Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে মেয়েটি প্রতি বছর নিজের শ্রাদ্ধে আসে (সপ্তম পর্ব: চার বোনের শেষ শ্রাদ্ধ)।

ছবিটা মেঝেতে পড়ে ছিল।

তিয়াসা ঝুঁকে ছবিটি তুলতে গেল, কিন্তু তার আগেই অমিতাভ সেন চিৎকার করে উঠলেন, “ওটা ছুঁয়ো না!”

তিয়াসা থমকে দাঁড়াল।

“কেন? ছবিতে কী আছে?”

অমিতাভ কোনও উত্তর দিলেন না। তাঁর চোখ স্থির হয়ে ছিল ছবির পেছনে লেখা লাল অক্ষরগুলোর দিকে।

চার বোনের মধ্যে যে বেঁচে থাকবে, সে-ই নিজের শ্রাদ্ধ করবে।

বাক্যটা পড়ে তিয়াসার মনে হল, এত বছর ধরে সে যে জীবনটাকে নিজের বলে জেনে এসেছে, সেটাই হয়তো একটা সাজানো মিথ্যা। প্রতি বছর নিজের হাতে যে মেয়েটির শ্রাদ্ধ করেছে, সে কি সত্যিই তার বোন ছিল? নাকি সেই শ্রাদ্ধের আয়োজন করা হয়েছিল অন্য কাউকে মৃত প্রমাণ করার জন্য?

ঠিক তখনই ওপরতলার দরজায় আবার আঘাতের শব্দ হল।

ঠক!

ঠক!

ঠক!

তারপর সেই বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর—

“তিয়াসা, মা, দরজাটা খোল।”

কণ্ঠস্বরটিতে এমন এক অদ্ভুত মমতা ছিল, যা শুনে তিয়াসার বুকের মধ্যে চাপা কান্না জমে উঠল। মনে হল, এই ডাক সে ছোটবেলায় বহুবার শুনেছে। কোনও এক অন্ধকার রাতে, কোনও এক বন্ধ দরজার ওপার থেকে কেউ তাকে ঠিক এইভাবেই ডাকত।

কিন্তু তার মনে পড়ছে না, কে সেই মানুষ।

“আপনি কে?” তিয়াসা চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করল।

উত্তর এল, “যে তোকে প্রথম কোলে নিয়েছিল।”

তিয়াসা কেঁপে উঠল।

“আমার মা?”

“তোর মা কে, সেটা জানার আগে জেনে নে, তোর জন্মের সময় তোর পাশে কারা ছিল।”

দেবব্রত রায় হঠাৎ তিয়াসার হাত চেপে ধরলেন।

“ওর কথা শুনিস না! এই বাড়িতে যে দরজাটা একবার খুলবে, সেটা আর কখনও আগের মতো বন্ধ হবে না।”

তিয়াসা তাঁর দিকে তাকাল।

“আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন? আপনি তো এতক্ষণ ধরে সব জানেন বলে দাবি করছেন!”

দেবব্রত চোখ নামিয়ে নিলেন।

“আমি সব জানি না। আমি শুধু জানি, পঁচিশ বছর আগে এই বাড়িতে একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার জন্য আমার মা নিজের ঘর ছেড়ে ওই ঘরে বন্দি হয়েছিলেন। তারপর একে একে এই পরিবারের সবাই নিজেদের পরিচয় হারাতে শুরু করে।”

“কী ঘটনা?”

দেবব্রত ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন, “একটি শিশুকে বদলে দেওয়া হয়েছিল।”

“কোন শিশুকে?”

“সেটাই কেউ জানে না।”

তিয়াসা এবার ছবিটার দিকে তাকাল।

চারটি নবজাতক। চারটি ছোট্ট মুখ। চারটি কবজি।

ছবির ডানদিকে শুয়ে থাকা শিশুটির কবজিতে একটি কালো দাগ। মাঝের শিশুটির হাতে সুতোর বাঁধন। আর একেবারে বাঁদিকে থাকা শিশুটির গলায় ছোট্ট রুপোর নূপুরের মতো একটি অলংকার।

তিয়াসার মনে পড়ে গেল সেই নূপুরের কথা, যেটি সে বাড়ির ভূগর্ভস্থ ঘরে খুঁজে পেয়েছিল।

সে ছবিটা অমিতাভের সামনে তুলে ধরল।

“এই চারটি শিশুর মধ্যে আমি কে?”

অমিতাভ মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন।

“আমি জানি না, তিয়াসা।”

“তুমি আমার বাবা! তুমি জানো না?”

“আমি তোকে বড় করেছি। তোকে ভালোবেসেছি। কিন্তু তোর জন্মের রাতে ঠিক কী হয়েছিল, সেটা আমি কোনওদিন পুরোপুরি জানতে পারিনি।”

“তাহলে তুমি মধুমিতাকে খুন করেছিলে কেন?”

প্রশ্নটা শুনে ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ থমকে গেল।

অমিতাভ ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।

“আমি যাকে মধুমিতা ভেবেছিলাম, সে আমাকে বলেছিল, তোর জন্মের পর একটা শিশু মারা গিয়েছে। সে বলেছিল, সেই শিশুটিকে বাঁচানোর কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু কয়েক দিন পর আমি জানতে পারি, শিশুটির মৃত্যুর শংসাপত্র জাল।”

“তারপর?”

“তারপর আমি তাকে প্রশ্ন করি। সে আমাকে বলে, এই বাড়ির সম্পত্তির জন্য একটি শিশুকে মৃত দেখানো হয়েছিল। আর সেই শিশুর পরিচয় নিয়ে অন্য একটি শিশু বড় হচ্ছে।”

তিয়াসার গলা শুকিয়ে গেল।

“সেই শিশুটি কি আমি?”

অমিতাভ উত্তর দেওয়ার আগেই ওপরতলার দরজা খুলে গেল।

কোনও শব্দ হল না।

দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বৃদ্ধা। তাঁর পরনে সাদা শাড়ি, চুল সম্পূর্ণ সাদা, চোখের নীচে গভীর কালি। মুখে বয়সের অসংখ্য রেখা থাকলেও চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।

তিনি ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন।

কেউ তাঁকে থামাল না।

শশাঙ্ক রায় বৃদ্ধাকে দেখে পিছিয়ে গিয়ে দেওয়ালে ঠেকে গেলেন।

“মা!”

বৃদ্ধা তাঁর দিকে তাকালেন।

“এত বছর পর মনে পড়ল, আমি তোমার মা?”

শশাঙ্ক কাঁপা গলায় বললেন, “আপনি তো মারা গিয়েছিলেন!”

বৃদ্ধা তিক্ত হাসলেন।

“এই বাড়িতে সবাইকে মেরে ফেলার সবচেয়ে সহজ উপায় কী জানিস? তাদের মৃত ঘোষণা করে দেওয়া। তারপর কাগজে সই করিয়ে নেওয়া। সম্পত্তি দখল করা। আর যারা সত্যিটা জানে, তাদের পাগল বলে বন্ধ ঘরে আটকে রাখা।”

তিয়াসা এগিয়ে এল।

“আপনি কি আমার ঠাকুমা?”

বৃদ্ধা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হাত বাড়িয়ে তিয়াসার গাল স্পর্শ করলেন।

“তোর চোখ দুটো ঠিক ওর মতো।”

“কার মতো?”

“মধুমিতার।”

তিয়াসার চোখে জল চলে এল।

“আমার মা কোথায়?”

বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তুই যাকে এত দিন মা বলে ডেকেছিস, সে তোকে জন্ম দেয়নি। কিন্তু সে তোকে ভালোবেসেছিল। আর যে তোকে জন্ম দিয়েছিল, তাকে এই বাড়ির মানুষ নিজেরাই হারিয়ে ফেলেছে।”

“সে কি বেঁচে আছে?”

বৃদ্ধা সরাসরি উত্তর দিলেন না।

তিনি তিয়াসার হাত ধরে ছবিটির কাছে নিয়ে গেলেন।

“এই চারটি শিশুর নাম ছিল—তিয়াসা, মৃণালিনী, মেঘলা আর নন্দিতা।”

তিয়াসা স্তব্ধ হয়ে গেল।

“নন্দিতা? কিন্তু নন্দিতা তো বারো বছর আগে মারা গিয়েছিল!”

বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।

“একজন নন্দিতা মারা গিয়েছিল। কিন্তু তার নাম নিয়ে আর একজন বেঁচে ছিল।”

দেবব্রত অস্ফুট স্বরে বললেন, “তাহলে যাকে আমরা নন্দিতা বলে চিনতাম…”

“সে ছিল অন্য একটি শিশু,” বৃদ্ধা বললেন। “তার জন্মের পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল। আর সেই বদলের কারণেই চারটি মেয়ের জীবন চারদিকে ছিটকে গিয়েছিল।”

তিয়াসা বুঝতে পারছিল না, কাকে বিশ্বাস করবে।

নন্দিতা, মেঘলা, মৃণালিনী, মেঘদূতি—প্রতিটি নাম যেন তার সামনে একটি করে নতুন দরজা খুলছে। অথচ কোনও দরজার ওপারেই সম্পূর্ণ সত্য নেই।

সে বৃদ্ধাকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি যদি সব জানেন, তাহলে এত বছর চুপ করে ছিলেন কেন?”

বৃদ্ধার মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“কারণ আমিই প্রথম শিশুটিকে বদলে দিয়েছিলাম।”

ঘরের মধ্যে যেন বজ্রপাত হল।

অমিতাভ চিৎকার করে উঠলেন, “মা!”

বৃদ্ধা তাঁর দিকে তাকালেন না।

“পঁচিশ বছর আগে এই বাড়ির উত্তরাধিকার নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়। আমার দুই ছেলে—শশাঙ্ক আর দেবব্রত—দুজনেই সম্পত্তি চাইত। তখন আমি ঠিক করেছিলাম, যে সন্তানকে আমি উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করব, সম্পত্তি তারই হবে। কিন্তু সন্তানদের জন্মের রাতে এমন কিছু ঘটল, যা আমার সমস্ত পরিকল্পনা বদলে দিল।”

“কী ঘটেছিল?” তিয়াসা জিজ্ঞাসা করল।

বৃদ্ধা বললেন, “একটি শিশু জন্মের পর কাঁদেনি। চিকিৎসক বলেছিলেন, সে মৃত। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর আমি শুনলাম, বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে শিশুর কান্না আসছে।”

“কোন ঘর?”

বৃদ্ধা আঙুল তুলে বাড়ির উত্তর দিকের অন্ধকার করিডরের দিকে দেখালেন।

“যে ঘরে আজও কেউ ঢোকে না।”

“সেখানে কে আছে?”

বৃদ্ধা তিয়াসার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যে মেয়েটির শ্রাদ্ধ তুই প্রতি বছর করিস।”

তিয়াসার পা অবশ হয়ে গেল।

“মেঘলা?”

“না।”

বৃদ্ধার ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল।

“তুই এত দিন যে মেয়েটিকে মেঘলা বলে চিনেছিস, সে মেঘলা নয়। আর যে মেয়েটিকে তুই মৃত ভেবে শ্রাদ্ধ করেছিস, সে-ও মেঘলা নয়।”

ঠিক তখনই বাড়ির উত্তর দিক থেকে একটা দরজা খোলার শব্দ এল।

কেউ একজন ধীরে ধীরে হাঁটছে।

পায়ের শব্দ কাছে আসছে।

এক পা।

দুই পা।

তিন পা।

তারপর করিডরের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল একটি মেয়ে।

তার বয়স তিয়াসার কাছাকাছি। মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই। চোখে অদ্ভুত শূন্যতা। পরনে সাদা পোশাক, হাতে একটি পিতলের থালা।

থালার মধ্যে ফুল, ধূপকাঠি, প্রদীপ এবং একটি ছোট্ট ছবির ফ্রেম।

তিয়াসা ছবির দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা থেমে গেল।

ছবিতে তার নিজের মুখ।

তার নীচে লেখা—

‘তিয়াসা সেনের শ্রাদ্ধ—প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর।’

তিয়াসা পিছিয়ে গেল।

“এটা কী?”

মেয়েটি প্রথমবার মুখ খুলল।

“তোমার শ্রাদ্ধ।”

“কিন্তু আমি তো বেঁচে আছি!”

মেয়েটি শান্ত গলায় বলল, “তুমি বেঁচে আছ, কারণ তোমার জায়গায় অন্য কেউ মরেছিল।”

“কে?”

মেয়েটি থালাটি মেঝেতে নামিয়ে রাখল।

তারপর তিয়াসার খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল—

“আমি।”

তিয়াসা মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

মুখটা তার নিজের মতোই। চোখ, নাক, ঠোঁট—সব এক। এমনকী বাঁ ভ্রুর পাশে ছোট্ট দাগটাও একই জায়গায়।

মেয়েটি এবার তিয়াসার কানের কাছে মুখ এনে বলল—

“তুমি যে বাড়িতে বড় হয়েছ, সেটা তোমার বাড়ি নয়। যে বাবাকে তুমি বাবা বলে ডাকো, তিনি তোমার বাবা নন। আর যে মাকে তুমি মৃত বলে জানো, তিনি কখনও তোমার মা ছিলেন না।”

তারপর সে এক পা পিছিয়ে গেল।

“কারণ তুমি তিয়াসা নও।”

ঠিক সেই মুহূর্তে তিয়াসার ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি অচেনা নম্বর।

সে কাঁপা হাতে ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল।

“তিয়াসা, তুমি যদি এখনও শালবনীর বাড়িতে থাকো, তাহলে এখনই পালাও।”

“কে বলছেন?”

“আমি সেই চিকিৎসক, যিনি তোমার জন্মের রাতে হাসপাতালের নথিতে সই করেছিলেন।”

তিয়াসা নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনতে লাগল।

চিকিৎসক বললেন, “আমি এত বছর ধরে তোমাকে খুঁজছি। কারণ তোমার জন্মের রাতে চারটি নয়, পাঁচটি শিশু জন্মেছিল।”

তিয়াসার হাত থেকে ফোনটি পড়ে গেল।

আর ঠিক তখনই তার পিছনে দাঁড়ানো বৃদ্ধা ফিসফিস করে বললেন—

“পঞ্চম শিশুটি এখনও এই বাড়িতেই আছে।”

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *