Categories
প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

অর্ধেক মঞ্চের অধিকার।

নাট্যপুরের একটি পুরোনো নাট্যদলে বহু বছর ধরে নাটক মঞ্চস্থ হতো। দলের পরিচালক ছিলেন অরুণেশবাবু। তিনি বিশ্বাস করতেন, মঞ্চে সাফল্য পেতে হলে অভিনেতার কণ্ঠস্বর জোরালো হওয়া দরকার, সংলাপ মুখস্থ থাকতে হবে এবং দর্শকের সামনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাঁড়াতে জানতে হবে।

দলে নতুন যোগ দিল মৈত্রী। সে খুব ভালো অভিনয় করত, কিন্তু কথা বলার সময় একটু তোতলাত। বিশেষ করে অনেক মানুষের সামনে দাঁড়ালে তার কথা আটকে যেত। অথচ মুখের অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা এবং শরীরী অভিনয়ে সে ছিল অসাধারণ।

প্রথম দিন মহড়ায় মৈত্রী সংলাপ বলতে গিয়ে থেমে গেল। কয়েকজন অভিনেতা মুচকি হাসল। পরিচালক বিরক্ত হয়ে বললেন, “মঞ্চে উঠলে এভাবে থেমে গেলে নাটক চলবে কী করে? তোমাকে আপাতত পেছনের কাজ করতে হবে।”

মৈত্রী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানত, তার কথা বলতে সমস্যা হয়। কিন্তু অভিনয় করার স্বপ্ন সে ছোটবেলা থেকে লালন করেছে। স্কুলে একবার নীরব অভিনয়ের প্রতিযোগিতায় সে পুরস্কারও পেয়েছিল। তার বিশ্বাস ছিল, অভিনয়ের ভাষা শুধু সংলাপ নয়।

পরের কয়েক সপ্তাহ সে দলের সঙ্গে কাজ করল। মঞ্চের সাজসজ্জা গুছিয়ে দেওয়া, পোশাক ঠিক করা, আলো জ্বালানোর সময় মনে করিয়ে দেওয়া—সব কাজই সে যত্ন করে করত। কিন্তু মহড়ার সময় অভিনেতাদের অভিনয় দেখলে তার মনে হতো, সে যেন নিজের জায়গায় নেই।

একদিন নাট্যদলের প্রধান অভিনেতা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মঞ্চস্থ হতে আর মাত্র চার দিন বাকি। তাঁর পরিবর্তে অভিনয় করার মতো কাউকে পাওয়া গেল না। নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দীর্ঘ সংলাপ ছিল, কিন্তু চরিত্রটির বেশ কিছু মুহূর্তে নীরব অভিব্যক্তিরও বিশেষ গুরুত্ব ছিল।

মৈত্রী পরিচালকের কাছে গিয়ে বলল, “আমি চরিত্রটা চেষ্টা করে দেখতে পারি?”

অরুণেশবাবু অবাক হয়ে বললেন, “তুমি? এত বড় চরিত্র? তোমার সংলাপের সমস্যা তো আছেই।”

মৈত্রী শান্তভাবে উত্তর দিল, “আমি জানি। কিন্তু চরিত্রটির কিছু অংশ আমি অন্যভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারব। আমাকে একবার সুযোগ দিন।”

পরিচালক প্রথমে রাজি হলেন না। কিন্তু দলের অন্য অভিনেতারা অনুরোধ করায় তিনি একটি শর্তে সম্মতি দিলেন—মৈত্রীকে পরদিনের মধ্যে চরিত্রটির গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যগুলো প্রস্তুত করতে হবে।

সেই রাত থেকে মৈত্রী অনুশীলন শুরু করল। সে সংলাপগুলো ছোট ছোট অংশে ভাগ করল, কোথায় শ্বাস নিতে হবে তা চিহ্নিত করল, আর যেখানে কথা আটকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, সেখানে অভিনয়ের অভিব্যক্তি ও বিরতির সাহায্যে আবেগ প্রকাশের অনুশীলন করল। সে নিজের অসুবিধা লুকানোর চেষ্টা করল না; বরং নিজের শক্তিগুলোকে কাজে লাগানোর পথ খুঁজল।

পরদিন মহড়ায় সে দৃশ্যটি অভিনয় করল। প্রথম কয়েকটি সংলাপে থেমে গেলেও পরে তার চোখের ভাষা, কণ্ঠের ওঠানামা এবং নীরব বিরতি দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখল। নাটকের যে অংশে চরিত্রটি বহু বছরের অভিমান প্রকাশ করতে পারে না, সেখানে মৈত্রীর নীরব মুখভঙ্গি দেখে সবাই চুপ করে গেল।

পরিচালক দীর্ঘক্ষণ কিছু বললেন না। তারপর বললেন, “তোমার অভিনয়ে এমন একটা দিক আছে, যেটা আমি আগে দেখিনি। আমরা সংলাপকে এত গুরুত্ব দিয়েছি যে নীরবতার শক্তিটা ভুলে গিয়েছিলাম।”

তবে তিনি এটাও বললেন, “তোমাকে এখনও সংলাপ নিয়ে কাজ করতে হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তুমি অভিনয় করতে পারবে না।”

মৈত্রী মাথা নাড়ল। সে জানত, তার সামনে এখনও অনেক অনুশীলন বাকি।

নাটকের দিন হলঘর দর্শকে পূর্ণ। পর্দা উঠতেই মৈত্রী মঞ্চে এল। প্রথম দৃশ্যে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু সে থেমে নিজেকে সামলে নিল। তারপর চরিত্রের অনুভূতিতে মন দিল। সংলাপের পাশাপাশি তার চোখ, হাতের ভঙ্গি আর নীরবতায় গল্প এগিয়ে চলল।

নাটকের শেষ দৃশ্যে চরিত্রটি বহুদিনের হারানো সম্পর্কের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চায়, কিন্তু পারে না। মৈত্রী শুধু একবার হাত বাড়িয়ে দিল, তারপর ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে নিল। হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সেই নীরব মুহূর্তেই দর্শকেরা চরিত্রটির সমস্ত যন্ত্রণা অনুভব করল।

পর্দা নামার পর দীর্ঘ হাততালি উঠল। মৈত্রীর চোখে জল এসে গিয়েছিল। দলের অভিনেতারা তাকে অভিনন্দন জানালেন। যে সহকর্মীরা প্রথম দিন হেসেছিল, তারাও এসে বলল, “তোমার অভিনয় আমাদের ভাবিয়ে দিয়েছে।”

অরুণেশবাবু মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “আজ আমি একটা ভুল বুঝতে পেরেছি। কাউকে তার দুর্বলতার জন্য বিচার করে ফেললে তার অন্য ক্ষমতাগুলো দেখার সুযোগই থাকে না।”

মৈত্রী উত্তর দিল, “আমারও অনেক শেখা বাকি। শুধু চাই, চেষ্টা করার সুযোগটা যেন পাই।”

এরপর থেকে নাট্যদলে নতুন নিয়ম চালু হলো। নতুন অভিনেতাদের শুধু সংলাপ বলার দক্ষতা দিয়ে বিচার করা হবে না; তাঁদের অভিনয়ের অন্যান্য দিকও গুরুত্ব পাবে। কেউ কণ্ঠে ভালো, কেউ শরীরী অভিনয়ে, কেউ চরিত্র বিশ্লেষণে—প্রত্যেকের শক্তিকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

মৈত্রীও নিয়মিত কণ্ঠস্বরের অনুশীলন চালিয়ে গেল। তার তোতলামি একদিনে দূর হয়ে যায়নি, কিন্তু সে আর নিজের স্বপ্নকে লুকিয়ে রাখেনি। সে বুঝেছিল, উন্নতির জন্য পরিশ্রম দরকার, আর সেই পরিশ্রম করার সুযোগ পাওয়ার অধিকারও সবার থাকা উচিত।

বহু বছর পরে মৈত্রী নিজেই নাট্যদলের প্রশিক্ষক হলো। নতুন কোনও অভিনেতা ভুল করলে সে কখনও হাসত না। বরং বলত, “তোমার কোথায় অসুবিধা হচ্ছে, সেটা আমরা একসঙ্গে বুঝে নেব। মঞ্চে সবারই জায়গা আছে, শুধু নিজের ভাষাটা খুঁজে নিতে হয়।”

শিক্ষা: কারও একটি দুর্বলতা দেখে তার সমস্ত ক্ষমতা বিচার করা অন্যায়। প্রত্যেক মানুষের প্রতিভা প্রকাশের ধরন আলাদা; যথাযথ সুযোগ, সম্মান ও অনুশীলন পেলে সেই প্রতিভাই একদিন অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *