Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে মেয়েটি নিজের মৃত্যুর খবর পড়েছিল (দ্বিতীয় পর্ব: মায়ের মুখোশ)।

অন্ধকারে প্রথমে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।

তারপর কোথাও একটা ধাতব জিনিস পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো। করিডরে কারও দ্রুত পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে গেল। অনন্যা অনুভব করল, কেউ তার হাত চেপে ধরেছে।

“চুপ করে থাকো,” সৌম্যদীপ ফিসফিস করলেন। “একটাও শব্দ কোরো না।”

অনন্যার মাথায় তখন একটাই কথা ঘুরছিল—অনামিকা বেঁচে আছে।

তার যমজ বোন।

যে বোনকে সে কখনও চিনতে পারেনি, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে এত বছর কিছুই জানত না, সেই বোন কয়েক মুহূর্ত আগে তাকে ফোন করে বলেছে, তাদের মা আসলে কে—তা জানলে অনন্যা নিজেই চাইবে অনামিকা মরে যাক।

কথাটার অর্থ কী?

আর মর্গের দরজার বাইরে যে মহিলা দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি যদি সত্যিই তার মা না হন, তাহলে তিনি কে?

হঠাৎ জরুরি আলোর ক্ষীণ আভা জ্বলে উঠল। নন্দিতা দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। মেঝেতে রক্তের কয়েক ফোঁটা পড়ে আছে। দরজার বাইরে কেউ নেই।

কিন্তু দরজার পাশের দেওয়ালে কালো রঙে লেখা রয়েছে—

‘একজনের মৃত্যু অন্যজনের জন্ম।’

নন্দিতা লেখাটা দেখে পিছিয়ে এলেন।

“ওরা এখানে এসেছিল,” তিনি বিড়বিড় করে বললেন।

সৌম্যদীপ দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে নিলেন।

“আমাদের এখান থেকে বেরোতে হবে। এখনই।”

অনন্যা তাঁর হাত চেপে ধরল।

“না। আগে বলুন, আমার বোন কোথায়?”

“আমি জানি না।”

“আপনি জানেন! আপনি আমাকে এই মর্গে নিয়ে এসেছেন, আপনি আমার বোনের চিঠি দেখিয়েছেন। আপনি সব জানেন!”

সৌম্যদীপের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“সব জানলে তোমাকে এখানে নিয়ে আসতাম না।”

“তাহলে আমাকে সাহায্য করছেন কেন?”

সৌম্যদীপ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর পকেট থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করলেন।

ছবিতে অনন্যার বাবা অরুণাভ সেন, মা মৃণালিনী এবং হাসপাতালের পোশাক পরা এক তরুণী। তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ছোট্ট মেয়ে।

মেয়েটির মুখ অনন্যার মতো।

কিন্তু ছবির পেছনে লেখা নামটা দেখে অনন্যার নিঃশ্বাস আটকে গেল।

‘মৃণালিনী, অরুণাভ ও তাঁদের মেয়ে—অনামিকা।’

“এটা কীভাবে সম্ভব?” অনন্যা জিজ্ঞাসা করল।

সৌম্যদীপ বললেন, “ছবিটা ১৯৯৯ সালের। তখন তুমি আর তোমার বোন এক বছরের।”

“কিন্তু ছবিতে তো একজনই!”

“ঠিক। কারণ অন্য শিশুটিকে সেই দিনই অন্য একটি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।”

“কোন পরিবার?”

সৌম্যদীপ উত্তর দিলেন না।

নন্দিতা এবার ধীরে ধীরে বললেন, “অনন্যা, তোমাকে একটা কথা বলার সময় এসেছে। তোমার বাবা-মা তোমাদের যমজ সন্তান হিসেবে বড় করেননি। তাঁরা জানতেন, তোমাদের মধ্যে একজনকে আলাদা করে রাখতে হবে। কিন্তু কেন, সেটা আমি জানতাম না।”

“আপনি ডাক্তার ছিলেন। আপনি কিছুই জানতেন না?”

“আমি চিকিৎসক ছিলাম, বিচারক নই। জন্মের পরে দুটো শিশুকে সুস্থ অবস্থায় দেখেছিলাম। তারপর তাদের নথি বদলে যায়। আমি প্রশ্ন করেছিলাম। আমাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়।”

অনন্যা কাঁপা গলায় বলল, “কে বাধ্য করেছিল?”

নন্দিতা তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার বাবা।”

অনন্যা যেন নিজের শরীরের ভার সামলাতে পারল না। পাশের বেঞ্চে বসে পড়ল।

তার বাবা?

যে মানুষটি ছোটবেলায় তাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন, স্কুলে প্রথম দিন হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন, পরীক্ষায় ভালো ফল করলে মিষ্টি কিনে আনতেন—সেই মানুষটি কি নিজের দুই সন্তানের পরিচয় বদলে দিয়েছিলেন?

কেন?

সৌম্যদীপ বললেন, “তোমার বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার আগে পুরো সত্যিটা জানা দরকার। আর সেই সত্যির চাবি রয়েছে তোমার মায়ের কাছে।”

“কিন্তু মা তো—”

“তোমার বাড়িতে যে মহিলা আছেন, তিনি তোমার মা। তবে তাঁর অতীতের পরিচয়টা তুমি জানো না।”

অনন্যা আর কোনো প্রশ্ন করল না।

সে বুঝতে পারছিল, প্রতিটি উত্তর তাকে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।


রাত সাড়ে আটটা।

অনন্যা বাড়ি ফিরে দেখল, সদর দরজা খোলা। বসার ঘরের আলো জ্বলছে, কিন্তু মা কোথাও নেই।

টেবিলের ওপর একটি কাপ। চায়ের মধ্যে ধুলো জমেছে। তার পাশে একটি চিরকুট।

‘অনু, আমি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাচ্ছি। আমার জন্য অপেক্ষা করিস না।’

অনন্যা চিরকুটটা হাতে নিয়ে দেখল, লেখাটা মায়ের নয়।

তার মা ‘অনু’ লিখতেন গোল করে। এখানে অক্ষরগুলো ধারালো, দ্রুত লেখা।

সে ঘরের ভেতরে ঢুকল।

মায়ের আলমারি খোলা। জামাকাপড় এলোমেলো। নিচের তাকে রাখা পুরোনো কাঠের বাক্সটা নেই।

সেই বাক্স, যেটা মা কাউকে কখনও খুলতে দিতেন না।

অনন্যা ছোটবেলায় একবার বাক্সটা খুলতে গিয়েছিল। মা এমনভাবে বকেছিলেন যে সে আর কখনও সাহস করেনি।

এবার আলমারির তলায় একটা ছোট্ট কাগজ দেখতে পেল।

তাতে লেখা একটি ঠিকানা—

‘পুরোনো রেল কোয়ার্টার, মালদা টাউন। ঘর নম্বর ৬।’

ঠিকানাটা দেখে অনন্যার মনে পড়ল, তার বাবা একসময় ওই এলাকায় কাজ করতেন। বাবার মৃত্যুর পর মা কখনও সেখানে যাননি।

সে ফোন বের করে সৌম্যদীপকে কল করল।

“আমি একটা ঠিকানা পেয়েছি। পুরোনো রেল কোয়ার্টার।”

ওপাশ থেকে সৌম্যদীপ বললেন, “ওখানে যেও না।”

“কেন?”

“কারণ তোমার বাবা ওই কোয়ার্টারেই শেষবার গিয়েছিলেন।”

“কী হয়েছিল সেখানে?”

“তাঁর মৃত্যুর আগের রাতে তিনি সেখানে একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। পরদিন তাঁর গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে।”

অনন্যার গলা শুকিয়ে গেল।

“আপনি কি বলতে চাইছেন, বাবার দুর্ঘটনা পরিকল্পিত ছিল?”

“আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু তোমার বাবার গাড়ির ব্রেক পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তার কোনো নির্ভরযোগ্য নথি নেই।”

“আর আপনি এতদিন চুপ ছিলেন কেন?”

“কারণ আমার কাছেও প্রমাণ ছিল না। শুধু একটা জিনিস ছিল—তোমার বাবার শেষ ফোনকলের রেকর্ড।”

“সেটা কোথায়?”

“আমার কাছে।”

“আমাকে দিন।”

“আগে আমাকে কথা দাও, তুমি একা কোথাও যাবে না।”

অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি কথা দিতে পারব না।”

তারপর ফোন কেটে দিল।


পুরোনো রেল কোয়ার্টার।

রাত দশটা পনেরো।

বাড়িগুলোর অধিকাংশই বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত। জানালার কাচ ভাঙা, দেওয়ালে শ্যাওলা, উঠোনে বুনো ঘাস। দূরে রেললাইনে ট্রেন যাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

অনন্যা ছয় নম্বর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল।

দরজায় তালা নেই।

ভেতরে ঢুকতেই একটা পুরোনো টেবিল, কাঠের চেয়ার আর দেওয়ালে ঝুলে থাকা ক্যালেন্ডার চোখে পড়ল। ক্যালেন্ডারটা ২০০৫ সালের নভেম্বর মাসে আটকে আছে।

১২ নভেম্বরের তারিখে লাল দাগ।

তার নিচে লেখা—

‘দুই মেয়ের শেষ রাত।’

অনন্যা ঘরের চারদিকে তাকাল। টেবিলের ওপর একটি টেপ রেকর্ডার, পাশে কয়েকটি ক্যাসেট। প্রতিটি ক্যাসেটের গায়ে তারিখ লেখা।

সে ১২ নভেম্বর, ২০০৫ লেখা ক্যাসেটটা চালাল।

প্রথমে শোঁ শোঁ শব্দ।

তারপর বাবার কণ্ঠ।

“মৃণালিনী, তুমি যদি এই রেকর্ডিং শুনে থাকো, তাহলে বুঝব আমি আর বাড়ি ফিরতে পারিনি। আমি জানি, তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না। কিন্তু আমি আর মিথ্যে বলতে পারছি না।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর বাবার গলা আবার শোনা গেল।

“আমরা যে শিশুটিকে অনন্যা বলে বড় করছি, সে আমাদের জন্মদেওয়া মেয়ে নয়। আমাদের আসল মেয়ে অনামিকা। কিন্তু যে শিশুটিকে আমরা অনামিকা বলে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছিলাম, সে-ও আমাদেরই মেয়ে। এই দুটো শিশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। পার্থক্য তৈরি করেছিলাম আমরা।”

অনন্যা টেপ রেকর্ডারের পাশে বসে পড়ল।

বাবার কণ্ঠ কাঁপছিল।

“আমি ভেবেছিলাম, একজনকে নিরাপদে রাখলে অন্যজনকে বাঁচানো যাবে। কিন্তু আমি ভুল করেছিলাম। কারণ যে মানুষটার হাত থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম, সে আমাদের বাড়ির মধ্যেই ছিল।”

তারপর একটা শব্দ।

মনে হলো, কেউ দরজা খুলেছে।

বাবা বললেন, “কে?”

অপরিচিত এক পুরুষকণ্ঠ উত্তর দিল, “আপনি অনেক দেরি করে ফেলেছেন, অরুণাভবাবু।”

এরপর ধস্তাধস্তির শব্দ।

একটি চেয়ার পড়ে গেল।

বাবার চিৎকার—

“মৃণালিনী! বাচ্চাটাকে নিয়ে পালাও!”

তারপর গুলির শব্দ।

টেপ থেমে গেল।

অনন্যা কিছুক্ষণ স্থির বসে রইল।

তারপর ক্যাসেটটা আবার চালাল।

এইবার সে শেষের কয়েক সেকেন্ড মন দিয়ে শুনল। গুলির শব্দের পরে খুব ক্ষীণ একটা শিশুর কান্না শোনা যায়।

তারপর একজন মহিলা ফিসফিস করে বলছেন—

“একজনকে নিয়ে যাচ্ছি। অন্যজনকে ফিরিয়ে আনব। কথা দিচ্ছি।”

কণ্ঠটা মায়ের।

অনন্যা চোখ বন্ধ করল।

তার মা সেই রাতে একজনকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু কাকে?


ঘরের পেছনের দেওয়ালে একটা কাঠের আলমারি ছিল। তার দরজা আধখোলা। ভেতরে ফাইল আর পুরোনো কাগজের স্তূপ।

অনন্যা একটা ফাইল টেনে বের করল।

ভেতরে হাসপাতালের নথি, দুটি জন্মের শংসাপত্র এবং একটি দত্তক গ্রহণের চুক্তিপত্র।

চুক্তিপত্রে লেখা—

‘শিশু অনামিকা সেনকে অস্থায়ীভাবে মৃণালিনী দেবীর পরিচিত এক দম্পতির কাছে রাখা হচ্ছে। শিশুটির নিরাপত্তার স্বার্থে তার জন্মপরিচয় গোপন রাখা হবে।’

নিচে তিনটি স্বাক্ষর।

অরুণাভ সেন।

মৃণালিনী সেন।

আর তৃতীয় স্বাক্ষরটি দেখে অনন্যা স্তব্ধ হয়ে গেল।

ডা. নন্দিতা রায়।

তারিখ—১৫ নভেম্বর, ১৯৯৮।

অর্থাৎ জন্মের মাত্র তিন দিন পরই তাদের একজনকে অন্যের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু কেন?

ফাইলের তলায় আরেকটি কাগজ।

একটি পুলিশি অভিযোগের খসড়া। অভিযোগকারী—অরুণাভ সেন।

বিষয়—নিজের দুই কন্যাসন্তানকে অপহরণের চেষ্টা।

অভিযুক্তের নামের জায়গা ফাঁকা।

কিন্তু কাগজের পেছনে বাবার হাতের লেখায় একটি নাম—

‘মৃণালিনী।’

অনন্যা কাগজটা নামিয়ে রাখল।

এটা কি সম্ভব যে তার মা-ই দুই শিশুকে আলাদা করেছিলেন?

ঠিক তখনই ঘরের বাইরে পায়ের শব্দ হলো।

অনন্যা দ্রুত ফাইলটা ব্যাগে ঢুকিয়ে দরজার পাশে দাঁড়াল।

দরজা খুলে একজন মহিলা ভেতরে এলেন।

সাদা শাড়ি। কাঁধে কালো ব্যাগ। ডান হাতে কালো দস্তানা।

মর্গের সেই মহিলা।

তিনি দরজা বন্ধ করে অনন্যার দিকে তাকালেন।

“তুমি এখানে আসবে, জানতাম।”

অনন্যা পেছনে সরে গেল।

“আপনি কে?”

মহিলা ধীরে ধীরে দস্তানাটা খুললেন।

তার ডান হাতের অনামিকা আঙুলে একটি রুপোর আংটি। আংটির ভেতরে খোদাই করা—‘মৃণালিনী’।

অনন্যার গলা শুকিয়ে গেল।

“মা?”

মহিলা মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ, আমি মৃণালিনী।”

“কিন্তু বাড়িতে—”

“বাড়িতে যে আছে, সে-ও মৃণালিনী।”

অনন্যা হতভম্ব।

“একজন মানুষ কীভাবে দুটো জায়গায় থাকতে পারে?”

মহিলা ধীরে ধীরে মুখ থেকে একটি পাতলা কৃত্রিম আবরণ খুলে ফেললেন। নিচে দেখা গেল পরিচিত মুখ। কিন্তু বয়সের রেখা আলাদা, চোখের কোণে ছোট্ট দাগ।

অনন্যা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।

মহিলার মুখ তার মায়ের মতোই।

একই চোখ, একই ঠোঁট, একই কপাল।

শুধু তিনি কয়েক বছরের ছোট।

মহিলা বললেন, “আমরা যমজ বোন।”

অনন্যার মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হলো।

“আপনি আমার মায়ের বোন?”

“হ্যাঁ। আমার নাম মাধুরী। আর তোমার মা মৃণালিনী।”

“তাহলে আপনি আমার মৃত্যুর খবর ছাপিয়েছেন?”

মাধুরী মাথা নাড়লেন।

“আমি চাইনি তোমাকে মেরে ফেলতে। আমি চেয়েছিলাম, তোমার আসল পরিচয় প্রকাশ্যে আসুক। কিন্তু যারা খবরটা ছেপেছে, তারা আমার কথা শোনেনি। তারা তোমাকে মৃত বলে ঘোষণা করেছে, কারণ তাদের কাছে সেটাই সুবিধাজনক ছিল।”

“কারা তারা?”

মাধুরী উত্তর দিলেন না।

বরং বললেন, “তোমাকে একটা সত্যি জানতে হবে। তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে বলেছিলেন, দুই মেয়ের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে। আমি কাউকে বেছে নিতে পারিনি। তাই তোমাদের দুজনকে আলাদা করে দিয়েছিলাম।”

অনন্যা কাঁপা গলায় বলল, “কিন্তু আপনি তো আমার মা নন।”

“না। আমি তোমার খালা। কিন্তু তোমার জন্মের পর প্রথম কোলে নিয়েছিলাম আমি। আর তোমার বাবা মারা যাওয়ার রাতে আমি তোমাদের বাড়িতে ছিলাম।”

“তাহলে বাবা কীভাবে মারা গেলেন?”

মাধুরী চোখ নামিয়ে বললেন, “তোমার বাবা দুর্ঘটনায় মারা যাননি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল।”

“কে করেছিল?”

মাধুরী তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যে মানুষটা এত বছর ধরে তোমাকে নিজের মেয়ে বলে বড় করেছে।”

অনন্যা স্তব্ধ হয়ে গেল।

“মা?”

“না। তোমার মা নয়। তোমার বাবা যে মানুষটিকে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু বলে বিশ্বাস করতেন।”

“কে?”

মাধুরী উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের বাইরে গাড়ির শব্দ হলো।

তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “ওরা এসে গেছে।”

“কারা?”

মাধুরী অনন্যার হাত ধরে পেছনের দরজার দিকে টেনে নিয়ে গেলেন।

“তোমার বোনের লোকেরা।”

“আমার বোনের লোক?”

“অনামিকা এখন একা নেই। তার সঙ্গে এমন একজন আছে, যে তোমাদের দুজনের জন্মের আগের সত্যিটাও জানে।”

অনন্যা থমকে গেল।

“আমাদের জন্মের আগের সত্যি?”

মাধুরী দরজা খুলে বাইরে তাকালেন।

“হ্যাঁ। কারণ তোমরা দুজন আসলে অরুণাভ আর মৃণালিনীর সন্তান নও।”

অনন্যার মনে হলো, এবার সত্যিই সে অজ্ঞান হয়ে যাবে।

“তাহলে আমরা কার সন্তান?”

মাধুরী তার কানে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন—

“তোমাদের আসল মা এখনও বেঁচে আছেন। আর তিনি গত সাতাশ বছর ধরে তোমাদের দুজনকে খুঁজছেন।”


বাইরে গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

কেউ একজন ডাকল, “মাধুরী দেবী! আমরা জানি, আপনি ভেতরে আছেন।”

মাধুরী অনন্যাকে পেছনের ছোট্ট ঘরে ঠেলে দিলেন।

“যাই হোক, বাইরে বেরোবে না।”

“আপনি কোথায় যাবেন?”

“ওদের আটকাতে।”

“আপনি একা পারবেন না!”

মাধুরী হালকা হাসলেন।

“আমি সাতাশ বছর ধরে এই দিনের অপেক্ষা করেছি।”

তিনি দরজা বন্ধ করে দিলেন।

অনন্যা ছোট্ট ঘরটায় দাঁড়িয়ে রইল। একটা ভাঙা জানালা দিয়ে বাইরের উঠোন দেখা যায়। সে দেখল, তিনজন লোক বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে একজনের হাতে একটি ফাইল।

আরেকজনের হাতে বন্দুক।

মাধুরী তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

“তোমরা এখানে কেন এসেছ?”

একজন লোক বলল, “মেয়েটাকে আমাদের হাতে তুলে দিন।”

“কোন মেয়েকে?”

“অনন্যা সেনকে।”

মাধুরী হাসলেন।

“অনন্যা তো সাত বছর বয়সেই মারা গেছে। তোমরা কার খোঁজ করছ?”

লোকটি ফাইল খুলে একটি ছবি বের করল।

“আমরা অনামিকা সেনকে খুঁজছি।”

মাধুরীর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

লোকটি এবার ধীরে ধীরে বলল, “আর আমরা জানি, সে এখানেই আছে।”

অনন্যার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

তার ফোন কেঁপে উঠল।

অজানা নম্বর।

একটি বার্তা।

‘দিদি, জানালার বাইরে তাকাও।’

অনন্যা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।

বাড়ির পেছনের গাছের নিচে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নীল পোশাক, কাঁধে ছোট্ট ব্যাগ। মুখটা অনন্যার মতোই।

কিন্তু মেয়েটির বাঁ কাঁধে পোড়া দাগ নেই।

মেয়েটি ফোনটা কানে তুলে বলল, “দিদি, আমি অনামিকা।”

অনন্যা জানালার কাচে হাত রাখল।

অনামিকা তার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে হাসল।

তারপর এমন একটি কথা বলল, যা শুনে অনন্যার বুকের ভেতরটা ভেঙে গেল।

“দিদি, মা তোমাকে যে গল্পটা বলেছে, তার একটাও সত্যি নয়। তুমি আমার যমজ বোন নও।”

অনন্যা স্তব্ধ হয়ে গেল।

অনামিকা ফোনে বলল, “আমাদের দুজনের মধ্যে একজনই আসল অনামিকা। অন্যজনকে জন্মের পর অন্য একটি শিশুর পরিচয় দিয়ে বড় করা হয়েছে।”

“তাহলে আমি কে?”

অনামিকা চোখ নামিয়ে বলল—

“তুমি সেই মেয়ে, যাকে সাতাশ বছর আগে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল।”

ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে একটি গুলির শব্দ ভেসে এল।

মাধুরী মাটিতে পড়ে গেলেন।

অনামিকা চিৎকার করে উঠল, “দিদি, পালাও!”

আর অনন্যা বুঝল, তার মৃত্যুর খবর কেবল একটা মিথ্যে সংবাদ ছিল না।

কেউ একজন সত্যিই চাইছে, সে যেন দ্বিতীয়বার মারা যায়।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *