোমার কাছে ফিরব।

তোমার দাদা, অরিন্দম।’

চিঠির নিচে একটি ঠিকানা লেখা ছিল।

মালদার বাইরে, গাজোলের কাছে একটি ছোট্ট গ্রাম। সেখানে একটি পুরোনো বাড়ির নাম—‘শান্তিনিকেতন’।

মেঘলা সেই রাতেই সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।


ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

গ্রামটা ছোট। সরু রাস্তা, দুপাশে ধানখেত, দূরে তালগাছের সারি। ঠিকানার বাড়িটা গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে। দরজায় তালা ঝুলছে।

মেঘলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকল, “অরিন্দমদা!”

কোনো উত্তর নেই।

সে আবার ডাকল।

“দাদা, আমি মেঘলা। আমি সব জেনে গেছি।”

ভেতর থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

দরজা খুলে গেল।

সামনে দাঁড়িয়ে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা। চুলে পাক ধরেছে, চোখের নিচে গভীর কালি। কিন্তু মুখটা দেখে মেঘলার মনে হলো, যেন নিজের মায়ের আরেকটি প্রতিচ্ছবি।

মহিলা তাকে দেখে কেঁপে উঠলেন।

“তুমি মেঘলা?”

“আপনি সুনন্দা?”

মহিলা মাথা নাড়লেন।

“অরিন্দম কোথায়?”

সুনন্দা চোখ নামিয়ে বললেন, “সে এখানে নেই। তবে যাওয়ার আগে একটা কথা বলে গেছে। তুমি এলে যেন তোমাকে শেষ খামটা দিই।”

তিনি ঘরের ভেতর থেকে একটি সাদা খাম নিয়ে এলেন।

খামের ওপরে বাবার হাতের লেখা।

‘মেঘলার জন্য—শেষ সত্যি।’

মেঘলা খামটা খুলল।

ভেতরে ছিল একটি চিঠি এবং একটি পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং।

সংবাদপত্রের শিরোনাম—

‘১৯৯৮ সালের অগ্নিকাণ্ডে অজ্ঞাতপরিচয় শিশুর মৃত্যু, নিখোঁজ আরেক শিশু।’

নিচে একটি ছোট্ট খবর। স্থানীয় একটি বাড়িতে আগুন লেগে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। মৃত শিশুটির পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। পরিবারের এক সদস্য অরিন্দম রায় নিখোঁজ বলে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল, কিন্তু কয়েক মাস পর সেই অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়।

মেঘলা চিঠিটা পড়তে শুরু করল।

‘মেঘলা,

এবার আর কোনো কথা লুকোব না।

১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্টের রাতে বাড়িতে আগুন লাগার আগে আমি অনির্বাণকে বাড়ির পেছনের ঘরে দেখেছিলাম। সে কিছু কাগজ পুড়িয়ে ফেলছিল। আমাকে দেখে সে পালিয়ে যায়।

সেই সময় বাড়িতে তিনটি শিশু ছিল।

তোমার দাদা অরিন্দম। অনির্বাণের ছেলে সৌরভ। আর সুনন্দার পরিচিত এক দরিদ্র পরিবারের শিশু, যাকে সেদিন তোমার মা সাময়িকভাবে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

আগুনের পরে সেই শিশুটির দেহ পাওয়া যায়। তার মুখ চেনার উপায় ছিল না। অরিন্দম নিখোঁজ, সৌরভ বেঁচে আছে—এই তথ্যের ভিত্তিতে সবাই ধরে নিয়েছিল, মৃত শিশুটি অরিন্দম।

কিন্তু আমি জানতাম, মৃত শিশুটি অরিন্দম নয়। তার পোশাক অরিন্দমের ছিল। আমি সন্দেহ করেছিলাম, অনির্বাণ ইচ্ছে করেই পোশাক বদলে দিয়েছে, যাতে অরিন্দমকে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয় এবং সৌরভকে তার পরিচয়ে বড় করা যায়।

আমি পুলিশকে সত্যি বলিনি। কারণ অনির্বাণ আমাকে জানিয়েছিল, সে আমার পরিবারকে শেষ করে দেবে। আমি ভয় পেয়েছিলাম।

এই ভয়ের মধ্যেই আমি সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছিলাম।

আমি আমার ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার বদলে তাকে মৃত বলে মেনে নিয়েছিলাম।

বছর পেরিয়ে যখন জানতে পারলাম, অরিন্দম বেঁচে আছে, তখন তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ততদিনে সে নিজের জীবন গড়ে ফেলেছে। তার নাম বদলে গেছে, তার অতীত ভেঙে গেছে।

আমি তাকে জোর করে ফিরিয়ে আনতে চাইনি।

আমি শুধু চেয়েছিলাম, একদিন সে নিজে থেকে ফিরে এসে তার বোনকে চিনুক।

মেঘলা, তোমার কাছে আমার শেষ অনুরোধ—অরিন্দমকে তার নিজের পরিচয় ফিরিয়ে দিস। আর সৌরভকে মনে করিয়ে দিস, সে কোনো অপরাধ করেনি। সে শুধু বড়দের ভুলের মধ্যে জন্মেছিল।

আর যে মানুষটা এত বছর ধরে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে, সে এখনও বেঁচে আছে।

তার নাম অনির্বাণ রায়।

গত রাতের যে মানুষটিকে তোমরা মৃত ভেবেছ, সে অনির্বাণ নয়। সে ছিল আমার পুরোনো সহকর্মী, যে আমাকে সাহায্য করছিল। অনির্বাণ এখনও বাইরে আছে। সে জানে, শেষ খামটা তোমার হাতে পৌঁছেছে।

সাবধানে থাকিস, মা।

তোর বাবা, অনিরুদ্ধ।’

মেঘলা চিঠিটা নামিয়ে রাখল।

তার মাথার ভেতরে এতদিনের সব প্রশ্ন একসঙ্গে ঘুরতে লাগল।

অরিন্দম বেঁচে আছে। সৌরভও বেঁচে আছে। মৃত শিশুটির পরিচয় অজানা। আর অনির্বাণ এখনও কোথাও লুকিয়ে আছে।

কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।

বাবা কি সত্যিই স্বাভাবিকভাবে মারা গিয়েছিলেন?

সুনন্দা তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগের রাতে আমাকে ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন, অনির্বাণকে তিনি চিনে ফেলেছেন। তারপর ফোন কেটে যায়। আর কোনোদিন তাঁর সঙ্গে কথা হয়নি।”

মেঘলা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“আমি অনির্বাণকে খুঁজে বের করব।”

সুনন্দা তার হাত ধরে বললেন, “তুমি একা পারবে না।”

“আমি একা নই। আমার দাদা আছে।”

ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে একটি গাড়ি এসে থামল।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে দেখে মেঘলার নিঃশ্বাস আটকে গেল।

সাদা চুল, কুঁচকে যাওয়া মুখ, হাতে লাঠি। কিন্তু চোখ দুটো এখনও ধারালো।

লোকটি হাসল।

“অবশেষে শেষ খামটা খুলেছ, মেঘলা।”

মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি অনির্বাণ রায়?”

লোকটি মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। আর আমি তোমার বাবাকে খুন করিনি।”

“তাহলে কে করেছে?”

অনির্বাণের হাসি মিলিয়ে গেল।

“যে মানুষটাকে তুমি এতক্ষণ তোমার দাদা বলে খুঁজছ, সে-ই তোমার বাবার মৃত্যুর আসল কারণ জানে।”

“অরিন্দমদা কোথায়?”

অনির্বাণ উত্তর দেওয়ার আগেই পেছনের ঘর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“আমি এখানে।”

মেঘলা ঘুরে দাঁড়াল।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অরিন্দম। মুখে ক্লান্তি, চোখে বহু বছরের জমে থাকা যন্ত্রণা। তার পাশে আরেকজন—সৌরভ।

দুই ভাইয়ের মুখ একই রকম, অথচ তাদের চোখে আলাদা জীবন।

অরিন্দম ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মেঘলার সামনে দাঁড়াল।

“বোন, এবার সব বলার সময় হয়েছে।”

অনির্বাণ লাঠির ওপর ভর দিয়ে হাসল।

“তাহলে বলো, অরিন্দম। তোমার বাবাকে শেষবার কে দেখেছিল?”

অরিন্দম মেঘলার দিকে তাকাল।

তারপর এমন একটি কথা বলল, যা শুনে মেঘলার সমস্ত সন্দেহ নতুন করে জেগে উঠল।

“বাবাকে শেষবার দেখেছিলাম আমি। কিন্তু তাঁকে হত্যা করার জন্য যে বিষ দেওয়া হয়েছিল, সেটা আমি দিইনি।”

সৌরভ মাথা নিচু করে বলল, “বিষটা আমি দিয়েছিলাম।”

ঘরের মধ্যে নেমে এল নিস্তব্ধতা।

মেঘলা অবিশ্বাসের চোখে সৌরভের দিকে তাকিয়ে রইল।

“কেন?”

সৌরভের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“কারণ আমি ভেবেছিলাম, তিনি আমাদের সবাইকে পুলিশের হাতে তুলে দেবেন।”

অরিন্দম চিৎকার করে উঠল, “চুপ কর! তুই জানিস না, কী বলছিস!”

কিন্তু সৌরভ মাথা নাড়ল।

“আমি জানি। আমি বাবাকে বিষ দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা মারার জন্য নয়। তাঁকে থামানোর জন্য।”

মেঘলা পেছনে সরে গেল।

একদিকে তার হারিয়ে যাওয়া দাদা, অন্যদিকে সেই ভাই, যে এত বছর তার দাদার পরিচয়ে বড় হয়েছে। আর মাঝখানে বাবার মৃত্যু, যার সত্যি এখনও পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি।

অনির্বাণ ধীরে ধীরে বলল, “এবার বুঝতে পারছ, মেঘলা? এই পরিবারের প্রত্যেকের হাতে কিছু না কিছু অপরাধ আছে। কেউ মিথ্যে বলেছে, কেউ পরিচয় চুরি করেছে, কেউ সত্যি লুকিয়েছে। আর তোমার বাবা—তিনি সবাইকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই শেষ হয়ে গেছেন।”

মেঘলা চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“না। এখনও একটা সত্যি বাকি আছে।”

সে বাবার শেষ চিঠিটা তুলে ধরল।

“আগুনে যে শিশুটি মারা গিয়েছিল, তার পরিচয় কেউ জানে না। কিন্তু আমার বাবা লিখেছেন, তিনি জানতেন শিশুটি অরিন্দম নয়। তাহলে সেই শিশুটি কে ছিল?”

অনির্বাণের মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে গেল।

সুনন্দা কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “আমি জানি।”

সবাই তাঁর দিকে তাকাল।

তিনি চোখ বন্ধ করে বললেন, “সেই শিশুটি ছিল আমার মেয়ে।”

মেঘলা স্তব্ধ।

“আপনার মেয়ে?”

সুনন্দা মাথা নাড়লেন।

“আমার আরেকটি মেয়ে ছিল। জন্মের পর আমি তাকে অন্য এক পরিবারের কাছে রেখে দিয়েছিলাম, কারণ অনির্বাণ আমাকে তাকে নিজের বলে স্বীকার করতে দেয়নি। আগুনের রাতে সে কীভাবে তোমাদের বাড়িতে এসেছিল, আমি জানি না। কিন্তু আমি জানতাম, সে নিখোঁজ।”

ঘরের মধ্যে কেউ কথা বলল না।

সুনন্দা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “এত বছর আমি তাকে খুঁজেছি। কিন্তু কেউ আমাকে বলেনি, সে ওই আগুনে মারা গিয়েছিল।”

মেঘলার চোখে জল এসে গেল।

এই পুরো গল্পে সবাই কাউকে না কাউকে হারিয়েছে। কেউ নিজের নাম, কেউ নিজের সন্তান, কেউ নিজের শৈশব, কেউ নিজের সত্যি।

কিন্তু অনির্বাণ হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।

“এবার যথেষ্ট হয়েছে। তোমরা কেউই জানো না, আসলে কী ঘটেছিল।”

সে পকেট থেকে একটি পুরোনো চিঠি বের করল।

“এই চিঠিটা তোমার বাবা লিখেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনও পাঠাননি। এতে লেখা আছে, আগুনের রাতে শিশুটিকে কে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিল।”

মেঘলা হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিতে গেল।

অনির্বাণ চিঠিটা সরিয়ে নিল।

“চিঠিটা পড়ার আগে তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তুমি কি তোমার দাদাকে বাঁচাবে, নাকি সত্যিটাকে?”

মেঘলা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “সত্যি কাউকে বাঁচানোর জন্য বদলানো যায় না।”

অনির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর চিঠিটা মেঘলার হাতে দিল।

চিঠির প্রথম লাইন পড়েই মেঘলার হাত কেঁপে উঠল।

‘সেই রাতে শিশুটিকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিল সুপর্ণা।’

মেঘলা ধীরে ধীরে মুখ তুলল।

“মা?”

সুনন্দা কেঁদে ফেললেন। সৌরভ পেছনে সরে গেল। অরিন্দম চোখ বন্ধ করল।

অনির্বাণ ফিসফিস করে বলল, “তোমার মা জানতেন, কোন শিশুটি আগুনে মারা যাবে। তিনি জানতেন, কাকে বাঁচাতে হলে কাকে ছেড়ে দিতে হবে।”

মেঘলার মাথা ঘুরে উঠল।

“না। আমার মা এমন করতে পারেন না।”

অরিন্দম ধীরে বলল, “মেঘলা, তুমি পুরো চিঠিটা পড়ো।”

চিঠির পরের অংশে লেখা ছিল—

‘সুপর্ণা শিশুটিকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিল, কারণ সে জানত, অনির্বাণের লোকেরা তাকে খুঁজছে। সে শিশুটিকে বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই সময় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সে একজনকে নিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল, অন্যজনকে নয়।

আমি তাকে দোষ দিইনি। কারণ সে যাকে বাঁচিয়েছিল, সে ছিল আমার ছেলে।’

মেঘলা চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।

তার মা কি সত্যিই একজন শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যজনকে হারিয়েছিলেন? নাকি এর আড়ালে আরও কোনো সত্যি আছে?

অনির্বাণ দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

“এখনও সব শেষ হয়নি। তোমার মা বেঁচে আছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করো, সেই রাতে তিনি কাকে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন।”

মেঘলা আর তাকে থামাল না।

অনির্বাণ চলে যাওয়ার পর ঘরে শুধু কান্নার শব্দ।

অরিন্দম মেঘলার কাঁধে হাত রাখল।

“চল, বাড়ি যাই। মায়ের মুখোমুখি হতে হবে।”


সন্ধ্যায় মেঘলা বাড়ি ফিরল অরিন্দম ও সৌরভকে সঙ্গে নিয়ে।

সুপর্ণা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। দুই ছেলেকে একসঙ্গে দেখে তাঁর চোখে জল এসে গেল। তিনি প্রথমে অরিন্দমের দিকে এগিয়ে গেলেন, তারপর সৌরভের দিকে।

“তোরা দুজনেই ফিরে এসেছিস?”

অরিন্দম মায়ের হাত ধরল।

“মা, আর কোনো মিথ্যে নয়। সেই রাতে কী হয়েছিল?”

সুপর্ণা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর সবাইকে বসতে বললেন।

“সেই রাতে আমি দুটো শিশুকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। আগুন লাগার পর আমি প্রথমে অরিন্দমকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। তাকে পাইনি। তারপর সৌরভকে কোলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। আমি ভেবেছিলাম, অরিন্দম আগেই বেরিয়ে গেছে।”

“তাহলে মৃত শিশুটি কে ছিল?” মেঘলা জিজ্ঞাসা করল।

সুপর্ণা চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি জানতাম না। পরদিন হাসপাতালে যে শিশুটিকে দেখানো হয়েছিল, তার মুখ চিনতে পারিনি। কিন্তু অনির্বাণ বলেছিল, সে অরিন্দম। আমি বিশ্বাস করতে চাইনি। তবু সবাই যখন একই কথা বলল, আমি ভেঙে পড়েছিলাম।”

“তুমি আমাদের কিছু বলোনি কেন?”

“কারণ আমি ভেবেছিলাম, সত্যি বললে সৌরভকে হারাব। সে তখন ছোট ছিল। তার কোনো দোষ ছিল না। আমি তাকে নিজের ছেলের মতো ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু প্রতিদিন তাকে অরিন্দম বলে ডাকতে গিয়ে নিজের ছেলের মুখ ভুলে যাওয়ার ভয় পেতাম।”

অরিন্দম মায়ের পাশে বসে পড়ল।

“মা, তুমি আমাকে ভুলে যাওনি।”

সুপর্ণা তার মুখ ছুঁয়ে বললেন, “না, বাবা। আমি তোকে কোনোদিন ভুলিনি।”

সৌরভও এগিয়ে এল।

“মা, আমি জানতাম না। আমি ভেবেছিলাম, এই বাড়িতে আমার জন্মের অধিকার আছে। কিন্তু আমি কখনও বুঝিনি, আমার জন্য অন্য একজনের জীবন থেমে গিয়েছিল।”

সুপর্ণা তাকে জড়িয়ে ধরলেন।

“তুইও আমার ছেলে। পরিচয় বদলে গেলেই ভালোবাসা বদলে যায় না।”

মেঘলা মায়ের হাত ধরল।

“মা, বাবার মৃত্যুর জন্য কে দায়ী?”

সুপর্ণা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“সেই উত্তরটা আমি জানি না। তবে মৃত্যুর আগের রাতে তোর বাবা আমাকে বলেছিলেন, তিনি এমন কিছু প্রমাণ পেয়েছেন, যা দিয়ে অনির্বাণের বিরুদ্ধে পুরোনো অপরাধের মামলা খোলা যাবে। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, অনির্বাণ তাঁকে থামিয়ে দেবে।”

“তাহলে সৌরভ যে বলল, সে বাবাকে বিষ দিয়েছিল?”

সৌরভ কেঁদে ফেলল।

“আমি বাবাকে একটা ওষুধ দিয়েছিলাম। অনির্বাণ বলেছিল, তাতে তিনি ঘুমিয়ে পড়বেন, আর আমরা তাঁর ঘর থেকে কাগজগুলো নিয়ে আসতে পারব। আমি জানতাম না, ওষুধে বিষ মেশানো ছিল।”

অরিন্দম রাগে কেঁপে উঠল।

“তুই সেটা আগে বলিসনি কেন?”

“কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, বাবাকে আমি মেরেছি।”

মেঘলা বুঝতে পারল, সৌরভ অপরাধবোধে এতদিন নিজেকে দোষী ভাবছিল। কিন্তু সত্যি এখনও প্রমাণিত নয়। বাবার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে হলে পুলিশি তদন্তের প্রয়োজন।

সে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করল। বাবার চিঠি, ডায়েরি, লকারের নথি—সব তাদের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

কিন্তু তার আগে সে বাবার শেষ চিঠির একেবারে নিচে ছোট্ট করে লেখা একটি লাইন দেখতে পেল, যা আগে চোখে পড়েনি।

‘মেঘলা, তোর জন্মের আগের সত্যিটাও একদিন জানতে হবে। তুই এই পরিবারের শুধু সাক্ষী নোস। তুই সেই শিশুটির সঙ্গে জড়িয়ে আছিস, যাকে সবাই ভুলে গেছে।’

মেঘলা স্থির হয়ে গেল।

তার জন্মের আগের সত্যি?

সেই মৃত শিশুটির সঙ্গে তার কী সম্পর্ক?

ঠিক তখনই বাড়ির ফোন বেজে উঠল।

মেঘলা রিসিভার তুলতেই ওপাশ থেকে অচেনা এক মহিলা বললেন, “আমি তোমার বাবার পুরোনো আইনজীবী। তোমার জন্য একটা নথি আছে। সেটা না দেখলে তোমার পরিবারের গল্প কখনও সম্পূর্ণ হবে না।”

“আপনি কে?”

“আমার নাম মধুমিতা সেন। আর তোমার জন্মের সময় যে নথিটা তৈরি হয়েছিল, তাতে তোমার বাবার স্বাক্ষর আছে।”

মেঘলার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

“কী লেখা আছে সেই নথিতে?”

মহিলা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন—

“তোমার জন্মের শংসাপত্রে যে মায়ের নাম লেখা আছে, তিনি সুপর্ণা রায় নন।”

কল কেটে গেল।

মেঘলা ধীরে ধীরে মায়ের দিকে তাকাল।

সুপর্ণা তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে সব বুঝে গেলেন। তাঁর চোখে আবার সেই বহু বছরের পুরোনো আতঙ্ক ফিরে এল।

“মেঘলা, তুই যা শুনেছিস, তার সবটাই সত্যি নয়।”

মেঘলা ফিসফিস করে বলল, “তাহলে আমার মা কে?”

সুপর্ণা কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু নিজের বুকের কাছে মেয়েকে টেনে নিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

আর মেঘলা বুঝল, তার বাবার রেখে যাওয়া শেষ খামটি খুলে গেলেও, তার নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য এখনও অন্ধকারেই রয়ে গেছে।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *