Categories
গল্প নারী কথা

লাল সাইকেলের স্বপ্ন।

সোনাঝুরি গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকত বারো বছরের মেয়ে ঝিলিক। ছোট্ট একটা মাটির বাড়ি, সামনে তুলসীতলা, পাশে কয়েকটা কলাগাছ আর বাড়ির পেছনে বিস্তীর্ণ ধানখেত—এই ছিল তার পৃথিবী।

ঝিলিক পড়াশোনা করতে খুব ভালোবাসত।

কিন্তু গ্রামের স্কুলটা ছিল বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে।

প্রতিদিন ভোরে উঠে তাকে হেঁটে স্কুলে যেতে হত।

বর্ষার দিনে কাদা পেরিয়ে, গ্রীষ্মে ধুলো উড়িয়ে, শীতের সকালে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে সে হাঁটত।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে ঝিলিক মাকে বলল,

—“মা, আমার যদি একটা সাইকেল থাকত!”

মা চুপ করে রইলেন।

বাবা দিনমজুর। সংসারে চারজন মানুষ। সাইকেল কেনার মতো টাকা তাদের হাতে কখনও জমেনি।

মা শুধু বললেন,

—“একদিন হবে।”

ঝিলিক জানত, মায়ের সেই ‘একদিন’ হয়তো অনেক দূরে।

তবু সে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করল না।

স্কুলে তার প্রিয় বিষয় ছিল বিজ্ঞান। শিক্ষক যখন নতুন কিছু বোঝাতেন, ঝিলিকের চোখ জ্বলে উঠত।

একদিন বিজ্ঞান শিক্ষক অনিরুদ্ধবাবু বললেন,

—“তোমরা সবাই বড় হয়ে কী হতে চাও?”

কেউ বলল ডাক্তার।

কেউ পুলিশ।

কেউ শিক্ষক।

ঝিলিক উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—“আমি বিজ্ঞানী হতে চাই।”

ক্লাসে কয়েকজন হেসে ফেলল।

অনিরুদ্ধবাবু হাসলেন না।

তিনি বললেন,

—“কেন?”

ঝিলিক বলল,

—“আমাদের গ্রামের অনেক সমস্যা আছে। আমি এমন কিছু বানাতে চাই যাতে গ্রামের মানুষের কাজ সহজ হয়।”

শিক্ষক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তাহলে আজ থেকেই শুরু করো।”

সেদিন কথাটা ঝিলিকের মনে গেঁথে গেল।

কয়েকদিন পর স্কুলে বিজ্ঞান প্রদর্শনীর ঘোষণা হল।

ঝিলিক ঠিক করল, সে এমন একটা জিনিস বানাবে যাতে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করে ব্যবহার করা যায়।

কিন্তু সমস্যা হল—প্রকল্প বানানোর টাকা কোথায়?

বাড়িতে বলতেই বাবা বললেন,

—“যা আছে তাই দিয়ে কর মা। নতুন জিনিস কিনতে পারব না।”

ঝিলিক বলল,

—“নতুন কিছু লাগবে না বাবা।”

সে পুরনো প্লাস্টিকের বোতল, বাঁশের টুকরো, ব্যবহৃত পাইপ আর কয়েকটি খালি ড্রাম জোগাড় করল।

অনিরুদ্ধবাবুর সাহায্যে সে একটি ছোট মডেল তৈরি করল।

বৃষ্টির জল ছাদ থেকে পাইপ দিয়ে ড্রামে জমবে। তারপর সেই জল বাগানে ব্যবহার করা যাবে।

প্রথম মডেলটি ভেঙে পড়ল।

দ্বিতীয়টিও ঠিকমতো কাজ করল না।

তৃতীয়বার আবার চেষ্টা করল ঝিলিক।

এক রাতে মা দেখলেন, মেয়েটা উঠোনে বসে কিছু একটা নিয়ে কাজ করছে।

—“এত রাতে?”

—“কাল স্কুলে পরীক্ষা।”

—“ঘুমাবি না?”

ঝিলিক বলল,

—“স্বপ্নটা শেষ না করলে ঘুম আসবে না।”

মা কিছু বললেন না।

শুধু ঘরে গিয়ে মেয়ের জন্য এক গ্লাস জল নিয়ে এলেন।

পরদিন বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে ঝিলিকের মডেল ঠিকঠাক কাজ করল।

বিচারকরা অবাক হয়ে দেখলেন।

একজন জিজ্ঞেস করলেন,

—“এটা তুমি নিজে বানিয়েছ?”

ঝিলিক মাথা নাড়ল।

—“জি।”

—“কী দিয়ে?”

ঝিলিক সবকিছু বুঝিয়ে বলল।

শেষে ফল ঘোষণা হল।

ঝিলিক প্রথম হল।

পুরস্কার হিসেবে সে পেল একটি বইয়ের সেট এবং একটি সাইকেল।

লাল রঙের সাইকেল।

সাইকেলটি দেখে ঝিলিক কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

তার চোখে জল এসে গেল।

অনিরুদ্ধবাবু বললেন,

—“কী হল?”

ঝিলিক ফিসফিস করে বলল,

—“স্যার, এটাই তো আমার স্বপ্ন ছিল।”

পরদিন ভোরে ঝিলিক প্রথমবার সাইকেল নিয়ে স্কুলের পথে বেরোল।

লাল সাইকেলটি কাঁচা রাস্তার ওপর দিয়ে ছুটছিল।

তার চুল বাতাসে উড়ছিল।

কিন্তু ঝিলিকের মনে হচ্ছিল, সে শুধু স্কুলে যাচ্ছে না—সে যেন নিজের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

কয়েক মাস পর গ্রামে আরেকটি সমস্যা দেখা দিল।

গরমের সময় পুকুরের জল শুকিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের মানুষ দূরের টিউবওয়েল থেকে জল আনত।

ঝিলিক ভাবতে শুরু করল।

সে এবার একটা সহজ জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করল।

অনিরুদ্ধবাবুর সাহায্যে গ্রামের কয়েকটি বাড়ির ছাদ থেকে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করল।

প্রথমে গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করল না।

একজন বললেন,

—“এই বাচ্চা মেয়ে আবার আমাদের জল শেখাবে?”

আরেকজন হাসলেন।

কিন্তু ঝিলিক থামল না।

বর্ষার প্রথম বৃষ্টির দিন সে নিজের বাড়িতে ব্যবস্থা চালু করল।

বৃষ্টির জল পাইপ দিয়ে ড্রামে জমতে লাগল।

মা অবাক হয়ে বললেন,

—“এত জল!”

ঝিলিক হাসল।

—“এই জল ফেলে দিলে আবার কিনতে হবে।”

কয়েকদিন পর গ্রামের আরও তিনটি পরিবার সেই ব্যবস্থা তৈরি করল।

তারপর দশটি।

তারপর আরও অনেক বাড়ি।

ঝিলিকের ছোট্ট পরিকল্পনা ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষের কাজে লাগতে শুরু করল।

একদিন পঞ্চায়েতের এক কর্মী এসে বললেন,

—“তোমার এই মডেলটা আমরা অন্য গ্রামেও দেখাতে চাই।”

ঝিলিক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

যে মেয়েটাকে নিয়ে একদিন সবাই হাসছিল, আজ তার কাজ দেখতে মানুষ দূর থেকে আসছে।

তবে ঝিলিক বদলায়নি।

সে এখনও প্রতিদিন স্কুলে যায়।

লাল সাইকেলটাও এখনও তার সঙ্গী।

একদিন অনিরুদ্ধবাবু তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

—“তুই বড় হয়ে কী হতে চাস?”

ঝিলিক একটু ভেবে বলল,

—“আগে ভাবতাম বিজ্ঞানী হব। এখন মনে হয়, আমি এমন কিছু বানাতে চাই যা গ্রামের মানুষের কাজে লাগে।”

শিক্ষক বললেন,

—“এটাই তো বিজ্ঞানীর আসল স্বপ্ন।”

বছর কেটে গেল।

ঝিলিক উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে চলে গেল।

বিদায়ের দিন তার মা বললেন,

—“সাইকেলটা নিয়ে যাবি?”

ঝিলিক হেসে বলল,

—“না মা। এটা এখানেই থাকবে।”

—“কেন?”

—“গ্রামের যে মেয়েটা স্কুলে যেতে চায়, কিন্তু সাইকেল নেই—সে ব্যবহার করবে।”

মা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ঝিলিক সাইকেলটা গ্রামের স্কুলে দিয়ে গেল।

সাইকেলের হ্যান্ডেলে ছোট্ট একটা কাগজ বাঁধা ছিল।

তাতে লেখা—

“স্বপ্ন দেখো। পথ যত দূরই হোক, একদিন পৌঁছবে।”

পরদিন গ্রামের আরেকটি মেয়ে সেই লাল সাইকেলে চেপে স্কুলে গেল।

তারপর আরেকজন।

তারপর আরও একজন।

লাল সাইকেলটি যেন এক স্বপ্ন থেকে আরেক স্বপ্নের কাছে ছুটে বেড়াতে লাগল।

আর সোনাঝুরি গ্রামের মানুষ বুঝল—

কখনও কখনও একটি ছোট্ট স্বপ্ন শুধু একজনের জীবন বদলায় না।

সেটা অনেক মানুষের পথ দেখায়।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ড. কমলা সোহোনি: বিজ্ঞানকে মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত করা এক মহীয়সী নারী।

বিজ্ঞান কখনও শুধু গবেষণাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনও গবেষণা যদি মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য কিংবা জীবনযাত্রার উন্নতিতে কাজে লাগে, তখন সেই গবেষণার গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

ভারতের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ড. কমলা সোহোনি ছিলেন এমনই এক বিজ্ঞানী। জীবরসায়নের মতো কঠিন বিষয় নিয়ে গবেষণা করেও তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের কাজকে সাধারণ মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

১৯৩৯ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করে তিনি ভারতীয় নারীদের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তৈরি করেন। পরবর্তীকালে তাঁর গবেষণার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয় হয়ে ওঠে ভারতীয়দের দৈনন্দিন খাদ্য, ডাল, শস্য এবং বিশেষ করে ‘নীরা’-র পুষ্টিগুণ।

বিজ্ঞানী পরিবারে বেড়ে ওঠা

কমলা সোহোনির জন্ম ১৮ জুন ১৯১১ সালে ইন্দোরে। তাঁর পারিবারিক পরিবেশ ছিল বিজ্ঞানমুখী। তাঁর বাবা নারায়ণরাও ভাগবত এবং কাকা মাধবরাও ভাগবত—দুজনেই রসায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বেঙ্গালুরুর তৎকালীন টাটা ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে পড়াশোনা করেছিলেন।

ছোটবেলা থেকেই তাই বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।

তিনি মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৩৩ সালে রসায়নকে প্রধান বিষয় ও পদার্থবিদ্যাকে সহায়ক বিষয় হিসেবে নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরীক্ষায় তাঁর ফল ছিল অত্যন্ত ভালো।

তখন ভারতে বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু কমলা জানতেন, তাঁর ভবিষ্যৎ গবেষণার মধ্যেই।

IISc-এর দরজা বন্ধ হয়েছিল তাঁর জন্য

স্নাতক হওয়ার পর কমলা বেঙ্গালুরুর Indian Institute of Science (IISc)-এ গবেষণা করার জন্য আবেদন করেন।

কিন্তু তখন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সি. ভি. রমন। কমলার আবেদন প্রথমে প্রত্যাখ্যান করা হয়—মূল কারণ ছিল তিনি নারী। IISc-এর নিজস্ব ঐতিহাসিক নথিতেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

কমলা এই প্রত্যাখ্যান মেনে নেননি।

তিনি নিজের অধিকারের জন্য দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেন এবং শেষ পর্যন্ত IISc-তে গবেষণার সুযোগ পান। তবে তাঁকে প্রথমে কিছু কঠোর শর্তের মধ্যে কাজ করতে হয়েছিল। তিনি নিয়মিত গবেষক হিসেবে নয়, পরীক্ষামূলকভাবে গবেষণা শুরু করেন।

এই ঘটনাটি তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

কারণ তিনি শুধু নিজের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেননি—তাঁর উপস্থিতির পর IISc-তে আরও নারী শিক্ষার্থীর জন্য দরজা খুলতে শুরু করে।

গবেষণাগারে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ

IISc-তে কমলা সোহোনি জীবরসায়ন নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল দুধ, ডাল এবং বিভিন্ন শস্যজাত খাদ্যের প্রোটিন।

তাঁর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিজ্ঞানী এম. শ্রীনিবাসাইয়া।

ভারতের সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে এই গবেষণার সরাসরি সম্পর্ক ছিল। কারণ দেশের বড় একটি অংশের মানুষের খাদ্যতালিকায় ডাল, শস্য ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাবারের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

কমলা বুঝেছিলেন, সাধারণ মানুষের খাবারের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরি।

১৯৩৬ সালে তিনি IISc-এর গবেষণা শেষ করে মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণা ও কাজের দক্ষতা শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রাথমিক বাধাগুলোকে অতিক্রম করে দেয়।

কেমব্রিজের পথে

এরপর কমলা সোহোনির সামনে আসে আরও বড় সুযোগ।

১৯৩৭ সালে তিনি কেমব্রিজের Newnham College-এ পড়াশোনা ও গবেষণা শুরু করেন। সেখানে তিনি জীবরসায়নের গবেষণায় যুক্ত হন। প্রথমে ডেরেক রিখটারের সঙ্গে এবং পরে উদ্ভিদ-শারীরবিদ রবিন হিলের সঙ্গে কাজ করেন।

তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল উদ্ভিদকোষে শক্তি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া।

আলুর কোষ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি উদ্ভিদে cytochrome c-এর উপস্থিতি ও তার ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। এই পদার্থ কোষে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।

অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর ডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন।

১৯৩৯ সালে কেমব্রিজ থেকে পিএইচডি অর্জন করেন তিনি। তাঁর এই অর্জন ভারতীয় নারী বিজ্ঞানীদের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

দেশে ফিরে মানুষের জন্য বিজ্ঞান

বিদেশে পিএইচডি অর্জনের পর কমলা সোহোনি ভারতে ফিরে আসেন।

তিনি দিল্লির Lady Hardinge Medical College-এ জীবরসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান হিসেবে কাজ করেন। পরে কুনুরের Nutrition Research Laboratory-তে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তাঁর গবেষণার অন্যতম বিষয় ছিল ভিটামিন ও পুষ্টি।

এখান থেকেই তাঁর গবেষণার সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক আরও গভীর হয়।

তিনি বুঝতে পারছিলেন, ভারতের মতো দেশে পুষ্টিবিজ্ঞান শুধু পরীক্ষাগারে নতুন রাসায়নিক উপাদান আবিষ্কারের বিষয় নয়। মানুষের প্রতিদিনের খাবারের মধ্যেই অনেক সমস্যার সমাধান লুকিয়ে থাকতে পারে।

মুম্বইয়ে নতুন অধ্যায়

১৯৪৭ সালে কমলা সোহোনি মুম্বইয়ের Royal Institute of Science-এ জীবরসায়নের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

সেখানে তিনি ডাল, শস্য এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের খাদ্যতালিকায় থাকা বিভিন্ন খাবারের পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা করেন।

এই গবেষণার বিশেষত্ব ছিল এর বাস্তব প্রাসঙ্গিকতা।

কোনও বিলাসবহুল বা বিরল খাদ্য নয়—সাধারণ মানুষের হাতের কাছে থাকা খাবারেই কীভাবে পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা যায়, সেই প্রশ্ন তাঁর গবেষণার অন্যতম কেন্দ্রে ছিল।

এই চিন্তাভাবনা পরবর্তী সময়ে তাঁকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার দিকে নিয়ে যায়।

‘নীরা’ নিয়ে গবেষণা

কমলা সোহোনির জীবনের অন্যতম পরিচিত গবেষণা ছিল নীরা নিয়ে।

নীরা হল বিভিন্ন তালগাছের পুষ্পমঞ্জরি থেকে সংগ্রহ করা মিষ্টি রস। ভারতের কিছু অঞ্চলে এটি দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য ও পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের পরামর্শে কমলা সোহোনি নীরার পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

গবেষণায় তিনি নীরায় ভিটামিন A, ভিটামিন C এবং আয়রন-এর উপস্থিতি শনাক্ত করেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—নীরা থেকে গুড় বা অন্যান্য ঘন খাদ্যপণ্য তৈরি করার পরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান যথেষ্ট পরিমাণে বজায় থাকতে পারে।

এর ফলে নীরা শুধুমাত্র একটি ঐতিহ্যবাহী পানীয় নয়, পুষ্টির দিক থেকেও সম্ভাবনাময় খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে।

দরিদ্র মানুষের খাদ্যের দিকে নজর

কমলা সোহোনির গবেষণার অন্যতম মানবিক দিক ছিল—তিনি গবেষণার জন্য এমন খাদ্যকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, যা দেশের সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের নাগালের মধ্যে ছিল।

পুষ্টির অভাব ভারতের বহু মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের সমস্যা ছিল। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে অপুষ্টি গুরুতর সামাজিক সমস্যা তৈরি করত।

নীরা নিয়ে তাঁর গবেষণা দেখিয়েছিল, স্থানীয় ও তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য খাদ্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করে পুষ্টির সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব।

পরবর্তী খাদ্যসংক্রান্ত গবেষণায় অপুষ্টিতে ভোগা শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের খাদ্যতালিকায় নীরার ব্যবহার নিয়ে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়।

এই কাজের জন্য তিনি Rashtrapati Award লাভ করেন।

গবেষক থেকে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে

কমলা সোহোনির কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল প্রশাসনিক নেতৃত্ব।

তিনি Royal Institute of Science-এর জীবরসায়ন বিভাগের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠানের Director হন।

ভারতের বিজ্ঞান গবেষণার ইতিহাসে এটি ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কারণ সেই সময়ে দেশের বড় বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিরল। ভারত সরকারের নারী ও শিশুবিকাশ মন্ত্রকের প্রকাশিত ‘First Women Achievers’ সংক্রান্ত নথিতেও তাঁকে ভারতের প্রথম দিকের নারী বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান-প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একজন নারী বিজ্ঞানীর জন্য এই নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছানো ছিল তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল।

বিজ্ঞান ও সমাজ—দুটি আলাদা নয়

কমলা সোহোনির গবেষণার দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে—তিনি বিজ্ঞানকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি।

আলুর কোষের জৈবরাসায়ন থেকে শুরু করে ডাল ও শস্যের পুষ্টিগুণ, তারপর নীরা—তাঁর গবেষণার বিষয় বদলেছে, কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে:

বিজ্ঞান কীভাবে মানুষের জীবনকে আরও ভালো করতে পারে?

এই প্রশ্নই তাঁকে একজন মৌলিক গবেষক থেকে একজন জনমুখী বিজ্ঞানীতে পরিণত করেছিল।

শুধু বিজ্ঞানী নন, সচেতন নাগরিকও

জীবনের পরবর্তী পর্যায়েও কমলা সোহোনি সক্রিয় ছিলেন।

তিনি Consumer Guidance Society of India-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৮২–৮৩ সময়কালে সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভোক্তা নিরাপত্তা সম্পর্কেও তিনি লিখেছেন।

অর্থাৎ তাঁর সামাজিক আগ্রহ শুধু পুষ্টিবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

খাদ্য, স্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার—মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল।

নারীদের জন্য তাঁর পথচলার গুরুত্ব

কমলা সোহোনির জীবনকে শুধু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দৃষ্টিতে দেখলে তাঁর সংগ্রামের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে।

তাঁকে প্রথমে শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে গবেষণার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। তিনি সেই বাধার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন এবং নিজের যোগ্যতা দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে গবেষণার ক্ষমতা লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

তাঁর IISc-এ প্রবেশের ঘটনা পরবর্তী সময়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির দরজা আরও উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসংখ্য ভারতীয় নারী কাজ করছেন। তাঁদের পথ অনেকটাই সহজ হয়েছে কারণ তাঁদের আগের প্রজন্মের কিছু নারী প্রথম বাধাগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন।

কমলা সোহোনি তাঁদের অন্যতম।

তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়

১৯৯৮ সালের ২৮ জুন নয়াদিল্লিতে কমলা সোহোনির মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।

জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁর কাজের মূল সুর ছিল মানুষের কল্যাণের সঙ্গে বিজ্ঞানকে যুক্ত করা।

মৃত্যুর পর বহু বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর নাম নতুন প্রজন্মের কাছে আবার পরিচিত হতে শুরু করে। ২০২৩ সালে তাঁর ১১২তম জন্মবার্ষিকীতে Google তাঁকে একটি Doodle-এর মাধ্যমে স্মরণ করে।

এটি দেখায়, সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর কাজের গুরুত্ব হারিয়ে যায়নি।

উত্তরাধিকার

কমলা সোহোনির উত্তরাধিকারকে কয়েকটি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

তিনি ছিলেন একজন গবেষক, যিনি উদ্ভিদকোষের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করেছিলেন।

তিনি ছিলেন একজন পুষ্টিবিজ্ঞানী, যিনি ভারতের সাধারণ মানুষের খাদ্যের পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।

তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, যিনি নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের তৈরি করেছিলেন।

এবং তিনি ছিলেন এমন একজন নারী, যিনি একটি পুরুষ-প্রধান বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করেছিলেন।

শেষ কথা

কমলা সোহোনির জীবন আমাদের ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের সামনে দাঁড় করায়—বড় বৈজ্ঞানিক কাজ সবসময় বড় যন্ত্র বা বিশাল গবেষণাগার দিয়ে শুরু হয় না।

কখনও তা শুরু হয় একটি প্রশ্ন দিয়ে।

মানুষ যে খাবার প্রতিদিন খায়, সেই খাবার কতটা পুষ্টিকর?

এই সাধারণ প্রশ্ন থেকেই ডাল, শস্য, উদ্ভিদ এবং নীরার মতো খাদ্য নিয়ে তাঁর গবেষণার পথ তৈরি হয়েছিল।

আর সেই পথ তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল কেমব্রিজের গবেষণাগার থেকে ভারতের সাধারণ মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্য সমস্যার কাছে।

কমলা সোহোনি প্রমাণ করেছিলেন, বিজ্ঞানের প্রকৃত শক্তি শুধু নতুন তথ্য আবিষ্কারে নয়—সেই জ্ঞানকে মানুষের জীবনে অর্থবহ করে তোলার মধ্যেও রয়েছে।

তাঁর জীবন তাই ভারতীয় নারী বিজ্ঞানীদের ইতিহাসে শুধু একটি ‘প্রথম’-এর গল্প নয়। এটি বাধা অতিক্রম করে জ্ঞান অর্জন, সেই জ্ঞানকে সমাজের কাজে লাগানো এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করার গল্প।

আজ যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে, তখন কমলা সোহোনির মতো অগ্রদূতদের স্মরণ করা মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়—বিজ্ঞান যেন মানুষের জন্য কাজ করে, সেই আদর্শকেও নতুন করে মনে রাখা।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

শকুন্তলা পরাঞ্জপে: গণিত থেকে সমাজসংস্কার—এক বহুমুখী মহীয়সী নারীর জীবন।

একজন মানুষের পরিচয় কি কেবল একটি পেশায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে?

কেউ যদি একই জীবনে গণিত পড়েন, বিদেশে আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করেন, চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, সাহিত্য রচনা করেন, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে কাজ করেন এবং শেষ পর্যন্ত দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক সম্মান লাভ করেন—তাহলে তাঁর জীবনকে কোনও একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা কঠিন।

শকুন্তলা পরাঞ্জপে ছিলেন তেমনই এক ব্যতিক্রমী ভারতীয় নারী।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন ভারতীয় সমাজে নারীদের জন্য পেশা ও শিক্ষার সুযোগ আজকের তুলনায় অনেক সীমিত ছিল, তখন তিনি কেমব্রিজে গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরে জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সঙ্গে কাজ করেন। আবার অন্যদিকে অভিনয় করেন মারাঠি ও হিন্দি চলচ্চিত্রে, সাহিত্যচর্চা করেন এবং সমাজের পরিবার পরিকল্পনা ও নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন।

১৯৯১ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। সরকারি পুরস্কারের নথিতে তাঁর সম্মানের ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয় সমাজসেবা—পরিবার পরিকল্পনা

শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠা

শকুন্তলা পরাঞ্জপের জন্ম ১৭ জানুয়ারি ১৯০৬ সালে।

তাঁর বাবা ছিলেন বিশিষ্ট গণিতবিদ ও শিক্ষাবিদ স্যার আর. পি. পরাঞ্জপে। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘Senior Wrangler’ হওয়া প্রথম ভারতীয় হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি শিক্ষাবিদ, প্রশাসক ও কূটনীতিক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

এই পরিবেশে বড় হওয়ার ফলে শকুন্তলার সামনে ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা ও বৌদ্ধিক চর্চার দরজা খোলা ছিল।

কিন্তু পরিবারের শিক্ষাগত ঐতিহ্য অনুসরণ করাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। তিনি নিজের আগ্রহ ও চিন্তার জগৎকে ক্রমশ বিস্তৃত করেছিলেন।

কেমব্রিজে গণিতের ছাত্রী

শকুন্তলা পরাঞ্জপে কেমব্রিজের Newnham College-এ Mathematical Tripos নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯২৯ সালে সেখান থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরের বছর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা বিষয়ে ডিপ্লোমাও নেন।

আজকের দিনে বিদেশে পড়তে যাওয়া ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা অনেক। কিন্তু ১৯২০-এর দশকের ভারতীয় সমাজে একজন তরুণীর একা বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা।

বিশেষ করে গণিতের মতো একটি বিষয়, যা তখনও উচ্চশিক্ষায় পুরুষ-প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতো, সেখানে নিজের জায়গা তৈরি করা ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

কেমব্রিজের শিক্ষা তাঁর চিন্তাভাবনাকে আরও প্রসারিত করে। গণিত তাঁকে যুক্তি ও বিশ্লেষণের অভ্যাস দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর পরবর্তী জীবন দেখায়—তিনি নিজেকে কেবল গণিতের মধ্যে আটকে রাখেননি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় কাজ

শিক্ষাজীবনের পর শকুন্তলা পরাঞ্জপে জেনেভায় International Labour Organization বা ILO-এর সঙ্গে কাজ করেন। ১৯৩০-এর দশকে তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাটে।

একজন ভারতীয় নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করে।

দেশের বাইরে কাজ করার ফলে তিনি বিভিন্ন দেশের সমাজব্যবস্থা, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং সামাজিক সমস্যাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান।

এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তাঁর সমাজকর্মের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছিল।

অভিনয়ের জগতে প্রবেশ

শকুন্তলা পরাঞ্জপের জীবনকে আকর্ষণীয় করে তোলার অন্যতম কারণ তাঁর অভিনয়জীবন।

গণিতের ছাত্রী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মী হওয়ার পাশাপাশি তিনি ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে মারাঠি এবং হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ছিল Sairandhri, Duniya Na Mane, Kunku, Stree, Ramshastri প্রভৃতি।

বিশেষ করে ভি. শান্তারামের Duniya Na Mane চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পরিচিত করে।

চলচ্চিত্র তখন ভারতের জন্য নতুন ও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি মাধ্যম। সেই সময়ে কোনও শিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণীর চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সিদ্ধান্তও ছিল বেশ ব্যতিক্রমী।

কিন্তু শকুন্তলা নিজের জীবনের কোনও একটি পরিচয়কে অন্য পরিচয়ের বাধা হতে দেননি।

শিল্পের পাশাপাশি সমাজের প্রশ্ন

চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও ধীরে ধীরে তাঁর আগ্রহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার দিকে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হয়।

বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, নারীর স্বাস্থ্য এবং পরিবারে সচেতনতা—এই বিষয়গুলো তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৩০-এর দশকেই তিনি মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজ করেছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এটি সেই সময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

কারণ পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা তখন সামাজিকভাবে সহজ ছিল না। নারীস্বাস্থ্য, সন্তানসংখ্যা, জন্মের ব্যবধান—এসব বিষয় নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা সামাজিক সংকোচ ও ভুল ধারণা ছিল।

শকুন্তলা সেই নীরবতা ভাঙার চেষ্টা করেন।

পরিবার পরিকল্পনাকে শুধু সংখ্যার প্রশ্ন হিসেবে দেখেননি

শকুন্তলা পরাঞ্জপের সমাজকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।

তিনি পরিবার পরিকল্পনাকে শুধু জনসংখ্যা কমানোর একটি প্রশাসনিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার পরিবর্তে স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে ছিলেন।

পরবর্তী গবেষণায় তাঁর কাজের মূল্যায়নে দেখা যায়, তিনি পরিবার পরিকল্পনাকে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন এবং শুধু সংখ্যাগত লক্ষ্য পূরণের পরিবর্তে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনা করার ওপর জোর দিয়েছিলেন।

এই চিন্তাধারা তাঁর সময়ের তুলনায় যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কারণ কোনও সামাজিক কর্মসূচি সফল করতে হলে শুধু নীতি তৈরি করলেই হয় না—যাঁদের জন্য সেই নীতি, তাঁদের বাস্তব জীবনও বুঝতে হয়।

লেখক হিসেবেও সক্রিয়

শকুন্তলা শুধু বক্তৃতা বা সামাজিক কাজের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করেননি। তিনি লেখালেখিও করতেন।

তিনি মারাঠি ও ইংরেজি ভাষায় বিভিন্ন ধরনের লেখা প্রকাশ করেন। তাঁর বইয়ের মধ্যে ছিল Three Years in Australia এবং Sense and Nonsense। এছাড়াও তিনি নাটক, গল্প, স্কেচ ও উপন্যাস লিখেছেন।

লেখালেখি তাঁর কাছে ছিল সমাজের সঙ্গে ভাবনার আদানপ্রদানের আরেকটি মাধ্যম।

চলচ্চিত্রে অভিনয়, সাহিত্যচর্চা এবং সমাজকর্ম—তিনটি ক্ষেত্রেই মানুষের জীবন ও সমাজের বিভিন্ন দিককে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা তাঁর কাজে প্রতিফলিত হয়েছিল।

জনজীবনে প্রবেশ

শকুন্তলা পরাঞ্জপে পরবর্তীকালে সক্রিয় জনজীবনেও প্রবেশ করেন।

১৯৫৮ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি মহারাষ্ট্র বিধান পরিষদের সদস্য ছিলেন। এরপর ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর জনজীবনের প্রধান পরিচয় ছিল দলীয় রাজনীতির প্রচলিত কাঠামোর বাইরে একজন সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

পরিবার পরিকল্পনা এবং সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নকে তিনি জনপরিসরে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন।

নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার সময়

আজ নারীর স্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক। কিন্তু শকুন্তলা যখন এসব বিষয়ে কাজ করছিলেন, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।

নারীর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক সংকোচের বিষয় ছিল।

এই পরিস্থিতিতে তিনি মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন, লেখালেখি করেছেন এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও নিজের মত তুলে ধরেছেন।

তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে তিনি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেও পিছিয়ে যাননি।

বিতর্কের মধ্যেও নিজের অবস্থান

শকুন্তলা পরাঞ্জপে সব বিষয়ে প্রচলিত মতের সঙ্গে একমত ছিলেন না।

পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর কিছু মতামত এবং নীতিগত অবস্থান সে সময় বিতর্কও তৈরি করেছিল। বিশেষত জনসংখ্যা, বিবাহের বয়স এবং রাষ্ট্রের পরিবার পরিকল্পনা নীতি নিয়ে তাঁর কিছু অবস্থান আজকের দৃষ্টিতে বিতর্কযোগ্য ও ঐতিহাসিকভাবে আলোচনার বিষয়।

একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে বুঝতে হলে তাঁর কাজের প্রশংসার পাশাপাশি সেই সময়ের বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতাকেও বিবেচনা করা জরুরি।

শকুন্তলার গুরুত্ব এখানেই যে তিনি সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে নীরব থাকেননি। নিজের সময়ের সমস্যাগুলো নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে মত দিয়েছেন এবং নীতিনির্ধারণের আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।

পদ্মভূষণ সম্মান

১৯৯১ সালে, তাঁর জীবনের শেষ পর্বে, ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে।

সরকারি পুরস্কারের নথিতে তাঁর নামের সঙ্গে ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয় Social Work—Family Planning

এই সম্মান তাঁর দীর্ঘ সামাজিক কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

একজন নারী, যিনি একসময় কেমব্রিজে গণিত পড়েছিলেন, পরে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছিলেন, চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সামাজিক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার মতো বিষয়কে নিজের কর্মক্ষেত্র বানিয়েছিলেন—তাঁর জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য সত্যিই বিরল।

পরবর্তী প্রজন্মেও তাঁর প্রভাব

শকুন্তলা পরাঞ্জপের মেয়ে সাই পরাঞ্জপে পরবর্তীকালে ভারতের পরিচিত চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হন।

ফলে পরাঞ্জপে পরিবারের সৃজনশীল ও বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মেও বহমান ছিল।

একদিকে গণিত ও শিক্ষার ঐতিহ্য, অন্যদিকে সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও সমাজচিন্তা—এই পরিবারে বিভিন্ন জগতের সংযোগ দেখা যায়।

শকুন্তলার নিজের জীবনও ছিল সেই বহুমাত্রিকতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

এক জীবনে এতগুলো পরিচয়

শকুন্তলা পরাঞ্জপের জীবনকে যদি কয়েকটি শব্দে ধরতে হয়, তাহলে বলা যায়—কৌতূহল, স্বাধীন চিন্তা এবং বহুমুখী কর্মজীবন

তিনি কেমব্রিজে গণিত পড়েছেন, কিন্তু গণিতের অধ্যাপক হননি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় কাজ করেছেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রশাসক হিসেবেই জীবন কাটাননি।

চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, কিন্তু অভিনেত্রী পরিচয়েই থেমে থাকেননি।

লেখালেখি করেছেন, কিন্তু শুধু লেখক হননি।

জনজীবনে থেকেছেন, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে সামাজিক সমস্যার প্রতি তাঁর দীর্ঘস্থায়ী আগ্রহ।

এই বহুমুখীতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

শেষ কথা

শকুন্তলা পরাঞ্জপের জীবন আমাদের সামনে এমন এক সময়ের ছবি তুলে ধরে, যখন একজন ভারতীয় নারীর সামনে পেশাগত ও সামাজিক বিকল্প আজকের তুলনায় অনেক কম ছিল।

কিন্তু তিনি নিজের জন্য একটির পর একটি নতুন দরজা খুলেছেন।

কেমব্রিজে গণিতের শিক্ষা থেকে জেনেভার আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্র, সেখান থেকে ভারতীয় চলচ্চিত্র, সাহিত্য এবং পরে পরিবার পরিকল্পনা ও সমাজসেবা—প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি নতুন কিছু শিখেছেন এবং নিজের কাজের ক্ষেত্র বদলেছেন।

তাঁর জীবন থেকে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা যায়—একজন মানুষের সামর্থ্যকে একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখার কোনও প্রয়োজন নেই।

কেউ গণিত ভালোবাসতে পারেন, আবার শিল্পেও আগ্রহী হতে পারেন। কেউ চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে পারেন, আবার সামাজিক সমস্যার সমাধান নিয়েও কাজ করতে পারেন। কেউ লেখক হতে পারেন, আবার জনজীবনে নীতিনির্ধারণের আলোচনায় অংশ নিতে পারেন।

শকুন্তলা পরাঞ্জপে সেই বহুমাত্রিক সম্ভাবনারই এক বিরল উদাহরণ।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো কোনও একটি বই, চলচ্চিত্র বা পদক নয়। বরং এই বার্তা—নিজের চিন্তাকে একটি সীমার মধ্যে বন্দি না করে, সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের জ্ঞান ও প্রতিভাকে নতুন কাজে ব্যবহার করাই একজন মানুষের প্রকৃত সৃষ্টিশীলতা।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

প্রফেসর রাজেশ্বরী চট্টার্জি: ভারতের মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির পথপ্রদর্শক এক মহীয়সী নারী।

আজ আমরা মোবাইল ফোনে কথা বলি, দূর থেকে টেলিভিশন দেখি, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য আদানপ্রদান করি, বিমান ও আবহাওয়ার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করি। রাডার, অ্যান্টেনা, বেতার যোগাযোগ—এই প্রযুক্তিগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে এগুলোর পেছনে থাকা বিজ্ঞানীদের কথা আমরা অনেক সময় ভাবিই না।

কিন্তু ভারতে যখন এই প্রযুক্তিগুলোর গবেষণা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে, তখন হাতে গোনা কয়েকজন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী নিজেদের পরিশ্রমে এই ক্ষেত্রের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রফেসর রাজেশ্বরী চট্টার্জি

তিনি ছিলেন ভারতের মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিং ও অ্যান্টেনা গবেষণার অন্যতম পথপ্রদর্শক। শুধু গবেষণাই নয়, শিক্ষকতা, গবেষণাগার গড়ে তোলা এবং নতুন প্রজন্মের প্রকৌশলী তৈরি—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স বা IISc-এর ইতিহাসেও তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়; তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম দিকের মহিলা প্রকৌশলী ও প্রথম মহিলা ফ্যাকাল্টি সদস্যদের একজন।

শিক্ষার পরিবেশ থেকেই শুরু

রাজেশ্বরী চট্টার্জির জন্ম ২৪ জানুয়ারি ১৯২২ সালে তৎকালীন মাইসোর রাজ্যের নঞ্জনগুড়ে। এমন এক সময়ে তাঁর জন্ম, যখন ভারতে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ আজকের তুলনায় অনেক সীমিত ছিল।

তবে তাঁর পরিবার শিক্ষার গুরুত্ব বুঝত। তাঁর ঠাকুমা কামলাম্মা দাসাপ্পা নিজেই ছিলেন শিক্ষার প্রসারে সক্রিয় একজন নারী। তিনি মহিলাদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পক্ষে কাজ করেছিলেন এবং একটি বিশেষ ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই শিক্ষামুখী পরিবেশ রাজেশ্বরীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—তিনি ভবিষ্যতে কী নিয়ে পড়াশোনা করবেন?

ইতিহাসের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বিজ্ঞানকে বেছে নেন।

গণিত ও পদার্থবিদ্যা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং

রাজেশ্বরী চট্টার্জি বেঙ্গালুরুর সেন্ট্রাল কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি গণিত ও পদার্থবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় তিনি মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। তাঁর মেধার স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন পুরস্কারও পান।

১৯৪৩ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে গবেষণার কাজে যোগ দেন। তখন তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়।

এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ সেই সময়ে ভারতে ইলেকট্রনিক্স ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এখনও বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে।

রাজেশ্বরী এমন একটি ক্ষেত্র বেছে নিয়েছিলেন, যার ভবিষ্যৎ তখনও পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত স্বাধীনতার দিকে এগোচ্ছিল। দেশের ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গড়ে তুলতে দক্ষ গবেষক তৈরির প্রয়োজন ছিল।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি সরকারি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। তিনি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি মাস্টার্স এবং পরে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর ডক্টরেট সম্পন্ন হয়।

বিদেশে যাওয়ার সেই যাত্রাও ছিল সহজ নয়। সে সময় ভারত থেকে একজন তরুণীর একা বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা ছিল যথেষ্ট বিরল ঘটনা।

কিন্তু রাজেশ্বরী সেই সুযোগকে শুধু নিজের শিক্ষার জন্য ব্যবহার করেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল দেশে ফিরে সেই জ্ঞান কাজে লাগানো।

দেশে ফিরে নতুন অধ্যায়

১৯৫৩ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করে রাজেশ্বরী চট্টার্জি ভারতে ফিরে আসেন এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে ফ্যাকাল্টি হিসেবে যোগ দেন। তিনি ইলেকট্রিক্যাল কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হন।

এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার অধ্যায়।

মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিং তখন ভারতে নতুন ক্ষেত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাডার ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মাইক্রোওয়েভের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছিল। কিন্তু ভারতে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো খুবই সীমিত ছিল।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি এবং তাঁর স্বামী, বিজ্ঞানী এস. কে. চট্টার্জি, মিলে সেই পরিস্থিতি বদলানোর উদ্যোগ নেন।

ভারতে মাইক্রোওয়েভ গবেষণাগার গড়ে তোলা

রাজেশ্বরী ও তাঁর স্বামী IISc-তে ভারতের প্রথম মাইক্রোওয়েভ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সরঞ্জাম তখন পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে অনেক যন্ত্র ও উপাদান দেশীয়ভাবে তৈরি করতে হয়েছিল।

আজকের অত্যাধুনিক গবেষণাগারের সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা করলে পার্থক্যটা সহজেই বোঝা যায়।

এখন কোনও গবেষক প্রয়োজনীয় যন্ত্র অনলাইনে বা বিশেষ সরবরাহকারীর কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু পঞ্চাশের দশকে ভারতে অনেক ক্ষেত্রেই গবেষকদের নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেদেরই করতে হতো।

রাজেশ্বরীর গবেষণাগার তাই শুধু একটি ল্যাবরেটরি ছিল না। সেটি ছিল ভারতের নতুন একটি প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রের প্রথম দিকের কর্মশালা।

মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি আসলে কী?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, মাইক্রোওয়েভ হল তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের একটি নির্দিষ্ট অংশ, যা যোগাযোগ, রাডার, স্যাটেলাইট এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়।

এই তরঙ্গ কীভাবে তৈরি হবে, কীভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবে, কীভাবে অ্যান্টেনা তা গ্রহণ বা প্রেরণ করবে—এসবই মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

রাজেশ্বরী চট্টার্জির গবেষণার সঙ্গে এই বিষয়গুলোর গভীর সম্পর্ক ছিল।

তিনি বিশেষভাবে অ্যান্টেনা, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তত্ত্ব এবং মাইক্রোওয়েভ ডিভাইস নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর কাজ পরবর্তীকালে রাডার ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

শুধু গবেষক নন, অসাধারণ শিক্ষক

রাজেশ্বরী চট্টার্জির অবদানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর শিক্ষকতা।

তিনি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক থিওরি, ইলেকট্রন টিউব সার্কিট, মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি এবং রেডিও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতেন।

তাঁর কাছে শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি ছিল না। তিনি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করেছিলেন যারা পরবর্তীকালে ভারতের ইলেকট্রনিক্স, রাডার ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করেন।

IISc-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় ২০ জন পিএইচডি গবেষককে গাইড করেছিলেন এবং ১০০-র বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর লেখা প্রযুক্তিগত বইয়ের সংখ্যাও ছিল একাধিক।

একজন গবেষকের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার অনেক সময় তাঁর নিজের আবিষ্কার নয়—তাঁর তৈরি করা পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকরা।

এই অর্থে রাজেশ্বরী চট্টার্জির প্রভাব তাঁর নিজের কর্মজীবনের অনেক পরে পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

অ্যান্টেনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ

রাজেশ্বরী চট্টার্জির অন্যতম পরিচিত কাজ ছিল অ্যান্টেনা প্রযুক্তি।

অ্যান্টেনা ছাড়া আধুনিক বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না। মোবাইল ফোন থেকে স্যাটেলাইট যোগাযোগ, রেডিও থেকে রাডার—বিভিন্ন প্রযুক্তির সঙ্গে অ্যান্টেনার সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি অ্যান্টেনা তত্ত্ব ও তার ব্যবহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন এবং এ বিষয়ে বইও লেখেন। তাঁর Antenna Theory and Practice বইটি দীর্ঘদিন ধরে প্রকৌশল শিক্ষায় পরিচিত একটি গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

তাঁর গবেষণা শুধু তাত্ত্বিক ছিল না। বাস্তব প্রযুক্তিতে কীভাবে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করা যায়, সেটিও ছিল তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্যাটেলাইট যোগাযোগের শিক্ষা

ভারতে যখন মহাকাশ ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল, তখন মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছিল।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি ও তাঁর সহকর্মীরা ষাটের দশকে মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ নিয়ে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। IISc-এর ঐতিহাসিক নথিতে এই উদ্যোগের উল্লেখ রয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ একটি নতুন প্রযুক্তি দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য শুধু গবেষণা যথেষ্ট নয়। সেই প্রযুক্তি শেখানোর জন্য শিক্ষক, পাঠ্যক্রম এবং গবেষণার পরিবেশও তৈরি করতে হয়।

রাজেশ্বরী এই তিন ক্ষেত্রেই কাজ করেছিলেন।

পুরুষ-প্রধান পরিবেশে এক নারী

তাঁর কর্মজীবনের শুরুতে ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তির ক্ষেত্র ছিল অত্যন্ত পুরুষ-প্রধান।

IISc-এর ইলেকট্রিক্যাল কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে তিনি দীর্ঘ সময় একমাত্র মহিলা হিসেবে কাজ করেছিলেন।

একজন নারী গবেষক হিসেবে তাঁকে শুধু নিজের গবেষণার মান প্রমাণ করলেই চলত না; একই সঙ্গে তাঁকে প্রতিষ্ঠানের ভিতরেও নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়েছিল।

তিনি সেই কাজ করেছেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে।

পরবর্তীকালে তিনি ওই বিভাগের নেতৃত্বের দায়িত্বও পালন করেন এবং ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বিভাগটির চেয়ারপারসন ছিলেন।

গবেষণার স্বীকৃতি

রাজেশ্বরী চট্টার্জির গবেষণা ও শিক্ষাদানের জন্য তিনি একাধিক পুরস্কার লাভ করেন।

এর মধ্যে ছিল Mountbatten Prize, J. C. Bose Memorial Prize এবং Ramlal Wadhwa Award

২০১৭ সালে ভারতের নারী ও শিশুবিকাশ মন্ত্রক তাঁকে মরণোত্তর ‘First Women Achievers of India’-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

তবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হয়তো এই পুরস্কারগুলোর বাইরেই।

ভারতে মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি গবেষণাগার দাঁড় করানো, নতুন প্রকৌশলী তৈরি করা এবং অ্যান্টেনা প্রযুক্তির ভিত্তি শক্ত করা—এই কাজগুলোই তাঁর স্থায়ী উত্তরাধিকার।

অবসরের পরেও থেমে থাকেননি

১৯৮২ সালে IISc থেকে অবসর নেওয়ার পরও রাজেশ্বরী চট্টার্জি সক্রিয় ছিলেন। তিনি নারী অধিকার ও নারীশিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। Indian Association for Women’s Studies-এর মতো সংগঠনের কাজেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল।

অর্থাৎ প্রযুক্তির জগত থেকে অবসর নেওয়ার পরও সমাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ শেষ হয়ে যায়নি।

বিজ্ঞান তাঁকে যে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিল, সামাজিক জীবনেও সেই অনুসন্ধিৎসা বজায় ছিল।

একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণা

রাজেশ্বরী চট্টার্জির জীবন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তরুণীদের জন্য, যারা ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রযুক্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চায়।

তিনি দেখিয়েছেন, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রবেশ করার জন্য শুধু মেধা নয়—প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অধ্যবসায়।

একটি নতুন বিষয় শিখতে হবে, বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে হবে, দেশে ফিরে গবেষণাগার তৈরি করতে হবে, নতুন ছাত্রছাত্রীকে শেখাতে হবে—এই পুরো যাত্রাটাই তিনি সম্পন্ন করেছিলেন।

তাঁর জীবনের বিশেষত্ব ছিল তিনি শুধু নিজের জন্য দরজা খুলে থেমে থাকেননি। তাঁর পরের প্রজন্ম যাতে সেই দরজা দিয়ে আরও সহজে প্রবেশ করতে পারে, সেই ব্যবস্থাও তৈরি করেছিলেন।

শেষ কথা

প্রফেসর রাজেশ্বরী চট্টার্জির জীবন ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তিনি এমন সময়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এসেছিলেন, যখন এই ক্ষেত্র ছিল পুরুষ-প্রধান এবং গবেষণার পরিকাঠামো ছিল সীমিত। তবুও তিনি পিছিয়ে যাননি।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে দেশে ফিরে তিনি ভারতের মাইক্রোওয়েভ গবেষণার প্রাথমিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। অ্যান্টেনা প্রযুক্তি ও তড়িৎচুম্বকীয় গবেষণায় অবদান রাখেন। শিক্ষক হিসেবে বহু গবেষককে তৈরি করেন। বই লেখেন, গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন এবং পরবর্তীকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাবিভাগের নেতৃত্বও দেন।

তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় দিক হল—তিনি এমন একটি ভবিষ্যতের জন্য কাজ করেছিলেন, যার পূর্ণ রূপ হয়তো তাঁর কর্মজীবনের শুরুতে কল্পনাও করা কঠিন ছিল।

আজকের বেতার যোগাযোগ, রাডার ও অ্যান্টেনা প্রযুক্তির বিশাল জগতের দিকে তাকালে সেই অগ্রদূতদের কথা মনে পড়ে, যাঁরা সীমিত সুযোগের মধ্যে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি তাঁদেরই একজন—যিনি প্রমাণ করেছিলেন, নতুন প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ তৈরি করতে কখনও কখনও একজন মানুষের সাহসী প্রথম পদক্ষেপই যথেষ্ট।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ রিভিউ

শান্তা সিনহা: শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে লড়াই করে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার এক মহীয়সী নারী।

একটি শিশুর হাতে বই থাকার কথা, কাজের সরঞ্জাম নয়। তার সময় কাটার কথা স্কুলের শ্রেণিকক্ষে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলায়, নতুন কিছু শেখার আনন্দে। কিন্তু বাস্তব পৃথিবীতে বহু শিশু দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য এবং পারিবারিক সংকটের কারণে অল্প বয়সেই শ্রমের জগতে প্রবেশ করে।

এই বাস্তবতাকে বদলানোর লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন শান্তা সিনহা। শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন এবং প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর কাজ ভারতের সামাজিক উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তিনি দেখিয়েছেন, শিশুশ্রমকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষা, দারিদ্র্য, সামাজিক মনোভাব, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং শিশুদের অধিকার।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

শান্তা সিনহা উচ্চশিক্ষিত পরিবার ও একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষায় গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন।

তিনি হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ও গবেষণার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু হলেও পরবর্তীকালে তাঁর কাজের একটি বড় অংশ চলে যায় শিশুদের অধিকার ও শিক্ষার আন্দোলনের দিকে।

এই পরিবর্তন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

মাঠে নেমে সমস্যাকে দেখা

শিশুশ্রম সম্পর্কে বই পড়ে বা পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে সমস্যাটি বোঝা যায়, কিন্তু বাস্তবে একটি শিশু কেন স্কুলে যাচ্ছে না—তার উত্তর অনেক সময় পাওয়া যায় গ্রামের মানুষের জীবনের মধ্যে।

শান্তা সিনহা সেই বাস্তবতাকে কাছ থেকে দেখার দিকে গুরুত্ব দেন।

তিনি বুঝতে পারেন, দরিদ্র পরিবারের শিশু যদি স্কুলের পরিবর্তে কাজ করতে যায়, তাহলে শুধু পরিবারকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা, স্কুলের পরিবেশ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের ধারণা—সবকিছুর সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত।

এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর সামাজিক কাজের ভিত্তি তৈরি হয়।

এমভি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজ

শান্তা সিনহার নাম সবচেয়ে বেশি যুক্ত MV Foundation-এর সঙ্গে। অন্ধ্রপ্রদেশের রঙ্গা রেড্ডি অঞ্চলে এই সংগঠন শিশুদের শ্রম থেকে বের করে এনে শিক্ষার আওতায় আনার জন্য কাজ করে।

এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল—শিশুর জন্য ‘কাজ’কে স্বাভাবিক বা অপরিহার্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে তার শিক্ষার অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

শিশুশ্রমের সঙ্গে লড়াই করতে হলে শুধু একটি শিশুকে কাজ থেকে সরিয়ে আনলেই হয় না। তাকে স্কুলে ভর্তি করতে হয়, পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করতে হয় এবং পরিবার ও সমাজকে বোঝাতে হয় কেন শিশুর শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

এই সামগ্রিক পদ্ধতিই আন্দোলনটিকে আলাদা মাত্রা দেয়।

‘শিশু শ্রমিক’ নয়, ‘শিশু’

শান্তা সিনহার কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শিশুকে প্রথমে একজন মানুষ ও শিক্ষার্থী হিসেবে দেখা।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ সীমিত হয়ে যাবে—এই ধারণাকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন।

একটি শিশু যদি দীর্ঘদিন শ্রমে যুক্ত থাকে, তাহলে তার স্কুলে ফেরার পথ কঠিন হতে পারে। তাই অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত করার জন্য বিশেষ প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়।

এই উদ্দেশ্যে সেতুশিক্ষা বা বিশেষ শিক্ষাকেন্দ্রের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

স্কুলে ফেরার পথ

শিশুশ্রম থেকে একটি শিশুকে উদ্ধার করার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তার পর কী?

শুধু কাজ বন্ধ করলেই শিশুর জীবন স্বাভাবিক হয়ে যায় না। তার পড়াশোনার ঘাটতি থাকতে পারে, বয়স অনুযায়ী শ্রেণিতে বসতে অসুবিধা হতে পারে এবং দীর্ঘদিনের শ্রমজীবনের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসাও সহজ নয়।

তাই শিশুদের ধীরে ধীরে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় নিয়ে আসার জন্য বিশেষ প্রস্তুতি দরকার।

MV Foundation-এর কাজের মধ্যে এই ধরনের উদ্যোগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজের মানসিকতা বদলানো

শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে আইন থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র আইন দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমাজে যদি ধারণা থাকে যে দরিদ্র পরিবারের শিশুর কাজ করাই স্বাভাবিক, তাহলে শিশুশ্রমের প্রবণতা বজায় থাকতে পারে।

শান্তা সিনহার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এই সামাজিক ধারণার পরিবর্তন।

গ্রামের পরিবার, শিক্ষক, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

কারণ একটি শিশুকে স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত শুধু তার বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত নয়; অনেক সময় পুরো সমাজের মানসিকতা সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

মেয়েশিশুদের শিক্ষা

শিশুশ্রমের সমস্যা ছেলে ও মেয়ে—উভয় শিশুর ক্ষেত্রেই দেখা যায়। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাড়ির কাজ, ছোট ভাইবোনের দেখাশোনা এবং অল্প বয়সে বিয়ের মতো সামাজিক চাপও শিক্ষার পথে বাধা তৈরি করতে পারে।

তাই মেয়েশিশুদের স্কুলে ধরে রাখার জন্য পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি।

শান্তা সিনহার কাজের বৃহত্তর পরিসরে শিশুদের সমান শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯৯৮ সালের র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার

শিশুদের অধিকার ও শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৯৮ সালে শান্তা সিনহা র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার পান কমিউনিটি লিডারশিপের জন্য।

এই পুরস্কার তাঁর কাজকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে।

তবে তাঁর আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল পুরস্কার নয়—স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ।

তিনি যে মডেলকে এগিয়ে নিয়েছিলেন, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল সাধারণ মানুষকে সমস্যার সমাধানের অংশীদার করা।

জাতীয় স্তরে শিশু অধিকার

পরবর্তীকালে শান্তা সিনহা ভারতের National Commission for Protection of Child Rights (NCPCR)-এর প্রথম চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই দায়িত্বের মাধ্যমে শিশুদের অধিকার নিয়ে তাঁর কাজ আরও বৃহত্তর জাতীয় পরিসরে পৌঁছায়।

শিশুর শিক্ষা, সুরক্ষা, শিশুশ্রম, নির্যাতন এবং শিশুদের মৌলিক অধিকার—এসব বিষয় জাতীয় স্তরে নীতিগত আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একজন মাঠপর্যায়ের কর্মী হিসেবে যে অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, তা এই বৃহত্তর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে সমাজকর্মী

শান্তা সিনহার জীবনের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো তাঁর পরিচয়ের বৈচিত্র্য।

তিনি একদিকে ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক ও গবেষক, অন্যদিকে শিশু অধিকার আন্দোলনের কর্মী।

এই দুটি জগতকে তিনি একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি।

ইতিহাস আমাদের শেখায় সমাজ কীভাবে পরিবর্তিত হয়। আর সামাজিক কাজ সেই পরিবর্তনকে বাস্তব জীবনে নিয়ে আসে।

তাঁর কর্মজীবনে এই দুই অভিজ্ঞতার সমন্বয় দেখা যায়।

গ্রামকে পরিবর্তনের অংশীদার করা

শিশুদের শিক্ষার প্রশ্নে বাইরে থেকে কোনো প্রকল্প নিয়ে এসে কয়েক বছর কাজ করলেই স্থায়ী পরিবর্তন আসে না।

পরিবারকে বোঝানো, স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করা, স্কুলকে সক্রিয় করা এবং শিশুদের শিক্ষার জন্য সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা—এই সবকিছুর সমন্বয় দরকার।

শান্তা সিনহার কাজের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এই স্থানীয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব।

এতে মানুষ শুধু সাহায্য গ্রহণকারী থাকে না; বরং নিজের এলাকার সমস্যার সমাধানে অংশীদার হয়ে ওঠে।

শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা

একজন শিশুকে স্কুলে পাঠানো মানে শুধু তাকে অক্ষরজ্ঞান দেওয়া নয়। শিক্ষা তার ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন সে বন্ধু তৈরি করে, নিজের মত প্রকাশ করতে শেখে, পৃথিবী সম্পর্কে জানতে পারে এবং ভবিষ্যতে নিজের পেশা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়।

অন্যদিকে অল্প বয়সে শ্রমে প্রবেশ করলে সেই সম্ভাবনাগুলি সংকুচিত হতে পারে।

এই কারণেই শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে লড়াইকে তিনি শিক্ষার অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

শান্তা সিনহার জীবন থেকে একটি বড় শিক্ষা হলো—সমাজের কোনো সমস্যাকে বদলাতে হলে সমস্যাটিকে তার মূল কারণসহ বুঝতে হয়।

শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে কাজ মানে শুধু কারখানা বা দোকান থেকে শিশুকে সরিয়ে দেওয়া নয়। তার পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, স্কুলের সুযোগ এবং সামাজিক মানসিকতাকেও বিবেচনা করতে হয়।

একই সঙ্গে দরকার দীর্ঘমেয়াদি কাজ।

একটি শিশুর জীবন বদলানোর কাজ রাতারাতি হয় না। শিক্ষা একটি ধীর প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই ধীর পরিবর্তনের ফল বহু বছর ধরে একটি শিশুর জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।

একটি বৃহত্তর সামাজিক উত্তরাধিকার

শান্তা সিনহার কাজ ভারতের শিশু অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

তিনি দেখিয়েছেন, একজন শিক্ষাবিদও চাইলে শ্রেণিকক্ষের বাইরের সমাজে গভীর পরিবর্তনের কাজে যুক্ত হতে পারেন।

তাঁর উদ্যোগের মাধ্যমে যে সামাজিক আন্দোলন তৈরি হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল শিশুদের কাজের জগৎ থেকে শিক্ষার জগতে নিয়ে আসা এবং শিশুদের ভবিষ্যৎকে তাদের অধিকার হিসেবে দেখা।

উপসংহার

শান্তা সিনহার জীবন আমাদের সামনে এমন এক সংগ্রামের ছবি তুলে ধরে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি খুব সাধারণ কিন্তু গভীর প্রশ্ন—একটি শিশুর শৈশবের অধিকার কি তার পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে হারিয়ে যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং শিশু অধিকারকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করেছেন।

একজন ইতিহাসের অধ্যাপক থেকে শিশু অধিকার আন্দোলনের কর্মী, তারপর জাতীয় স্তরে শিশু সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব—তাঁর পথচলা ছিল বহুমাত্রিক।

র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার তাঁর কাজকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সেইসব শিশুদের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত, যারা শ্রমের বদলে স্কুলের পথে হাঁটার সুযোগ পেয়েছে।

শান্তা সিনহার জীবন মনে করিয়ে দেয়—সমাজ পরিবর্তনের কাজ সব সময় বড় কোনো স্লোগান দিয়ে শুরু হয় না। কখনও তা শুরু হয় একটি শিশুকে বই হাতে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। আর সেই ছোট পদক্ষেপই একদিন একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ রিভিউ

ড. নীনা গুপ্ত: জটিল গণিতের জগতে ভারতীয় এক অসাধারণ নারী।

গণিতকে অনেকেই কঠিন, শুষ্ক কিংবা শুধুই সংখ্যার হিসাব বলে মনে করেন। কিন্তু গণিতের গভীরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, এটি আসলে যুক্তি, কল্পনা, ধৈর্য এবং নতুন সত্য আবিষ্কারের এক অসীম জগৎ। সেই জগতে নিজের অসাধারণ গবেষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরি করেছেন ভারতীয় গণিতবিদ ড. নীনা গুপ্ত।

কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী কমিউটেটিভ অ্যালজেব্রা এবং অ্যাফাইন অ্যালজেব্রিক জিওমেট্রির মতো জটিল বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল বহুদিনের একটি গাণিতিক সমস্যা—‘জারিস্কি ক্যানসেলেশন প্রবলেম’। এই গবেষণার জন্য তিনি ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শাস্তি স্বরূপ ভাটনাগর পুরস্কার লাভ করেন।

ছোটবেলা থেকেই গণিতের প্রতি আকর্ষণ

১৯৮৪ সালে কলকাতায় জন্ম নীনা গুপ্তের। ছোটবেলা থেকেই গণিতের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। অন্য অনেকের কাছে যে বিষয়টি কঠিন বলে মনে হতে পারে, নীনার কাছে সেটিই হয়ে উঠেছিল চিন্তা করার এক আনন্দময় মাধ্যম।

তিনি কলকাতার বেথুন কলেজে গণিতে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে গণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে গণিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে একই প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল বীজগণিতের অত্যন্ত বিশেষায়িত একটি ক্ষেত্র।

এই পথটি সহজ ছিল না। গণিতের গবেষণায় অনেক সময় একটি সমস্যার সমাধান খুঁজতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। একটি ছোট সূত্রের পেছনেও থাকতে পারে অসংখ্য হিসাব, যুক্তি ও ব্যর্থ প্রচেষ্টা। নীনা গুপ্ত সেই দীর্ঘ গবেষণার পথেই নিজের জায়গা তৈরি করেন।

যে সমস্যার সঙ্গে যুক্ত তাঁর নাম

নীনা গুপ্তের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে ‘জারিস্কি ক্যানসেলেশন প্রবলেম’-এর সঙ্গে যুক্ত গবেষণার কারণে।

সহজভাবে বললে, এই সমস্যাটি জানতে চায়—দুটি গাণিতিক বস্তুর সঙ্গে একই ধরনের একটি অতিরিক্ত অংশ যোগ করার পর যদি তারা সমান বা একই রকম হয়ে যায়, তাহলে মূল দুটি বস্তুকেও কি অবশ্যই একই রকম হতে হবে?

প্রশ্নটি শুনতে সরল মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে উচ্চতর বীজগণিত ও জ্যামিতির গভীর তত্ত্ব। বিখ্যাত গণিতবিদ অস্কার জারিস্কি ১৯৪৯ সালে সমস্যাটির একটি রূপ উত্থাপন করেছিলেন। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন গণিতবিদ এই সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করেছেন।

এই দীর্ঘ গবেষণার ধারায় নীনা গুপ্তের কাজ বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে ধনাত্মক characteristic-এর ক্ষেত্রে অ্যাফাইন স্পেস সম্পর্কিত সমস্যাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ counterexample তাঁর গবেষণায় সামনে আসে।

গবেষণার জগতে নিজের পরিচয়

ডক্টরেট শেষ করার পর নীনা গুপ্ত গবেষণার জগতে আরও গভীরভাবে যুক্ত হন। তিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কাজ করেন এবং টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চেও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যান্ড ম্যাথমেটিক্যাল ইউনিটে অধ্যাপনা ও গবেষণার দায়িত্ব পালন করেন।

গবেষণার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের গণিতের প্রতি আগ্রহী করে তোলাও তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ একটি দেশের বিজ্ঞানচর্চা শুধু একজন গবেষকের সাফল্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। নতুন গবেষক তৈরি করাও সেই ধারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একের পর এক সম্মান

নীনা গুপ্তের গবেষণার স্বীকৃতি এসেছে দেশ ও বিদেশ—দুই ক্ষেত্রেই।

২০১৪ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির ইয়ং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড পান। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে গণিতের ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ গবেষণার জন্য তিনি শাস্তি স্বরূপ ভাটনাগর পুরস্কারে সম্মানিত হন। সরকারি পুরস্কার-তথ্য অনুযায়ী, তাঁর কাজের মধ্যে জারিস্কি ক্যানসেলেশন প্রবলেম এবং অ্যাফাইন স্পেসে গ্রুপ অ্যাকশনের invariants সম্পর্কিত গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

২০২১ সালের জন্য তিনি উন্নয়নশীল দেশের তরুণ গণিতবিদদের দেওয়া DST-ICTP-IMU Ramanujan Prize-ও লাভ করেন। গণিতের আন্তর্জাতিক পরিসরে এই সম্মান তাঁর গবেষণার গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—তাঁর সাফল্যের ভিত্তি কোনও জনপ্রিয় প্রচার নয়, বরং বহু বছরের গভীর গবেষণা ও কঠিন গাণিতিক সমস্যার সমাধানের চেষ্টা।

গণিতের মতো কঠিন ক্ষেত্রেও নারীর জায়গা

বিজ্ঞান ও গণিতের উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ আজ অনেক বেড়েছে। কিন্তু কয়েক দশক আগেও পরিস্থিতি এতটা সহজ ছিল না। এখনও অনেক পরিবারে মেয়েদের পেশা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণার প্রভাব দেখা যায়।

নীনা গুপ্তের পথটি সেই প্রচলিত ধারণার বাইরে যাওয়ার একটি উদাহরণ।

তিনি দেখিয়েছেন, কোনও নির্দিষ্ট পেশা বা গবেষণাক্ষেত্রকে শুধু পুরুষদের জন্য উপযুক্ত বলে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। একজন নারীও অত্যন্ত বিমূর্ত ও জটিল গণিতের সমস্যাকে নিজের গবেষণার বিষয় করতে পারেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার স্বীকৃতি অর্জন করতে পারেন।

সাফল্যের আড়ালে দীর্ঘ অধ্যবসায়

একজন গবেষকের সাফল্যের গল্প সাধারণত পুরস্কার পাওয়ার মুহূর্ত দিয়ে বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে একটি পুরস্কারের পিছনে থাকে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম।

গণিতের গবেষণায় উত্তর সবসময় চোখের সামনে থাকে না। অনেক সময় একটি সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে গবেষককে বারবার নিজের ধারণা পরীক্ষা করতে হয়। কোনও অনুমান ভুল হলে আবার শুরু করতে হয়। একটি প্রমাণের সামান্য ত্রুটিও পুরো যুক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

নীনা গুপ্তের গবেষণাজীবন সেই ধৈর্যেরই প্রতিফলন। তাঁর কাজের ক্ষেত্র ছিল এমন একটি উচ্চতর গণিতের অঞ্চল, যেখানে সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়গুলো হয়তো দুর্বোধ্য। কিন্তু সেই কঠিন জগতেই তিনি নতুন ফলাফল সামনে এনেছেন।

কলকাতার মাটিতে আন্তর্জাতিক গণিতচর্চা

নীনা গুপ্তের জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল তাঁর কলকাতার সঙ্গে সম্পর্ক। বেথুন কলেজ থেকে শুরু করে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট—শিক্ষা ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই শহরের নাম।

কলকাতা বহুদিন ধরেই বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই শহর থেকেই আন্তর্জাতিক গণিতের অঙ্গনে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন নীনা গুপ্ত।

এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি ভারতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যেও যে বিশ্বমানের গবেষণা সম্ভব, তার একটি উদাহরণ।

তরুণ প্রজন্মের জন্য বার্তা

নীনা গুপ্তের জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—কঠিন কোনও বিষয়কে ভয় না পাওয়া।

গণিত কঠিন হতে পারে। গবেষণা দীর্ঘ হতে পারে। সাফল্য পেতে সময় লাগতে পারে। কিন্তু কোনও বিষয়কে ভালোবেসে তার গভীরে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে সেই কঠিন পথও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আজকের ছাত্রছাত্রীরা যখন দ্রুত ফল পাওয়ার প্রত্যাশায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, তখন গবেষণার মতো ক্ষেত্র তাদের অন্যরকম একটি শিক্ষা দেয়—কিছু আবিষ্কার দ্রুত হয় না। কিছু প্রশ্নের উত্তর পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।

নীনা গুপ্তের পথ সেই ধৈর্যের উদাহরণ।

পুরস্কারের থেকেও বড় একটি পরিচয়

একজন বিজ্ঞানীর পরিচয় শুধু তাঁর পাওয়া পুরস্কারের তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় তিনি কোন প্রশ্ন নিয়ে ভেবেছেন, কী নতুন জ্ঞান তৈরি করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী রেখে গেছেন—তার মাধ্যমে।

নীনা গুপ্তের গবেষণা উচ্চতর গণিতের এমন একটি ক্ষেত্রে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি দৃশ্যমানভাবে যুক্ত নয়। তবুও মৌলিক বিজ্ঞানের গুরুত্ব এখানেই—আজকের তাত্ত্বিক গবেষণাই ভবিষ্যতের বহু জ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

শেষ কথা

ড. নীনা গুপ্তের গল্প কোনও রূপকথার গল্প নয়। এটি অধ্যবসায়, কৌতূহল এবং জ্ঞানের প্রতি গভীর ভালোবাসার গল্প।

কলকাতার এক তরুণী গণিতের প্রতি আগ্রহ থেকে ধীরে ধীরে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথে এগিয়ে গেলেন। তারপর এমন এক জটিল গাণিতিক সমস্যার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেন, যা বহু বছর ধরে বিশ্বের গণিতবিদদের ভাবিয়েছে। তাঁর গবেষণা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পেল।

এই কারণেই নীনা গুপ্তের জীবন কেবল একজন গণিতবিদের জীবনী নয়। এটি সেইসব তরুণ-তরুণীর জন্য একটি অনুপ্রেরণার গল্প, যারা কোনও কঠিন বিষয়কে ভালোবেসে তার গভীরে যেতে চায়।

সংখ্যার জগতে তাঁর কাজ হয়তো সবার কাছে সহজে বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁর পথের মূল কথাটি খুব সহজ—কঠিন প্রশ্নকে এড়িয়ে না গিয়ে, তার উত্তর খুঁজে যাওয়াই গবেষণার আসল শক্তি।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ

হোমাই ব্যারাওয়ালা: ক্যামেরায় ইতিহাস ধরে রাখা ভারতের প্রথম সারির মহিলা ফটোসাংবাদিক।

ইতিহাসের বইয়ে আমরা স্বাধীনতার কথা পড়ি, দেশভাগের কথা পড়ি, রাষ্ট্রনায়কদের কথা জানি। কিন্তু ইতিহাসের সেই মুহূর্তগুলো যদি চোখের সামনে ছবির মতো জীবন্ত হয়ে ওঠে, তার পেছনে থাকেন কিছু নীরব সাক্ষী। তাঁরা কথা বলেন না, বক্তৃতা দেন না—ক্যামেরার লেন্সের মাধ্যমে সময়কে ধরে রাখেন।

ভারতের ফটোসাংবাদিকতার ইতিহাসে এমনই এক অসাধারণ নাম হোমাই ব্যারাওয়ালা। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, যখন সংবাদপত্রের জগতে মহিলা ফটোসাংবাদিকের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিরল, তখন তিনি ক্যামেরা হাতে দেশের নানা ঐতিহাসিক মুহূর্তকে বন্দি করেছিলেন।

তাঁর তোলা ছবির মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতার সময়কার দিল্লি, দেশের প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতাদের নানা মুহূর্ত, বিদেশি রাষ্ট্রনায়কদের ভারত সফর এবং সাধারণ জীবনের বহু দৃশ্য। তাঁর ছবিগুলো শুধু সংবাদচিত্র ছিল না—সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের দৃশ্যমান দলিল হয়ে উঠেছিল।

শৈশব থেকেই অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি

হোমাই ব্যারাওয়ালার জন্ম ৯ ডিসেম্বর ১৯১৩ সালে গুজরাটের নাভসারিতে। তাঁর পরিবার ছিল পারসি সম্প্রদায়ভুক্ত। ছোটবেলায় তিনি মুম্বইয়ে বড় হয়ে ওঠেন।

সে সময় ভারতের সমাজব্যবস্থা আজকের মতো ছিল না। বিশেষ করে কোনও তরুণীর হাতে ক্যামেরা দেখে মানুষের কৌতূহল তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল।

কিন্তু হোমাইয়ের কাছে ক্যামেরা ছিল শুধু ছবি তোলার যন্ত্র নয়। তিনি মানুষের জীবন, শহরের পরিবর্তন, সামাজিক পরিবেশ এবং ঘটনাগুলোকে নিজের চোখে দেখতেন। সেই দেখার ক্ষমতাই ধীরে ধীরে তাঁকে একজন দক্ষ ফটোগ্রাফারে পরিণত করে।

ছাত্রজীবনেই ক্যামেরার সঙ্গে পরিচয়

হোমাই ব্যারাওয়ালা মুম্বইয়ের জে. জে. স্কুল অব আর্টে পড়াশোনা করেন। সেখানেই তাঁর ফটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহ আরও গভীর হয়।

তাঁর স্বামী মানেকশ’ ব্যারাওয়ালাও ফটোগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কাছ থেকেও হোমাই ফটোগ্রাফির প্রযুক্তিগত দিক সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছিলেন।

কিন্তু একজন মহিলা হিসেবে পেশাদার ফটোগ্রাফির জগতে নিজের জায়গা তৈরি করা সহজ ছিল না।

তখন ক্যামেরা, ফিল্ম, ডার্করুম—সবই ছিল তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল এবং পরিশ্রমসাধ্য। তার ওপর সংবাদক্ষেত্রে একজন মহিলা ফটোগ্রাফারকে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে চাইতেন না।

হোমাই সেই বাধাকে নিজের কাজ দিয়ে অতিক্রম করেন।

প্রথম ছবির পেছনে একটি ছোট ঘটনা

হোমাই ব্যারাওয়ালার ফটোগ্রাফির প্রথম দিকের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে মুম্বইয়ে। একবার একটি কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে ছবি তোলার সুযোগ পান তিনি।

সেখানে তিনি এমন কিছু ছবি তোলেন, যা পরে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

ছবি প্রকাশিত হলেও পারিশ্রমিক ছিল অত্যন্ত কম। কিন্তু সেই অর্থের চেয়েও বড় ছিল স্বীকৃতি—তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর তোলা ছবিও সংবাদপত্রে জায়গা করে নিতে পারে।

এই ছোট সুযোগই পরবর্তীকালে তাঁর পেশাগত জীবনের দরজা খুলে দেয়।

দিল্লিতে নতুন অধ্যায়

পরে হোমাই ব্যারাওয়ালা দিল্লিতে চলে যান। স্বাধীনতার সময় এবং স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলোতে দিল্লিই হয়ে ওঠে তাঁর কর্মজগতের প্রধান কেন্দ্র।

দিল্লিতে তখন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছে। নতুন রাষ্ট্রের প্রশাসন গড়ে উঠছে, বিদেশি রাষ্ট্রনায়কেরা ভারতে আসছেন, দেশের প্রথম প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

এই পরিবর্তনশীল সময়কে ক্যামেরায় ধরে রাখেন হোমাই।

তিনি বিভিন্ন সংবাদসংস্থা ও সরকারি তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করেন। তাঁর পেশাগত জীবনে ব্রিটিশ তথ্য দপ্তর এবং পরে স্বাধীন ভারতের সরকারি তথ্য ও প্রচার ব্যবস্থার সঙ্গেও তাঁর কাজের সম্পর্ক তৈরি হয়।

স্বাধীনতার মুহূর্তের সাক্ষী

ভারতের স্বাধীনতা হোমাই ব্যারাওয়ালার ক্যামেরায় ধরা পড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলোর একটি।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দিল্লিতে স্বাধীনতার উদযাপন, লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম দিকের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোর বহু দৃশ্য তিনি ক্যামেরাবন্দি করেন।

তাঁর ছবিগুলো আমাদের সেই সময়ের পরিবেশকে শুধু তথ্য হিসেবে নয়, দৃশ্য হিসেবে অনুভব করার সুযোগ দেয়।

একটি ছবিতে মানুষের ভিড়, অন্যটিতে রাষ্ট্রনেতাদের উপস্থিতি, কোথাও আবার সাধারণ মানুষের মুখ—এই সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল স্বাধীনতার সময়কার ভারতের একটি দৃশ্যমান চিত্র।

গান্ধীজির শেষযাত্রা

হোমাই ব্যারাওয়ালার তোলা ঐতিহাসিক ছবিগুলোর মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর শেষযাত্রার ছবিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে গান্ধীজির হত্যার পর তাঁর শেষযাত্রায় মানুষের যে বিশাল সমাগম হয়েছিল, সেটি ছিল স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাবিধুর মুহূর্ত।

সেই শোকাবহ দৃশ্যও হোমাইয়ের ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায়, একজন ফটোসাংবাদিক শুধু ঘটনাকে অনুসরণ করেন না—কখনও কখনও তিনি এমন এক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে যান, যার গুরুত্ব কয়েক দশক পর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নেহরু থেকে বিদেশি রাষ্ট্রনায়ক

হোমাই ব্যারাওয়ালা স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বহু ছবি তুলেছিলেন।

নেহরুকে শুধু আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে নয়, তুলনামূলক স্বাভাবিক মুহূর্তেও তাঁর ক্যামেরায় দেখা যায়।

এছাড়া ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকারী বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভারত সফরের ছবিও তিনি তুলেছেন।

১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে দিল্লির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জীবনের যে দৃশ্য আমরা আজ ঐতিহাসিক নথি হিসেবে দেখি, তার একটি অংশ তৈরি হয়েছে হোমাইয়ের মতো ফটোসাংবাদিকদের কাজের মাধ্যমে।

শুধু রাজনীতি নয়

হোমাইয়ের কাজকে শুধু রাষ্ট্রনেতাদের ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে ভুল হবে।

তিনি সাধারণ মানুষের জীবনও ক্যামেরায় ধরেছেন। দিল্লির রাস্তা, সামাজিক অনুষ্ঠান, শিশু, মানুষের দৈনন্দিন জীবন—বিভিন্ন ধরনের দৃশ্য তাঁর ফটোগ্রাফিতে উঠে এসেছে।

এই বৈচিত্র্যই তাঁর কাজকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

কারণ একটি দেশের ইতিহাস শুধু প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা মন্ত্রীদের ইতিহাস নয়। সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, পোশাক, রাস্তা, বাড়িঘর, সামাজিক সম্পর্ক—এসবও একটি সময়কে বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

একজন মহিলা ফটোসাংবাদিকের সংগ্রাম

হোমাই যখন পেশাদার ফটোসাংবাদিক হিসেবে কাজ করছিলেন, তখন সংবাদমাধ্যমে পুরুষদের আধিপত্য ছিল প্রবল।

ক্যামেরা হাতে কোনও মহিলা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে অনেকেরই বিস্ময় তৈরি হতো। কিন্তু হোমাই নিজের কাজের দক্ষতা দিয়ে ধীরে ধীরে সেই সংশয় দূর করেন।

তাঁর ছবির গুণমানই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।

তিনি দেখিয়ে দেন, ফটোসাংবাদিকতার মতো পরিশ্রমসাধ্য পেশায় দক্ষতা লিঙ্গের ওপর নির্ভর করে না। একজন ফটোগ্রাফারের সবচেয়ে বড় শক্তি হল তাঁর পর্যবেক্ষণক্ষমতা, সময়জ্ঞান এবং মুহূর্তকে চিনে নেওয়ার ক্ষমতা।

‘ডালডা ১৩’—একটি পরিচিত নাম

হোমাই ব্যারাওয়ালার সঙ্গে ‘Dalda 13’ নামটির একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।

তাঁর গাড়ির নম্বরপ্লেটের সঙ্গে যুক্ত সংখ্যার সূত্রে এই নামটি তাঁর পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে তাঁর অনেক ছবির প্রদর্শনী ও পরিচিতির সঙ্গে ‘Dalda 13’ নামটি ব্যবহৃত হয়েছে।

এই নামটি যেন তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি স্বতন্ত্র স্বাক্ষর হয়ে দাঁড়ায়।

দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান

দীর্ঘ কয়েক দশক ফটোসাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকার পর হোমাই ধীরে ধীরে পেশাগত জীবন থেকে সরে আসেন।

ডিজিটাল ক্যামেরা ও আধুনিক প্রযুক্তির যুগ শুরু হওয়ার আগের সেই অ্যানালগ ফটোগ্রাফির সময়ে তাঁর কাজের পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

একটি ছবি তোলার অর্থ ছিল ফিল্মে সীমিত সংখ্যক ফ্রেম ব্যবহার করা। ভুল হলে তাৎক্ষণিকভাবে ছবি দেখে সংশোধন করার সুযোগ ছিল না।

তাই প্রতিটি শটের আগে ভাবতে হতো। আলো, বিষয়, ফ্রেম এবং মুহূর্ত—সবকিছু বিচার করে তারপর ক্যামেরার শাটার চাপতে হতো।

এই কারণেই তাঁর ছবিগুলোর মধ্যে পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণের একটি বিশেষ ছাপ দেখা যায়।

জীবনের শেষপর্বে স্বীকৃতি

হোমাই ব্যারাওয়ালার কাজ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নতুন করে মূল্যায়িত হয়।

ভারত সরকার তাঁকে ২০১১ সালে পদ্মবিভূষণে সম্মানিত করে। এই সম্মান তাঁর দীর্ঘ ফটোসাংবাদিকতা জীবনের সরকারি স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কিন্তু পুরস্কারের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাঁর ছবিগুলো।

সময়ের সঙ্গে অনেক মানুষের স্মৃতি মুছে যায়। রাজনৈতিক ঘটনা ইতিহাসের পাতায় সংক্ষিপ্ত হয়ে আসে। কিন্তু একটি শক্তিশালী ছবি কখনও কখনও কয়েক দশক পরেও সেই সময়কে মানুষের চোখের সামনে ফিরিয়ে আনতে পারে।

হোমাইয়ের ছবির শক্তি এখানেই।

নারীদের জন্য একটি নতুন পথ

হোমাই ব্যারাওয়ালার সাফল্যের গুরুত্ব শুধু ফটোগ্রাফির ইতিহাসে নয়, নারী পেশাজীবনের ইতিহাসেও রয়েছে।

আজ সংবাদমাধ্যমে বহু মহিলা ফটোগ্রাফার, ভিডিও সাংবাদিক, ক্যামেরাপার্সন ও ফিল্ড রিপোর্টার কাজ করেন। কিন্তু এই পথ তৈরি হওয়ার আগে অনেক মহিলাকেই এমন পেশায় প্রবেশ করতে হয়েছিল যেখানে তাঁদের উপস্থিতি ছিল অস্বাভাবিক।

হোমাই সেই প্রথম সারির পথপ্রদর্শকদের একজন।

তিনি কোনও আন্দোলনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নারী স্বাধীনতার ভাষণ দেননি। বরং নিজের পেশাগত দক্ষতা দিয়ে প্রমাণ করেছেন—একজন মহিলা কঠিন, প্রতিযোগিতামূলক এবং মাঠভিত্তিক পেশায়ও নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেন।

ক্যামেরা যখন ইতিহাসের দলিল

একজন ফটোসাংবাদিকের কাজের মূল্য অনেক সময় তাঁর জীবদ্দশায় পুরোপুরি বোঝা যায় না।

আজ যে ছবি একটি সাধারণ সংবাদচিত্র বলে মনে হয়, পঞ্চাশ বছর পরে সেটিই হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

হোমাই ব্যারাওয়ালার ছবিগুলোর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

স্বাধীন ভারতের প্রথম কয়েক দশকের রাজনৈতিক পরিবেশ, রাষ্ট্রনেতাদের উপস্থিতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সাধারণ মানুষের জীবন—সব মিলিয়ে তাঁর ফটোগ্রাফি ভারতের পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান আর্কাইভ তৈরি করেছে।

শেষ কথা

হোমাই ব্যারাওয়ালার জীবন আমাদের সামনে একটি অন্যরকম সাফল্যের গল্প তুলে ধরে।

তিনি কোনও বড় রাজনৈতিক পদে ছিলেন না, কোনও বিশাল প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেননি। তাঁর হাতে ছিল একটি ক্যামেরা। সেই ক্যামেরার লেন্স দিয়ে তিনি নিজের সময়কে দেখেছেন, বুঝেছেন এবং ধরে রেখেছেন।

একজন মহিলা হিসেবে এমন সময়ে ফটোসাংবাদিকতায় প্রবেশ করেছিলেন, যখন এই পেশায় নারীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। তবু তিনি পিছিয়ে যাননি।

স্বাধীনতার উচ্ছ্বাস, জাতীয় শোক, রাষ্ট্রনায়কদের আনুষ্ঠানিকতা, সাধারণ মানুষের জীবন—সবকিছুকেই তিনি নিজের ছবির মধ্যে জায়গা দিয়েছেন।

তাঁর কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা হয় না। কখনও ইতিহাস লেখা হয় আলোর রেখায়, ক্যামেরার ফ্রেমে এবং একটি সঠিক মুহূর্তকে ধরে রাখার সাহসে।

হোমাই ব্যারাওয়ালা সেই সাহসী ফ্রেমের কারিগর—ভারতীয় ফটোসাংবাদিকতার ইতিহাসে যাঁর নাম আজও বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ রিভিউ

আনন্দীবাই যোশী: যে কিশোরী স্বপ্ন দেখেছিল, ভারতীয় নারীরাও চিকিৎসক হতে পারে।

ভারতের ইতিহাসে কিছু মানুষের জীবন এত অল্প সময়ের হলেও তাঁদের স্বপ্ন এত বড় যে, তাঁদের প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে থেকে যায়। আনন্দীবাই যোশী ছিলেন তেমনই এক অসাধারণ নারী।

আজ ভারতের হাসপাতালগুলিতে অসংখ্য মহিলা চিকিৎসক কাজ করছেন। মেডিক্যাল কলেজে মেয়েদের উপস্থিতি স্বাভাবিক। কিন্তু উনিশ শতকে একজন ভারতীয় নারীর চিকিৎসাবিদ্যা শেখার স্বপ্নই ছিল প্রায় অসম্ভব কল্পনা।

সেই সময়ের সমাজে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যেত। তাঁদের জীবনের প্রধান পরিচয় ছিল স্ত্রী ও মা। উচ্চশিক্ষা, বিদেশযাত্রা কিংবা পেশাজীবন—এসব অধিকাংশ নারীর জন্য কল্পনারও বাইরে ছিল।

এই বাস্তবতার মধ্যেই আনন্দীবাই যোশী এমন এক স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা তাঁর সময়ের বহু মানুষের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। তিনি চেয়েছিলেন চিকিৎসক হতে এবং বিশেষ করে ভারতীয় নারীদের চিকিৎসার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে।

তাঁর জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত জীবনেই তিনি ভারতীয় নারীশিক্ষার ইতিহাসে এক স্থায়ী চিহ্ন রেখে যান।

জন্ম

আনন্দীবাই যোশীর জন্ম ১৮৬৫ সালের ৩১ মার্চ মহারাষ্ট্রের কল্যাণে।

তাঁর জন্মনাম ছিল যমুনা।

সময়ের সামাজিক রীতি অনুযায়ী খুব অল্প বয়সেই তাঁর বিবাহ হয়।

বিয়ের পর তাঁর নাম হয় আনন্দীবাই।

শৈশবের পরিবর্তন

শৈশব থেকেই তাঁর জীবন সাধারণ মেয়েদের মতো ছিল না।

খুব অল্প বয়সে তাঁকে সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়।

কিন্তু তাঁর জীবনের একটি ঘটনা তাঁর ভবিষ্যৎ চিন্তাভাবনাকে গভীরভাবে বদলে দেয়।

মাতৃত্বের কঠিন অভিজ্ঞতা

অল্প বয়সে আনন্দীবাই মা হন।

তাঁর সন্তান জন্মের পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যায়।

এই ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে।

কিন্তু ব্যক্তিগত শোকের মধ্য থেকেই তাঁর মনে একটি বড় প্রশ্ন জন্ম নেয়—ভারতীয় নারীদের চিকিৎসার জন্য কেন পর্যাপ্ত মহিলা চিকিৎসক নেই?

একটি নতুন স্বপ্ন

সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতা আনন্দীবাইয়ের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

তিনি সিদ্ধান্ত নেন, চিকিৎসাবিদ্যা শিখবেন।

শুধু নিজের জন্য নয়, ভারতীয় নারীদের জন্যও।

কারণ সেই সময় অনেক ভারতীয় নারী পুরুষ চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিতে অস্বস্তি বোধ করতেন। ফলে নারী চিকিৎসকের প্রয়োজন ছিল অত্যন্ত বেশি।

স্বামীর ভূমিকা

আনন্দীবাইয়ের স্বামী গোপালরাও যোশী তাঁর শিক্ষার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তিনি স্ত্রীকে পড়াশোনা করতে উৎসাহিত করেছিলেন।

তখন একজন বিবাহিত নারীকে উচ্চশিক্ষার জন্য উৎসাহিত করা ছিল ব্যতিক্রমী ব্যাপার।

গোপালরাও বিশ্বাস করতেন, আনন্দীবাইকে শিক্ষিত হতে হবে এবং নিজের পেশাগত পরিচয় তৈরি করতে হবে।

শিক্ষার শুরু

আনন্দীবাইকে পড়াশোনা শেখানো শুরু হয়।

তাঁর শিক্ষার পথ সহজ ছিল না।

সামাজিক পরিবেশ ছিল রক্ষণশীল।

একজন নারীকে বাড়ির বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করতে দেখাই অনেকের কাছে অস্বাভাবিক ছিল।

তার ওপর তিনি চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন।

বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত

ভারতে তখন মহিলাদের জন্য চিকিৎসাবিদ্যার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল।

তাই আনন্দীবাই বিদেশে গিয়ে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এই সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত সাহসী।

কারণ উনিশ শতকে একজন ভারতীয় নারীর একা বা প্রায় একা বিদেশযাত্রা ছিল বিরল ঘটনা।

সামাজিক বিরোধিতা

তাঁর বিদেশযাত্রার পরিকল্পনা সবাই ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।

সমাজের রক্ষণশীল অংশ নানা প্রশ্ন তোলে।

একজন হিন্দু নারী বিদেশে গেলে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি নষ্ট হবে—এমন আপত্তিও ওঠে।

কিন্তু আনন্দীবাই নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি।

জনসমক্ষে বক্তব্য

বিদেশযাত্রার আগে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা দেন।

সেখানে তিনি নিজের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করেন।

তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, বিদেশে যাওয়া তাঁর কাছে বিলাসিতা নয়।

চিকিৎসাশাস্ত্র শেখার জন্যই তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

আমেরিকায় যাত্রা

১৮৮৩ সালে আনন্দীবাই আমেরিকায় যাওয়ার পথে রওনা হন।

তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র আঠারো বছর।

একজন তরুণ ভারতীয় নারীর জন্য সমুদ্রপথে দীর্ঘ বিদেশযাত্রা ছিল বিরাট অভিজ্ঞতা।

তিনি সম্পূর্ণ অপরিচিত এক পরিবেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

নতুন দেশ

আমেরিকায় পৌঁছে আনন্দীবাই সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের মুখোমুখি হন।

ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, জীবনযাত্রা—সবকিছুই ছিল আলাদা।

তবুও তিনি নিজের লক্ষ্য ভুলে যাননি।

পেনসিলভানিয়ার মহিলা মেডিক্যাল কলেজ

আনন্দীবাই আমেরিকার পেনসিলভানিয়ার মহিলা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন।

বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটি কলেজ অব মেডিসিনের ঐতিহাসিক পূর্বসূরি হিসেবে পরিচিত।

সেখানে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র পড়াশোনা শুরু করেন।

একজন ভারতীয় নারীর নতুন পরিচয়

বিদেশে গিয়ে তিনি শুধু নিজের শিক্ষার প্রতিনিধিত্ব করেননি।

তাঁর মাধ্যমে অনেক আমেরিকান মানুষ প্রথমবার একজন ভারতীয় হিন্দু নারীকে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে দেখেছিলেন।

তিনি এক অর্থে ভারতীয় নারীশিক্ষার প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন।

পড়াশোনার কঠিন সময়

বিদেশে তাঁর জীবন সহজ ছিল না।

আবহাওয়া ছিল অপরিচিত।

খাদ্যাভ্যাস ছিল আলাদা।

শারীরিকভাবেও তিনি দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন।

তারপরও পড়াশোনা চালিয়ে যান।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে অধ্যয়ন

তিনি প্রসূতিবিদ্যা ও নারীদের চিকিৎসার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন।

কারণ তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়েছিল, ভারতীয় নারীদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার কতটা প্রয়োজন।

তাঁর গবেষণার বিষয়

তাঁর চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণার কাজ ছিল ভারতীয় নারীদের প্রসূতিগত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এটি দেখায়, তিনি বিদেশে গিয়েও নিজের দেশের নারীদের সমস্যাকে ভুলে যাননি।

ডিগ্রি অর্জন

১৮৮৬ সালে আনন্দীবাই চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন।

এই সাফল্য ছিল ঐতিহাসিক।

একজন ভারতীয় হিন্দু নারী হিসেবে তিনি আমেরিকার একটি মেডিক্যাল কলেজ থেকে চিকিৎসাবিদ্যার ডিগ্রি অর্জন করেন।

দেশে ফেরার স্বপ্ন

ডিগ্রি অর্জনের পর তাঁর ইচ্ছা ছিল ভারতে ফিরে চিকিৎসা করা।

তিনি বিশেষ করে নারীদের জন্য চিকিৎসা পরিষেবা দিতে চেয়েছিলেন।

একটি নতুন সম্ভাবনা

তাঁর সাফল্যের খবর ভারতে পৌঁছয়।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তাঁকে নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

অনেকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন নারীশিক্ষার নতুন প্রতীক।

স্বদেশে প্রত্যাবর্তন

১৮৮৬ সালের শেষদিকে আনন্দীবাই ভারতে ফিরে আসেন।

তাঁর দেশে ফেরার ঘটনা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

তিনি শুধু একটি ডিগ্রি নিয়ে ফেরেননি।

তিনি সঙ্গে করে এনেছিলেন একটি নতুন সম্ভাবনা—ভারতীয় নারীরাও চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারে।

চিকিৎসা পেশায় প্রবেশের প্রস্তুতি

দেশে ফিরে তিনি চিকিৎসা পেশায় কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

একটি হাসপাতালের মহিলা চিকিৎসা বিভাগে তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হতে থাকে।

অসুস্থতা

বিদেশে থাকার সময় থেকেই তাঁর স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

ভারতে ফেরার পর অসুস্থতা আরও বেড়ে যায়।

তবুও তিনি চিকিৎসা ও সমাজের জন্য নিজের কাজের স্বপ্ন ধরে রেখেছিলেন।

অকাল মৃত্যু

১৮৮৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আনন্দীবাই যোশী মৃত্যুবরণ করেন।

তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১ বছর।

একটি অসাধারণ সম্ভাবনাময় জীবন এত অল্প বয়সেই থেমে যায়।

অসমাপ্ত স্বপ্ন

তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাননি।

নিজের দেশের অসংখ্য নারীকে চিকিৎসা করার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত করার সময় তাঁর হাতে ছিল না।

কিন্তু তাঁর অর্জন ইতিমধ্যেই ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছিল।

কেন তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ?

কারণ তাঁর সময়ে ভারতীয় নারীদের সামনে পথ ছিল অত্যন্ত সীমিত।

তিনি সেই সীমারেখা অতিক্রম করেছিলেন।

তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন ভারতীয় নারী বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারেন।

একটি মানসিক বিপ্লব

আনন্দীবাইয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো তাঁর ডিগ্রি নয়।

তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল মানুষের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনা।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নারীর মেধা ও আকাঙ্ক্ষাকে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রাখা যায় না।

নারীশিক্ষার ইতিহাসে তাঁর স্থান

ভারতে নারীশিক্ষার ইতিহাসে তাঁর নাম একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

তাঁর জীবন পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের সামনে উচ্চশিক্ষার সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট করে দেয়।

চিকিৎসায় নারীর প্রবেশ

আজ চিকিৎসাক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা বিপুল।

কিন্তু এই অবস্থায় পৌঁছতে বহু বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে।

আনন্দীবাই সেই দীর্ঘ পথের অন্যতম প্রাথমিক পথিকৃৎ।

ব্যক্তিগত শোক থেকে সামাজিক স্বপ্ন

তাঁর জীবনের সবচেয়ে আবেগপূর্ণ দিক হলো—নিজের সন্তানের মৃত্যু তাঁকে ভেঙে দিলেও সেই শোককে তিনি একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্যে রূপান্তরিত করেছিলেন।

তিনি ভাবলেন, অন্য নারীদের যেন একই ধরনের চিকিৎসা-অভাবের মুখোমুখি হতে না হয়।

একজন তরুণীর অসাধারণ সাহস

মাত্র আঠারো বছর বয়সে বিদেশযাত্রা।

অপরিচিত দেশে পড়াশোনা।

সামাজিক বিরোধিতা।

শারীরিক অসুস্থতা।

তারপরও চিকিৎসাশাস্ত্রের ডিগ্রি অর্জন।

এই পুরো যাত্রা একজন তরুণীর অসাধারণ মানসিক শক্তির পরিচয় দেয়।

পরিবার ও সমাজের ভূমিকা

তাঁর জীবন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখায়।

একজন প্রতিভাবান মানুষের বিকাশে পরিবারের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বামীর উৎসাহ তাঁর শিক্ষার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

বিদেশে ভারতীয় পরিচয়

আনন্দীবাই নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে লুকিয়ে বিদেশে পড়াশোনা করেননি।

বরং নিজের পরিচয় বজায় রেখেই আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।

শিক্ষা ও সংস্কৃতির সমন্বয়

তাঁর জীবন দেখায়, আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করতে গেলে নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় ত্যাগ করতে হয় না।

জ্ঞান সর্বজনীন।

কিন্তু সেই জ্ঞানকে নিজের সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোই আসল উদ্দেশ্য।

নারীদের স্বাস্থ্য

আজ মাতৃস্বাস্থ্য ও নারীস্বাস্থ্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।

উনিশ শতকে এই বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনতা ছিল অনেক কম।

আনন্দীবাই বিশেষভাবে নারীদের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন।

তাঁর স্বপ্নের বর্তমান বাস্তবতা

আজ ভারতীয় নারীরা শুধু চিকিৎসক নন—

সার্জন,

গবেষক,

মেডিক্যাল অধ্যাপক,

হাসপাতাল প্রশাসক,

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ—

বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছেন।

এই বাস্তবতার ঐতিহাসিক শিকড়ের দিকে তাকালে আনন্দীবাইয়ের মতো পথিকৃৎদের কথা মনে পড়ে।

ইতিহাসের এক অসমাপ্ত অধ্যায়

আনন্দীবাইয়ের জীবন সংক্ষিপ্ত হওয়ায় তাঁর সম্ভাবনার অনেকটাই অপূর্ণ থেকে যায়।

যদি তিনি আরও কয়েক দশক বেঁচে থাকতেন, ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর অবদান আরও বিস্তৃত হতে পারত।

কিন্তু ইতিহাসে কখনও কখনও একজন মানুষের কাজের মূল্য তাঁর কাজের দৈর্ঘ্য দিয়ে বিচার করা যায় না।

তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা

আনন্দীবাই শেখান—

স্বপ্ন দেখার জন্য বয়স বড় বিষয় নয়।

সামাজিক বাধা স্বপ্নের শেষ কথা নয়।

ব্যক্তিগত কষ্ট থেকেও বৃহত্তর উদ্দেশ্য জন্ম নিতে পারে।

শিক্ষা মানুষকে নিজের সীমা অতিক্রম করার শক্তি দেয়।

বর্তমান প্রজন্মের জন্য বার্তা

আজ কোনো মেয়ে যদি চিকিৎসক হতে চায়, বিদেশে পড়তে চায় বা নিজের পেশাগত পরিচয় তৈরি করতে চায়, তাহলে আনন্দীবাইয়ের জীবন তাকে সাহস দিতে পারে।

কারণ তিনি এমন এক সময়ে এই পথ বেছে নিয়েছিলেন, যখন সেই পথ প্রায় অদৃশ্য ছিল।

মহীয়সী হওয়ার অর্থ

মহীয়সী হওয়া মানে শুধু দীর্ঘ জীবনযাপন করা নয়।

কখনও কখনও একটি ছোট জীবনও ইতিহাসের গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলে।

আনন্দীবাইয়ের জীবন তারই উদাহরণ।

উপসংহার

আনন্দীবাই যোশীর জীবনের গল্প অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার অর্থ অসীম।

একটি কিশোরী মেয়ে অল্প বয়সে বিয়ে করেছিল।

তারপর মাতৃত্বের আনন্দ পাওয়ার পর সন্তান হারানোর গভীর শোকের মুখোমুখি হয়েছিল।

সেই ব্যক্তিগত দুঃখ তাকে একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—ভারতীয় নারীদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসক কোথায়?

সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় একটি স্বপ্ন।

তিনি চিকিৎসক হবেন।

নারীদের চিকিৎসা করবেন।

এই স্বপ্ন পূরণ করতে তিনি সমাজের সমালোচনা উপেক্ষা করে পড়াশোনা করেন।

বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

১৮৮৩ সালে আমেরিকায় যান।

পেনসিলভানিয়ার মহিলা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন।

অপরিচিত পরিবেশ, শারীরিক অসুস্থতা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যান।

১৮৮৬ সালে চিকিৎসাবিদ্যার ডিগ্রি অর্জন করেন।

তারপর দেশে ফিরে নিজের মানুষের জন্য কাজ করার প্রস্তুতি নেন।

কিন্তু ভাগ্য তাঁকে বেশি সময় দেয়নি।

মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

তবুও তাঁর জীবন ব্যর্থ হয়নি।

কারণ তিনি এমন একটি দরজা খুলেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের বহু ভারতীয় নারী এগিয়ে যেতে পেরেছেন।

আজ ভারতের কোনো হাসপাতালে যখন একজন মহিলা চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা করেন, তখন সেই দৃশ্য আমাদের কাছে স্বাভাবিক।

কিন্তু এই স্বাভাবিকতার পেছনে রয়েছে বহু অগ্রদূতের সাহস।

আনন্দীবাই যোশী তাঁদের অন্যতম।

তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—

জীবন কত দীর্ঘ ছিল, তা নয়; জীবনের স্বপ্ন কত বড় ছিল এবং সেই স্বপ্নের জন্য কতটা সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওয়া হয়েছিল—ইতিহাসে মানুষের মূল্য অনেক সময় তার ওপরই নির্ভর করে।

আনন্দীবাইয়ের জীবন তাই এক অসমাপ্ত গল্প হয়েও সম্পূর্ণ এক অনুপ্রেরণা।

তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকেননি, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বেঁচে আছে।

আজও যখন কোনো ভারতীয় তরুণী চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখন সেই স্বপ্নের ইতিহাসের এক প্রাচীন অধ্যায়ে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন আনন্দীবাই যোশী—ভারতীয় নারীর চিকিৎসাশিক্ষার এক সাহসী অগ্রদূত।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ রিভিউ

ড. ই. কে. জানকী অম্মাল: উদ্ভিদবিজ্ঞানের নীরব বিপ্লবী এক ভারতীয় নারী।

ভূমিকা

ভারতের ইতিহাসে এমন অনেক মহীয়সী নারী রয়েছেন, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে অনেক দূরে থেকেও নিজেদের কাজের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ড. ই. কে. জানকী অম্মাল। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ উদ্ভিদবিজ্ঞানী, জেনেটিসিস্ট এবং উদ্ভিদ-প্রজনন গবেষক। এমন এক সময়ে তিনি বিজ্ঞানচর্চা শুরু করেছিলেন, যখন ভারতে নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণার জগৎ আজকের মতো সহজলভ্য ছিল না।

জানকী অম্মালের বিশেষ আগ্রহ ছিল উদ্ভিদের ক্রোমোজোম, জেনেটিক্স এবং উদ্ভিদের প্রজনন নিয়ে। তাঁর গবেষণা শুধু তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; আখসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফসলের বৈশিষ্ট্য ও উন্নত জাত নিয়ে তাঁর কাজ কৃষিবিজ্ঞানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন—বিজ্ঞানচর্চায় বড় আবিষ্কারের জন্য শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতিই নয়, দরকার গভীর কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং নিজের কাজের প্রতি অটুট নিষ্ঠা।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

জানকী অম্মালের জন্ম ১৮৯৭ সালে তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির তেল্লিচেরি অঞ্চলে, বর্তমান কেরলের কান্নুর জেলার কাছে। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি ও উদ্ভিদের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

তাঁর সময়ে ভারতীয় সমাজে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ খুব সীমিত ছিল। বিশেষ করে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে গবেষণার জগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন।

কিন্তু জানকী অম্মাল প্রচলিত সামাজিক বাধাকে নিজের ভবিষ্যতের পথে দাঁড়াতে দেননি। তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং উদ্ভিদবিজ্ঞানে নিজের আগ্রহকে ধীরে ধীরে গবেষণার দিকে নিয়ে যান।

পরবর্তীকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। সেখানে তিনি উদ্ভিদবিজ্ঞানে গবেষণা করেন এবং ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। এই সময়টি তাঁর বৈজ্ঞানিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বিদেশের মাটিতে এক ভারতীয় নারীর সাফল্য

বিশ শতকের প্রথম ভাগে একজন ভারতীয় নারীর বিদেশে গিয়ে বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা। জানকী অম্মাল সেই কঠিন পথেই এগিয়ে গিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রে তিনি উদ্ভিদের বংশগতি এবং ক্রোমোজোম নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সাইটোজেনেটিক্স—অর্থাৎ কোষের ক্রোমোজোম এবং বংশগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞান।

তাঁর গবেষণা তাঁকে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে পরিচিত করে তোলে।

তবে বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েও তিনি নিজের দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। বরং পরবর্তীকালে ভারতে ফিরে এসে দেশের বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়ার কাজে নিজেকে যুক্ত করেন।

আখ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান

জানকী অম্মালের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল আখ

আখ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। ভালো মানের আখের জাত তৈরি করতে হলে উদ্ভিদের বংশগত বৈশিষ্ট্য, ক্রোমোজোম সংখ্যা এবং বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে সম্পর্ক সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা দরকার।

জানকী অম্মাল আখের জেনেটিক্স ও সাইটোজেনেটিক্স নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। তিনি বিভিন্ন আখের প্রজাতি ও সংকর জাতের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করেন।

তাঁর গবেষণা ভারতীয় আখ গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সাহায্য করে।

এই কাজের বিশেষ গুরুত্ব ছিল, কারণ কৃষি শুধু খাদ্যের উৎস নয়—ভারতের অর্থনীতির সঙ্গেও তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই উদ্ভিদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে তাঁর গবেষণা পরোক্ষভাবে কৃষি ও শিল্প উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞান মানে শুধু পরীক্ষাগার নয়

জানকী অম্মালের কাজের একটি বিশেষ দিক ছিল তাঁর গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ।

তিনি বিশ্বাস করতেন, উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা শুধু বইয়ের পাতায় বা গবেষণাগারের পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য বুঝে তা কৃষি ও পরিবেশের উন্নতিতে কাজে লাগানো দরকার।

এই চিন্তাভাবনা আজকের দিনে অত্যন্ত স্বাভাবিক মনে হলেও তাঁর সময়ে এটি যথেষ্ট অগ্রসর ধারণা ছিল।

তিনি দেশীয় উদ্ভিদ, তাদের বৈচিত্র্য এবং সংরক্ষণের গুরুত্ব নিয়েও আগ্রহী ছিলেন। ভারতের বিপুল উদ্ভিদসম্পদকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝা এবং সংরক্ষণ করা যে অত্যন্ত জরুরি—তাঁর কাজের মধ্যে সেই উপলব্ধিও দেখা যায়।

রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটিতে কাজ

জানকী অম্মালের কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ইংল্যান্ডের রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি-তে তাঁর কাজ।

সেখানে তিনি উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা এবং বাগানবিদ্যার বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিদেশের একটি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক পরিবেশে একজন ভারতীয় নারী হিসেবে তাঁর উপস্থিতি ছিল নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

তিনি শুধু নিজের জন্য সুযোগ তৈরি করেননি; তাঁর সাফল্য পরবর্তী প্রজন্মের ভারতীয় নারী বিজ্ঞানীদের কাছেও অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

ভারতীয় উদ্ভিদসম্পদ সংরক্ষণে আগ্রহ

জানকী অম্মালের জীবনের শেষ দিকের কাজের মধ্যে পরিবেশ ও উদ্ভিদ সংরক্ষণের ভাবনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের পাহাড়, বনাঞ্চল ও বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা উদ্ভিদসম্পদের বৈচিত্র্য তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। দেশীয় উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষণ এবং উদ্ভিদের বৈচিত্র্য রক্ষা করা ভবিষ্যতের জন্য কতটা জরুরি, তিনি তা উপলব্ধি করেছিলেন।

আজ যখন জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস নিয়ে সারা পৃথিবীতে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন জানকী অম্মালের সেই চিন্তাধারা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

বাধা ছিল, কিন্তু থামেননি

জানকী অম্মালের জীবনকে শুধুমাত্র একজন বিজ্ঞানীর সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখলে তাঁর সংগ্রামের দিকটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

তিনি এমন একটি সময়ে বিজ্ঞানচর্চা করেছিলেন, যখন ভারত এখনও ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। একজন ভারতীয় নারী হিসেবে বিদেশে গিয়ে গবেষণা করা, আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে নিজের জায়গা তৈরি করা এবং পরে দেশে ফিরে কাজ করা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁকে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

কিন্তু তিনি নিজের পরিচয়কে কখনও দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি।

তাঁর কাছে গবেষণার মূল্য ছিল তাঁর কাজের মধ্যে। তিনি প্রচারের চেয়ে জ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

ভারত তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিও দিয়েছিল। ১৯৭৭ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়।

তবে তাঁর প্রকৃত অবদান কোনও পুরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

একজন নারী যখন এমন সময়ে বিজ্ঞান গবেষণায় নিজের জায়গা তৈরি করেন, যখন সেই ক্ষেত্রটি মূলত পুরুষপ্রধান ছিল, তখন তাঁর সাফল্য পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি দরজা খুলে দেয়।

জানকী অম্মালের জীবন তাই শুধু উদ্ভিদবিজ্ঞানের ইতিহাসের অংশ নয়; এটি ভারতের নারীশিক্ষা এবং নারী বিজ্ঞানীদের অগ্রযাত্রারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

নতুন প্রজন্মের জন্য তাঁর শিক্ষা

জানকী অম্মালের জীবন থেকে আজকের তরুণ প্রজন্ম অনেক কিছু শিখতে পারে।

প্রথমত, পরিস্থিতি কখনও স্বপ্নের চেয়ে বড় নয়।

দ্বিতীয়ত, জ্ঞান অর্জনের কোনও নির্দিষ্ট বয়স বা সীমা নেই।

তৃতীয়ত, বড় কাজ করার জন্য সবসময় প্রচারের প্রয়োজন হয় না। নীরবে, নিষ্ঠার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেও একজন মানুষ ইতিহাসে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেন।

আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল—নিজের আগ্রহকে অনুসরণ করার সাহস থাকতে হবে।

যে সময়ে একজন ভারতীয় নারীর জন্য বিজ্ঞান গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল, সেই সময়ে জানকী অম্মাল আন্তর্জাতিক স্তরে নিজের পরিচয় তৈরি করেছিলেন।

কেন আজও তাঁকে মনে রাখা দরকার?

বর্তমান পৃথিবীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পিছনে যে অসংখ্য বিজ্ঞানীর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম রয়েছে, তাঁদের সবাই সমানভাবে পরিচিত নন।

জানকী অম্মাল তাঁদেরই একজন।

তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে বিজ্ঞান শুধু বড় বড় আবিষ্কারের নাম নয়। একটি উদ্ভিদের ক্রোমোজোম নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণাও ভবিষ্যতের কৃষি, পরিবেশ এবং জীববিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তাঁর জীবন আরও একটি সত্য সামনে আনে—নারীদের প্রতিভাকে সুযোগ দেওয়া হলে তাঁরা শুধু নিজেদের জীবন নয়, একটি দেশের বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যৎও বদলে দিতে পারেন।

উপসংহার

ড. ই. কে. জানকী অম্মাল ছিলেন এমন একজন মহীয়সী নারী, যাঁর জীবন ছিল জ্ঞান, গবেষণা ও অধ্যবসায়ের এক অসাধারণ উদাহরণ।

তিনি কোনও রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষের নেতৃত্ব দেননি, কোনও যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে নেননি, কিংবা প্রচারের আলোয় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেননি। তাঁর যুদ্ধ ছিল অন্যরকম—অজ্ঞতার বিরুদ্ধে জ্ঞানের যুদ্ধ, সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে সম্ভাবনার যুদ্ধ।

উদ্ভিদের ক্ষুদ্র কোষের ভিতরের ক্রোমোজোম নিয়ে গবেষণা করতে করতে তিনি আসলে ভারতীয় নারীর সম্ভাবনার সীমাকেও অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত করেছিলেন।

আজ যখন কোনও মেয়ে বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখে, গবেষণাগারে কাজ করার কথা ভাবে কিংবা প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করতে চায়, তখন জানকী অম্মালের জীবন তাকে নীরবে বলে—

“তোমার পথ কঠিন হতে পারে, কিন্তু সেই পথ অসম্ভব নয়।”

তাই ড. ই. কে. জানকী অম্মাল শুধু ভারতের একজন প্রখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী নন; তিনি ভারতীয় নারীশক্তি, বৈজ্ঞানিক মনন এবং নিরলস অধ্যবসায়ের এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর নাম যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছবে, তত বেশি তরুণ-তরুণী বুঝতে পারবে—নীরব গবেষণাও একদিন ইতিহাস তৈরি করতে পারে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ রিভিউ

ড. অসীমা চট্টোপাধ্যায়: উদ্ভিদ থেকে ওষুধ আবিষ্কারের স্বপ্ন দেখা এক মহীয়সী বিজ্ঞানী।

ভূমিকা

ভারতের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁদের অবদান শুধু গবেষণাগারের দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁদের গবেষণা মানুষের জীবন, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ড. অসীমা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন তেমনই একজন বিজ্ঞানী।

তিনি ছিলেন জৈব রসায়নের বিশিষ্ট গবেষক। বিশেষ করে ভারতীয় উদ্ভিদ থেকে ঔষধি উপাদান আবিষ্কার এবং তাদের রাসায়নিক গঠন নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা ভারতীয় বিজ্ঞানকে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত করেছিল।

একজন নারী হিসেবে এমন সময়ে তিনি গবেষণার জগতে প্রবেশ করেছিলেন, যখন উচ্চশিক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নারীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু প্রতিকূলতা তাঁকে থামাতে পারেনি।

তাঁর কাছে বিজ্ঞান ছিল শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়—বিজ্ঞানকে মানুষের উপকারে কাজে লাগানোই ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

শৈশব থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ

অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯১৭ সালে কলকাতায়। ছোটবেলা থেকেই তাঁর পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল।

তাঁর বেড়ে ওঠার সময় ভারতীয় সমাজে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আজকের তুলনায় অনেক কম ছিল। বিশেষ করে বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া ছিল সাহসী সিদ্ধান্ত।

কিন্তু অসীমা চট্টোপাধ্যায় সেই প্রচলিত ধারণাকে অতিক্রম করেছিলেন।

তিনি কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে রসায়ন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। পড়াশোনার সময় থেকেই রসায়নের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।

বিশেষ করে প্রকৃতি এবং উদ্ভিদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রাসায়নিক উপাদান তাঁকে আকৃষ্ট করত।

গবেষণার পথে যাত্রা

অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল জৈব রসায়ন এবং প্রাকৃতিক যৌগের রাসায়নিক বিশ্লেষণ

সহজভাবে বললে, প্রকৃতিতে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিদের মধ্যে এমন অনেক রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, যেগুলির ঔষধি গুণ থাকতে পারে। সেই উপাদানগুলিকে চিহ্নিত করা, আলাদা করা, তাদের রাসায়নিক গঠন বোঝা এবং চিকিৎসায় তাদের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করা ছিল তাঁর কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভারতের মতো জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশে এই ধরনের গবেষণার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

অসীমা চট্টোপাধ্যায় সেই সম্ভাবনাকে বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান করেছিলেন।

ভারতীয় উদ্ভিদের ঔষধি সম্ভাবনা

ভারতীয় সমাজে বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন উদ্ভিদ চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। কিন্তু কোনও উদ্ভিদ কোনও রোগে উপকারী—এই প্রচলিত ধারণাকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

অসীমা চট্টোপাধ্যায় উদ্ভিদজাত রাসায়নিক যৌগের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।

তিনি বিভিন্ন উদ্ভিদ থেকে সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান পৃথক করার চেষ্টা করেন এবং তাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করেন।

তাঁর গবেষণার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র ছিল আলকালয়েড এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক জৈব যৌগ।

এই ধরনের গবেষণা পরবর্তীকালে ঔষধ আবিষ্কার এবং ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।

ক্যান্সার গবেষণায় অবদান

অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ক্যান্সারবিরোধী সম্ভাবনাময় রাসায়নিক যৌগ নিয়ে কাজ।

কিছু ভারতীয় উদ্ভিদে উপস্থিত রাসায়নিক উপাদান নিয়ে তিনি এবং তাঁর গবেষক দল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তাঁদের গবেষণার লক্ষ্য ছিল এমন যৌগ খুঁজে বের করা, যেগুলির চিকিৎসাবিজ্ঞানে সম্ভাব্য ব্যবহার থাকতে পারে।

এখানে মনে রাখা দরকার, কোনও উদ্ভিদে কোনও সক্রিয় রাসায়নিক যৌগ পাওয়া গেলেই সেটি সরাসরি ক্যান্সারের ওষুধ হয়ে যায় না। তার জন্য দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং ক্লিনিক্যাল গবেষণা প্রয়োজন।

কিন্তু নতুন সম্ভাবনাময় যৌগ চিহ্নিত করার কাজই ভবিষ্যৎ গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে।

এই ক্ষেত্রেই অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণার গুরুত্ব ছিল অত্যন্ত বড়।

মৃগীরোগ নিয়ে গবেষণা

তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র ছিল মৃগীরোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের সম্ভাবনাময় উদ্ভিদজাত যৌগ

তিনি উদ্ভিদ থেকে পাওয়া বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান নিয়ে গবেষণা করেন এবং সেগুলির ঔষধি সম্ভাবনা অনুসন্ধান করেন।

এই গবেষণার ধারাবাহিকতায় তাঁর কাজ থেকে এমন কিছু যৌগ নিয়ে গবেষণার পথ তৈরি হয়েছিল, যেগুলি মৃগীরোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় বলে বিবেচিত হয়।

এটি ছিল তাঁর গবেষণার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য—তিনি প্রকৃতির উপাদানকে কেবল রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে দেখেননি; মানুষের চিকিৎসায় তার সম্ভাব্য ব্যবহার খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন।

শিক্ষক হিসেবেও অসাধারণ

অসীমা চট্টোপাধ্যায় শুধু গবেষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকও।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। সেখানে তিনি বহু ছাত্রছাত্রীকে রসায়ন এবং গবেষণার জগতে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন।

একজন ভালো শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় শেখান না। তিনি ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন করতে শেখান, ভুল থেকে শিখতে শেখান এবং নতুন কিছু অনুসন্ধানের সাহস দেন।

অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের শিক্ষাদর্শেও এই বৈজ্ঞানিক কৌতূহল গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তাঁর কাছে গবেষণা মানে শুধু নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করা নয়; পরবর্তী প্রজন্মকে গবেষণার পথে তৈরি করে দেওয়াও ছিল বিজ্ঞানীর দায়িত্ব।

একজন নারী বিজ্ঞানীর সংগ্রাম

আজ নারী বিজ্ঞানীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক মনে হলেও অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের সময় পরিস্থিতি অনেক কঠিন ছিল।

বিজ্ঞান ও গবেষণার জগৎ তখন মূলত পুরুষপ্রধান। একজন নারীকে নিজের যোগ্যতা বারবার প্রমাণ করতে হতো।

কিন্তু তিনি নিজের পরিচয়কে কখনও বাধা হিসেবে মেনে নেননি।

তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন যে গবেষণার ক্ষেত্রে মেধা, পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার কোনও লিঙ্গ নেই।

তাঁর সাফল্য শুধু তাঁর নিজের সাফল্য ছিল না। তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য নারী বিজ্ঞানীর জন্যও তিনি একটি পথ তৈরি করেছিলেন।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণা ভারতীয় বিজ্ঞানকে আন্তর্জাতিক মহলে পরিচিত করে।

তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর গবেষণাপত্র দেশ-বিদেশের বৈজ্ঞানিক মহলে গুরুত্ব পায়।

তাঁর দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক জীবনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি ছিল ১৯৬০ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের সাধারণ সভাপতি নির্বাচিত হওয়া। তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত হওয়া প্রথম ভারতীয় নারী বিজ্ঞানী ছিলেন।

এই অর্জন ছিল ঐতিহাসিক।

কারণ এটি দেখিয়েছিল যে একজন ভারতীয় নারী শুধু বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা বা গবেষণা করতে পারেন না—তিনি দেশের বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক সমাজের নেতৃত্বও দিতে পারেন।

পদ্মভূষণ ও অন্যান্য সম্মান

ভারত সরকার তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছিল।

১৯৬১ সালে তিনি শান্তি স্বরূপ ভাটনাগর পুরস্কার লাভ করেন। এটি ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পুরস্কার।

পরে ১৯৭৫ সালে তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করা হয়।

তবে পুরস্কারই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল না।

তাঁর আসল পরিচয় ছিল একজন গবেষক হিসেবে—যিনি দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্যের সঙ্গে এমন একটি ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিয়েছিলেন, যার ফলাফল সমাজের জন্য বাস্তব মূল্য বহন করতে পারে।

বিজ্ঞান ও প্রকৃতির সম্পর্ক

অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের জীবন আমাদের প্রকৃতি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।

আমরা চারপাশে যে গাছপালা দেখি, তাদের প্রত্যেকটির মধ্যে অসংখ্য রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। সঠিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সেই উপাদানগুলির নতুন ব্যবহার আবিষ্কার করা সম্ভব।

অর্থাৎ প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের উৎস নয়; প্রকৃতি জ্ঞান ও সম্ভাবনারও এক বিশাল ভাণ্ডার।

তবে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রকৃতিকে ধ্বংস নয়, সংরক্ষণ করতে হবে।

আজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নতুন ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণার ক্ষেত্রে এই চিন্তাভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তরুণ প্রজন্মের জন্য তাঁর বার্তা

অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের জীবন থেকে তরুণ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল—কৌতূহলকে কখনও ছোট করে দেখা উচিত নয়।

একটি ছোট প্রশ্ন থেকেই বড় গবেষণার শুরু হতে পারে।

একটি গাছের মধ্যে থাকা অজানা রাসায়নিক উপাদান নিয়ে প্রশ্ন করতে করতেই একজন বিজ্ঞানী নতুন জ্ঞানের সন্ধান পেতে পারেন।

তাঁর জীবন আরও শেখায়, সাফল্য দ্রুত আসে না। গবেষণার ক্ষেত্রে বছরের পর বছর পরীক্ষা করতে হয়, ব্যর্থ হতে হয়, আবার নতুনভাবে শুরু করতে হয়।

অসীমা চট্টোপাধ্যায় সেই ধৈর্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

মহীয়সী নারীর প্রকৃত পরিচয়

মহীয়সী নারী বলতে আমরা অনেক সময় শুধু সেই নারীদের কথা ভাবি, যাঁরা ইতিহাসের বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

কিন্তু সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার কাজ আরও অনেকভাবে করা যায়।

কেউ শিক্ষা দিয়ে সমাজ বদলান, কেউ শিল্পের মাধ্যমে মানুষের মন বদলান, কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, আবার কেউ গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করেন।

অসীমা চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সেই চতুর্থ ধরনের পথিকৃৎ।

তিনি পরীক্ষাগারে বসে কাজ করতেন, কিন্তু তাঁর গবেষণার লক্ষ্য ছিল মানুষের জীবনকে আরও ভালো করার সম্ভাবনা খুঁজে বের করা।

উপসংহার

ড. অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ভারতের বিজ্ঞান ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে একজন নারী একই সঙ্গে গবেষক, শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং বিজ্ঞানসমাজের নেতা হতে পারেন।

উদ্ভিদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা রাসায়নিক উপাদান অনুসন্ধান করতে করতে তিনি শুধু নতুন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সন্ধান করেননি; তিনি দেখিয়েছিলেন ভারতীয় প্রকৃতি এবং ভারতীয় মেধার মধ্যেও কত অসীম সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ছিল তাঁর নিষ্ঠা। খ্যাতির জন্য নয়, জ্ঞানের জন্য তিনি কাজ করেছিলেন। আর সেই জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার স্বপ্নই তাঁর গবেষণাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

আজ কোনও ভারতীয় মেয়ে যখন রসায়নের গবেষণাগারে প্রবেশ করে, নতুন ওষুধ আবিষ্কারের স্বপ্ন দেখে কিংবা বিজ্ঞানকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিতে চায়, তখন তার পথের অদৃশ্য অনুপ্রেরণাদের একজন হলেন অসীমা চট্টোপাধ্যায়।

তাঁর জীবন যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

“প্রকৃতির রহস্যকে জানার চেষ্টা কখনও বৃথা যায় না; একটি ছোট আবিষ্কারও একদিন অসংখ্য মানুষের জীবনে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।”

এই কারণেই ড. অসীমা চট্টোপাধ্যায় শুধু একজন বিজ্ঞানী নন—তিনি ভারতীয় নারীশক্তি, বৈজ্ঞানিক কৌতূহল এবং মানুষের কল্যাণে জ্ঞান ব্যবহারের এক চিরন্তন প্রতীক।

Share This