“পঞ্চম শিশুটি এখনও এই বাড়িতেই আছে।”
বৃদ্ধার কথাটা শোনার পর তিয়াসার মনে হল, তার চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ থেমে গিয়েছে।
পাঁচটি শিশু!
এতক্ষণ সে জেনে এসেছে, তার জন্মের রাতে তিনটি শিশু জন্মেছিল। পরে চারটি শিশুর কথা সামনে এসেছে। আর এখন বলা হচ্ছে, পাঁচটি শিশু জন্মেছিল!
কিন্তু একটি প্রশ্ন তার মাথার মধ্যে বারবার ঘুরছিল।
যদি পাঁচটি শিশু জন্মে থাকে, তাহলে পঞ্চম শিশুটি কে?
আর কেন তাকে এত বছর লুকিয়ে রাখা হয়েছে?
তিয়াসা মেঝে থেকে ফোনটা তুলে নিল।
“হ্যালো! ডাক্তারবাবু! আপনি শুনতে পাচ্ছেন?”
ওপাশ থেকে কোনও উত্তর এল না।
কয়েক সেকেন্ড পর আবার কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“তিয়াসা, মন দিয়ে শোনো। তোমার হাতে খুব বেশি সময় নেই। ওই বাড়ির লোকেরা যদি জানতে পারে যে তুমি পঞ্চম শিশুর পরিচয় জানতে পেরেছ, তাহলে তোমার জীবন বিপন্ন হতে পারে।”
“আপনি কে? আপনার নাম বলুন!”
“আমার নাম ডা. অরুণাভ মিত্র। আমি শালবনী জেলা হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক ছিলাম। তোমার জন্মের রাতে আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম।”
“তাহলে বলুন, আমার আসল পরিচয় কী?”
ওপাশের মানুষটি কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন।
তারপর বললেন, “তুমি যার মেয়ে বলে নিজেকে জানো, তুমি তার মেয়ে নও। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোমার বাবা-মা তোমাকে ভালোবাসেনি। আসল সত্যিটা আরও ভয়ংকর।”
“কী সত্যি?”
“পাঁচটি শিশুর মধ্যে একজনের জন্ম হয়েছিল মৃত অবস্থায়। অন্তত নথিতে তাই লেখা হয়েছিল। কিন্তু আমি যখন শেষবার সেই শিশুটিকে পরীক্ষা করি, তখন তার শরীরে প্রাণের স্পন্দন ছিল।”
তিয়াসার গলা শুকিয়ে গেল।
“তাহলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হল কেন?”
“কারণ সেই শিশুটির পরিচয় প্রকাশ পেলে একটি সম্পত্তির উত্তরাধিকার বদলে যেত। আর সেই সম্পত্তির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি খুনের ঘটনা।”
“কার খুন?”
ডাক্তারবাবু উত্তর দেওয়ার আগেই ফোনে একটা তীব্র শব্দ হল। তারপর লাইন কেটে গেল।
তিয়াসা বারবার ফোন করল। কিন্তু নম্বরটি আর চালু হল না।
পিছন থেকে মেঘদূতির কণ্ঠ ভেসে এল।
“তুই যত বেশি সত্যের কাছে যাবি, তত বেশি মানুষ তোকে মিথ্যে বলবে।”
তিয়াসা ঘুরে দাঁড়াল।
“আপনি কি জানেন পঞ্চম শিশুটি কে?”
মেঘদূতি মাথা নাড়ল।
“জানি।”
“তাহলে বলছেন না কেন?”
“কারণ পঞ্চম শিশুটি কোনও অচেনা মানুষ নয়। সে এমন একজন, যাকে তুই নিজের চোখের সামনে দেখেছিস। যার সঙ্গে কথা বলেছিস। এমনকী যার জন্য তুই কেঁদেছিস।”
তিয়াসা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“কে সে?”
মেঘদূতি উত্তর দেওয়ার আগেই বাড়ির সমস্ত দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।
ধড়াম!
ধড়াম!
ধড়াম!
বাতাসে ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। অথচ ঘরের কোনও প্রদীপ জ্বলছিল না।
আর ঠিক সেই সময় তিয়াসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের মতো দেখতে মেয়েটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
“আমাকে চিনতে পারছ না, দিদি?”
তিয়াসা তার মুখের দিকে তাকাল।
“তুমি কে?”
মেয়েটি মৃদু হাসল।
“তুই ছোটবেলায় আমাকে একটা নাম দিয়েছিলি। মনে আছে?”
তিয়াসা মাথা নাড়ল।
“না।”
“তুই বলতিস, আমি নাকি রাতের আকাশের তারা। কারণ আমি অন্ধকারে তোকে পথ দেখাতাম।”
তিয়াসার মনে হঠাৎ একটি অস্পষ্ট স্মৃতি ফিরে এল।
ছোট্ট একটি ঘর। জানলার বাইরে বৃষ্টি। বিছানায় শুয়ে সে কাঁদছে। তার পাশে আরেকটি মেয়ে বসে আছে। মেয়েটি তার হাত ধরে বলছে, “ভয় পাস না। আমি তো আছি।”
তারপর একটি দরজা খুলছে।
কেউ একজন মেয়েটিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
আর ছোট্ট তিয়াসা চিৎকার করে বলছে, “তারাকে নিয়ে যেও না!”
তিয়াসা দু’হাতে মাথা চেপে ধরল।
“তারা!”
মেয়েটির চোখে জল এসে গেল।
“অবশেষে মনে পড়েছে?”
“তুমি কি আমার বোন?”
“আমি তোর বোন ছিলাম। কিন্তু এই বাড়ির মানুষ আমাকে কখনও বোন বলে মানেনি।”
“তাহলে তোমাকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিল কেন?”
তারা ঠান্ডা গলায় বলল, “কারণ আমি বেঁচে থাকলে তোর পরিচয় বদলে যেত।”
তিয়াসা তার হাত ধরতে গেল। কিন্তু হাতটা ছোঁয়ার আগেই মেয়েটি পিছিয়ে গেল।
“না, দিদি। এখন আমাকে ছুঁয়ো না।”
“কেন?”
“কারণ আমি এখনও জানি না, তুই সত্যিই তিয়াসা কি না।”
কথাটা শুনে তিয়াসার বুকের মধ্যে কেমন একটা ব্যথা হল।
“তুমি কী বলতে চাইছ?”
তারা উত্তর দিল না। সে শুধু মেঝেতে পড়ে থাকা পুরোনো ছবিটার দিকে তাকাল।
“ওই ছবিতে যে চারটি শিশুকে দেখেছিস, তাদের মধ্যে একজন আমি। কিন্তু ছবির পিছনে যে মহিলাকে দেখেছিস, তিনি আমাদের মা নন।”
“তাহলে কে?”
“যে আমাদের মায়ের পরিচয় চুরি করেছিল।”
তিয়াসা অবাক হয়ে বলল, “মধুমিতা?”
তারা মাথা নাড়ল।
“না। মধুমিতা ছিল আমাদের জন্মদাত্রী মা। কিন্তু তাঁর মুখ নিয়ে আর একজন এই বাড়িতে বাস করত। আর সেই মানুষটাই একে একে আমাদের জীবন থেকে মুছে দিয়েছিল।”
তিয়াসার মনে পড়ল, তার বাবা বলেছিলেন, মধুমিতাকে তিনি নিজের হাতে হত্যা করেছেন। কিন্তু সেই হত্যার কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
তাহলে কি তিনি ভুল মানুষকে হত্যা করেছিলেন?
নাকি হত্যার ঘটনাটাই ছিল সাজানো?
তিয়াসা তারার দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে আমার মা কোথায়?”
তারা উত্তর দিল, “তোর মা এখনও বেঁচে আছেন।”
“কোথায়?”
“এই বাড়ির নীচে।”
তিয়াসা স্তব্ধ হয়ে গেল।
“পাতালঘরে?”
“না। পাতালঘরের নীচে আরও একটি ঘর আছে। যেটার কথা এই বাড়ির কেউ জানে না।”
“কিন্তু সেখানে যাওয়ার রাস্তা কোথায়?”
তারা তিয়াসাকে নিয়ে বাড়ির উত্তর দিকের করিডরে এগিয়ে গেল।
করিডরের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো দেওয়াল। দেওয়ালে ঝুলছে কয়েকটি বিবর্ণ পারিবারিক ছবি। তার মধ্যে একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তরুণী মধুমিতা একটি শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশে অমিতাভ সেন।
কিন্তু ছবিটির এক কোণে কালো কালি দিয়ে কারও মুখ মুছে দেওয়া হয়েছে।
তিয়াসা ছবিটা নামিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকাল।
“এখানে তো কোনও দরজা নেই!”
তারা দেওয়ালের মাঝখানে হাত রাখল।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল, “দরজাটা দেখতে পাস না, কারণ তুই এত দিন ধরে অন্য দরজা খুঁজেছিস।”
সে দেওয়ালের একটি ছোট্ট পাথর চাপ দিল।
সঙ্গে সঙ্গে দেওয়ালের একটা অংশ সরে গেল।
ভেতরে নেমে গিয়েছে সরু পাথরের সিঁড়ি।
সিঁড়ির নীচে ঘন অন্ধকার।
তিয়াসা মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে নিচে নামতে শুরু করল। তারা তার পিছনে। কিছুটা নামার পর তারা দেখল, সিঁড়ির শেষ প্রান্তে একটি লোহার দরজা।
দরজায় কোনও তালা নেই।
শুধু সাদা রঙে লেখা—
‘যে মা পাঁচটি সন্তান জন্ম দিয়েছিল, তার কাছে যাওয়ার আগে নিজের নাম ভুলে যেতে হবে।’
তিয়াসা দরজায় হাত রাখল।
ভেতর থেকে সঙ্গে সঙ্গে একটা শব্দ এল।
কেউ কাঁদছে।
একজন বৃদ্ধা নয়।
একজন তরুণীও নয়।
একটি ছোট্ট মেয়ে।
“দিদি, তুমি এসেছ?”
তিয়াসার চোখে জল এসে গেল।
“হ্যাঁ, আমি এসেছি। তুমি কে?”
ভেতর থেকে উত্তর এল—
“আমি সেই মেয়ে, যার শ্রাদ্ধ তুমি প্রতি বছর করো।”
তিয়াসা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
“তুমি কি মেঘলা?”
“না।”
“তারা?”
“না।”
“নন্দিতা?”
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর মেয়েটি বলল—
“আমি তিয়াসা।”
তিয়াসার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।
তার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা তারা ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল, “এবার বুঝতে পারছিস? এই বাড়িতে শুধু একজন তিয়াসা নেই।”
ঠিক সেই মুহূর্তে লোহার দরজার ওপার থেকে আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল।
একজন মহিলার কণ্ঠ।
“মেয়েরা, দরজাটা খুলো না। তোমাদের মধ্যে যে তিয়াসা দাঁড়িয়ে আছে, সে আমার মেয়ে নয়।”
তিয়াসা ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে তাকাল।
সিঁড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন মধুমিতা সেন।
কিন্তু তাঁর মুখে হাসি নেই।
চোখে জল নেই।
শুধু ডান হাতে ধরা একটি পুরোনো ছুরি।
তিনি তিয়াসার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“কারণ আমার আসল মেয়েকে আমি বারো বছর আগেই নিজের হাতে মেরে ফেলেছি।”
চলবে…