Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

সাবিত্রীবাই ফুলে: ভারতের নারীশিক্ষার পথপ্রদর্শক এক মহীয়সী নারী।

ভূমিকা

একসময় ভারতের সমাজে মেয়েদের শিক্ষার অধিকার ছিল অত্যন্ত সীমিত। বিশেষ করে নিম্নবর্ণ ও দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য শিক্ষার দরজা কার্যত বন্ধ ছিল। সমাজের প্রচলিত ধারণা ছিল, মেয়েদের কাজ শুধু সংসার করা। পড়াশোনা করা তাদের জন্য প্রয়োজনীয় নয়—এমন বিশ্বাস বহু মানুষের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল।

এই কঠিন সামাজিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যে কয়েকজন মানুষ ভারতীয় সমাজে পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাবিত্রীবাই ফুলে

তিনি শুধু একজন শিক্ষিকা ছিলেন না। তিনি ছিলেন নারীশিক্ষার অগ্রদূত, সমাজসংস্কারক, কবি এবং নিপীড়িত মানুষের অধিকার রক্ষার এক সাহসী কণ্ঠ।

যে সময়ে একটি মেয়ের স্কুলে যাওয়াই ছিল সমাজের চোখে অপরাধের মতো, সেই সময়ে সাবিত্রীবাই নিজে শিক্ষিকা হয়ে অন্য মেয়েদের হাতে বই তুলে দিয়েছিলেন।

শৈশব ও বিয়ে

সাবিত্রীবাই ফুলের জন্ম ১৮৩১ সালের ৩ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার নায়গাঁও গ্রামে।

তাঁর সময়ে মেয়েদের নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ ছিল না। শৈশবেই তাঁর বিয়ে হয় জ্যোতিরাও ফুলের সঙ্গে।

জ্যোতিরাও ছিলেন সমাজসংস্কারক এবং নারী ও নিপীড়িত মানুষের শিক্ষার প্রবল সমর্থক।

বিয়ের পর জ্যোতিরাও সাবিত্রীবাইকে পড়াশোনা শেখাতে শুরু করেন।

এই শিক্ষা তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

যে মেয়েটির নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল না, তিনিই পরবর্তীকালে অসংখ্য মেয়ের শিক্ষার দরজা খুলে দেওয়ার কাজে নেতৃত্ব দেন।

শিক্ষিকা হওয়ার পথ

সাবিত্রীবাই বুঝতে পেরেছিলেন, সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো শিক্ষা।

কিন্তু শুধু নিজের শিক্ষা অর্জন করলেই হবে না—অন্যদেরও শিক্ষিত করতে হবে।

তিনি শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ নেন এবং শিক্ষিকা হিসেবে কাজ শুরু করেন।

তখন একজন নারী শিক্ষিকা হওয়াই ছিল অত্যন্ত বিরল ঘটনা।

আর একজন নারী অন্য মেয়েদের পড়াচ্ছেন—এটি সমাজের রক্ষণশীল অংশের কাছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু সাবিত্রীবাই পিছিয়ে যাননি।

মেয়েদের জন্য স্কুল

১৮৪৮ সালে পুনের ভিঢেওয়াড়ায় মেয়েদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জ্যোতিরাও ফুলে ও সাবিত্রীবাই ফুলে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

সাবিত্রীবাই সেখানে শিক্ষাদানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেন।

এটি ছিল ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

কারণ তখন মেয়েদের শিক্ষার জন্য আলাদা স্কুলের ধারণাই সমাজে খুব বেশি গ্রহণযোগ্য ছিল না।

সাবিত্রীবাই নিজের হাতে সেই পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন।

পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ফুলে দম্পতির নাম জড়িয়ে যায়।

স্কুলে যাওয়ার পথে অপমান

সাবিত্রীবাইয়ের শিক্ষকতা সহজ ছিল না।

প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে তাঁকে নানা অপমান ও বাধার মুখোমুখি হতে হতো। রক্ষণশীল কিছু মানুষ তাঁর দিকে কাদা, গোবর বা নানা জিনিস ছুড়ে দিতেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

তাঁকে গালিগালাজও সহ্য করতে হয়েছে।

কিন্তু তিনি একটি অসাধারণ কৌশল গ্রহণ করেছিলেন।

তিনি স্কুলে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত একটি শাড়ি সঙ্গে রাখতেন। স্কুলে পৌঁছে নোংরা হয়ে যাওয়া শাড়ি বদলে তিনি মেয়েদের পড়াতে বসতেন।

এই ঘটনা তাঁর দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে আছে।

অপমান তাঁকে থামাতে পারেনি।

বরং প্রতিদিনের সেই অপমান যেন তাঁর সংকল্পকে আরও শক্তিশালী করেছিল।

শিক্ষাকে সবার অধিকার করার চেষ্টা

সাবিত্রীবাইয়ের কাছে শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের অধিকার ছিল না।

তিনি চেয়েছিলেন সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ, দরিদ্র পরিবার এবং নারীরাও শিক্ষার সুযোগ পাক।

এই ভাবনা তাঁর সময়ের প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ তৈরি করেছিল।

তিনি বুঝেছিলেন, অশিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি সামাজিক বৈষম্যকে আরও শক্তিশালী করে।

শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।

বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান

সাবিত্রীবাই ও জ্যোতিরাও ফুলে বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।

তাঁরা এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে মানুষের মর্যাদা জন্মের ওপর নির্ভর করবে না।

সাবিত্রীবাই বিশেষভাবে নিপীড়িত নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

তাঁর কাজের মধ্যে শিক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়—দুই বিষয়ই পাশাপাশি চলেছে।

বিধবা ও অসহায় নারীদের জন্য কাজ

তৎকালীন সমাজে বিধবাদের জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন।

বিধবাদের ওপর নানা সামাজিক নিষেধাজ্ঞা ছিল। অনেকে পরিবার ও সমাজের কাছ থেকেও বঞ্চিত হতেন।

সাবিত্রীবাই তাঁদের জন্য আশ্রয় ও সহায়তার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেন।

তিনি এবং জ্যোতিরাও এমন একটি আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে বিপন্ন নারী ও শিশুদের সাহায্য করা হতো।

বিশেষ করে অবিবাহিত মা এবং সমাজের ভয়ে পরিত্যক্ত শিশুদের জন্য তাঁদের উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কন্যাশিশুর জীবন রক্ষায় উদ্যোগ

সেই সময় অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক লজ্জা ও কুসংস্কারের কারণে অবাঞ্ছিত বা অসহায় নবজাতককে বিপদের মুখে পড়তে হতো।

ফুলে দম্পতি এমন শিশুদের রক্ষা করার জন্য উদ্যোগ নেন।

তাঁদের প্রতিষ্ঠিত আশ্রয়ব্যবস্থায় অসহায় নারী ও শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এটি ছিল সেই সময়ের তুলনায় অত্যন্ত সাহসী মানবিক পদক্ষেপ।

কবি সাবিত্রীবাই

সাবিত্রীবাই শুধু শিক্ষিকা ও সমাজসংস্কারক ছিলেন না; তিনি ছিলেন কবিও।

তাঁর কবিতায় শিক্ষা, আত্মমর্যাদা, সামাজিক জাগরণ এবং মানুষের মুক্তির কথা উঠে এসেছে।

তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি না হলে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

তাঁর লেখার ভাষায় ছিল জাগরণের আহ্বান।

তিনি মানুষকে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞান অর্জনের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।

নারীকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বার্তা

সাবিত্রীবাইয়ের কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নারীর আত্মনির্ভরতার ধারণা।

তিনি বুঝেছিলেন, একজন নারী যদি শিক্ষিত হন, তাহলে তিনি নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করতে পারেন।

শিক্ষা তাঁকে নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।

নিজের মতামত প্রকাশের সাহস দেয়।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়।

এই কারণেই নারীশিক্ষাকে তিনি সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে সংগ্রাম

সামাজিক সংস্কারের পথে কাজ করতে গিয়ে সাবিত্রীবাইকে ব্যক্তিগত জীবনেও বহু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

তাঁদের কাজ সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যাওয়ায় তাঁদের বিরোধিতা করা হয়েছিল।

কিন্তু তিনি নিজের পথ পরিবর্তন করেননি।

তিনি বুঝেছিলেন, সমাজের গভীরে থাকা অন্যায়কে বদলাতে গেলে প্রথমে প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়।

সেই প্রতিরোধকে তিনি নিজের কাজের অংশ হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন।

প্লেগ মহামারির সময় মানবসেবা

জীবনের শেষ অধ্যায়েও সাবিত্রীবাই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

১৮৯৬-৯৭ সালের প্লেগ মহামারির সময় তিনি আক্রান্ত মানুষদের সাহায্য করতে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসেন।

তিনি রোগীদের সাহায্য করার জন্য নিজে ঝুঁকি নেন।

অন্যরা যখন সংক্রমণের ভয়ে দূরে সরে যাচ্ছিল, তখন তিনি অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

এই মানবিক কাজের সময়ই তিনি নিজে প্লেগে আক্রান্ত হন।

১৮৯৭ সালের ১০ মার্চ তাঁর মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর পরেও যে আদর্শ বেঁচে আছে

সাবিত্রীবাই ফুলে চলে গিয়েছেন এক শতাব্দীরও বেশি আগে। কিন্তু তাঁর আদর্শ আজও জীবন্ত।

ভারতে নারীশিক্ষার প্রসার, সামাজিক ন্যায় এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে আলোচনা হলেই তাঁর নাম ফিরে আসে।

আজ লক্ষ লক্ষ মেয়ে স্কুলে যায়, কলেজে পড়ে, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, ডাক্তার, প্রশাসক, শিল্পী কিংবা উদ্যোক্তা হয়।

এই বাস্তবতা একদিনে তৈরি হয়নি।

সাবিত্রীবাইয়ের মতো মানুষরা সেই পথ তৈরির জন্য সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।

আজকের সমাজে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা

বর্তমান সময়ে শিক্ষার সুযোগ অনেক বেড়েছে। তবুও সমাজের সব স্তরের মানুষ সমান সুযোগ পায় না।

দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, সামাজিক বৈষম্য এবং শিক্ষার সুযোগের অসমতা এখনও বিভিন্ন জায়গায় সমস্যা সৃষ্টি করে।

এই পরিস্থিতিতে সাবিত্রীবাইয়ের শিক্ষা আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নয়।

শিক্ষা মানুষকে সচেতন করে।

শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়।

শিক্ষা মানুষকে নিজের অধিকার বুঝতে শেখায়।

আর সেই কারণেই শিক্ষার প্রসারই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।

উপসংহার

সাবিত্রীবাই ফুলের জীবন ছিল এক অসাধারণ সাহসের গল্প।

একটি এমন সমাজে, যেখানে মেয়েদের শিক্ষাই গ্রহণযোগ্য ছিল না, সেখানে তিনি নিজে শিক্ষিত হলেন এবং অন্য মেয়েদের হাতে বই তুলে দিলেন।

পথে অপমান সহ্য করেও তিনি স্কুলে গিয়েছেন। সামাজিক বিরোধিতা সত্ত্বেও নারীশিক্ষার কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। বিধবা, অসহায় নারী ও শিশুদের জন্য কাজ করেছেন। কবিতায় মানুষের মধ্যে জাগরণের বার্তা দিয়েছেন। আর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—একজন মানুষের হাতে যদি জ্ঞানের আলো থাকে, তবে সেই আলো শুধু তাঁর নিজের জীবন নয়, একটি সমাজের ভবিষ্যৎও বদলে দিতে পারে।

সাবিত্রীবাই ফুলে তাই শুধু ভারতের প্রথমদিকের নারী শিক্ষিকাদের একজন নন; তিনি ভারতীয় সমাজে নারীশিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনের এক শক্তিশালী প্রতীক।

যে হাতে একদিন বই উঠেছিল, সেই হাতই হাজার হাজার মেয়ের ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিয়েছিল।

এই কারণেই সাবিত্রীবাই ফুলের নাম ভারতীয় ইতিহাসে চিরকাল এক সাহসী, সংগ্রামী ও মহীয়সী নারীর নাম হয়ে থাকবে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ইলা ভাট: কর্মজীবী নারীদের আত্মনির্ভরতার পথ দেখানো এক মহীয়সী নারী।

ভূমিকা

একজন নারী যখন নিজের হাতে উপার্জন করেন, তখন শুধু তাঁর নিজের জীবনই বদলে যায় না—বদলে যেতে পারে তাঁর পরিবার, সন্তান এবং গোটা সমাজের ভবিষ্যৎ। কিন্তু ভারতের দরিদ্র ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত বহু নারী দীর্ঘদিন ধরে শ্রম দিলেও তাঁদের কাজের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং আর্থিক সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত।

এই বাস্তবতা বদলানোর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ইলা রমেশ ভাট। তিনি ছিলেন একজন আইনজীবী, সমাজকর্মী এবং নারী-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মী।

তাঁর সবচেয়ে পরিচিত উদ্যোগ Self-Employed Women’s Association বা SEWA। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি এমন বহু নারীকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেন, যাঁরা ঘরে বসে কাজ করতেন, রাস্তার ধারে পণ্য বিক্রি করতেন, কৃষিকাজ করতেন, নির্মাণক্ষেত্রে শ্রম দিতেন বা ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে সংসার চালাতেন।

ইলা ভাটের দর্শন ছিল সহজ—নারীকে শুধু সাহায্য করলে হবে না, তাঁকে এমন সুযোগ দিতে হবে যাতে তিনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন।

শৈশব ও শিক্ষা

ইলা ভাটের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর আহমেদাবাদে। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষিত এবং সামাজিকভাবে সচেতন।

তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। আইনশাস্ত্রের শিক্ষা পরবর্তীকালে তাঁর কর্মজীবনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

কারণ তিনি খুব কাছ থেকে দেখতে পেয়েছিলেন, সমাজের প্রান্তিক মানুষের সমস্যা শুধু অর্থের অভাবের কারণে তৈরি হয় না। অনেক সময় তাঁদের অধিকার, শ্রমের মূল্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সংগঠিত হওয়ার সুযোগের অভাবও তাঁদের দুর্বল করে রাখে।

শ্রমজীবী নারীদের বাস্তবতা

ইলা ভাটের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি সমস্যাকে দূর থেকে দেখেননি।

তিনি অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত নারীদের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন।

একজন সবজি বিক্রেতা হয়তো প্রতিদিন ভোরে বাজারে যান। একজন কাপড়ের কাজ করা নারী বাড়িতে বসে দীর্ঘ সময় শ্রম দেন। কেউ আবার মাথায় বোঝা নিয়ে কাজ করেন বা ছোট দোকান চালান।

এঁদের অনেকেই ছিলেন স্বনির্ভর কর্মজীবী। কিন্তু তাঁদের কাজকে অনেক সময় প্রচলিত অর্থে “চাকরি” হিসেবে দেখা হতো না।

ফলে তাঁদের জন্য শ্রমিক হিসেবে সংগঠিত হওয়া বা বিভিন্ন সামাজিক সুবিধা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।

ইলা ভাট এই সমস্যাটিকেই গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনেন।

SEWA প্রতিষ্ঠার গল্প

১৯৭২ সালে ইলা ভাট Self-Employed Women’s Association (SEWA) প্রতিষ্ঠা করেন।

এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, কারণ এখানে মূল লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভর ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত নারীদের সংগঠিত করা।

SEWA-র মাধ্যমে নারীরা নিজেদের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে একসঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।

তাঁদের মধ্যে সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সমর্থনের কাঠামো তৈরি হয়।

এই সংগঠনের ভাবনা ছিল—দরিদ্র নারীকে শুধু সাহায্য গ্রহণকারী হিসেবে না দেখে তাঁকে একজন কর্মী, উপার্জনকারী এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মানুষ হিসেবে দেখা।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্ব

ইলা ভাট বুঝেছিলেন, নারীর স্বাধীনতার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

একজন নারী নিজের আয় করতে পারলে পরিবারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাঁর ভূমিকা বাড়তে পারে। সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, খাবার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে।

কিন্তু আয় করাই যথেষ্ট নয়।

সেই আয় নিরাপদে রাখা, প্রয়োজনে ঋণ পাওয়া, সঞ্চয় করা এবং নিজের কাজকে আরও বড় করার সুযোগও প্রয়োজন।

এই কারণেই SEWA-র কাজ শুধু সংগঠন তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

দরিদ্র নারীদের জন্য সমবায় ভাবনা

ইলা ভাট সমবায় ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

ছোট ছোট আয়ের নারীরা যখন একসঙ্গে সংগঠিত হন, তখন তাঁরা নিজেদের সঞ্চয়, ঋণ এবং ব্যবসার বিভিন্ন প্রয়োজন নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারেন।

এই পদ্ধতি নারীদের মধ্যে আর্থিক শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—নারীদের নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

ব্যাংকিংয়ের নতুন দরজা

দরিদ্র ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা নারীদের অনেকেরই প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশ করা কঠিন ছিল।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য ১৯৭৪ সালে SEWA Bank প্রতিষ্ঠিত হয়।

ব্যাংকটি মূলত দরিদ্র স্বনির্ভর কর্মজীবী নারীদের আর্থিক পরিষেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে।

এর মাধ্যমে ছোট সঞ্চয়, ঋণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়।

এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা নারীও একজন আর্থিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি এবং তাঁরও ব্যাংকিং পরিষেবার অধিকার থাকা উচিত।

সংগঠিত হওয়ার শক্তি

ইলা ভাটের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—একজন মানুষ একা যতটা করতে পারেন, সংগঠিত মানুষ তার চেয়ে অনেক বেশি করতে পারেন।

একজন নারী যদি একা নিজের শ্রমের ন্যায্য মূল্য দাবি করেন, তাঁর পক্ষে তা কঠিন হতে পারে।

কিন্তু একই সমস্যায় থাকা হাজার হাজার নারী যদি একসঙ্গে নিজেদের কথা বলেন, তাহলে তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়।

এই সংগঠিত শক্তিকেই ইলা ভাট তাঁর কাজের অন্যতম ভিত্তি করেছিলেন।

শ্রমের মর্যাদা

ইলা ভাটের চিন্তায় একটি বিষয় বারবার সামনে আসে—শ্রমের মর্যাদা

অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা নারীদের অনেক কাজই ঘরের কাজ এবং জীবিকার কাজের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।

কেউ বাড়িতে খাবার তৈরি করে বিক্রি করেন, কেউ কাপড় তৈরি করেন, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করেন।

এই কাজগুলিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ইলা ভাটের কাজ সেই অদৃশ্য শ্রমকে দৃশ্যমান করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নারী ও নেতৃত্ব

ইলা ভাট শুধু নারীদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করার কথা বলেননি। তিনি তাঁদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগও তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

যে নারী নিজের জীবনের সমস্যার কথা জানেন, তিনিই সেই সমস্যার সমাধানের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন—এই ধারণা তাঁর কাজের মধ্যে ছিল।

ফলে SEWA-র কাঠামোর মধ্যেও সাধারণ কর্মজীবী নারীদের নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ইলা ভাটের কাজ ভারতের সীমা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পরিচিতি লাভ করে।

তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দরিদ্র নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়।

তিনি Ramon Magsaysay Award-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করেন।

তবে তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি ছিল সেইসব নারীর জীবনে পরিবর্তন, যাঁরা নিজেদের শ্রম ও সংগঠনের মাধ্যমে নতুন সুযোগ পেয়েছিলেন।

শুধু দারিদ্র্য দূরীকরণ নয়

ইলা ভাটের কাজকে শুধু দারিদ্র্য দূরীকরণের উদ্যোগ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তিনি নারীর মর্যাদা, আত্মনির্ভরতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

তাঁর কাছে একজন নারী শুধু পরিবারের সদস্য নন। তিনি একজন কর্মী, উদ্যোক্তা, সঞ্চয়কারী, উৎপাদক এবং অর্থনৈতিক নাগরিক।

এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কাজকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র নারীদের জন্য শিক্ষা

ভারতের অর্থনীতির একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অসংগঠিত ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল।

এই ক্ষেত্রে কর্মরত মানুষের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নারী।

তাঁদের কাজ অনেক সময় আনুষ্ঠানিক নথিতে ধরা পড়ে না। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান বা আর্থিক পরিষেবার ক্ষেত্রেও তাঁরা পিছিয়ে পড়তে পারেন।

ইলা ভাটের কাজ দেখিয়েছে, উন্নয়নের পরিকল্পনায় এই কর্মজীবী নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

ইলা ভাটের জীবন থেকে নতুন প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সাহায্য করার পাশাপাশি ক্ষমতায়নের পথ তৈরি করতে হয়।

কাউকে একবার সাহায্য করলে হয়তো সাময়িক সমস্যা মেটে। কিন্তু একজন মানুষকে যদি এমন সুযোগ দেওয়া যায় যাতে তিনি নিজেই নিজের আয় তৈরি করতে পারেন, সঞ্চয় করতে পারেন এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তাহলে পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

আরেকটি শিক্ষা হলো—ছোট কাজ বলে কোনো কাজকে অবহেলা করা উচিত নয়।

একজন রাস্তার বিক্রেতা, কারিগর, কৃষিশ্রমিক বা গৃহভিত্তিক কর্মীর শ্রমও অর্থনীতির অংশ।

তাঁর উত্তরাধিকার

ইলা ভাট ২০২২ সালের ২ নভেম্বর আহমেদাবাদে মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর চলে যাওয়ার পরও তাঁর প্রতিষ্ঠিত ভাবনা এবং সংগঠন নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

SEWA-র মতো উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে দরিদ্র নারীদের নিয়ে কাজ করার সময় তাঁদের শুধু সুবিধাভোগী হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাঁদের নিজেদের সংগঠনের নেতৃত্বে আনা সম্ভব।

এই চিন্তাধারা ভারতের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক আলোচনায় প্রভাব ফেলেছে।

উপসংহার

ইলা ভাটের জীবন ছিল মানুষের ক্ষমতাকে বিশ্বাস করার গল্প।

তিনি বুঝেছিলেন, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে সম্ভব নয়। মানুষের নিজের ক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নারীদের এমন সুযোগ দিতে হবে যাতে তাঁরা নিজের শ্রমের মূল্য বুঝতে পারেন, সঞ্চয় করতে পারেন, ঋণ নিতে পারেন, ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তিনি যে নারীদের নিয়ে কাজ করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই সমাজের চোখে হয়তো ছোট পেশার মানুষ ছিলেন। কিন্তু ইলা ভাট তাঁদের কাজের মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন।

তিনি দেখিয়েছিলেন—অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু উপার্জনের বিষয় নয়; এটি আত্মসম্মান, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতে তুলে নেওয়ারও একটি পথ।

তাই ইলা ভাটের জীবন ভারতীয় সমাজে নারী ক্ষমতায়নের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তিনি এমন একটি ভাবনা রেখে গেছেন, যার মূল কথা খুব সহজ—নারীকে সুযোগ দিন, সংগঠিত হতে সাহায্য করুন, নিজের শক্তি দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিন।

এই দর্শনই তাঁকে একজন সমাজকর্মী থেকে আরও বড় পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে—তিনি হয়ে উঠেছেন আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন দেখা অসংখ্য নারীর এক অনুপ্রেরণার নাম।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

মীরা মুখোপাধ্যায়: ধাতুর শরীরে মানুষের জীবনকে ফুটিয়ে তোলা এক অনন্য শিল্পী।

ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা শুধু ছবি আঁকেননি বা ভাস্কর্য নির্মাণ করেননি—তাঁরা সাধারণ মানুষের জীবন, শ্রম, আবেগ ও সংস্কৃতিকে শিল্পের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মীরা মুখোপাধ্যায় ছিলেন তেমনই একজন শিল্পী। ভারতীয় আধুনিক ভাস্কর্যের জগতে তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়, কারণ তিনি ব্রোঞ্জ ও ধাতুর মাধ্যমে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে এমনভাবে তুলে ধরেছিলেন, যা একই সঙ্গে বাস্তব, সংবেদনশীল এবং গভীরভাবে ভারতীয়।

মীরা মুখোপাধ্যায়ের শিল্পে রাজা-রানি বা কেবল বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের চেয়ে বেশি জায়গা পেয়েছে সাধারণ মানুষ। কারিগর, তাঁতি, মৎস্যজীবী, বাদ্যযন্ত্রী, শ্রমজীবী মানুষ কিংবা গ্রামীণ জীবনের নানা চরিত্র তাঁর শিল্পের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাঁদের মুখের রেখা, শরীরের ভঙ্গি এবং কাজের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক ধরনের সৌন্দর্য।

শিল্পের প্রতি শৈশব থেকেই আকর্ষণ

মীরা মুখোপাধ্যায় ১৯২৩ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই শিল্প ও সংস্কৃতির পরিবেশ তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে তিনি শিল্পচর্চাকে নিজের জীবনের প্রধান পথ হিসেবে বেছে নেন।

তাঁর শিল্পশিক্ষার পথ ছিল সহজ নয়। তিনি বিভিন্ন শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীকালে দেশের বাইরে গিয়েও শিল্পের নানা পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। ইউরোপীয় শিল্পের সঙ্গে পরিচয় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করলেও তিনি নিজের শিল্পে ভারতীয় ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনকে কখনও হারিয়ে ফেলেননি।

বরং দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতাকে নিজের শিল্পবোধের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন একটি স্বতন্ত্র ভাষা।

শান্তিনিকেতনের প্রভাব

মীরা মুখোপাধ্যায়ের শিল্পভাবনার বিকাশে শান্তিনিকেতনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শান্তিনিকেতনের শিল্পচর্চায় প্রকৃতি, মানুষ, লোকজ ঐতিহ্য এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত।

এই পরিবেশ তাঁর শিল্পদৃষ্টিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

তাঁর কাছে শিল্প কোনও বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না। একজন সাধারণ মানুষ যে কাজটি প্রতিদিন করে চলেছেন, সেই কাজের মধ্যেও যে সৌন্দর্য রয়েছে—তিনি সেটিই দেখতে চেয়েছিলেন।

এই কারণেই তাঁর ভাস্কর্যে দেখা যায় জীবন্ত মানুষের উপস্থিতি। তাঁর তৈরি মূর্তিগুলিকে শুধু একটি স্থির অবয়ব বলে মনে হয় না; বরং মনে হয় তারা যেন কোনও মুহূর্তে কথা বলবে, কাজ শুরু করবে কিংবা নিজের জীবনের গল্প বলতে শুরু করবে।

ব্রোঞ্জে তৈরি আলাদা এক শিল্পভাষা

মীরা মুখোপাধ্যায়ের শিল্পের সঙ্গে ব্রোঞ্জের কাজ বিশেষভাবে যুক্ত। ব্রোঞ্জ ঢালাইয়ের প্রাচীন ‘লস্ট-ওয়াক্স’ বা মোমের ছাঁচ ব্যবহার করে ভাস্কর্য তৈরির পদ্ধতিতে তিনি বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

এই পদ্ধতি কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতার বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, নিখুঁত পর্যবেক্ষণ এবং উপাদানের প্রতি গভীর বোঝাপড়া।

মীরা মুখোপাধ্যায় এই প্রাচীন পদ্ধতিকে আধুনিক শিল্পভাবনার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর হাতে ব্রোঞ্জ হয়ে উঠেছিল মানুষের জীবন প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

তাঁর ভাস্কর্যের পৃষ্ঠে অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবে অসমতলতা, খসখসে ভাব কিংবা হাতের কাজের চিহ্ন দেখা যায়। এই বৈশিষ্ট্য তাঁর শিল্পকে যান্ত্রিক নিখুঁততার বদলে মানবিক উষ্ণতা দিয়েছে।

সাধারণ মানুষই হয়ে উঠলেন শিল্পের নায়ক

মীরা মুখোপাধ্যায়ের শিল্পের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ।

একজন তাঁতি দিনের পর দিন বসে কাপড় বুনছেন। একজন মৎস্যজীবী নদী বা সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই করে জীবিকা অর্জন করছেন। একজন কারিগর নিজের হাতে কোনও বস্তু তৈরি করছেন। একজন বাদ্যযন্ত্রী সুর সৃষ্টি করছেন।

সমাজের চোখে এগুলি হয়তো প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনা। কিন্তু মীরা মুখোপাধ্যায়ের চোখে এগুলিই ছিল অসাধারণ।

তিনি বুঝেছিলেন, ভারতের প্রকৃত সাংস্কৃতিক ইতিহাস শুধু বড় বড় প্রাসাদ, স্মৃতিস্তম্ভ বা রাজপরিবারের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষের শ্রম, দক্ষতা ও জীবনযাত্রার মধ্যেও দেশের সংস্কৃতি বেঁচে থাকে।

তাই তাঁর শিল্পে শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি এত গুরুত্বপূর্ণ।

শিল্পীর চোখে কারিগর

মীরা মুখোপাধ্যায় নিজেও হাতের কাজের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁর শিল্পচর্চায় কারুশিল্প ও ভাস্কর্যের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছিল।

তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের কারিগরদের কাজ কাছ থেকে দেখেছেন এবং তাঁদের দক্ষতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। বিশেষ করে বাংলার লোকশিল্প, ধাতুশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প তাঁর শিল্পভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছিল।

তিনি বুঝেছিলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে কারিগররা হাতে হাতে শিল্পের ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন, তাঁদের জ্ঞানও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সম্পদ।

এই উপলব্ধি তাঁর কাজকে শুধু আধুনিক শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। তাঁর শিল্পে ভারতীয় লোকজ সংস্কৃতিরও একটি শক্তিশালী উপস্থিতি দেখা যায়।

উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রতি আকর্ষণ

মীরা মুখোপাধ্যায়ের জীবনে উত্তর-পূর্ব ভারতের সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। সেখানকার মানুষ, কারুশিল্প ও জীবনযাত্রা তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল।

বিশেষ করে তাঁদের হাতে তৈরি বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে তিনি যে সৌন্দর্য দেখতে পেয়েছিলেন, তা তাঁর শিল্পে প্রতিফলিত হয়েছে।

শিল্পীর এই আগ্রহ ছিল কেবল বাইরের সৌন্দর্য দেখার আগ্রহ নয়। তিনি মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করতেন।

কোনও একটি অঞ্চলের মানুষ কীভাবে কাজ করেন, কীভাবে তাঁদের সংস্কৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এগিয়ে যায়—এসব বিষয় তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

নারীর শিল্পীসত্তার এক শক্তিশালী উদাহরণ

যে সময়ে ভারতীয় শিল্পজগতে পুরুষ শিল্পীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত প্রবল, সেই সময়ে একজন নারী হিসেবে মীরা মুখোপাধ্যায় নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন।

তাঁর সাফল্য কেবল একজন নারী শিল্পীর সাফল্য নয়; এটি ছিল নিজের শিল্পভাবনার প্রতি অবিচল থাকার একটি উদাহরণ।

তিনি প্রচলিত রুচির পিছনে ছুটে নিজের শিল্পকে পরিবর্তন করেননি। বরং নিজের পছন্দের বিষয়, উপাদান এবং পদ্ধতিকে অনুসরণ করে ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় তৈরি করেছিলেন।

তাঁর কাজ প্রমাণ করে যে শিল্পীর পরিচয় শুধু তাঁর লিঙ্গের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় তাঁর কাজ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে।

শিল্পের মধ্যে মানবিকতা

মীরা মুখোপাধ্যায়ের ভাস্কর্য দেখলে একটি বিষয় বিশেষভাবে অনুভব করা যায়—মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা।

তিনি মানুষের শরীরকে শুধু একটি আকৃতি হিসেবে দেখেননি। মানুষের শরীরের ভঙ্গি, পরিশ্রমের চিহ্ন, মুখের অভিব্যক্তি এবং জীবনের অভিজ্ঞতাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর তৈরি চরিত্রগুলির মধ্যে তাই এক ধরনের নীরব গল্প থাকে।

কেউ কাজ করছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন, কেউ বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন—কিন্তু প্রত্যেকের মধ্যেই যেন একটি সম্পূর্ণ জীবন লুকিয়ে আছে।

এই মানবিক দৃষ্টিই তাঁর শিল্পকে বিশেষ করে তুলেছে।

শিল্পের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক

মীরা মুখোপাধ্যায় বিশ্বাস করতেন, শিল্পকে মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। শিল্প যদি মানুষের অভিজ্ঞতা, আনন্দ, দুঃখ, শ্রম ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত না থাকে, তবে তার প্রাণশক্তি অনেকটাই কমে যায়।

তাই তাঁর কাজের মধ্যে বিলাসী জীবনের চেয়ে সাধারণ জীবনের উপস্থিতি বেশি।

একজন শিল্পী হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন, চারপাশের পৃথিবীকে মন দিয়ে দেখলে প্রতিদিনের জীবন থেকেও অসংখ্য শিল্পের বিষয় খুঁজে পাওয়া যায়।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

মীরা মুখোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘ শিল্পজীবনে দেশ-বিদেশে সম্মান ও স্বীকৃতি লাভ করেন। তাঁর শিল্প ভারতীয় ভাস্কর্যের জগতে একটি স্বতন্ত্র স্থান তৈরি করে।

তবে তাঁর উত্তরাধিকার শুধু পুরস্কার বা প্রদর্শনীর তালিকায় সীমাবদ্ধ নয়।

তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো—তিনি ভারতীয় শিল্পে সাধারণ মানুষের জীবনকে একটি মর্যাদাপূর্ণ ও শক্তিশালী বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছেন।

শেষ জীবনের সৃষ্টিশীলতা

জীবনের শেষ পর্যায়েও মীরা মুখোপাধ্যায় শিল্পচর্চা থেকে দূরে সরে যাননি। দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার ফলে তাঁর শিল্পে আরও পরিণত মানবিকতা ও গভীরতা তৈরি হয়েছিল।

১৯৯৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর শিল্প আজও ভারতীয় ভাস্কর্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।

তাঁর কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন শিল্পীর জীবন শেষ হয়ে গেলেও তাঁর সৃষ্টি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে থাকে।

উত্তরাধিকার

মীরা মুখোপাধ্যায়ের জীবন থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল—সৃষ্টিশীলতার জন্য বড় বিষয়ের অপেক্ষা করতে হয় না।

আমাদের চারপাশের সাধারণ মানুষ, তাঁদের কাজ, তাঁদের জীবনযাপন, তাঁদের আনন্দ ও সংগ্রাম—সবকিছুর মধ্যেই অসাধারণ সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকতে পারে।

তিনি সেই সৌন্দর্যকে দেখেছিলেন এবং ব্রোঞ্জের শরীরে তাকে স্থায়ী রূপ দিয়েছিলেন।

তাঁর শিল্প আমাদের শেখায়, একজন প্রকৃত শিল্পী শুধু যা চোখে দেখা যায় তা তুলে ধরেন না; তিনি দৃশ্যমান জীবনের ভিতরে থাকা অদৃশ্য অনুভূতিকেও প্রকাশ করেন।

উপসংহার

মীরা মুখোপাধ্যায় ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি ভারতীয় ভাস্কর্যকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আরও কাছে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর হাতে ব্রোঞ্জ শুধু ধাতু ছিল না—তা হয়ে উঠেছিল শ্রম, সংস্কৃতি, স্মৃতি এবং মানবিকতার ভাষা।

তাঁর শিল্পে যে মানুষগুলি দেখা যায়, তাঁরা ইতিহাসের বিখ্যাত চরিত্র নন। তাঁরা আমাদের চারপাশের মানুষ। তাঁদের জীবনই মীরা মুখোপাধ্যায় শিল্পের বিষয় করে তুলেছিলেন।

এই কারণেই তাঁর কাজ আজও প্রাসঙ্গিক।

একজন শিল্পীর প্রকৃত সাফল্য হয়তো তখনই, যখন তাঁর সৃষ্টি দর্শককে নিজের চারপাশের মানুষ ও জীবনকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়। মীরা মুখোপাধ্যায় সেই কাজটিই করেছিলেন। তাঁর জীবন ও শিল্প তাই ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

সুনীতা নারায়ণ: পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর।

ভারতের উন্নয়নের ইতিহাসে পরিবেশ নিয়ে আলোচনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বাস্তবে পরিবেশ রক্ষার কাজটি ততটাই কঠিন। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, দূষণ, জলসংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলি সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই জটিল বিষয়গুলিকে সাধারণ মানুষের সামনে সহজ ভাষায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে যাঁরা দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে সুনীতা নারায়ণের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তিনি শুধু একজন পরিবেশকর্মী নন; একজন গবেষক, লেখক এবং পরিবেশ-নীতির গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবেও তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন রয়েছে। তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—পরিবেশকে তিনি কেবল গাছপালা বা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয় হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে পরিষ্কার বাতাস, নিরাপদ জল, স্বাস্থ্যকর শহর এবং টেকসই উন্নয়নও পরিবেশেরই অংশ।

ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ

সুনীতা নারায়ণের জন্ম ১৯৬১ সালে নয়াদিল্লিতে। বড় হয়ে ওঠার সময় থেকেই পরিবেশ ও প্রকৃতির নানা বিষয় তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে।

ভারতে তখন পরিবেশ সংক্রান্ত আলোচনা আজকের মতো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আলোচনার অংশ ছিল না। শিল্পোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে সামনে রেখে উন্নয়নের ধারণা তৈরি হচ্ছিল। সেই সময় পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি নিয়ে কাজ করা ছিল অনেকটাই ভিন্ন ধরনের পথ বেছে নেওয়া।

সুনীতা নারায়ণ সেই পথই বেছে নেন।

সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট

তাঁর কর্মজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত প্রতিষ্ঠান হল Centre for Science and Environment (CSE)। এই প্রতিষ্ঠান পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, জল, বায়ুদূষণ, টেকসই উন্নয়ন এবং পরিবেশনীতি নিয়ে গবেষণা ও জনসচেতনতার কাজ করে।

সুনীতা নারায়ণ দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এবং এর নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

CSE-র কাজের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল গবেষণাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। পরিবেশ নিয়ে অনেক আলোচনা অত্যন্ত প্রযুক্তিগত ভাষায় হয়। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বিষয়টি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

সুনীতা নারায়ণ ও তাঁর সহকর্মীরা গবেষণা, তথ্য এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়গুলিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

পরিবেশ মানেই মানুষের স্বাস্থ্য

সুনীতা নারায়ণের চিন্তাভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক।

বায়ু দূষণ শুধু আকাশের একটি সমস্যার নাম নয়। দূষিত বাতাস মানুষের ফুসফুস, হৃদ্‌যন্ত্র এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে দূষিত জল মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

এই কারণে পরিবেশ রক্ষাকে তিনি মানুষের অধিকার এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন।

বিশেষ করে দিল্লি ও ভারতের অন্যান্য শহরের বায়ুদূষণ নিয়ে তাঁর কাজ এবং বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরে জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে।

বায়ুদূষণ নিয়ে দীর্ঘ লড়াই

ভারতের বড় শহরগুলিতে বায়ুদূষণ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। কিন্তু বহু বছর আগে এই বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা আজকের তুলনায় অনেক কম ছিল।

সুনীতা নারায়ণ এবং CSE-র কাজ এই আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করতে সাহায্য করে।

দিল্লির বাতাসে দূষণের মাত্রা, যানবাহনের ধোঁয়া, জ্বালানির ব্যবহার, শিল্পদূষণ এবং শহরের পরিবহন ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলি নিয়ে গবেষণা ও জনসচেতনতার কাজ করা হয়েছে।

তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল একটি সহজ প্রশ্ন—শহরের উন্নয়ন যদি মানুষের শ্বাস নেওয়ার অধিকারকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে সেই উন্নয়নের ধরন নিয়ে কি নতুন করে ভাবা উচিত নয়?

এই প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও পরিবহন

পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দূষণের অভিযোগ তুললেই সমস্যার সমাধান হয় না। দূষণের উৎস কমানোর জন্য নীতি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রয়োজন।

এই বিষয়টিও সুনীতা নারায়ণের কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শহরের পরিবহন ব্যবস্থা কীভাবে আরও পরিবেশবান্ধব করা যায়, কীভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো যায় এবং কীভাবে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে গণপরিবহনকে শক্তিশালী করা যায়—এসব বিষয় নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করেছেন।

এর ফলে পরিবেশের বিষয়টি কেবল গাছ লাগানোর প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নগর পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণের আলোচনায় আরও জায়গা পেয়েছে।

জল সংরক্ষণের গুরুত্ব

ভারতের মতো দেশে জল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বৃষ্টির জল, ভূগর্ভস্থ জল, নদী এবং জলাশয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জীবন ও কৃষি উভয়ই সমস্যার মুখে পড়তে পারে।

সুনীতা নারায়ণের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জল ও জল ব্যবস্থাপনা।

তিনি বারবার দেখিয়েছেন যে জল সমস্যার সমাধান শুধু বড় বাঁধ বা বড় প্রকল্পের ওপর নির্ভর করতে পারে না। স্থানীয় জলসম্পদ, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ এবং মানুষের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের বহু অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী জল সংরক্ষণ ব্যবস্থার যে জ্ঞান রয়েছে, তার গুরুত্বও পরিবেশ আলোচনায় উঠে এসেছে।

পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের অধিকার

সুনীতা নারায়ণের পরিবেশ ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল সামাজিক ন্যায়ের বিষয়টি।

পরিবেশ দূষণের প্রভাব সব মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। দরিদ্র মানুষ অনেক সময় বেশি দূষিত এলাকায় বসবাস করতে বাধ্য হন। তাঁদের কাছে নিরাপদ জল, পরিষ্কার বাতাস বা স্বাস্থ্যকর পরিবেশের সুযোগও সীমিত হতে পারে।

তাই পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নকে সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি।

এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবেশ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে—শুধু প্রকৃতিকে রক্ষা নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করাও এর অংশ।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ

বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হল জলবায়ু পরিবর্তন।

তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়ার ঘটনা এবং কৃষির ওপর প্রভাব—এসব বিষয় নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে।

সুনীতা নারায়ণ জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির দায়িত্বের পার্থক্য নিয়েও কথা বলেছেন।

তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—উন্নয়নশীল দেশের মানুষের উন্নয়নের অধিকারকে অস্বীকার করে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে উন্নয়নের নাম করে সীমাহীন সম্পদ ব্যবহার করাও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

এই ভারসাম্যের প্রশ্নটি তাঁর পরিবেশ ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সাংবাদিকতা ও পরিবেশ শিক্ষা

সুনীতা নারায়ণের কাজের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল পরিবেশ বিষয়ক সাংবাদিকতা ও জনশিক্ষা।

CSE-র সঙ্গে যুক্ত প্রকাশনা ও পরিবেশ সংক্রান্ত তথ্যভিত্তিক কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে জটিল পরিবেশগত বিষয় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

পরিবেশের সমস্যাকে শুধু বিশেষজ্ঞদের আলোচনার মধ্যে আটকে না রেখে সংবাদমাধ্যম, বিদ্যালয়, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের আলোচনার বিষয় করে তোলার ক্ষেত্রে এই ধরনের কাজ গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি মনে করেন, সচেতন নাগরিক ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

স্বীকৃতি ও সম্মান

পরিবেশ রক্ষা ও জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত কাজের জন্য সুনীতা নারায়ণ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান পেয়েছেন। তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক পরিবেশ আলোচনাতেও পরিচিতি লাভ করেছে।

তবে তাঁর কাজের মূল্য শুধু পুরস্কারের তালিকায় নয়।

একজন পরিবেশকর্মীর প্রকৃত কাজ হল এমন প্রশ্ন সামনে আনা, যা হয়তো অস্বস্তিকর, কিন্তু সমাজের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সুনীতা নারায়ণের দীর্ঘ কর্মজীবনে সেই প্রশ্ন তোলার প্রবণতা স্পষ্ট।

তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

সুনীতা নারায়ণের জীবন তরুণদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে—পরিবর্তন আনতে হলে নিজের ক্ষেত্রকে মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে গেলে শুধু প্রকৃতিকে ভালোবাসলেই হয় না। বিজ্ঞান, অর্থনীতি, প্রশাসন, সমাজ এবং মানুষের আচরণ—সবকিছুকে বুঝতে হয়।

তাঁর কাজ দেখায়, একজন মানুষ গবেষণা, সাংবাদিকতা, জনসচেতনতা এবং নীতিগত আলোচনার মাধ্যমে সমাজে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তৈরি করতে পারেন।

উপসংহার

সুনীতা নারায়ণের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবেশ কোনও দূরের বিষয় নয়। আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে জল পান করি, যে রাস্তায় চলি এবং যে শহরে বাস করি—সবকিছুর সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নকে মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের প্রশ্নে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে পরিষ্কার বাতাস, নিরাপদ জল, টেকসই উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া মানে শুধু গাছ লাগানো নয়; আমাদের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি এবং উন্নয়নের পদ্ধতিও নতুন করে ভাবা।

সুনীতা নারায়ণের দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে আজকের সিদ্ধান্তগুলির পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

একজন মানুষের কণ্ঠ হয়তো একদিনে পৃথিবী বদলে দিতে পারে না। কিন্তু সেই কণ্ঠ যদি দীর্ঘদিন ধরে তথ্য, গবেষণা এবং সচেতনতার সঙ্গে কথা বলে, তবে সমাজের চিন্তার ধরন বদলানোর পথ তৈরি হতে পারে। সুনীতা নারায়ণের জীবন সেই দীর্ঘস্থায়ী প্রচেষ্টারই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ভারতের লোকশিল্পের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পধারা রয়েছে, যেগুলি কোনও রাজদরবারে জন্ম নেয়নি, কোনও বড় শিল্পবিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম থেকেও শুরু হয়নি। বরং সেগুলি গড়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের ঘর, উঠোন, উৎসব এবং বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে। বিহারের মিথিলা অঞ্চলের মধুবনী চিত্রকলা তেমনই এক শিল্পধারা।

এই লোকশিল্পকে বৃহত্তর ভারতীয় শিল্পের পরিসরে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে কয়েকজন শিল্পীর অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সীতা দেবী। একসময় যে শিল্প মূলত ঘরের দেওয়াল ও মাটির মেঝেতে আঁকা হত, সীতা দেবীর মতো শিল্পীরা সেটিকে কাগজ ও কাপড়ের মতো মাধ্যমে নিয়ে এসে বৃহত্তর দর্শকের সামনে পৌঁছে দেন।

সীতা দেবীর জীবন তাই শুধু একজন শিল্পীর জীবন নয়। এটি একটি লোকশিল্পের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রারও গল্প।

মিথিলার মাটি ও শিল্পের পরিবেশ

সীতা দেবীর শৈশব ও শিল্পজীবনের সঙ্গে মিথিলার সাংস্কৃতিক পরিবেশ গভীরভাবে যুক্ত ছিল। মিথিলা অঞ্চলে চিত্রাঙ্কনের ঐতিহ্য বহু পুরনো। বিশেষ করে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বাড়ির দেওয়াল, উঠোন এবং বিশেষ স্থানকে আলপনা ও চিত্র দিয়ে সাজানোর রীতি ছিল।

এই চিত্রের বিষয়বস্তুর মধ্যেও ছিল একটি নিজস্ব জগৎ।

রাম-সীতা, কৃষ্ণ, বিভিন্ন দেবদেবী, ফুল, পাখি, মাছ, গাছপালা, সূর্য, চাঁদ এবং প্রকৃতির নানা প্রতীক মধুবনী চিত্রকলায় বিশেষ স্থান পেয়েছে।

এই শিল্পের মাধ্যমে নারীরা তাঁদের চারপাশের পৃথিবীকে নিজেদের মতো করে প্রকাশ করতেন।

ঘরের শিল্প থেকে জীবিকার পথ

মধুবনী চিত্রকলার দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও একসময় এটি মূলত গৃহস্থালির ও আচার-অনুষ্ঠানের শিল্প ছিল। মহিলারাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পের কৌশল শিখতেন।

কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে বিহারের মিথিলা অঞ্চলে খরা ও দুর্ভিক্ষের সময় এই লোকশিল্পকে কাগজের ওপর নিয়ে এসে বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়। এর ফলে অনেক শিল্পী তাঁদের ঐতিহ্যবাহী দক্ষতার মাধ্যমে নতুন জীবিকার সুযোগ পান।

সীতা দেবী এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন।

তিনি দেওয়াল বা মাটির পরিবর্তে কাগজের ওপর মধুবনী চিত্র আঁকতে শুরু করেন। ফলে তাঁর শিল্প ঘরের সীমানা পেরিয়ে বাইরে পৌঁছতে থাকে।

রেখা ও রঙের নিজস্ব জগৎ

সীতা দেবীর শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর দৃঢ় রেখা এবং উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার।

মধুবনী চিত্রকলায় সাধারণত ছবির কোনও অংশকে একেবারে ফাঁকা রাখা হয় না। ফুল, লতা, পাতা, পাখি, মাছ কিংবা অন্যান্য নকশার মাধ্যমে ফাঁকা জায়গাগুলিকেও ভরিয়ে তোলা হয়।

এই বৈশিষ্ট্য ছবিকে একটি বিশেষ ছন্দ দেয়।

সীতা দেবীর কাজে সেই ঐতিহ্য বজায় থাকলেও তাঁর নিজস্ব শিল্পীসত্তারও প্রকাশ ঘটেছে। তাঁর আঁকা চরিত্রগুলির মধ্যে সরলতা যেমন ছিল, তেমনই ছিল শক্তিশালী প্রতীকী অর্থ।

পৌরাণিক কাহিনি থেকে সামাজিক জীবন

মধুবনী শিল্পের একটি বড় শক্তি হল—এর বিষয়বস্তু কেবল ধর্মীয় কাহিনিতে সীমাবদ্ধ নয়।

সীতা দেবীর মতো শিল্পীরা পৌরাণিক চরিত্রের পাশাপাশি প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের বিভিন্ন দিককেও শিল্পে স্থান দিয়েছেন।

রাম-সীতার কাহিনি যেমন এসেছে, তেমনই এসেছে কৃষ্ণের বিভিন্ন ঘটনা। আবার মাছ, পাখি, গাছ, ফুল এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা চিত্রও দেখা গেছে।

এইভাবে মধুবনী চিত্রকলা একটি জীবন্ত সংস্কৃতির দলিল হয়ে উঠেছে।

নারীশক্তির শিল্প

মধুবনী চিত্রকলার ইতিহাসের সঙ্গে নারীদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বহু প্রজন্ম ধরে গ্রামের মহিলারা এই শিল্পের মাধ্যমে নিজেদের সৃজনশীলতা প্রকাশ করেছেন।

কিন্তু তাঁদের কাজ দীর্ঘদিন শিল্পের মূলধারার বাইরে ছিল।

সীতা দেবীর সাফল্য সেই ব্যবধান কমাতে সাহায্য করে। তাঁর শিল্প যখন প্রদর্শনী ও বৃহত্তর শিল্পবাজারে পৌঁছতে শুরু করে, তখন মিথিলার বহু নারী শিল্পীর কাজও নতুন করে পরিচিতি পেতে থাকে।

এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে—গৃহস্থালির কাজ হিসেবে দেখা একটি শিল্প ধীরে ধীরে পেশা ও স্বতন্ত্র শিল্পচর্চার মর্যাদা লাভ করে।

ঐতিহ্যকে আধুনিক মাধ্যমে নিয়ে আসা

সীতা দেবীর কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলির একটি ছিল ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে নতুন মাধ্যম গ্রহণ করা।

দেওয়াল থেকে কাগজে চলে আসা ছিল শুধু মাধ্যমের পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে বদলে গিয়েছিল শিল্পের দর্শক, বাজার এবং সম্ভাবনাও।

আগে যে ছবি একটি নির্দিষ্ট বাড়ির দেওয়ালে সীমাবদ্ধ থাকত, সেটিই এখন অন্য শহরের মানুষ দেখতে পারছিলেন। পরে দেশের বাইরেও এই শিল্পের পরিচিতি তৈরি হয়।

এই পরিবর্তনের ফলে মধুবনী শিল্পের সামনে নতুন দরজা খুলে যায়।

আন্তর্জাতিক পরিচিতি

সীতা দেবীর শিল্প ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্তরেও পৌঁছেছিল। তাঁর শিল্পের মাধ্যমে মিথিলার লোকজ সংস্কৃতি দেশের বাইরের দর্শকদের কাছেও পরিচিতি পায়।

এটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

কারণ আন্তর্জাতিক শিল্পমঞ্চে সাধারণত যেসব শিল্পধারা বেশি পরিচিত ছিল, তার মধ্যে লোকশিল্পের স্থান তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। মধুবনী শিল্প সেই সীমা অতিক্রম করে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করে।

সীতা দেবীর মতো শিল্পীরা দেখিয়েছিলেন, একটি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শিল্পও বিশ্বমানের শিল্পচর্চার অংশ হতে পারে।

প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক

সীতা দেবীর শিল্পে প্রকৃতির উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মাছ, পাখি, গাছ, ফুল ও লতাপাতা শুধু ছবির সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়নি। এগুলির মধ্যে মিথিলার মানুষের প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাত্রার প্রতিফলনও রয়েছে।

গ্রামীণ জীবনে প্রকৃতি কোনও আলাদা বিষয় নয়। কৃষি, উৎসব, খাদ্য, বিশ্বাস এবং দৈনন্দিন জীবন—সবকিছুর সঙ্গে প্রকৃতি জড়িয়ে থাকে।

মধুবনী শিল্প সেই সম্পর্ককেই রঙ ও রেখার মাধ্যমে ধরে রাখে।

শিল্প ও আত্মনির্ভরতা

সীতা দেবীর জীবন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—লোকশিল্প অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার পথও তৈরি করতে পারে।

যে শিল্প একসময় মূলত পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানের অংশ ছিল, সেটিই পরে শিল্পীদের জীবিকার মাধ্যম হয়ে ওঠে।

মধুবনী চিত্রের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বহু শিল্পী তাঁদের দক্ষতাকে পেশায় পরিণত করার সুযোগ পান।

বিশেষ করে গ্রামীণ মহিলাদের জন্য এই পরিবর্তনের সামাজিক গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট।

নিজের হাতে তৈরি শিল্প বিক্রি করে উপার্জন করা তাঁদের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানেও নতুন মাত্রা যোগ করে।

পুরস্কার ও সম্মান

সীতা দেবীর শিল্পীজীবন বিভিন্ন সম্মানে স্বীকৃত হয়েছিল। তিনি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক সম্মান পদ্মশ্রী লাভ করেন।

তাঁর স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না। এর সঙ্গে মধুবনী শিল্পের মর্যাদাও আরও বৃদ্ধি পায়।

একটি আঞ্চলিক লোকশিল্প জাতীয় স্তরে সম্মান পাওয়ার ফলে আরও বহু শিল্পী তাঁদের ঐতিহ্যবাহী কাজ নিয়ে সামনে আসার উৎসাহ পান।

পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

সীতা দেবীর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এই যে, ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করার অর্থ তাকে কেবল অতীতে আটকে রাখা নয়।

ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হলে তাকে নতুন মাধ্যম, নতুন দর্শক এবং নতুন সময়ের সঙ্গে পরিচয় করাতে হয়।

সীতা দেবী তাঁর শিল্পের মাধ্যমে সেই কাজ করেছিলেন।

তিনি পুরনো শিল্পরীতিকে পরিত্যাগ করেননি। আবার তাকে কেবল পুরনো পদ্ধতির মধ্যে আটকে রাখেননি।

এই ভারসাম্যই তাঁর কাজকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

উত্তরাধিকার

সীতা দেবীর মৃত্যুর পরেও তাঁর শিল্পের প্রভাব ভারতীয় লোকশিল্পের জগতে রয়েছে। মধুবনী চিত্রকলা আজ ভারতের অন্যতম পরিচিত লোকশিল্পধারা।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মধুবনী শিল্প নিয়ে প্রদর্শনী হয়। শিল্পীরা কাগজ, কাপড়, ক্যানভাসসহ নানা মাধ্যমে কাজ করেন। আধুনিক শিল্পের সঙ্গেও এই লোকশিল্পের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

এই দীর্ঘ যাত্রার পেছনে সীতা দেবীর মতো শিল্পীদের অবদান স্মরণ করা জরুরি।

উপসংহার

সীতা দেবীর জীবন আমাদের শেখায়, শিল্পের মূল্য নির্ভর করে না সেটি কোথায় জন্মেছে তার ওপর। কোনও শিল্প যদি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অনুভূতিকে সত্যিকারভাবে প্রকাশ করতে পারে, তবে তার শক্তি সীমাহীন।

মিথিলার ঘর ও উঠোন থেকে উঠে আসা মধুবনী চিত্রকলা আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই যাত্রায় সীতা দেবীর মতো শিল্পীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন, নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরেও পৃথিবীর সামনে পৌঁছানো যায়।

মাটির ঘরের দেওয়ালে আঁকা যে ছবি একসময় কেবল একটি পরিবারের উৎসবের অংশ ছিল, সেই ছবিই একদিন হয়ে উঠতে পারে একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক পরিচয়।

সীতা দেবীর জীবন তাই শুধু একজন শিল্পীর গল্প নয়—এটি ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা, নারীশক্তি এবং আত্মনির্ভরতার এক অসাধারণ যাত্রা

Share This
Categories
গল্প নারী কথা

লাল সাইকেলের স্বপ্ন।

সোনাঝুরি গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকত বারো বছরের মেয়ে ঝিলিক। ছোট্ট একটা মাটির বাড়ি, সামনে তুলসীতলা, পাশে কয়েকটা কলাগাছ আর বাড়ির পেছনে বিস্তীর্ণ ধানখেত—এই ছিল তার পৃথিবী।

ঝিলিক পড়াশোনা করতে খুব ভালোবাসত।

কিন্তু গ্রামের স্কুলটা ছিল বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে।

প্রতিদিন ভোরে উঠে তাকে হেঁটে স্কুলে যেতে হত।

বর্ষার দিনে কাদা পেরিয়ে, গ্রীষ্মে ধুলো উড়িয়ে, শীতের সকালে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে সে হাঁটত।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে ঝিলিক মাকে বলল,

—“মা, আমার যদি একটা সাইকেল থাকত!”

মা চুপ করে রইলেন।

বাবা দিনমজুর। সংসারে চারজন মানুষ। সাইকেল কেনার মতো টাকা তাদের হাতে কখনও জমেনি।

মা শুধু বললেন,

—“একদিন হবে।”

ঝিলিক জানত, মায়ের সেই ‘একদিন’ হয়তো অনেক দূরে।

তবু সে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করল না।

স্কুলে তার প্রিয় বিষয় ছিল বিজ্ঞান। শিক্ষক যখন নতুন কিছু বোঝাতেন, ঝিলিকের চোখ জ্বলে উঠত।

একদিন বিজ্ঞান শিক্ষক অনিরুদ্ধবাবু বললেন,

—“তোমরা সবাই বড় হয়ে কী হতে চাও?”

কেউ বলল ডাক্তার।

কেউ পুলিশ।

কেউ শিক্ষক।

ঝিলিক উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—“আমি বিজ্ঞানী হতে চাই।”

ক্লাসে কয়েকজন হেসে ফেলল।

অনিরুদ্ধবাবু হাসলেন না।

তিনি বললেন,

—“কেন?”

ঝিলিক বলল,

—“আমাদের গ্রামের অনেক সমস্যা আছে। আমি এমন কিছু বানাতে চাই যাতে গ্রামের মানুষের কাজ সহজ হয়।”

শিক্ষক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তাহলে আজ থেকেই শুরু করো।”

সেদিন কথাটা ঝিলিকের মনে গেঁথে গেল।

কয়েকদিন পর স্কুলে বিজ্ঞান প্রদর্শনীর ঘোষণা হল।

ঝিলিক ঠিক করল, সে এমন একটা জিনিস বানাবে যাতে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করে ব্যবহার করা যায়।

কিন্তু সমস্যা হল—প্রকল্প বানানোর টাকা কোথায়?

বাড়িতে বলতেই বাবা বললেন,

—“যা আছে তাই দিয়ে কর মা। নতুন জিনিস কিনতে পারব না।”

ঝিলিক বলল,

—“নতুন কিছু লাগবে না বাবা।”

সে পুরনো প্লাস্টিকের বোতল, বাঁশের টুকরো, ব্যবহৃত পাইপ আর কয়েকটি খালি ড্রাম জোগাড় করল।

অনিরুদ্ধবাবুর সাহায্যে সে একটি ছোট মডেল তৈরি করল।

বৃষ্টির জল ছাদ থেকে পাইপ দিয়ে ড্রামে জমবে। তারপর সেই জল বাগানে ব্যবহার করা যাবে।

প্রথম মডেলটি ভেঙে পড়ল।

দ্বিতীয়টিও ঠিকমতো কাজ করল না।

তৃতীয়বার আবার চেষ্টা করল ঝিলিক।

এক রাতে মা দেখলেন, মেয়েটা উঠোনে বসে কিছু একটা নিয়ে কাজ করছে।

—“এত রাতে?”

—“কাল স্কুলে পরীক্ষা।”

—“ঘুমাবি না?”

ঝিলিক বলল,

—“স্বপ্নটা শেষ না করলে ঘুম আসবে না।”

মা কিছু বললেন না।

শুধু ঘরে গিয়ে মেয়ের জন্য এক গ্লাস জল নিয়ে এলেন।

পরদিন বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে ঝিলিকের মডেল ঠিকঠাক কাজ করল।

বিচারকরা অবাক হয়ে দেখলেন।

একজন জিজ্ঞেস করলেন,

—“এটা তুমি নিজে বানিয়েছ?”

ঝিলিক মাথা নাড়ল।

—“জি।”

—“কী দিয়ে?”

ঝিলিক সবকিছু বুঝিয়ে বলল।

শেষে ফল ঘোষণা হল।

ঝিলিক প্রথম হল।

পুরস্কার হিসেবে সে পেল একটি বইয়ের সেট এবং একটি সাইকেল।

লাল রঙের সাইকেল।

সাইকেলটি দেখে ঝিলিক কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

তার চোখে জল এসে গেল।

অনিরুদ্ধবাবু বললেন,

—“কী হল?”

ঝিলিক ফিসফিস করে বলল,

—“স্যার, এটাই তো আমার স্বপ্ন ছিল।”

পরদিন ভোরে ঝিলিক প্রথমবার সাইকেল নিয়ে স্কুলের পথে বেরোল।

লাল সাইকেলটি কাঁচা রাস্তার ওপর দিয়ে ছুটছিল।

তার চুল বাতাসে উড়ছিল।

কিন্তু ঝিলিকের মনে হচ্ছিল, সে শুধু স্কুলে যাচ্ছে না—সে যেন নিজের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

কয়েক মাস পর গ্রামে আরেকটি সমস্যা দেখা দিল।

গরমের সময় পুকুরের জল শুকিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের মানুষ দূরের টিউবওয়েল থেকে জল আনত।

ঝিলিক ভাবতে শুরু করল।

সে এবার একটা সহজ জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করল।

অনিরুদ্ধবাবুর সাহায্যে গ্রামের কয়েকটি বাড়ির ছাদ থেকে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করল।

প্রথমে গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করল না।

একজন বললেন,

—“এই বাচ্চা মেয়ে আবার আমাদের জল শেখাবে?”

আরেকজন হাসলেন।

কিন্তু ঝিলিক থামল না।

বর্ষার প্রথম বৃষ্টির দিন সে নিজের বাড়িতে ব্যবস্থা চালু করল।

বৃষ্টির জল পাইপ দিয়ে ড্রামে জমতে লাগল।

মা অবাক হয়ে বললেন,

—“এত জল!”

ঝিলিক হাসল।

—“এই জল ফেলে দিলে আবার কিনতে হবে।”

কয়েকদিন পর গ্রামের আরও তিনটি পরিবার সেই ব্যবস্থা তৈরি করল।

তারপর দশটি।

তারপর আরও অনেক বাড়ি।

ঝিলিকের ছোট্ট পরিকল্পনা ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষের কাজে লাগতে শুরু করল।

একদিন পঞ্চায়েতের এক কর্মী এসে বললেন,

—“তোমার এই মডেলটা আমরা অন্য গ্রামেও দেখাতে চাই।”

ঝিলিক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

যে মেয়েটাকে নিয়ে একদিন সবাই হাসছিল, আজ তার কাজ দেখতে মানুষ দূর থেকে আসছে।

তবে ঝিলিক বদলায়নি।

সে এখনও প্রতিদিন স্কুলে যায়।

লাল সাইকেলটাও এখনও তার সঙ্গী।

একদিন অনিরুদ্ধবাবু তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

—“তুই বড় হয়ে কী হতে চাস?”

ঝিলিক একটু ভেবে বলল,

—“আগে ভাবতাম বিজ্ঞানী হব। এখন মনে হয়, আমি এমন কিছু বানাতে চাই যা গ্রামের মানুষের কাজে লাগে।”

শিক্ষক বললেন,

—“এটাই তো বিজ্ঞানীর আসল স্বপ্ন।”

বছর কেটে গেল।

ঝিলিক উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে চলে গেল।

বিদায়ের দিন তার মা বললেন,

—“সাইকেলটা নিয়ে যাবি?”

ঝিলিক হেসে বলল,

—“না মা। এটা এখানেই থাকবে।”

—“কেন?”

—“গ্রামের যে মেয়েটা স্কুলে যেতে চায়, কিন্তু সাইকেল নেই—সে ব্যবহার করবে।”

মা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ঝিলিক সাইকেলটা গ্রামের স্কুলে দিয়ে গেল।

সাইকেলের হ্যান্ডেলে ছোট্ট একটা কাগজ বাঁধা ছিল।

তাতে লেখা—

“স্বপ্ন দেখো। পথ যত দূরই হোক, একদিন পৌঁছবে।”

পরদিন গ্রামের আরেকটি মেয়ে সেই লাল সাইকেলে চেপে স্কুলে গেল।

তারপর আরেকজন।

তারপর আরও একজন।

লাল সাইকেলটি যেন এক স্বপ্ন থেকে আরেক স্বপ্নের কাছে ছুটে বেড়াতে লাগল।

আর সোনাঝুরি গ্রামের মানুষ বুঝল—

কখনও কখনও একটি ছোট্ট স্বপ্ন শুধু একজনের জীবন বদলায় না।

সেটা অনেক মানুষের পথ দেখায়।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

ড. কমলা সোহোনি: বিজ্ঞানকে মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত করা এক মহীয়সী নারী।

বিজ্ঞান কখনও শুধু গবেষণাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনও গবেষণা যদি মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য কিংবা জীবনযাত্রার উন্নতিতে কাজে লাগে, তখন সেই গবেষণার গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।

ভারতের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে ড. কমলা সোহোনি ছিলেন এমনই এক বিজ্ঞানী। জীবরসায়নের মতো কঠিন বিষয় নিয়ে গবেষণা করেও তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের কাজকে সাধারণ মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

১৯৩৯ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করে তিনি ভারতীয় নারীদের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তৈরি করেন। পরবর্তীকালে তাঁর গবেষণার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয় হয়ে ওঠে ভারতীয়দের দৈনন্দিন খাদ্য, ডাল, শস্য এবং বিশেষ করে ‘নীরা’-র পুষ্টিগুণ।

বিজ্ঞানী পরিবারে বেড়ে ওঠা

কমলা সোহোনির জন্ম ১৮ জুন ১৯১১ সালে ইন্দোরে। তাঁর পারিবারিক পরিবেশ ছিল বিজ্ঞানমুখী। তাঁর বাবা নারায়ণরাও ভাগবত এবং কাকা মাধবরাও ভাগবত—দুজনেই রসায়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বেঙ্গালুরুর তৎকালীন টাটা ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে পড়াশোনা করেছিলেন।

ছোটবেলা থেকেই তাই বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।

তিনি মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৩৩ সালে রসায়নকে প্রধান বিষয় ও পদার্থবিদ্যাকে সহায়ক বিষয় হিসেবে নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরীক্ষায় তাঁর ফল ছিল অত্যন্ত ভালো।

তখন ভারতে বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু কমলা জানতেন, তাঁর ভবিষ্যৎ গবেষণার মধ্যেই।

IISc-এর দরজা বন্ধ হয়েছিল তাঁর জন্য

স্নাতক হওয়ার পর কমলা বেঙ্গালুরুর Indian Institute of Science (IISc)-এ গবেষণা করার জন্য আবেদন করেন।

কিন্তু তখন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ছিলেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সি. ভি. রমন। কমলার আবেদন প্রথমে প্রত্যাখ্যান করা হয়—মূল কারণ ছিল তিনি নারী। IISc-এর নিজস্ব ঐতিহাসিক নথিতেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

কমলা এই প্রত্যাখ্যান মেনে নেননি।

তিনি নিজের অধিকারের জন্য দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেন এবং শেষ পর্যন্ত IISc-তে গবেষণার সুযোগ পান। তবে তাঁকে প্রথমে কিছু কঠোর শর্তের মধ্যে কাজ করতে হয়েছিল। তিনি নিয়মিত গবেষক হিসেবে নয়, পরীক্ষামূলকভাবে গবেষণা শুরু করেন।

এই ঘটনাটি তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

কারণ তিনি শুধু নিজের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেননি—তাঁর উপস্থিতির পর IISc-তে আরও নারী শিক্ষার্থীর জন্য দরজা খুলতে শুরু করে।

গবেষণাগারে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ

IISc-তে কমলা সোহোনি জীবরসায়ন নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল দুধ, ডাল এবং বিভিন্ন শস্যজাত খাদ্যের প্রোটিন।

তাঁর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিজ্ঞানী এম. শ্রীনিবাসাইয়া।

ভারতের সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে এই গবেষণার সরাসরি সম্পর্ক ছিল। কারণ দেশের বড় একটি অংশের মানুষের খাদ্যতালিকায় ডাল, শস্য ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাবারের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।

কমলা বুঝেছিলেন, সাধারণ মানুষের খাবারের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরি।

১৯৩৬ সালে তিনি IISc-এর গবেষণা শেষ করে মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণা ও কাজের দক্ষতা শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রাথমিক বাধাগুলোকে অতিক্রম করে দেয়।

কেমব্রিজের পথে

এরপর কমলা সোহোনির সামনে আসে আরও বড় সুযোগ।

১৯৩৭ সালে তিনি কেমব্রিজের Newnham College-এ পড়াশোনা ও গবেষণা শুরু করেন। সেখানে তিনি জীবরসায়নের গবেষণায় যুক্ত হন। প্রথমে ডেরেক রিখটারের সঙ্গে এবং পরে উদ্ভিদ-শারীরবিদ রবিন হিলের সঙ্গে কাজ করেন।

তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল উদ্ভিদকোষে শক্তি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া।

আলুর কোষ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি উদ্ভিদে cytochrome c-এর উপস্থিতি ও তার ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। এই পদার্থ কোষে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।

অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর ডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন।

১৯৩৯ সালে কেমব্রিজ থেকে পিএইচডি অর্জন করেন তিনি। তাঁর এই অর্জন ভারতীয় নারী বিজ্ঞানীদের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

দেশে ফিরে মানুষের জন্য বিজ্ঞান

বিদেশে পিএইচডি অর্জনের পর কমলা সোহোনি ভারতে ফিরে আসেন।

তিনি দিল্লির Lady Hardinge Medical College-এ জীবরসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান হিসেবে কাজ করেন। পরে কুনুরের Nutrition Research Laboratory-তে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তাঁর গবেষণার অন্যতম বিষয় ছিল ভিটামিন ও পুষ্টি।

এখান থেকেই তাঁর গবেষণার সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক আরও গভীর হয়।

তিনি বুঝতে পারছিলেন, ভারতের মতো দেশে পুষ্টিবিজ্ঞান শুধু পরীক্ষাগারে নতুন রাসায়নিক উপাদান আবিষ্কারের বিষয় নয়। মানুষের প্রতিদিনের খাবারের মধ্যেই অনেক সমস্যার সমাধান লুকিয়ে থাকতে পারে।

মুম্বইয়ে নতুন অধ্যায়

১৯৪৭ সালে কমলা সোহোনি মুম্বইয়ের Royal Institute of Science-এ জীবরসায়নের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

সেখানে তিনি ডাল, শস্য এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের খাদ্যতালিকায় থাকা বিভিন্ন খাবারের পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা করেন।

এই গবেষণার বিশেষত্ব ছিল এর বাস্তব প্রাসঙ্গিকতা।

কোনও বিলাসবহুল বা বিরল খাদ্য নয়—সাধারণ মানুষের হাতের কাছে থাকা খাবারেই কীভাবে পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা যায়, সেই প্রশ্ন তাঁর গবেষণার অন্যতম কেন্দ্রে ছিল।

এই চিন্তাভাবনা পরবর্তী সময়ে তাঁকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার দিকে নিয়ে যায়।

‘নীরা’ নিয়ে গবেষণা

কমলা সোহোনির জীবনের অন্যতম পরিচিত গবেষণা ছিল নীরা নিয়ে।

নীরা হল বিভিন্ন তালগাছের পুষ্পমঞ্জরি থেকে সংগ্রহ করা মিষ্টি রস। ভারতের কিছু অঞ্চলে এটি দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য ও পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের পরামর্শে কমলা সোহোনি নীরার পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

গবেষণায় তিনি নীরায় ভিটামিন A, ভিটামিন C এবং আয়রন-এর উপস্থিতি শনাক্ত করেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—নীরা থেকে গুড় বা অন্যান্য ঘন খাদ্যপণ্য তৈরি করার পরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান যথেষ্ট পরিমাণে বজায় থাকতে পারে।

এর ফলে নীরা শুধুমাত্র একটি ঐতিহ্যবাহী পানীয় নয়, পুষ্টির দিক থেকেও সম্ভাবনাময় খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে।

দরিদ্র মানুষের খাদ্যের দিকে নজর

কমলা সোহোনির গবেষণার অন্যতম মানবিক দিক ছিল—তিনি গবেষণার জন্য এমন খাদ্যকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, যা দেশের সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের নাগালের মধ্যে ছিল।

পুষ্টির অভাব ভারতের বহু মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের সমস্যা ছিল। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে অপুষ্টি গুরুতর সামাজিক সমস্যা তৈরি করত।

নীরা নিয়ে তাঁর গবেষণা দেখিয়েছিল, স্থানীয় ও তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য খাদ্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করে পুষ্টির সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব।

পরবর্তী খাদ্যসংক্রান্ত গবেষণায় অপুষ্টিতে ভোগা শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের খাদ্যতালিকায় নীরার ব্যবহার নিয়ে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায়।

এই কাজের জন্য তিনি Rashtrapati Award লাভ করেন।

গবেষক থেকে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে

কমলা সোহোনির কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল প্রশাসনিক নেতৃত্ব।

তিনি Royal Institute of Science-এর জীবরসায়ন বিভাগের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠানের Director হন।

ভারতের বিজ্ঞান গবেষণার ইতিহাসে এটি ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কারণ সেই সময়ে দেশের বড় বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত বিরল। ভারত সরকারের নারী ও শিশুবিকাশ মন্ত্রকের প্রকাশিত ‘First Women Achievers’ সংক্রান্ত নথিতেও তাঁকে ভারতের প্রথম দিকের নারী বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান-প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একজন নারী বিজ্ঞানীর জন্য এই নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছানো ছিল তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল।

বিজ্ঞান ও সমাজ—দুটি আলাদা নয়

কমলা সোহোনির গবেষণার দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে—তিনি বিজ্ঞানকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি।

আলুর কোষের জৈবরাসায়ন থেকে শুরু করে ডাল ও শস্যের পুষ্টিগুণ, তারপর নীরা—তাঁর গবেষণার বিষয় বদলেছে, কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে:

বিজ্ঞান কীভাবে মানুষের জীবনকে আরও ভালো করতে পারে?

এই প্রশ্নই তাঁকে একজন মৌলিক গবেষক থেকে একজন জনমুখী বিজ্ঞানীতে পরিণত করেছিল।

শুধু বিজ্ঞানী নন, সচেতন নাগরিকও

জীবনের পরবর্তী পর্যায়েও কমলা সোহোনি সক্রিয় ছিলেন।

তিনি Consumer Guidance Society of India-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৮২–৮৩ সময়কালে সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভোক্তা নিরাপত্তা সম্পর্কেও তিনি লিখেছেন।

অর্থাৎ তাঁর সামাজিক আগ্রহ শুধু পুষ্টিবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

খাদ্য, স্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার—মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল।

নারীদের জন্য তাঁর পথচলার গুরুত্ব

কমলা সোহোনির জীবনকে শুধু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দৃষ্টিতে দেখলে তাঁর সংগ্রামের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে।

তাঁকে প্রথমে শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে গবেষণার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। তিনি সেই বাধার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন এবং নিজের যোগ্যতা দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে গবেষণার ক্ষমতা লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

তাঁর IISc-এ প্রবেশের ঘটনা পরবর্তী সময়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির দরজা আরও উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসংখ্য ভারতীয় নারী কাজ করছেন। তাঁদের পথ অনেকটাই সহজ হয়েছে কারণ তাঁদের আগের প্রজন্মের কিছু নারী প্রথম বাধাগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন।

কমলা সোহোনি তাঁদের অন্যতম।

তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়

১৯৯৮ সালের ২৮ জুন নয়াদিল্লিতে কমলা সোহোনির মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।

জীবনের শেষ পর্যন্ত তাঁর কাজের মূল সুর ছিল মানুষের কল্যাণের সঙ্গে বিজ্ঞানকে যুক্ত করা।

মৃত্যুর পর বহু বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর নাম নতুন প্রজন্মের কাছে আবার পরিচিত হতে শুরু করে। ২০২৩ সালে তাঁর ১১২তম জন্মবার্ষিকীতে Google তাঁকে একটি Doodle-এর মাধ্যমে স্মরণ করে।

এটি দেখায়, সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর কাজের গুরুত্ব হারিয়ে যায়নি।

উত্তরাধিকার

কমলা সোহোনির উত্তরাধিকারকে কয়েকটি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

তিনি ছিলেন একজন গবেষক, যিনি উদ্ভিদকোষের জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করেছিলেন।

তিনি ছিলেন একজন পুষ্টিবিজ্ঞানী, যিনি ভারতের সাধারণ মানুষের খাদ্যের পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।

তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, যিনি নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের তৈরি করেছিলেন।

এবং তিনি ছিলেন এমন একজন নারী, যিনি একটি পুরুষ-প্রধান বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করেছিলেন।

শেষ কথা

কমলা সোহোনির জীবন আমাদের ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের সামনে দাঁড় করায়—বড় বৈজ্ঞানিক কাজ সবসময় বড় যন্ত্র বা বিশাল গবেষণাগার দিয়ে শুরু হয় না।

কখনও তা শুরু হয় একটি প্রশ্ন দিয়ে।

মানুষ যে খাবার প্রতিদিন খায়, সেই খাবার কতটা পুষ্টিকর?

এই সাধারণ প্রশ্ন থেকেই ডাল, শস্য, উদ্ভিদ এবং নীরার মতো খাদ্য নিয়ে তাঁর গবেষণার পথ তৈরি হয়েছিল।

আর সেই পথ তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল কেমব্রিজের গবেষণাগার থেকে ভারতের সাধারণ মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্য সমস্যার কাছে।

কমলা সোহোনি প্রমাণ করেছিলেন, বিজ্ঞানের প্রকৃত শক্তি শুধু নতুন তথ্য আবিষ্কারে নয়—সেই জ্ঞানকে মানুষের জীবনে অর্থবহ করে তোলার মধ্যেও রয়েছে।

তাঁর জীবন তাই ভারতীয় নারী বিজ্ঞানীদের ইতিহাসে শুধু একটি ‘প্রথম’-এর গল্প নয়। এটি বাধা অতিক্রম করে জ্ঞান অর্জন, সেই জ্ঞানকে সমাজের কাজে লাগানো এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করার গল্প।

আজ যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে, তখন কমলা সোহোনির মতো অগ্রদূতদের স্মরণ করা মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়—বিজ্ঞান যেন মানুষের জন্য কাজ করে, সেই আদর্শকেও নতুন করে মনে রাখা।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

শকুন্তলা পরাঞ্জপে: গণিত থেকে সমাজসংস্কার—এক বহুমুখী মহীয়সী নারীর জীবন।

একজন মানুষের পরিচয় কি কেবল একটি পেশায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে?

কেউ যদি একই জীবনে গণিত পড়েন, বিদেশে আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করেন, চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, সাহিত্য রচনা করেন, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে কাজ করেন এবং শেষ পর্যন্ত দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক সম্মান লাভ করেন—তাহলে তাঁর জীবনকে কোনও একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা কঠিন।

শকুন্তলা পরাঞ্জপে ছিলেন তেমনই এক ব্যতিক্রমী ভারতীয় নারী।

বিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন ভারতীয় সমাজে নারীদের জন্য পেশা ও শিক্ষার সুযোগ আজকের তুলনায় অনেক সীমিত ছিল, তখন তিনি কেমব্রিজে গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেন। পরে জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সঙ্গে কাজ করেন। আবার অন্যদিকে অভিনয় করেন মারাঠি ও হিন্দি চলচ্চিত্রে, সাহিত্যচর্চা করেন এবং সমাজের পরিবার পরিকল্পনা ও নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন।

১৯৯১ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। সরকারি পুরস্কারের নথিতে তাঁর সম্মানের ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয় সমাজসেবা—পরিবার পরিকল্পনা

শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠা

শকুন্তলা পরাঞ্জপের জন্ম ১৭ জানুয়ারি ১৯০৬ সালে।

তাঁর বাবা ছিলেন বিশিষ্ট গণিতবিদ ও শিক্ষাবিদ স্যার আর. পি. পরাঞ্জপে। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘Senior Wrangler’ হওয়া প্রথম ভারতীয় হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি শিক্ষাবিদ, প্রশাসক ও কূটনীতিক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

এই পরিবেশে বড় হওয়ার ফলে শকুন্তলার সামনে ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা ও বৌদ্ধিক চর্চার দরজা খোলা ছিল।

কিন্তু পরিবারের শিক্ষাগত ঐতিহ্য অনুসরণ করাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। তিনি নিজের আগ্রহ ও চিন্তার জগৎকে ক্রমশ বিস্তৃত করেছিলেন।

কেমব্রিজে গণিতের ছাত্রী

শকুন্তলা পরাঞ্জপে কেমব্রিজের Newnham College-এ Mathematical Tripos নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯২৯ সালে সেখান থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরের বছর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা বিষয়ে ডিপ্লোমাও নেন।

আজকের দিনে বিদেশে পড়তে যাওয়া ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা অনেক। কিন্তু ১৯২০-এর দশকের ভারতীয় সমাজে একজন তরুণীর একা বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা।

বিশেষ করে গণিতের মতো একটি বিষয়, যা তখনও উচ্চশিক্ষায় পুরুষ-প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতো, সেখানে নিজের জায়গা তৈরি করা ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

কেমব্রিজের শিক্ষা তাঁর চিন্তাভাবনাকে আরও প্রসারিত করে। গণিত তাঁকে যুক্তি ও বিশ্লেষণের অভ্যাস দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর পরবর্তী জীবন দেখায়—তিনি নিজেকে কেবল গণিতের মধ্যে আটকে রাখেননি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় কাজ

শিক্ষাজীবনের পর শকুন্তলা পরাঞ্জপে জেনেভায় International Labour Organization বা ILO-এর সঙ্গে কাজ করেন। ১৯৩০-এর দশকে তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাটে।

একজন ভারতীয় নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করে।

দেশের বাইরে কাজ করার ফলে তিনি বিভিন্ন দেশের সমাজব্যবস্থা, শ্রমজীবী মানুষের জীবন এবং সামাজিক সমস্যাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান।

এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে তাঁর সমাজকর্মের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছিল।

অভিনয়ের জগতে প্রবেশ

শকুন্তলা পরাঞ্জপের জীবনকে আকর্ষণীয় করে তোলার অন্যতম কারণ তাঁর অভিনয়জীবন।

গণিতের ছাত্রী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মী হওয়ার পাশাপাশি তিনি ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে মারাঠি এবং হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে ছিল Sairandhri, Duniya Na Mane, Kunku, Stree, Ramshastri প্রভৃতি।

বিশেষ করে ভি. শান্তারামের Duniya Na Mane চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পরিচিত করে।

চলচ্চিত্র তখন ভারতের জন্য নতুন ও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা একটি মাধ্যম। সেই সময়ে কোনও শিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণীর চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সিদ্ধান্তও ছিল বেশ ব্যতিক্রমী।

কিন্তু শকুন্তলা নিজের জীবনের কোনও একটি পরিচয়কে অন্য পরিচয়ের বাধা হতে দেননি।

শিল্পের পাশাপাশি সমাজের প্রশ্ন

চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও ধীরে ধীরে তাঁর আগ্রহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার দিকে আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হয়।

বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা, জন্মনিয়ন্ত্রণ, নারীর স্বাস্থ্য এবং পরিবারে সচেতনতা—এই বিষয়গুলো তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৩০-এর দশকেই তিনি মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজ করেছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এটি সেই সময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

কারণ পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা তখন সামাজিকভাবে সহজ ছিল না। নারীস্বাস্থ্য, সন্তানসংখ্যা, জন্মের ব্যবধান—এসব বিষয় নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা সামাজিক সংকোচ ও ভুল ধারণা ছিল।

শকুন্তলা সেই নীরবতা ভাঙার চেষ্টা করেন।

পরিবার পরিকল্পনাকে শুধু সংখ্যার প্রশ্ন হিসেবে দেখেননি

শকুন্তলা পরাঞ্জপের সমাজকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।

তিনি পরিবার পরিকল্পনাকে শুধু জনসংখ্যা কমানোর একটি প্রশাসনিক কর্মসূচি হিসেবে দেখার পরিবর্তে স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে ছিলেন।

পরবর্তী গবেষণায় তাঁর কাজের মূল্যায়নে দেখা যায়, তিনি পরিবার পরিকল্পনাকে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন এবং শুধু সংখ্যাগত লক্ষ্য পূরণের পরিবর্তে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনা করার ওপর জোর দিয়েছিলেন।

এই চিন্তাধারা তাঁর সময়ের তুলনায় যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কারণ কোনও সামাজিক কর্মসূচি সফল করতে হলে শুধু নীতি তৈরি করলেই হয় না—যাঁদের জন্য সেই নীতি, তাঁদের বাস্তব জীবনও বুঝতে হয়।

লেখক হিসেবেও সক্রিয়

শকুন্তলা শুধু বক্তৃতা বা সামাজিক কাজের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করেননি। তিনি লেখালেখিও করতেন।

তিনি মারাঠি ও ইংরেজি ভাষায় বিভিন্ন ধরনের লেখা প্রকাশ করেন। তাঁর বইয়ের মধ্যে ছিল Three Years in Australia এবং Sense and Nonsense। এছাড়াও তিনি নাটক, গল্প, স্কেচ ও উপন্যাস লিখেছেন।

লেখালেখি তাঁর কাছে ছিল সমাজের সঙ্গে ভাবনার আদানপ্রদানের আরেকটি মাধ্যম।

চলচ্চিত্রে অভিনয়, সাহিত্যচর্চা এবং সমাজকর্ম—তিনটি ক্ষেত্রেই মানুষের জীবন ও সমাজের বিভিন্ন দিককে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা তাঁর কাজে প্রতিফলিত হয়েছিল।

জনজীবনে প্রবেশ

শকুন্তলা পরাঞ্জপে পরবর্তীকালে সক্রিয় জনজীবনেও প্রবেশ করেন।

১৯৫৮ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি মহারাষ্ট্র বিধান পরিষদের সদস্য ছিলেন। এরপর ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর জনজীবনের প্রধান পরিচয় ছিল দলীয় রাজনীতির প্রচলিত কাঠামোর বাইরে একজন সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

পরিবার পরিকল্পনা এবং সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নকে তিনি জনপরিসরে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন।

নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার সময়

আজ নারীর স্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক। কিন্তু শকুন্তলা যখন এসব বিষয়ে কাজ করছিলেন, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।

নারীর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক সংকোচের বিষয় ছিল।

এই পরিস্থিতিতে তিনি মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন, লেখালেখি করেছেন এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও নিজের মত তুলে ধরেছেন।

তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে তিনি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেও পিছিয়ে যাননি।

বিতর্কের মধ্যেও নিজের অবস্থান

শকুন্তলা পরাঞ্জপে সব বিষয়ে প্রচলিত মতের সঙ্গে একমত ছিলেন না।

পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর কিছু মতামত এবং নীতিগত অবস্থান সে সময় বিতর্কও তৈরি করেছিল। বিশেষত জনসংখ্যা, বিবাহের বয়স এবং রাষ্ট্রের পরিবার পরিকল্পনা নীতি নিয়ে তাঁর কিছু অবস্থান আজকের দৃষ্টিতে বিতর্কযোগ্য ও ঐতিহাসিকভাবে আলোচনার বিষয়।

একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে বুঝতে হলে তাঁর কাজের প্রশংসার পাশাপাশি সেই সময়ের বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতাকেও বিবেচনা করা জরুরি।

শকুন্তলার গুরুত্ব এখানেই যে তিনি সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে নীরব থাকেননি। নিজের সময়ের সমস্যাগুলো নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে মত দিয়েছেন এবং নীতিনির্ধারণের আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।

পদ্মভূষণ সম্মান

১৯৯১ সালে, তাঁর জীবনের শেষ পর্বে, ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে।

সরকারি পুরস্কারের নথিতে তাঁর নামের সঙ্গে ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয় Social Work—Family Planning

এই সম্মান তাঁর দীর্ঘ সামাজিক কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

একজন নারী, যিনি একসময় কেমব্রিজে গণিত পড়েছিলেন, পরে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছিলেন, চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সামাজিক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার মতো বিষয়কে নিজের কর্মক্ষেত্র বানিয়েছিলেন—তাঁর জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য সত্যিই বিরল।

পরবর্তী প্রজন্মেও তাঁর প্রভাব

শকুন্তলা পরাঞ্জপের মেয়ে সাই পরাঞ্জপে পরবর্তীকালে ভারতের পরিচিত চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হন।

ফলে পরাঞ্জপে পরিবারের সৃজনশীল ও বৌদ্ধিক উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মেও বহমান ছিল।

একদিকে গণিত ও শিক্ষার ঐতিহ্য, অন্যদিকে সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও সমাজচিন্তা—এই পরিবারে বিভিন্ন জগতের সংযোগ দেখা যায়।

শকুন্তলার নিজের জীবনও ছিল সেই বহুমাত্রিকতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

এক জীবনে এতগুলো পরিচয়

শকুন্তলা পরাঞ্জপের জীবনকে যদি কয়েকটি শব্দে ধরতে হয়, তাহলে বলা যায়—কৌতূহল, স্বাধীন চিন্তা এবং বহুমুখী কর্মজীবন

তিনি কেমব্রিজে গণিত পড়েছেন, কিন্তু গণিতের অধ্যাপক হননি।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় কাজ করেছেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রশাসক হিসেবেই জীবন কাটাননি।

চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, কিন্তু অভিনেত্রী পরিচয়েই থেমে থাকেননি।

লেখালেখি করেছেন, কিন্তু শুধু লেখক হননি।

জনজীবনে থেকেছেন, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে সামাজিক সমস্যার প্রতি তাঁর দীর্ঘস্থায়ী আগ্রহ।

এই বহুমুখীতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

শেষ কথা

শকুন্তলা পরাঞ্জপের জীবন আমাদের সামনে এমন এক সময়ের ছবি তুলে ধরে, যখন একজন ভারতীয় নারীর সামনে পেশাগত ও সামাজিক বিকল্প আজকের তুলনায় অনেক কম ছিল।

কিন্তু তিনি নিজের জন্য একটির পর একটি নতুন দরজা খুলেছেন।

কেমব্রিজে গণিতের শিক্ষা থেকে জেনেভার আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্র, সেখান থেকে ভারতীয় চলচ্চিত্র, সাহিত্য এবং পরে পরিবার পরিকল্পনা ও সমাজসেবা—প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি নতুন কিছু শিখেছেন এবং নিজের কাজের ক্ষেত্র বদলেছেন।

তাঁর জীবন থেকে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা যায়—একজন মানুষের সামর্থ্যকে একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখার কোনও প্রয়োজন নেই।

কেউ গণিত ভালোবাসতে পারেন, আবার শিল্পেও আগ্রহী হতে পারেন। কেউ চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে পারেন, আবার সামাজিক সমস্যার সমাধান নিয়েও কাজ করতে পারেন। কেউ লেখক হতে পারেন, আবার জনজীবনে নীতিনির্ধারণের আলোচনায় অংশ নিতে পারেন।

শকুন্তলা পরাঞ্জপে সেই বহুমাত্রিক সম্ভাবনারই এক বিরল উদাহরণ।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো কোনও একটি বই, চলচ্চিত্র বা পদক নয়। বরং এই বার্তা—নিজের চিন্তাকে একটি সীমার মধ্যে বন্দি না করে, সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের জ্ঞান ও প্রতিভাকে নতুন কাজে ব্যবহার করাই একজন মানুষের প্রকৃত সৃষ্টিশীলতা।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

প্রফেসর রাজেশ্বরী চট্টার্জি: ভারতের মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির পথপ্রদর্শক এক মহীয়সী নারী।

আজ আমরা মোবাইল ফোনে কথা বলি, দূর থেকে টেলিভিশন দেখি, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য আদানপ্রদান করি, বিমান ও আবহাওয়ার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করি। রাডার, অ্যান্টেনা, বেতার যোগাযোগ—এই প্রযুক্তিগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে এগুলোর পেছনে থাকা বিজ্ঞানীদের কথা আমরা অনেক সময় ভাবিই না।

কিন্তু ভারতে যখন এই প্রযুক্তিগুলোর গবেষণা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে, তখন হাতে গোনা কয়েকজন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী নিজেদের পরিশ্রমে এই ক্ষেত্রের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রফেসর রাজেশ্বরী চট্টার্জি

তিনি ছিলেন ভারতের মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিং ও অ্যান্টেনা গবেষণার অন্যতম পথপ্রদর্শক। শুধু গবেষণাই নয়, শিক্ষকতা, গবেষণাগার গড়ে তোলা এবং নতুন প্রজন্মের প্রকৌশলী তৈরি—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স বা IISc-এর ইতিহাসেও তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়; তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রথম দিকের মহিলা প্রকৌশলী ও প্রথম মহিলা ফ্যাকাল্টি সদস্যদের একজন।

শিক্ষার পরিবেশ থেকেই শুরু

রাজেশ্বরী চট্টার্জির জন্ম ২৪ জানুয়ারি ১৯২২ সালে তৎকালীন মাইসোর রাজ্যের নঞ্জনগুড়ে। এমন এক সময়ে তাঁর জন্ম, যখন ভারতে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ আজকের তুলনায় অনেক সীমিত ছিল।

তবে তাঁর পরিবার শিক্ষার গুরুত্ব বুঝত। তাঁর ঠাকুমা কামলাম্মা দাসাপ্পা নিজেই ছিলেন শিক্ষার প্রসারে সক্রিয় একজন নারী। তিনি মহিলাদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পক্ষে কাজ করেছিলেন এবং একটি বিশেষ ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই শিক্ষামুখী পরিবেশ রাজেশ্বরীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—তিনি ভবিষ্যতে কী নিয়ে পড়াশোনা করবেন?

ইতিহাসের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বিজ্ঞানকে বেছে নেন।

গণিত ও পদার্থবিদ্যা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং

রাজেশ্বরী চট্টার্জি বেঙ্গালুরুর সেন্ট্রাল কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি গণিত ও পদার্থবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় তিনি মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। তাঁর মেধার স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন পুরস্কারও পান।

১৯৪৩ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে গবেষণার কাজে যোগ দেন। তখন তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল ইলেকট্রিক্যাল টেকনোলজি ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়।

এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ সেই সময়ে ভারতে ইলেকট্রনিক্স ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এখনও বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে।

রাজেশ্বরী এমন একটি ক্ষেত্র বেছে নিয়েছিলেন, যার ভবিষ্যৎ তখনও পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত স্বাধীনতার দিকে এগোচ্ছিল। দেশের ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গড়ে তুলতে দক্ষ গবেষক তৈরির প্রয়োজন ছিল।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি সরকারি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। তিনি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি মাস্টার্স এবং পরে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর ডক্টরেট সম্পন্ন হয়।

বিদেশে যাওয়ার সেই যাত্রাও ছিল সহজ নয়। সে সময় ভারত থেকে একজন তরুণীর একা বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা ছিল যথেষ্ট বিরল ঘটনা।

কিন্তু রাজেশ্বরী সেই সুযোগকে শুধু নিজের শিক্ষার জন্য ব্যবহার করেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল দেশে ফিরে সেই জ্ঞান কাজে লাগানো।

দেশে ফিরে নতুন অধ্যায়

১৯৫৩ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করে রাজেশ্বরী চট্টার্জি ভারতে ফিরে আসেন এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে ফ্যাকাল্টি হিসেবে যোগ দেন। তিনি ইলেকট্রিক্যাল কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হন।

এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার অধ্যায়।

মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিং তখন ভারতে নতুন ক্ষেত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাডার ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে মাইক্রোওয়েভের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছিল। কিন্তু ভারতে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো খুবই সীমিত ছিল।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি এবং তাঁর স্বামী, বিজ্ঞানী এস. কে. চট্টার্জি, মিলে সেই পরিস্থিতি বদলানোর উদ্যোগ নেন।

ভারতে মাইক্রোওয়েভ গবেষণাগার গড়ে তোলা

রাজেশ্বরী ও তাঁর স্বামী IISc-তে ভারতের প্রথম মাইক্রোওয়েভ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও সরঞ্জাম তখন পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে অনেক যন্ত্র ও উপাদান দেশীয়ভাবে তৈরি করতে হয়েছিল।

আজকের অত্যাধুনিক গবেষণাগারের সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা করলে পার্থক্যটা সহজেই বোঝা যায়।

এখন কোনও গবেষক প্রয়োজনীয় যন্ত্র অনলাইনে বা বিশেষ সরবরাহকারীর কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু পঞ্চাশের দশকে ভারতে অনেক ক্ষেত্রেই গবেষকদের নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেদেরই করতে হতো।

রাজেশ্বরীর গবেষণাগার তাই শুধু একটি ল্যাবরেটরি ছিল না। সেটি ছিল ভারতের নতুন একটি প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রের প্রথম দিকের কর্মশালা।

মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি আসলে কী?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, মাইক্রোওয়েভ হল তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের একটি নির্দিষ্ট অংশ, যা যোগাযোগ, রাডার, স্যাটেলাইট এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়।

এই তরঙ্গ কীভাবে তৈরি হবে, কীভাবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবে, কীভাবে অ্যান্টেনা তা গ্রহণ বা প্রেরণ করবে—এসবই মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

রাজেশ্বরী চট্টার্জির গবেষণার সঙ্গে এই বিষয়গুলোর গভীর সম্পর্ক ছিল।

তিনি বিশেষভাবে অ্যান্টেনা, ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তত্ত্ব এবং মাইক্রোওয়েভ ডিভাইস নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর কাজ পরবর্তীকালে রাডার ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

শুধু গবেষক নন, অসাধারণ শিক্ষক

রাজেশ্বরী চট্টার্জির অবদানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর শিক্ষকতা।

তিনি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক থিওরি, ইলেকট্রন টিউব সার্কিট, মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি এবং রেডিও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতেন।

তাঁর কাছে শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি ছিল না। তিনি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করেছিলেন যারা পরবর্তীকালে ভারতের ইলেকট্রনিক্স, রাডার ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করেন।

IISc-এর তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায় ২০ জন পিএইচডি গবেষককে গাইড করেছিলেন এবং ১০০-র বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর লেখা প্রযুক্তিগত বইয়ের সংখ্যাও ছিল একাধিক।

একজন গবেষকের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার অনেক সময় তাঁর নিজের আবিষ্কার নয়—তাঁর তৈরি করা পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকরা।

এই অর্থে রাজেশ্বরী চট্টার্জির প্রভাব তাঁর নিজের কর্মজীবনের অনেক পরে পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

অ্যান্টেনা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ

রাজেশ্বরী চট্টার্জির অন্যতম পরিচিত কাজ ছিল অ্যান্টেনা প্রযুক্তি।

অ্যান্টেনা ছাড়া আধুনিক বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা কল্পনা করা যায় না। মোবাইল ফোন থেকে স্যাটেলাইট যোগাযোগ, রেডিও থেকে রাডার—বিভিন্ন প্রযুক্তির সঙ্গে অ্যান্টেনার সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি অ্যান্টেনা তত্ত্ব ও তার ব্যবহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন এবং এ বিষয়ে বইও লেখেন। তাঁর Antenna Theory and Practice বইটি দীর্ঘদিন ধরে প্রকৌশল শিক্ষায় পরিচিত একটি গ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

তাঁর গবেষণা শুধু তাত্ত্বিক ছিল না। বাস্তব প্রযুক্তিতে কীভাবে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করা যায়, সেটিও ছিল তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্যাটেলাইট যোগাযোগের শিক্ষা

ভারতে যখন মহাকাশ ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল, তখন মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছিল।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি ও তাঁর সহকর্মীরা ষাটের দশকে মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ নিয়ে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। IISc-এর ঐতিহাসিক নথিতে এই উদ্যোগের উল্লেখ রয়েছে।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ একটি নতুন প্রযুক্তি দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য শুধু গবেষণা যথেষ্ট নয়। সেই প্রযুক্তি শেখানোর জন্য শিক্ষক, পাঠ্যক্রম এবং গবেষণার পরিবেশও তৈরি করতে হয়।

রাজেশ্বরী এই তিন ক্ষেত্রেই কাজ করেছিলেন।

পুরুষ-প্রধান পরিবেশে এক নারী

তাঁর কর্মজীবনের শুরুতে ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তির ক্ষেত্র ছিল অত্যন্ত পুরুষ-প্রধান।

IISc-এর ইলেকট্রিক্যাল কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে তিনি দীর্ঘ সময় একমাত্র মহিলা হিসেবে কাজ করেছিলেন।

একজন নারী গবেষক হিসেবে তাঁকে শুধু নিজের গবেষণার মান প্রমাণ করলেই চলত না; একই সঙ্গে তাঁকে প্রতিষ্ঠানের ভিতরেও নিজের অবস্থান তৈরি করতে হয়েছিল।

তিনি সেই কাজ করেছেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে।

পরবর্তীকালে তিনি ওই বিভাগের নেতৃত্বের দায়িত্বও পালন করেন এবং ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বিভাগটির চেয়ারপারসন ছিলেন।

গবেষণার স্বীকৃতি

রাজেশ্বরী চট্টার্জির গবেষণা ও শিক্ষাদানের জন্য তিনি একাধিক পুরস্কার লাভ করেন।

এর মধ্যে ছিল Mountbatten Prize, J. C. Bose Memorial Prize এবং Ramlal Wadhwa Award

২০১৭ সালে ভারতের নারী ও শিশুবিকাশ মন্ত্রক তাঁকে মরণোত্তর ‘First Women Achievers of India’-এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

তবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হয়তো এই পুরস্কারগুলোর বাইরেই।

ভারতে মাইক্রোওয়েভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি গবেষণাগার দাঁড় করানো, নতুন প্রকৌশলী তৈরি করা এবং অ্যান্টেনা প্রযুক্তির ভিত্তি শক্ত করা—এই কাজগুলোই তাঁর স্থায়ী উত্তরাধিকার।

অবসরের পরেও থেমে থাকেননি

১৯৮২ সালে IISc থেকে অবসর নেওয়ার পরও রাজেশ্বরী চট্টার্জি সক্রিয় ছিলেন। তিনি নারী অধিকার ও নারীশিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন। Indian Association for Women’s Studies-এর মতো সংগঠনের কাজেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল।

অর্থাৎ প্রযুক্তির জগত থেকে অবসর নেওয়ার পরও সমাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ শেষ হয়ে যায়নি।

বিজ্ঞান তাঁকে যে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিল, সামাজিক জীবনেও সেই অনুসন্ধিৎসা বজায় ছিল।

একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণা

রাজেশ্বরী চট্টার্জির জীবন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তরুণীদের জন্য, যারা ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রযুক্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চায়।

তিনি দেখিয়েছেন, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রবেশ করার জন্য শুধু মেধা নয়—প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অধ্যবসায়।

একটি নতুন বিষয় শিখতে হবে, বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে হবে, দেশে ফিরে গবেষণাগার তৈরি করতে হবে, নতুন ছাত্রছাত্রীকে শেখাতে হবে—এই পুরো যাত্রাটাই তিনি সম্পন্ন করেছিলেন।

তাঁর জীবনের বিশেষত্ব ছিল তিনি শুধু নিজের জন্য দরজা খুলে থেমে থাকেননি। তাঁর পরের প্রজন্ম যাতে সেই দরজা দিয়ে আরও সহজে প্রবেশ করতে পারে, সেই ব্যবস্থাও তৈরি করেছিলেন।

শেষ কথা

প্রফেসর রাজেশ্বরী চট্টার্জির জীবন ভারতের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তিনি এমন সময়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এসেছিলেন, যখন এই ক্ষেত্র ছিল পুরুষ-প্রধান এবং গবেষণার পরিকাঠামো ছিল সীমিত। তবুও তিনি পিছিয়ে যাননি।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে দেশে ফিরে তিনি ভারতের মাইক্রোওয়েভ গবেষণার প্রাথমিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। অ্যান্টেনা প্রযুক্তি ও তড়িৎচুম্বকীয় গবেষণায় অবদান রাখেন। শিক্ষক হিসেবে বহু গবেষককে তৈরি করেন। বই লেখেন, গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন এবং পরবর্তীকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাবিভাগের নেতৃত্বও দেন।

তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় দিক হল—তিনি এমন একটি ভবিষ্যতের জন্য কাজ করেছিলেন, যার পূর্ণ রূপ হয়তো তাঁর কর্মজীবনের শুরুতে কল্পনাও করা কঠিন ছিল।

আজকের বেতার যোগাযোগ, রাডার ও অ্যান্টেনা প্রযুক্তির বিশাল জগতের দিকে তাকালে সেই অগ্রদূতদের কথা মনে পড়ে, যাঁরা সীমিত সুযোগের মধ্যে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

রাজেশ্বরী চট্টার্জি তাঁদেরই একজন—যিনি প্রমাণ করেছিলেন, নতুন প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ তৈরি করতে কখনও কখনও একজন মানুষের সাহসী প্রথম পদক্ষেপই যথেষ্ট।

Share This
Categories
নারী কথা প্রবন্ধ রিভিউ

শান্তা সিনহা: শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে লড়াই করে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার এক মহীয়সী নারী।

একটি শিশুর হাতে বই থাকার কথা, কাজের সরঞ্জাম নয়। তার সময় কাটার কথা স্কুলের শ্রেণিকক্ষে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলায়, নতুন কিছু শেখার আনন্দে। কিন্তু বাস্তব পৃথিবীতে বহু শিশু দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য এবং পারিবারিক সংকটের কারণে অল্প বয়সেই শ্রমের জগতে প্রবেশ করে।

এই বাস্তবতাকে বদলানোর লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন শান্তা সিনহা। শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন এবং প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর কাজ ভারতের সামাজিক উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তিনি দেখিয়েছেন, শিশুশ্রমকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষা, দারিদ্র্য, সামাজিক মনোভাব, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং শিশুদের অধিকার।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

শান্তা সিনহা উচ্চশিক্ষিত পরিবার ও একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষায় গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন।

তিনি হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ও গবেষণার সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে তাঁর পেশাগত জীবন শুরু হলেও পরবর্তীকালে তাঁর কাজের একটি বড় অংশ চলে যায় শিশুদের অধিকার ও শিক্ষার আন্দোলনের দিকে।

এই পরিবর্তন ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

মাঠে নেমে সমস্যাকে দেখা

শিশুশ্রম সম্পর্কে বই পড়ে বা পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে সমস্যাটি বোঝা যায়, কিন্তু বাস্তবে একটি শিশু কেন স্কুলে যাচ্ছে না—তার উত্তর অনেক সময় পাওয়া যায় গ্রামের মানুষের জীবনের মধ্যে।

শান্তা সিনহা সেই বাস্তবতাকে কাছ থেকে দেখার দিকে গুরুত্ব দেন।

তিনি বুঝতে পারেন, দরিদ্র পরিবারের শিশু যদি স্কুলের পরিবর্তে কাজ করতে যায়, তাহলে শুধু পরিবারকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা, স্কুলের পরিবেশ, সামাজিক প্রত্যাশা এবং শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষের ধারণা—সবকিছুর সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত।

এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর সামাজিক কাজের ভিত্তি তৈরি হয়।

এমভি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজ

শান্তা সিনহার নাম সবচেয়ে বেশি যুক্ত MV Foundation-এর সঙ্গে। অন্ধ্রপ্রদেশের রঙ্গা রেড্ডি অঞ্চলে এই সংগঠন শিশুদের শ্রম থেকে বের করে এনে শিক্ষার আওতায় আনার জন্য কাজ করে।

এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল—শিশুর জন্য ‘কাজ’কে স্বাভাবিক বা অপরিহার্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে তার শিক্ষার অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

শিশুশ্রমের সঙ্গে লড়াই করতে হলে শুধু একটি শিশুকে কাজ থেকে সরিয়ে আনলেই হয় না। তাকে স্কুলে ভর্তি করতে হয়, পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করতে হয় এবং পরিবার ও সমাজকে বোঝাতে হয় কেন শিশুর শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

এই সামগ্রিক পদ্ধতিই আন্দোলনটিকে আলাদা মাত্রা দেয়।

‘শিশু শ্রমিক’ নয়, ‘শিশু’

শান্তা সিনহার কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শিশুকে প্রথমে একজন মানুষ ও শিক্ষার্থী হিসেবে দেখা।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ সীমিত হয়ে যাবে—এই ধারণাকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন।

একটি শিশু যদি দীর্ঘদিন শ্রমে যুক্ত থাকে, তাহলে তার স্কুলে ফেরার পথ কঠিন হতে পারে। তাই অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত করার জন্য বিশেষ প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়।

এই উদ্দেশ্যে সেতুশিক্ষা বা বিশেষ শিক্ষাকেন্দ্রের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

স্কুলে ফেরার পথ

শিশুশ্রম থেকে একটি শিশুকে উদ্ধার করার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তার পর কী?

শুধু কাজ বন্ধ করলেই শিশুর জীবন স্বাভাবিক হয়ে যায় না। তার পড়াশোনার ঘাটতি থাকতে পারে, বয়স অনুযায়ী শ্রেণিতে বসতে অসুবিধা হতে পারে এবং দীর্ঘদিনের শ্রমজীবনের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসাও সহজ নয়।

তাই শিশুদের ধীরে ধীরে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় নিয়ে আসার জন্য বিশেষ প্রস্তুতি দরকার।

MV Foundation-এর কাজের মধ্যে এই ধরনের উদ্যোগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজের মানসিকতা বদলানো

শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে আইন থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র আইন দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমাজে যদি ধারণা থাকে যে দরিদ্র পরিবারের শিশুর কাজ করাই স্বাভাবিক, তাহলে শিশুশ্রমের প্রবণতা বজায় থাকতে পারে।

শান্তা সিনহার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এই সামাজিক ধারণার পরিবর্তন।

গ্রামের পরিবার, শিক্ষক, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

কারণ একটি শিশুকে স্কুলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত শুধু তার বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত নয়; অনেক সময় পুরো সমাজের মানসিকতা সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

মেয়েশিশুদের শিক্ষা

শিশুশ্রমের সমস্যা ছেলে ও মেয়ে—উভয় শিশুর ক্ষেত্রেই দেখা যায়। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাড়ির কাজ, ছোট ভাইবোনের দেখাশোনা এবং অল্প বয়সে বিয়ের মতো সামাজিক চাপও শিক্ষার পথে বাধা তৈরি করতে পারে।

তাই মেয়েশিশুদের স্কুলে ধরে রাখার জন্য পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি।

শান্তা সিনহার কাজের বৃহত্তর পরিসরে শিশুদের সমান শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

১৯৯৮ সালের র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার

শিশুদের অধিকার ও শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৯৮ সালে শান্তা সিনহা র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার পান কমিউনিটি লিডারশিপের জন্য।

এই পুরস্কার তাঁর কাজকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে।

তবে তাঁর আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল পুরস্কার নয়—স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ।

তিনি যে মডেলকে এগিয়ে নিয়েছিলেন, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল সাধারণ মানুষকে সমস্যার সমাধানের অংশীদার করা।

জাতীয় স্তরে শিশু অধিকার

পরবর্তীকালে শান্তা সিনহা ভারতের National Commission for Protection of Child Rights (NCPCR)-এর প্রথম চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই দায়িত্বের মাধ্যমে শিশুদের অধিকার নিয়ে তাঁর কাজ আরও বৃহত্তর জাতীয় পরিসরে পৌঁছায়।

শিশুর শিক্ষা, সুরক্ষা, শিশুশ্রম, নির্যাতন এবং শিশুদের মৌলিক অধিকার—এসব বিষয় জাতীয় স্তরে নীতিগত আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একজন মাঠপর্যায়ের কর্মী হিসেবে যে অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, তা এই বৃহত্তর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে সমাজকর্মী

শান্তা সিনহার জীবনের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো তাঁর পরিচয়ের বৈচিত্র্য।

তিনি একদিকে ছিলেন ইতিহাসের অধ্যাপক ও গবেষক, অন্যদিকে শিশু অধিকার আন্দোলনের কর্মী।

এই দুটি জগতকে তিনি একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি।

ইতিহাস আমাদের শেখায় সমাজ কীভাবে পরিবর্তিত হয়। আর সামাজিক কাজ সেই পরিবর্তনকে বাস্তব জীবনে নিয়ে আসে।

তাঁর কর্মজীবনে এই দুই অভিজ্ঞতার সমন্বয় দেখা যায়।

গ্রামকে পরিবর্তনের অংশীদার করা

শিশুদের শিক্ষার প্রশ্নে বাইরে থেকে কোনো প্রকল্প নিয়ে এসে কয়েক বছর কাজ করলেই স্থায়ী পরিবর্তন আসে না।

পরিবারকে বোঝানো, স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করা, স্কুলকে সক্রিয় করা এবং শিশুদের শিক্ষার জন্য সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা—এই সবকিছুর সমন্বয় দরকার।

শান্তা সিনহার কাজের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এই স্থানীয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব।

এতে মানুষ শুধু সাহায্য গ্রহণকারী থাকে না; বরং নিজের এলাকার সমস্যার সমাধানে অংশীদার হয়ে ওঠে।

শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা

একজন শিশুকে স্কুলে পাঠানো মানে শুধু তাকে অক্ষরজ্ঞান দেওয়া নয়। শিক্ষা তার ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন সে বন্ধু তৈরি করে, নিজের মত প্রকাশ করতে শেখে, পৃথিবী সম্পর্কে জানতে পারে এবং ভবিষ্যতে নিজের পেশা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়।

অন্যদিকে অল্প বয়সে শ্রমে প্রবেশ করলে সেই সম্ভাবনাগুলি সংকুচিত হতে পারে।

এই কারণেই শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে লড়াইকে তিনি শিক্ষার অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।

তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

শান্তা সিনহার জীবন থেকে একটি বড় শিক্ষা হলো—সমাজের কোনো সমস্যাকে বদলাতে হলে সমস্যাটিকে তার মূল কারণসহ বুঝতে হয়।

শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে কাজ মানে শুধু কারখানা বা দোকান থেকে শিশুকে সরিয়ে দেওয়া নয়। তার পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, স্কুলের সুযোগ এবং সামাজিক মানসিকতাকেও বিবেচনা করতে হয়।

একই সঙ্গে দরকার দীর্ঘমেয়াদি কাজ।

একটি শিশুর জীবন বদলানোর কাজ রাতারাতি হয় না। শিক্ষা একটি ধীর প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই ধীর পরিবর্তনের ফল বহু বছর ধরে একটি শিশুর জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।

একটি বৃহত্তর সামাজিক উত্তরাধিকার

শান্তা সিনহার কাজ ভারতের শিশু অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

তিনি দেখিয়েছেন, একজন শিক্ষাবিদও চাইলে শ্রেণিকক্ষের বাইরের সমাজে গভীর পরিবর্তনের কাজে যুক্ত হতে পারেন।

তাঁর উদ্যোগের মাধ্যমে যে সামাজিক আন্দোলন তৈরি হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল শিশুদের কাজের জগৎ থেকে শিক্ষার জগতে নিয়ে আসা এবং শিশুদের ভবিষ্যৎকে তাদের অধিকার হিসেবে দেখা।

উপসংহার

শান্তা সিনহার জীবন আমাদের সামনে এমন এক সংগ্রামের ছবি তুলে ধরে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি খুব সাধারণ কিন্তু গভীর প্রশ্ন—একটি শিশুর শৈশবের অধিকার কি তার পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে হারিয়ে যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং শিশু অধিকারকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করেছেন।

একজন ইতিহাসের অধ্যাপক থেকে শিশু অধিকার আন্দোলনের কর্মী, তারপর জাতীয় স্তরে শিশু সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব—তাঁর পথচলা ছিল বহুমাত্রিক।

র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার তাঁর কাজকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সেইসব শিশুদের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত, যারা শ্রমের বদলে স্কুলের পথে হাঁটার সুযোগ পেয়েছে।

শান্তা সিনহার জীবন মনে করিয়ে দেয়—সমাজ পরিবর্তনের কাজ সব সময় বড় কোনো স্লোগান দিয়ে শুরু হয় না। কখনও তা শুরু হয় একটি শিশুকে বই হাতে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। আর সেই ছোট পদক্ষেপই একদিন একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

Share This