Categories
উপন্যাস বিবিধ

যে বাড়িতে কেউ নিজের নাম বলতে পারে না ((দ্বিতীয় পর্ব: অষ্টম মানুষের মুখ))।

“এবার বল, আমাদের মধ্যে আসল ঈশান কে?”

অন্ধকারের মধ্যে প্রশ্নটি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। ঈশান বুঝতে পারছিল না, সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। তার পায়ের নিচে কাঠের মেঝে, সামনে লম্বা টেবিল, আর চারপাশে অজস্র মানুষের নিঃশ্বাস। কিন্তু কেউ নড়ছে না।

হঠাৎ অনির্বাণের গলা শোনা গেল।

“ঈশান! আমার হাত ধর! এখান থেকে বেরোতে হবে!”

ঈশান হাত বাড়িয়ে দিল। এবার সত্যিই বন্ধুর হাত পেল। দু’জনে দরজার দিকে ছুটল। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছতেই অন্ধকারের মধ্যে সেই অষ্টম মানুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

“পালিয়ে লাভ নেই, ভাই। এই বাড়ি থেকে কেউ নিজের পরিচয় নিয়ে বেরোতে পারে না।”

ঈশান থমকে দাঁড়াল।

“তুমি কে?”

“আমি সেই মানুষ, যাকে তুমি সারাজীবন ভুলে থেকেছ।”

“তোমার মুখ আমার মতো কেন?”

“কারণ তুই আমার মুখ নিয়ে বেঁচে আছিস।”

কথাটি শেষ হতেই ঘরের সমস্ত আলো জ্বলে উঠল।

টেবিলের বিপরীতে বসে থাকা মানুষটিকে এবার স্পষ্ট দেখা গেল। তার মুখ ঈশানের হুবহু অনুরূপ। কপালের বাঁ দিকে ছোট্ট একটি কাটা দাগ, ঠোঁটের পাশে তিল—সবকিছু এক। শুধু গলায় কালচে ক্ষতচিহ্ন।

ঈশান নিজের গলায় হাত দিল। সেখানে কোনও ক্ষত নেই।

অষ্টম মানুষটি উঠে দাঁড়াল।

“আমার নাম জানতে চাইছিস? নাম বললে এই বাড়ি আমাকে চিনে ফেলবে। আর বাড়ি আমাকে চিনে ফেললে তোর জন্য আর কোনও পথ খোলা থাকবে না।”

ঈশান রাগে চিৎকার করে উঠল, “তুমি যা-ই হও, আমার পরিচয় নিয়ে মিথ্যে বলার অধিকার তোমার নেই!”

লোকটি হাসল।

“তোর পরিচয়? যে পরিচয় অন্য একজনের জীবন থেকে চুরি করা, সেটা কি সত্যিই তোর?”

ঠিক তখনই ঘরের বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলেন, “থামো! ছেলেটাকে আর কষ্ট দিও না!”

অষ্টম মানুষটি তাঁর দিকে তাকাল।

“আপনি তো সব জানেন, ঠাকুমা। আপনি কেন ওকে সত্যিটা বলেননি?”

বৃদ্ধা মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন।

ঈশান এবার তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

“আপনি আমাকে চেনেন? আপনি কি আমার পরিবারের কেউ?”

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।

“আমি তোর ঠাকুমা, ঈশান।”

ঈশান স্তব্ধ হয়ে গেল।

তার বাবা কোনও দিন তাঁর ঠাকুমার কথা বলেননি। শুধু বলেছিলেন, পরিবারের সঙ্গে বহু বছর আগে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

“আপনি এখানে কেন? আর এই লোকটা কে?”

বৃদ্ধা উত্তর দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। তাঁর চোখ চলে গেল দেয়ালের ঘড়ির দিকে।

রাত ১২টা ১৭ মিনিট।

ঘড়ির কাঁটা চলেছে, অথচ বাড়ির বাইরে থেকে কোনও শব্দ আসছে না।

বৃদ্ধা ফিসফিস করে বললেন, “আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। এই বাড়ির নিয়ম একবার ভাঙলে, বাড়ি তার মূল্য নেয়।”

“কী নিয়ম?”

“এখানে নিজের নাম বলা যায় না। কারণ এই বাড়ির প্রতিটি নামের সঙ্গে একটি জীবন বাঁধা আছে। কেউ যদি নিজের নাম উচ্চারণ করে, বাড়ি তার স্মৃতি খুলে দেয়। আর যে স্মৃতি খুলে যায়, তাকে আর আগের মতো বন্ধ করা যায় না।”

অনির্বাণ ক্যামেরাটি বুকে চেপে ধরে বলল, “এ সব অসম্ভব! একটা বাড়ি কীভাবে মানুষের নাম আর স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করবে?”

বৃদ্ধা তার দিকে তাকালেন।

“তুমি এখানে অতিথি। তোমার স্মৃতি এখনও এই বাড়ির সঙ্গে বাঁধা পড়েনি। তাই তুমি চাইলে চলে যেতে পারো।”

অনির্বাণ সঙ্গে সঙ্গে দরজার দিকে ছুটল।

কিন্তু দরজায় হাত রাখতেই সে থেমে গেল।

তার চোখের সামনে যেন অন্য কোনও দৃশ্য ভেসে উঠেছে। সে ফ্যাকাশে হয়ে পিছিয়ে এল।

ঈশান জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে?”

অনির্বাণ কাঁপা গলায় বলল, “দরজার ওপারে আমার বাড়ি নেই।”

“মানে?”

“দরজা খুলে দেখলাম, আমি একটা হাসপাতালের ঘরে দাঁড়িয়ে আছি। বিছানায় কেউ শুয়ে আছে। তার মুখ আমার মতো। আর পাশে দাঁড়িয়ে একজন ডাক্তার বলছে—‘রোগীকে আর বাঁচানো সম্ভব নয়।’”

ঈশান বন্ধুর কাঁধ ধরল।

“তুমি নিশ্চয়ই ভুল দেখেছ।”

অনির্বাণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“ঈশান, বিছানায় যে মানুষটা শুয়ে ছিল, তার মুখে আমারই ক্যামেরা ঝুলছিল।”

কথাটি শুনে ঘরের বাতাস যেন আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।

অষ্টম মানুষটি মৃদু হেসে বলল, “বাড়ি এখন তোমাকেও চিনতে শুরু করেছে, অনির্বাণ।”


বৃদ্ধা সবাইকে নিয়ে গেলেন বাড়ির উত্তর দিকের একটি ছোট ঘরে। দরজাটি খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঈশান দেখল, ঘরের মাঝখানে একটি কাঠের দোলনা। দেওয়ালে ঝুলছে একটি পুরোনো ক্যালেন্ডার। তারিখ—১৪ জুন ১৯৯৪।

দোলনার পাশে একটি লোহার বাক্স। বাক্সের গায়ে খোদাই করা দুটি নাম।

‘ঈশান’ এবং ‘অর্ণব’।

ঈশান নাম দুটি পড়ে চমকে উঠল।

“অর্ণব কে?”

বৃদ্ধা দোলনার পাশে বসে পড়লেন।

“তোমার জন্মের সময় তোমার মা যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। দুই ছেলে। একজনের নাম রাখা হয়েছিল ঈশান, অন্যজনের নাম অর্ণব।”

ঈশানের মাথা ঘুরে উঠল।

“যমজ? কিন্তু বাবা তো কখনও বলেননি!”

“তোর বাবা অনেক কিছুই বলেননি। কারণ সে সময়ে এই পরিবারের ওপর এমন একটা বিপদ নেমে এসেছিল, যার কথা কেউ বিশ্বাস করত না।”

বৃদ্ধা বাক্সটি খুললেন।

ভেতরে ছিল দুটি শিশুর হাসপাতালের পরিচয়পত্র, একটি রুপোর লকেট এবং কয়েকটি পুরোনো চিঠি।

ঈশান একটি পরিচয়পত্র তুলে নিল।

তাতে লেখা—

শিশু ১: অর্ণব রায়।

শিশু ২: ঈশান রায়।

জন্মতারিখ: ১৪ জুন ১৯৯৪।

মায়ের নাম: মধুমিতা রায়।

বাবার নাম: অরিন্দম রায়।

ঈশান কাগজটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার নিজের পরিচয়পত্রে পদবি সেন। তার বাবার নামও অরিন্দম সেন নয়।

“আমার বাবার নাম অরিন্দম সেন,” সে বলল। “আমি ঈশান সেন। এই কাগজে অন্য নাম কেন?”

বৃদ্ধা চোখ মুছলেন।

“তোর বাবার আসল নাম অরিন্দম রায়। তোর মা বিয়ের পর রায়বাড়িতে এসেছিলেন। কিন্তু তোর জন্মের রাতেই সব বদলে যায়।”

“কী হয়েছিল সেই রাতে?”

বৃদ্ধা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।

তারপর বলতে শুরু করলেন।

“রায়বাড়িতে বহু বছর ধরে একটি অদ্ভুত বিশ্বাস ছিল। পরিবারের প্রথম সন্তান জন্মালে তাকে বাড়ির পুরোনো উত্তরাধিকারী কক্ষে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে একটি আয়না ছিল। পরিবারের লোকেরা বিশ্বাস করত, সেই আয়না শিশুর ভবিষ্যৎ দেখাতে পারে। কিন্তু তোমার জন্মের রাতে আয়নায় দুটি শিশুর প্রতিবিম্ব দেখা যায়, অথচ ঘরে তখন একটি শিশুই ছিল বলে সবাই মনে করেছিল।”

ঈশান বলল, “কিন্তু আপনি তো বললেন যমজ সন্তান ছিল।”

“হ্যাঁ। পরে আমরা জানতে পারি, দুটি শিশুই জন্মেছিল। কিন্তু জন্মের পরপরই একজনকে অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। কে নিয়ে গিয়েছিল, কেউ জানত না। হাসপাতালের নথিতে দুটি শিশুর নাম থাকলেও পরিবারের কাছে ছিল একটি শিশুই।”

ঈশান লোহার বাক্সটি শক্ত করে ধরল।

“তাহলে আমার ভাই কোথায় ছিল?”

বৃদ্ধা তার দিকে তাকালেন।

“এই বাড়িতেই।”

ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা অষ্টম মানুষটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

“আমিই অর্ণব।”

ঈশান তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“তাহলে এতদিন কোথায় ছিলে?”

অর্ণবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তুই বাইরে বড় হয়েছিস। স্কুলে গেছিস, কলেজে পড়েছিস, নিজের জীবন তৈরি করেছিস। আর আমি এই বাড়ির ভেতরে আটকে থেকেছি। এখানে সময় চলে না। মানুষ বুড়ো হয় না। কিন্তু স্মৃতিগুলো প্রতিদিন নতুন করে যন্ত্রণা দেয়।”

“কিন্তু কেন?”

অর্ণব বৃদ্ধার দিকে তাকাল।

“কারণ ঠাকুমা আর বাবা ভয় পেয়েছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, এই বাড়ির উত্তরাধিকারী একজনই হতে পারে। দুই ভাই একসঙ্গে থাকলে বাড়ির অভিশাপ জেগে উঠবে।”

ঈশান অবিশ্বাসে মাথা নাড়ল।

“এসব কুসংস্কার! আমাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আর তোমাকে এখানে আটকে রাখা হয়েছিল—এটাই কি সত্যি?”

অর্ণব উত্তর দিল না।

সে শুধু লকেটটি তুলে ঈশানের হাতে দিল।

লকেট খুলতেই দেখা গেল, ভেতরে দুটি শিশুর ছবি। একজনের গলায় একটি ছোট্ট কালো দাগ। অন্যজনের কপালে জন্মদাগ।

ঈশান ছবির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, কালো দাগটি অর্ণবের গলায় থাকা ক্ষতের মতো।

“তোমার গলার এই দাগ কীভাবে হলো?”

অর্ণব গম্ভীর হয়ে বলল, “যে রাতে তুই এই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলি, সেই রাতেই।”

ঈশান হতবাক হয়ে গেল।

“আমি এই বাড়িতে কখনও আসিনি!”

অর্ণব ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“তোর স্মৃতি তাই বলে। কিন্তু তোর শরীর অন্য কথা জানে।”

সে ঈশানের কপালের দিকে আঙুল তুলল।

“তোর কপালের বাঁ দিকে যে ছোট্ট দাগটা আছে, সেটা কীভাবে হয়েছিল মনে আছে?”

ঈশান উত্তর দিতে পারল না।

তার শৈশবের অনেক স্মৃতিই অস্পষ্ট। সে শুধু জানত, ছোটবেলায় একবার পড়ে গিয়ে কপালে আঘাত পেয়েছিল। কিন্তু কোথায়, কীভাবে—কিছুই মনে নেই।

অর্ণব বলল, “সেই রাতেই তুই আর আমি উত্তরাধিকারী কক্ষের আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। তারপর আয়নাটা ভেঙে যায়। আমি গুরুতর আহত হই। তুই অজ্ঞান হয়ে পড়িস। সকালে যখন জ্ঞান ফিরল, তুই আর এই বাড়িতে ছিলি না।”

“আমাকে কে নিয়ে গিয়েছিল?”

“তোর বাবা।”

“আর তোমাকে?”

অর্ণব চোখ নামিয়ে বলল, “আমাকে কেউ নিয়ে যায়নি।”


হঠাৎ বাড়ির ওপরতলা থেকে ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ হলো।

ধপ!

তারপর এক মহিলার কান্না।

ঈশান সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। অনির্বাণ তার পিছু নিল।

দোতলার করিডরে পৌঁছে তারা দেখল, একটি দরজা আধখোলা। দরজার ওপারে একটি বড় ঘর। দেয়ালে সারি সারি ছবি। সব ছবিতে একই মহিলা—ঈশানের মা মধুমিতা।

কিন্তু প্রতিটি ছবিতে তাঁর বয়স আলাদা।

কোথাও তিনি তরুণী, কোথাও মধ্যবয়স্ক, কোথাও তাঁর চুল পেকে গেছে।

সবচেয়ে শেষের ছবিটিতে তিনি বৃদ্ধা। ছবির নিচে লেখা—

‘মধুমিতা রায়। মৃত্যু: ১৪ জুন ২০২৬।’

ঈশানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

তার মা তো বহু বছর আগেই মারা গিয়েছিলেন!

সে ছবির নিচের তারিখের দিকে তাকাল।

২০২৬।

বর্তমান বছর।

“এটা কীভাবে সম্ভব?” ঈশান ফিসফিস করে বলল।

ঘরের কোণ থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।

“কারণ তুই কখনও আমার মৃত্যুর দিন দেখিসনি, ঈশান।”

একজন মহিলা ধীরে ধীরে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন।

চুলে পাক ধরেছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু চোখ দুটি ঈশান স্পষ্ট চিনতে পারল।

তার মা।

ঈশানের ঠোঁট কাঁপতে লাগল।

“মা…”

মধুমিতা হাত তুলে তাকে থামালেন।

“আমার নাম বলিস না। এই বাড়ি আমাদের কথা শুনছে।”

ঈশান মায়ের কাছে এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু মধুমিতা পিছিয়ে গেলেন।

“আমাকে ছুঁস না। তুই যদি আমাকে ছুঁয়ে ফেলিস, বাড়ি বুঝে যাবে তুই কে।”

“আমি তোমার ছেলে!”

মধুমিতার চোখে জল এসে গেল।

“তুই আমার ছেলে। কিন্তু তুই যে ঈশান, সেটা প্রমাণ করার জন্য তোকে আরও একটা সত্যি জানতে হবে।”

“কী সত্যি?”

মধুমিতা দরজার বাইরে তাকালেন।

করিডরের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে অর্ণব।

তার মুখে আর কোনও হাসি নেই।

মধুমিতা ফিসফিস করে বললেন, “এই বাড়িতে দু’জন যমজ সন্তান জন্মেছিল ঠিকই। কিন্তু তাদের মধ্যে একজন জন্মের সময়ই মারা গিয়েছিল।”

ঈশানের শরীর অবশ হয়ে গেল।

“কিন্তু আপনি তো বললেন…”

“আমি বলেছিলাম, দুটি শিশুর নাম নথিতে লেখা হয়েছিল। আমি বলিনি, দু’জনেই বেঁচে ছিল।”

মধুমিতা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “যে শিশুটি মারা গিয়েছিল, তার নাম ছিল অর্ণব। আর যে শিশুটি বেঁচে ছিল, তার নাম ঈশান।”

ঈশান পিছিয়ে গেল।

“না! অর্ণব তো আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে!”

মধুমিতা অন্ধকারের দিকে তাকালেন।

“সেটাই তো এই বাড়ির সবচেয়ে বড় রহস্য। অর্ণবের জন্ম হয়েছিল, কিন্তু তার জীবন কখনও শুরু হয়নি। এই বাড়ির আয়না তাকে একটি জীবন দিয়েছে। আর সেই জীবন বাঁচিয়ে রাখতে প্রতি বছর বাড়িটিকে একজন মানুষের স্মৃতি খেতে হয়।”

ঈশান স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তাহলে আমি কে?”

মধুমিতা তার মুখ দু’হাতে ধরে বললেন, “তুই আমার জীবিত ছেলে। কিন্তু এই বাড়ির কাছে তুই শুধু একজন মানুষ নোস। তুই সেই দরজা, যার মাধ্যমে অর্ণব এই পৃথিবীতে সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসতে পারে।”

ঠিক তখনই বাড়ির সব আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে অর্ণবের কণ্ঠ শোনা গেল—

“মা, তুমি সব বলে দিলে?”

তারপর এক প্রচণ্ড শব্দে জানালার কাচ ভেঙে গেল।

মধুমিতা ঈশানকে ঠেলে দরজার বাইরে পাঠিয়ে দিলেন।

“দৌড়ে পালা! উত্তর দিকের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যা!”

ঈশান মায়ের হাত ধরতে গেল।

“তোমাকে ছেড়ে যাব না!”

মধুমিতা চিৎকার করে উঠলেন, “তুই যদি এখানে থাকিস, অর্ণব তোর জীবন নিয়ে নেবে!”

ঈশান পিছনে তাকিয়ে দেখল, অর্ণব ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। তার শরীরের চারপাশে কালো ধোঁয়া পাক খাচ্ছে। গলার ক্ষত থেকে রক্ত নয়, কালো তরল গড়িয়ে পড়ছে।

অর্ণব বলল, “আমি তোর জীবন নিতে চাই না, ভাই। আমি শুধু নিজের জীবনটা ফিরে পেতে চাই।”

“তাহলে আমাকে যেতে দাও!”

“তুই চলে গেলে আমি আবার অন্ধকারে ফিরে যাব। আর আমি আর অন্ধকারে থাকতে চাই না।”

অর্ণব হাত বাড়াল।

ঈশান দৌড় দিল।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সে বসার ঘরে পৌঁছল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল।

সামনের দরজাটি খুলে গেছে।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে অনির্বাণ।

তার হাতে ক্যামেরা। মুখে অদ্ভুত হাসি।

“ঈশান, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আয়!”

ঈশান বন্ধুর দিকে এগিয়ে গেল।

ঠিক তখনই তার পেছন থেকে মায়ের চিৎকার শোনা গেল—

“ঈশান! ও অনির্বাণ নয়!”

ঈশান থেমে গেল।

দরজায় দাঁড়ানো মানুষটি ধীরে ধীরে ক্যামেরা নামাল।

তার মুখ বদলে যেতে লাগল।

অনির্বাণের মুখ মিলিয়ে গেল। তার জায়গায় দেখা দিল ঈশানের নিজের মুখ।

তারপর সে হাসতে হাসতে বলল—

“তুই এখনও বুঝতে পারছিস না, ভাই? এই বাড়িতে আটজন মানুষ থাকার কথা ছিল। কিন্তু এখন আমরা নয়জন।”

ঈশান পেছনে তাকাল।

সিঁড়ির ওপর অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে।

দোতলার করিডরে মা।

বসার ঘরে বৃদ্ধা।

টেবিলের চারপাশে সাতজনের ছায়া।

আর দরজায় দাঁড়ানো সেই অচেনা মানুষটি।

ঈশান দ্রুত গুনল।

এক, দুই, তিন…

আট।

তারপর আবার গুনল।

নয়।

কিন্তু নবম মানুষটি কে?

ঠিক তখনই তার পকেটে রাখা মোবাইল ফোন বেজে উঠল।

পর্দায় একটি অচেনা নম্বর।

ঈশান কাঁপা হাতে ফোন ধরল।

ওপাশ থেকে অনির্বাণের আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এল—

“ঈশান! আমি বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছি! তুই কোথায়? আমি তোকে খুঁজে পাচ্ছি না!”

ঈশান দরজার দিকে তাকাল।

সেখানে দাঁড়ানো তার নিজের মুখের মানুষটি ধীরে ধীরে হাত তুলল।

তার আঙুলের ফাঁকে ঝুলছে অনির্বাণের ক্যামেরা।

আর ক্যামেরার পর্দায় দেখা যাচ্ছে একটি লাইভ ছবি।

ছবিতে ঈশান নিজে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির মাঝখানে।

তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে অর্ণব।

অর্ণবের হাতে একটি ছুরি।

আর ঈশানের গলায় রক্তের দাগ।

ক্যামেরার ছবির নিচে লাল অক্ষরে ফুটে উঠল—

‘আগামীকাল রাত বারোটায় ঈশানের মৃত্যু হবে।’

দরজায় দাঁড়ানো মানুষটি ফিসফিস করে বলল—

“এবার সিদ্ধান্ত নে, ভাই। তুই বাঁচবি, নাকি আমি?”

ঠিক তখনই দেয়ালের ঘড়ি বারোটা বাজিয়ে দিল।

আর রায়বাড়ির সমস্ত দরজা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *