Categories
উপন্যাস বিবিধ

শেষ ট্রেনের যাত্রী(তৃতীয় ও শেষ পর্ব: শেষ ট্রেনের শেষ সত্য)।

রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।

পুরোনো সিগন্যাল ঘরের ভিতরে দাঁড়িয়ে অর্ক সেনের মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনও দুঃস্বপ্নের মধ্যে আটকে পড়েছে। সামনে তার বাবার মুখের মতো দেখতে একজন মানুষ। পাশে তার মা মধুরিমা। আর ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ স্টেশনমাস্টার হরিপদ, যাঁর নামই কিনা বাবার হত্যার নথিতে লেখা রয়েছে।

অর্কের হাতে সেই পুরোনো ছবিটি।

ছবির পিছনে লেখা—‘সেই রাতে আমরা তিনজনই মারা গিয়েছিলাম।’

অর্ক ছবিটি তুলে ধরে বলল, “আমি আর কোনও ধাঁধা চাই না। আপনারা প্রত্যেকে নিজেদের পরিচয় দিন। সত্যিটা এখনই জানতে চাই।”

দরজার সামনে দাঁড়ানো মানুষটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“আমার নাম অরিন্দম সেন। আমি তোমার বাবা।”

অর্ক চিৎকার করে উঠল, “প্রমাণ কী?”

লোকটি পকেট থেকে একটি ছোট্ট রুপোর লকেট বের করল। লকেটটি খুলতেই ভিতরে দেখা গেল অর্কের ছোটবেলার ছবি।

“তোমার জন্মের দিন তোমার মা এই লকেটটি আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, একদিন আমাদের ছেলে বড় হলে যেন আমি ওকে এটা দিই।”

মধুরিমা লকেটটি দেখে কেঁপে উঠলেন।

“এই লকেটটা তো আমি তোমার হাতে দিয়েছিলাম, অরিন্দম!”

অর্কের মাথা ঘুরে গেল।

দুজনেই একই স্মৃতি জানেন। দুজনের কাছেই এমন কিছু প্রমাণ রয়েছে, যা তাঁদের সত্যি বলে মনে করাতে পারে।

তখন হরিপদ ধীরে ধীরে বললেন, “এবার আমার কথা শোনো। এই রহস্যের সমাধান করতে হলে তোমাকে বারো বছর আগের সেই রাতের ঘটনাটা জানতে হবে।”

তিনি ঘরের পুরোনো কাঠের চেয়ারে বসলেন।

“২০১৪ সালের ১৭ অক্টোবর, রাত এগারোটার দিকে, তোমার বাবা অরিন্দম আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁর ভাই অনিরুদ্ধ এমন একটি ষড়যন্ত্র করেছে, যা প্রকাশ পেলে অনেক প্রভাবশালী মানুষের মুখোশ খুলে যাবে। তোমার বাবা সেই ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নিয়ে আমার কাছে আসছিলেন।”

“তারপর?”

“তারপর একটি গাড়ি রেলক্রসিংয়ের কাছে দুর্ঘটনার শিকার হয়। গাড়ির ভিতরে তিনজন ছিলেন বলে পুলিশকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু গাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে যে দেহ উদ্ধার হয়েছিল, তার পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।”

অর্ক বলল, “তাহলে বাবা মারা যাননি?”

হরিপদ মাথা নিচু করলেন।

“আমি ভেবেছিলাম, তিনি মারা গিয়েছেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর যখন তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য কাগজপত্র তৈরি হচ্ছিল, তখন কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছিল। সেই সময় থেকেই আমি সন্দেহ করতে শুরু করি, দুর্ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল।”

মধুরিমা বললেন, “সেই রাতেই আমাকে অপহরণ করা হয়। অর্ককে আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমি বারবার জানতে চেয়েছিলাম, আমার স্বামী কোথায়। কিন্তু কেউ আমাকে উত্তর দেয়নি।”

অর্ক মায়ের হাত ধরল।

“তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?”

“একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে আমাকে আটকে রাখা হয়েছিল। আমার কাছে যে নথিগুলো ছিল, সেগুলোর জন্যই আমাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। ওরা ভেবেছিল, একদিন আমি নথিগুলোর অবস্থান জানিয়ে দেব।”

“কিন্তু তুমি তো এখন আমার সামনে!”

মধুরিমা মৃদু হাসলেন।

“কারণ আজকের রাতেই আমাকে শেষবারের মতো সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তুমি এখানে এসে সব হিসাব পাল্টে দিয়েছ।”

দরজার সামনে দাঁড়ানো মানুষটি হঠাৎ বলল, “অনেক হয়েছে। এবার নথিগুলো আমার হাতে দাও।”

অর্ক তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি যদি সত্যিই আমার বাবা হন, তাহলে একটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আমার জন্মের সময় মা কী বলেছিলেন?”

লোকটি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

তারপর বলল, “তিনি বলেছিলেন, আমাদের ছেলে একদিন বড় হয়ে সত্যের জন্য লড়বে।”

মধুরিমা চোখ বন্ধ করলেন।

“না। আমি বলেছিলাম, আমাদের ছেলে যেন কখনও মিথ্যার কাছে মাথা নত না করে।”

অর্ক বুঝতে পারল, লোকটি স্মৃতির কথাগুলো বদলে বলছে। কিন্তু শুধু এই ভুল দিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত করা যায় না।

ঠিক তখনই বৃদ্ধ হরিপদ উঠে দাঁড়ালেন।

“আমি জানি, কীভাবে এই রহস্যের সমাধান হবে।”

তিনি আলমারির ভিতর থেকে আরেকটি খাম বের করলেন।

খামের উপর লেখা—‘অর্কের জন্য। শুধু ১৭ অক্টোবর খুলবে।’

অর্ক খামটি খুলল।

ভিতরে একটি চিঠি এবং একটি ছোট্ট অডিও রেকর্ডার।

চিঠিতে লেখা—

‘অর্ক, যদি তুমি এই চিঠি পড়ে থাকো, তাহলে বুঝব তুমি শেষ পর্যন্ত সত্যের কাছে পৌঁছেছ। তোমাকে একটি কথা মনে রাখতে হবে। মানুষের মুখ নকল করা যায়, তার স্মৃতির অনুকরণ করা যায়, কিন্তু অপরাধের উদ্দেশ্য লুকিয়ে রাখা যায় না। যে মানুষ তোমাকে সত্যের বদলে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে, তাকে কখনও বিশ্বাস করবে না।’

চিঠির নীচে স্বাক্ষর—

অরিন্দম সেন।

অর্ক রেকর্ডারটি চালু করল।

প্রথমে কিছু শব্দ, তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ।

“আমি অরিন্দম সেন। আমার যমজ ভাই অনিরুদ্ধ বহু বছর ধরে আমার পরিচয় ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সে একা নয়। আমাদের পরিবারের সম্পত্তি দখলের ষড়যন্ত্রে আরও একজন জড়িত। সেই মানুষটি আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহকর্মী। আমি যদি আর ফিরে না আসি, তাহলে হরিপদকে বিশ্বাস করবে। সে ভুল করেছে, কিন্তু সে আমার হত্যাকারী নয়।”

রেকর্ডিং শেষ হল।

অর্ক ধীরে ধীরে হরিপদের দিকে তাকাল।

“আপনি তাহলে ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না?”

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আমি একটি ভুল করেছিলাম। তোমার বাবার অনুরোধ সত্ত্বেও আমি তাঁর যাত্রার কথা অন্য একজনকে জানিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সে তাঁকে সাহায্য করবে। কিন্তু সেই তথ্যই ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে পৌঁছে যায়। তোমার বাবাকে বাঁচাতে পারিনি। তারপর থেকে অপরাধবোধ আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে।”

“সেই অন্য মানুষটি কে?”

হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগেই দরজার বাইরে থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

“সেই মানুষটি আমি।”

ঘরের সবাই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকাল।

সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন বৃদ্ধ। সাদা চুল, কালো কোট, হাতে লাঠি। তাঁর মুখে অদ্ভুত এক হাসি।

অর্ক তাঁকে চিনতে পারল।

তিনি দেবব্রত সেন—অর্কের দাদু।

কিন্তু তাঁর তো বহু বছর আগেই মৃত্যু হয়েছিল!

অর্ক হতবাক হয়ে বলল, “দাদু! আপনি বেঁচে আছেন?”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকলেন।

“হ্যাঁ, অর্ক। আমি বেঁচে আছি। আর তোমার পরিবারের এই সমস্ত বিপর্যয়ের জন্য আমিই দায়ী।”

মধুরিমা চিৎকার করে উঠলেন, “দেবব্রতবাবু! আপনি নিজের ছেলেকেও রেহাই দেননি!”

দেবব্রত মাথা নিচু করলেন না। বরং ঠান্ডা গলায় বললেন, “আমি যা করেছি, সব করেছি পরিবারকে বাঁচানোর জন্য।”

অর্ক ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল।

“পরিবারকে বাঁচানোর জন্য নিজের ছেলেকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন?”

“তোমার বাবা পরিবারের সম্পত্তি বিক্রি করে সমস্ত টাকা একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে দান করতে চেয়েছিল। আমি সেটা মেনে নিতে পারিনি। সেই সম্পত্তির উপর আমার অধিকার ছিল।”

“তাই আপনি অনিরুদ্ধের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ। অনিরুদ্ধকে আমি ফিরিয়ে এনেছিলাম। ওকে তোমার বাবার পরিচয় নিতে সাহায্য করেছিলাম। পরিকল্পনা ছিল, অরিন্দমকে সরিয়ে দিয়ে অনিরুদ্ধকে পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। তারপর সম্পত্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।”

অর্কের চোখে ঘৃণা।

“আর মা?”

“মধুরিমা নথিগুলোর অবস্থান জানত। তাই তাকে বন্দি রাখা হয়েছিল।”

“আর আমাকে?”

দেবব্রত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “তোমাকে অন্য পরিচয়ে বড় করা হয়েছিল, যাতে তুমি কখনও এই পরিবারের সত্য জানতে না পারো। আমি ভেবেছিলাম, তুমি কিছুই মনে রাখতে পারবে না।”

অর্কের চোখে জল এসে গেল।

“আপনি আমার দাদু ছিলেন। আমি ছোটবেলায় আপনার ছবি দেখে আপনাকে মনে করার চেষ্টা করেছি। আর আপনি আমার জীবনটাই মিথ্যে দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছিলেন!”

দেবব্রত প্রথমবারের মতো চোখ নামিয়ে নিলেন।

কিন্তু তাঁর মুখে অনুশোচনার চিহ্ন খুব সামান্য।

“আমি ভুল করেছি। কিন্তু এখন আর কিছু বদলানো সম্ভব নয়। নথিগুলো আমাকে দাও। আমি তোমার মাকে মুক্তি দেব।”

অর্ক বলল, “আপনি এখনও ভাবছেন, আমি আপনার সঙ্গে সমঝোতা করব?”

দেবব্রত লাঠির মাথায় চাপ দিলেন। ঘরের এক কোণে লুকোনো একটি দরজা খুলে গেল।

সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন সেই মানুষটি, যাকে অর্ক এতক্ষণ নিজের বাবা বলে ভাবছিল।

লোকটি এবার মুখের উপর থেকে একটি পাতলা কৃত্রিম আবরণ খুলে ফেলল।

অর্ক দেখল, মুখটি অরিন্দমের মতো হলেও চোখে অন্য রকম চাহনি।

লোকটি বলল, “আমি অনিরুদ্ধ সেন। তোমার কাকা। আর তোমার বাবা কোথায় আছে, সেটা একমাত্র আমি জানি।”

অর্ক তার দিকে এগিয়ে গেল।

“আমার বাবা বেঁচে আছেন?”

অনিরুদ্ধ মুচকি হাসল।

“হয়তো। হয়তো নেই। তুমি যদি নথিগুলো দাও, তাহলে জানতে পারবে।”

মধুরিমা চিৎকার করে উঠলেন, “ওর কথা বিশ্বাস কোরো না!”

অনিরুদ্ধ পকেট থেকে একটি ছোট্ট ছবি বের করল।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি অন্ধকার ঘরে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় বসে আছেন অরিন্দম সেন। ছবির নীচে লেখা—‘শেষ সাক্ষাৎ’।

অর্কের বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

“কোথায় তিনি?”

অনিরুদ্ধ বলল, “পুরোনো রেলওয়ে টানেলের শেষ প্রান্তে। কিন্তু সেখানে পৌঁছনোর আগে তোমাকে আমার সঙ্গে আসতে হবে।”

হরিপদ বাধা দিতে গেলেন। দেবব্রত লাঠি তুলে তাঁকে থামিয়ে দিলেন।

ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল।

অনিরুদ্ধ চমকে উঠল।

“পুলিশ এখানে এল কীভাবে?”

অর্ক শান্ত গলায় বলল, “আমি স্টেশনে আসার আগেই সমস্ত তথ্য আমার সহকর্মীকে পাঠিয়েছিলাম। আমার ফোনে নেটওয়ার্ক না থাকলেও, স্টেশনে ঢোকার আগে পাঠানো বার্তাগুলো পৌঁছে গিয়েছিল। আমি তাকে বলেছিলাম, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমার খবর না পেলে পুলিশকে জানাতে।”

দেবব্রত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন।

“তুমি সব নষ্ট করে দিলে!”

তিনি দরজার দিকে দৌড়তে গেলেন। কিন্তু ঠিক তখনই পুলিশ সিগন্যাল ঘরে ঢুকে পড়ল।

অনিরুদ্ধ পালানোর চেষ্টা করল। একজন পুলিশকর্মী তাকে ধরে ফেললেন। দেবব্রতকেও আটক করা হল।

কিন্তু অর্কের একটাই প্রশ্ন—

তার বাবা কোথায়?

হরিপদ দ্রুত বললেন, “টানেল। আমাদের এখনই সেখানে যেতে হবে।”

পুলিশের সাহায্যে অর্ক, মধুরিমা ও হরিপদ পুরোনো রেলওয়ে টানেলের দিকে রওনা দিলেন।

টানেলের ভিতরে অন্ধকার। দেওয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ। মাটিতে ছড়িয়ে রয়েছে পুরোনো কাঠ আর লোহার টুকরো।

শেষ প্রান্তে একটি ছোট্ট ঘর।

দরজা খুলতেই অর্ক দেখতে পেল, একজন মানুষ মেঝেতে বসে আছেন। মুখে দাড়ি, চুল এলোমেলো, শরীর দুর্বল।

কিন্তু চোখ দুটি অর্কের অচেনা নয়।

অর্ক দৌড়ে গিয়ে তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।

“বাবা!”

লোকটি ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।

“অর্ক?”

অর্ক বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

বারো বছর ধরে যে মানুষটির মৃত্যুশোক বয়ে বেড়িয়েছে, তিনি তার সামনে জীবিত।

অরিন্দম কাঁপা হাতে ছেলের মুখ ছুঁয়ে বললেন, “তুই এত বড় হয়ে গেছিস! আমি জানতাম, একদিন তুই সত্যের খোঁজে আসবি।”

মধুরিমা স্বামীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।

“আমি ভেবেছিলাম, আর কোনও দিন তোমাকে দেখতে পাব না।”

অরিন্দম বললেন, “ওরা আমাকে বছরের পর বছর আটকে রেখেছিল। আমাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, যাতে কেউ আমার খোঁজ না করে। কিন্তু আমি জানতাম, অর্ক একদিন সব খুঁজে বের করবে।”

অর্ক বলল, “বাবা, তুমি জানতেই কীভাবে যে আমি আসব?”

অরিন্দম মৃদু হাসলেন।

“কারণ সত্যকে যতই চাপা দেওয়া হোক, একদিন না একদিন কেউ না কেউ তার খোঁজ করবেই। আমি শুধু আশা করেছিলাম, সেই মানুষটা তুই হবি।”

পুলিশ অরিন্দমকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে এল।

ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। শালবনি রোড স্টেশনের কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

কিন্তু অর্কের মনে আরও একটি প্রশ্ন রয়ে গেল।

“বাবা, সেই ট্রেনটা কী? কেন প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর এখানে আসে? কেন আমি বারবার একই সময় দেখতে পাচ্ছিলাম?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন, “তুই যে ট্রেন দেখেছিস, সেটা কোনও ভূতের ট্রেন নয়। বারো বছর আগে দুর্ঘটনার রাতে এই লাইনে একটি বিশেষ ট্রেন দাঁড়িয়েছিল। সেই ট্রেনের কয়েকজন যাত্রী ষড়যন্ত্রের সাক্ষী হয়েছিলেন। পরে তাঁদের পরিচয় গোপন করা হয়। রেলওয়ের কিছু কর্মী আর স্থানীয় কয়েকজন মানুষ মিলে প্রতি বছর ওই রাতের স্মৃতি ধরে রাখতেন। পুরোনো মাইক, বন্ধ সিগন্যাল আর স্টেশনের আলো ব্যবহার করে একটা রহস্যের আবহ তৈরি হয়েছিল, যাতে কেউ সহজে সত্যের কাছে পৌঁছতে না পারে।”

অর্ক অবাক হয়ে বলল, “তাহলে সময় থেমে যাওয়ার ব্যাপারটা?”

হরিপদ বললেন, “স্টেশনের পুরোনো ঘড়ি বহু বছর ধরে নষ্ট। আর তোর ফোনে সময় আটকে যাওয়ার কারণ ছিল দুর্বল নেটওয়ার্ক ও যন্ত্রের সমস্যা। তুই যখন ভয় পেয়েছিলি, তখন প্রতিটি ঘটনাকে আরও রহস্যময় মনে হচ্ছিল। তবে সবকিছু যে সাজানো ছিল, তা নয়। তোর বাবাকে সত্যিই বন্দি করে রাখা হয়েছিল, তোর মাকে সত্যিই অপহরণ করা হয়েছিল, আর তোর পরিবারকে সত্যিই ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছিল।”

অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

সে বুঝতে পারল, সব রহস্যের উত্তর অতিপ্রাকৃত নয়। কখনও কখনও মানুষের লোভ, ভয় আর অপরাধই ভূতের গল্পের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

কয়েক মাস পরে আদালতে দেবব্রত সেন ও অনিরুদ্ধ সেনের বিরুদ্ধে মামলা শুরু হল। তদন্তে আরও কয়েকজনের নাম উঠে এল। হরিপদ নিজের ভুলের কথা স্বীকার করে তদন্তে সহযোগিতা করলেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বহু পুরোনো নথি উদ্ধার করা সম্ভব হল।

অর্ক আবার কলকাতায় ফিরে গেল।

কিন্তু এবার সে আর আগের অর্ক নয়।

সে নিজের সংবাদপোর্টালে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করল—

‘শেষ ট্রেনের যাত্রী: ভূতের গল্পের আড়ালে বারো বছরের অপরাধ।’

প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে আলোড়ন পড়ে গেল। বহু মানুষ জানতে পারলেন, কীভাবে একটি পরিবারকে সম্পত্তির লোভে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছিল।

এক বছর পর, ১৭ অক্টোবর।

অর্ক আবার শালবনি রোড স্টেশনে এল। এবার তার সঙ্গে বাবা-মা দুজনেই রয়েছেন।

প্ল্যাটফর্মের পুরোনো ঘড়িটি মেরামত করা হয়েছে। মাইকেও আর কোনও অদ্ভুত ঘোষণা শোনা যায় না।

রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে অর্ক একবার ঘড়ির দিকে তাকাল।

ঠিক সেই সময় দূরে একটি ট্রেনের আলো দেখা গেল।

অর্কের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।

ট্রেনটি ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।

একজন বৃদ্ধ যাত্রী নেমে অর্কের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতে একটি কালো ডায়েরি।

অর্ক চমকে উঠল।

এটা সেই ডায়েরি, যেটি এক বছর আগে বৃদ্ধ স্টেশনমাস্টার হরিপদ তাকে দিয়েছিলেন!

বৃদ্ধ ডায়েরিটি অর্কের হাতে দিয়ে বললেন, “সব সত্যি কি জানতে পেরেছ?”

অর্ক উত্তর দিল, “হ্যাঁ। সব রহস্যের সমাধান হয়েছে।”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

“তাহলে শেষ পাতাটা পড়ে দেখো।”

অর্ক ডায়েরির শেষ পাতা খুলল।

সেখানে লেখা—

‘১৭ অক্টোবর, ২০২৬। আজ শেষ ট্রেনটি আর কাউকে নিয়ে যাবে না। কারণ যে সত্য এত বছর ধরে অন্ধকারে বন্দি ছিল, আজ সে মুক্ত।’

অর্ক মুখ তুলে তাকাল।

বৃদ্ধ আর সেখানে নেই।

প্ল্যাটফর্মে শুধু অর্ক, তার বাবা-মা আর সকালের দিকে ছুটে চলা কয়েকজন যাত্রী।

অর্ক ডায়েরিটি বন্ধ করে দিল।

সে জানত না, বৃদ্ধটি সত্যিই হরিপদ ছিলেন, নাকি তার ক্লান্ত মনের কল্পনা। তবে এবার সে ভয় পেল না।

কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, রহস্যের অন্ধকার যত গভীরই হোক, সত্যের সন্ধান থামিয়ে দেওয়া যায় না।

অরিন্দম ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।

“চল, বাড়ি যাই।”

অর্ক মায়ের হাত ধরল। তারপর বাবার সঙ্গে স্টেশন থেকে বেরিয়ে এল।

পিছনে রেললাইনের উপর সূর্যের আলো পড়েছে।

শেষ ট্রেনটি ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল।

এবার তার কোনও রহস্য নেই।

কোনও বন্দি যাত্রী নেই।

কোনও অসমাপ্ত অপেক্ষা নেই।

শুধু একটি পরিবারের ফিরে পাওয়া জীবন, আর একজন সাংবাদিকের অটুট বিশ্বাস—

“মিথ্যে যত শক্তিশালীই হোক, সত্যকে চিরকাল আটকে রাখা যায় না।”

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *