শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল। মাঠের ধারে কাশফুল দুলছিল বাতাসে। দূরের ধানখেতে সোনালি রং ধরতে শুরু করেছে। এমন এক দুপুরে বীরভূমের ছোট্ট গ্রাম কৃষ্ণপুরে ফিরে এল সতেরো বছরের ঋজু।
ঋজু কলকাতার একটি নামী স্কুলে পড়ত। পড়াশোনায় সে ভালো, ইংরেজিতে সাবলীল, কম্পিউটার চালাতে দক্ষ। তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়া। গ্রামের ছোট বাড়ি, মাটির রাস্তা, পুকুরপাড়ের আড্ডা—সবকিছুই তার কাছে ক্রমশ পুরোনো ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হচ্ছিল।
ছুটিতে গ্রামে ফিরতে তার খুব একটা ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাবার সঙ্গে তাকে কয়েক দিনের জন্য আসতে হয়েছিল।
বাড়িতে পৌঁছে ঋজু দেখল, তার দাদু নিবারণবাবু উঠোনে বসে বাঁশের সরু কাঠি কাটছেন। পাশে রঙিন কাগজ, সুতো আর আঠা রাখা।
ঋজু ব্যাগ নামিয়ে বলল, “দাদু, এখনও ঘুড়ি বানাও? এখন তো দোকানে কত সুন্দর ঘুড়ি পাওয়া যায়!”
নিবারণবাবু চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে হাসলেন।
“দোকানের ঘুড়ি কিনতে টাকা লাগে। নিজের হাতে বানাতে লাগে ধৈর্য।”
ঋজু হেসে বলল, “ধৈর্য দিয়ে কি আর সব হয়? এখনকার দিনে দক্ষতা আর সুযোগ দরকার।”
দাদু মাথা নাড়লেন।
“সেটাও ঠিক। তবে দক্ষতা আর সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে নিজের হাতে কিছু তৈরি করার আনন্দটাও জানতে হয়।”
ঋজু কথাটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিল না। সে ফোন বের করে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।
কিন্তু নিবারণবাবু তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। তিনি জানতেন, নাতির চোখে এখন পৃথিবী অনেক বড়, আর নিজের গ্রামটা খুব ছোট।
তিনি শুধু অপেক্ষা করছিলেন, কবে ছেলেটি নিজের চোখে এই ছোট্ট জায়গাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা বড় সত্যিটা দেখতে পাবে।
১. হারিয়ে যাওয়া প্রতিযোগিতা
কৃষ্ণপুরে একসময় শরৎকালে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা হতো। গ্রামের মাঠে ছোট-বড় সবাই জড়ো হতো। কেউ নিজের হাতে ঘুড়ি বানিয়ে আনত, কেউ আবার পরিবারের পুরোনো নকশা অনুসরণ করত।
নিবারণবাবু ছিলেন সেই প্রতিযোগিতার অন্যতম আয়োজক। তিনি শুধু ঘুড়ি ওড়ানো শেখাতেন না, শিশুদের বাঁশের কাঠি মাপা, কাগজ কাটানো, সুতো বাঁধা এবং বাতাসের গতিপথ বোঝার কৌশলও শেখাতেন।
কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে প্রতিযোগিতাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখন মোবাইল ফোনে ব্যস্ত। অনেক পরিবার কাজের জন্য বাইরে চলে গেছে। পুরোনো মাঠটির একাংশে আগাছা জন্মেছে। আর নিবারণবাবুর সঙ্গে যাঁরা একসময় আয়োজন করতেন, তাঁদের কেউ অসুস্থ, কেউ অন্যত্র চলে গেছেন।
এবারও প্রতিযোগিতা হবে না জেনে গ্রামের ছোট্ট মেয়ে পিউ একদিন নিবারণবাবুর কাছে এল।
“দাদু, এ বছরও কি ঘুড়ি ওড়ানো হবে না?”
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“লোকজন জোগাড় হলে হবে মা। একা তো আর সব করা যায় না।”
পিউ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি যদি সবাইকে ডাকি?”
নিবারণবাবু হেসে ফেললেন।
“তুই ডাকলে কি সবাই আসবে?”
“জানি না। কিন্তু চেষ্টা তো করতে পারি!”
দূর থেকে কথাগুলো শুনছিল ঋজু। সে মনে মনে ভাবল, গ্রামের মানুষ এখনও ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কত আবেগ দেখায়!
তবু পিউয়ের চোখের উজ্জ্বলতা তার নজর এড়াল না।
পরদিন পিউ গ্রামের শিশুদের নিয়ে একটি ছোট সভা করল। কেউ ঘুড়ি বানাতে জানে না, কেউ সুতো বাঁধতে পারে না। তবু সবাই প্রতিযোগিতাটি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠল।
সমস্যা হলো, মাঠ পরিষ্কার করতে হবে, বাঁশের কাঠি ও কাগজ জোগাড় করতে হবে, প্রতিযোগিতার দিন ঠিক করতে হবে। বড়দের সাহায্যও প্রয়োজন।
পিউ এবার ঋজুর কাছে এল।
“দাদা, তুমি তো শহরে পড়ো। তুমি আমাদের একটা পোস্টার বানিয়ে দিতে পারবে? সবাইকে জানাতে হবে।”
ঋজু প্রথমে না করে দিয়েছিল।
“এসব নিয়ে আমার সময় নেই। তোমরা গ্রামের বড়দের বলো।”
পিউ মাথা নিচু করে চলে গেল।
কিন্তু সন্ধ্যায় ঋজু যখন উঠোনে বসে ফোন দেখছিল, তখন দাদুর ঘর থেকে একটি পুরোনো ঘুড়ি বের করতে দেখল। ঘুড়িটির কাগজ ছেঁড়া, কাঠিগুলো বাঁকা। তবু নিবারণবাবু অত্যন্ত যত্নে সেটি মেরামত করছিলেন।
ঋজু জিজ্ঞেস করল, “ওটা এত যত্ন করে সারাচ্ছ কেন?”
দাদু বললেন, “এই ঘুড়িটা তোর বাবা ছোটবেলায় বানিয়েছিল। প্রথম দিন ওড়েনি। দ্বিতীয় দিনও পড়ে গিয়েছিল। তৃতীয় দিন বাতাস ধরেছিল। তারপর ও নিজেই ঘুড়ি বানানো শিখে যায়।”
ঋজু একটু অবাক হলো।
“বাবা ঘুড়ি বানাত?”
“শুধু বানাত না। একবার তো এমন একটা ঘুড়ি বানিয়েছিল, যা গ্রামের সব ঘুড়ির চেয়ে উঁচুতে উঠেছিল।”
দাদু ঘুড়িটা তার হাতে দিয়ে বললেন, “তোর বাবা এখন অনেক দূরে কাজ করে। কিন্তু এই ঘুড়িটা মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যত দূরেই যাক, তার শুরুর গল্পটা কোথাও না কোথাও থেকে যায়।”
ঋজু ঘুড়িটির ছেঁড়া কাগজের দিকে তাকিয়ে রইল।
সেদিন রাতে সে পিউকে ফোন করল।
“শোনো, পোস্টারটা আমি বানিয়ে দেব। আর প্রতিযোগিতার জন্য একটা অনলাইন ঘোষণাও তৈরি করা যায়।”
পিউ আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
২. শহরের দক্ষতা, গ্রামের স্বপ্ন
ঋজু পরের দিন থেকেই কাজে নেমে পড়ল। সে একটি সুন্দর পোস্টার তৈরি করল। তাতে প্রতিযোগিতার দিন, সময়, স্থান এবং অংশগ্রহণের নিয়ম লেখা হলো। গ্রামের শিশুদের আঁকা কয়েকটি ঘুড়ির ছবি পোস্টারে ব্যবহার করল সে।
তারপর গ্রামের তরুণদের নিয়ে একটি ছোট অনলাইন গোষ্ঠী তৈরি করল, যাতে যারা বাইরে কাজ করে তারাও খবর পায়। কেউ অর্থসাহায্যের প্রস্তাব দিল, কেউ বাঁশ ও কাগজ কিনে দেওয়ার কথা বলল, কেউ আবার প্রতিযোগিতার দিন বাড়ি ফেরার প্রতিশ্রুতি দিল।
ঋজু বুঝতে পারল, গ্রামের মানুষ শুধু গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের অনেকেই অন্য শহরে কাজ করে, পড়াশোনা করে, নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখনও রয়ে গেছে।
এই সম্পর্ককে কাজে লাগানোই ছিল আসল কাজ।
কয়েক দিনের মধ্যে মাঠ পরিষ্কার করার উদ্যোগ শুরু হলো। বড়রা আগাছা সরালেন, তরুণেরা বাঁশের খুঁটি পুঁতল, শিশুরা কাগজ ও সুতো গুছিয়ে রাখল।
নিবারণবাবু সবাইকে ঘুড়ি বানানো শেখাতে শুরু করলেন।
প্রথম দিন ঋজুও তাদের সঙ্গে বসেছিল। সে মাপজোক করে বাঁশের কাঠি কাটতে সাহায্য করল। কিন্তু ঘুড়ির দুই পাশ সমানভাবে বাঁধতে গিয়ে বারবার ভুল করছিল।
দাদু বললেন, “দেখেছিস, শুধু হিসাব জানলেই হয় না। হাতে কাজের অনুভূতিও দরকার।”
ঋজু একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “আমি তো শিখছি।”
“সেটাই তো চাই। যে মানুষ শেখা বন্ধ করে দেয়, সে নিজের অভিজ্ঞতার সীমার মধ্যেই আটকে থাকে।”
কথাটা ঋজুর মনে রয়ে গেল।
সে বুঝতে শুরু করল, দাদুর অভিজ্ঞতা পুরোনো হলেও মূল্যহীন নয়। বরং সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের নতুন দক্ষতা মিলিয়ে দিলে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়।
ঋজু ঘুড়ির নকশা আঁকত, আর নিবারণবাবু দেখিয়ে দিতেন কোথায় কাঠির ভারসাম্য ঠিক রাখতে হবে। পিউ রং বেছে দিত। গ্রামের অন্য শিশুরা কাগজে নানা নকশা আঁকত।
কিছু ঘুড়িতে নদীর ছবি, কিছুতে ধানখেত, কিছুতে গ্রামের পুরোনো মন্দিরের নকশা ফুটে উঠল।
ঋজু একটি বিশেষ ঘুড়ি তৈরি করল। সেটির মাঝখানে আঁকা হলো কৃষ্ণপুরের মানচিত্রের মতো একটি ছবি। তার চারদিকে ছোট ছোট ঘরে লেখা হলো গ্রামের শিশুদের নাম।
ঘুড়িটির নাম দিল সে—‘আমাদের আকাশ’।
৩. যে দিন বাতাস থেমে গেল
প্রতিযোগিতার আগের দিন থেকেই গ্রামের আকাশ মেঘলা হয়ে উঠল। সকালে হালকা বৃষ্টি হলো। দুপুরে বাতাস থেমে গেল। সন্ধ্যার দিকে আবহাওয়া আরও খারাপ হয়ে উঠল।
গ্রামের অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল।
একজন বললেন, “এমন আবহাওয়ায় ঘুড়ি উড়বে কী করে?”
আরেকজন বললেন, “এত আয়োজন করে শেষ পর্যন্ত যদি কিছুই না হয়!”
পিউয়ের মুখ মলিন হয়ে গেল। সে ঋজুর কাছে এসে বলল, “দাদা, সব নষ্ট হয়ে যাবে না তো?”
ঋজু আকাশের দিকে তাকাল। সত্যিই বাতাস ছিল না। তার মনে হলো, এত কষ্ট করে কাজ করার পর যদি প্রতিযোগিতা বাতিল করতে হয়, তাহলে সবাই হতাশ হবে।
নিবারণবাবু অবশ্য শান্ত ছিলেন।
তিনি বললেন, “বাতাস আমাদের হাতে নেই। কিন্তু বাতাস না থাকলে কী করা যায়, সেটা ভাবা আমাদের হাতে আছে।”
ঋজু প্রশ্ন করল, “কী করা যায়?”
দাদু বললেন, “আজ ঘুড়ি উড়বে না। তাই বলে আজকের দিনটা নষ্ট করতে হবে কেন? শিশুদের ঘুড়ি তৈরির প্রদর্শনী হতে পারে। কে কী শিখেছে, সেটা দেখাতে পারে। বাতাস এলে উড়বে, না এলে আবার অন্য দিন।”
ঋজু সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা বদলে দিল। সে পোস্টারে নতুন ঘোষণা লিখল—প্রথম দিনে ঘুড়ি তৈরির প্রদর্শনী ও নকশা প্রতিযোগিতা হবে, আর আবহাওয়া অনুকূল হলে পরের দিন ঘুড়ি ওড়ানো হবে।
গ্রামের মানুষ স্বস্তি পেলেন।
পরের সকালে মাঠে সবাই জড়ো হলো। আকাশ তখনও পুরো পরিষ্কার নয়, কিন্তু বৃষ্টি থেমেছে। শিশুদের তৈরি ঘুড়িগুলো দড়িতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। গ্রামের প্রবীণরা ঘুড়ির নকশা দেখে পুরোনো দিনের গল্প বলছিলেন।
একজন বৃদ্ধ জানালেন, তাঁর বাবা একসময় কাগজের বদলে পাতলা কাপড় দিয়ে ঘুড়ি বানাতেন। আরেকজন বললেন, ছোটবেলায় তিনি ঘুড়ির সুতো তৈরি করার জন্য বাড়িতে তুলো পাকাতে সাহায্য করতেন।
ঋজু এসব কথা শুনে বিস্মিত হলো। সে বুঝতে পারল, ঘুড়ি শুধু একটি খেলনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্মৃতি, দক্ষতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা অভিজ্ঞতা।
বিকেলের দিকে হঠাৎ বাতাস বইতে শুরু করল।
প্রথমে খুব হালকা, তারপর একটু জোরে।
পিউ দৌড়ে এসে চিৎকার করল, “দাদা! বাতাস এসেছে!”
মাঠে আনন্দের ঢেউ উঠল।
৪. আকাশে ওঠার আগে
ঘুড়ি ওড়ানোর সময় ঋজুর তৈরি ‘আমাদের আকাশ’ প্রথমে মাটি ছেড়ে উঠতেই চাইছিল না। সে দৌড়ল, সুতো ছাড়ল, আবার টান দিল। ঘুড়িটি কয়েক হাত ওপরে উঠেই ঘুরে পড়ে গেল।
পাশ থেকে কেউ বলল, “আরেকবার চেষ্টা করো!”
ঋজু ঘুড়িটি হাতে নিয়ে পরীক্ষা করল। একটি কাঠির বাঁধন সামান্য ঢিলে হয়ে গেছে। সে দাদুর সাহায্যে সেটি ঠিক করল।
দ্বিতীয়বার চেষ্টা করল। এবারও ঘুড়ি বেশি ওপরে উঠল না।
ঋজু বিরক্ত হয়ে বলল, “এত হিসাব করেও কাজ হচ্ছে না!”
নিবারণবাবু তার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
“হিসাব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আকাশের সঙ্গে লড়াই করা যায় না। বাতাসের দিক বুঝে তার সঙ্গে চলতে হয়।”
“তাহলে?”
“আগে দেখ, বাতাস কোন দিক থেকে আসছে। তারপর সুতো ছাড়বি। ঘুড়িকে নিজের ইচ্ছেমতো টানতে যাবি না। কখনও সুতো ছাড়তে হয়, কখনও টানতে হয়।”
ঋজু কিছুক্ষণ বাতাসের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে ঘুড়ির নড়াচড়া লক্ষ্য করল। তারপর পিউকে বলল, “তুমি ঘুড়িটা ধরে রাখো। বাতাস ধরলে ছেড়ে দেবে।”
তৃতীয়বার চেষ্টা করার সময় ঘুড়িটি ধীরে ধীরে ওপরে উঠল। প্রথমে একটু দুলল, তারপর বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আকাশের দিকে এগিয়ে গেল।
ঋজু সুতো ছাড়তে লাগল। ঘুড়িটি আরও ওপরে উঠল। মাঠে দাঁড়ানো শিশুরা হাততালি দিল।
পিউ আনন্দে বলল, “দাদা, তোমার ঘুড়ি সবার ওপরে উঠেছে!”
ঋজু হাসল। কিন্তু তার চোখ ছিল ঘুড়ির দিকে। সে দেখছিল, যত ওপরে উঠছে, ততই সুতো আর ভারসাম্যের গুরুত্ব বাড়ছে।
একসময় ঘুড়িটি বেশ উঁচুতে পৌঁছল। হঠাৎ দমকা বাতাস এল। সুতো টানটান হয়ে গেল। ঋজু জোরে সুতো টানতে গিয়ে বুঝল, এতে ঘুড়িটি আরও অস্থির হয়ে উঠছে।
দাদু বললেন, “ধীরে! সব সময় শক্ত করে ধরে রাখলে চলবে না।”
ঋজু একটু সুতো ছেড়ে দিল। ঘুড়িটি আবার স্থির হলো।
সে অবাক হয়ে দাদুর দিকে তাকাল।
“তুমি ঠিক বলেছিলে। কখনও ছাড়তে হয়, কখনও ধরে রাখতে হয়।”
নিবারণবাবু হেসে বললেন, “এই কথাটা শুধু ঘুড়ির জন্য নয়, জীবনের জন্যও মনে রাখিস।”
৫. শিকড়ের কাছে ফিরে দেখা
সেদিন প্রতিযোগিতায় কোনো একক বিজয়ী ঘোষণা করা হলো না। গ্রামের মানুষ ঠিক করলেন, সবচেয়ে সুন্দর নকশা, সবচেয়ে যত্নে তৈরি ঘুড়ি এবং দলগত সহযোগিতার জন্য আলাদা সম্মান দেওয়া হবে।
ঋজুর ‘আমাদের আকাশ’ ঘুড়িটি বিশেষ প্রশংসা পেল। কিন্তু সে নিজের নামের পুরস্কার নিতে এগিয়ে যাওয়ার আগে পিউকে সঙ্গে ডাকল।
“এই ঘুড়ি শুধু আমি বানাইনি। নকশায় পিউয়ের সাহায্য আছে, দাদু আমাকে ভারসাম্য শিখিয়েছেন, আর গ্রামের সবাই মিলে মাঠ তৈরি করেছে।”
পিউ লজ্জা পেয়ে হাসল। নিবারণবাবুর চোখে আনন্দের জল চিকচিক করল।
সন্ধ্যার আগে ঘুড়িগুলো নামিয়ে আনা হলো। শিশুরা একে অপরকে সাহায্য করল। কেউ সুতো গুছিয়ে রাখল, কেউ ভাঙা কাঠি আলাদা করল। ঠিক হলো, আগামী বছর আরও বড় আয়োজন হবে।
বাড়ি ফেরার পথে ঋজু দাদুর পাশে হাঁটছিল।
সে বলল, “দাদু, আমি সব সময় ভাবতাম, বড় হতে হলে গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে যেতে হবে। এখানে থাকলে যেন পিছিয়ে পড়তে হবে।”
নিবারণবাবু ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “দূরে যাওয়া খারাপ নয়। নতুন জায়গায় গেলে নতুন কিছু শেখা যায়। কিন্তু কোথা থেকে এসেছিস, সেটা ভুলে গেলে নিজের শেখার অনেক পথ বন্ধ হয়ে যায়।”
ঋজু বলল, “আজ বুঝলাম, নতুন প্রযুক্তি দিয়ে আমরা অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু দাদু, তোমার মতো মানুষের অভিজ্ঞতাও দরকার।”
“আর আমাদেরও তোদের কাছ থেকে শেখার আছে। পুরোনো জ্ঞানকে আঁকড়ে ধরে থাকলে চলবে না, আবার নতুন বলে পুরোনো সবকিছু ফেলে দিলেও চলবে না। দুটোকে মিলিয়ে নিতে হয়।”
ঋজু চুপ করে গেল।
পরদিন কলকাতায় ফিরে যাওয়ার আগে সে দাদুর কাছ থেকে ঘুড়ি বানানোর কয়েকটি পুরোনো নকশা নিয়ে নিল। সে ঠিক করল, সেগুলো ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করবে। শুধু তাই নয়, গ্রামের শিশুদের তৈরি ঘুড়ির ছবিও সে একটি অনলাইন অ্যালবামে রাখবে, যাতে বাইরে থাকা গ্রামের মানুষও দেখতে পারে।
বিদায়ের সময় নিবারণবাবু তাকে সেই পুরোনো ঘুড়িটি দিলেন, যেটি একসময় তার বাবা বানিয়েছিলেন।
“এটা নিয়ে যা। তবে মনে রাখিস, ঘুড়ির আসল সৌন্দর্য আলমারিতে ঝুলে থাকায় নয়, আকাশে উড়তে পারায়।”
ঋজু ঘুড়িটি যত্ন করে ব্যাগে রাখল।
ট্রেনে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে তার মনে হচ্ছিল, কৃষ্ণপুর আর আগের মতো ছোট মনে হচ্ছে না। গ্রামের মাঠ, কাশফুল, দাদুর সংগৃহীত নকশা, পিউয়ের হাসি—সবকিছু যেন এক বিশাল পৃথিবীর অংশ।
সে বুঝতে পেরেছিল, শিকড় মানুষকে আটকে রাখে না। শিকড় মানুষকে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়।
আর যে নিজের দাঁড়ানোর জায়গাটা চেনে, সে আরও সাহস নিয়ে দূরের আকাশে উড়তে পারে।
কয়েক মাস পর কলেজের একটি প্রকল্পে ঋজু গ্রামীণ ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কাজ শুরু করল। সে কৃষ্ণপুরের ঘুড়ি তৈরির পদ্ধতি নথিবদ্ধ করল, প্রবীণদের সাক্ষাৎকার নিল এবং শিশুদের তৈরি নকশাগুলো সংরক্ষণ করল। তার প্রকল্পের নাম দিল—‘আকাশের সুতো, মাটির টান’।
প্রকল্পটি প্রশংসা পেলেও ঋজুর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল অন্য কিছু। সে বুঝেছিল, নিজের গ্রামের কথা বলতে তার আর লজ্জা লাগে না। বরং সে গর্ব অনুভব করে।
পরের শরতে সে আবার কৃষ্ণপুরে ফিরল। মাঠে তখন আরও বেশি শিশু, আরও বেশি ঘুড়ি। নিবারণবাবু আগের মতোই বসে আছেন, হাতে বাঁশের সরু কাঠি।
ঋজু তাঁর পাশে বসে বলল, “দাদু, এবার আমাকে নতুন একটা নকশা শেখাবে?”
বৃদ্ধের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“অবশ্যই। তবে আজ একটা শর্ত আছে।”
“কী শর্ত?”
“নকশাটা তুই শিখবি, তারপর অন্য কাউকে শেখাবি।”
ঋজু হেসে বলল, “কথা দিলাম।”
দুজনের মাথার ওপর দিয়ে তখন একটি নীল ঘুড়ি উড়ে যাচ্ছিল। তার সুতো ধরে ছিল ছোট্ট পিউ। ঘুড়িটি আকাশের দিকে এগিয়ে চলেছিল, আর তার সুতো মাটিতে দাঁড়ানো মানুষের হাতে রয়ে গিয়েছিল।
ঋজু তাকিয়ে বুঝল, জীবনের সুন্দরতম উড়ান সেই উড়ান নয়, যেখানে মানুষ সব বন্ধন ছিঁড়ে ফেলে। বরং সেই উড়ান, যেখানে স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্ক, স্বপ্নের সঙ্গে দায়িত্ব এবং নতুন পথের সঙ্গে পুরোনো অভিজ্ঞতার যোগ অটুট থাকে।
শিক্ষা: বড় স্বপ্ন দেখা এবং দূরে এগিয়ে যাওয়া জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু নিজের শিকড়, সংস্কৃতি ও পূর্ববর্তী প্রজন্মের অভিজ্ঞতাকে অবহেলা করলে শেখার অনেক দরজা বন্ধ হয়ে যায়। নতুন জ্ঞান ও পুরোনো অভিজ্ঞতাকে সম্মানের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারলেই প্রকৃত উন্নতি সম্ভব।