Categories
কবিতা

চন্দনকাঠের চাঁদ, চিতা ও চমৎকার :: শুভঙ্কর দাস।।।

১
অনশ্বর গুহার ভেতর ছুটন্ত স্পন্দন
সময়রাক্ষসের চোখে তুচ্ছ, অতি সামান্য অথচ ব্রহ্ম-উদ্যম
তাতেই অলীক নির্মিত গোটা ভুবনের সম্রাট ও সিংহাসন!

২
মাঘী সংক্রান্তীর কোনো তারাখসা রাত
রক্তমাংসের পুষ্পবৃষ্টি, ঘড়ির কাঁটার উল্লম্ফনসম
ভয়ার্ত জন্ম-আঙুল,চেপে ধরে অনিদ্রিত,অগাধ সফেন স্তন!

৩
কোনো অঙ্কে বিভাজিত নয় অঙ্ক অথচ দৃশ্য শুরু
দিগন্তে মিশে যাওয়া সাদা বলাকার পাখা,সবুজ শীষের শরীর বেয়ে নামা শিশির, ধানসিদ্ধ উনুনের লালাভমুখ
অরব আয়োজনের সাক্ষী
পথচলা গুহার চিত্রের শিকারের পর অবিরাম শান্তি।

৪
অভিযানে অ্যামিবার আলস্যমাখা চিহ্ন বুকের মধ্যে
এনেছে বক্বল বিশুদ্ধতা, গতি তো দুর্বোধ্য, বৃক্ষের পাশে
মাথায় ময়ূরপালক বেঁধে চোখ দেখানো অসূর্যকে
রূপকথার চেয়েও অসীম,অবধারিত..

৫
অরণ্যের সকল পোশাক ফেলে আলোর স্বভাবসত্য
স্নায়ুকিরণ চলাচল সেই মহাশূন্য থেকে পিঁপড়ের পায়ের নূপুরের ধ্বনির মাঝে, যেখানেই আর্তনাদ
প্রার্থনা শিশুহাতের,শুভ্রতার মেঠো অনুবাদ

৬
জলজ পরিবার,শ্বাস ভরে নিয়ে সপরিবারে বাঁশি
হয়ে ওঠার নিরলস নিমগ্নতা,বসুন্ধরা বিজয়ের হাসি
কোনো জীবাস্মস্মৃতির ভেতর গোপন রেখে
এই উপলব্ধি, হৃদয়ের সুউচ্চতা ও স্থাপত্য কল্পনাতীত!

৭
ক্ষমা শব্দের ভেতর রক্ত,শূল,কাঁটা আর বহনকারী মিথ্যের দোষারোপ, আশেপাশে সবই শব,শুধু শিরের
মাঝখানে জাগ্রত তৃতীয় নয়ন
জ্বলছে, জ্বলছে নারীত্ব,পুরুত্বের কাঠে ও কাঠামোয়..

৮
তুষারক্ষেত্রে অযুত পায়ের চিহ্ন পাবে না,শিবরেখা
বরাবর পড়ে আছে পৃথিবীজন্মের কথা,কোথায় ছিল সেই মহাজাগতিক ছিদ্র, মাতৃযোনী,বিস্ফোরণ!
সকল প্রাণ,আসলে ধ্বংসাবশেষ…

৯
স্বপ্নের ভেতর সারাৎসার সিঁড়ি, অথচ কতক্ষণ স্থায়ীত্ব!
হৃদয়ের সক্রিয় শব্দের মূর্তি, সে দৈব হোক বা অদৈব
অঘোষিত সিদ্ধান্ত এই,নিজের সৃষ্টিকে প্রশ্ন না করে
নিজেই উত্তরলিপি পাঠ করো নিজের আয়নায়…

১০
পর্যায়ে রেখা মাত্র দুটি, আদম ও ইভ, সত্যি কোনো
গল্পের নটেগাছ না হলেও প্রতিটি মাটির নিচে শিকড়
যাচ্ছে, কোন টানে? চেতনার অধিকৃত প্রাণে
অস্ত্রগুলি পরীক্ষিত, শুধু আহত ও পরবর্তী শুশ্রূষার
কাহিনি শিশু শুনতে থাকতে মাতৃগর্ভে

১১
অন্তহীন সন্তরণে জল পেতেও পারো আবার নাও পেতে পরো,সাঁতার অশেষ,অমোঘ এবং অপরিবর্তনীয়
নদীর কাছে নৌকা মিলনপ্রত্যাশী,অথচ স্থিরতা নেই
পিতা-মাতার চক্ষু-চমাড়া,সেই ধ্বনিত প্রকাশ

১২
খাঁচা নির্মাণই দেবত্ব,এই দিলাম চাঁদ,এই দিলাম জোছনা
এই দিলাম জোনাকি,এবার আর্ষপ্রয়োগের আবেগে
বিদ্যুৎ, বিনত প্রস্তাব, বৃষ্টি ও মুখর-মেঘে
সব কাঁচাপাকা সন্তানই জয়ের স্মারক…

১৩
আঁচলের হলুদ শস্য, আলপনা সেই স্বর্গাবোধি
অনিপুণ হাতের সোহাগ মাখানো সহবাস
লক্ষ্মীবিদ্যা শেখানোর যুগান্তর শাঁস, যেভাবে নতুন ফসলের গান,মনকণিকার অভিভাবক,অযান্ত্রিক!

১৪
জ্ঞানের কাছে থেমে আছে যা,ক্ষুধার সৈকতস্বাদ
রোদপোহানোর মতো পুঁথিপাঠ,ধর্ম-মোক্ষ-মহৎমঠ
সবই শিশুপালনের মতো আবর্তন
শুধু দীর্ঘরাত পেরিয়ে একটাই লড়াই,মৃত্যু প্রতিদ্বন্দ্বী

১৫
বনমানুষের স্বভাব ঢেলে দিয়েছে ঈশ্বরের অবয়বে
নিজেকে পোশাকের মুখোশে,কাপড়ের সৌজন্যে ঢেকে
নিজেই আবার দায়মুক্ত হয়ে নগ্ন হয় রাতে ও দিনে
কে অন্তরাল? নীলকন্ঠের রেখেছো মোহিত আড়াল!

১৬
অকস্মাৎ জানতে পারল,অনুভব ছাড়া কোনো দরজা
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নেই,প্রজ্ঞা, প্রেরণা, প্রদীপ এবং প্রীতি
ফুরিয়েও সঠিক সন্ধি বা সহবাস হয়নি
নিহত চোখের নিচে মুঠো মুঠো বলিরেখা

১৭
সেই মরুপথে যাত্রা, নাভিসরোবরে স্নান,স্বরূপের
সাহসসমগ্র ইতিহাসের অক্ষম পাতা,তার ওপর
মৃতচিতাবাঘের ওপর ছবি তোলার মতো কারুকার্য
অবাক পানীয়,পিপাসার কীরকম সযত্ন সঞ্চারণ!

১৮
জড় ও জমির অধিকাংশ চর্চা ও চেষ্টা, অন্বেষণ
সেইসঙ্গে নরম,তুলতুলে,পদ্মপ্রথম শরীর,খনন
বাদবাকি শুধু শ্রদ্ধাবান হাহুতাশ আর পড়ে থাকে
কিছু জরাসন্ধ ইন্দ্রিয়, যাদের নগ্ন দ্রৌপদীদহন ছাড়া
কিছু বিদ্ধ মহাভারতীয় তীর

১৯
সহসা প্রেমের সারি সারি সঙ্কল্প কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকার তলদেশ পর্যন্ত একে-অপরকে
প্রতিষ্ঠিত করতে,দৃশ্য, দৃশ্যের পালিশ,গান,গানের গভীরতা,প্রস্তাব, প্রস্তাবের সংস্কৃতি, সেই সরলতা প্রথম কদম ফুল

২০
অতি কষ্টে শ্মশান সন্ধিতে আসে,আশির কাছে
বা তারও ঢেলা-ভাঙা আগে দেখিয়ে রাখে চতুষ্পদ
বা আয়তক্ষেত্রের মাপ,স্বয়ং পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার
ছায়াছবি,তবুও সরাসরি মুহুর্ত, চুম্বন

২১
উজ্জ্বল নীলগ্রহ একাই বুকে প্রান ভরে নিয়েছে
যেভাবে ডুবসাঁতার দেওয়ার আগে ভরে নেয় দম
মেঘের আসবাব, মাঠের মাধুকরী, পুষ্পের প্রস্তাব
সব স্বয়ংচালিত ক্ষুদ্রকে করে সুবৃহৎ

২২
কেবল কি কাঠামো? যাবতীয় খড়,মাটি,অস্ত্র
যে গড়ে,তার ফুসফুস, পেট,চরিত্রসংশোধন বিন্যাস
কোনো নক্ষত্র মৃত ছাড়া মাটি ছোঁয় না
ঈশ্বরও ধাতবস্বর, আঘাত হলে আকৃতি পায়

২৩
সরলতা ন্যাংটাশিশুর মতো সকলের গৃহের সামনে ধুলোর গড়াগড়ি দেয়,হাসে,দুর্ঘটনায় কাঁদে
পুনর্বাসন সচেষ্টায় সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়,শুধু অশান্ত কিছু ছাঁচ দরজা-জানালা বন্ধ করে

২৪
শব্দহীন বেদনার বাতাসে এগিয়ে চলে মহাশূন্যকারিগর
নিজের নিঃশ্বাসের সঙ্গে কথোপকথন, নিজেকে স্পর্শ
করে প্রাণময় করে তোলে পরবর্তী পর্যায়
সেখানেও প্রবাহিত সম্পর্কের সুজনিশাক, তরতাজা

২৫
উৎসমুখে আগ্নেয়ঘর, একটি মাত্র শিল্পী বেঁচে আছে
তাঁকে করুণা করে কেউ সর্বশক্তিমান বলে বাঁচতে চেয়েছে,স্বর্গের কল্পনার চেয়ে মহৎগুণ এই
পিতৃপুরুষের শেষযাত্রায় মাথায় হাত রেখে,নিরাময়ের
নতুন গল্প শোনানো,সত্যি হলেও হতে পারে…

২৬
চাঁদের সংগীত যেকোনো শরীরকে হরিতকীমন্দির করে তুলতে পারে,জীবাণুর সকল পরিচয়, দৃষ্টি, সহবাস
অথবা পরাক্রমী উৎপাদন ভুলিয়ে রাখে নন্দনতত্ত্ব
শুধু লড়াই নেমেছে সমুদ্রের মতো,পুতুল হতে পারবে না!

২৭
শেষপাতে ঈশ্বর এসে খাবেন বলে,পা-ধোয়ার জল, তুলানরম বক্বল,পরমাসুন্দরী সম্ভাষণ সাজিয়ে রেখে
অনুসরণীয় কোনো নৃত্য-গীত এবং স্তব প্রদর্শিত
শুধু ঈশ্বর পশু-পাখি-গিরিগিটি-কেঁচো অথবা গৃহপালিত
প্রীতিময় পুরাণপাতা,সেটাই রহস্য!

২৮
নদী যেদিকে বহমান,পাহাড় যতটা আকাশভেদী
বৃক্ষের শিকড়কৌশল, সব ভাস্কর্য ও স্থাপত্য শেষে
যা রক্ত-ক্লেদ-কফকে রূপময়-শ্রেয়শ্রেষ্ঠ করেছে
প্রণয়,অশ্বিনীকুমারের রথচক্র ঘষটে গেছে মাটিতে

২৯
পাথরে খোদিতরূপ, অবিশ্বাসের আলোড়নে যদি
সকল মূর্তি ভেঙে যায়,জড়ো করা প্রসাধন, প্রভাব
প্রতিশোধ আগুনে পুড়ে,ছাই
সেই ছাইয়ের ওপর অবতার ঘুমায়,ত্রিশূল শর্ত হয়ে

৩০
চাঁদের দুপিঠেই চাবুক,কুমিরের রোদ পোহানোর মতো
বিস্ময় শুয়ে আছে প্রকাশ্যে,নিজেকে এই যজ্ঞের আগুনে উৎসর্গ করেছে,অষ্টধাতুর সঙ্গে মিশিয়ে
চাঁদের চেয়েও অপরূপ অপরাধ করবে বলে…

৩১
নির্মাণ মাইলের পর মাইল হেঁটে আসে,সেখানে সৌখিন পরীক্ষায় অভিষেক, মুকুট বানানো হয়নি বুকের মাংস কেটে,ক্রিয়াধর্মের সূত্র ধরে অপেক্ষা ফিরে আসবে
যা কিছু অন্তর্গত ভালো,ভালোর মহিমা

৩২
হৃদয় সশস্ত্র ডুবোজাহাজ, নিজের শরীরে সামুদ্রিক
তা নয়, যার দর্শনে শ্বাসকার্য চলে,সেখানে যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি,কেন এই মহাকর্ষীয় আন্দোলন, মুখ,মুখর
কোলাহল,মধ্যমণি,সেই মুদ্রা ও মুগ্ধতা

৩৩
হৃদয়ের পান্ডুলিপি কেউ না কেউ সংবিধান ও সম্রাটের
পায়ের কাছে রেখে,মুক্তি ও মধুরিমা
এই যে অবাধ আবেগ,তার শাসিত কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস
সবই দাগ রেখে,শুধু উষ্ণতাকে তপসিলি তাম্রযুগ!

৩৪
পদাবলির পাতা ইঁদুরের মুখে,খুদের আকাল
মাঠে মাঠে সবুজের লাশ,হাঁড়ি,কলসি,বাটি,চাল,ডাল
আর বৈষ্ণবী রাত,কন্ঠিবদল করে রৌদ্রবিক্রয়
অপরাহ্নে চক্ষুস্থির, এতো পাঠ বাকি নারীর…

৩৫
একটি পরিচ্ছন্ন কাল,তাই কম্পিত হাতের ওপর রাখা
জয়ের সকল চিহ্ন দিয়ে জলেডোবা রাস্তাটুকু চলাচলের
যোগ্য করে,বিশ্বরূপদর্শন। অতীত,ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকে
জানার এই প্রক্রিয়া, সৃষ্টির নিয়ামকের দাঁড়িপাল্লা

৩৬
আত্মা কোথা থেকে নিয়ে এসেছে আনাজ,মাছ,মাংস
স্নানের পর ত্রিপিটক খুলে সাদাবস্ত্র নামিয়েছে শির
সেই শিরে চুম্বন করছে সশরীরে নূর, পরমহংসের কাতর
কান্না মিশে আছে অস্তিত্বে,এবার পোড়ায় মায়া,গাছের ছাল

৩৭
আমলকি করতলে রেখে বলছে, মানুষ নয়,মানুষী নয়
লিঙ্গভেদে শুধু মাতা, নিত্যসিদ্ধ,শুধু উচ্চারণ, পিতা,
মুমুক্ষুবৃক্ষ,মাঝখানে সাধনবর্গ সেই যোনিপথে চক্রাকারে
চমৎকার

৩৮
অরণ্য থেকে বেরানো শ্বাস,শূদ্রের হাতে তৈরি মারণাস্ত্র
বালক চলেছে সাধু-দর্শনে,বালিকা ধরেছে,বালকের
শরীরী পটবস্ত্র, যা নিজের শরীর দিয়ে তৈরি
ক্ষত্রিয় অবাক,বৈশ্য বিগলিত,শুধু একটি জ্যোতিরেখায় ব্রাহ্মণ শূদ্রের পায়ের ধুলোয় মন্ত্র লিখছে

৩৯
বেদান্ত-আয়াত এবং বাইবেলের ধ্বনিত চমৎকার ধ্বনি
একশো শতাংশ আন্তরিক জেনে,বদ্ধজীব, আরও আরও
বদ্ধ হয়ে হাসে,সেই হাসিতে বিদ্যুৎ চিরে যায়
কৃষক শুধু গলায় হাড়ের মালা দেখিয়ে বলে
ক্ষিদের পাতা খুলে খুলে নোঙর বানাব…

৪০
সহসা শেষ কথা,শেষ কথাই,মৃত্যুর মতো সংবাদ
মৃত শোনে না,কোনোদিন, অথচ দশ সহস্র গোধন ও সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রার আশায় সন্ন্যাসী ও সংসারী
সেই সংবাদের সুষ্ঠু আশায় মৃত্যুকে ভেট দেয়…

৪১
সকল ভিক্ষুক হাত জড়ো করে নদীর ওপর,যাদের শরীরে এখনও রাজসভা লেগে,কষ্ট বেশি তাদের
আর যাদের গায়ে লেগে আছে পথের ধুলোয়
তারা স্নানমাত্র সারস

৪২
শ্বাসকার্যে ঈশ্বরের সন্ধ্যা ও সকাল।গোলাকার একটি বলীয় প্রক্রিয়া, তার ওপর মাটি-পাথর-মাংসের নামকরণ ও বুক চিতিয়ে ওঠার নমুনা,সুনিপুণ বিবরণী হিসেবের
ঐ পর্যন্ত কি আকাশ? হলুদ হ্রদের হাহাকার,শুধু সূর্যপ্রতিম সবুজ সবুজ মদের মতো ঘাস!

৪৩
অমরত্বের ভুল বোঝাবুঝি, উপাস্য তাকেই করেছে যে সবচেয়ে ক্ষুরধার অস্ত্র ধরতে পারে,সেই হত্যার সারাৎসার লীলা,এখন আহ্নিক গতির পৃষ্ঠা ছিঁড়ে
ভুবন গড়ার খেলা,খেলার অধিক অভ্যাস,এমন কি ঈশ্বরীয় বিশ্বাস!

৪৪
ঝুলন্ত মাটির বারান্দা, ধনুকহাতে বীরশ্রেষ্ঠ,স্বর্গামাধুরীর মতো মোহময়ী নারীর কোমরে হাত ক্রেডিটকার্ড ধরে থাকা কুবের,তার অনেক নিচে সিনেমার পোস্টারের নিচে খালি পেটে,না,অভুক্ত নয়, অশ্রু চেটে চেয়ে আছে
নবযুগের নায়ক

৪৫
যেকোনো বৃহৎ রাক্ষসের চেয়ে শক্তিশালী কাম,নিসর্গ, দেব-দেবী,পক্ষীরাজঘোড়া,রূপকথা,সমৃদ্ধনগরের জলপথ,আবিষ্কার, আরামপ্রিয় নিদ্রা,নত হয়ে থাকা মুনি-ঋষির শির
তার চেয়েও জন্মগ্রহণ,মানুষের, মানুষের বাচ্চার..

৪৬
মানুষের বসবাসযোগ্য ভূমি,লেখো,অশ্রু, অশ্রু, অশ্রু

৪৭
অনুতাপ চেতনার শেষ তলে ঢেউ তোলে একা
যেন নিঃসঙ্গ সৈনিক
মহাভারতের কোনো অধ্যায়কে ক্ষমা করবে না

৪৮
এখনও প্রেম সমর্থন পায়নি,জিততে কোনোদিন পারেনি!শুধু অপেক্ষার পাথুরে রেখা অথবা জীবাশ্ম হয়ে
স্থির,কোনো এক জীবন্ত হৃদয়ের

৪৯
মৃতদেহের ওপর জন্মান্তরের গাছ,সেই গাছে ধুলো…

৫০
আবার চোখের পাতায় লেখো, অপেক্ষা,অপেক্ষা, অপেক্ষা…

উৎসর্গ। কবি শম্ভু রক্ষিত
চিত্রঋণ।ফেসবুক

 

————————//———————-
২৫শে ডিসেম্বর, ২০২১.©Suvankar Das, Haldia

Share This
Categories
উপন্যাস

কঙ্কাবতীর দুঃসাহস (ধারাবাহিক উপন্যাস, ষষ্ঠদশ পর্ব) : দিলীপ রায়।

কঙ্কাবতী কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এত তাড়াতাড়ি কী করে রসুলপুরের মেয়ে লতাকে ঘোতন পছন্দ করলো ! খবরাখবর নিয়ে কঙ্কাবতী জানতে পেরেছে লতা খুব ডানপিটে । আরও জানতে পেরেছে, মাসীর বাড়িতে থেকে সালার কলেজে লতার পড়াশুনা । ব্রজেশ্বরবাবু মেয়ের চালচলনের ঠাটবাট দেখে কোনো ঝুঁকি নেননি । তাই লতাকে মাসী বাড়ি রেখে পড়ানো । সালার কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার ডিগ্রি করার লতার খুব ইচ্ছা ছিল । কিন্তু বাড়ি থেকে সেভাবে সাড়া পায়নি । তাই তার উচ্চশিক্ষার ইচ্ছা থেমে গেছে । লতা মেয়ে হিসাবে ঘোতনের উপযুক্ত । কিন্তু কঙ্কাবতীর খটকা অন্য জায়গায় । নাদনঘাট থেকে ভাল একটা সম্বন্ধ এসেছিল । সেই মেয়েটা যেমন শিক্ষিত, তেমনি মার্জিত । মেয়ের বাবা হাই স্কুলের শিক্ষক । ভদ্র পরিবার । মেয়েটি ফর্সা না হলেও তাকে পুরোপুরি শ্যামলা বলা যাবে না । কঙ্কাবতী যতটুকু জেনেছিল, মেয়েটির স্বভাব-চরিত্র যেমন ভাল তেমনি মেয়েটি কর্মঠ । পড়াশুনার পাশাপাশি নাচ শিখত । মেয়েটির প্রতি কঙ্কাবতীর যথেষ্ট আগ্রহ ছিল । কিন্তু ঘোতন এককথায় নাকচ করে দিয়ে বলেছিল, “মেয়েটি কালো ।“ অথচ মেয়েটির বাবা নাদনঘাটের বিশিষ্ট মানুষ । সেখানকার মানুষ তাঁকে সমীহ করে চলে । কঙ্কাবতীর দৃষ্টিতে লতার চেয়ে নাদনঘাটের মেয়েটি ঘোতনের জীবনসঙ্গিনী হিসাবে বেশী উপযুক্ত ।
যাই হোক ঘোতনের ইচ্ছা অনুসারে লতার সঙ্গে বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হলো । কিন্তু গোঁ ধরলো ঘোতন । তার ইচ্ছা, দোকানটা আরও সাজিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসবে । অন্যদিকে বিয়ে দেরীতে হোক, লতা তার ঘোরতর বিরোধী । তাই ঘোতনের মতলব জানার পর লতা সরাসরি ঘোতনের দোকানে এসে হাজির । বর্ধমানের রসুলপুর থেকে মিঁয়া স্টেশন পৌঁছানো ভীষণ ঝকমারী । তবুও বর্ধমান, কাটোয়া হয়ে দুপুরের আগে সোজা ঘোতনের দোকানে । লতাকে দেখে ঘোতন অবাক ! কৌতুহলি দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ লতার দিকে তাকিয়ে রইলো ।
ফ্যালফ্যাল করে তাকানো দেখে লতার ঝটিকা প্রশ্ন, “আপনি জীবনে কোনোদিন মেয়ে দেখেননি ? ঐভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছেন ? অনেক দূর থেকে এসেছি । কোথায় আমাকে বসতে বলবেন কিংবা খাবার এনে খাওয়াবেন, সেসব না করে হাঁদার মতো আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন !”
প্রশ্নের জেরবারে থতোমতো খেয়ে ঘোতন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ! ভ্যাবাচেকা খেয়ে তড়িঘড়ি করে চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “বসুন ম্যাডাম ।“
উঁহু, ম্যাডাম নয় । আমি আপনার বৌ হতে যাচ্ছি, সুতরাং শুধুমাত্র লতা । তবে শুনুন, আমি বসতে আসিনি ?
“তবে ?” প্রশ্ন করেই আবার লতার দিকে হাবলার মতো তাকিয়ে রইলো ।
এবার কিছুটা ধমকের শুরে লতা ঘোতনকে বলল, “মশাই, আর তাকাতে হবে না । কিছুদিনের মধ্যে আপনার সঙ্গে ঘর বাঁধতে স্থায়ীভাবে আসছি । কিন্তু …?”
আবার কিন্তু কেন ?
আমাদের বিয়ের পিঁড়িতে বসাটা দেরী করলে চলবে না । পুজোর পরে অগ্রহায়ণ মাসেই আমাদের বিয়ে হবে এবং সেটা অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম সপ্তাহেই । আমি পঞ্জিকা দেখে এসেছি । ৪ঠা অগ্রহায়ণ বুধবার, বিয়ের ভাল দিন । ঐদিন আমাদের বিয়ের তারিখ ঠিক করতে বলুন । অন্যথা হলে, আমার দিকে ফ্যালফ্যাল তাকানোর আর সুযোগ পাবেন না । কথাটা মনে রাখবেন । তারপর দোকান ঘরের দিকে তাকিয়ে লতা বলল, “ঘরটা এত নোংরা কেন ? একটু গায়ে-গতরে খেটে পরিষ্কার রাখতে পারেন তো ?”
কী যেনো বলতে যাচ্ছিলো ঘোতন । তাকে থামিয়ে দিয়ে লতা বলল, “আমার দরকারি কথা বলা শেষ ! এবার আমি বাড়ি চললাম ।“
ঘোতন এতক্ষণ লতার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে তার চোখা-চোখা কথাগুলি শুনছিলো আর ভাবছিলো মেয়ে তো নয়, পুরোমাত্রায় থানার দারোগা ! রাখঢাক নেই । সোজাসাপ্টা কথা সোজাসাপ্টাভাবে বলার অভ্যাস । সুতরাং এই মেয়ে নিয়ে তার কপালে কী আছে, কে জানে ? ঘোতনের মতো ঠাটবাট ছেলেকেও ঘোল খাওয়াতে লতা একাই একশ ! তারপর লতার মুখে চলে যাওয়ার কথা শুনে ঘোতন আরও ঘাবড়ে গেলো । কী মেয়েরে বাবা ! রসুলপুর থেকে বয়স্থা মেয়ে একা সোজা মিঁয়া স্টেশন পৌঁছানো, প্রচণ্ড ধকলের ব্যাপার । তার উপর দিনের দিন ফিরে যাওয়ার চিন্তা ! অতোটা পথ ফিরে যাওয়া খুবই কষ্টকর । যাতায়াতের ঝক্কি-ঝামেলা ভীষণ সাংঘাতিক ! লতার ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে ঘোতন এবার বেঁকে বসলো এবং বলল, “বাড়ি ফিরে যাওয়া হবে না । আজ এখানে থাকতে হবে । তার আগে আপনার খাওয়া-দাওয়া ।“
বিরবির করে লতা বলল, “ক্যাবলাকান্তের মুখে বোল ফুঁটেছে ।“
কী বলছেন বিরবির করে ?
বলছি, থাকার জন্য আসিনি । আর থাকলে লোকে আপনাকে দুষবে এবং বলবে, “বিয়ের আগে মেয়েটাকে বাড়ি ডেকে এনে ঘনিষ্টভাবে মেলামেশা করছেন ! তাতে আপনার সম্মানহানি ঘটবে । সুতরাং মশাই, এবার আমার বাড়ি ফেরার পালা !”
উঁহু আপনাকে আমি একা ছাড়ছি না ।
তাহলে কী আপনি আমার সঙ্গে যাবেন ?
দরকার হলে যাবো ।
রসুলপুর, অনেক দূর । কথাটা ভেবে বলছেন তো ?
ঘোতন পড়েছে ফ্যাসাদে । অতো সাতপাঁচ ভেবে কথাটা বলেনি । এখন সত্যিই যেতে হলে রাতে বাড়ি ফেরা অসম্ভব । তবুও ঢোক গিলে বলল, “ম্যাডাম, আমি আপনার সঙ্গে যাবো ।“
বেশ ! রেডি হয়ে নিন ।
মিঁয়া স্টেশন থেকে তিনটে কুড়ির ট্রেন ধরে প্রথমে কাটোয়া । সেখানে নেমে বর্ধমানের বাস ধরার আগে বাস স্ট্যান্ডে দুজনে দুটো কেক্‌ কিনে গরম চা খেলো । বর্ধমান থেকে সন্ধ্যা ৭টায় বাস পেলো । বর্ধমান – বিষ্ণুপুর বাস । সোনামুখী হয়ে যাচ্ছে । সেই বাসে রসুলপুর ।
ঘোতন বাড়ি ফিরতে চাইলে লতা নাছোড়বান্দা, তার বাড়ি ফেরা হবে না । এতক্ষণ দুজনে খুব কাছাকাছি একসঙ্গে সফর করার জন্য তাদের কথাবার্তায় “আপনি” উঠে গিয়ে এখন শুধু “তুমি” । তাই একরকম জোর দিয়ে লতা বলল,”তোমাকে আমি ছাড়ছি না । ভয় নেই, আমরা এক ঘরের ভিতর শুয়ে তার কাটাবো না । তার গ্যারান্টি থাকলো ।“
অগত্যা ঘোতন লতাদের বাড়ি থাকার সিদ্ধান্ত নিলো ।
রাত্রিবেলায় খাওয়া-দাওয়ার এলাহি আয়োজন ! দেশী চিকেন, পুকুরের কাতলা মাছ ! রসুলপুরের বাস স্ট্যান্ডের ঘনাদার মিষ্টির দোকানের গরম গরম রসগোল্লা । আরও কতো কী !
তারপর…………?
তারপর পরেরদিন ভোরবেলায় পূর্ব আকাশে কেবল সূর্য উঠেছে । ঘোতন বাড়ি ফেরার জন্য জামা-কাপড় পরে রেডি । ঘোতনকে জামা-কাপড় পরা অবস্থায় দেখে ব্রজেশ্বরবাবু বললেন, “রেডি হলে চলবে না বাবা । দুটো ভাত খেয়ে রওনা দেবে ! কেননা অনেকটা পথ । বাড়ি ফিরতে বেলা গড়িয়ে যেতে পারে ।“ ব্রজেশ্বরবাবুর কথা শেষ হতেই কোথা থেকে লতা ছুটে এসে একেবারে ঘোতনের সামনে । হাঁপিয়ে গেছে বেচারা ! হাতে ছোট একটা পুটুলি । তার মধ্যে গোটা পাঁচ-ছয় কাঁচা পেয়ারা । দুটো পেয়ারা ঘোতনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “আজ তোমার বাড়ি যাওয়া বন্ধ । আমি চা বানিয়ে আনছি । চুপচাপ চা খাও । তারপর বাজারে যাওয়া । বাজার থেকে ফিরে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে তোমাকে শক্তিগড়ের ল্যাংচা খাওয়াতে নিয়ে যাবো । তারপর দুপুরের খাওয়ার পর কালী মন্দির । সেখানে গ্রামীন মেলা বসেছে । মেলায় তোমার সঙ্গে নাগরদোলায় উঠবো । আপাতত এই কয়েকটা প্রোগ্রাম । সুতরাং বাড়ি ফেরার একদম নাম করা চলবে না । তারপর ঘোতনকে লতা হাত ধরে বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসিয়ে বলল, “এখানে চুপচাপ বসো । আমি এক্ষণি চা বানিয়ে আনছি ।“ ইত্যবসরে লতার মা দুটো প্লেটে দু-কাপ চা এনে হাজির ।
চা খাওয়ার পর লতা বাবাকে বলল, “আজ তোমাকে বাজারে যেতে হবে না । আমি বাজারে যাবো ।“ বাবাকে কথাটা বলেই ঘর থেকে বাজারের ব্যাগ এনে ঘোতনের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার দয়া করে আমার সঙ্গে বাজারে চলো ।“
বাজারটা লতাদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে । লতার বাবা ব্রজেশ্বরবাবু সাধারণত সাইকেলে বাজারে যান । লতার একটা লেডিস্‌ সাইকেল রয়েছে । তা সত্ত্বেও লতা ঠিক করলো, “পায়ে হেঁটে বাজারে যাবে । তাতে ঘোতনের সাথে অনেক কথা বলা যাবে ।“
রাস্তায় রতন কাকার সাথে দেখা । রতন কাকা জিজ্ঞাসা করলে, “হনহন করে কোথায় চললি লতা ?”
বাজারে যাচ্ছি ।
কেন, তোর বাবা কোথায় গেলো ?
বাবার শরীরটা ভাল না । তাই আমি বাজারে যাচ্ছি ।
তোর সঙ্গের ছেলেটিকে তো চিনতে পারলাম না !
ইনি আমাদের বাড়ির কুটুম ।
কেমন কুটুম ? ইতিপূর্বে তাকে কখনও তো দেখিনি !
আমার বান্ধবীর দাদা । কাকা, আমার তাড়া আছে । আমি বাজারে চল্লুম ।
এক ঝলক মুচকী হাসি দিয়ে রতন কাকা লতাকে বললেন, “ছেলেটির সাথে তোর ভীষণ মানিয়েছে ।“
লতা রতন কাকার সঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে সোজা বাজারে ।
হঠাৎ রাস্তার বা-পাশের অর্জুন গাছ তলা থেকে প্রথমে একটা শিস দেওয়ার আওয়াজ । ঘোতন তাকিয়ে দেখে গাছের নীচে কতকগুলি ছেলের জটলা । ছেলেগুলোর চেহারার ধরন দেখে ঘোতন বুঝতে পারলো, উটকো ছেলে-পেলেদের জটলা । তারা আড্ডায় মত্ত । তারপর জটলার মধ্যে থেকে একজন উটকো ছেলে সম্ভবত তাদের মধ্যের অন্যজনকে চিৎকার করে লতাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, চেয়ে দ্যাখ । তোর ভালবাসার লতার সাথে অন্য আর একজন নাগর ঘুরছে !”
ঘোতন দাঁড়িয়ে পড়লো । ঘোতনের শারীরিক কায়দা দেখে লতা ঘাবড়ে গিয়ে কোনোকিছু না ভেবে ঘোতনের হাত টেনে ধরে আরও জোরে হাঁটতে লাগল । বাজারে ঢুকে প্রথমে মাছ বাজারে ঢুকলো । সোনালী রঙের লোকাল ট্যাংরা মাছ । দামটা একটু বেশী । তারপর বড় সাইজের বোয়াল মাছ । মাটন কিনতে ঘোতন বারণ করেছিল । কিন্তু কে শোনে কার কথা ! লতা বেশ খানিকটা মাটন কিনলো । তারপর সবজির বাজার । আলু, পিঁয়াজ, আদা, রসুন, কাঁচা লঙ্কা, টমেটো, পটল, গরমমশলা, ইত্যাদি কিনে এবার রিক্সায় উঠলো । লতার ভয়, গাছ তলার ছেলেগুলি আবার বিরক্ত করলে ঘোতনকে সামলানো দায় হয়ে দাঁড়াবে !
রিক্সা মৃদুমন্দ গতিতে এগোচ্ছে । অর্জুন গাছের কাছাকাছি আসা মাত্র লতা লক্ষ্য করলো, সবগুলি উটকো ছেলে লাঠি নিয়ে রাস্তার উপরে দাঁড়িয়েছে । লতা পরিষ্কার বুঝতে পারলো ছেলেগুলির ধান্দা খারাপ ! মারপিট করার ধান্দা !
হঠাৎ উটকো ছেলেগুলির মধ্যে পল্লবকে দেখে ঘোতনের চোখ ছানাবড়া ! নিজের অজান্তেই বলে ফেলল, ঘাটের মরাটা এখানে কেন ? তারপর কোনোকিছু বোঝবার আগেই উটকো ছেলেগুলি ঘোতনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো ……?
 (চলবে)

Share This
Categories
নারী কথা

আয়ালাসোমায়াজুলা ললিতা ::: সৌরভকুমার ভূঞ্যা।।।

বয়স মাত্র আঠারো। কোলে চার মাসের শিশু সন্তান। সদ্য বিধবা মেয়েটির চারপাশে একরাশ অন্ধকার। নিজ ঘরে অনেকটা পরগাছার মতো জীবন। উঠতে বসতে গঞ্জনা, আপবাদ। একে তো স্বামী হারানোর বেদনা, অন্যদিকে চারপাশের অসহনীয় পরিবেশ। তিলে তিলে দগ্ধ হওয়া মেয়েটি তখন আকুল ভাবে খুঁজছে মুক্তির পথ। আর মৃত্যুর থেকে মুক্তির সহজ উপায় আর কী হতে পারে! কিন্তু মৃত্যুতেই কি মুক্তি নাকি হেরে যাওয়া? মেয়েটি ভাবে কেন সে হেরে যাবে জীবনের কাছে? তার দোষ কোথায়? ওই ছোট্ট শিশুটিরও দোষ কোথায়? তাহলে মুক্তি কোথায়? মেয়েটি ভাবে। বুঝতে পারে পরাধীনতার জীবন মুক্ত হয়ে যদি সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তাহলে মুক্তি সমম্ভ। আর তার জন্য চাই লেখাপড়া। কিন্তু মেয়েদের লেখাপড়া করার পথটাও সুগম নয়। তারপরে সে বিধবা। কিন্তু পিছিয়ে গেলে চলবে না। মেয়েটি নিজেকে বোঝায় হেরে যাওয়া চলবে না। পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবেই। নিজের জন্য বাঁচবে। বাঁচবে তার মেয়ের জন্য। শুরু হয় তার জীবনের নতুন লড়াই, নতুন অধ্যায়। সাফল্যের বরমাল্য গলায় পরে নতুন নজির সৃষ্টি করে হয়েছিলেন দেশের প্রথম মহিলা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। অসামান্যা এই নারী হলেন আয়ালাসোমায়াজুলা ললিতা।
১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৭ আগস্ট চেন্নাইয়ের এক মধ্যবিত্ত তেলেগু পরিবারে ললিতার জন্ম। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। বাবা পাপ্পু সুব্বারাও ছিলেন গুইন্ডির কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অধ্যাপক। ছেলেমেয়ে উভয়ের শিক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সচেতন। তার সব ছেলেই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন।
সেকেন্ডারি স্কুল লিভিং সার্টিফিকেট পাওয়ার পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় ললিতার। তৎকালীন সামাজিক নিয়ম মেনে মাত্র পনেরো বছর বয়সে বিয়ে যায় ললিতার। ১৯৩৭-এ তাঁর মেয়ের জন্ম হয়। মেয়ের বয়স যখন মাত্র চার মাস তখন তার স্বামী মারা যায়। অষ্টাদশী বিধবা ললিতার জীবনে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। ছেলের অকাল মৃত্যুর জন্য শাশুড়ি ললিতাকে নানারকম কথা শোনাতেন। তাঁকে অপয়া বলে গালিগালাজ করতেন। জীবনটা দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া ললিতা ঘুরে দাঁড়ানোর সংকল্প নেন।
শুরু হয় ললিতার জীবনের নতুন অধ্যায়। কুইন মেরি কলেজ থেকে তিনি ইন্টার মিডিয়েট পাশ করেন প্রথম বিভাগে। সিদ্ধান্ত নেন বাবা-ভাইদের মতো ইঞ্জিনিয়ার হবেন। সেই সময় একজন মেয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সিদ্ধান্তটি বেশ অভিনব ও সাহসের। তবে বাবা তাঁর সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেন।
যাই হোক, ইঞ্জিনিয়ারিং তো পড়বেন কিন্তু কোথায়? তখন গুইন্ডির কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মেয়েদের পড়ার সুযোগ ছিল না। পরিত্রাতা হয়ে এগিয়ে এলেন বাবা। তিনি কলেজের প্রিন্সিপ্যাল এবং পাবলিক ইনস্ট্রাকশান ডিরেক্টরকে মেয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ব্যাপারটা বলেন এবং বুঝিয়ে তাদের মত আদায় করেন। কলেজের ইতিহাসে তৈরি হয় এক নতুন অধ্যায়। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন ললিতা।
কলেজের অসংখ্য ছেলের মধ্যে একমাত্র মেয়ে হয়ে প্রথম প্রথম বেশ অস্বস্তি ও অসুবিধার মধ্যে পড়েন ললিতা। ধীরে ধীরে তিনি সব অসুবিধা কাটিয়ে ওঠেন। কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁর জন্য আলাদা হোস্টেলের ব্যবস্থা করেন। ললিতার একাকীত্বের ব্যাপারটা কলেজ কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছিলেন। তাঁরা ভাবেন যদি আরও মেয়েকে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে এই সমস্যা দূর হবে। সেই মতো পরের বছর তাঁরা মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ব্যাপারে বিজ্ঞাপন দেন। সেই বিজ্ঞাপন দেখে দুজন মহিলা ভর্তি হন, পি-কে থ্রেশিয়া ও লীলাম্মা কোশি জর্জ। তাদের বিষয় ছিল সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং।
১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন ললিতা। স্থাপন করেন এক নতুন নজির। তিনি হলেন ভারতের প্রথম মহিলা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর তিনি জামালপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপে এক বছর শিক্ষানবিশীর কাজ করেন প্রাকটিক্যাল ট্রেনিং-এর জন্য। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি সেন্ট্রাল স্টান্ডার্ড অর্গানাইজেশনে সহকারী ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। পোস্টিং হয় সিমলাতে। এখানে তিনি দু-বছরের কিছু বেশি সময় কাজ করেন। ১৯৪৬-এর ডিসেম্বর মাসে তিনি এই কাজ ছেড়ে দেন।
ললিতার বাবা পাপ্পু সুব্বারাও কিছু গবেষণার কাজ করছিলেন। বাবার অনুরোধে চাকরি ছেড়ে ললিতা সেই গবেষণার কাজে যোগ দেন। কিন্তু ন-মাস পর তিনি এই কাজও ছেড়ে দেন। এরপর তিনি কলকাতায় অ্যাসোসিয়েটেড ইলেকট্রিক্যাল ইনডাস্ট্রিজে যোগ দেন। ইঞ্জিনিয়ারিং ও সেলস ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন তিনি। এখানে তিনি বেশকিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভারতের বৃহত্তম ভাকরা নাঙ্গাল বাঁধের বৈদ্যুতিক জেনারেটর নিয়ে কাজ। তিরিশ বছরের বেশি এখানে কাজ করেছেন তিনি।
১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের কাউন্সিল অব দ্য ইনস্টিটিউশন অহ ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারস তাকে অ্যাসোশিয়েট সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি এখানকার পূর্ণ সময়ের সদস্য হয়েছিলেন। ১৯৬৪-এর জুন মাসে নিউইয়র্কে আয়োজিত প্রথম ইন্টারন্যাশন্যাল কনফারেন্স অব ওমেন ইঞ্জিনিয়ারস অ্যান্ড সাইন্টিস্টস-এ তিনি আমন্ত্রণ পান। নিজের ব্যবস্থাপনায় তিনি এই কনফারেন্সে যোগ দেন। এখান থেকে ফিরে আসার পর বেশ কিছু পত্রপত্রিকায় তাঁর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। নিজের বক্তব্যে তিনি মেয়েদের পড়াশোনা ও কাজে যোগাদানের ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ সে ব্যাপারে নিজের মন্তব্য প্রকাশ করেন। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি লন্ডনের ওমেন ইঞ্জিনিয়ারিং সোসাইটির স্থায়ী সদস্য হন।
১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ১২ অক্টোবর ব্রেন অ্যানিউরিজমে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ষাট বছর বয়সে মারা যান ললিতা।
পরাধীন ভারতবর্ষে মেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপারে তেমন উৎসাহ দেওয়া হত না, তাদের পড়াশোনা করার বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা করার নানা রকম প্রতিবন্ধকতা ছিল। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এক বিধবা মেয়ের হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে তিনি কেবল অনন্য নজির স্থাপনই করেননি, আগামী প্রজন্মের মহিলাদের কাছে নিজেকে দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থাপন করেছিলেন।

Share This
Categories
কবিতা

জাগরন : সুমন।।।।

১.
যে মেয়েটি প্রতিদিন রাতে তার মাতাল স্বামীর অত্যাচারে কুঁকড়ে থাকত, আজ সেই মেয়ে নিশ্চিন্তে স্বামীর বুকে মাথা রেখে পূর্ণীমার আলো মেখে প্রেমের গানগায়।

২.
যে সীমান্তে গুলিড় লড়াইয়ে শূন্য হত হাজার মায়ের কোল, আজ সেই সীমান্তে খোলা আকাশের নীচে নির্ভয়ে ঘুমায় সে দিনের সেই অতন্দ্র প্রহরীরা। কাঁটা তারের দেওয়াল জুড়ে লবঙ্গলতার ফুল।

৩.
রাজনৈতিক লড়াইয়ে শ্লোগান আর দেওয়াল লিখনে ভোরে যাওয়া দেওয়াল গুলোতো আজ শুধুই মহাজনদের মহৎ বানী!

৪.
পাখিরা নিশ্চিন্তে স্বাধীনতার ডালা মেলে উড়ে বেড়ায় নীল আকাশে, খাঁচার দরজা খুলে দাঁড়িয়ে প্রশান্ত হাঁসি হাসে দারোয়ান।

৫.
জেলের গারদ গুলো স্মৃতী হয়ে দাঁড়িয়ে সৌজন্যের শুভেচ্ছা বিনিময় করে মানুষের সাথে।

৬.
ব্যারিকেট হীন মৌনতার মিছিল নিখুত নিশব্দে অনায়াসে পৌঁছে যাচ্ছে ভালোবাসার দরজায়

৭.
অচেনার ভীড়ে হারিয়ে যাওয়া এক দিন, আজ সব চেনা চেনা লাগে। চারিপাশে শুধুই আপনজনদের চোখ আর বাড়ানো বিশ্বাসী হাতের ভীড়।

৮.
আমিনার পোষ্যটিকে আদর করে ভাতের ফেন খাওয়ায় বাবুদের গিন্নী।

৯.
স্বপ্ন দেখা গোরিব মেধাবী ছাত্রটির স্বপ্ন সফল করার স্বপ্ন এখন সকলের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ চোখে মুখে স্পষ্ট।

১০.
একা হেঁটে যাওয়া মানুষ গুলোর চার পাশে এখন হাজার পায়ের শব্দ।

১১.
ভালোবাসার মিছিলে নীরবতার স্লোগান গোষ্ঠী, গোত্র, পরিচয় হীন দের। সব হারানো পরিবারের বুকে আজ অনেক পাওয়ার শান্তি।

১২.
ভিন্ জাতের মেয়ে টিকে পুত্র বধূ করে নিয়ে যায় যে পিতা, সেথায় কন্যা রূপে লাললন পালন হচ্ছে সে একই স্নেহ মমতায়।

১৩.
ঘুম ভেঙ্গে শুনি নিরূপমার মৃত্য হয়নি। ওটা দুঃস্বপ্ন ছিল।

১৪.
রিজিওয়ানুর ঘর আলো করে এসেছে নতুন অতিথি, রামরহিম।

১৫.
বৃদ্ধ মানুষ গুলোকে আর লাঠির খোঁজ করতে হয়না, তাদের চারপাশে এখন অনেক শক্তপোক্ত কাঁধের ইমারত।

১৬.
এখন আর জয় পরাজয় অশান্ত উল্লাস নেই।অঙ্কের কাটাকুটিতে হেরে যাওয়া মানুষগুলোও আজ নিশ্চিন্তে ঘুমায়।

Share This
Categories
কবিতা

চন্দনকাঠের চাঁদ, চিতা ও চমৎকার :: শু ভ ঙ্ক র দা স।।।

১
অনশ্বর গুহার ভেতর ছুটন্ত স্পন্দন
সময়রাক্ষসের চোখে তুচ্ছ, অতি সামান্য অথচ ব্রহ্ম-উদ্যম
তাতেই অলীক নির্মিত গোটা ভুবনের সম্রাট ও সিংহাসন!

২
মাঘী সংক্রান্তীর কোনো তারাখসা রাত
রক্তমাংসের পুষ্পবৃষ্টি, ঘড়ির কাঁটার উল্লম্ফনসম
ভয়ার্ত জন্ম-আঙুল,চেপে ধরে অনিদ্রিত,অগাধ সফেন স্তন!

৩
কোনো অঙ্কে বিভাজিত নয় অঙ্ক অথচ দৃশ্য শুরু
দিগন্তে মিশে যাওয়া সাদা বলাকার পাখা,সবুজ শীষের শরীর বেয়ে নামা শিশির, ধানসিদ্ধ উনুনের লালাভমুখ
অরব আয়োজনের সাক্ষী
পথচলা গুহার চিত্রের শিকারের পর অবিরাম শান্তি।

৪
অভিযানে অ্যামিবার আলস্যমাখা চিহ্ন বুকের মধ্যে
এনেছে বক্বল বিশুদ্ধতা, গতি তো দুর্বোধ্য, বৃক্ষের পাশে
মাথায় ময়ূরপালক বেঁধে চোখ দেখানো অসূর্যকে
রূপকথার চেয়েও অসীম,অবধারিত..

৫
অরণ্যের সকল পোশাক ফেলে আলোর স্বভাবসত্য
স্নায়ুকিরণ চলাচল সেই মহাশূন্য থেকে পিঁপড়ের পায়ের নূপুরের ধ্বনির মাঝে, যেখানেই আর্তনাদ
প্রার্থনা শিশুহাতের,শুভ্রতার মেঠো অনুবাদ

৬
জলজ পরিবার,শ্বাস ভরে নিয়ে সপরিবারে বাঁশি
হয়ে ওঠার নিরলস নিমগ্নতা,বসুন্ধরা বিজয়ের হাসি
কোনো জীবাস্মস্মৃতির ভেতর গোপন রেখে
এই উপলব্ধি, হৃদয়ের সুউচ্চতা ও স্থাপত্য কল্পনাতীত!

৭
ক্ষমা শব্দের ভেতর রক্ত,শূল,কাঁটা আর বহনকারী মিথ্যের দোষারোপ, আশেপাশে সবই শব,শুধু শিরের
মাঝখানে জাগ্রত তৃতীয় নয়ন
জ্বলছে, জ্বলছে নারীত্ব,পুরুত্বের কাঠে ও কাঠামোয়..

৮
তুষারক্ষেত্রে অযুত পায়ের চিহ্ন পাবে না,শিবরেখা
বরাবর পড়ে আছে পৃথিবীজন্মের কথা,কোথায় ছিল সেই মহাজাগতিক ছিদ্র, মাতৃযোনী,বিস্ফোরণ!
সকল প্রাণ,আসলে ধ্বংসাবশেষ…

৯
স্বপ্নের ভেতর সারাৎসার সিঁড়ি, অথচ কতক্ষণ স্থায়ীত্ব!
হৃদয়ের সক্রিয় শব্দের মূর্তি, সে দৈব হোক বা অদৈব
অঘোষিত সিদ্ধান্ত এই,নিজের সৃষ্টিকে প্রশ্ন না করে
নিজেই উত্তরলিপি পাঠ করো নিজের আয়নায়…

১০
পর্যায়ে রেখা মাত্র দুটি, আদম ও ইভ, সত্যি কোনো
গল্পের নটেগাছ না হলেও প্রতিটি মাটির নিচে শিকড়
যাচ্ছে, কোন টানে? চেতনার অধিকৃত প্রাণে
অস্ত্রগুলি পরীক্ষিত, শুধু আহত ও পরবর্তী শুশ্রূষার
কাহিনি শিশু শুনতে থাকতে মাতৃগর্ভে

১১
অন্তহীন সন্তরণে জল পেতেও পারো আবার নাও পেতে পরো,সাঁতার অশেষ,অমোঘ এবং অপরিবর্তনীয়
নদীর কাছে নৌকা মিলনপ্রত্যাশী,অথচ স্থিরতা নেই
পিতা-মাতার চক্ষু-চমাড়া,সেই ধ্বনিত প্রকাশ

১২
খাঁচা নির্মাণই দেবত্ব,এই দিলাম চাঁদ,এই দিলাম জোছনা
এই দিলাম জোনাকি,এবার আর্ষপ্রয়োগের আবেগে
বিদ্যুৎ, বিনত প্রস্তাব, বৃষ্টি ও মুখর-মেঘে
সব কাঁচাপাকা সন্তানই জয়ের স্মারক…

১৩
আঁচলের হলুদ শস্য, আলপনা সেই স্বর্গাবোধি
অনিপুণ হাতের সোহাগ মাখানো সহবাস
লক্ষ্মীবিদ্যা শেখানোর যুগান্তর শাঁস, যেভাবে নতুন ফসলের গান,মনকণিকার অভিভাবক,অযান্ত্রিক!

১৪
জ্ঞানের কাছে থেমে আছে যা,ক্ষুধার সৈকতস্বাদ
রোদপোহানোর মতো পুঁথিপাঠ,ধর্ম-মোক্ষ-মহৎমঠ
সবই শিশুপালনের মতো আবর্তন
শুধু দীর্ঘরাত পেরিয়ে একটাই লড়াই,মৃত্যু প্রতিদ্বন্দ্বী

১৫
বনমানুষের স্বভাব ঢেলে দিয়েছে ঈশ্বরের অবয়বে
নিজেকে পোশাকের মুখোশে,কাপড়ের সৌজন্যে ঢেকে
নিজেই আবার দায়মুক্ত হয়ে নগ্ন হয় রাতে ও দিনে
কে অন্তরাল? নীলকন্ঠের রেখেছো মোহিত আড়াল!

১৬
অকস্মাৎ জানতে পারল,অনুভব ছাড়া কোনো দরজা
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নেই,প্রজ্ঞা, প্রেরণা, প্রদীপ এবং প্রীতি
ফুরিয়েও সঠিক সন্ধি বা সহবাস হয়নি
নিহত চোখের নিচে মুঠো মুঠো বলিরেখা

১৭
সেই মরুপথে যাত্রা, নাভিসরোবরে স্নান,স্বরূপের
সাহসসমগ্র ইতিহাসের অক্ষম পাতা,তার ওপর
মৃতচিতাবাঘের ওপর ছবি তোলার মতো কারুকার্য
অবাক পানীয়,পিপাসার কীরকম সযত্ন সঞ্চারণ!

১৮
জড় ও জমির অধিকাংশ চর্চা ও চেষ্টা, অন্বেষণ
সেইসঙ্গে নরম,তুলতুলে,পদ্মপ্রথম শরীর,খনন
বাদবাকি শুধু শ্রদ্ধাবান হাহুতাশ আর পড়ে থাকে
কিছু জরাসন্ধ ইন্দ্রিয়, যাদের নগ্ন দ্রৌপদীদহন ছাড়া
কিছু বিদ্ধ মহাভারতীয় তীর

১৯
সহসা প্রেমের সারি সারি সঙ্কল্প কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকার তলদেশ পর্যন্ত একে-অপরকে
প্রতিষ্ঠিত করতে,দৃশ্য, দৃশ্যের পালিশ,গান,গানের গভীরতা,প্রস্তাব, প্রস্তাবের সংস্কৃতি, সেই সরলতা প্রথম কদম ফুল

২০
অতি কষ্টে শ্মশান সন্ধিতে আসে,আশির কাছে
বা তারও ঢেলা-ভাঙা আগে দেখিয়ে রাখে চতুষ্পদ
বা আয়তক্ষেত্রের মাপ,স্বয়ং পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার
ছায়াছবি,তবুও সরাসরি মুহুর্ত, চুম্বন

২১
উজ্জ্বল নীলগ্রহ একাই বুকে প্রান ভরে নিয়েছে
যেভাবে ডুবসাঁতার দেওয়ার আগে ভরে নেয় দম
মেঘের আসবাব, মাঠের মাধুকরী, পুষ্পের প্রস্তাব
সব স্বয়ংচালিত ক্ষুদ্রকে করে সুবৃহৎ

২২
কেবল কি কাঠামো? যাবতীয় খড়,মাটি,অস্ত্র
যে গড়ে,তার ফুসফুস, পেট,চরিত্রসংশোধন বিন্যাস
কোনো নক্ষত্র মৃত ছাড়া মাটি ছোঁয় না
ঈশ্বরও ধাতবস্বর, আঘাত হলে আকৃতি পায়

২৩
সরলতা ন্যাংটাশিশুর মতো সকলের গৃহের সামনে ধুলোর গড়াগড়ি দেয়,হাসে,দুর্ঘটনায় কাঁদে
পুনর্বাসন সচেষ্টায় সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়,শুধু অশান্ত কিছু ছাঁচ দরজা-জানালা বন্ধ করে

২৪
শব্দহীন বেদনার বাতাসে এগিয়ে চলে মহাশূন্যকারিগর
নিজের নিঃশ্বাসের সঙ্গে কথোপকথন, নিজেকে স্পর্শ
করে প্রাণময় করে তোলে পরবর্তী পর্যায়
সেখানেও প্রবাহিত সম্পর্কের সুজনিশাক, তরতাজা

২৫
উৎসমুখে আগ্নেয়ঘর, একটি মাত্র শিল্পী বেঁচে আছে
তাঁকে করুণা করে কেউ সর্বশক্তিমান বলে বাঁচতে চেয়েছে,স্বর্গের কল্পনার চেয়ে মহৎগুণ এই
পিতৃপুরুষের শেষযাত্রায় মাথায় হাত রেখে,নিরাময়ের
নতুন গল্প শোনানো,সত্যি হলেও হতে পারে…

২৬
চাঁদের সংগীত যেকোনো শরীরকে হরিতকীমন্দির করে তুলতে পারে,জীবাণুর সকল পরিচয়, দৃষ্টি, সহবাস
অথবা পরাক্রমী উৎপাদন ভুলিয়ে রাখে নন্দনতত্ত্ব
শুধু লড়াই নেমেছে সমুদ্রের মতো,পুতুল হতে পারবে না!

২৭
শেষপাতে ঈশ্বর এসে খাবেন বলে,পা-ধোয়ার জল, তুলানরম বক্বল,পরমাসুন্দরী সম্ভাষণ সাজিয়ে রেখে
অনুসরণীয় কোনো নৃত্য-গীত এবং স্তব প্রদর্শিত
শুধু ঈশ্বর পশু-পাখি-গিরিগিটি-কেঁচো অথবা গৃহপালিত
প্রীতিময় পুরাণপাতা,সেটাই রহস্য!

২৮
নদী যেদিকে বহমান,পাহাড় যতটা আকাশভেদী
বৃক্ষের শিকড়কৌশল, সব ভাস্কর্য ও স্থাপত্য শেষে
যা রক্ত-ক্লেদ-কফকে রূপময়-শ্রেয়শ্রেষ্ঠ করেছে
প্রণয়,অশ্বিনীকুমারের রথচক্র ঘষটে গেছে মাটিতে

২৯
পাথরে খোদিতরূপ, অবিশ্বাসের আলোড়নে যদি
সকল মূর্তি ভেঙে যায়,জড়ো করা প্রসাধন, প্রভাব
প্রতিশোধ আগুনে পুড়ে,ছাই
সেই ছাইয়ের ওপর অবতার ঘুমায়,ত্রিশূল শর্ত হয়ে

৩০
চাঁদের দুপিঠেই চাবুক,কুমিরের রোদ পোহানোর মতো
বিস্ময় শুয়ে আছে প্রকাশ্যে,নিজেকে এই যজ্ঞের আগুনে উৎসর্গ করেছে,অষ্টধাতুর সঙ্গে মিশিয়ে
চাঁদের চেয়েও অপরূপ অপরাধ করবে বলে…

৩১
নির্মাণ মাইলের পর মাইল হেঁটে আসে,সেখানে সৌখিন পরীক্ষায় অভিষেক, মুকুট বানানো হয়নি বুকের মাংস কেটে,ক্রিয়াধর্মের সূত্র ধরে অপেক্ষা ফিরে আসবে
যা কিছু অন্তর্গত ভালো,ভালোর মহিমা

৩২
হৃদয় সশস্ত্র ডুবোজাহাজ, নিজের শরীরে সামুদ্রিক
তা নয়, যার দর্শনে শ্বাসকার্য চলে,সেখানে যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি,কেন এই মহাকর্ষীয় আন্দোলন, মুখ,মুখর
কোলাহল,মধ্যমণি,সেই মুদ্রা ও মুগ্ধতা

৩৩
হৃদয়ের পান্ডুলিপি কেউ না কেউ সংবিধান ও সম্রাটের
পায়ের কাছে রেখে,মুক্তি ও মধুরিমা
এই যে অবাধ আবেগ,তার শাসিত কেন্দ্রীয় নিউক্লিয়াস
সবই দাগ রেখে,শুধু উষ্ণতাকে তপসিলি তাম্রযুগ!

৩৪
পদাবলির পাতা ইঁদুরের মুখে,খুদের আকাল
মাঠে মাঠে সবুজের লাশ,হাঁড়ি,কলসি,বাটি,চাল,ডাল
আর বৈষ্ণবী রাত,কন্ঠিবদল করে রৌদ্রবিক্রয়
অপরাহ্নে চক্ষুস্থির, এতো পাঠ বাকি নারীর…

৩৫
একটি পরিচ্ছন্ন কাল,তাই কম্পিত হাতের ওপর রাখা
জয়ের সকল চিহ্ন দিয়ে জলেডোবা রাস্তাটুকু চলাচলের
যোগ্য করে,বিশ্বরূপদর্শন। অতীত,ভবিষ্যৎ ও বর্তমানকে
জানার এই প্রক্রিয়া, সৃষ্টির নিয়ামকের দাঁড়িপাল্লা

৩৬
আত্মা কোথা থেকে নিয়ে এসেছে আনাজ,মাছ,মাংস
স্নানের পর ত্রিপিটক খুলে সাদাবস্ত্র নামিয়েছে শির
সেই শিরে চুম্বন করছে সশরীরে নূর, পরমহংসের কাতর
কান্না মিশে আছে অস্তিত্বে,এবার পোড়ায় মায়া,গাছের ছাল

৩৭
আমলকি করতলে রেখে বলছে, মানুষ নয়,মানুষী নয়
লিঙ্গভেদে শুধু মাতা, নিত্যসিদ্ধ,শুধু উচ্চারণ, পিতা,
মুমুক্ষুবৃক্ষ,মাঝখানে সাধনবর্গ সেই যোনিপথে চক্রাকারে
চমৎকার

৩৮
অরণ্য থেকে বেরানো শ্বাস,শূদ্রের হাতে তৈরি মারণাস্ত্র
বালক চলেছে সাধু-দর্শনে,বালিকা ধরেছে,বালকের
শরীরী পটবস্ত্র, যা নিজের শরীর দিয়ে তৈরি
ক্ষত্রিয় অবাক,বৈশ্য বিগলিত,শুধু একটি জ্যোতিরেখায় ব্রাহ্মণ শূদ্রের পায়ের ধুলোয় মন্ত্র লিখছে

৩৯
বেদান্ত-আয়াত এবং বাইবেলের ধ্বনিত চমৎকার ধ্বনি
একশো শতাংশ আন্তরিক জেনে,বদ্ধজীব, আরও আরও
বদ্ধ হয়ে হাসে,সেই হাসিতে বিদ্যুৎ চিরে যায়
কৃষক শুধু গলায় হাড়ের মালা দেখিয়ে বলে
ক্ষিদের পাতা খুলে খুলে নোঙর বানাব…

৪০
সহসা শেষ কথা,শেষ কথাই,মৃত্যুর মতো সংবাদ
মৃত শোনে না,কোনোদিন, অথচ দশ সহস্র গোধন ও সমপরিমাণ স্বর্ণমুদ্রার আশায় সন্ন্যাসী ও সংসারী
সেই সংবাদের সুষ্ঠু আশায় মৃত্যুকে ভেট দেয়…

৪১
সকল ভিক্ষুক হাত জড়ো করে নদীর ওপর,যাদের শরীরে এখনও রাজসভা লেগে,কষ্ট বেশি তাদের
আর যাদের গায়ে লেগে আছে পথের ধুলোয়
তারা স্নানমাত্র সারস

৪২
শ্বাসকার্যে ঈশ্বরের সন্ধ্যা ও সকাল।গোলাকার একটি বলীয় প্রক্রিয়া, তার ওপর মাটি-পাথর-মাংসের নামকরণ ও বুক চিতিয়ে ওঠার নমুনা,সুনিপুণ বিবরণী হিসেবের
ঐ পর্যন্ত কি আকাশ? হলুদ হ্রদের হাহাকার,শুধু সূর্যপ্রতিম সবুজ সবুজ মদের মতো ঘাস!

৪৩
অমরত্বের ভুল বোঝাবুঝি, উপাস্য তাকেই করেছে যে সবচেয়ে ক্ষুরধার অস্ত্র ধরতে পারে,সেই হত্যার সারাৎসার লীলা,এখন আহ্নিক গতির পৃষ্ঠা ছিঁড়ে
ভুবন গড়ার খেলা,খেলার অধিক অভ্যাস,এমন কি ঈশ্বরীয় বিশ্বাস!

৪৪
ঝুলন্ত মাটির বারান্দা, ধনুকহাতে বীরশ্রেষ্ঠ,স্বর্গামাধুরীর মতো মোহময়ী নারীর কোমরে হাত ক্রেডিটকার্ড ধরে থাকা কুবের,তার অনেক নিচে সিনেমার পোস্টারের নিচে খালি পেটে,না,অভুক্ত নয়, অশ্রু চেটে চেয়ে আছে
নবযুগের নায়ক

৪৫
যেকোনো বৃহৎ রাক্ষসের চেয়ে শক্তিশালী কাম,নিসর্গ, দেব-দেবী,পক্ষীরাজঘোড়া,রূপকথা,সমৃদ্ধনগরের জলপথ,আবিষ্কার, আরামপ্রিয় নিদ্রা,নত হয়ে থাকা মুনি-ঋষির শির
তার চেয়েও জন্মগ্রহণ,মানুষের, মানুষের বাচ্চার..

৪৬
মানুষের বসবাসযোগ্য ভূমি,লেখো,অশ্রু, অশ্রু, অশ্রু

৪৭
অনুতাপ চেতনার শেষ তলে ঢেউ তোলে একা
যেন নিঃসঙ্গ সৈনিক
মহাভারতের কোনো অধ্যায়কে ক্ষমা করবে না

৪৮
এখনও প্রেম সমর্থন পায়নি,জিততে কোনোদিন পারেনি!শুধু অপেক্ষার পাথুরে রেখা অথবা জীবাশ্ম হয়ে
স্থির,কোনো এক জীবন্ত হৃদয়ের

৪৯
মৃতদেহের ওপর জন্মান্তরের গাছ,সেই গাছে ধুলো…

৫০
আবার চোখের পাতায় লেখো, অপেক্ষা,অপেক্ষা, অপেক্ষা…

উৎসর্গ। কবি শম্ভু রক্ষিত
চিত্রঋণ।ফেসবুক

————————//———————-
২৫শে ডিসেম্বর, ২০২১.©Suvankar Das.Haldia.

Share This
Categories
কবিতা

একান্তে :: রাণু সরকার।।

খেলেছি কত তোমার সাথে
যখন আমার শুরু হলো প্রথম মেয়েবেলা,
তখন চিনতো কি আমাদের মন-
কে তুমি আর কে আমি!

ছিলোনা আমাদের ভয় লজ্জা অপমানের জ্বালা,
তখন সেই যে আমার প্রথম শুরু বেলা-
মনটা ছিলো বিশ্রামহীন অস্থির উড়ু উড়ু,
থাকাটাই তো স্বাভাবিক।

সকাল সন্ধ্যা রোজ আসতে না তুমি বলো ডাকতে,
যেন তুমি আমার কোন এক কালে ছিলে ভীষন আপন জন,
আমার তো কেউ ছিলো না বলো তুমি ছাড়া খেলার সাথী-
তুমিই ছিলে একজন একান্ত আপনজনা!

ছুটোছুটি করেছি কতনা হাত ধরে,
হেসে খেলে বনের এপ্রান্ত থেকে ওপান্তে।
এখন কি তোমার ওসব কথা মনে পড়ে আমার মতো?
তোমার পাঁচমিশালী টুকরো টুকরো গানের সুরে দিতাম আমি তাল,
করতো না তো একটুও লজ্জা আমার!
তখন নাচতো আমার মন, হতো চঞ্চল,
তখন আমি ছোট্ট খুকী-
সবে গায়ের গন্ধ বাতাসে ওড়ে, বুঝতামনা গানের মর্মার্থ।

আচমকা দিনের সূচনা স্তব্ধ হল সব,
প্রকৃতির এটাই বুঝি নিয়ম,
পশ্চিমেতে সূর্য রেগে ঠায় দাঁড়িয়ে,
যাচ্ছে না কেনো চলে-
বুঝেছি, এবার আমার থাকতে হবে একান্তে নিরালায় ঘরের কোণে।

Share This
Categories
কবিতা

আদরের অনামিকা :: রাণু সরকার।।।

রাতে ঘুম আসেনি, ভাবনারা ছিলো প্রিয়র অভ্যন্তরে,
ভোরে একটু চোখ বুজে আসছিলো-
মনে হলো প্রিয় নিদ্রাতুর চোখে চুম্বন করলো।

গায়ে তার যৌনগন্ধ,
ঘুমের মধ্যে হৃদয়ে ঢেউ তুলে দিলো,
ঘুমের ঘোরে হাত ধরে নিয়ে যায় জ্যোৎস্নায় স্নান করবে বলে।

দু’জনেই স্নান করছিলো,
কাঁপা কাঁপা স্বরে করলো অঙ্গীকার,
দু’জনের হৃৎশব্দ একসুরে বেজে উঠল-
ঘুমের মধ্যে সে-কি সুখ, প্রেমানন্দে নানান স্পর্শ!

হিংস্রের মত নেশালাগা জ্যোৎস্নার রাত ব্যাকুল বিবস্ত্র শরীর দু’জনের,
এক নিঝুম জ্যোৎস্না রাতে নদীর ধারে ঘাসের কোমল শয্যায় হলো মিলন,
মিলনের অজান্তে বীজ রোপণ করা হয়ে গেলো, কি হবে এখন?

বীজ রোপণ করেছে যখন গাছটির কি নাম দেওয়া যায়,
ভয়ে ভয়ে গাছটির নামকরণ করলো-
নাম দিয়েছে অনামিকা।

গাছটি দু’জনের মিলনের খুব আদরের,
গাছটি স্বপ্নে রোপণ হলল,
কিন্তু দু’জনের খুব আদরের, স্বপ্নের অনামিকা!
—
২৬|০৪|২০১৮

Share This
Categories
কবিতা

এক শ্রাবণের কথা : রাণু সরকার।

শ্রাবণের আকাশে কালো মেঘের পুঁজিতরাশি,
এই বুঝি এলো বর্ষা রাণী, স্বামী-পুত্র গেছে মাঠে,
ধেয়ে এলো ঘনকাল ও মাগো মা নিমেষে হলো এক হাঁটু জল মাঠ ঘাট হলো এক বোঝা দায়।
হায়-রে শ্রাবণের ধারা দেখো দেখো ধানের মাথা গুলো করছে যেন বিনয়ী বাতাসের তাড়নায়।

গরু-ছাগলের পাল দিচ্ছে কি হাঁক ডাক,গোগৃহ তো জলে ডুবুডুবু গা যাচ্ছে ওদের ভিঁজে। এতোগুলো গাই বাছুরের পাল রাখি কোথায়ও, কে যানতো এভাবে শ্রাবণেরধারা বৈবে অবিরাম।

সূর্য এই বুঝি দিলো ডুব তবে যায় না দেখা মনে হয় একটু আছে বাকি,
বোঝাও কি উপায় আছে আঁধার রেখেছে যে ঘিরে।
এখনো কি পারছে না বুঝতে তারা হুঁশ নেই কি একদম,একা কি করে দেই সব সামাল বৃদ্ধা শ্বাশুড়িটাও পরে আছে বিছানায়।
দুয়ারে এক হাঁটুজল দাঁড়িয়ে দেখছি-কারুর দেখা নেই,ঘনঘন বিদ্যুতের চমকানি,
একা গৃহে ভয়ে ভয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত,
তাকে বলেছিলাম-বেলা না গড়ায় এসো ফিরে তাড়াতাড়ি ঘরে, কে কার কথা শোনে,
সকাল থেকেই ছিলো মেঘেদের মুখ ভার করছিলো তারা কানাকানি।

তখনি বুঝেছি আসবে ধেয়ে নেবে সব ভাসিয়ে ক’দিন আগেই বলেছিলাম গোয়াল ঘরের চালটাতে ঘর চাপাতে হবে কানে নেয় নি কথা।

হঠাৎই কানে এলো কে যেন ডাকছে,বউঠান বাব-বেটা ফিরেছে কি ঘরে?
আমি বলি না গো দাদাঠাকুর ফেরেনি এখনো তারা।
দেখ দেখি কি মুশকিলের কথা,তারা কি বোঝে
না দু’কূল গেছে ভেসে,
বলেছিলেম তো তারে বেলা থাকতেই যেন আসে ফিরে ঘরে।
গৃহিণীর কথা বাসি হলে লাগে কাজে।

Share This
Categories
কবিতা

কোরক : রাণু সরকার।

আমার জন্ম জন্মান্তরের
কিছু সুখ দুঃখের স্মৃতি‐
অত্যাচারিত তারা-
তোমার ঠোঁটে বা হৃদয়ে
কি করে তাদের রাখি!
আমি কোন চিহ্ন রেখে
যাবো না-

তুমি কি আমার?
না—
আমার নও অন্য কারোর!
যদি ভুল বলি করো খমা-

আমার কোন স্মৃতি
থাকে যদি মনে!
ধরা দেবে তুমি নিজে-
ধূর্ত কপটচারী–
খুলতে হবে না দ্বার!

ঠোঁটে যদি পুষ্পকোরকের
অনুভূতি হয়ে থাকে-
সেটা আমার নিবিড় প্রখরতা কদাচ-
দীর্ঘকালের আকাঙ্ক্ষিত
সোহাগের অভ্যর্থনা!

তবে তুমি কি আমার?
না–
ছিলে একসময় এখন
অন্য কারো!
প্রকৃতি সাক্ষী রখেছে-
তবে আকাঙ্ক্ষিত যুগল
ঠোঁট ভরাট হলোনা!
মদিরার কামনা বাসনার চুম্বনে!

Share This
Categories
কবিতা

আদুল : রাণু সরকার।

প্রতিদিন মধ্যাহ্নে তটিনীর জলে স্নান সেরে
আদুল যৌবন
ভেজা কাপড়ে মুড়ে কলসীতে জল ভরে হেঁটে যাও-
চুলে মাখা চন্দন তেলের গন্ধ ভেসে আসে নাকে, মন হয় চঞ্চল!

জলপরীর সাজে দেখায় বেশ জলের বিন্দু চোখেমুখে,
ঠোঁট দুটি যেন মদিরা ঢালা!

এতো সুন্দর দৃশ্য হোতনা দেখা
যদি না থাকতাম আড়ালে অপেক্ষায়!

Share This