Categories
অনুগল্প বিবিধ

সাতটি আসনের শেষ সিদ্ধান্ত।

পুরুলিয়ার একটি ছোট শহরে বহু বছর ধরে চলত ‘জনমঞ্চ’ নামে একটি উন্মুক্ত আলোচনা সভা। মাসে একবার শহরের মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে নিজেদের এলাকার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন। কারও বক্তব্য থাকলে তিনি মঞ্চে উঠে বলতে পারতেন। সেখানে ব্যবসায়ী, কৃষক, ছাত্র, শ্রমিক—সবারই সমান অধিকার ছিল।

এক বছর শহরের পুরোনো বাজারের পাশের একটি খালি জমি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে বড় বিতর্ক শুরু হলো। জমিটি সরকারি মালিকানাধীন। একদল ব্যবসায়ী সেখানে গাড়ি রাখার জায়গা তৈরি করতে চাইলেন। তাঁদের যুক্তি, বাজারে যানজট কমবে, ক্রেতারা সহজে আসতে পারবেন। অন্যদিকে, কয়েকজন তরুণ সেখানে একটি ছোট ক্রীড়াঙ্গন তৈরির প্রস্তাব দিলেন। এলাকার বহু শিশুর খেলার উপযুক্ত জায়গা ছিল না।

তৃতীয় একটি প্রস্তাবও এল—জমিতে একটি সাপ্তাহিক হাট বসানো হোক, যাতে আশপাশের গ্রামের ক্ষুদ্র উৎপাদকরা সরাসরি নিজেদের পণ্য বিক্রি করতে পারেন।

তিনটি প্রস্তাবেরই যুক্তি ছিল। কিন্তু জমিটি এত ছোট ছিল যে সবকিছু একসঙ্গে করা সম্ভব নয়।

জনমঞ্চের পরিচালনা কমিটি সিদ্ধান্ত নিল, সাতজনের একটি নাগরিক দল তৈরি করা হবে। তাঁরা প্রতিটি প্রস্তাবের সুবিধা-অসুবিধা খতিয়ে দেখে সুপারিশ করবেন। সাতজনের মধ্যে ছিলেন কলেজের ছাত্রী অন্বেষা, বাজারের ব্যবসায়ী গোপালবাবু, কৃষক নিতাই মাহাতো, অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী শশাঙ্কবাবু, স্থানীয় চিকিৎসক ডা. মধুমিতা, এক তরুণ ক্রীড়াপ্রশিক্ষক এবং একজন ক্ষুদ্র উৎপাদক।

প্রথম বৈঠকেই সমস্যা দেখা দিল। গোপালবাবু বললেন, “ব্যবসা ভালো চললে পুরো শহরের লাভ হবে। তাই গাড়ি রাখার জায়গাই সবচেয়ে জরুরি।”

ক্রীড়াপ্রশিক্ষক প্রতিবাদ করলেন, “শিশুদের ভবিষ্যৎ কি ব্যবসার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ?”

ক্ষুদ্র উৎপাদক বললেন, “আপনারা সবাই শহরের সুবিধার কথা ভাবছেন। গ্রামের মানুষ বাজারে এসে পণ্য বিক্রি করবে কোথায়?”

কথা কাটাকাটি এতটাই বেড়ে গেল যে বৈঠক ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো।

তখন অন্বেষা একটি প্রস্তাব দিল। “আমরা কেউ নিজেদের প্রয়োজনের বাইরে কিছু দেখছি না। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের জানা দরকার, কার কতটা প্রয়োজন এবং কোন সমস্যার বিকল্প সমাধান আছে।”

পরের সাত দিন দলটি তথ্য সংগ্রহ করল। বাজারে গিয়ে দেখা গেল, ব্যস্ত সময়ে যানজট হয় ঠিকই, কিন্তু পাশের একটি সরকারি জমি নির্দিষ্ট সময়ে গাড়ি রাখার জন্য ব্যবহার করা সম্ভব। তার জন্য সামান্য সংস্কার দরকার।

শিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা শুধু খেলার মাঠ চায় না; বর্ষাকালেও যাতে খেলাধুলা চালিয়ে যেতে পারে, তার ব্যবস্থাও দরকার। অন্যদিকে, গ্রামের উৎপাদকরা জানালেন, সপ্তাহের নির্দিষ্ট দু’দিন হাট বসলে তাঁদের সুবিধা হবে। প্রতিদিন বাজারের জায়গা দরকার নেই।

শশাঙ্কবাবু জমিটির মাপজোক করে একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করলেন। দেখা গেল, জমির একাংশে ছোট ক্রীড়াঙ্গন রাখা যায়, আর নির্দিষ্ট দিনে তার পাশের খোলা অংশে অস্থায়ী হাট বসানো সম্ভব। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের আগে নিরাপত্তা, প্রবেশপথ, পরিচ্ছন্নতা এবং সরকারি অনুমোদনের বিষয়গুলি পরীক্ষা করা জরুরি।

সাতজন আবার বৈঠকে বসলেন। এবার কেউ নিজের প্রস্তাবকে একমাত্র সঠিক বলে দাবি করলেন না। তাঁরা বুঝলেন, সমাধান মানে সব পক্ষকে সম্পূর্ণ খুশি করা নয়; বরং তথ্যের ভিত্তিতে এমন পথ খোঁজা, যাতে অধিকাংশ মানুষের প্রয়োজন ন্যায্যভাবে বিবেচিত হয়।

তাঁরা যৌথভাবে সুপারিশ জমা দিলেন। সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বাজেটের ব্যবস্থা করল। পাশাপাশি, যানজট কমানোর জন্য অন্য জমিটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলো।

কয়েক মাস পর নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে খোলা হলো ছোট ক্রীড়াঙ্গন। সপ্তাহের দু’দিন সেখানে হাট বসত। হাটের দিন খেলা বন্ধ থাকত, আর অন্য দিনগুলো শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট থাকত। ব্যবসায়ীদের গাড়ি রাখার সমস্যাও বিকল্প জমিটি সংস্কারের ফলে অনেকটা কমে গেল।

উদ্বোধনের দিন সাতজনের নাগরিক দলের কেউ মঞ্চে নিজের কৃতিত্বের কথা বললেন না। তাঁরা বরং একটি ছোট ফলক বসানোর প্রস্তাব দিলেন, যেখানে লেখা থাকবে—‘এই জায়গা কোনও এক ব্যক্তির জয় নয়; এটি সম্মিলিত চিন্তা ও দায়িত্বের ফল।’

অন্বেষা সেদিন বুঝেছিল, নেতৃত্ব মানে সবচেয়ে জোরে কথা বলা নয়। কখনও কখনও নেতৃত্বের আসল কাজ হলো অন্যদের কথা মন দিয়ে শোনা, তথ্য যাচাই করা এবং মতভেদের মধ্যেও একটি গ্রহণযোগ্য পথ খুঁজে বের করা।

শিক্ষা: মতভেদ মানেই শত্রুতা নয়। ধৈর্য ধরে সবার কথা শোনা, তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সহযোগিতা করতে পারলেই একটি সমাজে স্থায়ী ও ন্যায্য সমাধান তৈরি হয়।

Share This
Categories
অনুগল্প বিবিধ

অদৃশ্য স্বাক্ষরের শক্তি।

কলকাতার এক সরকারি দপ্তরে কাজ করতেন অনিরুদ্ধ পাল। তাঁর পদ ছিল সাধারণ—নথি যাচাইকারী। প্রতিদিন অসংখ্য আবেদনপত্র, অনুমতিপত্র এবং সরকারি কাগজপত্র তাঁর টেবিলের ওপর জমা হতো। অধিকাংশ মানুষই তাঁকে চিনতেন না। দপ্তরের বড় আধিকারিকদের নাম সংবাদপত্রে ছাপা হতো, তাঁদের ছবি উঠত অনুষ্ঠানে। অথচ অনিরুদ্ধের কাজের গুরুত্ব বোঝার মানুষ ছিল খুব কম।

তিনি কখনও এই নিয়ে অভিযোগ করতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোনও কাজ ছোট নয়; ছোট হয় কাজের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি।

একদিন দপ্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন এল। শহরের উপকণ্ঠে একটি পুরোনো জলাভূমি ভরাট করে বিশাল বাণিজ্যিক ভবন তৈরির অনুমতি চাওয়া হয়েছে। আবেদনপত্রের সঙ্গে অনেক নথি জমা দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে দাবি করা হয়েছিল।

ফাইলটি দ্রুত অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশ এল। অধিকাংশ কর্মীই নথিপত্রের প্রাথমিক পরীক্ষা করে ফাইল এগিয়ে দিলেন। কিন্তু অনিরুদ্ধের চোখ আটকে গেল একটি মানচিত্রে। সেখানে জমিটিকে সাধারণ পতিত জমি হিসেবে দেখানো হয়েছে, অথচ তাঁর মনে পড়ল, কয়েক বছর আগে ওই অঞ্চলের জলনিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে একটি সরকারি সমীক্ষার নথি তিনি দেখেছিলেন।

সেই সমীক্ষায় এলাকাটিকে প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

অনিরুদ্ধ পুরোনো নথি খুঁজতে শুরু করলেন। বহু ফাইল ঘেঁটে তিনি সংশ্লিষ্ট সমীক্ষার প্রতিবেদনটি বের করলেন। তাতে স্পষ্ট লেখা ছিল, বর্ষাকালে আশপাশের কয়েকটি এলাকার অতিরিক্ত জল এই জলাভূমিতে জমা হয়। জলাভূমি ভরাট হলে জলনিকাশি ব্যাহত হতে পারে এবং আশপাশের বসতিতে জল জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তিনি বিষয়টি তাঁর ঊর্ধ্বতন আধিকারিককে জানালেন।

আধিকারিক বিরক্ত হয়ে বললেন, “প্রকল্পটি অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এত বড় বিনিয়োগের পথে বাধা সৃষ্টি করার আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার। তোমার কাজ নথি যাচাই করা, প্রকল্পের বিরোধিতা করা নয়।”

অনিরুদ্ধ শান্তভাবে বললেন, “আমি প্রকল্পের বিরোধিতা করছি না, স্যার। শুধু চাইছি, অনুমোদনের আগে তথ্যগুলো আবার যাচাই করা হোক।”

কিন্তু তাঁর কথা গুরুত্ব পেল না। বরং তাঁকে দ্রুত ফাইল নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হলো।

সেদিন বাড়ি ফিরে অনিরুদ্ধ অনেকক্ষণ ভাবলেন। তিনি জানতেন, প্রশ্ন তুললে তাঁর বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ উঠতে পারে। পদোন্নতির সুযোগও নষ্ট হতে পারে। অন্যদিকে, চুপচাপ ফাইল এগিয়ে দিলে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি নিজেই অসৎ হয়ে পড়বেন।

পরদিন তিনি নিয়ম মেনে একটি লিখিত পর্যবেক্ষণ জমা দিলেন। সেখানে কোনও ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়নি। শুধু পুরোনো সমীক্ষা, নতুন মানচিত্রের অসংগতি এবং পুনরায় পরিবেশগত ও জলনিকাশি সংক্রান্ত মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছিল।

প্রথমে তাঁর প্রতিবেদনটি গুরুত্ব পেল না। কিন্তু ফাইলের পরবর্তী পর্যায়ে একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলী বিষয়টি পড়ে আপত্তি তুললেন। তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সরেজমিনে পরিদর্শনের পরামর্শ দিলেন।

পরিদর্শনে দেখা গেল, জলাভূমিটির একটি অংশ ইতিমধ্যেই মাটি ফেলে উঁচু করা হয়েছে। বর্ষার সময় আশপাশের রাস্তায় জল জমার ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের নতুন মূল্যায়নে জানানো হলো, প্রস্তাবিত নির্মাণের আগে জলনিকাশির পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় পরিবেশগত অনুমোদন নিশ্চিত করা জরুরি।

ফলে প্রকল্পের অনুমোদন স্থগিত রাখা হলো। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিকল্প নকশা তৈরি করতে এবং প্রযোজ্য নিয়ম মেনে নতুন করে মূল্যায়ন করাতে বলা হয়।

কয়েক সপ্তাহ পর দপ্তরে একটি বৈঠক ডাকা হলো। সেখানে অনিরুদ্ধের প্রতিবেদনটির উল্লেখ করে বিভাগীয় প্রধান বললেন, “একজন কর্মী নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করেছেন বলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি সময়মতো ধরা পড়েছে। পদমর্যাদা দিয়ে কাজের গুরুত্ব মাপা যায় না।”

অনিরুদ্ধ কোনও বিশেষ পুরস্কার পেলেন না। তাঁর নাম সংবাদপত্রেও ছাপা হলো না। কিন্তু সহকর্মীদের আচরণে পরিবর্তন এল। তাঁরা বুঝতে পারলেন, নিয়ম মেনে প্রশ্ন তোলা মানেই কাজে বাধা দেওয়া নয়।

কয়েক মাস পরে নতুন প্রকল্পের নকশা তৈরি হলো। তাতে জলনিকাশির পথ অক্ষত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় পর্যালোচনার বিষয়গুলিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

একদিন অনিরুদ্ধ নিজের টেবিলে বসে একটি নতুন ফাইল খুললেন। পাতার নিচে তাঁর স্বাক্ষরের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ছিল। তিনি কলম হাতে নিয়ে মনে মনে বললেন, “স্বাক্ষর হয়তো কয়েকটি কালির রেখা। কিন্তু তার আগে যে বিবেক কাজ করে, তার মূল্য অনেক বেশি।”

বাইরের পৃথিবী হয়তো তাঁর নাম জানল না, কিন্তু তাঁর সতর্কতা বহু মানুষের সম্ভাব্য দুর্ভোগ এড়ানোর প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

শিক্ষা: সততা সব সময় প্রশংসা বা পুরস্কার এনে দেয় না। তবু নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা এবং ভুল দেখলে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে প্রশ্ন তোলা—এই সাহসই সমাজকে আরও নিরাপদ ও ন্যায়সংগত করে তোলে।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : যে জানালাটি খুলে দিয়েছিল নতুন জীবনের পথ।

শহরের পুরোনো পাড়াটিতে একটি বাড়ি ছিল, যার দোতলার উত্তর দিকের জানালাটি প্রায় পনেরো বছর ধরে বন্ধ। জানালার কাঠে ধুলো জমেছিল, পাল্লার গায়ে শ্যাওলা ধরেছিল, আর লোহার ছিটকিনিতে মরচে পড়েছিল। পাড়ার লোকেরা বলত, বাড়িটির ওই ঘরে কেউ থাকে না। একসময় সেখানে থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার শশাঙ্কবাবু। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি বাড়ির বেশির ভাগ ঘর বন্ধ করে একতলায় থাকতে শুরু করেছিলেন।

বাড়ির পাশেই থাকত ষোলো বছরের মেয়ে অন্বেষা। সে পড়াশোনায় ভালো, কিন্তু তার জীবনে একটা বড় সমস্যা ছিল—সে কথা বলতে ভয় পেত। স্কুলে কোনও প্রশ্নের উত্তর জানলেও হাত তুলত না। বন্ধুরা কোনও বিষয়ে আলোচনা করলে নিজের মতামত প্রকাশ করত না। এমনকি নিজের পছন্দ-অপছন্দ জানাতেও তার অসুবিধা হতো।

তার বাবা ছোট্ট একটি ওষুধের দোকান চালাতেন। মা বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করতেন। দুজনেই মেয়েকে ভালোবাসতেন, কিন্তু অন্বেষার নীরবতার কারণ বুঝতে পারতেন না।

মা প্রায়ই বলতেন, “তুই সব জানিস, তবু মুখ খুলিস না কেন?”

অন্বেষা উত্তর দিতে পারত না। তার মনে হতো, কথা বলতে গিয়ে ভুল করলে সবাই হাসবে। ছোটবেলায় একবার স্কুলের অনুষ্ঠানে কবিতা বলতে গিয়ে সে কয়েকটি লাইন ভুলে গিয়েছিল। কয়েকজন সহপাঠী হেসেছিল। সেই হাসি তার মনে এমন গভীর দাগ কেটেছিল যে তারপর থেকে মানুষের সামনে কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেলেছিল।

একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় সে দেখল, পাশের পুরোনো বাড়ির উত্তর দিকের জানালার সামনে একজন মিস্ত্রি দাঁড়িয়ে আছেন। বাড়ির মালিক শশাঙ্কবাবু তাঁকে বলছেন, জানালাটা খুলে পরিষ্কার করতে।

অন্বেষা কৌতূহলী হয়ে দাঁড়াল।

শশাঙ্কবাবু তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী দেখছ মা?”

সে একটু ইতস্তত করে বলল, “জানালাটা এত দিন বন্ধ ছিল কেন?”

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “কখনও কখনও মানুষ ঘরের জানালা বন্ধ করতে করতে নিজের মনের জানালাও বন্ধ করে ফেলে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।”

অন্বেষা কথাটির অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারল না। তবু তার মনে প্রশ্ন জাগল।

পরদিন বিকেলে সে দেখল, জানালার পাল্লা খুলে দেওয়া হয়েছে। ঘরের ভিতরে জমে থাকা ধুলো পরিষ্কার হচ্ছে। বহু বছর পর সূর্যের আলো ঢুকছে ঘরটিতে।

সেদিন স্কুলের একটি ঘটনা অন্বেষাকে খুব কষ্ট দিয়েছিল। শিক্ষক ক্লাসে একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে বলেছিলেন। অন্বেষার কাছে ভালো একটি উত্তর ছিল। কিন্তু সে বলতে পারেনি। অন্য এক সহপাঠী ভুল উত্তর দেওয়ার পরও সবাই তাকে উৎসাহ দিয়েছিল। বাড়ি ফিরে অন্বেষার মনে হচ্ছিল, সে যেন কোনও দিনই নিজের কথা বলতে পারবে না।

সন্ধ্যায় সে পুরোনো বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়াল। জানালাটি খোলা। ভিতরে শশাঙ্কবাবু একটি চেয়ারে বসে বই পড়ছেন।

বৃদ্ধ তাকে দেখে ডাকলেন, “ভিতরে আসবে?”

অন্বেষা প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেল।

ঘরটিতে পুরোনো বইয়ের তাক, কাঠের টেবিল আর একটি বড় আয়না ছিল। জানালা দিয়ে দূরের গাছপালা দেখা যাচ্ছিল। শশাঙ্কবাবু তাকে বসতে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার মন খারাপ কেন?”

অন্বেষা অবাক হলো। সে তো কিছুই বলেনি!

বৃদ্ধ বললেন, “মানুষের মুখ সব সময় কথা বলে না, কিন্তু তার চোখ অনেক সময় মনের খবর জানিয়ে দেয়।”

অন্বেষা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর নিজের সমস্যার কথা জানাল। সে বলল, কীভাবে একবার ভুল করার পর থেকে মানুষের সামনে কথা বলতে ভয় পায়। শশাঙ্কবাবু মন দিয়ে সব শুনলেন। কোনও তাড়াহুড়ো করে উপদেশ দিলেন না।

তারপর তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই জানালাটা পনেরো বছর বন্ধ ছিল। তুমি জানো কেন?”

অন্বেষা মাথা নাড়ল।

“আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর এই ঘরটায় আসতে কষ্ট হতো। এই জানালার পাশে বসেই আমরা দুজনে বই পড়তাম, বৃষ্টির শব্দ শুনতাম। ও চলে যাওয়ার পর জানালাটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, বাইরের আলো ঢুকতে না দিলে ভিতরের কষ্টও হয়তো কমবে।”

তিনি একটু থামলেন।

“কিন্তু কষ্ট কমেনি। বরং ঘরটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। বইগুলো ধুলোয় ঢেকে গিয়েছিল। একদিন বুঝলাম, স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আলো বন্ধ করে রাখা যায় না।”

অন্বেষা চুপচাপ শুনছিল।

শশাঙ্কবাবু বললেন, “ভুল করার ভয়ে তুমি নিজের কথা বলছ না। কিন্তু জানো, ভুল না করলে মানুষ শেখে কীভাবে? জানালাটা খুললে যেমন আলো ঢোকে, তেমনই কথা বললে কখনও প্রশংসা আসবে, কখনও সমালোচনা। দুটোই গ্রহণ করতে শেখা দরকার।”

সেদিন বাড়ি ফেরার আগে বৃদ্ধ তাকে একটি ছোট্ট ডায়েরি দিলেন।

“প্রতিদিন এই ডায়েরিতে তিনটি কথা লিখবে। আজ কী শিখলে, কোন কাজটি করতে ভয় পেয়েছিলে, আর আগামীকাল সেই ভয়ের মুখোমুখি হতে কী করবে।”

অন্বেষা ডায়েরিটি হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরল।

প্রথম দিন সে লিখল—‘আজ নিজের সমস্যার কথা একজনকে বলেছি।’

দ্বিতীয় দিন লিখল—‘আজ দোকানে গিয়ে নিজের পছন্দের কলমটি চেয়েছি।’

তৃতীয় দিন লিখল—‘আজ ক্লাসে উত্তর জানতাম, কিন্তু বলতে পারিনি। কাল চেষ্টা করব।’

পরের দিনও সে পুরোপুরি সাহস পায়নি। তবে শিক্ষক যখন প্রশ্ন করলেন, তখন সে ধীরে ধীরে হাত তুলল। তার গলা কাঁপছিল, কথাও একটু আটকে যাচ্ছিল। তবু সে উত্তরটি বলল।

উত্তরটি সম্পূর্ণ সঠিক ছিল না। শিক্ষক একটি অংশ সংশোধন করে দিলেন। অন্বেষার মনে প্রথমে অস্বস্তি হলো, কিন্তু তারপর সে বুঝল, ভুল হওয়া মানেই অপমানিত হওয়া নয়। শিক্ষক তাকে আরও ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলেন।

সেদিন বাড়ি ফিরে ডায়েরিতে সে লিখল—‘আজ ভুল করেছি, কিন্তু কেউ আমাকে নিয়ে হাসেনি। আমি আবার চেষ্টা করতে পারব।’

এরপর থেকে সে প্রতিদিন ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করতে লাগল। কখনও দোকানে আসা ক্রেতাকে পরিষ্কারভাবে কথা বলত, কখনও বন্ধুর সঙ্গে নিজের মতামত ভাগ করত। মাঝে মাঝে ব্যর্থ হতো, আবার নতুন করে চেষ্টা করত।

শশাঙ্কবাবুর ঘরটিও ধীরে ধীরে বদলে গেল। অন্বেষা মাঝে মাঝে সেখানে যেত। বৃদ্ধের বইয়ের তাক গুছিয়ে দিত, জানালার পাশে রাখা ফুলের টবে জল দিত। একদিন তার মাথায় একটি ভাবনা এল।

সে শশাঙ্কবাবুকে বলল, “এই ঘরটা যদি পাড়ার ছেলেমেয়েদের জন্য খুলে দেওয়া যায়? এখানে তো অনেক বই আছে। আমরা বিকেলে এসে পড়তে পারি।”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “চমৎকার ভাবনা। তবে শুধু বই পড়লেই হবে না। তোমরা এখানে নিজেদের কথা বলবে, গল্প করবে, কেউ কিছু শেখাতে চাইলে অন্যদের শেখাবে।”

অন্বেষা প্রথমে ভয় পেল। এতগুলো মানুষের সামনে কথা বলবে কীভাবে? কিন্তু ডায়েরির পাতাগুলো মনে পড়ল। সে ঠিক করল, এবার পিছিয়ে যাবে না।

পাড়ার কয়েকজন ছেলেমেয়েকে নিয়ে শুরু হলো ছোট্ট একটি পাঠচক্র। প্রথম দিন অন্বেষা সবাইকে স্বাগত জানানোর সময় কাগজ দেখে কথা বলেছিল। দ্বিতীয় দিন কাগজ না দেখে দু-একটি বাক্য বলল। কয়েক সপ্তাহ পর সে নিজেই একটি গল্প পড়ে শোনাতে শুরু করল।

একদিন শশাঙ্কবাবু তাকে বললেন, “তোমার গলায় এখন আর আগের মতো ভয় শুনতে পাই না।”

অন্বেষা হেসে বলল, “ভয় এখনও আছে। শুধু এখন ভয় পেলেই পালিয়ে যাই না।”

বৃদ্ধের মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটল।

কয়েক মাস পরে স্কুলে বার্ষিক অনুষ্ঠান হলো। শিক্ষক অন্বেষাকে মঞ্চে উঠে একটি ছোট্ট বক্তব্য দিতে বললেন। বিষয় ছিল—‘আমার জীবনের একটি শিক্ষা’।

অন্বেষা প্রথমে দ্বিধায় পড়ে গেল। তারপর বাড়ি ফিরে ডায়েরি খুলল। তার মনে হলো, এই বক্তব্য শুধু মঞ্চের জন্য নয়; নিজের পুরোনো ভয়কে সামনে দাঁড়িয়ে দেখারও একটা সুযোগ।

অনুষ্ঠানের দিন হলঘর ভর্তি মানুষ। মঞ্চে ওঠার সময় তার হাত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। সামনে বসা অনেক মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, সে হয়তো সব ভুলে যাবে।

তারপর চোখে পড়ল শেষ সারিতে বসে থাকা শশাঙ্কবাবুকে। তাঁর মুখে শান্ত হাসি।

অন্বেষা মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলতে শুরু করল—

“একসময় আমি ভাবতাম, ভুল করলে সবাই আমাকে ছোট করবে। তাই নিজের কথা বলতাম না। কিন্তু একজন মানুষ আমাকে শিখিয়েছেন, জানালা বন্ধ রাখলে বাইরের আলোও ঢুকতে পারে না। নিজের ভয়কে সব সময় এড়িয়ে চললে আমরা নতুন কিছু শেখার সুযোগ হারাই।”

সে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলল। কীভাবে ছোট ছোট পদক্ষেপ তাকে সাহসী করেছে, কীভাবে ভুল থেকে শেখা যায়, আর কীভাবে অন্যের কথা মন দিয়ে শুনলে মানুষ নিজেকে একা মনে করে না।

বক্তব্য শেষ হলে হলঘরে করতালি উঠল। অন্বেষা বুঝতে পারল, তার সাফল্য করতালির মধ্যে নয়। সাফল্য হলো, সে ভয় থাকা সত্ত্বেও নিজের কথা বলতে পেরেছে।

অনুষ্ঠানের পর সে শশাঙ্কবাবুর কাছে গেল।

“আপনি না থাকলে হয়তো আমি কোনও দিন মঞ্চে উঠতে পারতাম না,” সে বলল।

শশাঙ্কবাবু মাথা নাড়লেন।

“আমি শুধু জানালাটা খুলেছি। বাইরে তাকানোর সাহসটা তোমাকেই অর্জন করতে হয়েছে।”

কয়েক বছর পর সেই পুরোনো ঘরটি পাড়ার ছোট্ট পাঠাগার ও আলোচনা কেন্দ্র হয়ে উঠল। জানালাটি আর কখনও বন্ধ করা হয়নি। সকালে সূর্যের আলো বইয়ের তাক ছুঁয়ে যেত, বিকেলে শিশুরা সেখানে বসে পড়ত, আর সন্ধ্যায় নানা বয়সের মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিত।

দরজার পাশে একটি ছোট্ট ফলকে লেখা ছিল—

‘এই ঘরে ভুল করা নিষেধ নয়। প্রশ্ন করা নিষেধ নয়। নিজের কথা বলাও নিষেধ নয়।’

অন্বেষা বড় হয়ে শিক্ষকতা শুরু করেছিল। তার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যারা চুপচাপ থাকত, তাদের সে কখনও জোর করে কথা বলাত না। বরং তাদের সময় দিত, মন দিয়ে শুনত এবং বোঝাত—প্রত্যেক মানুষের নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার অধিকার আছে।

আর শশাঙ্কবাবু? তিনি প্রায়ই জানালার পাশে বসে বই পড়তেন। স্ত্রীর স্মৃতি তখনও তাঁকে কষ্ট দিত, কিন্তু সেই কষ্ট আর তাঁকে অন্ধকারে আটকে রাখতে পারত না।

তিনি বুঝেছিলেন, জীবন থেকে কিছু হারিয়ে গেলে তার শূন্যতা মুছে যায় না। তবু সেই শূন্যতার মধ্যেও নতুন সম্পর্ক, নতুন কাজ আর নতুন আনন্দের জন্য জায়গা তৈরি করা যায়।

একটি জানালা খুলেছিল একটি ঘরকে। সেই ঘর খুলে দিয়েছিল একটি মেয়ের সাহসের পথ। আর সেই মেয়ের সাহস একদিন আরও অনেক মানুষের জন্য তৈরি করেছিল এমন একটি জায়গা, যেখানে কেউ নিজের কথা বলতে ভয় পেত না।

শিক্ষা: ভয়কে সম্পূর্ণ দূর করার অপেক্ষায় থাকলে জীবনের অনেক দরজা বন্ধই থেকে যায়। ভয়কে সঙ্গে নিয়েই ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হয়। আর অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা কখনও কখনও তার জীবনে নতুন আলো জ্বালাতে পারে।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : শেষ বিকেলের সেই অচেনা চিঠি।।

শহরের এক প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো বাড়ি। বাড়িটির সামনে ছোট্ট উঠোন, উঠোনের এক পাশে তুলসীমঞ্চ, আর পিছনে একটি সরু গলি। সেই বাড়িতে একা থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিবারণবাবু।

একসময় তাঁর বাড়ি ছিল ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনায় মুখর। কেউ অঙ্ক বুঝতে আসত, কেউ পরীক্ষার আগে শেষ মুহূর্তের পরামর্শ নিতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাই নিজের নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বাড়িটা আরও নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল।

তবু নিবারণবাবুর প্রতিদিনের একটি অভ্যাস ছিল। বিকেল পাঁচটায় তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে শহরের পুরোনো পার্কে যেতেন। একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চে বসে সূর্য ডোবা দেখতেন। তাঁর হাতে থাকত ছোট্ট একটি ডায়েরি। মাঝে মাঝে তাতে দু-একটি কথা লিখতেন।

কী লিখতেন, তা কেউ জানত না।

একদিন বিকেলে পার্কের সেই বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতে তিনি দেখতে পেলেন, বেঞ্চের নিচে একটি খাম পড়ে আছে। খামটি পুরোনো, কিন্তু বেশ যত্ন করে বন্ধ করা। তার ওপরে শুধু লেখা—‘যাঁর কাছে পৌঁছবে, তাঁর জন্য।’

নিবারণবাবু চারদিকে তাকালেন। কাছাকাছি কয়েকজন মানুষ হাঁটছিলেন, কিছু শিশু খেলছিল। কিন্তু কেউ খামটির খোঁজ করছিল না।

তিনি খামটি খুলবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়লেন। অন্যের চিঠি পড়া ঠিক নয়। আবার খামের ওপরে প্রাপকের নামও নেই। শেষ পর্যন্ত তিনি খামটি নিজের ব্যাগে রেখে দিলেন, মনে মনে ঠিক করলেন, পরদিন পার্কের কর্মচারীর কাছে জমা দেবেন।

কিন্তু বাড়ি ফিরে ব্যাগ থেকে খামটি বের করতেই তাঁর চোখ আটকে গেল খামের এক কোণে লেখা একটি ছোট্ট বাক্যে।

‘যদি কখনও মনে হয়, আপনার জীবনের আর কোনও প্রয়োজন নেই, তবে এটি পড়বেন।’

নিবারণবাবু দীর্ঘক্ষণ বাক্যটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিজের মনেও এমন কথা কখনও কখনও এসেছে। একসময় যে মানুষটির কাছে প্রতিদিন কেউ না কেউ সাহায্য চাইত, আজ তাঁর অসুস্থতার খবর নেওয়ার মতো মানুষও হাতে গোনা। তিনি কাউকে দোষ দিতেন না। জানতেন, জীবন সবার জন্যই ব্যস্ত। কিন্তু সন্ধ্যা নামলে নিঃসঙ্গতা কখনও কখনও বুকের মধ্যে পাথরের মতো চেপে বসত।

তিনি খামটি খুললেন।

ভেতরে ছিল একটি হাতে লেখা চিঠি।

‘প্রিয় অচেনা মানুষ,

আপনি কে, আমি জানি না। হয়তো আপনার বয়স আমার চেয়ে বেশি, হয়তো কম। হয়তো আপনার জীবনে অনেক মানুষ আছে, আবার হয়তো আপনি একা।

আমি জানি না, এই চিঠি আপনার হাতে পৌঁছবে কি না। তবু লিখছি, কারণ একসময় আমিও ভেবেছিলাম, আমার থাকা না-থাকায় কারও কিছু এসে যায় না।

আমার নাম অদিতি। কয়েক মাস আগে আমার জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল, যার পরে আমি নিজেকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ মনে করতাম। যে কাজের জন্য এত পরিশ্রম করেছি, সেখানে সফল হতে পারিনি। কাছের মানুষদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম।

একদিন এই পার্কের বেঞ্চে বসে কাঁদছিলাম। তখন এক বৃদ্ধ মানুষ আমার পাশে বসেছিলেন। তিনি আমাকে কোনও বড় উপদেশ দেননি। শুধু জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আজ তুমি খেয়েছ?”

প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু অনেক দিন পরে কেউ আমার খাওয়ার কথা ভেবেছিল। আমি উত্তর দিতে পারিনি। তিনি আমাকে কাছের দোকান থেকে এক কাপ চা এনে দিয়েছিলেন।

সেদিন বুঝেছিলাম, পৃথিবী সব সময় বড় বড় কথা দিয়ে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে না। কখনও একটি সাধারণ প্রশ্ন, এক কাপ চা, অথবা কারও নীরবে পাশে বসে থাকাও যথেষ্ট।

সেই মানুষটির নাম আমি জানতে পারিনি। তাঁকে আর কোনও দিন দেখিনি। কিন্তু তাঁর ছোট্ট ব্যবহার আমাকে আবার নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার সাহস দিয়েছিল।

আজ আমি ভালো আছি। সব সমস্যা মিটে যায়নি, কিন্তু আমি বুঝেছি, ব্যর্থতা মানেই জীবনের শেষ নয়।

এই চিঠি আমি সেই মানুষটির উদ্দেশে লিখছি। যদি কোনও দিন তাঁর কাছে পৌঁছয়, তিনি যেন জানেন—সেদিন তাঁর সামান্য সাহায্য আমার কাছে কত বড় ছিল।

আর যদি তাঁর কাছে না পৌঁছয়, তবে যাঁর হাতে পড়বে, তিনি যেন মনে রাখেন—আপনার একটি ছোট্ট ভালো কাজও কোনও মানুষের জীবনে অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

আপনি হয়তো নিজেই জানবেন না, কার জীবনে আপনি আলো হয়ে এসেছেন।

ইতি, একজন কৃতজ্ঞ মানুষ।’

চিঠিটি পড়ে নিবারণবাবুর হাত কেঁপে উঠল।

তিনি আবার পড়লেন। তারপর আরও একবার।

এক কাপ চা। কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন। একজন অচেনা মানুষের পাশে বসে থাকা।

হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে গেল বহু বছর আগের একটি ঘটনা।

তখন তিনি স্কুলে পড়াতেন। এক শীতের সকালে স্কুলের গেটের বাইরে একটি মেয়ে বসে কাঁদছিল। তার নাম অদিতি। পরীক্ষায় খারাপ ফল করেছিল বলে বাড়িতে বকুনি খেয়ে সে স্কুলে আসতে ভয় পাচ্ছিল। নিবারণবাবু তাকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে জল খাইয়েছিলেন, টিফিনের খাবার ভাগ করে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, “একটা পরীক্ষার ফল তোমার পুরো জীবনের পরিচয় হতে পারে না।”

সেই মেয়েটি কি এই অদিতি?

নিবারণবাবু স্মৃতি হাতড়াতে লাগলেন। অদিতির চোখের জল, ছোট্ট দুটি বেণি, আর ভয়ে কুঁকড়ে থাকা মুখটি যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

পরদিন তিনি চিঠিটি নিয়ে পার্কে গেলেন। পার্কের কর্মচারীকে দেখালেন। কর্মচারী চিঠিটি দেখে বললেন, “এ রকম একটা খাম কয়েক দিন ধরে এখানে পড়ে থাকতে দেখেছি। তবে কে রেখে গেছে, জানি না।”

নিবারণবাবু জানতে চাইলেন, “এখানে কি কোনও অদিতি নামে মেয়ে আসে?”

কর্মচারী একটু ভেবে বললেন, “সন্ধ্যার দিকে এক তরুণী আসে মাঝে মাঝে। সে পার্কের পাশের শিশুদের পাঠকেন্দ্রে কাজ করে। নাম অদিতি কি না, ঠিক জানি না।”

পার্কের পাশেই একটি ছোট্ট পাঠকেন্দ্র ছিল। সেখানে এলাকার শিশুদের বিনা পয়সায় পড়াশোনা করানো হতো। নিবারণবাবু সেদিনই সেখানে গেলেন।

ঘরে ঢুকতেই কয়েকজন শিশু তাঁকে ঘিরে ধরল। কেউ অঙ্কের খাতা দেখাতে লাগল, কেউ বাংলা পড়তে চাইল। অনেক দিন পর শিশুদের এই কোলাহল তাঁর মনে অদ্ভুত আনন্দ জাগাল।

একটু পরে ঘরে এল এক তরুণী। তার মুখে পরিশ্রমের ছাপ, চোখে শান্ত আত্মবিশ্বাস।

নিবারণবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার নাম কি অদিতি?”

মেয়েটি অবাক হয়ে বলল, “হ্যাঁ। আপনি আমাকে চেনেন?”

তিনি ব্যাগ থেকে চিঠিটি বের করলেন।

অদিতি চিঠি দেখে প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর তার চোখ বড় হয়ে গেল।

“এটা আপনি কোথায় পেলেন?”

নিবারণবাবু বললেন, “পার্কের বেঞ্চের নিচে। চিঠির কথা পড়ে মনে হল, হয়তো তোমাকে খুঁজে পাওয়া দরকার।”

অদিতি ধীরে ধীরে বসে পড়ল।

“আমি ভেবেছিলাম, চিঠিটা হয়তো কোনও দিন কারও হাতে পৌঁছবে না। আমি আসলে সেই মানুষটিকে খুঁজছিলাম, যিনি বহু বছর আগে আমাকে সাহায্য করেছিলেন। আমার মনে ছিল, তিনি এই পার্কে বিকেলে বসতেন। কিন্তু নামটা মনে করতে পারিনি। তাই চিঠিটা রেখে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, হয়তো তিনি কোনও দিন পড়বেন।”

নিবারণবাবু মৃদু হেসে বললেন, “তুমি কি সেই ছোট্ট মেয়েটি, যে একদিন স্কুলের গেটের বাইরে কাঁদছিল?”

অদিতির চোখ ভিজে উঠল।

“স্যার! আপনি?”

সে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর পায়ে হাত দিতে গেল। নিবারণবাবু তাড়াতাড়ি তাকে থামিয়ে দিলেন।

“এসব করতে হবে না। তুমি এখন কী করছ, বলো।”

অদিতি জানাল, পড়াশোনা শেষ করে সে একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। পরে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিল, অনেক শিশু পরীক্ষার ফল, পারিবারিক সমস্যা কিংবা অর্থের অভাবে পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাই কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে সে এই পাঠকেন্দ্র শুরু করেছে।

“সব কিছু খুব সহজ নয়, স্যার,” অদিতি বলল। “কখনও বই কেনার টাকা থাকে না, কখনও ঘরভাড়া দিতে সমস্যা হয়। তবু শিশুদের চোখে যখন শেখার আগ্রহ দেখি, তখন মনে হয় কাজটা চালিয়ে যেতে হবে।”

নিবারণবাবু চারদিকে তাকালেন। একটি শিশু বারবার একই অঙ্ক ভুল করছে। অন্য একটি শিশু বাংলা শব্দ জোড়া লাগাতে পারছে না। অথচ তাদের চোখে ছিল শেখার তীব্র ইচ্ছা।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের কি একজন শিক্ষক দরকার?”

অদিতি অবাক হয়ে তাকাল।

“আপনি কি এখানে পড়াবেন?”

নিবারণবাবু হেসে বললেন, “যদি তোমরা আমাকে সুযোগ দাও।”

সেই দিন থেকেই তাঁর বিকেলের রুটিন বদলে গেল।

এখন তিনি আর একা বেঞ্চে বসে সূর্য ডোবা দেখতেন না। সপ্তাহে চার দিন পাঠকেন্দ্রে যেতেন। শিশুদের বাংলা, অঙ্ক, ইতিহাস পড়াতেন। কারও ভুল হলে বকতেন না; বরং বোঝাতেন, ভুলের মধ্য দিয়েই শেখা যায়।

ধীরে ধীরে পাঠকেন্দ্রের শিশুর সংখ্যা বাড়তে লাগল। এলাকার আরও কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষ সেখানে যোগ দিলেন। কেউ ছবি আঁকা শেখাতেন, কেউ গল্প পড়তেন, কেউ আবার শিশুদের খেলাধুলার ব্যবস্থা করতেন।

একদিন পাঠকেন্দ্রের বার্ষিক অনুষ্ঠানে অদিতি নিবারণবাবুকে একটি ছোট্ট বাক্স উপহার দিল। বাক্সের মধ্যে ছিল অনেকগুলি হাতে লেখা চিঠি। গ্রামের ও শহরের বিভিন্ন মানুষ লিখেছেন—কোনও এক সময়ে কে তাঁদের সাহায্য করেছিলেন, কীভাবে একটি ছোট্ট ভালো কাজ তাঁদের জীবন বদলে দিয়েছিল।

অদিতি বলল, “স্যার, আমরা এই চিঠিগুলো দিয়ে একটি দেয়াল তৈরি করব। নাম দেব ‘ভালো কাজের স্মৃতি’। যাতে শিশুরা বুঝতে পারে, পৃথিবীতে ভালো মানুষ আছেন, আর তারাও চাইলে ভালো কাজ করতে পারে।”

নিবারণবাবু একটি চিঠি হাতে তুলে নিলেন। তাতে লেখা ছিল—‘একদিন এক অচেনা মানুষ আমার কথা শুনেছিলেন। সেই দিন থেকে আমি বুঝেছিলাম, আমার কথারও মূল্য আছে।’

চিঠিটি পড়ে তাঁর চোখ ভিজে উঠল।

অনুষ্ঠান শেষে তিনি আবার সেই পুরোনো পার্কে গেলেন। সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। বেঞ্চটি আগের মতোই আছে, কিন্তু তাঁর পাশে এখন শূন্যতা নেই। পকেটে রাখা ডায়েরিটি বের করে তিনি লিখলেন—

‘জীবনের শেষ বিকেল বলে কিছু নেই। যত দিন অন্য কারও কাজে লাগার সুযোগ থাকে, তত দিন প্রতিটি সন্ধ্যার পরেও নতুন সকাল অপেক্ষা করে।’

তারপর ডায়েরি বন্ধ করে তিনি ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

সেদিন তাঁর মনে আর প্রশ্ন জাগেনি—তিনি কারও কাছে প্রয়োজনীয় কি না। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, জীবনের মূল্য শুধু কতজন মানুষ আমাদের মনে রাখল, তার ওপর নির্ভর করে না। কখনও আমরা যাকে সামান্য সাহায্য করি, সে-ই একদিন আমাদের জীবনেও নতুন অর্থ ফিরিয়ে দিতে পারে।

আর সেই অচেনা চিঠি?

সেটি পাঠকেন্দ্রের দেয়ালে কাচের ফ্রেমে রাখা হল। নিচে লেখা হল—

‘একটি ছোট্ট ভালো কাজের কোনও মেয়াদ শেষ হয় না। তার ফল কখন, কোথায়, কার জীবনে ফিরে আসবে—তা আমরা জানি না।’

শিক্ষা: মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সব সময় বড় ক্ষমতা বা অনেক অর্থের প্রয়োজন হয় না। একটু সময়, আন্তরিকতা ও সহানুভূতিও কারও জীবনে নতুন আশার দরজা খুলে দিতে পারে।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : বৃষ্টির জলে ভেসে আসা অচেনা নাম।।

সেদিন সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। দুপুর গড়াতেই মুষলধারে বৃষ্টি নামল। গ্রামের কাঁচা রাস্তা জলে ডুবে গেল, পুকুরের জল উপচে উঠল, আর ছোট ছোট নালাগুলো দিয়ে ছুটতে লাগল ঘোলা স্রোত।

বারো বছরের অর্ক জানলার পাশে বসে বৃষ্টি দেখছিল। তার স্কুল বন্ধ, হাতে করার মতো বিশেষ কিছু নেই। হঠাৎ উঠোনের পাশের নালায় একটা নীল রঙের খাতা ভাসতে দেখে সে ছুটে গেল।

খাতাটা একটা বাঁশের ডালের সঙ্গে আটকে ছিল। অর্ক সাবধানে সেটাকে তুলে এনে বারান্দায় রাখল। মলাটের রং প্রায় উঠে গিয়েছে। পাতাগুলো ভিজে একাকার। তবু প্রথম পাতায় লেখা নামটা কোনওরকমে পড়া গেল—‘মেঘলা দাস’।

নামের নিচে ছোট করে লেখা, ‘তৃতীয় শ্রেণি’।

অর্ক ভ্রু কুঁচকে ভাবল, তাদের গ্রামের স্কুলে তো মেঘলা নামে কোনও মেয়েকে সে চেনে না! তাহলে খাতাটা এল কোথা থেকে?

সে পাতাগুলো আলতো করে খুলতে লাগল। বেশির ভাগ লেখাই বৃষ্টির জলে মুছে গিয়েছে। কিন্তু শেষের দিকে একটি পাতায় পেনসিলে আঁকা ছিল একটা ছোট্ট বাড়ি, পাশে একটি গাছ, আর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষ। ছবির নিচে লেখা—‘আমাদের নতুন বাড়ি কবে হবে?’

প্রশ্নটা পড়ে অর্কর মনটা কেমন যেন হয়ে গেল।

পরদিন বৃষ্টি একটু কমতেই সে খাতাটা নিয়ে বন্ধু রাহুলের কাছে গেল। রাহুল খাতার নাম দেখে বলল, “মেঘলা দাস? এ নাম তো আমি আগে শুনিনি। হয়তো অন্য কোনও গ্রাম থেকে এসেছে।”

অর্ক বলল, “কিন্তু খাতাটা আমাদের পাড়ার নালায় এল কী করে?”

রাহুল কাঁধ ঝাঁকাল। “বৃষ্টির জল অনেক দূর থেকে জিনিস ভাসিয়ে আনে। এতে এত ভাবার কী আছে?”

কথাটা যুক্তিসংগত হলেও অর্কর মন মানল না। খাতার শেষ পাতায় আঁকা বাড়িটার ছবিটা তার মাথায় ঘুরছিল। যে মেয়েটি নিজের নতুন বাড়ির অপেক্ষায় আছে, তার খাতা এভাবে জলে ভাসছে কেন?

সেদিন বিকেলে অর্ক গ্রামের মুদি দোকানে গেল। দোকানদার হরিপদ কাকুকে খাতাটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কাকু, আমাদের গ্রামে কি নতুন কেউ এসেছে?”

হরিপদ কাকু একটু ভেবে বললেন, “হ্যাঁ রে, মাসখানেক আগে নদীর ধারের ভাঙনপাড়ার কয়েকটি পরিবার এখানে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি নদীতে চলে গিয়েছে। পঞ্চায়েতের পাশে যে অস্থায়ী আশ্রয়ঘর আছে, তারা সেখানেই থাকে।”

অর্কর বুকের মধ্যে যেন একটা আলো জ্বলে উঠল। “ওদের মধ্যে মেঘলা নামে কোনও মেয়ে আছে?”

“নামটা ঠিক মনে পড়ছে না। তবে কয়েকটা ছোট বাচ্চা আছে। তুই চাইলে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারিস।”

পরদিন সকালে অর্ক তার মা-কে সব কথা জানাল। মা প্রথমে বললেন, “অন্যের খাতা নিয়ে এত দৌড়াদৌড়ি করার দরকার কী?”

অর্ক চুপ করে রইল। তারপর খাতার ছবিটা মায়ের সামনে মেলে ধরল।

“মা, দেখো। ও নিজের নতুন বাড়ির অপেক্ষা করছে। খাতাটা যদি ওর খুব প্রিয় হয়?”

ছবিটা দেখে মায়ের মুখ নরম হয়ে এল। তিনি বললেন, “ঠিক আছে। খাতাটা নিয়ে যা। তবে একা নয়, আমি সঙ্গে যাব।”

দুপুরে মা-ছেলে পঞ্চায়েতের পাশের আশ্রয়ঘরে পৌঁছল। সেখানে কয়েকটি পরিবার অস্থায়ীভাবে থাকছিল। কেউ রান্না করছিল, কেউ ভেজা জামাকাপড় শুকোচ্ছিল। কয়েকজন শিশু উঠোনের এক পাশে বসে পড়ছিল।

অর্ক খাতাটা হাতে নিয়ে নাম ধরে ডাকল, “মেঘলা দাস কে?”

এক কোণে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটি মুখ তুলল। তার পরনে বিবর্ণ জামা, চুল দুদিকে বাঁধা। চোখে কৌতূহল আর সামান্য ভয়।

“আমি,” সে আস্তে বলল।

অর্ক এগিয়ে গিয়ে খাতাটা বাড়িয়ে দিল। “এটা কি তোমার?”

মেয়েটি খাতাটা দেখে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর দুহাতে বুকের কাছে চেপে ধরল।

“আমার খাতা! কোথায় পেলে?”

অর্ক সব ঘটনা খুলে বলল। মেঘলার চোখে জল এসে গেল।

“আমাদের পুরোনো বাড়িটা নদীতে ভেঙে পড়েছিল। সেই সময় তাড়াহুড়ো করে সব জিনিস নিয়ে বেরোতে হয়। আমার বইগুলো একটা বস্তায় ছিল। কয়েক দিন আগে বৃষ্টির জল ঢুকে বস্তাটা ভিজে গিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম খাতাটা আর খুঁজে পাব না।”

অর্ক বলল, “তোমার খাতার ছবিটা দেখেছি। তুমি নতুন বাড়ি চেয়েছ কেন?”

মেঘলা মাথা নিচু করল।

“আগে আমাদের একটা ছোট্ট বাড়ি ছিল। বাড়ির সামনে একটা আমগাছ ছিল। মা সেখানে বসে আমার পড়া শুনত। নদী বাড়িটা নিয়ে যাওয়ার পর আমরা এখানে চলে এসেছি। মা বলে, একদিন আবার ঘর হবে। কিন্তু কবে হবে জানি না।”

মেঘলার গলায় অভিমান ছিল না, ছিল শুধু অনিশ্চয়তা।

অর্কর মা মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। “নতুন বাড়ি তৈরি হতে সময় লাগতে পারে। কিন্তু তোমার পড়াশোনা তো আজ থেকেই চলতে পারে।”

মেঘলা মুখ তুলে তাকাল। “আমি কি এখানকার স্কুলে পড়তে পারব? আমার বই খুব কম। আর আমি নতুন জায়গায় কাউকে চিনি না।”

অর্ক সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমাদের স্কুলেই এসো। আমি তোমাকে বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।”

মেঘলা একটু হাসল। সেই হাসিটুকু দেখে অর্কর মনে হল, বৃষ্টির দিনেও রোদ উঠতে পারে।

পরদিন অর্ক স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে সব কথা জানাল। শিক্ষক মন দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, “মেঘলার মতো অনেক শিশুরই ঘর হারিয়েছে, কিন্তু তাদের পড়াশোনার অধিকার হারায়নি। আমরা ওকে স্কুলে ভর্তি করার ব্যবস্থা করব।”

তিনি আরও কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে আশ্রয়ঘরে গেলেন। মেঘলার মা-বাবার সঙ্গে কথা বললেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করলেন এবং আপাতত স্কুলের বই দেওয়ার আশ্বাস দিলেন।

কয়েক দিনের মধ্যেই মেঘলা স্কুলে ভর্তি হল।

প্রথম দিন ক্লাসে ঢোকার সময় সে খুব নার্ভাস ছিল। অন্য শিশুরা তাকে কেমনভাবে নেবে, তা নিয়ে তার ভয় হচ্ছিল। অর্ক তাকে নিজের পাশে বসতে বলল। রাহুলও এগিয়ে এসে বলল, “টিফিনে আমাদের সঙ্গে বসবে। আমাদের স্কুলে নতুন কেউ এলে তাকে একা বসে থাকতে হয় না।”

ধীরে ধীরে মেঘলা সবার সঙ্গে মিশে গেল। পড়াশোনায় সে ভালো ছিল, বিশেষ করে ছবি আঁকতে ভালোবাসত। একদিন শিক্ষক তাকে একটি ছবি আঁকতে বললেন—‘আমার স্বপ্নের গ্রাম’।

মেঘলা ছবিতে একটি বড় মাঠ, পাকা রাস্তা, শিশুদের জন্য একটি পাঠাগার এবং নদীর ধারে শক্ত বাঁধ আঁকল। ছবির এক কোণে ছিল একটি ছোট্ট বাড়ি। বাড়ির সামনে একটি আমগাছ, আর উঠোনে কয়েকটি শিশু বই হাতে বসে আছে।

শিক্ষক ছবিটি দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি শুধু নিজের বাড়ি আঁকোনি কেন?”

মেঘলা বলল, “আমার বাড়ি হলে ভালো লাগবে। কিন্তু নদীর ধারে যাদের বাড়ি ভেঙে যায়, তাদের সবার যেন নিরাপদ বাড়ি হয়। আর কেউ যেন বই হারিয়ে স্কুল ছাড়তে বাধ্য না হয়।”

কথাগুলো শুনে শিক্ষক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ছবিটি স্কুলের দেওয়ালে টাঙিয়ে দিলেন।

বর্ষা শেষ হতে আরও কিছুদিন লাগল। গ্রামের মানুষ মিলে আশ্রয়ঘরের শিশুদের জন্য পুরোনো বই সংগ্রহ করল। অর্ক ও তার বন্ধুরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাতা, পেনসিল ও গল্পের বই জোগাড় করল। মেঘলা সেই বইগুলো যত্ন করে সাজিয়ে রাখত। সে বলত, “আমার খাতা একদিন বৃষ্টির জলে ভেসে এসেছিল। এখন চাই, কোনও শিশুর বই যেন আর হারিয়ে না যায়।”

একদিন বিকেলে অর্ক আর মেঘলা স্কুল থেকে ফিরছিল। নদীর পাশের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে মেঘলা বলল, “জানো, আগে ভাবতাম আমাদের বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় আমার সব শেষ হয়ে গেছে।”

অর্ক জিজ্ঞাসা করল, “এখন কী মনে হয়?”

মেঘলা একটু হেসে বলল, “এখন মনে হয়, বাড়ি হারিয়েছি ঠিকই, কিন্তু নতুন বন্ধু পেয়েছি, আবার স্কুলে যেতে পারছি। আমার স্বপ্নের বাড়িটা এখনও হয়তো তৈরি হয়নি, কিন্তু স্বপ্নটা তো আছে।”

অর্ক আকাশের দিকে তাকাল। মেঘ সরে গিয়ে পশ্চিমে সূর্যের আলো দেখা দিয়েছে।

সেদিন সে বুঝেছিল, বৃষ্টির জল শুধু ভাঙন আর ক্ষতির খবর নিয়ে আসে না। কখনও কখনও সেই জল মানুষের অজানা কষ্টকে সামনে এনে দেয়, আর সেই কষ্টের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগও তৈরি করে।

একটি ভেজা খাতার পাতায় লেখা নাম দুটো শিশুর জীবনকে বদলে দিয়েছিল। অর্ক শিখেছিল, কোনও সমস্যার সমাধান সব সময় বড় কাজ দিয়ে শুরু হয় না। কখনও একটি হারিয়ে যাওয়া জিনিস ফিরিয়ে দেওয়া, কারও কথা মন দিয়ে শোনা কিংবা নতুন বন্ধুর পাশে বসার মতো ছোট্ট কাজ থেকেই বদল শুরু হয়।

আর মেঘলা বুঝেছিল, ঘর মানে শুধু চারটি দেওয়াল নয়। ঘর তৈরি হয় নিরাপত্তায়, ভালোবাসায়, পড়াশোনার সুযোগে এবং এমন মানুষদের মধ্যে—যারা বিপদের সময় কাউকে একা ফেলে রাখে না।

সেদিন থেকে গ্রামের শিশুরা আশ্রয়ঘরের ছোট্ট বইয়ের তাকটির নাম দিয়েছিল—‘মেঘলার ঘর’। সেখানে কোনও দরজা ছিল না, কোনও তালাও ছিল না। যে শিশু বই পড়তে চাইত, সে-ই সেখানে এসে বসতে পারত।

আর তাকের একেবারে ওপরের তাকে রাখা থাকত সেই পুরোনো নীল খাতাটি। তার ভেজা মলাটে লেখা নামটি যেন সবাইকে মনে করিয়ে দিত—একটি অচেনা নামও কখনও কখনও পরিচিত হৃদয়ের দরজা খুলে দিতে পারে।

শিক্ষা: মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা না করে তার পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবিকতা। হারিয়ে যাওয়া জিনিস ফিরিয়ে দেওয়ার চেয়েও বড় কাজ হল, কারও হারিয়ে যাওয়া আশা ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করা।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : যে পুরোনো রঙের বাক্সে লুকিয়ে ছিল একটি পরিবারের অসমাপ্ত স্বপ্ন।।

পুরুলিয়ার এক ছোট্ট শহরে বাস করত ষোলো বছরের মেয়ে তিতলি। তার বাবা সুব্রত দত্ত একটি ওষুধের দোকানে কাজ করতেন, আর মা বাড়িতে সেলাই করে সংসারে সাহায্য করতেন। সংসারে অভাব ছিল না বললে ভুল হবে, তবে খুব হিসাব করে চললে মাসের খরচ কোনোমতে মিটে যেত।

তিতলি পড়াশোনায় ভালো ছিল। স্কুলের পরীক্ষায় প্রায়ই ভালো ফল করত। কিন্তু তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল ছবি আঁকা। জানালার ধারে বসে সে কখনও গ্রামের পুকুর আঁকত, কখনও রেললাইনের পাশে দাঁড়ানো একাকী গাছ, কখনও আবার মানুষের মুখের অভিব্যক্তি।

তার ছবিতে এমন কিছু থাকত, যা দেখে শিক্ষকরা অবাক হয়ে যেতেন।

একদিন স্কুলের অঙ্কনশিক্ষক বলেছিলেন, “তিতলি, তোর চোখে দেখার একটা আলাদা ক্ষমতা আছে। তুই যদি নিয়মিত অনুশীলন করিস, অনেক দূর যেতে পারবি।”

কিন্তু তিতলির বাড়িতে ছবি আঁকাকে পেশা হিসেবে দেখার মতো মানসিকতা ছিল না। বাবা বলতেন, “ছবি আঁকবি, ভালো কথা। কিন্তু আগে এমন একটা পড়াশোনা কর, যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারিস।”

তিতলি প্রতিবাদ করত না। সে জানত, বাবার কথার মধ্যে অবহেলা নেই; আছে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ।

তবু তার মনে প্রশ্ন জাগত—মানুষ কি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পাশাপাশি নিজের স্বপ্নকেও বাঁচিয়ে রাখতে পারে না?

একদিন স্কুল থেকে ফিরে তিতলি মায়ের পুরোনো কাঠের আলমারি পরিষ্কার করছিল। আলমারির নিচের তাকে কাপড়ের একটি পুঁটলি পাওয়া গেল। পুঁটলিটি খুলতেই বেরিয়ে এল একটি ছোট কাঠের বাক্স।

বাক্সটির ওপর ধুলোর আস্তরণ। ঢাকনায় খোদাই করা ফুলের নকশা। তালা ছিল না, শুধু একটি পুরোনো হুক দিয়ে বন্ধ করা।

তিতলি সাবধানে বাক্সটি খুলল।

ভেতরে কয়েকটি শুকিয়ে যাওয়া রঙের কৌটো, পুরোনো তুলি, কিছু আঁকার কাগজ এবং একটি সাদা-কালো ছবি। ছবিতে এক তরুণী নদীর ধারে বসে ছবি আঁকছেন।

ছবির পেছনে লেখা—‘মালবিকা, ১৯৮৭’।

তিতলি ছবিটি নিয়ে মায়ের কাছে ছুটে গেল।

“মা, এই মালবিকা কে?”

ছবিটি দেখেই মায়ের মুখের রং বদলে গেল।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বললেন, “ও তোমার পিসি। আমার বড় ননদ।”

তিতলি অবাক হয়ে বলল, “তাহলে তুমি কখনও বলোনি কেন?”

মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“সব গল্প বলা যায় না মা। কিছু গল্প সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে যায়।”

কিন্তু তিতলি বুঝতে পারল, এই বাক্সের মধ্যে এমন কিছু লুকিয়ে আছে, যা তার পরিবারের কেউ আর উচ্চারণ করতে চায় না।

১. যে স্বপ্ন থেমে গিয়েছিল

রাতে খাওয়ার পর তিতলি আবার মায়ের পাশে বসে পড়ল।

“মা, পিসি কি ছবি আঁকতেন?”

মা মাথা নাড়লেন।

“খুব ভালো আঁকতেন। তোমার বয়সে আমিও ওঁর কাছ থেকে ছবি আঁকা শিখেছিলাম। পিসি বলতেন, রং দিয়ে শুধু দৃশ্য আঁকা যায় না, মানুষের মনের কথাও বলা যায়।”

“তাহলে উনি ছবি আঁকা ছেড়ে দিলেন কেন?”

মা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “পিসি আর্ট কলেজে পড়তে চেয়েছিলেন। কলকাতায় যাওয়ার সুযোগও পেয়েছিলেন। কিন্তু তখন ঠাকুরদার শরীর খারাপ হয়ে গেল। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর ওপর। পরিবারের সবাই ভেবেছিল, পড়াশোনার চেয়ে বাড়িতে থাকাই বেশি জরুরি।”

“তারপর?”

“পিসি সংসার সামলালেন। নিজের ইচ্ছেগুলো ধীরে ধীরে সরিয়ে রাখলেন। পরে বিয়ে হয়ে অন্য জেলায় চলে যান। অনেক দিন যোগাযোগ ছিল। তারপর একসময় খবর পাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।”

তিতলি বিস্মিত হয়ে শুনছিল।

“কেউ কি ওঁর খোঁজ করেনি?”

মা চোখ নামিয়ে বললেন, “করেছিল। কিন্তু জীবন অনেক সময় মানুষকে এমন দূরে নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।”

তিতলি বাক্সটির দিকে তাকাল।

তার মনে হলো, কাঠের এই ছোট্ট বাক্সটি শুধু পুরোনো রঙের সংগ্রহ নয়। এর মধ্যে আটকে আছে এমন একজন মানুষের স্বপ্ন, যিনি নিজের ইচ্ছের কথা বলতে বলতে একসময় চুপ করে গিয়েছিলেন।

সে মাকে জিজ্ঞেস করল, “পিসি এখন কোথায় থাকেন, জানো?”

মা মাথা নাড়লেন।

“ঠিকানা জানি না। বহু বছর আগে এক আত্মীয়ের কাছ থেকে শুনেছিলাম, তিনি বাঁকুড়ার দিকে কোথাও থাকেন। কিন্তু নিশ্চিত নই।”

তিতলি আর প্রশ্ন করল না। সে বাক্সটি নিজের ঘরে নিয়ে গেল।

সেই রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে একটি সিদ্ধান্ত নিল—মালবিকা পিসির খোঁজ সে করবে।

২. পুরোনো ছবির সূত্র

পরের দিন স্কুলে গিয়ে তিতলি তার অঙ্কনশিক্ষক অরিন্দমবাবুকে সব কথা জানাল। তিনি মন দিয়ে শুনলেন।

“তোর পিসির পুরোনো ছবিগুলো কি আছে?”

তিতলি বলল, “কয়েকটা কাগজ আছে। বেশিরভাগই বিবর্ণ হয়ে গেছে।”

অরিন্দমবাবু বললেন, “ছবিগুলোর পেছনে কোনো নাম, তারিখ বা প্রদর্শনীর পরিচয় আছে কি না, দেখিস। কখনও কখনও ছোট্ট একটি তথ্যও বড় সূত্র হয়ে উঠতে পারে।”

বাড়ি ফিরে তিতলি বাক্সের সব জিনিস একে একে বের করল। রঙের কৌটোর নিচে একটি ভাঁজ করা কাগজ পাওয়া গেল। কাগজে হাতে লেখা কয়েকটি নাম এবং একটি ঠিকানার অংশ ছিল। ঠিকানাটি অস্পষ্ট হলেও একটি সাংস্কৃতিক সংস্থার নাম বোঝা যাচ্ছিল।

তিতলি বাবাকে দেখাল।

সুব্রতবাবু কাগজটি দেখে বললেন, “এটা সম্ভবত বহু পুরোনো কোনো চিত্রপ্রদর্শনীর পরিচয়। তবে এত দিন পর ঠিকানা খুঁজে পাওয়া কঠিন।”

ঋজু নামের এক সহপাঠীর বড় দাদা স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে কাজ করতেন। তিতলি তাঁর সাহায্য চাইল। তিনি পুরোনো পত্রিকার কিছু সংখ্যা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের তালিকা ঘেঁটে দেখার পর জানালেন, প্রায় চল্লিশ বছর আগে ওই সংস্থার উদ্যোগে একটি তরুণ শিল্পীদের প্রদর্শনী হয়েছিল।

প্রদর্শনীর তালিকায় ‘মালবিকা দত্ত’ নামে একজনের ছবি ছিল।

এটি ছিল প্রথম নিশ্চিত সূত্র।

তিতলি আনন্দে মাকে খবর দিল। কিন্তু ঠিকানাটি তখনকার, বর্তমান ঠিকানা নয়। তাই শুধু ওই তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হলো না।

কয়েক দিন পর অরিন্দমবাবু তিতলিকে বললেন, “স্থানীয় শিল্পীদের পুরোনো সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখতে পারিস। তবে কারও ব্যক্তিগত তথ্য খুঁজতে গেলে সম্মান ও গোপনীয়তার কথা মাথায় রাখবি। কাউকে অস্বস্তিতে ফেলা চলবে না।”

তিতলি সেই পরামর্শ মেনে এগোল। সংগঠনের একজন প্রবীণ সদস্য পুরোনো প্রদর্শনীর কথা মনে করতে পারলেন। তিনি জানালেন, মালবিকা বিয়ের পর শিল্পচর্চা অনেকটাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন বলে পরিবারটি একসময় বাঁকুড়ার কাছে থাকত।

কিন্তু এরপর আর কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেল না।

তিতলির মন খারাপ হলো। তবু সে খোঁজ করা বন্ধ করল না।

৩. রং ফিরে পাওয়ার দিন

মালবিকার সন্ধান চলতে থাকলেও তিতলি নিজের আঁকা বন্ধ করল না। বরং সে প্রতিদিন অন্তত আধঘণ্টা ছবি আঁকার জন্য সময় রাখতে শুরু করল।

একদিন সে পুরোনো বাক্সের শুকনো রঙগুলো পরীক্ষা করছিল। বেশিরভাগ রং নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তবু বাক্সের এক কোণে কয়েকটি ছোট রঙের টুকরো পাওয়া গেল। সেগুলো ব্যবহার করার মতো অবস্থায় ছিল না, কিন্তু রঙের নাম লেখা কাগজগুলো পড়া যাচ্ছিল।

তিতলি সেই নামগুলো লিখে রাখল।

তারপর সে একটি নতুন ছবি আঁকল—একটি কাঠের বাক্স খোলা, তার ভেতর থেকে নানা রঙের আলো বেরিয়ে এসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ছবির এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি কিশোরী, আর অন্য পাশে দূরে বসে আছেন এক বৃদ্ধা শিল্পী।

ছবিটির নাম দিল—‘অসমাপ্ত রঙ’।

স্কুলের বার্ষিক প্রদর্শনীতে ছবিটি রাখা হলো। দর্শকদের অনেকেই ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। কেউ বললেন, ছবিটি যেন হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের কথা বলে। কেউ আবার জানতে চাইলেন, ছবিটির পেছনের গল্প কী।

তিতলি তার পিসির কথা বলল। তবে কাউকে দোষারোপ করল না। সে শুধু জানাল, কীভাবে একটি পুরোনো বাক্স তাকে পরিবারের এক হারিয়ে যাওয়া গল্পের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় একটি সাংস্কৃতিক পত্রিকার সম্পাদক। তিনি তিতলিকে বললেন, “তোমার ছবিতে আবেগ আছে, আবার গল্প বলার ক্ষমতাও আছে। তুমি চাইলে এই বিষয় নিয়ে একটি ছোট লেখা লিখতে পারো।”

তিতলি বাড়ি ফিরে লেখাটি তৈরি করল। সেখানে সে নিজের পিসির নাম, পুরোনো ছবির কথা এবং অসমাপ্ত স্বপ্নের অনুভূতি তুলে ধরল। তবে পিসির বর্তমান ঠিকানা না জানায় ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কোনো অনুমান করল না।

লেখাটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলো।

তিতলি জানত না, এই লেখাই তার খোঁজের পথ খুলে দেবে।

৪. একটি ফোনকল

প্রায় তিন সপ্তাহ পর এক বিকেলে তিতলির মায়ের ফোন বেজে উঠল। অপরিচিত নম্বর।

ওপাশ থেকে এক মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি মালবিকা দত্তের পরিবারের কেউ?”

মা বিস্মিত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ। আপনি কে বলছেন?”

মহিলা জানালেন, তিনি বাঁকুড়ার একটি ছোট পাঠাগারের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে স্থানীয় শিল্পীদের পুরোনো কাজ নিয়ে একটি আলোচনা সভা হয়েছিল। সেই সভায় কেউ তিতলির লেখা পড়ে মালবিকার কথা তুলেছিলেন। তাঁর এক পরিচিত প্রতিবেশী মালবিকাকে চিনতেন।

মালবিকা এখন বাঁকুড়ার কাছেই একটি ছোট শহরে থাকেন। বয়স হয়েছে, শরীরও খুব ভালো নয়। কিন্তু তিনি এখনও মাঝে মাঝে ছবি আঁকেন।

খবর শুনে তিতলির মা কেঁদে ফেললেন।

“এত বছর পর ওর খবর পেলাম!”

মহিলা জানালেন, তিনি মালবিকার অনুমতি নিয়ে যোগাযোগের ব্যবস্থা করতে পারবেন। তিতলির মা সম্মতি দিলেন। কয়েক দিন পর তাঁদের মধ্যে ফোনে কথা হলো।

প্রথমে মা কিছু বলতে পারছিলেন না। তারপর কাঁপা গলায় বললেন, “দিদি, আমি মালতী বলছি।”

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর শোনা গেল, “মালতী? তুই?”

দুজনের কণ্ঠেই কান্না মিশে গেল। কত বছর জমে থাকা স্মৃতি, অভিমান, না-বলা কথা যেন একসঙ্গে ফিরে এল।

মালবিকা জানালেন, তিনি পরিবারের কারও ওপর রাগ করে দূরে সরে যাননি। সংসারের দায়িত্ব, স্থান পরিবর্তন, অসুস্থতা এবং নানা পরিস্থিতির মধ্যে যোগাযোগ হারিয়ে গিয়েছিল। পরে যোগাযোগ করার কথা ভাবলেও কোথা থেকে শুরু করবেন বুঝতে পারেননি।

মালতী বললেন, “দিদি, তোমার রঙের বাক্সটা এখনও আমাদের কাছে আছে।”

ওপাশ থেকে মালবিকা মৃদু হেসে বললেন, “ওটা যে এখনও আছে, ভাবতেই পারিনি।”

তিতলি পাশে বসে সব শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, এত দিন ধরে যে গল্পটি অসমাপ্ত ছিল, তার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।

৫. অসমাপ্ত ছবির শেষ রেখা

কয়েক সপ্তাহ পর তিতলি ও তার মা মালবিকার বাড়িতে গেলেন। ছোট শহরের শান্ত পাড়ায় একতলা বাড়ি। উঠোনে তুলসী গাছ, জানালার পাশে কয়েকটি টব। ঘরের ভেতরে দেওয়ালে টাঙানো কিছু পুরোনো ছবি।

দরজা খুলে দাঁড়ালেন সাদা চুলের এক বৃদ্ধা। চোখে চশমা, মুখে মৃদু হাসি।

মালতী এগিয়ে গিয়ে দিদিকে জড়িয়ে ধরলেন।

অনেকক্ষণ কেউ কথা বলতে পারলেন না।

তারপর মালবিকা তিতলির দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই সেই মেয়ে, যে আমার বাক্সটা খুঁজে পেয়েছিস?”

তিতলি মাথা নাড়ল।

“তুমি কি এখনও ছবি আঁকো, পিসি?”

মালবিকা একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, “খুব বেশি নয়। হাত কাঁপে। চোখেও সমস্যা হয়েছে। তবে কখনও কখনও আঁকি।”

তিনি ঘরের ভেতর থেকে একটি কাগজ এনে দেখালেন। সেখানে একটি নদী, তার পাশে কয়েকটি গাছ, দূরে মেঘলা আকাশ। ছবিটি অসমাপ্ত।

“এটা বহু বছর আগে শুরু করেছিলাম,” তিনি বললেন। “শেষ করতে পারিনি।”

তিতলি ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল। ছবির রং বিবর্ণ, তবু তার মধ্যে গভীর সৌন্দর্য ছিল।

সে বলল, “পিসি, তুমি চাইলে আমরা একসঙ্গে এটা শেষ করতে পারি।”

মালবিকা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালেন।

“এখন আর আমার হাত আগের মতো চলে না মা।”

“তোমাকে একাই তো সব করতে হবে না। তুমি আমাকে বলবে কোথায় কোন রং লাগবে। আমি রং করব। ছবিটা তোমারই থাকবে।”

মালবিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর তাঁর চোখে জল এসে গেল।

“জানিস, আমি একসময় ভাবতাম, ছবি আঁকার স্বপ্নটা আমার জীবন থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। কিন্তু আজ বুঝছি, স্বপ্ন হারিয়ে গেলেও তার দরজা সব সময় বন্ধ হয়ে যায় না।”

পরের দিন সকালে তাঁরা ছবিটি নিয়ে বসে পড়লেন। মালবিকা তিতলিকে বুঝিয়ে দিলেন, নদীর জলে কীভাবে আলো ফুটিয়ে তুলতে হয়, দূরের গাছের রং কীভাবে হালকা রাখতে হয়, আর আকাশের মেঘে কীভাবে গভীরতা তৈরি করতে হয়।

তিতলি রং লাগাল। মালবিকা নির্দেশ দিলেন। কোথাও ভুল হলে তিতলি আবার ঠিক করল।

কাজ শেষ হতে কয়েক দিন লেগে গেল।

শেষ দিনে মালবিকা নিজের কাঁপা হাতে ছবির নিচে লিখলেন—‘মালবিকা ও তিতলি—দুই প্রজন্মের অসমাপ্ত রঙ’।

ছবিটি শেষ হওয়ার পর মালবিকা অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

তিনি বললেন, “আমার স্বপ্ন হয়তো সেই সময়ে পূর্ণ হয়নি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে স্বপ্নের কোনো মূল্য ছিল না। সেই স্বপ্নই আজ তোকে আমার কাছে নিয়ে এসেছে।”

তিতলি তাঁর হাত ধরে বলল, “তোমার গল্প না জানলে আমি হয়তো নিজের স্বপ্নের মূল্যও বুঝতাম না।”

৬. বাক্সের নতুন ঠিকানা

বাড়ি ফেরার সময় মালবিকা রঙের পুরোনো বাক্সটি তিতলির হাতে তুলে দিলেন।

তিতলি অবাক হয়ে বলল, “এটা তো তোমার স্মৃতি!”

মালবিকা হেসে বললেন, “স্মৃতি শুধু নিজের কাছে আটকে রাখলে চলে না। তবে বাক্সটা নিয়ে যাওয়ার আগে একটা কথা মনে রাখিস—এটাকে শুধু পুরোনো জিনিস হিসেবে দেখবি না। এটা যেন তোকে শেখায়, নিজের স্বপ্নের জন্য সময় বের করা জরুরি।”

তিতলি বাক্সটি গ্রহণ করল। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি দিল, বাক্সটি পরিবারের স্মৃতি হিসেবেই থাকবে, আর পিসির সঙ্গে তার সম্পর্কও নিয়মিত বজায় থাকবে।

পরের বছর তিতলির স্কুলে একটি বিশেষ চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন হলো। প্রদর্শনীর নাম—‘অসমাপ্ত স্বপ্নের নতুন রং’। সেখানে মালবিকার পুরোনো ছবি, তিতলির আঁকা ছবি এবং তাঁদের একসঙ্গে শেষ করা ছবিটির প্রতিলিপি প্রদর্শিত হলো।

প্রদর্শনীর উদ্বোধনে মালবিকা নিজে উপস্থিত হতে পারেননি, কিন্তু একটি ভিডিওবার্তায় তিনি শিশুদের বললেন, “জীবনে কখনও কখনও পরিস্থিতির জন্য নিজের ইচ্ছেকে পিছিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু নিজের ভালোবাসার কাজটিকে একেবারে ভুলে যেও না। সুযোগ পেলে আবার শুরু করো। আর মনে রেখো, জীবনের কোনো অধ্যায় অসমাপ্ত থাকলে পরের অধ্যায়ে তার নতুন অর্থ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।”

অনুষ্ঠানের শেষে তিতলি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি আগে ভাবতাম, সফল হতে হলে খুব দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে। এখন বুঝেছি, নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি অন্য মানুষের স্বপ্নের গল্প শোনাও জরুরি। কারণ, অনেক সময় অন্যের অসমাপ্ত গল্পই আমাদের নিজের পথ দেখায়।”

সেদিন বাড়ি ফিরে তিতলি কাঠের বাক্সটি নিজের পড়ার টেবিলের পাশে রাখল। তার পাশে রাখল মালবিকার সঙ্গে তোলা একটি ছবি।

বাক্সটি এখন আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের প্রতীক নয়। সেটি হয়ে উঠেছে দুই প্রজন্মের মধ্যে তৈরি হওয়া এক নতুন সম্পর্কের স্মারক।

তিতলি জানত, সামনে তার পড়াশোনা আছে, পরীক্ষা আছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক সিদ্ধান্ত আছে। সে হয়তো একদিন অন্য শহরে যাবে, হয়তো বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়বে। কিন্তু সে আর নিজের আঁকার খাতাটি লুকিয়ে রাখবে না।

কারণ সে বুঝেছে, স্বপ্নের জন্য সব সময় পৃথিবীকে বদলে দিতে হয় না। কখনও কখনও নিজের জীবনের ভেতরেই তার জন্য একটু জায়গা তৈরি করতে হয়।

আর কখনও কখনও একটি পুরোনো রঙের বাক্স খুললেই দেখা যায়—যে স্বপ্নকে আমরা মৃত বলে ভেবেছিলাম, সে আসলে নতুন হাতের অপেক্ষায় ছিল।

শিক্ষা: জীবনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে পিছিয়ে রাখতে হতে পারে, কিন্তু তাকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া উচিত নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের অভিজ্ঞতা ও অসমাপ্ত ইচ্ছা নতুন মানুষের পথ দেখাতে পারে। নিজের স্বপ্নকে সম্মান করার পাশাপাশি অন্যের স্বপ্নের প্রতিও সহানুভূতিশীল হওয়া আমাদের জীবনকে আরও অর্থবহ করে তোলে।

Share This
Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : যে ছোট্ট ঘুড়িটি শিখিয়েছিল আকাশ ছোঁয়ার আগে শিকড় চিনতে হয়।

শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল। মাঠের ধারে কাশফুল দুলছিল বাতাসে। দূরের ধানখেতে সোনালি রং ধরতে শুরু করেছে। এমন এক দুপুরে বীরভূমের ছোট্ট গ্রাম কৃষ্ণপুরে ফিরে এল সতেরো বছরের ঋজু।

ঋজু কলকাতার একটি নামী স্কুলে পড়ত। পড়াশোনায় সে ভালো, ইংরেজিতে সাবলীল, কম্পিউটার চালাতে দক্ষ। তার স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়া। গ্রামের ছোট বাড়ি, মাটির রাস্তা, পুকুরপাড়ের আড্ডা—সবকিছুই তার কাছে ক্রমশ পুরোনো ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হচ্ছিল।

ছুটিতে গ্রামে ফিরতে তার খুব একটা ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু মা অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাবার সঙ্গে তাকে কয়েক দিনের জন্য আসতে হয়েছিল।

বাড়িতে পৌঁছে ঋজু দেখল, তার দাদু নিবারণবাবু উঠোনে বসে বাঁশের সরু কাঠি কাটছেন। পাশে রঙিন কাগজ, সুতো আর আঠা রাখা।

ঋজু ব্যাগ নামিয়ে বলল, “দাদু, এখনও ঘুড়ি বানাও? এখন তো দোকানে কত সুন্দর ঘুড়ি পাওয়া যায়!”

নিবারণবাবু চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে হাসলেন।

“দোকানের ঘুড়ি কিনতে টাকা লাগে। নিজের হাতে বানাতে লাগে ধৈর্য।”

ঋজু হেসে বলল, “ধৈর্য দিয়ে কি আর সব হয়? এখনকার দিনে দক্ষতা আর সুযোগ দরকার।”

দাদু মাথা নাড়লেন।

“সেটাও ঠিক। তবে দক্ষতা আর সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে নিজের হাতে কিছু তৈরি করার আনন্দটাও জানতে হয়।”

ঋজু কথাটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিল না। সে ফোন বের করে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।

কিন্তু নিবারণবাবু তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। তিনি জানতেন, নাতির চোখে এখন পৃথিবী অনেক বড়, আর নিজের গ্রামটা খুব ছোট।

তিনি শুধু অপেক্ষা করছিলেন, কবে ছেলেটি নিজের চোখে এই ছোট্ট জায়গাটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা বড় সত্যিটা দেখতে পাবে।

১. হারিয়ে যাওয়া প্রতিযোগিতা

কৃষ্ণপুরে একসময় শরৎকালে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা হতো। গ্রামের মাঠে ছোট-বড় সবাই জড়ো হতো। কেউ নিজের হাতে ঘুড়ি বানিয়ে আনত, কেউ আবার পরিবারের পুরোনো নকশা অনুসরণ করত।

নিবারণবাবু ছিলেন সেই প্রতিযোগিতার অন্যতম আয়োজক। তিনি শুধু ঘুড়ি ওড়ানো শেখাতেন না, শিশুদের বাঁশের কাঠি মাপা, কাগজ কাটানো, সুতো বাঁধা এবং বাতাসের গতিপথ বোঝার কৌশলও শেখাতেন।

কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে প্রতিযোগিতাটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখন মোবাইল ফোনে ব্যস্ত। অনেক পরিবার কাজের জন্য বাইরে চলে গেছে। পুরোনো মাঠটির একাংশে আগাছা জন্মেছে। আর নিবারণবাবুর সঙ্গে যাঁরা একসময় আয়োজন করতেন, তাঁদের কেউ অসুস্থ, কেউ অন্যত্র চলে গেছেন।

এবারও প্রতিযোগিতা হবে না জেনে গ্রামের ছোট্ট মেয়ে পিউ একদিন নিবারণবাবুর কাছে এল।

“দাদু, এ বছরও কি ঘুড়ি ওড়ানো হবে না?”

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“লোকজন জোগাড় হলে হবে মা। একা তো আর সব করা যায় না।”

পিউ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি যদি সবাইকে ডাকি?”

নিবারণবাবু হেসে ফেললেন।

“তুই ডাকলে কি সবাই আসবে?”

“জানি না। কিন্তু চেষ্টা তো করতে পারি!”

দূর থেকে কথাগুলো শুনছিল ঋজু। সে মনে মনে ভাবল, গ্রামের মানুষ এখনও ছোটখাটো বিষয় নিয়ে কত আবেগ দেখায়!

তবু পিউয়ের চোখের উজ্জ্বলতা তার নজর এড়াল না।

পরদিন পিউ গ্রামের শিশুদের নিয়ে একটি ছোট সভা করল। কেউ ঘুড়ি বানাতে জানে না, কেউ সুতো বাঁধতে পারে না। তবু সবাই প্রতিযোগিতাটি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠল।

সমস্যা হলো, মাঠ পরিষ্কার করতে হবে, বাঁশের কাঠি ও কাগজ জোগাড় করতে হবে, প্রতিযোগিতার দিন ঠিক করতে হবে। বড়দের সাহায্যও প্রয়োজন।

পিউ এবার ঋজুর কাছে এল।

“দাদা, তুমি তো শহরে পড়ো। তুমি আমাদের একটা পোস্টার বানিয়ে দিতে পারবে? সবাইকে জানাতে হবে।”

ঋজু প্রথমে না করে দিয়েছিল।

“এসব নিয়ে আমার সময় নেই। তোমরা গ্রামের বড়দের বলো।”

পিউ মাথা নিচু করে চলে গেল।

কিন্তু সন্ধ্যায় ঋজু যখন উঠোনে বসে ফোন দেখছিল, তখন দাদুর ঘর থেকে একটি পুরোনো ঘুড়ি বের করতে দেখল। ঘুড়িটির কাগজ ছেঁড়া, কাঠিগুলো বাঁকা। তবু নিবারণবাবু অত্যন্ত যত্নে সেটি মেরামত করছিলেন।

ঋজু জিজ্ঞেস করল, “ওটা এত যত্ন করে সারাচ্ছ কেন?”

দাদু বললেন, “এই ঘুড়িটা তোর বাবা ছোটবেলায় বানিয়েছিল। প্রথম দিন ওড়েনি। দ্বিতীয় দিনও পড়ে গিয়েছিল। তৃতীয় দিন বাতাস ধরেছিল। তারপর ও নিজেই ঘুড়ি বানানো শিখে যায়।”

ঋজু একটু অবাক হলো।

“বাবা ঘুড়ি বানাত?”

“শুধু বানাত না। একবার তো এমন একটা ঘুড়ি বানিয়েছিল, যা গ্রামের সব ঘুড়ির চেয়ে উঁচুতে উঠেছিল।”

দাদু ঘুড়িটা তার হাতে দিয়ে বললেন, “তোর বাবা এখন অনেক দূরে কাজ করে। কিন্তু এই ঘুড়িটা মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যত দূরেই যাক, তার শুরুর গল্পটা কোথাও না কোথাও থেকে যায়।”

ঋজু ঘুড়িটির ছেঁড়া কাগজের দিকে তাকিয়ে রইল।

সেদিন রাতে সে পিউকে ফোন করল।

“শোনো, পোস্টারটা আমি বানিয়ে দেব। আর প্রতিযোগিতার জন্য একটা অনলাইন ঘোষণাও তৈরি করা যায়।”

পিউ আনন্দে চিৎকার করে উঠল।

২. শহরের দক্ষতা, গ্রামের স্বপ্ন

ঋজু পরের দিন থেকেই কাজে নেমে পড়ল। সে একটি সুন্দর পোস্টার তৈরি করল। তাতে প্রতিযোগিতার দিন, সময়, স্থান এবং অংশগ্রহণের নিয়ম লেখা হলো। গ্রামের শিশুদের আঁকা কয়েকটি ঘুড়ির ছবি পোস্টারে ব্যবহার করল সে।

তারপর গ্রামের তরুণদের নিয়ে একটি ছোট অনলাইন গোষ্ঠী তৈরি করল, যাতে যারা বাইরে কাজ করে তারাও খবর পায়। কেউ অর্থসাহায্যের প্রস্তাব দিল, কেউ বাঁশ ও কাগজ কিনে দেওয়ার কথা বলল, কেউ আবার প্রতিযোগিতার দিন বাড়ি ফেরার প্রতিশ্রুতি দিল।

ঋজু বুঝতে পারল, গ্রামের মানুষ শুধু গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের অনেকেই অন্য শহরে কাজ করে, পড়াশোনা করে, নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখনও রয়ে গেছে।

এই সম্পর্ককে কাজে লাগানোই ছিল আসল কাজ।

কয়েক দিনের মধ্যে মাঠ পরিষ্কার করার উদ্যোগ শুরু হলো। বড়রা আগাছা সরালেন, তরুণেরা বাঁশের খুঁটি পুঁতল, শিশুরা কাগজ ও সুতো গুছিয়ে রাখল।

নিবারণবাবু সবাইকে ঘুড়ি বানানো শেখাতে শুরু করলেন।

প্রথম দিন ঋজুও তাদের সঙ্গে বসেছিল। সে মাপজোক করে বাঁশের কাঠি কাটতে সাহায্য করল। কিন্তু ঘুড়ির দুই পাশ সমানভাবে বাঁধতে গিয়ে বারবার ভুল করছিল।

দাদু বললেন, “দেখেছিস, শুধু হিসাব জানলেই হয় না। হাতে কাজের অনুভূতিও দরকার।”

ঋজু একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “আমি তো শিখছি।”

“সেটাই তো চাই। যে মানুষ শেখা বন্ধ করে দেয়, সে নিজের অভিজ্ঞতার সীমার মধ্যেই আটকে থাকে।”

কথাটা ঋজুর মনে রয়ে গেল।

সে বুঝতে শুরু করল, দাদুর অভিজ্ঞতা পুরোনো হলেও মূল্যহীন নয়। বরং সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের নতুন দক্ষতা মিলিয়ে দিলে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়।

ঋজু ঘুড়ির নকশা আঁকত, আর নিবারণবাবু দেখিয়ে দিতেন কোথায় কাঠির ভারসাম্য ঠিক রাখতে হবে। পিউ রং বেছে দিত। গ্রামের অন্য শিশুরা কাগজে নানা নকশা আঁকত।

কিছু ঘুড়িতে নদীর ছবি, কিছুতে ধানখেত, কিছুতে গ্রামের পুরোনো মন্দিরের নকশা ফুটে উঠল।

ঋজু একটি বিশেষ ঘুড়ি তৈরি করল। সেটির মাঝখানে আঁকা হলো কৃষ্ণপুরের মানচিত্রের মতো একটি ছবি। তার চারদিকে ছোট ছোট ঘরে লেখা হলো গ্রামের শিশুদের নাম।

ঘুড়িটির নাম দিল সে—‘আমাদের আকাশ’।

৩. যে দিন বাতাস থেমে গেল

প্রতিযোগিতার আগের দিন থেকেই গ্রামের আকাশ মেঘলা হয়ে উঠল। সকালে হালকা বৃষ্টি হলো। দুপুরে বাতাস থেমে গেল। সন্ধ্যার দিকে আবহাওয়া আরও খারাপ হয়ে উঠল।

গ্রামের অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল।

একজন বললেন, “এমন আবহাওয়ায় ঘুড়ি উড়বে কী করে?”

আরেকজন বললেন, “এত আয়োজন করে শেষ পর্যন্ত যদি কিছুই না হয়!”

পিউয়ের মুখ মলিন হয়ে গেল। সে ঋজুর কাছে এসে বলল, “দাদা, সব নষ্ট হয়ে যাবে না তো?”

ঋজু আকাশের দিকে তাকাল। সত্যিই বাতাস ছিল না। তার মনে হলো, এত কষ্ট করে কাজ করার পর যদি প্রতিযোগিতা বাতিল করতে হয়, তাহলে সবাই হতাশ হবে।

নিবারণবাবু অবশ্য শান্ত ছিলেন।

তিনি বললেন, “বাতাস আমাদের হাতে নেই। কিন্তু বাতাস না থাকলে কী করা যায়, সেটা ভাবা আমাদের হাতে আছে।”

ঋজু প্রশ্ন করল, “কী করা যায়?”

দাদু বললেন, “আজ ঘুড়ি উড়বে না। তাই বলে আজকের দিনটা নষ্ট করতে হবে কেন? শিশুদের ঘুড়ি তৈরির প্রদর্শনী হতে পারে। কে কী শিখেছে, সেটা দেখাতে পারে। বাতাস এলে উড়বে, না এলে আবার অন্য দিন।”

ঋজু সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা বদলে দিল। সে পোস্টারে নতুন ঘোষণা লিখল—প্রথম দিনে ঘুড়ি তৈরির প্রদর্শনী ও নকশা প্রতিযোগিতা হবে, আর আবহাওয়া অনুকূল হলে পরের দিন ঘুড়ি ওড়ানো হবে।

গ্রামের মানুষ স্বস্তি পেলেন।

পরের সকালে মাঠে সবাই জড়ো হলো। আকাশ তখনও পুরো পরিষ্কার নয়, কিন্তু বৃষ্টি থেমেছে। শিশুদের তৈরি ঘুড়িগুলো দড়িতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। গ্রামের প্রবীণরা ঘুড়ির নকশা দেখে পুরোনো দিনের গল্প বলছিলেন।

একজন বৃদ্ধ জানালেন, তাঁর বাবা একসময় কাগজের বদলে পাতলা কাপড় দিয়ে ঘুড়ি বানাতেন। আরেকজন বললেন, ছোটবেলায় তিনি ঘুড়ির সুতো তৈরি করার জন্য বাড়িতে তুলো পাকাতে সাহায্য করতেন।

ঋজু এসব কথা শুনে বিস্মিত হলো। সে বুঝতে পারল, ঘুড়ি শুধু একটি খেলনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্মৃতি, দক্ষতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা অভিজ্ঞতা।

বিকেলের দিকে হঠাৎ বাতাস বইতে শুরু করল।

প্রথমে খুব হালকা, তারপর একটু জোরে।

পিউ দৌড়ে এসে চিৎকার করল, “দাদা! বাতাস এসেছে!”

মাঠে আনন্দের ঢেউ উঠল।

৪. আকাশে ওঠার আগে

ঘুড়ি ওড়ানোর সময় ঋজুর তৈরি ‘আমাদের আকাশ’ প্রথমে মাটি ছেড়ে উঠতেই চাইছিল না। সে দৌড়ল, সুতো ছাড়ল, আবার টান দিল। ঘুড়িটি কয়েক হাত ওপরে উঠেই ঘুরে পড়ে গেল।

পাশ থেকে কেউ বলল, “আরেকবার চেষ্টা করো!”

ঋজু ঘুড়িটি হাতে নিয়ে পরীক্ষা করল। একটি কাঠির বাঁধন সামান্য ঢিলে হয়ে গেছে। সে দাদুর সাহায্যে সেটি ঠিক করল।

দ্বিতীয়বার চেষ্টা করল। এবারও ঘুড়ি বেশি ওপরে উঠল না।

ঋজু বিরক্ত হয়ে বলল, “এত হিসাব করেও কাজ হচ্ছে না!”

নিবারণবাবু তার পাশে এসে দাঁড়ালেন।

“হিসাব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আকাশের সঙ্গে লড়াই করা যায় না। বাতাসের দিক বুঝে তার সঙ্গে চলতে হয়।”

“তাহলে?”

“আগে দেখ, বাতাস কোন দিক থেকে আসছে। তারপর সুতো ছাড়বি। ঘুড়িকে নিজের ইচ্ছেমতো টানতে যাবি না। কখনও সুতো ছাড়তে হয়, কখনও টানতে হয়।”

ঋজু কিছুক্ষণ বাতাসের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে ঘুড়ির নড়াচড়া লক্ষ্য করল। তারপর পিউকে বলল, “তুমি ঘুড়িটা ধরে রাখো। বাতাস ধরলে ছেড়ে দেবে।”

তৃতীয়বার চেষ্টা করার সময় ঘুড়িটি ধীরে ধীরে ওপরে উঠল। প্রথমে একটু দুলল, তারপর বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আকাশের দিকে এগিয়ে গেল।

ঋজু সুতো ছাড়তে লাগল। ঘুড়িটি আরও ওপরে উঠল। মাঠে দাঁড়ানো শিশুরা হাততালি দিল।

পিউ আনন্দে বলল, “দাদা, তোমার ঘুড়ি সবার ওপরে উঠেছে!”

ঋজু হাসল। কিন্তু তার চোখ ছিল ঘুড়ির দিকে। সে দেখছিল, যত ওপরে উঠছে, ততই সুতো আর ভারসাম্যের গুরুত্ব বাড়ছে।

একসময় ঘুড়িটি বেশ উঁচুতে পৌঁছল। হঠাৎ দমকা বাতাস এল। সুতো টানটান হয়ে গেল। ঋজু জোরে সুতো টানতে গিয়ে বুঝল, এতে ঘুড়িটি আরও অস্থির হয়ে উঠছে।

দাদু বললেন, “ধীরে! সব সময় শক্ত করে ধরে রাখলে চলবে না।”

ঋজু একটু সুতো ছেড়ে দিল। ঘুড়িটি আবার স্থির হলো।

সে অবাক হয়ে দাদুর দিকে তাকাল।

“তুমি ঠিক বলেছিলে। কখনও ছাড়তে হয়, কখনও ধরে রাখতে হয়।”

নিবারণবাবু হেসে বললেন, “এই কথাটা শুধু ঘুড়ির জন্য নয়, জীবনের জন্যও মনে রাখিস।”

৫. শিকড়ের কাছে ফিরে দেখা

সেদিন প্রতিযোগিতায় কোনো একক বিজয়ী ঘোষণা করা হলো না। গ্রামের মানুষ ঠিক করলেন, সবচেয়ে সুন্দর নকশা, সবচেয়ে যত্নে তৈরি ঘুড়ি এবং দলগত সহযোগিতার জন্য আলাদা সম্মান দেওয়া হবে।

ঋজুর ‘আমাদের আকাশ’ ঘুড়িটি বিশেষ প্রশংসা পেল। কিন্তু সে নিজের নামের পুরস্কার নিতে এগিয়ে যাওয়ার আগে পিউকে সঙ্গে ডাকল।

“এই ঘুড়ি শুধু আমি বানাইনি। নকশায় পিউয়ের সাহায্য আছে, দাদু আমাকে ভারসাম্য শিখিয়েছেন, আর গ্রামের সবাই মিলে মাঠ তৈরি করেছে।”

পিউ লজ্জা পেয়ে হাসল। নিবারণবাবুর চোখে আনন্দের জল চিকচিক করল।

সন্ধ্যার আগে ঘুড়িগুলো নামিয়ে আনা হলো। শিশুরা একে অপরকে সাহায্য করল। কেউ সুতো গুছিয়ে রাখল, কেউ ভাঙা কাঠি আলাদা করল। ঠিক হলো, আগামী বছর আরও বড় আয়োজন হবে।

বাড়ি ফেরার পথে ঋজু দাদুর পাশে হাঁটছিল।

সে বলল, “দাদু, আমি সব সময় ভাবতাম, বড় হতে হলে গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে যেতে হবে। এখানে থাকলে যেন পিছিয়ে পড়তে হবে।”

নিবারণবাবু ধীরে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “দূরে যাওয়া খারাপ নয়। নতুন জায়গায় গেলে নতুন কিছু শেখা যায়। কিন্তু কোথা থেকে এসেছিস, সেটা ভুলে গেলে নিজের শেখার অনেক পথ বন্ধ হয়ে যায়।”

ঋজু বলল, “আজ বুঝলাম, নতুন প্রযুক্তি দিয়ে আমরা অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু দাদু, তোমার মতো মানুষের অভিজ্ঞতাও দরকার।”

“আর আমাদেরও তোদের কাছ থেকে শেখার আছে। পুরোনো জ্ঞানকে আঁকড়ে ধরে থাকলে চলবে না, আবার নতুন বলে পুরোনো সবকিছু ফেলে দিলেও চলবে না। দুটোকে মিলিয়ে নিতে হয়।”

ঋজু চুপ করে গেল।

পরদিন কলকাতায় ফিরে যাওয়ার আগে সে দাদুর কাছ থেকে ঘুড়ি বানানোর কয়েকটি পুরোনো নকশা নিয়ে নিল। সে ঠিক করল, সেগুলো ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করবে। শুধু তাই নয়, গ্রামের শিশুদের তৈরি ঘুড়ির ছবিও সে একটি অনলাইন অ্যালবামে রাখবে, যাতে বাইরে থাকা গ্রামের মানুষও দেখতে পারে।

বিদায়ের সময় নিবারণবাবু তাকে সেই পুরোনো ঘুড়িটি দিলেন, যেটি একসময় তার বাবা বানিয়েছিলেন।

“এটা নিয়ে যা। তবে মনে রাখিস, ঘুড়ির আসল সৌন্দর্য আলমারিতে ঝুলে থাকায় নয়, আকাশে উড়তে পারায়।”

ঋজু ঘুড়িটি যত্ন করে ব্যাগে রাখল।

ট্রেনে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে তার মনে হচ্ছিল, কৃষ্ণপুর আর আগের মতো ছোট মনে হচ্ছে না। গ্রামের মাঠ, কাশফুল, দাদুর সংগৃহীত নকশা, পিউয়ের হাসি—সবকিছু যেন এক বিশাল পৃথিবীর অংশ।

সে বুঝতে পেরেছিল, শিকড় মানুষকে আটকে রাখে না। শিকড় মানুষকে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়।

আর যে নিজের দাঁড়ানোর জায়গাটা চেনে, সে আরও সাহস নিয়ে দূরের আকাশে উড়তে পারে।

কয়েক মাস পর কলেজের একটি প্রকল্পে ঋজু গ্রামীণ ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে কাজ শুরু করল। সে কৃষ্ণপুরের ঘুড়ি তৈরির পদ্ধতি নথিবদ্ধ করল, প্রবীণদের সাক্ষাৎকার নিল এবং শিশুদের তৈরি নকশাগুলো সংরক্ষণ করল। তার প্রকল্পের নাম দিল—‘আকাশের সুতো, মাটির টান’।

প্রকল্পটি প্রশংসা পেলেও ঋজুর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল অন্য কিছু। সে বুঝেছিল, নিজের গ্রামের কথা বলতে তার আর লজ্জা লাগে না। বরং সে গর্ব অনুভব করে।

পরের শরতে সে আবার কৃষ্ণপুরে ফিরল। মাঠে তখন আরও বেশি শিশু, আরও বেশি ঘুড়ি। নিবারণবাবু আগের মতোই বসে আছেন, হাতে বাঁশের সরু কাঠি।

ঋজু তাঁর পাশে বসে বলল, “দাদু, এবার আমাকে নতুন একটা নকশা শেখাবে?”

বৃদ্ধের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

“অবশ্যই। তবে আজ একটা শর্ত আছে।”

“কী শর্ত?”

“নকশাটা তুই শিখবি, তারপর অন্য কাউকে শেখাবি।”

ঋজু হেসে বলল, “কথা দিলাম।”

দুজনের মাথার ওপর দিয়ে তখন একটি নীল ঘুড়ি উড়ে যাচ্ছিল। তার সুতো ধরে ছিল ছোট্ট পিউ। ঘুড়িটি আকাশের দিকে এগিয়ে চলেছিল, আর তার সুতো মাটিতে দাঁড়ানো মানুষের হাতে রয়ে গিয়েছিল।

ঋজু তাকিয়ে বুঝল, জীবনের সুন্দরতম উড়ান সেই উড়ান নয়, যেখানে মানুষ সব বন্ধন ছিঁড়ে ফেলে। বরং সেই উড়ান, যেখানে স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্ক, স্বপ্নের সঙ্গে দায়িত্ব এবং নতুন পথের সঙ্গে পুরোনো অভিজ্ঞতার যোগ অটুট থাকে।

শিক্ষা: বড় স্বপ্ন দেখা এবং দূরে এগিয়ে যাওয়া জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু নিজের শিকড়, সংস্কৃতি ও পূর্ববর্তী প্রজন্মের অভিজ্ঞতাকে অবহেলা করলে শেখার অনেক দরজা বন্ধ হয়ে যায়। নতুন জ্ঞান ও পুরোনো অভিজ্ঞতাকে সম্মানের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারলেই প্রকৃত উন্নতি সম্ভব।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা : শেষ বিকেলের ডাকপিয়ন।

গ্রামের পথে ধীরে ধীরে
সাইকেল চালিয়ে যান,
কাঁধের ব্যাগে চিঠির বোঝা,
মুখে মিষ্টি গান।

কোনো চিঠি দূর শহরের,
কোনোটা বিদেশের,
কোনো চিঠি অপেক্ষাতে
কাঁদে আপন ঘরের।

বৃদ্ধ বাবা দরজায় বসে
ছেলের খবর চান,
মেয়ের লেখা দুটো লাইনেই
ভরে ওঠে প্রাণ।

কেউ পায় চাকরির খবর,
কেউ পায় বিয়ের নিমন্ত্রণ,
কেউ বা চিঠির অক্ষর পড়ে
পায় নতুন জীবন।

ডাকপিয়নটি জানেন কত
মানুষের সুখ-দুঃখ,
চিঠি বিলিয়ে ফিরে যান
নীরবতার মুখ।

আজ মোবাইলের পর্দায়
খবর আসে ক্ষণে,
তবু চিঠির হাতের লেখা
থাকে হৃদয়জুড়ে।

কাগজে লেখা মনের কথা
সময়ের কাছে হারায় না,
পুরনো চিঠির ভাঁজের মাঝে
স্মৃতি কখনও মলিন হয় না।

ডাকপিয়ন আজও যেন
স্মৃতির পথে হাঁটেন,
অজস্র মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে
ভালোবাসা বিলিয়ে দেন।

চিঠির মতো সহজ করে
মনের কথা বলো,
দূরত্ব যতই থাকুক মাঝে,
সম্পর্কগুলো ভালো রেখো।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা : মায়ের পুরনো শাড়ি।

আলমারির এক কোণেতে
রয়েছে শাড়িখানি,
রংটা তার ফিকে হয়েছে,
তবু বড় দামী।

সেই শাড়িতে মা যে কত
উৎসবে সাজতেন,
আমার ছোট্ট হাতটি ধরে
পথের ধুলো মাড়তেন।

শাড়ির আঁচল দিয়ে মা
মুছিয়ে দিতেন ঘাম,
ভয় পেলে সেই আঁচলেই
খুঁজতাম শান্তির নাম।

শীতের রাতে গায়ে জড়িয়ে
ঘুম পাড়াতেন গান,
নিজের সুখ ভুলে গিয়ে
রাখতেন আমার মান।

আজকে আমি বড় হয়েছি,
পেরিয়েছি কত পথ,
তবু মায়ের সেই আঁচল
মনে জাগায় শৈশব।

শাড়িখানিতে গন্ধ আছে
মায়ের স্নেহভরা,
হাজার দামি পোশাকের চেয়ে
এ যে অনেক বড়।

মা তো কখনও হিসাব করেননি
কতটা দিলেন আমায়,
নিজের সবটুকু ভালোবাসা
নীরবে বিলিয়ে যান।

যতদিন মা পাশে আছেন,
সময় দিও তাঁকে,
একটু কথা, একটু আদর
সুখ দেবে তাঁর চোখে।

পুরনো শাড়ি বলে দেবে
ভালোবাসার মানে—
সবচেয়ে দামি সম্পদ থাকে
স্মৃতির ভাঁজে ভাঁজে।

Share This
Categories
কবিতা বিবিধ

কবিতা : বৃষ্টির পরে রংধনু।

সারাদিনের মেঘের শেষে
বৃষ্টি থেমে যায়,
ভেজা পাতার ফাঁক গলিয়ে
রোদের হাসি চায়।

আকাশজুড়ে হঠাৎ দেখি
সাতটি রঙের সেতু,
নীল, সবুজ আর লাল মিলে
সৌন্দর্যের ঋতু।

মাঠের ধারে ছোট্ট শিশু
হাত বাড়িয়ে ডাকে,
রংধনুটাকে ছুঁয়ে দেখার
স্বপ্ন চোখে রাখে।

কৃষক হাসে, ফসলভরা
মাটির গন্ধ পেয়ে,
পাখিরা সব গান ধরেছে
নতুন সকাল চেয়ে।

বৃষ্টির জলে ভিজেছিল
পথের ধুলোর বুক,
রংধনু এসে মনে জাগায়
আবার বাঁচার সুখ।

জীবনেও তো ঝড় আসে
অকারণে কখনও,
চেনা পথও হারিয়ে যায়,
মন কাঁদে নীরবতায়।

তবু দুঃখ চিরকাল
থাকে না জীবনে,
অন্ধকারের পরেই আলো
ফোটে নতুন ক্ষণে।

তাই বিপদে ভেঙে পড়ো না,
আশার প্রদীপ জ্বালো,
কঠিন সময় পেরিয়ে গেলে
দেখবে চারদিক আলো।

রংধনু শুধু রঙের ছবি
নয় আকাশের গায়,
সে মনে করায়—ঝড়ের পরেও
সুন্দর দিন ফিরে পায়।

Share This