Categories
অনুগল্প বিবিধ

সাত নম্বর ঘরের রহস্য।।

পুরুলিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে ছিল বহু বছরের পুরোনো একটি সরকারি অতিথিশালা। লাল মাটির রাস্তা পেরিয়ে, শাল-পিয়ালের জঙ্গল ঘেরা পথ ধরে সেখানে পৌঁছতে হতো। একসময় ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারী এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ভিড়ে অতিথিশালাটি জমজমাট থাকত। কিন্তু নতুন রাস্তা তৈরি হওয়ার পর লোকজনের আনাগোনা কমে যায়। শেষ পর্যন্ত সেখানে শুধু একজন তত্ত্বাবধায়ক, হরেনবাবু, আর তাঁর পুরোনো সহকারী গোবিন্দ থাকতেন।

অতিথিশালাটিতে মোট বারোটি ঘর ছিল। কিন্তু সাত নম্বর ঘরটি প্রায় বিশ বছর ধরে বন্ধ।

গ্রামের মানুষ বলত, ওই ঘরে রাতের বেলা টেবিল সরানোর শব্দ শোনা যায়। কখনও দরজার নিচ দিয়ে আলো বেরোয়, কখনও আবার ভেতর থেকে কেউ তিনবার টোকা দেয়। একবার নাকি এক অতিথি মাঝরাতে ওই ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন।

তাই কেউ সাত নম্বর ঘরের কাছে যেত না।

কিন্তু নতুন দায়িত্ব নিয়ে অতিথিশালায় এল তরুণী রূপসা। সে সরকারি পর্যটন দপ্তরের কর্মী। তার কাজ ছিল অতিথিশালাটির অবস্থা পরীক্ষা করে সংস্কারের পরিকল্পনা তৈরি করা।

প্রথম দিনই সে হরেনবাবুর কাছে সাত নম্বর ঘরের চাবি চাইল।

হরেনবাবু অস্বস্তিতে পড়ে বললেন, “ও ঘর না খুললেই ভালো। অনেক পুরোনো ব্যাপার আছে।”

রূপসা হেসে বলল, “পুরোনো ঘর মানেই ভুতুড়ে নয়। হয়তো ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ে, তাই শব্দ হয়।”

হরেনবাবু আর কিছু বললেন না। তবে চাবি দিতে রাজি হলেন না।

পরদিন সকালে রূপসা অতিথিশালার পুরোনো নথিপত্র পরীক্ষা করতে শুরু করল। সে জানতে পারল, বিশ বছর আগে এক সরকারি প্রকৌশলী এখানে কয়েক মাস ছিলেন। তাঁর নাম ছিল অমরেশ মিত্র। তিনি পাহাড়ি এলাকার একটি সেতু নির্মাণের কাজে যুক্ত ছিলেন। হঠাৎ একদিন তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। তাঁর ঘর ছিল সাত নম্বর।

সেই ঘটনার পর থেকেই ঘরটি বন্ধ।

রূপসার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।

সন্ধ্যায় সে গোবিন্দকে জিজ্ঞেস করল, “অমরেশবাবুর কী হয়েছিল?”

গোবিন্দ চারদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “লোকটা খারাপ ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সঙ্গে বড় বড় লোকের ঝামেলা হয়েছিল। তারপর এক রাতে উনি চলে যান। আর ফেরেননি।”

“কেন ঝামেলা?”

গোবিন্দ উত্তর না দিয়ে চলে গেল।

সেই রাতেই রূপসা নিজের ঘরে বসে কাজ করছিল। হঠাৎ করিডর থেকে এল তিনটি টোকা।

ঠক। ঠক। ঠক।

সে দরজা খুলে বাইরে বেরোল। করিডর ফাঁকা। কিন্তু সাত নম্বর ঘরের নিচ দিয়ে সরু আলোর রেখা বেরিয়ে আসছে।

রূপসা ধীরে ধীরে ঘরটির কাছে গেল। দরজায় হাত রাখতেই ভেতর থেকে আবার শব্দ হল। এবার যেন ভারী কিছু মেঝের ওপর টেনে সরানো হচ্ছে।

সে দ্রুত হরেনবাবুকে ডাকল। হরেনবাবু ছুটে এসে আলো দেখে ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন।

“চলুন, আজই দরজা খুলি,” রূপসা বলল।

অনেক বছর পর তালায় চাবি ঢোকানো হল। দরজা খুলতেই পুরোনো কাগজ, কাঠ আর স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালের গন্ধ বেরিয়ে এল।

ঘরের মধ্যে একটি টেবিল, ভাঙা চেয়ার, লোহার আলমারি এবং জানালার পাশে একটি বড় কাঠের বাক্স পড়ে ছিল। কিন্তু ঘরের এক কোণে মেঝেতে নতুন আঁচড়ের দাগ। যেন সম্প্রতি কেউ ভারী কিছু সরিয়েছে।

রূপসা বাক্সটি খুলে দেখল, তার মধ্যে পুরোনো নকশা, কিছু চিঠি এবং একটি ডায়েরি রয়েছে।

ডায়েরির প্রথম কয়েকটি পাতা সাধারণ কাজের বিবরণে ভরা। কিন্তু শেষের দিকে অমরেশ মিত্র লিখেছিলেন, সেতু নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বারবার আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, বর্ষায় সেতুটি ভেঙে পড়তে পারে।

একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘যে সেতু মানুষের জীবন বাঁচানোর কথা, সেটিই যদি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়, তবে সেই নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত থাকা অপরাধ।’

রূপসা বুঝল, এটি শুধু একটি পুরোনো ঘরের রহস্য নয়। এর সঙ্গে মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে।

পরদিন সে ডায়েরি ও নথিগুলো নিয়ে জেলা প্রশাসনের দপ্তরে যোগাযোগ করল। প্রথমে কেউ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চাইল না। বিশ বছর আগের ঘটনা, পুরোনো প্রকল্প—এসব নিয়ে নতুন করে তদন্ত করা কঠিন।

কিন্তু রূপসা হাল ছাড়ল না। সে নথিগুলোর ছবি তুলে সংরক্ষণ করল, সেতুটির বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করার আবেদন জানাল এবং পুরোনো প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করল।

কয়েক সপ্তাহ পরে প্রকৌশলীদের একটি দল সেতুটি পরীক্ষা করতে গেল। দেখা গেল, সেতুর কয়েকটি অংশে সত্যিই গুরুতর ত্রুটি রয়েছে। বহু বছর ধরে মেরামতির কাজ হলেও মূল সমস্যাটি পুরোপুরি সমাধান হয়নি।

প্রশাসন দ্রুত সেতুটিতে ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দিল এবং মেরামতির ব্যবস্থা করল।

এদিকে তদন্তে জানা গেল, অমরেশ মিত্র কোনো দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হননি। অভিযোগ জানানোর পর তাঁকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে অন্য রাজ্যে চলে যান। নিজের নিরাপত্তা ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কারণে তিনি আর কখনও ওই অঞ্চলে ফিরে আসেননি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটি জানা গেল হরেনবাবুর কাছ থেকে।

তিনি স্বীকার করলেন, অমরেশবাবু চলে যাওয়ার আগে তাঁর কাছে কিছু নথি রেখে গিয়েছিলেন। হরেনবাবু ভয় পেয়ে সেগুলো সাত নম্বর ঘরের কাঠের বাক্সে লুকিয়ে রেখেছিলেন। পরে নিজের চাকরি বাঁচানোর জন্য ঘটনাটি কাউকে বলেননি। কয়েক বছর আগে গোবিন্দ পুরোনো বাক্সটি সরাতে গিয়ে তালার ভেতরে একটি আলগা যন্ত্রাংশ পেয়েছিল। সেটি নাড়াচাড়া করলেই দরজায় টোকা পড়ার মতো শব্দ হতো। আর করিডরের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে মেঝেতে পড়ে অদ্ভুত আলোর রেখা তৈরি করত।

ভূতের গল্পের রহস্য এভাবেই মিটল। কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য সামনে এল—ভয়ের কারণে চাপা পড়ে থাকা একটি সতর্কবার্তা হয়তো আরও বড় বিপদের জন্ম দিতে পারত।

কয়েক মাস পর অতিথিশালাটি সংস্কার করা হল। সাত নম্বর ঘরটিকে একটি ছোট তথ্যকক্ষে রূপান্তরিত করা হলো। সেখানে অমরেশ মিত্রের নথি, সেতুর নকশা এবং নির্মাণকাজে নিরাপত্তার গুরুত্ব নিয়ে একটি প্রদর্শনী রাখা হল।

উদ্বোধনের দিন রূপসা ঘরের দরজায় নতুন ফলক লাগাল। তাতে লেখা ছিল—

‘সাত নম্বর ঘর: একটি সতর্কবার্তার ইতিহাস।’

হরেনবাবু ফলকটির সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আমি ভেবেছিলাম, দরজা বন্ধ রাখলেই অতীত মুছে যাবে। বুঝিনি, দরজা বন্ধ থাকলেও সত্য কোথাও না কোথাও অপেক্ষা করে।”

রূপসা জানালার পর্দা সরিয়ে দিল। বিকেলের আলো ঘরে এসে পড়ল। এত বছর ধরে অন্ধকারে পড়ে থাকা ঘরটি প্রথমবারের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

শিক্ষা: ভয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সত্য চাপা রাখা বিপজ্জনক হতে পারে। ভুলের মুখোমুখি হওয়া এবং সময়মতো সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া অনেক মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *