Categories
প্রবন্ধ

উধাম সিং : ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের শহীদ মার্ক্সবাদী বিপ্লবী।।।

উধাম সিং (২৬ ডিসেম্বর ১৮৯৯ – ৩১ জুলাই ১৯৪০) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের শহীদ মার্ক্সবাদী বিপ্লবী। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের সময়ে যিনি পাঞ্জাব প্রদেশের বিলেতি গভর্নর ছিলেন, সেই মাইকেল ও’ডোয়াইয়ার-কে (Michael O’Dwyer) হত্যা করতে তিনি সংকল্পবদ্ধ হন।

এই উদ্দেশ্যে উধাম সিং ১৯৩৪ সালে বিলেত গমন করেন। এবং অবশেষে ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে – জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের প্রায় ২১ বছর পরে – লন্ডনের এক সভাকক্ষে তিনি মাইকেল ও’ডোয়াইয়ার-কে গুলি করে হত্যা করেন।
উধম সিং ব্রিটিশ ভারতের লাহোর থেকে প্রায় 130 মাইল দক্ষিণে সুনামের পিলবাদ এলাকায় ২৬ ডিসেম্বর ১৮৯৯ সালে একটি শিখ পরিবারে ‘শের সিং’ জন্মগ্রহণ করেন, তেহাল সিং নামে একজন কম্বোজ, স্বল্প-দক্ষ স্বল্প বেতনের কায়িক শ্রমিক এবং তার স্ত্রী নারাইন কৌর। তিনি ছিলেন তাদের কনিষ্ঠ, তার এবং তার বড় ভাই সাধুর মধ্যে দুই বছরের পার্থক্য। যখন তাদের বয়স যথাক্রমে তিন এবং পাঁচের কাছাকাছি, তখন তাদের মা মারা যান। দুই ছেলে পরবর্তীকালে তাদের বাবার কাছাকাছি থেকে যায় যখন তিনি নিলোওয়াল গ্রামে পাঞ্জাব ক্যানেল কলোনির অংশ, একটি নবনির্মিত খাল থেকে কাদা তোলার কাজ করতেন। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর তিনি উপলি গ্রামে রেলক্রসিং প্রহরী হিসেবে কাজ পান।
১৯০৭ সালের অক্টোবরে, ছেলেদের পায়ে হেঁটে অমৃতসরে নিয়ে যাওয়ার সময়, তাদের বাবা রামবাগ হাসপাতালে পড়ে মারা যান। দুই ভাইকে পরবর্তীতে একজন চাচার কাছে হস্তান্তর করা হয় যিনি তাদের রাখতে অক্ষম হয়ে তাদের সেন্ট্রাল খালসা এতিমখানায় দিয়েছিলেন, যেখানে এতিমখানার রেজিস্টার অনুসারে, ২৮ অক্টোবর তাদের দীক্ষা দেওয়া হয়েছিল। পুনর্বাসিত হয়ে, সাধু হয়ে ওঠেন “মুক্তা”, যার অর্থ “যে পুনরুত্থান থেকে পালিয়েছে”, এবং শের সিংকে “উধম সিং”, উধম যার অর্থ “উত্থান”। এতিমখানায় তাকে আদর করে “উদে” বলে অভিহিত করা হয়। ১৯১৭ সালে, মুক্তা এক অজানা আকস্মিক অসুস্থতায় মারা যান।
এর কিছুক্ষণ পরেই, নথিভুক্তির সরকারি বয়সের কম হওয়া সত্ত্বেও, উধম সিং কর্তৃপক্ষকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাকে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে সেবা করার অনুমতি দেওয়ার জন্য রাজি করান। পরবর্তীকালে উপকূল থেকে বসরা পর্যন্ত মাঠ রেলপথে পুনরুদ্ধারের কাজ করার জন্য ৩২ তম শিখ পাইওনিয়ারদের সাথে সর্বনিম্ন র্যাঙ্কিং শ্রম ইউনিটের সাথে সংযুক্ত হন। তার অল্প বয়স এবং কর্তৃত্বের সাথে দ্বন্দ্ব তাকে ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে পাঞ্জাবে ফিরে যেতে বাধ্য করে। ১৯১৮ সালে, তিনি সেনাবাহিনীতে পুনরায় যোগদান করেন এবং তাকে বসরা এবং তারপর বাগদাদে প্রেরণ করা হয়, যেখানে তিনি ছুতার কাজ এবং যন্ত্রপাতি এবং যানবাহনের সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণ করেন, এক বছর পর ১৯১৯ সালের প্রথম দিকে অমৃতসরের অনাথ আশ্রমে ফিরে আসেন।
১০ এপ্রিল ১৯১৯-এ, সত্যপাল এবং সাইফুদ্দিন কিচলু সহ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাথে জোটবদ্ধ বেশ কয়েকজন স্থানীয় নেতাকে রাওলাট অ্যাক্টের শর্তে গ্রেফতার করা হয়। একটি সামরিক পিকেট বিক্ষোভকারী জনতার উপর গুলি চালায়, একটি দাঙ্গাকে প্ররোচিত করে যা দেখেছে অসংখ্য ইউরোপীয় মালিকানাধীন ব্যাংক আক্রমণ করেছে এবং বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় রাস্তায় আক্রমণ করেছে। ১৩ এপ্রিল, অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে বিশ হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র লোক জড়ো হয়েছিল বৈশাখীর গুরুত্বপূর্ণ শিখ উৎসব উদযাপন করতে এবং গ্রেফতারের প্রতিবাদ করতে। অনাথ আশ্রমের সিং এবং তার বন্ধুরা ভিড়কে জল পরিবেশন করছিলেন। কর্নেল রেজিনাল্ড ডায়ারের অধীনে সৈন্যরা ভিড়ের উপর গুলি চালায়, কয়েকশত লোককে হত্যা করে; এটি অমৃতসর গণহত্যা বা জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যা নামে বিভিন্নভাবে পরিচিতি লাভ করে।
সিং বিপ্লবী রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন এবং ভগত সিং ও তার বিপ্লবী গোষ্ঠীর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৯২৪ সালে, সিং ঔপনিবেশিক শাসন উৎখাত করার জন্য বিদেশী ভারতীয়দের সংগঠিত করে গদর পার্টির সাথে জড়িত হন। ১৯২৭ সালে, তিনি ভগৎ সিংয়ের আদেশে ভারতে ফিরে আসেন, ২৫ জন সহযোগীর পাশাপাশি রিভলবার এবং গোলাবারুদ নিয়ে আসেন। এরপরই লাইসেন্সবিহীন অস্ত্র রাখার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। রিভলবার, গোলাবারুদ এবং “গদর-দি-গুঞ্জ” (“বিদ্রোহের কণ্ঠস্বর”) নামে একটি নিষিদ্ধ গদর পার্টির কাগজের কপি বাজেয়াপ্ত করা হয়। তাকে বিচার করা হয় এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
১৯৩১ সালে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর, সিং-এর গতিবিধি পাঞ্জাব পুলিশের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে ছিল। তিনি কাশ্মীরে চলে যান, যেখানে তিনি পুলিশকে এড়িয়ে জার্মানিতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ১৯৩৪ সালে, তিনি লন্ডনে পৌঁছান, যেখানে তিনি চাকরি খুঁজে পান। ব্যক্তিগতভাবে, তিনি মাইকেল ও’ডোয়ায়ারকে হত্যার পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। ১৯৩৯ এবং ১৯৪০ সালের সিংয়ের ডায়েরিতে, তিনি মাঝে মাঝে ও’ডায়ারের উপাধি “ও’ডায়ার” হিসাবে ভুল বানান করেন, একটি সম্ভাবনা রেখে তিনি ও’ডায়ারকে জেনারেল ডায়ারের সাথে বিভ্রান্ত করতে পারেন। যদিও উধম সিং প্রতিশোধের পরিকল্পনা করার আগেই ১৯২৭ সালে জেনারেল ডায়ারের মৃত্যু হয়েছিল। ইংল্যান্ডে, সিং কভেন্ট্রিতে ইন্ডিয়ান ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং তাদের মিটিংয়ে যোগ দিতেন।
১৩ মার্চ ১৯৪০ তারিখে, মাইকেল ও’ডায়ার লন্ডনের ক্যাক্সটন হল-এ ইস্ট ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন এবং সেন্ট্রাল এশীয় সোসাইটি (এখন রয়্যাল সোসাইটি ফর এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স) এর যৌথ সভায় বক্তৃতা করার জন্য নির্ধারিত ছিল। সিং তার স্ত্রীর নামে টিকিট নিয়ে ইভেন্টে প্রবেশ করেছিলেন। সিং একটি বইয়ের ভিতরে একটি রিভলভার লুকিয়ে রেখেছিলেন, যার পৃষ্ঠাগুলি একটি রিভলভারের আকারে কাটা ছিল। এই রিভলভারটি তিনি একটি পাবের একজন সৈনিকের কাছ থেকে কিনেছিলেন। তারপর হলের ভিতরে ঢুকে একটা খোলা আসন পেল। সভা শেষ হওয়ার সাথে সাথে, সিং ও’ডায়ারকে দুবার গুলি করে যখন তিনি স্পিকিং প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে যান। এই বুলেটগুলির মধ্যে একটি ও’ডায়ারের হৃৎপিণ্ড এবং ডান ফুসফুসের মধ্য দিয়ে চলে যায় এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাকে হত্যা করে। গুলিতে আহত অন্যদের মধ্যে স্যার লুই ডেন; লরেন্স ডান্ডাস, জেটল্যান্ডের দ্বিতীয় মার্কেস; এবং চার্লস কোচরান-বেলি, ২য় ব্যারন ল্যামিংটন। গুলি চালানোর পরপরই সিংকে গ্রেফতার করা হয় এবং প্রমাণ হিসেবে পিস্তল (এখন ক্রাইম মিউজিয়ামে) জব্দ করা হয়।
.
।।তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

আওরঙ্গজেবের ক্ষমতায় উত্থান: উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ষড়যন্ত্রের গল্প।।।।

আওরঙ্গজেব, যিনি আলমগীর নামেও পরিচিত, তিনি ছিলেন ভারতের ষষ্ঠ মুঘল সম্রাট এবং ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী শাসক। তার পিতা শাহজাহানের পতন এবং তার ভাইদের পরাজয়ের দিকে পরিচালিত একাধিক যুদ্ধ এবং ষড়যন্ত্রের পর তাকে 31 জুলাই, 1658 সালে সম্রাট ঘোষণা করা হয়।

প্রারম্ভিক জীবন এবং উত্তরাধিকার সংগ্রাম—

আওরঙ্গজেব 4 নভেম্বর, 1618 সালে গুজরাটের দাহোদে শাহজাহান এবং তার স্ত্রী মুমতাজ মহলের কাছে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সম্রাটের তৃতীয় পুত্র এবং সুলতান মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর উপাধি পান। আওরঙ্গজেবের প্রাথমিক জীবন ইসলামী শিক্ষার প্রতি কঠোর আনুগত্য এবং সামরিক বিষয়ে গভীর আগ্রহের দ্বারা চিহ্নিত ছিল।
1657 সালে, শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার চার ছেলের মধ্যে উত্তরাধিকার সংগ্রাম শুরু হয়। আওরঙ্গজেব, যিনি তখন গুজরাটের গভর্নর ছিলেন, সিংহাসন দাবি করার জন্য রাজধানী আগ্রার দিকে অগ্রসর হন। তিনি তার ভাই দারা শিকোহ এবং মুরাদ বক্সকে পৃথক যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং অবশেষে শাহজাহানকে ক্ষমতাচ্যুত করেন, যাকে গৃহবন্দী করা হয়।
সম্রাট হিসেবে ঘোষণা
31 জুলাই, 1658-এ, আগ্রার লাল কেল্লায় একটি জমকালো অনুষ্ঠানে আওরঙ্গজেবকে ভারতের মুঘল সম্রাট ঘোষণা করা হয়। তিনি আলমগীর উপাধি গ্রহণ করেন, যার অর্থ “বিশ্বজয়ী”। আওরঙ্গজেবের সিংহাসনে আরোহণ মুঘল ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা করে, যা শাসনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর এবং গোঁড়া দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্যযুক্ত।
রাজত্ব এবং নীতি
আওরঙ্গজেবের শাসনকাল প্রায় 49 বছর স্থায়ী হয়েছিল, এই সময়ে তিনি বেশ কয়েকটি নীতি বাস্তবায়ন করেছিলেন যার সুদূরপ্রসারী ফলাফল ছিল। তার উল্লেখযোগ্য কিছু নীতির মধ্যে রয়েছে:
1. ইসলামী আইন: আওরঙ্গজেব কঠোর ইসলামী আইন জারি করেছিলেন, যার ফলে হিন্দু, শিখ এবং অন্যান্য অমুসলিমদের উপর অত্যাচার চালানো হয়েছিল। তিনি বেশ কিছু হিন্দু মন্দিরও ধ্বংস করেন এবং অমুসলিমদের উপর জিজিয়া কর আরোপ করেন।
2. সামরিক অভিযান: আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যের মালভূমি, রাজপুত রাজ্য এবং শিখ অঞ্চল জয় করে একাধিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান।
3. প্রশাসনিক সংস্কার: আওরঙ্গজেব তার কর্মকর্তাদের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি কেন্দ্রীভূত রাজস্ব ব্যবস্থা এবং গুপ্তচরদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি সহ বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক সংস্কার প্রবর্তন করেন।
4. সাংস্কৃতিক নীতি: আওরঙ্গজেব অনৈসলামিক বিবেচনা করে সঙ্গীত, নৃত্য এবং বিনোদনের অন্যান্য রূপ নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ও ফার্সি সাহিত্য অধ্যয়নকেও নিরুৎসাহিত করেছিলেন।
উত্তরাধিকার
আওরঙ্গজেবের উত্তরাধিকার জটিল এবং বিতর্কিত। তিনি যখন মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান এবং বেশ কিছু প্রশাসনিক সংস্কার বাস্তবায়ন করেন, তার নীতিগুলিও ব্যাপক নিপীড়ন ও ধ্বংসের দিকে পরিচালিত করে। তার রাজত্ব মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা করে, যা শেষ পর্যন্ত 19 শতকের মাঝামাঝি পতন ঘটে।
ঐতিহাসিকরা আওরঙ্গজেবের উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক করেছেন, কেউ কেউ তাকে একজন নায়ক হিসেবে চিত্রিত করেছেন যিনি ইসলামকে রক্ষা করেছিলেন এবং অন্যরা একজন খলনায়ক হিসেবে যিনি ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধ্বংস করেছিলেন। যাইহোক, এটা অনস্বীকার্য যে আওরঙ্গজেব ভারতীয় ইতিহাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সমাজে স্থায়ী প্রভাব রেখেছিলেন।
উপসংহার
1658 সালের 31শে জুলাই ভারতের মুঘল সম্রাট হিসেবে আওরঙ্গজেবের ঘোষণা ভারতীয় ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা করে। তার শাসনকাল ইসলামী আইন, সামরিক অভিযান, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সাংস্কৃতিক নীতির কঠোর আনুগত্য দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছিল যার সুদূরপ্রসারী ফলাফল ছিল। যদিও তার উত্তরাধিকার জটিল এবং বিতর্কিত, আওরঙ্গজেব ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী শাসকদের একজন, এবং তার প্রভাব আজও অনুভূত হচ্ছে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

অ্যাপোলো 15 : চাঁদে একটি গ্রাউন্ডব্রেকিং মিশন।।।

31 জুলাই, 1971, মহাকাশ অনুসন্ধানের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল যখন অ্যাপোলো 15 মহাকাশযান চাঁদে যাত্রা শুরু করেছিল। এই মিশনটি ছিল চতুর্থ মানব চান্দ্র অবতরণ এবং লুনার রোভিং ভেহিকল (LRV) ব্যবহার করা প্রথম, যা নভোচারীদের অভূতপূর্ব গতিশীলতার সাথে চাঁদের পৃষ্ঠ অন্বেষণ করতে সক্ষম করেছিল।

ক্রু এবং মিশনের উদ্দেশ্য—–
Apollo 15 ক্রু তিনজন অভিজ্ঞ মহাকাশচারী নিয়ে গঠিত: ডেভিড স্কট (মিশন কমান্ডার), জেমস আরউইন (লুনার মডিউল পাইলট), এবং আলফ্রেড ওয়ার্ডেন (কমান্ড মডিউল পাইলট)। তাদের মিশনের উদ্দেশ্য ছিল:
1. হ্যাডলি রিলে অঞ্চলে একটি চন্দ্র অবতরণ সম্পাদন করুন।
2. বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান এবং নমুনা সংগ্রহ করুন
3. পৃষ্ঠ অনুসন্ধানের জন্য LRV স্থাপন করুন
4. Apollo Lunar Surface Experiments Package (ALSEP) পরিচালনা করুন
মহাকাশযান এবং লঞ্চ
অ্যাপোলো 15 মহাকাশযান দুটি প্রধান উপাদান নিয়ে গঠিত: এন্ডেভার নামক কমান্ড এবং সার্ভিস মডিউল (সিএসএম) এবং ফ্যালকন নামক লুনার মডিউল (এলএম)। মহাকাশযানটি কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ কমপ্লেক্স 39A থেকে একটি Saturn V রকেটের উপরে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল।
চাঁদে যাত্রা—
পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করার পর, মহাকাশযান ট্রান্স-লুনার ইনজেক্ট করে এবং চন্দ্রের কক্ষপথে প্রবেশের আগে প্রায় 67 ঘন্টা মহাকাশে ভ্রমণ করে। ক্রুরা চন্দ্র অবতরণের প্রস্তুতির জন্য কক্ষপথের একটি সিরিজ পরিচালনা করেছিল।
চন্দ্র অবতরণ এবং সারফেস অপারেশন—–
2শে আগস্ট, স্কট এবং আরউইন তাদের স্পেসসুট পরে এবং কমান্ড মডিউল থেকে আলাদা হয়ে লুনার মডিউলে আরোহণ করেন। তারা চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করে, হ্যাডলি রিলে অঞ্চলে অবতরণ করে। ক্রু চাঁদের পৃষ্ঠে প্রায় 67 ঘন্টা কাটিয়েছে, তিনটি এক্সট্রাভেহিকুলার অ্যাক্টিভিটিস (ইভিএ) পরিচালনা করেছে।
LRV একটি গেম-চেঞ্জার হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে, যা মহাকাশচারীদের আরও বেশি দূরত্ব ভ্রমণ করতে এবং আগের মিশনের চেয়ে আরও বেশি ভূখণ্ড অন্বেষণ করতে দেয়। তারা নমুনা সংগ্রহ করেছে, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করেছে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে।
ফিরতি যাত্রা—–
তাদের মুনওয়াক শেষ করার পর, স্কট এবং আরউইন লুনার মডিউলে ফিরে আসেন এবং কমান্ড মডিউলে ওয়ার্ডেনের সাথে মিলিত হয়ে চাঁদ থেকে উঠে যান। ক্রু কমান্ড মডিউলে ফেরত স্থানান্তরিত হয়, এবং লুনার মডিউলটি জেটিসন করা হয়।
মহাকাশযানটি 7 আগস্ট, 1971 সালে প্রশান্ত মহাসাগরে সফলভাবে স্প্ল্যাশ করে, একটি অত্যন্ত সফল মিশনের সমাপ্তি চিহ্নিত করে।
Apollo 15 এর উত্তরাধিকার—
Apollo 15 অসংখ্য মাইলফলক অর্জন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে:
1. LRV এর প্রথম ব্যবহার, যা বৃহত্তর পৃষ্ঠের গতিশীলতা সক্ষম করে
2. দীর্ঘতম চন্দ্র পৃষ্ঠ থাকার সময় (67 ঘন্টা)
3. চাঁদে পরিচালিত সর্বাধিক বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা
4. ALSEP এর প্রথম স্থাপনা
মিশনটি অ্যাপোলো মহাকাশযানের ক্ষমতা প্রদর্শন করে এবং ভবিষ্যতের চন্দ্র ও গ্রহ অনুসন্ধানের পথ তৈরি করে।
উপসংহার—–
Apollo 15 ছিল একটি যুগান্তকারী মিশন যা মানুষের বুদ্ধিমত্তা, বৈজ্ঞানিক কৌতূহল এবং পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে অন্বেষণ করার সংকল্প প্রদর্শন করে। মিশনের সাফল্য চাঁদ এবং এর ভূতত্ত্ব সম্পর্কে আমাদের বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপকে চিহ্নিত করেছে এবং এর উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং অনুসন্ধানকারীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ঊনিশ শতকের বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার – প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি।।।।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উনবিংশ শতকের একজন বিশিষ্ট বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যকার । তাঁর পসম্পর্কে বলা যেতে পারে, তিনি লেখক, দার্শনিক, পণ্ডিত, অনুবাদক, প্রকাশক ও মানবহিতৈষী । সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য প্রথম জীবনেই বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন । সংস্কৃত ছাড়াও বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে যুক্তিবহ ও অপরবোধ্য করে তোলেন ।

বাংলা গদ্যের সার্থক রূপকার তিনিই ।
বিদ্যাসাগরের যখন জন্ম (১৮২০), তখন শিক্ষা সংস্কারে ও বাংলা ভাষার আধুনিকরণের একটা ডামাডোল পরিস্থিতি । বিশৃঙ্খলার বাতাবরণ । শিক্ষার লক্ষ্য, পদ্ধতি ও পাঠক্রম নিয়ে চলছিল নানান বিতর্ক । অথচ বাঙালী সমাজ জানে, আধুনিক শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে বিদ্যাসাগরের গৌরবময় অবদানের কথা ।
তাঁর নির্মিত বাংলা ভাষার ভিত্তির ওপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম অধ্যায় । বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে বোধগম্য এবং সবরকমের ভাব ও চিন্তা প্রকাশের যোগ্য করে তুলেছিলেন । তাই আজও বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের জনক বলা হয় ।
আটপৌরে বাঙালি পোশাকে বিদ্যাসাগর ছিলেন সর্বত্রগামী । প্রবল জেদ ও আত্নসম্মানবোধ নিয়ে সরকারি চাকরি করেছেন, দ্বিরুক্তি না করে ইস্তফা দিয়েছেন । পাঠ্যবই লিখে ছেপে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেছেন, দানের জন্য ধারও করেছেন । উনিশ শতকে সমাজ বদলের সব আন্দোলনেই তিনি ছিলেন পুরোভাগে । এমন ব্যক্তিত্ব সবসময়ে ব্যতিক্রম ।
বিদ্যাসাগরের একটা আপ্ত বাক্য আজও সমাজজীবনে উজ্জীবিত, “কোনো বিষয়ে প্রস্তাব করা সহজ, কিন্তু নির্বাহ করে ওঠা কঠিন” । অথচ তিনি এককভাবে ধুতিচাদর পরে একটার পর একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটা বাস্তবায়িত করে গেছেন, যেমন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যঃ শিক্ষার সংস্কার ও বিধবা বিবাহ প্রচলন । এটা সর্বজনবিদিত, বিদ্যাসাগরের লড়াইটা ছিল একার লড়াই । বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য পরিষ্কার, তিনি গতানুগতিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র, সচেতন ও পারমার্থিক ।
এটা অনস্বীকার্য যে, বাঙালী সমাজে আজও বিদ্যাসাগরের প্রদীপ্ত উপস্থিতি ‘বর্ণপরিচয়’ দিয়ে । প্রাথমিক শিক্ষায় ‘বর্ণপরিচয়’ এর মাহাত্ম্য সকলের জানা । মুর্শিদাবাদ জেলার শক্তিপুর হাই স্কুলের বাংলা ক্লাসের দিদিমণি আমার রচনা লেখার গঠন অবলোকন করে হঠাৎ তাঁর সম্মুখে তিনি আদর করে ডেকে আমাকে বললেন, “তুই বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ গ্রন্থের নাম শুনেছিস” ? মাথা নেড়ে আমি বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় গ্রন্থটির নাম শুনেছি জানালাম । তারপর চুপি চুপি বাংলা বিষয়ের শ্রদ্ধেয়া দিদিমণি বললেন, রোজ রাতে শোওয়ার আগে বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ বইখানা পড়বি । রচনা লেখার সময়ে তোর বানানের জড়তা কেটে যাবে ।” সুতরাং শৈশব থেকে বাংলা ভাষা শিক্ষার প্রেক্ষাপটে বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় আজও অমলিন । সেই বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষ অতিক্রান্ত । তাই দুশো বছর ধরে শিক্ষা জীবনের বাস্তবতায় ও শিক্ষা বিকাশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যাসাগর আজও প্রাসঙ্গিক ।
বিদ্যাসাগর যখন জন্মগ্রহন করেছিলেন সেই সময়টা ছিল রামমোহনের যুগ, যিনি একজন শিক্ষিত ও অগ্রণী পুরুষ ছিলেন এবং সমাজ সংস্কারের অন্যতম কারিগর । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । ঈশ্বরচন্দ্রের পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ ছিলেন সুপণ্ডিত ও বলিষ্ঠ দৃঢ়চেতা পুরুষ। তিনিই ঈশ্বরচন্দ্রের নামকরণ করেছিলেন। বিদ্যাসাগরের বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধায় কলকাতায় স্বল্প বেতনের চাকরিতে খুব কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করতেন । পরিবার নিয়ে শহরে বাস করা তাঁর সাধ্যের অতীত ছিল। সেই কারণে বালক ঈশ্বরচন্দ্র গ্রামেই মা ভগবতী দেবী’র সঙ্গে বাস করতেন।
পাঁচ বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্রকে গ্রামের পাঠশালায় পাঠানো হয়। ১৮২৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁকে কলকাতার একটি পাঠশালায় এবং ১৮২৯ সালের জুন মাসে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি করানো হয়। ভর্তির ছ’মাসের মধ্যেই পাঁচ টাকা বৃত্তি পান । তাঁর প্রতিভার অসাধারণ ক্ষমতা দেখে শিক্ষকেরা সকলে স্তম্ভিত । তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান ছাত্র এবং ১৮৩৯ সালের মধ্যেই বিদ্যাসাগর উপাধি লাভ করেন। পরে তিনি দু-বছর ওই কলেজে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, ন্যায়, তর্ক, জ্যোতির্বিজ্ঞান, হিন্দু আইন এবং ইংরেজি বিষয়ে অধ্যয়ন করেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্মজীবন শুরু করেন ফোর্ট উইলিয়াম (১৮৪১) কলেজের প্রধান পন্ডিত হিসাবে । ঐসময়েই তাঁর ইংরেজি শিক্ষার যথাযথ শিক্ষালাভ । কেননা বিদ্যাসাগরকে সকলে জানতেন সংস্কৃতের পণ্ডিত হিসাবে । ইংরেজি হাতের লেখাও ছিল নজরকাড়া । ১৮৫০ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি সংস্কৃত কলেজের সাহিত্যের অধ্যাপক পদ লাভ করেন এবং পরের মাসে অর্থাৎ ১৮৫১ সালের ২২শে জানুয়ারী ঐ কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি কলেজের অনেক সংস্কার করেন। ঐ সময়েই ১৮৫১ সালে বিদ্যালয় দেখলেন, সংস্কৃত কলেজে গোড়া থেকেই শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ ও বৈদ্য সন্তানদের পড়বার অধিকার ছিল । কিন্তু বৈদ্যদের আবার ধর্মশিক্ষায় ছিল আপত্তি । স্বভাবতই প্রশ্ন উঠল কায়স্থ ও অন্যান্য হিন্দু বর্ণদের কথা । তখনকার পণ্ডিত সমাজের তোয়াক্কা না করে, বিদ্যাসাগর তদানীন্তন কাউন্সিল অফ এডুকেশনের সেক্রেটারিকে জানিয়ে দিলেন ব্রাম্মণ ও বৈদ্য ছাড়া অন্যান্য বর্ণের বিশেষ করে শূদ্রদের সংস্কৃত কলেজে প্রবেশে তাঁর আপত্তি নেই । যদিও সেই সময় সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপকরা বিদ্যাসাগরের মতে গররাজী ছিলেন, তথাপি বিদ্যাসাগরের মতটাকেই মান্যতা দিয়েছিলেন তদানীন্তনকালের কাউন্সিল অফ এডুকেশনের সেক্রেটারি । এবং পর পরই ১৮৫৪ সালের শেষে বিদ্যাসাগর হিন্দুদের সব শ্রেনীর জন্য সংস্কৃত কলেজের দরজা খুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন এবং সেই প্রস্তাব যথাসময়ে অনুমোদিত হয়েছিল ।
সংস্কৃত কলেজের সংস্কার ও আধুনিকীকরণ এবং বাংলা ও বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন ছাড়া, শিক্ষা প্রসারে তাঁর আরও অবদান সর্বজনবিদিত । ১৮৫৪ সালে চার্লস উডের শিক্ষা সনদ গৃহীত হওয়ার পর সরকার গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। এ উদ্দেশে ১৮৫৫ সালের মে মাসে বিদ্যাসাগরকে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদের অতিরিক্ত সহকারী স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তিনি নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি এবং মেদিনীপুর জেলায় স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তিনিই প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে বাংলা ভাষাকে সহজবোধ্য করে তুলতে চেয়েছিলেন । ১৮৫৫ সালে বাংলা নববর্ষের দিনে বর্ণপরিচয়ের প্রথমভাগ প্রকাশ করে তিনি বাঙালীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এশিয়াটিক সোসাইটি (কলকাতা) ও বেথুন সোসাইটিসহ আরও কিছু সংগঠনের সম্মানিত সভ্য ছিলেন। ১৮৫৮ সালে যাঁরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ফেলো নির্বাচিত হন, তিনি ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ১৮৫৯ সালে তিনি “ক্যালকাটা ট্রেনিং স্কুল” স্থাপনে বিশেষ ভুমিকা পালন করেন। ১৮৬৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয় “হিন্দু মেট্রেপলিটন ইসস্টিটিউট”। ইংরাজ অধ্যাপকের সাহায্য ছাড়া এবং কোনোরকম সরকারি সাহায্য ছাড়া, বিদ্যাসাগর স্কুলটিকে ১৮৭২ সালে প্রথম শ্রেণীর কলেজে পরিণত করেছিলেন । বর্তমানে এর নাম “বিদ্যাসাগর কলেজ”। এটি দেশের প্রথম কলেজ যার প্রতিষ্ঠাতা – পরিচালক – শিক্ষক স্কলেই ভারতীয় । এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান থেকে শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন লাভ করেন।
ব্রাম্মণ হয়েও বিদ্যাসাগর ত্রিসন্ধ্যা জপ করেননি । কোনো মন্দিরে যাননি এবং ঈশ্বর বিষয়ক কোনো লেখা তিনি লেখেননি । বিদ্যাসাগর ছিলেন নাস্তিক । ধর্ম সম্বন্ধে তিনি শুধু মনে করতেন জগতের কল্যাণসাধন ও বিদ্যাচর্চা । এপ্রসঙ্গে কবি শঙ্খ ঘোষের উক্তিটি প্রনিধাযোগ্য, ধর্মের কোন বহিরঙ্গ মানতেন না । তিনি, আচরণও করতেন না । এখন যেমন অনেকে বলেন, ধর্মটা ব্যক্তিগত ব্যাপার, অনেকটা সেইরকম ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ, বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়ন । সেদিনের সমাজে প্রচলিত প্রথার নির্মম পরিণতির জন্য নারীদের ভাগ্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন আপামর জনতা অবলোকন করেছিলেন । শোনা যায়, একসময় রাজা রাজবল্লভ নিজের বালবিধবা কন্যাকে পুনর্বিবাহ দেওয়ার অনুমতি সমাজের পণ্ডিতদের কাছ থেকে পেয়েও সেই বিবাহ কারও কারও বাধায় দিতে পারেননি । বিদ্যাসাগরের “বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা” বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর দেশ ও সমাজ চমকে উঠেছিল । শেষ পর্য্যন্ত ১৮৫৫ সালের ১৬ই জুলাই বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয় । তারপর ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই বিধবা বিবাহ আইন স্রকারিভাবে আইন হিসাবে মঞ্জর হয় । বিদ্যাসাগরের দরদী হৃদয় কেঁদেছিল সেকালের সমগ্র হিন্দু নারী সমাজের দুর্গতি দুর্দশায় । বিধবা বিবাহ আইন নামে পরিচিত ১৮৫৬ সালের আইনটি কেবলমাত্র বিধবা নারীর দ্বিতীয় বিবাহের স্বীকৃতি দেয়নি, আইনটি যেমন বিবাহকে আইনসিদ্ধ করে তেমনই মৃত স্বামীর এবং দ্বিতীয় বিবাহের এবং পৈত্রিক বিষয় সম্পত্তিতে অধিকার সুনিদ্দিষ্ট করে । বিভিন্নভাবে জানা যায়, ১৮৫৬ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত মোট ৬০টি বিধবা বিবাহ সংঘটিত হয় । আরও জানা যায়, বিদ্যাসাগর ও তাঁর বন্ধুরা মিলে ১৮৫৬ সালের ডিসেম্বর মাসে রক্ষণশীল সমাজের বিক্ষোভ এবং প্রচণ্ড বাধার মুখে ঘটা করে এক বিধবার বিবাহ দেন। পাত্র ছিল সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগরের একজন সহকর্মী। তা ছাড়া নিজের একমাত্র পুত্রের সঙ্গে বিধবার বিবাহ দিতে তিনি কুণ্ঠিত হননি। এতে একটা জিনিস পরিস্কার, বিধবাবিবাহ আইন প্রণয়নে বিদ্যাসাগরের দৃঢ় সংকল্প শতভাগ সফল ।
তিনি হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় তৈরি করেন, যাকে পরবর্তীতে বেথুন কলেজ নামকরণ করা হয়। নারীদের শিক্ষার দিকে আনার জন্য তিনি একটি অর্থায়নের ব্যবস্থা করেন, যা নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠা ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। এখান থেকে মেয়েদের শিক্ষার জন্য যাবতীয় অর্থের ব্যবস্থা করা হতো। ১৮৫৭ সালের নভেম্বর মাস থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাস অবধি সমগ্র দক্ষিণবঙ্গে বিদ্যাসাগর ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।
বিদ্যাসাগরের দয়া এবং মানবিকতার জন্যে তিনি করুণাসাগর নামে পরিচিত । দরিদ্রদের দানে তিনি সর্বদাই মুক্তহস্ত ছিলেন । তিনি তাঁর দান এবং দয়ার জন্যে বিখ্যাত হয়েছিলেন । এখানে বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে মাইকেল মধুসূদন দত্ত’র উক্তি প্রনিধানযোগ্য,
“বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে,
করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
দীন যে, দীনের বন্ধু ! উজ্জ্বল জগতে
হেমাদ্রির হেম কান্তি অম্লান কিরণে” ।
তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন একটি ঐতিহ্যিক এবং রক্ষণশীল পরিবারে এবং সমাজ সংস্কারের জন্যে তিনি যুক্তিও দিতেন হিন্দু শাস্ত্র থেকে কিন্তু তিনি ছিলেন ধর্ম ও ঈশ্বর সম্পর্কে সন্দিহান মনের। তাঁর বোধোদয় গ্রন্থ যেমন তিনি শুরু করেছেন পদার্থের সংজ্ঞা দিয়ে । পরে সংজ্ঞা দিয়েছেন ঈশ্বরের, যাঁকে তিনি বলেছেন সর্বশক্তিমান, সর্বত্র বিরাজমান চৈতন্যস্বরূপ।
তিনি তাঁর একক ও সহযোগীর উদ্যোগে রেখে গেলেন আধুনিক ব্যবহারযোগ্য একটি (উচ্চারণ অনুযায়ী ও মুদ্রণযোগ্য) বাংলা ভাষা, প্রাথমিক ও নীতিশিক্ষার বহু জনপ্রিয় গ্রন্থ, বাংলা মাধ্যম স্কুলব্যবস্থা ও নারীশিক্ষার পাকা বুনিয়াদ । মাতৃ/বাংলা ভাষার শিক্ষার আর একটি প্রাক শর্ত হল ভাল পাঠ্যপুস্তকের সুলভতা । বিদ্যাসাগরের সময় তার যথেষ্ট অভাব ছিল । বিদ্যাসাগরকেও অবতীর্ণ হতে দেখা যায় এক দিকে, বাংলায় ব্যকরণসিদ্ধ মুদ্রণযোগ্য অক্ষর ও বানান সংস্কার করে, নানা পাঠ্যপুস্তক রচনা, ছাপা ও বিপণনের আয়োজন । পাঠ্যপুস্তক রচনার পাশাপাশি ছাপা বইয়ের সম্পাদনা ও সম্মার্জনার প্রতি তাঁর অখণ্ড মনোযোগ চিরদিন বজায় ছিল । একবার তিনি হতদরিদ্র সাঁওতালদের মাঝে দিন কাটাচ্ছেন তিনি, সেই সময় (১৮৭৮) চর্যাপদের আবিস্কর্তা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও তাঁর এক সঙ্গী লখনউ যাওয়ার পথে এক রাত বিদ্যাসাগরের আতিথ্যগ্রহণ করেন । রাত্রে বিশ্রামের পর সকালে উঠে শাস্ত্রী মশাই দেখলেন, “বিদ্যাসাগর মহাশয় বারান্দায় পাইচারি করিতেছেন এবং মাঝে মাঝে টেবিলে বসিয়া কথামালা কি বোধোদয়ের প্রূফ দেখিতেছেন । প্রূফে বিস্তর কাটকুটি করিতেছেন । যেভাবে প্রূফগুলি পড়িয়া আছে, বোধ হইল, তিনি রাত্রেও প্রূফ দেখিয়াছেন । আমি বলিলাম, কথামালার প্রূফ আপনি দেখেন কেন ? তিনি বলিলেন, ভাষাটা এমন জিনিস, কিছুতেই মন স্পষ্ট হয় না ; যেন আর একটা শব্দ পাইলে ভাল হইত ; — তাই সর্বদা কাটকুটি করি । ভাবিলাম — বাপ রে, এই বুড়ো বয়সেও ইহার বাংলার ইডিয়ামের ওপর এত নজর ।” (সূত্রঃ অ-বা-প,পৃঃ৪/ ২৭-৯-১৯) ।
এই অনন্য ও বিরাট ব্যক্তিত্বের মানুষটি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ধর্মের কোনও বহিরঙ্গ মানতেন না এমনকি, আচরণও করতেন না । অথচ চালচলনে তিনি ছিলেন নিতান্তই সাদাসিধে । খুব বিনয়ী এবং জীবনে দৃঢ় সংকল্প এবং উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে ছিলেন তিনি দৃঢ় মনোভাবাপন্ন । তিনি ছিলেন একাধারে মহান সমাজ সংস্কারক অন্যদিকে এক জন শিক্ষাবিদ এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন অবিরাম । ভারতে শিক্ষার প্রতি তার অবদান এবং নারীর অবস্থার পরিবর্তন জন্য তিনি চিরস্বরণীয়। তাঁর অবর্ণনীয় মাতৃ ভক্তি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত । তাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে আজও চর্চিত ।
হিন্দু ধর্মের কুসংস্কারের বিরোধী, বিধবা বিবাহের প্রচলনকারী, নারী শিক্ষার প্রবর্তক, উনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, সমাজ সংস্কারক, বর্ণপরিচয় ও বহু গ্রন্থের রচয়িতা, মহান শিক্ষাবিদ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিনের প্রাক্কালে তাঁর মহান স্মৃতির প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য ।

কলমে : দিলীপ রায়।
————————-০——————————

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজ আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস, জানুন দিনটি কেন পালিত হয় এবং পালনের গুরুত্ব।।।।।

সমগ্র বিশ্বে বাঘের সংরক্ষণের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ২৯ জুলাই তারিখে আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস বা বিশ্ব বাঘ দিবস পালন করা হয়।২০১০ সালে সেণ্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ব্যাঘ্র অভিবর্তনে এই দিবসের সূচনা হয়। এই দিবস পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য হল বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা করা এবং বাঘের সংরক্ষণের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে এর সম্পর্কে থাকা ভুল ধারণা ও ভয় দূর করা।

প্রতি বছর বিভিন্ন কার্যসূচীর মাধ্যমে এই দিবস পালন করা হয়। বাঘ ভারতের জাতীয় পশু হওয়ার কারণে এই দিবসের মহত্ব এখানে বেশি ধরা হয়।
২০১০ সালে নভেম্বরে প্রথম বাঘ দিবস উদযাপিত হয়। বিংশ শতকের গোড়া থেকেই বন্য বাঘের সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমে যায়। এই বিষয়টি উপলব্ধি করার পরেই বাঘ দিবস পালনের বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়। রাশিয়ায় সেন্ট পিটার্সবার্গ টাইগাই সামিটে প্রথম বাঘ দিবস পালিত হয়। বাঘেদের স্বাভাবিক বাসস্থান রক্ষা করাই ছিল এই সামিটের মূল উদ্দেশ্য।
সামিটে যে ১৩টি দেশ অংশগ্রহণ করে, সেগুলি হল – ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, চিন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এবং রাশিয়া। এই সামিটে ২০২২-এর মধ্যে বন্য বাঘের সংখ্যা ৬০০০-এর বেশি বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়।
সপ্তম বিশ্ব বাঘ দিবস গোটা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাবে পালন করা হয়। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল প্রভৃতি বাঘের বেশি ঘনত্ব থাকা দেশের সাথে ইংল্যান্ড ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রেও বিভিন্ন স্থানীয় কার্যসূচীর মাধ্যমে এই দিবস পালন করা হয়। কিছু জনপ্রিয় তারকা তাদের সোসাল মিডিয়ায় নিজেদের প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করে এতে অংশগ্রহণ করেন। বিশ্ব বন্যপ্রাণী সংস্থা (WWF) এর রেঞ্জারসমূহে বিনিয়োগ করে “দ্বিগুণ বাঘ” অভিযান চালায়। কয়েকটি কোম্পানী বিশ্ব বন্যপ্রাণী সংস্থার সঙ্গে মিলিতভাবে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।
তথ্য অনুযায়ী বিংশ শতকের গোড়া থেকেই বন্য বাঘের সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমে যায়। বিষয়টি উপলব্ধি করার পরেই বাঘ দিবস পালনের বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়।প্রতি বছর বিভিন্ন কার্যসূচীর মাধ্যমে এই দিবস পালন করা হয়। বাঘ ভারতের জাতীয় পশু হওয়ার কারণে এই দিবস আমাদের দেশের একটু বেশিমাত্রায় উপযোগী। গোটা বিশ্বে নগরায়নের কারণে বাঘেরা তাদের স্বাভাবিক বাসস্থানের ৯০ শতাংশই হারিয়ে ফেলেছে। বর্তামানে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা ৪০০০-এরও কম।
আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস বা বিশ্ব বাঘ দিবস সমগ্র বিশ্বে বাঘের সংরক্ষণের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ২৯ জুলাই তারিখে পালন করা হয়। ২০১০ সালে সেণ্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ব্যাঘ্র অভিবর্তনে এই দিবসের সূচনা হয়। বিশ্ব বাঘ দিবস পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য হল বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা করা এবং বাঘের সংরক্ষণের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। এছাড়াও বাঘের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে থাকা ভুল ধারণা ও ভয় দূর করাও আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস পালনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যে।
ভারতের জাতীয় পশু বাঘ হওয়ায় ভারতে এই দিনটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বাঘেদের স্বাভাবিক বাসস্থান বৃদ্ধি ও বাঘের সংখ্যা বাড়ানো এই বাঘ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
।। তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ

কানাইলাল ভট্টাচার্য : ভারতের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিযুগের বিপ্লবী।।।।

স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব এবং অগ্নিযুগের বিপ্লবী নামে খ্যাত শহীদ কানাইলাল ভট্টাচার্য। মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৯৩১ সালে বিচারক গার্লিককে হত্যার অভিযোগে ব্রিটিশ শাসকদের গুলিতে শহিদ হন এই বিপ্লবী। তবে ইতিহাস বলে, মৃত্যু বরণের পর এই বিপ্লবীর পকেটে এক খন্ড কাগজ পাওয়া যায়।

যাতে লেখ ছিল ‘ধ্বংস হও, দীনেশ গুপ্তকে ফাঁসি দেওয়ার পুরস্কার লও’।
বর্তমান যুগে দেশের জন্য প্রাণত্যাগ করা এই শহীদরা প্রায় বিস্মৃতপ্রায়। কিন্তু বিস্মৃতির পলিতে ঢাকা পড়েছেন কানাইলাল | তিনিও অগ্নিযুগের এক বলিপ্রদত্ত বিপ্লবী | দেশের স্বার্থে, বিপ্লবের জন্য নাম-যশ-খ্যাতি কোনও কিছুর পরোয়া করতেন না কানাইলাল ভট্টাচার্যর মতো অগ্নিস্ফুলিঙ্গরা | তাঁর স্মৃতিতে আলিপুরের বেকার রোডের নামকরণ করা হয়েছে বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্য রোড | জন্মস্থান মজিলপুরের একটি রাস্তাও তাঁর নামে নামাঙ্কিত | পৈতৃক বাড়ির সামনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্রোঞ্জ মূর্তি | অবশ্য, দেশমাতৃকার মুক্তি ছাড়া এসব নিয়ে ভাববার সময় ছিল না কানাইলালদের।
কানাইলাল ভট্টাচার্য (২৭ জুলাই ১৯০৯ – ২৭ জুলাই ১৯৩১) ছিলেন ভারতের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব এবং অগ্নিযুগের বিপ্লবী।
প্রাথমিক জীবন—
কানাইলাল ভট্টাচার্যের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার মজিলপুরে। তার পিতার নাম নগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য।মাতার নাম কাত্যায়নী দেবীI চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সেজো। দুই দাদা কলকাতায় সামান্য চাকরী করতেন। কানাইলাল সেখানে ইলেকট্রিকের কাজ শিখতেন এবং দাদার একটি মুদির দোকানেও বসতেন। দোকানে বসেই তিনি কয়েকটি স্বদেশী বই পড়েন। বালেশ্বরের যুদ্ধ, চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুন্ঠন প্রভৃতি ঘটনা তাঁকে আলোড়িত করে। ১৯৩১ সালের প্রথম দিকে জয়নগর মজিলপুর ব্যায়াম সমিতির প্রথম বাৎসরিক প্রতিষ্ঠা দিবসের উৎসবে সভাপতির পদ অলংকৃত করেন সুভাষ চন্দ্র বসু। তাঁকে স্বেচ্ছাসেবকরা বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ এর মাধ্যমে অভিবাদন জানায়। ওই কুচকাওয়াজে প্ল্যাটুন কমান্ডার হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন কানাইলাল। ওই দিনই তিনি মন্মথ ঘোষ ও সুনীল চট্টোপাধ্যায় এর হাত ধরে স্বাধীনতা বিপ্লব আন্দোলনে যোগ দেন এবং পরের দিনই দীক্ষিত হন। তিনি বিপ্লবী সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় এর মতো সুপরিচিত বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন। তিনি মজিলপুর জে এম ট্রেনিং স্কুলে পড়াশুনা করেন।
তিনি জয়নগর-মজিলপুর, বহড়ু, বিষ্ণুপুর ব্যায়াম সমিতির সভ্য ছিলেন। ছাত্রাবস্থায় আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, বাঘাযতীনের বুড়িবালামের যুদ্ধ, মাস্টারদার জালালাবাদ পাহাড়ে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি যুবক বয়সেই স্বাধীনতা বিপ্লব আন্দোলনে যোগ দেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স দলের সদস্য ছিলেন তিনি। বহড়ুর বিপ্লবী সুনীল চট্টোপাধ্যায়, বোড়ালের সাতকাড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সুপরিচিত বিপ্লবীদের সংস্পর্শে আসেন এবং একজন বিপ্লবী আন্দোলনের যোদ্ধায় পরিণত হন।
গার্লিক হত্যা—-
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই কানাইলাল ভট্টাচার্য ‘বিমল দাশগুপ্ত’ ছদ্মনামে বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ও বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসির দণ্ডাদেশকারী বিচারক আর আর গার্লিককে হত্যা করেন এবং পটাশিয়াম সায়ানাইডের ক্যাপসুল খেয়ে নেন। সেই অবস্থায় উপস্থিত প্রহরী সার্জেন্টের গুলি তাঁর শরীর ঝাঁঝরা করে দেয়। সে সময় তাঁর পকেটে একখণ্ড কাগজ পাওয়া যায়। তাতে লেখা ছিল, “ধ্বংস হও; দীনেশ গুপ্তকে ফাঁসি দেওয়ার পুরস্কার লও”। তার পকেটে একখণ্ড কাগজ পাওয়া যায়। তাতে লেখা ছিলো “ধ্বংস হও; দীনেশ গুপ্তকে ফাঁসি দেওয়ার পুরস্কার লও” ইতি —– বিমল গুপ্ত। মাত্র ২২ বছর বয়সে নামহীন, পরিচয়হীন শহিদ হয়ে থেকে, অপর এক বিপ্লবীকে বাঁচিয়ে যাওয়ার এই চেষ্টা ইতিহাসে বিরল। মেদিনীপুরের ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট পেডির হত্যার ব্যাপারে পুলিস বিমল দাশগুপ্তকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। তিনি ছদ্মনাম নিয়ে নিজ জীবনের বিনিময়ে বিমল দাশগুপ্তকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। পুলিস দীর্ঘদিন তার প্রকৃত পরিচয় উদ্ধার করতে পারেনি। এমনকি শনাক্তকরণের সময় কানাইলালের মহীয়সী মাতা কাত্যায়নী দেবীও তার দেহকে অস্বীকার করে বলেন “এ তার কানু নয়”। উল্লেখ্য এই ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ২৬শে জুলাই ভোরে কসবা উত্তরপাড়ার বিল ধরে ডিঙ্গি চড়ে তপসিয়ায় ধাপার মাঠে এসে এক জঙ্গলে সুনীল চট্টোপাধ্যায়, জিতেন ঘোষ, প্রভাত ঘোষের উপস্থিতিতে টার্গেট প্র্যাকটিস করেন কানাইলাল। তার কিছুদিন আগেই তিনি টাইফয়েড থেকে উঠেছেন | নামহীন, পরিচয়হীন শহীদ হয়ে থেকে, অপর এক বিপ্লবীকে বাঁচিয়ে যাওয়ার এই চেষ্ঠা ইতিহাসে বিরল। কানাইলাল ভট্টাচার্য বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স দলের সদস্য ছিলেন।তিনি বিপ্লবী নেতা সাতকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মী। সাতকড়িবাবুই তাকে একাজে পাঠান।
সম্মাননা—-
এই দেশপ্রেমিকের স্মৃতিতে “আলীপুর বেকার রোড”-এর নাম পরিবর্তন করে “বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্য সড়ক” নামকরণ করা হয়েছে। মজিলপুরের একটি রাস্তাও তার নামে নামকরণ করা হয়েছে। মজিলপুরের দত্ত বাজারে তার পূর্বপুরুষের বাড়ির কাছে তার একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি রয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই দেশের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসাই কাল হয়েছিল ব্রিটিশ শাসকদের জন্য। বিপ্লবী কানাইলাল ভট্টাচার্য আজও বাঙালিদের কাছে দেশপ্রেমের জ্বলন্ত উদাহরণ।

।। তথ্য : সংগৃহীত উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট।।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

আজাদ আজাদ হিন্দ ফৌজের রানী ঝাঁসি রেজিমেন্টের সৈনিক ও প্রথম গুপ্তচর : নীরা আর্য।।।।।।

ভূমিকা:- তিনি ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম মহিলা গুপ্তচর, আজাদ হিন্দ ফৌজের ঝাঁসি রেজিমেন্টের নেতৃত্বে ছিলেন লক্ষী সেহেগল। দক্ষিণ এশিয়ায় বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভুত মহিলা স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ১৯৪৩ সালে গড়ে উঠেছিল এই রেজিমেন্ট। ট্রেনিং ক্যাম্প ছিল ব্যাংকক, রেঙ্গুন ও সিঙ্গাপুর।

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন বাঁচাতে নিজের স্বামীকে হত্যা —
নীরা আর্য আজাদ হিন্দ ফৌজের রানি ঝাঁসি রেজিমেন্টের সৈনিক ছিলেন। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন বাঁচাতে তিনি নিজের স্বামীকে হত্যা করেন। নেতাজী তাঁকে নীরা নাগিনী বলে অভিহিত করলে তিনি নীরা নাগিনী নামে পরিচিতি লাভ করেন। বৃটিশ সরকার তাঁকে একজন গুপ্তচর হিসাবে গণ্য করেছিল। তার ভাই বসন্ত কুমারও আজাদ হিন্দ ফৌজে ছিলেন।
প্রখর বুদ্ধিমত্তা, সাহসী ও আত্মসম্মান বোধ–
অনেক লোকশিল্পী নীরা নাগিন ও তার ভাই বসন্ত কুমারের জীবন নিয়ে কবিতা ও ভজন রচনা করেছেন। নীরা নাগিনী নামে তার জীবনের একটি মহাকাব্যও রয়েছে। তার জীবন নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তিনি ছিলেন এক দুর্দান্ত দেশপ্রেমিক, সাহসী ও আত্মসম্মান বোধে গর্বিত মহিলা। তার শেষ জীবন কাটে হায়দ্রাবাদে। সেখানকার মহিলারা তাকে গর্বের সাথে ‘পদ্মমা’ বলে সম্বোধন করতেন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন—-
নীরা আর্য ১৯০২ সালের ৫ মার্চ ভারতের তৎকালীন যুক্তপ্রদেশের অধুনা উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বাগপত জেলার খেকড়া শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতা শেঠ ছজুমল ছিলেন সে সময়ের এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তার ব্যবসা-বাণিজ্য সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। তার পিতার ব্যবসায়ের মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা। তাই কলকাতাতে তার পড়াশোনা শুরু হয়েছিল। নীরা আর্য হিন্দি, ইংরেজি, বাংলার পাশাপাশি আরও অনেক ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ ভারতের সিআইডি ইন্সপেক্টর শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসকে বিবাহ করেন। শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস ছিলেন ইংরেজপ্রভু ভক্ত অফিসার। মূলতঃ শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসকে গুপ্তচরবৃত্তি করে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে হত্যা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ—–
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন বাঁচাতে তিনি ইংরেজ সেনাবাহিনীর পদস্থ অফিসার শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসকে হত্যা করেছিলেন। একসময় সুযোগ পেয়ে শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস নেতাজিকে হত্যার জন্য গুলি চালিয়েছিলেন, কিন্তু সেই গুলি নেতাজির গাড়ীর চালককে বিদ্ধ করে । কিন্তু এরই মধ্যে নীরা আর্য শ্রীকান্ত জয়রঞ্জনের পেটে বেয়নেট চালিয়ে হত্যা করে। শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস নীরা আর্যের স্বামী ছিলেন, তাই স্বামী হত্যার কারণে নেতাজি তাঁকে নাগিনী বলে অভিহিত করেছিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ আত্মসমর্পণের পরে, সমস্ত বন্দী সৈন্যকে দিল্লির লাল কেল্লায় বিচারে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু নীরাকে স্বামী হত্যার কারণে দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হয়েছিল। জেলে বন্দীদশায় সেখানে তাঁকে কঠোর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল।
আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম গুপ্তচর—–
নীরা আর্য আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম গুপ্তচর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। পবিত্র মোহন রায় আজাদ ভারতীয় সেনাবাহিনীর মহিলা এবং পুরুষ উভয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু নিজেই নীরাকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তার সঙ্গী মনবতী আর্য, সরস্বতী রাজামণি এবং দুর্গা মল্লা গোর্খা এবং যুবক ড্যানিয়েল কালে তার সামরিক গোয়েন্দা শাখার সাথে যুক্ত ছিল। তারা নেতাজির জন্য গুপ্তচরবৃত্তির কাজ করত। তারা বিভিন্ন কাজের অছিলায় ব্রিটিশ অফিসারদের বাড়ি ও সেনাশিবিরে প্রবেশ করতেন তথ্য সংগ্রহের জন্য, তারপর তা নেতাজীর কাছে পাঠাতেন। এই কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়লে প্রথমে নথিগুলি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া ও পরে পিস্তল চালিয়ে আত্মহত্যা করতে হবে, এই নিয়ম তারা কঠোর ভাবে মেনে চলতেন।
রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে নীরাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড–
দক্ষিণ এশিয়ার অক্ষশক্তির পরাজয়ের পর ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল আজাদ হিন্দ ফৌজ। ধরা পড়েছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের হাজার হাজার সেনানী। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে লালকেল্লায় তাদের বিচার শুরু হয়, বেশির ভাগ সেনানী ছাড়া পেলেও নীরাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়, জাহাজে করে পাঠানো হয় আন্দামানের সেলুলার জেলে। সেখানে তার ওপর যে অমানুষিক অত্যাচার হয়েছিল তা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
আন্দামানে নীরাকে রাখা হয়েছিল একটি ছোট কুঠরিতে, সেখানে বাকি বন্দিরা ছিল মুক্ত, কিন্তু নীরাকে বন্য জন্তুর মত প্রথমদিন বেঁধে রাখা হয়েছিল। গলায় বাঁধা ছিল চেন ও হাতে-পায়ে ছিল শেকল লাগানো বেড়ি। নীরাকে কিছু খেতে দেওয়া হয়নি প্রথম দিন। শোয়ার জন্য মাদুর কিংবা কম্বল কিছুই দেওয়া হয়নি প্রথমে। কুঠরির কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে ছিলেন পরিশ্রান্ত নীরা। মাঝরাতে এক প্রহরী কুঠরিতে ঢুকে গায়ের ওপর ছুঁড়ে দিয়েছিল দুটো কম্বল। সকাল বেলায় প্রথম জুটেছিল খাবার, খেতে দেওয়া হয়েছিল ফুটন্ত খিচুড়ি।
এরপরেও আরও অনেক পাশবিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে নীরাকে। সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। তবুও মনে মনে স্বপ্ন দেখতেন স্বাধীন ভারতে সূর্যোদয় দেখবেন। এই মহান ত্যাগের সম্মান দেয়নি দেশ। নীরা আন্দামানে আসার একবছর পর স্বাধীন হয়েছিল দেশ। মুক্তি পেয়েছিলেন নীরা। এই আত্মত্যাগের সম্মান দেয়নি দেশ। অভিমানে সাধারণের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন অসাধারণ নীরা।
স্বাধীনতা পরবর্তী জীবন–
স্বাধীনতার পরে, তিনি ফুল বিক্রি করে জীবনযাপন করেছিলেন, তবে কোনও সরকারী সহায়তা বা পেনশন গ্রহণ করেননি। তার ভাই বসন্ত কুমারও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি স্বাধীনতার পর সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। নীরা স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভূমিকা নিয়ে আত্মজীবনীও লিখেছেন। উর্দু লেখক ফারহানা তাজ’কে তিনি তার জীবনের অনেক ঘটনা শুনিয়েছিলেন। তিনি তার জীবন নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমিতে একটি উপন্যাসও রচনা করেন।
সম্মাননা—
নীরা আর্য নামে একটি জাতীয় পুরষ্কারও চালু করা হয়েছে। ছত্তিশগড়ের অভিনেতা অখিলেশ পান্ডে প্রথম নীরা আর্য পুরষ্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবং তাঁকে নীরা আর্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।
জীবনাবসান—
শেষ জীবনে তিনি তিনি দরিদ্র, অসহায়, নিঃস্ব হয়ে পরেছিলেন। হায়দরাবাদের ফালকনুমার একটি কুঁড়ে ঘরে বাস করতেন। নীরা আর্য জীবনের শেষ দিনগুলিতে ফুল বিক্রি করে কাটিয়েছেন এবং সরকারি জমিতে থাকার কারণে তার কুঁড়েঘরটিও শেষ মুহুর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সকলের অলক্ষ্যে ১৯৯৮ সালের ২৬শে জুলাই উসমানিয়া হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছিলেন ৯৬ বছরের বীরাঙ্গনা এক অগ্নিকন্যা নীরা আর্য্য।

।।তথ্য : সংগৃহীত ইন্টারনেট ও উইকিপিডিয়া।।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

আজকের দিনে কলকাতায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পূর্বতন বেঙ্গল একাডেমি অব লিটারেচার স্থাপিত হয়।।।।

বেঙ্গল লিটারারি সোসাইটি, 23 জুলাই, 1823 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, একটি অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান যা বাংলা সাহিত্য ও ভাষার প্রচার ও বিকাশে নিবেদিত ছিল। বেঙ্গল একাডেমি অফ লিটারেচার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত, এটি ছিল বাংলা ও ভারতের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।

19 শতকের গোড়ার দিকে, বাংলা একটি সাংস্কৃতিক নবজাগরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এবং এই বৃদ্ধির জন্য সমাজ গঠিত হয়েছিল।

পণ্ডিত, লেখক এবং বুদ্ধিজীবী সহ একদল দূরদর্শী ব্যক্তি, সাহিত্যিক আলোচনা, বিতর্ক এবং অগ্রগতির জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে একত্রিত হয়েছিল।
সমাজের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল বাংলা সাহিত্যের প্রচার, মৌলিক লেখাকে উৎসাহিত করা এবং সাহিত্য সমালোচনা ও বিশ্লেষণের জন্য একটি ফোরাম প্রদান করা। এর লক্ষ্য ছিল বাংলা সাহিত্যের ভান্ডার তৈরি করা, দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ ও প্রকাশ করা এবং জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায়, সমাজ তার যাত্রা শুরু করে, রাজা রামমোহন রায়, ডেভিড হেয়ার এবং উইলিয়াম কেরির মতো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সোসাইটির প্রারম্ভিক সভাগুলি কলকাতা টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে সদস্যরা সাহিত্যকর্ম নিয়ে আলোচনা করতে, তাদের নিজস্ব লেখা শেয়ার করতে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কে জড়িত হতেন।
বেঙ্গল লিটারারি সোসাইটির একটি উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রসার। যে সময়ে ইংরেজি প্রাধান্য লাভ করছিল, সমাজ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সংরক্ষণ ও বিকাশের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল। তারা লেখকদের বাংলা ভাষায় মৌলিক রচনা তৈরি করতে উত্সাহিত করেছিল এবং তাদের প্রচেষ্টার ফলে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট বাঙালি লেখকদের আবির্ভাব ঘটে।
বাংলা শিক্ষার বিকাশেও সমাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে কথা বলেছিল, যা অবশেষে স্কুল ও কলেজে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করে।
বছরের পর বছর ধরে, বেঙ্গল লিটারারি সোসাইটি বেশ কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, কিন্তু বাংলা সাহিত্য ও ভাষাকে প্রসারে এর অঙ্গীকার অটুট রয়েছে। আজ, সমাজটি কলকাতার সাহিত্যিক ল্যান্ডস্কেপে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসাবে অব্যাহত রয়েছে, সাহিত্য অনুষ্ঠান, সম্মেলন এবং কর্মশালার আয়োজন করে।
উপসংহারে বলা যায়, 23শে জুলাই, 1823 সালে প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল লিটারারি সোসাইটি বাংলা ও ভারতে সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্বের বাতিঘর। বাংলা সাহিত্য ও ভাষার বিকাশে এর অবদান অপরিসীম, এবং এর উত্তরাধিকার প্রজন্মের লেখক, পণ্ডিত এবং বুদ্ধিজীবীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

Share This
Categories
প্রবন্ধ রিভিউ

কলকাতা — ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আধুনিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধনের শহর।

ভূমিকা

কলকাতা — একটি নাম, একটি আবেগ, একটি সংস্কৃতি। এটি শুধু পশ্চিমবঙ্গের রাজধানীই নয়, বরং একসময়ের ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হিসেবেও ইতিহাসে স্বীকৃত। “City of Joy” নামে খ্যাত এই শহরটি আজও তার ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য, সাহিত্যের গন্ধ, আড্ডার খোলামেলা পরিবেশ, অসাধারণ রন্ধনপ্রণালী এবং হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া মানুষের জন্য বিখ্যাত। এ শহরের প্রতিটি কোণে ইতিহাস আর গল্প লুকিয়ে আছে।

এই প্রবন্ধে আমরা জানবো কলকাতার দশটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রের বিস্তারিত, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার কথা, যা ভ্রমণপ্রেমীদের মন কেড়ে নেয়।


১. ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল — এক ব্রিটিশ ঐতিহ্যের স্মারক

সাদা মার্বেলের তৈরি বিশাল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল কলকাতার সবচেয়ে পরিচিত দর্শনীয় স্থান। ১৯০৬ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে ১৯২১ সালে শেষ হয়। এটি রানী ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিতে গঠিত। স্থাপত্যের ধরনটি মুগল ও ইউরোপীয় রীতির সংমিশ্রণ।

দর্শনীয় বিষয়সমূহ:

  • রানীর ব্রোঞ্জ মূর্তি
  • বিভিন্ন ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম ও ফটোগ্রাফ
  • ৬৪ একর জমির উপর বিস্তৃত সুন্দর বাগান
  • আলোক ও শব্দ প্রদর্শনী

পরামর্শ: সন্ধ্যাবেলায় বাগানে হাঁটা ও লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখার জন্য একবার অবশ্যই আসুন।


২. হাওড়া ব্রিজ — ইস্পাতের নির্মিত জীবনরেখা

হুগলি নদীর উপর নির্মিত হাওড়া ব্রিজ শুধুমাত্র একটি সেতু নয়, কলকাতার প্রাণ। এটি বিশ্বের ব্যস্ততম ক্যানটিলিভার সেতু। আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৪৩ সালে উদ্বোধন হয়।

দর্শনীয় বিষয়সমূহ:

  • গোধূলিতে হুগলির উপর সূর্যাস্তের দৃশ্য
  • নৌকাবিহার
  • ব্রিজের নিচে থাকা ফুলবাজার

পরামর্শ: ভোরবেলায় হাওড়া ব্রিজ থেকে শহর দেখলে মুগ্ধ হবেন।


৩. বেলুড় মঠ — রামকৃষ্ণ পরমহংসের আদর্শে গড়া তীর্থভূমি

শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদাদেবী ও স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শকে তুলে ধরে বেলুড় মঠ। ১৯০৯ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এটি রামকৃষ্ণ মিশনের মূল কেন্দ্র।

দর্শনীয় বিষয়সমূহ:

  • গঙ্গার ধারে নির্মিত মূল মন্দির
  • বিবেকানন্দের কক্ষ
  • মননশীল শান্ত পরিবেশ

পরামর্শ: সন্ধ্যায় আরতির সময় এলে এক অনন্য অভিজ্ঞতা পাবেন।


৪. ভারতীয় জাদুঘর — ভারতের ইতিহাসের প্রাচীনতম সংগ্রহশালা

১৮১৪ সালে স্থাপিত, এটি ভারতের প্রাচীনতম এবং এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জাদুঘর। এখানে প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, প্রাণিবিজ্ঞান ও ভূতত্ত্ব বিভাগে বিশাল সংগ্রহ রয়েছে।

দর্শনীয় বিষয়সমূহ:

  • মমি
  • অশোক স্তম্ভ
  • বৌদ্ধ শিল্পকর্ম

পরামর্শ: বাচ্চাদের নিয়ে গেলে শিক্ষা ও আনন্দ দুটোই হবে।


৫. ইডেন গার্ডেন — ক্রিকেটের ঐতিহাসিক মঞ্চ

১৮৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেডিয়ামটি ৬৬,০০০ দর্শক ধারণক্ষমতার জন্য পরিচিত। আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছাড়াও এটি বাংলার রঞ্জি দল এবং আইপিএলের হোম গ্রাউন্ড।

দর্শনীয় বিষয়সমূহ:

  • আন্তর্জাতিক ম্যাচের উত্তেজনা
  • গাছ-গাছালির ঘেরা প্রাঙ্গণ
  • মাঠ ঘিরে থাকা প্যাভিলিয়নগুলি

পরামর্শ: খেলার দিন হলে অবশ্যই টিকিট সংগ্রহ করে অভিজ্ঞতা নিন।


৬. সেন্ট পল’স ক্যাথেড্রাল — ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের নিদর্শন

১৮৪৭ সালে তৈরি এই গথিক রিভাইভাল শৈলীর গির্জাটি নিঃসন্দেহে কলকাতার সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ জায়গাগুলির একটি। এর দাগযুক্ত কাঁচের জানালা ও চুনাপাথরের দেয়াল এক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা দেয়।

দর্শনীয় বিষয়সমূহ:

  • গির্জার বিশাল গম্বুজ
  • ধর্মীয় চিত্র ও প্রতিমা
  • মধ্যাহ্ন প্রার্থনা

পরামর্শ: বড়দিনের সময় এলে সজ্জিত গির্জা ও সংগীত শুনে মুগ্ধ হবেন।


৭. পার্ক স্ট্রিট — কলকাতার নাইট লাইফের প্রাণকেন্দ্র

বিখ্যাত রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, বার ও লাইভ মিউজিকের জন্য পার্ক স্ট্রিট অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখানেই প্রথম আধুনিক ডিস্কো সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল।

দর্শনীয় বিষয়সমূহ:

  • পিটার ক্যাট, ফ্লুরিস, ট্র্যাম্পসের মতো বিখ্যাত রেস্তোরাঁ
  • ডিসেম্বরে আলো দিয়ে সাজানো রাস্তা
  • লাইভ জ্যাজ বা ব্যান্ড মিউজিক

পরামর্শ: সন্ধ্যায় ঘুরতে এলেই বুঝবেন এর জাদু।


৮. নিউ মার্কেট — কেনাকাটার এক ঐতিহাসিক ঠিকানা

১৮৭৪ সালে নির্মিত, এটি কলকাতার সবচেয়ে পুরনো ও ব্যস্ততম বাজার। প্রায় ২০০০ দোকানে মেলে জামাকাপড়, গয়না, খাবার থেকে শুরু করে স্থানীয় হস্তশিল্প।

দর্শনীয় বিষয়সমূহ:

  • ভারতীয় পোশাকের বিশাল সংগ্রহ
  • মিষ্টির দোকান ও খাদ্য সামগ্রী
  • মূল্য দরাদরির চমৎকার পরিবেশ

পরামর্শ: হালকা পকেটেও প্রচুর জিনিস কেনা সম্ভব।


৯. বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম — মহাবিশ্বের রহস্যে ভ্রমণ

এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্ল্যানেটোরিয়াম। এখানে মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে বিভিন্ন প্রদর্শনী হয়।

দর্শনীয় বিষয়সমূহ:

  • দৈনিক থ্রিডি শো
  • সৌরজগতের তথ্যচিত্র
  • আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান দিবসে বিশেষ আয়োজন

পরামর্শ: শিশুরা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করবে, তবে বড়রাও শিখতে পারবেন।


১০. মার্বেল প্রাসাদ — শিল্প ও অলংকারের অদ্ভুত সমাহার

১৮৩৫ সালে জমিদার রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক নির্মিত মার্বেল প্রাসাদ এক সত্যিকারের শিল্পভাণ্ডার। ফরাসি, ইংরেজি ও ভারতীয় চিত্রকলা, ভাস্কর্য, আয়না, ঝাড়বাতি ইত্যাদির বিশাল সংগ্রহ রয়েছে।

দর্শনীয় বিষয়সমূহ:

  • প্রাসাদের ভেতরের গ্রীক ও রোমান মূর্তি
  • পাশেই পশুপাখির চিড়িয়াখানা
  • বিরল সংগ্রহশালার অভ্যন্তরভাগ

পরামর্শ: আগে থেকে অনুমতি নিয়ে গেলে ভেতরে ছবি তোলা যেতে পারে।


উপসংহার

কলকাতা একটি জীবন্ত ইতিহাসের শহর, যেখানে প্রতিটি অলিগলি একেকটি গল্প বলার অপেক্ষায়। আধুনিকতার স্পর্শ থাকলেও তার শিকড় ছড়িয়ে আছে অতীতে, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতায়। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য কলকাতা নিঃসন্দেহে একবার নয়, বারবার ঘুরে দেখার মতো শহর।


আপনি যদি কলকাতা ঘুরে দেখতে চান, তবে শুধু ক্যামেরা নয়, সঙ্গে করে নিয়ে আসুন বিস্ময় ও কৌতূহল — কারণ এই শহর চমকে দেওয়ার মতো গল্প লুকিয়ে রাখে তার প্রতিটি কোণে।

Share This
Categories
গল্প প্রবন্ধ

চার ধাম : এক মহাপবিত্র তীর্থযাত্রার ইতিহাস ও তাৎপর্য।

🔶 ভূমিকা

ভারতবর্ষের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরম্পরায় চার ধামের গুরুত্ব অপরিসীম। হিন্দু ধর্মে “চার ধাম” বলতে বোঝায় চারটি পবিত্র স্থান, যেখানে একবার তীর্থ করে আসা মানুষের পাপ মোচন হয় এবং মোক্ষ লাভের পথ প্রসারিত হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। এই চারটি তীর্থক্ষেত্র হল—বদ্রীনাথ (উত্তরে), দ্বারকা (পশ্চিমে), জগন্নাথ পুরী (পূর্বে) এবং রামেশ্বরম (দক্ষিণে)।
এই তীর্থযাত্রা শুধুমাত্র ভ্রমণ নয়, বরং আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষও বটে।

🕉️ চার ধামের উৎপত্তি ও ধারণা

চার ধামের ধারণা প্রচলন করেন মহান আচার্য শংকরাচার্য। তিনি অষ্টম শতকে সারা ভারতে ধর্মীয় সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণ আনতে চারটি প্রান্তে চারটি ধামের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু ধর্মের মূল মন্ত্রকে দেশজুড়ে বিস্তার করা এবং মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ঐক্য ও আত্মিক উত্তরণ ঘটানো।

📍 চার ধামের পরিচিতি

১. বদ্রীনাথ ধাম (উত্তর ভারত)

অবস্থান: উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় হিমালয়ের নরনারায়ণ পর্বতের কোলঘেঁষে অবস্থিত।

প্রধান দেবতা: ভগবান বিষ্ণু (বদ্রীনারায়ণ রূপে)।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এখানে শংকরাচার্য আধ্যাত্মিক তপস্যার আশ্রম স্থাপন করেছিলেন। পুরাণ অনুযায়ী, বদ্রীনাথ হল সেই স্থান যেখানে নারায়ণ তপস্যা করেছিলেন এবং লক্ষ্মী দেবী বাদামের গাছ (বদ্রি) হয়ে তাঁকে রোদ থেকে রক্ষা করেছিলেন।

মুখ্য আর্কিটেকচার: পাহাড়ের মাঝে কাঠ ও পাথরের মিলিত রীতিতে তৈরি মন্দির।

তীর্থকাল: এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত, কারণ শীতকালে তুষারপাতের কারণে বন্ধ থাকে।

২. দ্বারকা ধাম (পশ্চিম ভারত)

অবস্থান: গুজরাটের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে আরব সাগরের তীরে।

প্রধান দেবতা: শ্রীকৃষ্ণ (দ্বারকাধীশ রূপে)।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কৃষ্ণ এখানে Mathura থেকে স্থানান্তর করে রাজ্য স্থাপন করেন। এটি তাঁর রাজ্যপাটের স্থান। মহাভারতের বহু কাহিনি এই শহরকে ঘিরে আবর্তিত।

দ্বারকাধীশ মন্দির: এটি চৌহান শাসকের দ্বারা নির্মিত, ৭-তলা বিশিষ্ট বিশাল মন্দির।

তীর্থকাল: সারা বছরই ভক্তদের আনাগোনা দেখা যায়, বিশেষ করে জন্মাষ্টমীতে।

৩. জগন্নাথ পুরী (পূর্ব ভারত)

অবস্থান: ওড়িশার পুরী শহরে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে।

প্রধান দেবতা: ভগবান জগন্নাথ (কৃষ্ণ রূপে), বলভদ্র ও সুভদ্রা।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এটি কৃষ্ণের এক বিশেষ রূপ। এই মন্দিরে একমাত্র স্থানে কৃষ্ণের কাঠের মূর্তি বিরাজমান। এখানেই অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বখ্যাত ‘রথযাত্রা’ উৎসব।

জগন্নাথ মন্দির: ১২ শতকে নির্মিত এই মন্দিরটি হিন্দু স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন।

বিশেষত্ব: “মহাপ্রসাদ”, রাঁধার নিয়ম ও বিতরণ পদ্ধতি এক অলৌকিক ঘটনা।

৪. রামেশ্বরম ধাম (দক্ষিণ ভারত)

অবস্থান: তামিলনাড়ুর রামনাথপুরম জেলায়, পাক প্রণালীতে অবস্থিত।

প্রধান দেবতা: শিব (রামনাথস্বামী রূপে)।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: রামায়ণ অনুযায়ী, ভগবান রাম এখানে শিবলিঙ্গ স্থাপন করে পুজো করেন লঙ্কা যাত্রার পূর্বে। সেই কারণে এই স্থান অত্যন্ত পবিত্র।

রামনাথস্বামী মন্দির: বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ করিডোর বিশিষ্ট দক্ষিণী শৈলীতে নির্মিত মন্দির।

অন্য নাম: হিন্দু ধর্মে এটি “বেণারসের পরে সর্বোচ্চ পুণ্যক্ষেত্র” হিসেবেও ধরা হয়।

🙏 চার ধামের তীর্থযাত্রার গুরুত্ব

◾ মোক্ষ লাভের আশ্বাস

হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, জীবনে একবার চার ধাম দর্শন করলে মোক্ষ লাভ হয়, আর পুনর্জন্মের আবর্ত থেকে মুক্তি মেলে।

◾ পাপ মোচন

শাস্ত্রে বলা হয়েছে, এই ধামে পবিত্র স্নান, দান, পূজা ও জপ-তপ করলে মানুষের জন্মজন্মান্তরের পাপ ধুয়ে যায়।

◾ আত্মিক পরিশুদ্ধি

চার ধামের প্রত্যেকটির নিজস্ব পরিবেশ, অনুভব, ও আত্মিক প্রভাব আছে। পাহাড়, সমুদ্র, নদী ও উপকূলের মিশ্র পরিবেশ আত্মাকে শুদ্ধ করে।

🚩 আধুনিক যুগে চার ধাম যাত্রা

বর্তমানে সরকার চার ধাম যাত্রাকে অনেক সহজতর করে তুলেছে। “চার ধাম মহামার্গ” প্রকল্পের মাধ্যমে একাধিক হাইওয়ে নির্মাণ হয়েছে। পাশাপাশি হেলিকপ্টার পরিষেবা, ট্রেন, বাস, ও অনলাইন বুকিংয়ের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।

🔍 কিছু চমকপ্রদ তথ্য

বদ্রীনাথ ধামে একমাত্র ঠাণ্ডার মরসুম বাদে পূজা হয়।

রামেশ্বরমে রামের স্থাপন করা শিবলিঙ্গের পাশে অন্য এক শিবলিঙ্গ নেপাল থেকে আনা হয়েছিল।

জগন্নাথ মন্দিরে পতাকা প্রতিদিন উল্টো দিক থেকে ওড়ে।

দ্বারকায় এখনও সমুদ্রের নিচে ডুবে যাওয়া প্রাচীন শহরের নিদর্শন পাওয়া যায়।

🌿 উপসংহার

চার ধাম তীর্থ শুধু ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক এক সফর নয়, এটি আত্মিক উৎকর্ষের এক গভীর অনুশীলন। শংকরাচার্যের প্রতিষ্ঠিত এই তীর্থগুলি আজও হিন্দু ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রী হৃদয়ে এক গভীর ভক্তি ও বিশ্বাস নিয়ে এই যাত্রায় অংশগ্রহণ করে চলেছেন।
জীবনে অন্তত একবার চার ধামের দর্শন জীবনের উদ্দেশ্য, কৃতজ্ঞতা, আত্মবোধ ও ঈশ্বর ভাবনার নব দিগন্ত উন্মোচিত করে দেয়।
‐——————–
—‐‐-‐-‐————–‐-

Share This