মাধুরী মেঝেতে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো রেলওয়ে কোয়ার্টারের ভেতরটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে আছে অনামিকার চিৎকার।
“দিদি, পালাও!”
অনন্যা প্রথমে বুঝতেই পারেনি কী করবে। মাধুরীর শরীরের পাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে আসছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির হাতে বন্দুক। তার চোখে এমন এক শীতলতা, যেন মানুষের মৃত্যু তার কাছে নিত্যদিনের ঘটনা।
লোকটি আবার বন্দুক তুলতেই অনন্যা পাশের টেবিলটা সজোরে ঠেলে দিল। টেবিলটি লোকটির হাঁটুতে আঘাত করল। গুলির শব্দে ঘর কেঁপে উঠল। জানলার কাচ ভেঙে ছিটকে পড়ল মেঝেতে।
এই সুযোগে অনামিকা দৌড়ে এসে অনন্যার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল পেছনের দরজা দিয়ে।
“মাধুরী মাসি?” অনন্যা হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল।
“এখন থামলে তুমিও মরবে!” অনামিকা বলল। “আমাদের বাঁচতে হলে আজ সব সত্যি জানতে হবে।”
দু’জনে অন্ধকার গলি পেরিয়ে পরিত্যক্ত রেললাইন ধরে ছুটতে লাগল। কিছুটা দূরে এসে অনামিকা একটি বন্ধ রেলগুদামের দরজা খুলল। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার পর দু’জনেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।
অনন্যার বুকের ভেতর তখনও ধুকপুক করছে।
“তুমি এত কিছু জানো, অথচ আমাকে বলোনি কেন?”
অনামিকা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কারণ আমিও সব জানতাম না। শুধু জানতাম, আমাদের জন্মের কাগজে মিথ্যে লেখা আছে। আর কেউ একজন সেই মিথ্যেকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের দু’জনকে শেষ করে দিতে চাইছে।”
“তুমি বলেছিলে, আমরা যমজ নই। আমাদের মধ্যে একজনই আসল অনামিকা। তার মানে কী?”
অনামিকা মুখ তুলে তাকাল।
“আমার নাম অনামিকা নয়। অন্তত যে পরিচয়ে আমাকে বড় করা হয়েছে, সেই পরিচয়টা আমার নয়। আমার কাছে যে জন্মের কাগজ আছে, তাতে লেখা আছে আমি অনামিকা সেন। কিন্তু আমার পালক বাবা-মা আমাকে ছোটবেলা থেকে অন্য নামে চিনেছেন। মৃত্যুর খবর পড়ার পর আমি নিজের অতীত খুঁজতে শুরু করি। তখনই জানতে পারি, আমার পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল।”
“তাহলে তোমার আসল নাম কী?”
“সেটাই তো জানি না, দিদি।”
অনন্যা তার দিকে তাকিয়ে রইল। একই মুখ, একই চোখ, একই গলার স্বর—তবু তাদের জীবন দুটো সম্পূর্ণ আলাদা পথে গিয়েছে।
অনামিকা ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো খাম বের করল। খামের ভেতরে ছিল একটি বিবর্ণ ছবি। ছবিতে হাসপাতালের বিছানায় এক তরুণী শুয়ে আছেন। তাঁর কোলে একটি নবজাতক। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন আরেকজন মহিলা, যাঁর মুখ অনন্যার কাছে অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হলো।
ছবির পেছনে লেখা—‘১৫ নভেম্বর, ১৯৯৮। দুই শিশুকে আলাদা করার আগে।’
অনন্যা ছবিটি হাতে নিয়ে কেঁপে উঠল।
“এই মহিলাটি কে?”
“জানি না। তবে ছবির সঙ্গে পাওয়া চিঠিতে একটি নাম আছে—সুবর্ণা।”
অনন্যা ফিসফিস করে বলল, “সুবর্ণা কে?”
অনামিকা উত্তর দেওয়ার আগেই গুদামের বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। দু’জনেই নিঃশ্বাস বন্ধ করে রইল। কেউ একজন দরজার হাতল ঘোরানোর চেষ্টা করল। তারপর বাইরে থেকে পরিচিত একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
“অনন্যা! অনামিকা! দরজা খোলো। আমি সৌম্যদীপ।”
অনন্যা দরজার কাছে গিয়ে থামল। “তুমি একা এসেছ?”
“হ্যাঁ। আমার কাছে এমন কিছু আছে, যা তোমাদের জানা দরকার।”
অনামিকা ফিসফিস করে বলল, “বিশ্বাস কোরো না। ও সাংবাদিক। খবরের জন্য মানুষ অনেক কিছু করতে পারে।”
বাইরে থেকে সৌম্যদীপ বলল, “তোমরা যদি আমাকে বিশ্বাস না করো, অন্তত এই নামটা শোনো—অরিন্দম রায়।”
নামটা শুনেই অনামিকা চমকে উঠল।
“অরিন্দম রায়! এই নামটা আমি মাধুরী মাসির মুখে শুনেছি।”
অনন্যা দরজা খুলল। সৌম্যদীপ ভিজে একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে একটি ফাইল এবং ছোট একটি পেনড্রাইভ।
“মাধুরী কোথায়?” সে জিজ্ঞেস করল।
“ওকে গুলি করা হয়েছে,” অনন্যা বলল।
সৌম্যদীপের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “আমি দেরি করে ফেলেছি।”
“তুমি অরিন্দম রায়কে চেনো?”
“চিনি। তিনি ছিলেন তোমাদের বাবা অরুণাভ সেনের ব্যবসায়িক অংশীদার এবং সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু অরুণাভর মৃত্যুর পর তিনিই সমস্ত সম্পত্তির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পরে জানা যায়, মৃত্যুর আগে অরুণাভ তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতির প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।”
“তাহলে বাবাকে তিনিই খুন করেছিলেন?” অনন্যার গলায় রাগ জমে উঠল।
“আমার কাছে থাকা নথি তাই ইঙ্গিত করছে। কিন্তু শুধু সম্পত্তির জন্য খুন—ব্যাপারটা তার চেয়েও গভীর। অরুণাভ এমন একটি সত্য জেনে গিয়েছিলেন, যা প্রকাশ হলে অরিন্দমের জীবন শেষ হয়ে যেত।”
সৌম্যদীপ পেনড্রাইভটি অনন্যার হাতে দিল।
“এতে অরুণাভ সেনের শেষ ভিডিও রেকর্ডিং রয়েছে। আমি একটি পুরোনো কম্পিউটার থেকে উদ্ধার করেছি। ভিডিওটি দেখার পর তোমরা বুঝতে পারবে, কেন তোমাদের পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল।”
গুদামের এক কোণে পুরোনো মনিটর ছিল। সৌম্যদীপ সেটিকে চালু করে পেনড্রাইভ লাগাল। কিছুক্ষণের মধ্যে পর্দায় ভেসে উঠল এক ক্লান্ত মানুষের মুখ।
অরুণাভ সেন।
অনন্যা ছোটবেলায় বাবার মৃত্যুর কথা শুনেছিল, কিন্তু তাঁর শেষ মুহূর্তের কোনো ছবি কখনও দেখেনি। পর্দার মানুষটির চোখে ভয় ছিল, ক্লান্তি ছিল, তবু দৃঢ়তা ছিল।
অরুণাভ বলতে শুরু করলেন—
“যদি এই রেকর্ডিং কেউ দেখে, তবে বুঝতে হবে আমি হয়তো আর বেঁচে নেই। আমার নাম অরুণাভ সেন। আমি এমন একটি অপরাধের সাক্ষী, যার অংশীদার হতে বাধ্য হয়েছিলাম। সাতাশ বছর আগে, ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাসে, কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে দু’টি শিশু জন্মেছিল। তাদের মধ্যে একজনের মা ছিলেন সুবর্ণা দত্ত। অন্য শিশুটির জন্মপরিচয় হাসপাতালের নথিতে ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়েছিল।”
পর্দায় কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্ধকার নেমে এল। তারপর অরুণাভ আবার কথা বলতে শুরু করলেন।
“সুবর্ণা ছিলেন এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। তাঁর স্বামী দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর পাশে দাঁড়ানোর কেউ ছিল না। সেই সময় হাসপাতালের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কয়েকজন মানুষ তাঁর অসহায়তার সুযোগ নেয়। শিশুটিকে দত্তক দেওয়ার নামে তাঁর কাছ থেকে জাল কাগজে সই করিয়ে নেওয়া হয়। অন্যদিকে, আরেকটি শিশুর জন্মপরিচয় নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছিল। দুই শিশুর কাগজপত্র অদলবদল করে তাদের আলাদা পরিবারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।”
অনন্যা স্তব্ধ হয়ে গেল।
ভিডিওতে অরুণাভের কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে উঠল।
“আমি তখন অরিন্দম রায়ের সঙ্গে হাসপাতালের একটি আর্থিক প্রকল্পে যুক্ত ছিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, সবটাই আইন মেনে দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা। পরে বুঝতে পারি, শিশুর পরিচয় বদলানো হয়েছে, নথি জাল করা হয়েছে, আর একটি মাকে তাঁর সন্তান থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমি প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অরিন্দম আমাকে হুমকি দেয়। সে জানত, হাসপাতালের দুর্নীতির কাগজে আমার স্বাক্ষরও রয়েছে।”
অনামিকা অনন্যার হাত শক্ত করে ধরল।
অরুণাভ বলতে থাকলেন, “আমি পরে একটি শিশুকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসি। আমার স্ত্রী মৃণালিনী তখন সন্তান হারানোর শোকে ভেঙে পড়েছিলেন। আমাদের একটি সন্তান জন্মের পরপরই মারা গিয়েছিল। আমি তাঁকে সত্যিটা জানাতে পারিনি। শিশুটিকে আমাদের মেয়ে হিসেবে বড় করার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু অন্য শিশুটির কী হয়েছিল, তা আমি নিশ্চিতভাবে জানতাম না। শুধু জানতাম, সে অন্য একটি পরিবারের কাছে বড় হচ্ছে।”
অনন্যার চোখে জল এসে গেল।
তাহলে মৃণালিনী তাঁর জন্মদাত্রী মা নন। কিন্তু যিনি তাঁকে বুকের মধ্যে আগলে বড় করেছেন, তিনি কি তবে শুধু অপরাধের অংশীদার?
ভিডিওতে অরুণাভ যেন সেই প্রশ্নের উত্তরই দিলেন।
“মৃণালিনী প্রথমে সব জানতেন না। পরে সত্যিটা জানতে পেরে তিনি ভেঙে পড়েন। তিনি শিশুটিকে ছেড়ে দিতে চাননি। আমি তাঁকে বোঝাতে পারিনি যে অন্য একজন মা তাঁর সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমরা ভুল করেছিলাম। ভেবেছিলাম, ভালোবাসা দিয়ে অপরাধ ঢেকে রাখা যাবে। কিন্তু মিথ্যে যত দিন বাঁচে, তত দিন আরও মানুষের জীবন নষ্ট করে।”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর তিনি বললেন, “আমার মৃত্যুর জন্য যদি আমাকে দোষী বলা হয়, তবে সেই বিচার মেনে নেব। কিন্তু আমার মেয়েদের বলছি—তোমরা কেউ কারও শত্রু নও। তোমাদের পরিচয় কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তোমাদের অপরাধ নয়।”
ভিডিওটি শেষ হয়ে গেল।
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। অনন্যা চোখ মুছল। অনামিকা মাথা নিচু করে বসে রইল।
“তাহলে সুবর্ণা আমাদের একজনের মা,” অনন্যা বলল।
“হ্যাঁ,” সৌম্যদীপ উত্তর দিল। “কিন্তু অন্য শিশুটির পরিচয় এখনও পরিষ্কার নয়। হাসপাতালের আসল নথি উদ্ধার না করলে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।”
“আর অরিন্দম রায়?”
সৌম্যদীপ ফাইল খুলল। “তিনি এখনও বেঁচে আছেন। বর্তমানে শহরের বাইরে থাকেন। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কলকাতায় তাঁর যাতায়াত বেড়েছে। তোমাদের খোঁজ পাওয়ার পর থেকেই।”
অনন্যার মনে পড়ল, অজ্ঞাত নম্বর থেকে আসা ফোন, পুরোনো ডাকবাংলো, মর্গের অন্ধকার, রেলওয়ে কোয়ার্টারে গুলির শব্দ—সবকিছু যেন একটি সুতোয় বাঁধা।
“তিনি আমাদের মেরে ফেলতে চান কেন?” সে জিজ্ঞেস করল।
সৌম্যদীপ ফাইলের শেষ পাতাটি সামনে ধরল। সেখানে হাসপাতালের পুরোনো হিসাবের একটি কপি ছিল। কয়েকটি নাম, কয়েকটি তারিখ, আর একটি স্বাক্ষর।
স্বাক্ষরটি অরিন্দম রায়ের।
“কারণ তোমরা দু’জন বেঁচে আছ, আর তোমাদের কাছে সত্যিটা পৌঁছে গেছে। তোমাদের অস্তিত্বই প্রমাণ করতে পারে যে তিনি শিশু পাচার, নথি জালিয়াতি এবং অরুণাভ সেনের হত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।”
অনন্যা উঠে দাঁড়াল।
“তাহলে এবার পালিয়ে লাভ নেই। সত্যিটা সামনে আনতেই হবে।”
সৌম্যদীপ মাথা নাড়ল। “কিন্তু তার আগে আমাদের সুবর্ণাকে খুঁজে বের করতে হবে। তিনিই একমাত্র মানুষ, যিনি প্রথম রাতের সত্যিটা বলতে পারবেন।”
পরদিন সকালেই তারা পুরোনো হাসপাতালের রেকর্ডঘরে পৌঁছল। হাসপাতালটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভবনের একাংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে, অন্য অংশে এখন সরকারি নথি সংরক্ষণ করা হয়।
সৌম্যদীপের এক পরিচিত কর্মচারীর সাহায্যে তারা ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাসের নথি খুঁজতে শুরু করল। ধুলো জমা রেজিস্টারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে অনন্যার আঙুল থেমে গেল একটি নামের ওপর।
সুবর্ণা দত্ত।
তারিখ: ১২ নভেম্বর, ১৯৯৮।
নবজাতক কন্যা।
তার পাশে লাল কালিতে লেখা—‘মৃত’।
অনন্যার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“এই তো আমার মৃত্যুর খবরের সঙ্গে সেই তারিখের যোগসূত্র,” সে বলল। “কিন্তু আমি তো ১২ নভেম্বর জন্মাইনি—আমার কাগজে জন্মতারিখ ১৫ নভেম্বর।”
সৌম্যদীপ রেজিস্টারের পরের পাতা খুলল। সেখানে একই দিনের আরেকটি এন্ট্রি ছিল। দ্বিতীয় শিশুটির নামের ঘর ফাঁকা। মা হিসেবে লেখা ছিল—‘পরিচয় অজ্ঞাত’। তিন দিন পরে সেই শিশুটিকে দত্তক দেওয়ার নথি তৈরি করা হয়েছিল।
অনামিকা ফিসফিস করে বলল, “তাহলে আমাদের একজনকে ১২ নভেম্বর মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। আরেকজনকে তিন দিন পরে অন্য পরিচয়ে পাঠানো হয়েছিল।”
“হ্যাঁ,” সৌম্যদীপ বলল। “কিন্তু কে কোন শিশু, সেটা এখনও নিশ্চিত নয়।”
ঠিক সেই সময় রেকর্ডঘরের দরজায় একজন বৃদ্ধা এসে দাঁড়ালেন। পরনে সাদা শাড়ি, হাতে লাঠি। মুখে বয়সের ছাপ থাকলেও চোখ দু’টি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।
“তোমরা কি সুবর্ণা দত্তকে খুঁজছ?” বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন।
তিনজন একসঙ্গে তাঁর দিকে তাকাল।
“আপনি তাঁকে চেনেন?” অনন্যা বলল।
“চিনি। আমি সেই হাসপাতালের নার্স ছিলাম। ওই রাতের অনেক কিছু নিজের চোখে দেখেছি। এত বছর চুপ করে ছিলাম, কারণ আমারও সন্তান ছিল।”
“আপনি কি জানেন, আমরা কে?” অনামিকা এগিয়ে এল।
বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তোমাদের একজনের জন্মের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। অন্য শিশুটিকে পরে এখানে আনা হয়। হাসপাতালের কাগজে যা লেখা আছে, তার সবটাই সত্যি নয়। সুবর্ণার সন্তান মারা যায়নি। তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল, যাতে তার ওপর অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়।”
অনন্যার চোখে জল জমল। “সুবর্ণা এখন কোথায়?”
বৃদ্ধা কাঁপা হাতে একটি ঠিকানা লেখা কাগজ এগিয়ে দিলেন।
“তিনি এখন নদিয়ার এক বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন। নিজের নামও অনেক বছর ধরে গোপন রেখেছেন। তোমরা যাও। তবে সাবধান—অরিন্দম রায় এখনও জানে না, আমি বেঁচে আছি।”
“আপনি কি আমাদের পরিচয় জানেন?” অনন্যা প্রশ্ন করল।
বৃদ্ধা কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“আমি শুধু জানি, তোমাদের দু’জনের মধ্যে একজন সুবর্ণার জন্মদেওয়া সন্তান। অন্যজনের পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল অন্য এক পরিবারের অপরাধ ঢাকতে। কিন্তু তোমাদের দু’জনকেই অন্যায়ের শিকার করা হয়েছে।”
বৃদ্ধার কথাগুলো যেন অনন্যার বুকের ভেতর পাথরের মতো জমে রইল।
সুবর্ণা—যিনি নিজের সন্তানকে মৃত ভেবে সাতাশ বছর কাটিয়েছেন।
আর সে—যে নিজের মৃত্যুর খবর পড়ে সত্যের খোঁজে নেমেছিল।
নদিয়ার বৃদ্ধাশ্রমে পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেল। ছোট্ট বাড়িটির সামনে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। বারান্দায় বসে একজন বৃদ্ধা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর চুল প্রায় সাদা, মুখে গভীর বিষণ্ণতা।
অনন্যা কাছে যেতেই বৃদ্ধা ধীরে ধীরে মুখ ফেরালেন।
“আপনি কি সুবর্ণা দত্ত?” অনন্যা জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধার হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল।
“কে তোমরা?”
অনামিকা ছবিটি তাঁর সামনে ধরল। ছবির তরুণীটিকে দেখে সুবর্ণার চোখ ভরে উঠল। তিনি কাঁপা হাতে ছবিটি তুলে বুকে চেপে ধরলেন।
“এ ছবি তোমরা কোথায় পেলে?”
“আমরা নিজেদের পরিচয় খুঁজছি,” অনন্যা বলল। “আপনার সন্তানকে ১২ নভেম্বর, ১৯৯৮ সালে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সে মারা যায়নি।”
সুবর্ণা যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললেন। অনেকক্ষণ পর ফিসফিস করে বললেন, “আমার মেয়ে বেঁচে আছে?”
অনন্যা তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
“আমরা জানি না, আমাদের মধ্যে কে আপনার মেয়ে। তাই আপনার কাছে এসেছি।”
সুবর্ণা দু’জনের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর কাঁপা হাতে অনন্যার বাঁ কাঁধের কাছে হাত বাড়ালেন। অনন্যার জামার ওপর দিয়ে আঙুল ছুঁয়ে গেল পুরোনো পোড়া দাগটিতে।
সুবর্ণার মুখ থেকে একটি চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
“এই দাগটা…”
অনন্যা স্তব্ধ হয়ে গেল। “আপনি কীভাবে জানলেন?”
সুবর্ণা চোখ বন্ধ করলেন।
“আমার মেয়ের জন্মের পর হাসপাতালের এক নার্সের হাত থেকে গরম বাতি পড়ে গিয়েছিল। তার বাঁ কাঁধে ছোট্ট একটা পোড়া দাগ হয়েছিল। আমি সেই দাগ নিজের চোখে দেখেছিলাম। তারপর আমাকে বলা হয়, আমার মেয়ে মারা গেছে।”
অনামিকা ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।
“তার মানে… অনন্যাই আপনার মেয়ে?”
সুবর্ণা কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়লেন।
“আমি নিশ্চিত হতে চাই। এত বছর ধরে মিথ্যে শুনেছি। আর কোনও ভুল করতে চাই না।”
সৌম্যদীপ বলল, “ডিএনএ পরীক্ষা করানো যেতে পারে।”
সুবর্ণা অনন্যার হাত দু’হাতে চেপে ধরলেন।
“আমি তোমাকে খুঁজেছি, মা। প্রথমে হাসপাতালের দরজায়, তারপর আদালতে। সবাই বলেছিল, আমার সন্তান মারা গেছে। আমার কাছে টাকা ছিল না, ক্ষমতা ছিল না। একদিন আমার স্বামীও চলে গেলেন। আমি একা হয়ে পড়লাম। তবু বিশ্বাস করতাম, আমার মেয়েটা কোথাও বেঁচে আছে।”
অনন্যা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে সুবর্ণাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। এতদিন যে মানুষটিকে সে চিনত না, তাঁর বুকের কাছে মাথা রাখতেই মনে হলো, জীবনের সমস্ত শূন্যতা এক মুহূর্তে কথা বলতে শুরু করেছে।
কিন্তু অনামিকা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে জল থাকলেও মুখে ছিল অদ্ভুত শূন্যতা।
সুবর্ণা তাকে কাছে ডাকলেন।
“তুমিও আমার মেয়ে না হলেও, আমার কাছে অপরিচিত নও। তোমাদের দু’জনের জীবন যারা নষ্ট করেছে, তাদের অপরাধ তোমাদের নয়।”
অনামিকা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সুবর্ণার হাত ধরল।
“আমি কি কখনও নিজের আসল নাম জানতে পারব?”
সুবর্ণা তার মাথায় হাত রাখলেন।
“অবশ্যই পারবে। পরিচয় শুধু জন্মের কাগজে লেখা থাকে না। সত্যি জানার অধিকার তোমারও আছে।”
সেই মুহূর্তে অনন্যা বুঝতে পারল, তাদের লড়াই শুধু নিজের পরিচয় ফিরে পাওয়ার নয়। এই লড়াই সেই মায়েরও, যাঁর কাছ থেকে সন্তান কেড়ে নেওয়া হয়েছিল; সেই মেয়েটিরও, যে নিজের নামের আড়ালে অন্যের জীবন বহন করেছে।
কিন্তু তাদের শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
বৃদ্ধাশ্রমের সামনে একটি কালো গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে এলেন ধূসর চুলের এক ব্যক্তি। পরনে দামি কোট, হাতে ছড়ি। তাঁর পেছনে দু’জন সশস্ত্র লোক।
সৌম্যদীপ জানলার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে ফিসফিস করল, “অরিন্দম রায়।”
অরিন্দম ধীরে ধীরে বারান্দায় উঠে এলেন। তাঁর চোখ প্রথমে সুবর্ণার দিকে, তারপর অনন্যা ও অনামিকার দিকে গেল।
“সাতাশ বছর আগের একটা ভুল নিয়ে এত নাটক করার কী দরকার?” তিনি শান্ত গলায় বললেন। “যে জীবন শেষ হয়ে গেছে, তাকে আবার জাগিয়ে তোলার কোনও মানে নেই।”
অনন্যা উঠে দাঁড়াল।
“একটা মানুষকে মিথ্যে করে মৃত ঘোষণা করা আপনার কাছে ভুল? একটা মায়ের কাছ থেকে সন্তান কেড়ে নেওয়া ভুল? আমার বাবাকে খুন করা ভুল?”
অরিন্দমের মুখে বিদ্রূপের হাসি ফুটল।
“তোমার বাবা নিজের ভুলের মূল্য দিয়েছিলেন। আমাকে বিশ্বাসঘাতকতা করার ফল পেয়েছিলেন।”
“আপনিই তাঁকে খুন করেছিলেন!”
“প্রমাণ আছে?”
সৌম্যদীপ সামনে এগিয়ে এল। “আপনার স্বাক্ষর করা আর্থিক নথি আছে, হাসপাতালের জাল রেজিস্টার আছে, আর অরুণাভ সেনের ভিডিও আছে। সবকিছুর অনুলিপি পুলিশের কাছে পাঠানো হয়েছে।”
প্রথমবারের মতো অরিন্দমের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“তোমরা বুঝতে পারছ না, কাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছ।”
“এবার বুঝতে পেরেছি,” অনন্যা বলল। “এত বছর আমরা অন্ধকারে ছিলাম। আর আপনি সেই অন্ধকারকে ব্যবহার করেছেন।”
অরিন্দম পেছনের লোকটিকে ইশারা করলেন। লোকটি বন্দুক তুলল।
ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।
অরিন্দম ঘুরে দাঁড়াতেই দরজা দিয়ে কয়েকজন পুলিশ অফিসার ঢুকে পড়লেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন এক মহিলা পুলিশ আধিকারিক।
“অরিন্দম রায়, আপনাকে অরুণাভ সেনের হত্যাকাণ্ড, নথি জালিয়াতি, অবৈধ দত্তক প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকা এবং হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।”
অরিন্দম পালানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু দরজার কাছে দাঁড়ানো পুলিশ তাঁকে ধরে ফেলল। তাঁর সহযোগীদের কাছ থেকেও অস্ত্র উদ্ধার হলো।
হাতকড়া পরানোর সময় অরিন্দম অনন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি ভাবছ, সত্যি জেনে সব ফিরে পাবে? তোমার যে জীবন ছিল, সেটা আর কোনও দিন ফিরে আসবে না।”
অনন্যা শান্ত গলায় উত্তর দিল, “আমি পুরোনো জীবন ফেরত চাই না। আমি শুধু আমার জীবনের ওপর নিজের অধিকার চাই।”
পুলিশ অরিন্দমকে নিয়ে চলে গেল।
সুবর্ণা চুপ করে বসেছিলেন। তাঁর চোখের জল শুকিয়ে গেছে, কিন্তু মুখে এমন এক ক্লান্তি, যেন সাতাশ বছরের অপেক্ষা একদিনে শেষ হয়ে গেলেও তার ক্ষত সহজে শুকোবে না।
কয়েক সপ্তাহ পরে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট এল।
অনন্যা সুবর্ণা দত্তের জৈবিক কন্যা।
অন্যদিকে অনামিকার পরিচয়ও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো। হাসপাতালের মূল নথি, পুরোনো দত্তক সংক্রান্ত কাগজ এবং তার পালক পরিবারের সংরক্ষিত নথি মিলিয়ে জানা গেল, সে ছিল আরেকটি শিশুর পরিচয়ে বড় হওয়া মেয়ে। তার জন্মদাত্রী মায়ের নাম ছিল ইলা মুখোপাধ্যায়। ইলা বহু বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। তাঁর রেখে যাওয়া নথিতে স্পষ্ট ছিল, শিশুটিকে আইনসম্মতভাবে দত্তক দেওয়ার কথা থাকলেও হাসপাতালের কর্মীরা তার পরিচয় বদলে দিয়েছিল।
অর্থাৎ অনন্যা ও অনামিকা জৈবিক যমজ ছিল না। তারা একই রাতে একই অপরাধের শিকার হওয়া দুই শিশু—দু’জনেরই জন্মপরিচয় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, আর তাদের জীবনকে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল জাল কাগজের সুতোয়।
মৃণালিনীও শেষ পর্যন্ত সব সত্যি স্বীকার করলেন। অরুণাভের মৃত্যুর পরে তিনি ভয়ে মুখ বন্ধ রেখেছিলেন। অরিন্দম তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, সত্যি প্রকাশ পেলে অনন্যাকে হারাতে হবে। মাতৃত্বের টান আর অপরাধবোধের মধ্যে দোদুল্যমান হয়ে তিনি নীরবতাকে বেছে নিয়েছিলেন।
অনন্যা মৃণালিনীকে ক্ষমা করতে পেরেছিল কি না, তার উত্তর সহজ ছিল না। সে জানত, মৃণালিনী তাকে ভালোবেসেছেন। কিন্তু সেই ভালোবাসার ভিতের নীচে ছিল অন্য এক মায়ের কান্না। ক্ষমা করা মানে ভুলে যাওয়া নয়—এ কথা বুঝতে অনন্যার আরও অনেক সময় লাগবে।
মাধুরী গুলির আঘাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। সুস্থ হয়ে ওঠার পর তিনি পুলিশের কাছে সাক্ষ্য দেন। তাঁর জবানবন্দি এবং সৌম্যদীপের সংগৃহীত প্রমাণ অরিন্দমের বিরুদ্ধে মামলাকে আরও শক্তিশালী করে।
সৌম্যদীপ তার সংবাদপত্রে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করল—‘মৃত্যুর নথিতে বেঁচে থাকা মেয়ে’। সেই প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকাশ্যে এল হাসপাতালের দুর্নীতি, পরিচয় বদলের ষড়যন্ত্র এবং অরুণাভ সেনের মৃত্যুর রহস্য।
একদিন সকালে অনন্যা নিজের বাড়ির বারান্দায় বসে সংবাদপত্রটি খুলল। প্রথম পাতায় তার নিজের ছবি। ছবির নীচে বড় অক্ষরে লেখা—
‘সাতাশ বছর আগে মৃত ঘোষণা করা তরুণী ফিরে পেল নিজের পরিচয়।’
অনন্যা অনেকক্ষণ খবরটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সংবাদপত্রটি ভাঁজ করে রেখে দিল।
এবার সে নিজের মৃত্যুর খবর পড়ছিল না।
সে পড়ছিল নিজের বেঁচে থাকার ইতিহাস।
সুবর্ণা তার পাশে এসে বসলেন। অনামিকাও সেখানে ছিল। দু’জনের জীবনে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি, অনেক ক্ষত সারতে সময় লাগবে। কিন্তু প্রথমবারের মতো তাদের সামনে ভবিষ্যৎ ছিল—যে ভবিষ্যৎ কেউ জাল কাগজে লিখে দেয়নি।
“তুমি এখন কী করবে?” অনামিকা জিজ্ঞেস করল।
অনন্যা মৃদু হাসল।
“যে মেয়েটি নিজের মৃত্যুর খবর পড়েছিল, সে এবার নিজের জীবনের গল্প লিখবে।”
দূরে সকালবেলার আলো ছড়িয়ে পড়ছিল। শহর জেগে উঠছিল নতুন দিনের জন্য।
সাতাশ বছরের মিথ্যে একদিনে মুছে যায়নি। হারানো সময়ও ফিরে আসেনি। কিন্তু সত্যি অবশেষে দরজা খুলেছিল। আর সেই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল তিনটি মানুষ—এক মা, এক মেয়ে, আর আরেক মেয়ে, যে নিজের হারিয়ে যাওয়া পরিচয় খুঁজতে নতুন পথের দিকে পা বাড়াচ্ছিল।
অনন্যা জানত, জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় জন্মের কাগজে লেখা নাম নয়। সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সব মিথ্যে ভেদ করে নিজের সত্যের পাশে দাঁড়ানোর সাহস।
সেদিন রাতে সে পুরোনো খবরের কাগজটি শেষবারের মতো খুলল। নিজের মৃত্যুসংবাদে আঙুল ছুঁইয়ে ধীরে ধীরে সেটি ছিঁড়ে ফেলল।
তারপর জানলা খুলে দিল।
বাইরে ভোরের বাতাস।
আর বহুদিন পরে, প্রথমবারের মতো, অনন্যার মনে হলো—তার জীবন সত্যিই শুরু হলো আজ।
— সমাপ্ত —