Categories
গল্প

মাটির হাঁড়িতে আঁকা স্বপ্ন।

নদীর ধারে ছোট্ট একটা গ্রাম—কুমোরডাঙা। গ্রামের নামের মতোই এই গ্রামের বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম মাটির কাজ করে আসছিল। কারও হাতে তৈরি হত হাঁড়ি, কারও হাতে কলসি, কারও হাতে প্রদীপ কিংবা মাটির পুতুল।

সেই গ্রামেরই মেয়ে ছিল মাধবী।

ছোটবেলা থেকেই মাটির সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। অন্য শিশুরা যখন পুতুল নিয়ে খেলত, মাধবী তখন মায়ের পাশে বসে ভেজা মাটি দিয়ে ছোট ছোট ঘর বানাত।

মা হাসতেন।

—“তুই বড় হয়ে কী হবি রে?”

মাধবী বলত,

—“আমি মাটির মানুষ হব।”

মা হেসে বলতেন,

—“মাটির মানুষ আবার কী?”

মাধবী উত্তর দিত,

—“যে মাটিকে সুন্দর করে।”

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাধবীর হাতের কাজও নিখুঁত হতে লাগল। কিন্তু সংসারে অভাব ছিল। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ল মায়ের ওপর।

মাধবীর পড়াশোনাও অষ্টম শ্রেণির পর বন্ধ হয়ে গেল।

একদিন মা বললেন,

—“মাধু, তুই যদি শহরে কোনো কাজ পেতিস, সংসারটা একটু চলত।”

মাধবী চুপ করে রইল।

তার চোখ তখন উঠোনের কোণে রাখা মাটির হাঁড়িগুলোর দিকে।

সেই রাতে সে সিদ্ধান্ত নিল, অন্যের বাড়িতে কাজ করতে যাওয়ার আগে নিজের মাটির কাজ দিয়েই কিছু করার চেষ্টা করবে।

পরদিন থেকেই শুরু হল নতুন লড়াই।

সে পুরনো মাটির হাঁড়িতে নতুন নকশা আঁকতে শুরু করল। কখনও ফুল, কখনও পাখি, কখনও নদীর ছবি।

কিন্তু গ্রামের বাজারে কেউ সেগুলো কিনল না।

এক দোকানদার বলল,

—“এগুলো নিয়ে কে বসে থাকবে? এখন সবাই প্লাস্টিকের জিনিস ব্যবহার করে।”

আর একজন বলল,

—“মাটির জিনিস দিয়ে সংসার চলে না।”

মাধবী বাড়ি ফিরে খুব কাঁদল।

মা তাকে বললেন,

—“কাঁদলে মাটি নরম হবে না রে। হাত দিয়ে কাজ কর।”

মায়ের কথায় মাধবী আবার উঠে দাঁড়াল।

সে নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নিল।

গ্রামের পুরনো কুমোরদের কাছ থেকে সে মাটির কাজের নানা কৌশল শিখল। তারপর নিজের মতো করে ছোট ছোট ফুলদানি, কলমদানি, টব এবং সাজানোর সামগ্রী তৈরি করতে লাগল।

কিন্তু এবারও সমস্যা হল—বিক্রি করবে কোথায়?

মাধবীর গ্রামের কাছে একটি কলেজ ছিল। সেখানে পড়ত শহরের অনেক ছেলে-মেয়ে।

একদিন সে কয়েকটি মাটির কলমদানি নিয়ে কলেজের সামনে বসে পড়ল।

প্রথম দিন কেউ তাকাল না।

দ্বিতীয় দিন একজন ছাত্রী এসে একটা কলমদানি হাতে নিল।

—“এটা কত?”

—“পঞ্চাশ টাকা।”

মেয়েটি কিনে নিল।

তারপর আরও দুজন এল।

সেদিন মাধবী পাঁচটি জিনিস বিক্রি করল।

বাড়ি ফিরে সে মাকে পঞ্চাশ টাকা এগিয়ে দিয়ে বলল,

—“দেখেছ মা? মাটি কথা বলেছে!”

মা হেসে বললেন,

—“না রে, তুই কথা বলিয়েছিস।”

সেই ছোট্ট সাফল্য মাধবীর মনে সাহস এনে দিল।

সে প্রতিদিন নতুন নতুন নকশা করতে লাগল।

কখনও মাটির পুতুলে গ্রামের বধূ, কখনও কৃষক, কখনও নদীর মাঝি। তার তৈরি জিনিসে গ্রামের জীবন ফুটে উঠতে লাগল।

একদিন এক শিক্ষক তার কাজ দেখে বললেন,

—“তুমি এগুলো অনলাইনে বিক্রি করার চেষ্টা করেছ?”

মাধবী মাথা নাড়ল।

—“অনলাইন কীভাবে করতে হয় জানি না।”

শিক্ষক বললেন,

—“শিখবে?”

—“হ্যাঁ।”

সেই দিন থেকেই শুরু হল আরেক শিক্ষা।

স্মার্টফোনে ছবি তোলা, ছবি পাঠানো, দাম লেখা, অর্ডার নেওয়া—সবকিছু ধীরে ধীরে শিখতে লাগল মাধবী।

প্রথমে খুব কম অর্ডার আসত।

কখনও একটি।

কখনও দুটো।

কখনও এক সপ্তাহেও কোনো অর্ডার আসত না।

তবুও সে থামেনি।

একদিন কলকাতা থেকে দশটি মাটির ফুলদানি তৈরির অর্ডার এল।

মাধবী আনন্দে মাকে জড়িয়ে ধরল।

—“মা, কলকাতা থেকে অর্ডার এসেছে!”

মা বললেন,

—“তাহলে মাটিও এবার শহরে যাবে।”

কিন্তু অর্ডার তৈরি করতে গিয়ে বড় সমস্যা দেখা দিল।

মাধবীর নিজের চাকা ছিল না।

সে প্রতিবেশী কুমোরদের কাছ থেকে ধার করে কাজ করত। বড় অর্ডার এলে সময়মতো কাজ শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ত।

তবু সে রাত জেগে কাজ করল।

অর্ডার ঠিক সময়ে পৌঁছে গেল।

কয়েকদিন পর খবর এল—ক্রেতারা খুব পছন্দ করেছেন।

মাধবীর কাজের ছবি আরও কয়েকজনের কাছে পৌঁছে গেল।

তারপর অর্ডার বাড়তে লাগল।

একদিন মাধবী মাকে বলল,

—“আমি একা আর পারছি না।”

মা ভয় পেয়ে গেলেন।

—“তাহলে কাজ বন্ধ করবি?”

মাধবী হেসে বলল,

—“না। গ্রামের অন্য মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করব।”

সে গ্রামের পাঁচজন মহিলাকে ডেকে বলল,

—“তোমরা আমার সঙ্গে কাজ করবে?”

তারা প্রথমে দ্বিধায় ছিল।

কারও স্বামী রাজি হবে কি না, কেউ জানত না।

মাধবী বলল,

—“আমরা বাড়ির কাজের পাশাপাশি কাজ করব। যে যতটা পারবে।”

শেষ পর্যন্ত পাঁচজনই রাজি হল।

শুরু হল নতুন দল।

কেউ মাটি প্রস্তুত করত, কেউ হাঁড়ি বানাত, কেউ নকশা আঁকত, কেউ রং করত।

মাধবী সব কাজের সমন্বয় করত।

কয়েক মাসের মধ্যে গ্রামের আরও দশজন মহিলা তাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন।

কুমোরডাঙায় নতুন পরিবর্তন শুরু হল।

যে মাটিকে সবাই অবহেলা করত, সেই মাটিই এখন বহু পরিবারের আয়ের পথ হয়ে উঠল।

একদিন জেলা শহর থেকে একটি সাংস্কৃতিক মেলা করার ডাক এল।

মাধবীরা সেখানে নিজেদের স্টল দিল।

স্টলের সামনে বড় করে লেখা—

“কুমোরডাঙার মাটি”

মেলার প্রথম দিনেই প্রচুর মানুষ তাদের কাজ দেখতে এল।

একজন বৃদ্ধ তাদের তৈরি একটি মাটির পুতুল হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

তিনি মাধবীকে বললেন,

—“এই পুতুলটা আমার ছোটবেলার গ্রামের কথা মনে করিয়ে দিল।”

মাধবী মৃদু হেসে বলল,

—“তাহলে পুতুলটা আপনারই।”

বৃদ্ধ পুতুলটি কিনে নিলেন।

সেদিন সন্ধ্যায় মাধবী হিসাব করছিল।

তার মা পাশে বসে ছিলেন।

মা বললেন,

—“তুই ছোটবেলায় বলতিস, মাটির মানুষ হবি।”

মাধবী হেসে বলল,

—“মনে আছে তোমার?”

—“সব মনে আছে।”

—“তাহলে বলো, আমি পেরেছি?”

মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“তুই শুধু মাটিকে সুন্দর করিসনি। মাটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর জীবনও সুন্দর করার চেষ্টা করেছিস।”

মাধবী কিছু বলল না।

তার চোখ ভিজে উঠল।

কয়েক বছর পর কুমোরডাঙায় একটি ছোট প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি হল। সেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা মাটির কাজ শেখে।

দেয়ালের ওপর মাধবী একটি কথা লিখে রেখেছে—

“যে মাটিকে সবাই পায়ের নিচে রাখে, সেই মাটিই একদিন কারও স্বপ্নের ভিত্তি হতে পারে।”

আজও ভোর হলে কুমোরডাঙার উঠোনে মাটি মাখার শব্দ শোনা যায়।

চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে ঘুরতে থাকে অনেক মানুষের স্বপ্ন।

আর মাধবী?

সে এখনও প্রতিদিন নতুন কিছু বানায়।

কারণ তার কাছে মাটি শুধু মাটি নয়।

মাটি মানে স্মৃতি।

মাটি মানে শিকড়।

আর মাটি মানে—অসম্ভবকে সম্ভব করার এক নীরব শক্তি।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

আলোর পথের মানুষ।

পশ্চিমবঙ্গের এক ছোট্ট গ্রাম—শিউলিবাড়ি। গ্রামটি খুব বড় নয়। চারদিকে ধানখেত, মাঝখান দিয়ে সরু মাটির রাস্তা, দূরে তালগাছের সারি। বর্ষায় সেই রাস্তা কাদায় ভরে যায়, শীতে মাঠের ওপর সাদা কুয়াশা নামে, আর গ্রীষ্মে মাটির ফাটল ধরে।

এই গ্রামেরই ছেলে অর্ক।

অর্কের বয়স তখন মাত্র উনিশ। বাবা দিনমজুর, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। তবুও অর্কের একটা অদ্ভুত স্বপ্ন ছিল—সে গ্রামের মানুষদের জন্য কিছু করবে।

কিন্তু কী করবে, সে নিজেও জানত না।

অর্ক পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল না। উচ্চমাধ্যমিকের পর আর পড়া চালিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য পরিবারের ছিল না। বাধ্য হয়ে সে বাজারের একটি ছোট ইলেকট্রিকের দোকানে কাজ নিল।

সারাদিন তার কাজ ছিল তার জোড়া লাগানো, সুইচ বদলানো, ফ্যান সারানো, বাড়িতে গিয়ে বিদ্যুতের ছোটখাটো সমস্যা ঠিক করা।

একদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছিল অর্ক। রাস্তার পাশে সে দেখল, গ্রামের কয়েকজন ছোট ছেলে-মেয়ে একটা ভাঙা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে বসে পড়াশোনা করছে।

অর্ক থমকে দাঁড়াল।

একটি মেয়ে বইয়ের ওপর মুখ ঝুঁকিয়ে পড়ছে। আলো বলতে পাশের বাড়ি থেকে আসা সামান্য হলুদ আলো।

অর্ক জিজ্ঞেস করল,

—“এখানে বসে পড়ছিস কেন?”

একটি ছেলে বলল,

—“বাড়িতে আলো নেই কাকু।”

অর্ক অবাক হয়ে বলল,

—“বাড়িতে আলো নেই?”

ছেলেটি মাথা নিচু করল।

—“বাবা বলেছে, এই মাসে বিল দিতে পারেনি। লাইন কেটে দিয়েছে।”

অর্ক আর কিছু বলতে পারল না।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে তার ঘুম এল না।

বারবার সেই শিশুদের মুখ মনে পড়ছিল।

তার মনে হল, বিদ্যুৎ নিয়ে সে কাজ করে। তার হাতেই তো আলো জ্বালানোর কিছুটা ক্ষমতা আছে।

পরের দিন দোকানে গিয়ে সে মালিককে বলল,

—“কাকু, পুরনো কিছু তার, সুইচ, এলইডি বাল্ব যদি ফেলে দেন, আমাকে দেবেন?”

মালিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

—“কী করবে?”

অর্ক বলল,

—“একটা কাজ করতে চাই।”

দোকানের মালিক হাসতে হাসতে বললেন,

—“নিয়ে যা। তবে ভাঙা জিনিস দিয়ে কী করতে পারিস দেখি!”

অর্ক সেই পুরনো তার, কয়েকটি বাল্ব, কিছু সুইচ নিয়ে বাড়ি ফিরল।

পরের কয়েকদিন সে নিজের হাতে সেগুলো পরীক্ষা করতে লাগল।

তারপর এক রবিবার সে গ্রামের পরিত্যক্ত একটি গোয়ালঘর পরিষ্কার করতে শুরু করল।

গ্রামের মানুষ অবাক হয়ে দেখল।

কেউ বলল,

—“পাগল হয়েছে ছেলেটা!”

কেউ বলল,

—“এই ঘরে পড়াশোনা হবে?”

কেউ আবার হাসল।

অর্ক কারও কথায় কান দিল না।

সে ঘরটি পরিষ্কার করল। দেওয়ালের ময়লা ঘষে তুলল। পুরনো বেঞ্চ জোগাড় করল। কয়েকটি কাঠের টুকরো দিয়ে টেবিল বানাল।

তারপর নিজের জমানো টাকা দিয়ে একটি ছোট সোলার লাইট কিনল।

সন্ধ্যায় সেই ঘরে প্রথম আলো জ্বলল।

অর্ক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তারপর গ্রামের শিশুদের ডাকল।

—“এসো। এখানে পড়বে।”

প্রথম দিন এসেছিল মাত্র চারজন।

দ্বিতীয় দিন সাতজন।

এক সপ্তাহের মধ্যে সেই সংখ্যা দাঁড়াল পনেরোতে।

অর্ক নিজে খুব বেশি পড়াশোনা করেনি। তাই সে গ্রামের উচ্চশিক্ষিত কয়েকজন যুবককে অনুরোধ করল, সপ্তাহে অন্তত একদিন যেন তারা এসে পড়ায়।

প্রথমে কেউ রাজি হচ্ছিল না।

অর্ক বলত,

—“টাকা দিতে পারব না। কিন্তু একটা শিশুর ভবিষ্যৎ বদলাতে পারব।”

এই কথাটা একদিন গ্রামের কলেজপড়ুয়া মেয়ে মেঘলার মনে দাগ কাটল।

মেঘলা বলল,

—“আমি সপ্তাহে তিনদিন আসব।”

তারপর এল সৌমেন। এল রাহুল। এল গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অমলবাবু।

গোয়ালঘরটা ধীরে ধীরে ছোট্ট পাঠশালায় পরিণত হল।

নাম দেওয়া হল—“আলোর পথ”।

অর্ক প্রতিদিন দোকানের কাজ শেষ করে সেখানে যেত।

একদিন অমলবাবু তাকে বললেন,

—“তুই জানিস, তুই আসলে কী করছিস?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

—“না।”

—“তুই আলো জ্বালাচ্ছিস। শুধু ঘরের নয়, মানুষের ভেতরের আলো।”

অর্ক হেসে ফেলল।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

কয়েক মাস পর গ্রামের রিনা নামের একটি মেয়ে অর্ককে বলল,

—“দাদা, আমি আর পড়ব না।”

অর্ক অবাক।

—“কেন?”

—“বাবা বলেছে, আমাকে এবার কাজে যেতে হবে।”

রিনার বাবা ছিলেন ভ্যানচালক। সংসারে অভাব ছিল প্রচণ্ড।

অর্ক রিনার বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেল।

তিনি বললেন,

—“দাদা, মেয়েকে পড়িয়ে কী হবে? সংসারে তো টাকা দরকার।”

অর্ক চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—“আপনি যদি চান, আমি রিনার পড়ার খরচের কিছুটা ব্যবস্থা করব। কিন্তু ওকে পড়তে দিন।”

লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।

—“তুমি কেন করবে?”

অর্ক বলল,

—“কারণ একদিন আমাকেও কেউ যদি সুযোগ দিত, হয়তো আজ আমি আরও দূর যেতে পারতাম। রিনার সুযোগটা যেন নষ্ট না হয়।”

রিনা আবার পড়াশোনা শুরু করল।

বছর ঘুরল।

পরীক্ষার ফল বেরোল।

রিনা গ্রামের মধ্যে প্রথম হল।

অর্কের হাতে ফলের কাগজ তুলে দিয়ে রিনা বলল,

—“দাদা, তুমি না থাকলে আমি আজ এখানে থাকতাম না।”

অর্কের চোখে জল এসে গেল।

সে শুধু বলল,

—“এবার তুই অন্য কাউকে আলো দেখাবি।”

এরপর থেকে “আলোর পথ” শুধু পড়াশোনার জায়গা রইল না।

সেখানে শিশুদের ছবি আঁকা শেখানো হত। পুরনো বই সংগ্রহ করে ছোট লাইব্রেরি তৈরি হল। গ্রামের মেয়েদের জন্য সন্ধ্যায় সেলাই শেখানোর ব্যবস্থা হল।

একদিন সেই গ্রামেরই কয়েকজন মানুষ অর্কের কাছে এসে বললেন,

—“আমরাও কিছু করতে চাই।”

অর্ক হাসল।

সে বুঝতে পারল, পরিবর্তন কখনও একজন মানুষের হাতে সম্পূর্ণ হয় না। একজন শুরু করে, তারপর অন্যরা পাশে এসে দাঁড়ায়।

পাঁচ বছর পর শিউলিবাড়ির চেহারা বদলে গেল।

যে শিশুরা একসময় রাস্তার ধারে অন্ধকারে পড়ত, তাদের অনেকেই কলেজে ভর্তি হয়েছে।

রিনা নার্সিং পড়ছে।

সৌরভ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।

ছোট্ট পলাশ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

আর অর্ক?

সে এখনও সেই ইলেকট্রিকের দোকানে কাজ করে।

তবে এখন গ্রামের মানুষ তাকে শুধু দোকানের কর্মচারী হিসেবে দেখে না।

এক সন্ধ্যায় অর্ক “আলোর পথ”-এর সামনে বসেছিল। চারদিকে শিশুদের পড়ার শব্দ। মাথার ওপর সোলার বাতির আলো।

অমলবাবু পাশে এসে বসে বললেন,

—“তুই নিজের জীবনটা বদলাতে পারলি না, এই নিয়ে কখনও আফসোস হয়?”

অর্ক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর হাসল।

—“আমার জীবন বদলেছে কি না জানি না। কিন্তু এই গ্রামের কয়েকটা শিশুর জীবন যদি বদলে থাকে, তাহলে আমার জীবনটাও বৃথা যায়নি।”

অমলবাবু তার কাঁধে হাত রাখলেন।

সেদিন রাতের আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছিল।

আর শিউলিবাড়ির ছোট্ট পাঠশালার আলো অনেক দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল।

সেই আলো হয়তো খুব বড় ছিল না।

কিন্তু অন্ধকারের কাছে আলো কখনও ছোট হয় না।

কারণ একজন মানুষ যখন অন্যের পথ আলোকিত করার চেষ্টা করে, তখন তার নিজের পথও ধীরে ধীরে আলোর দিকে এগিয়ে যায়।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

মাটির ঘ্রাণে যে স্বপ্ন।।

পশ্চিম মেদিনীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রাম—নাম কুসুমডাঙা। গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল কয়েকটি কুমোরের বাড়ি। বর্ষায় কাদা, শীতে ধুলো আর গ্রীষ্মে ফেটে যাওয়া মাটির রাস্তা—এই ছিল তাদের জীবন।

সেই গ্রামেরই ছেলে নীলয়। বয়স মাত্র চৌদ্দ।

তার বাবা হরিপদ কুমোর। সারাদিন মাটির সঙ্গে লড়াই করে সংসার চালাতেন। ভোরে ঘুম থেকে উঠে পুকুরপাড়ের মাটি সংগ্রহ করা, তা ছেঁকে নেওয়া, মেখে রাখা, তারপর চাক ঘুরিয়ে একের পর এক হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ, ফুলদানি তৈরি করা—এই ছিল তাঁর প্রতিদিনের কাজ।

নীলয় ছোট থেকেই বাবার কাজ দেখত।

কিন্তু তার একটা প্রশ্ন ছিল।

একদিন সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

—“বাবা, এত সুন্দর জিনিস বানাও, কিন্তু আমাদের বাড়িতে এত অভাব কেন?”

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“কারণ আমরা মাটি দিয়ে জিনিস বানাতে জানি, কিন্তু সেই জিনিসের মূল্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে জানি না।”

নীলয় কথাটা পুরোপুরি বুঝতে পারল না।

তবে কথাটা তার মনে গেঁথে গেল।

পুরোনো চাক

হরিপদের কুমোরের চাকটি ছিল বহু বছরের পুরোনো।

চাক ঘোরাতে পা দিয়ে বারবার চাপ দিতে হত। একটু অসাবধান হলেই চাকের গতি কমে যেত।

একদিন নীলয় বাবাকে বলল,

—“বাবা, চাকটা কি একটু অন্যভাবে বানানো যায় না?”

বাবা হেসে বললেন,

—“আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য নতুন চাক কোথায়?”

নীলয় বলল,

—“নতুন কিনতে হবে না। পুরোনোটাকেই বদলানো যায় কি না দেখি।”

হরিপদ ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

—“তুই পড়াশোনা কর। এসব নিয়ে মাথা ঘামাস না।”

কিন্তু নীলয় মাথা ঘামানো বন্ধ করল না।

স্কুলের বিজ্ঞান বই খুলে সে বিভিন্ন ধরনের চাকা, গতি ও যন্ত্রের ছবি দেখতে লাগল।

তারপর গ্রামের পুরোনো সাইকেলের দোকান থেকে কয়েকটি অকেজো যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করল।

তার বন্ধু সুমনও তাকে সাহায্য করতে শুরু করল।

দু’জনে মিলে একটা ছোট মডেল বানাল।

প্রথম দিনেই সেটা ভেঙে গেল।

দ্বিতীয় দিনেও।

তৃতীয় দিনেও।

সুমন বিরক্ত হয়ে বলল,

—“আর করিস না। হবে না।”

নীলয় বলল,

—“একদিনে না হলে দশ দিনে হবে।”

—“আর দশ দিনেও না হলে?”

নীলয় মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,

—“তাহলে একশো দিন চেষ্টা করব।”

বাবার অসুস্থতা

এর মধ্যেই হরিপদ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

কয়েকদিন চাক ঘোরাতে না পারায় কাজ বন্ধ হয়ে গেল।

সংসারে টান পড়ল।

নীলয়ের মা বললেন,

—“তুই যদি বাবার সঙ্গে একটু কাজ করিস, কিছু টাকা আসত।”

নীলয় স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাজ শুরু করল।

কিন্তু চাক ঘোরাতে ঘোরাতে তার পা ব্যথা হয়ে যেত।

একদিন সন্ধ্যায় সে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল।

বাবা বললেন,

—“বুঝলি তো, এই কাজটা কত কঠিন?”

নীলয় মাথা নাড়ল।

—“হ্যাঁ বাবা।”

—“তাই বলি, তুই অন্য কিছু কর। পড়াশোনা করে বড় হ।”

নীলয় বাবার হাত ধরে বলল,

—“আমি বড় হবই। কিন্তু তোমার কাজটাকেও বড় করব।”

হরিপদ কিছু বললেন না।

শুধু ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।

পরিবর্তনের শুরু

কয়েক সপ্তাহ পর নীলয় তার তৈরি মডেলটি আবার বানাল।

এবার সে সাইকেলের পুরোনো বেয়ারিং ব্যবহার করল। চাকের ঘর্ষণ কমানোর চেষ্টা করল।

মডেলটি ঘোরাতেই চাক আগের তুলনায় অনেক সহজে ঘুরতে লাগল।

নীলয় দৌড়ে বাবাকে ডাকল।

—“বাবা! এসো!”

হরিপদ এসে দেখলেন।

নীলয় বলল,

—“এটা দিয়ে পা দিয়ে কম চাপ দিলেই চাক ঘুরবে।”

হরিপদ নিজে বসে চেষ্টা করলেন।

চাক ঘুরল।

তিনি অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন।

—“তুই এটা কীভাবে করলি?”

নীলয় হেসে বলল,

—“বই দেখে।”

হরিপদের চোখে জল এসে গেল।

তিনি বললেন,

—“আমি তোকে পড়তে বলেছিলাম। তুই সত্যিই পড়েছিস।”

শুধু চাক নয়

কিন্তু নীলয়ের স্বপ্ন শুধু চাক বদলানোতে থামল না।

সে বুঝতে পারল, গ্রামের কুমোরদের আসল সমস্যা অন্য জায়গায়।

তাঁরা সুন্দর জিনিস তৈরি করেন, কিন্তু বিক্রি করতে পারেন না।

মাটির প্রদীপ, ফুলদানি, পুতুল, টব—সবকিছুই পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হয়।

নীলয় স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষককে বলল,

—“স্যার, মোবাইলে ছবি তুলে কি এই জিনিসগুলো বিক্রি করা যায়?”

শিক্ষক বললেন,

—“অবশ্যই যায়। তবে ভালো ছবি, সঠিক দাম আর মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা দরকার।”

সেদিন থেকে নীলয় গ্রামের কুমোরদের তৈরি জিনিসের ছবি তুলতে শুরু করল।

প্রতিটি জিনিসের নাম লিখল।

দাম লিখল।

কীভাবে তৈরি হয়, সেটাও লিখল।

তারপর পরিচিতদের মাধ্যমে শহরের মানুষের কাছে ছবিগুলো পাঠাতে লাগল।

প্রথমে অর্ডার এল মাত্র পাঁচটি প্রদীপের।

নীলয় খুশিতে বাবাকে বলল,

—“বাবা, পাঁচটা প্রদীপ শহরে যাবে!”

হরিপদ বললেন,

—“পাঁচটা দিয়ে কী হবে?”

নীলয় হেসে বলল,

—“শুরু তো হল।”

প্রথম বড় অর্ডার

কয়েক মাস পর পুজোর সময় শহরের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গ্রামের মাটির প্রদীপ ও পুতুলের ছবি দেখে যোগাযোগ করল।

তারা একসঙ্গে পাঁচশো প্রদীপ এবং একশো মাটির পুতুলের অর্ডার দিল।

গ্রামে যেন উৎসব শুরু হয়ে গেল।

যে বাড়িগুলোতে অনেকদিন চাক ঘোরেনি, সেখানে আবার মাটি মাখা শুরু হল।

বৃদ্ধ কুমোরেরা কাজে ফিরলেন।

মহিলারা প্রদীপে রং করতে শুরু করলেন।

ছোটরা মাটি শুকোতে সাহায্য করল।

নীলয় সব কাজ ভাগ করে দিল।

কেউ মাটি তৈরি করবে।

কেউ জিনিস বানাবে।

কেউ শুকোবে।

কেউ রং করবে।

কেউ প্যাক করবে।

কয়েকদিনের মধ্যে পাঁচশো প্রদীপ তৈরি হয়ে গেল।

অর্ডার পাঠানো হল শহরে।

টাকা এল সরাসরি গ্রামের মানুষের হাতে।

হরিপদ সেই টাকা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর ছেলেকে বললেন,

—“তুই শুধু আমার চাকটা বদলাসনি। তুই আমাদের কাজটার সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছিস।”

নতুন সকাল

এরপর কুসুমডাঙার কুমোরপাড়া ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।

গ্রামের মানুষ বুঝতে পারল, মাটির কাজ শুধু পুরোনো পেশা নয়।

এটা শিল্প।

এটা ঐতিহ্য।

এটা জীবিকা।

আর সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে এই শিল্প দিয়েও ভবিষ্যৎ তৈরি করা যায়।

নীলয় বড় হয়ে কী হবে, সে তখনও জানত না।

কেউ বলত ইঞ্জিনিয়ার হবে।

কেউ বলত ব্যবসায়ী হবে।

কেউ বলত শিল্পী হবে।

কিন্তু নীলয় শুধু বলত,

—“আমি এমন কিছু করতে চাই, যাতে আমাদের গ্রামের মানুষ নিজেদের কাজ নিয়ে গর্ব করতে পারে।”

বছর কয়েক পরে গ্রামের সেই পুরোনো কুমোরপাড়ায় একটি ছোট প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি হল।

দরজার সামনে কাঠের ফলকে লেখা হল—

“মাটির স্বপ্ন”

হরিপদ প্রতিদিন সেখানে বসে নতুন ছেলেমেয়েদের মাটির কাজ শেখাতেন।

আর দেওয়ালে টাঙানো ছিল তাঁর ছেলের বানানো সেই প্রথম ছোট মডেল চাকটি।

একদিন এক শিশু সেটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—“কাকু, এটা কী?”

হরিপদ মৃদু হেসে বললেন,

—“এটা একটা চাক নয় রে। এটা একটা স্বপ্নের শুরু।”

শিশুটি বুঝতে পারল না।

হরিপদ মাটির একটা দলা হাতে নিয়ে বললেন,

—“মাটি যেমন মানুষের হাতে আকার পায়, তেমনই স্বপ্নও চেষ্টা করলে আকার পায়।”

বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।

কুমোরপাড়ার প্রতিটি ঘরে আলো জ্বলছে।

চাক ঘুরছে।

মাটি ঘুরছে।

মানুষের হাত চলছে।

আর সেই মাটির গন্ধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে এক নতুন ভবিষ্যতের গন্ধ।

কারণ কখনও কখনও বড় পরিবর্তন বড় শহর থেকে আসে না—একটি ছোট গ্রামের মাটির ঘর থেকেও শুরু হতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

আমগাছের নিচে রাখা স্বপ্ন।।

গ্রামের নাম মাধবপুর। চারদিকে সবুজ ধানখেত, মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া সরু মাটির রাস্তা, আর গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল একটি আমগাছ—যেন বহু বছরের পুরোনো কোনো পাহারাদার।

গাছটির নিচে একটি ভাঙা পাথরের বেঞ্চ ছিল।

গ্রামের মানুষ বলত, গাছটি নাকি একশো বছরেরও বেশি পুরোনো।

কেউ জানত না কে গাছটি লাগিয়েছিল।

তবে গ্রামের সবাই জানত, সেই গাছের নিচে বসলে মনটা কেমন শান্ত হয়ে যায়।

সেই গ্রামেই থাকত মেঘলা।

বয়স সতেরো।

মেঘলার বাবা ছিলেন কৃষক। মা সেলাই করে সংসারে সাহায্য করতেন।

মেঘলা পড়াশোনায় ভালো ছিল। বিশেষ করে গণিত আর বিজ্ঞান তার খুব প্রিয়।

কিন্তু একটা সমস্যা ছিল।

মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে পাশের শহরে যেতে হবে।

আর শহরে যাওয়ার মতো টাকা পরিবারের ছিল না।

একদিন সন্ধ্যায় মেঘলা আমগাছের নিচে বসে ছিল।

তার হাতে একটি খাতা।

খাতার প্রথম পাতায় বড় করে লেখা—

“আমি কী হতে চাই?”

তার নিচে সে লিখেছিল—

“আমি এমন কিছু করতে চাই, যাতে আমাদের গ্রামের মানুষকে নিজেদের সমস্যার জন্য শহরের দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়।”

কিন্তু কী করবে, সেটা সে জানত না।


একটি অদ্ভুত সমস্যা

মাধবপুরের মানুষ বর্ষাকালে একটা বড় সমস্যায় পড়ত।

গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট নদীটি বর্ষায় ফুলে উঠত। গ্রামের সঙ্গে শহরের যোগাযোগের একমাত্র রাস্তার একটি অংশ জলমগ্ন হয়ে যেত।

তখন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে যেতে সমস্যা হত।

কৃষকদের বাজারে যেতে সমস্যা হত।

অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ত।

প্রতিবছর একই সমস্যা।

প্রতিবছর মানুষ বলত,

—“এবার একটা ব্যবস্থা করা দরকার।”

কিন্তু বর্ষা শেষ হলে সবাই ভুলে যেত।

মেঘলা ভুলত না।

একদিন সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

—“বাবা, এখানে একটা উঁচু রাস্তা বানানো যায় না?”

বাবা হাসলেন।

—“রাস্তা বানানো কি এত সহজ?”

—“সরকারকে বললে?”

—“বলেছি। অনেকবার বলেছি।”

—“কিছু হয়নি?”

বাবা মাথা নাড়লেন।

—“কাজের কথা শুনেছি, কাজ দেখিনি।”

মেঘলা চুপ করে গেল।

সেই রাতেই সে একটা খাতা খুলল।

খাতার নাম দিল—

“মাধবপুর রাস্তা পরিকল্পনা।”


মানচিত্র আঁকা

পরদিন থেকে মেঘলা গ্রামের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখতে শুরু করল।

কোথায় কতটা জল জমে?

কোন জায়গায় রাস্তা নিচু?

কোন অংশ দিয়ে মানুষ বেশি যাতায়াত করে?

কোন জায়গায় মাটি শক্ত?

সবকিছু সে খাতায় লিখতে লাগল।

বন্ধু রিয়া জিজ্ঞেস করল,

—“তুই এসব কী করছিস?”

মেঘলা বলল,

—“আমাদের গ্রামের রাস্তার একটা মানচিত্র বানাচ্ছি।”

রিয়া হেসে বলল,

—“তুই কি ইঞ্জিনিয়ার?”

মেঘলা হাসল।

—“এখনও না।”

—“তাহলে?”

—“শিখছি।”

রিয়া এবার আর হাসল না।

সে বলল,

—“আমিও সাহায্য করব।”

দু’জনে মিলে কাজ শুরু করল।

কয়েকদিন পর তাদের সঙ্গে আরও তিনজন যোগ দিল।

তারা গ্রামের প্রবীণ মানুষদের সঙ্গে কথা বলল।

কেউ বলল, আগে কোথায় নদী বইত।

কেউ বলল, কোন জায়গায় বর্ষায় সবচেয়ে বেশি জল ওঠে।

কেউ পুরোনো রাস্তার কথা বলল।

মেঘলা সব লিখে রাখল।


সেই দিনের বৃষ্টি

একদিন বিকেলে হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হল।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রামের নিচু অংশে জল ঢুকে গেল।

মেঘলা ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

রিয়া বলল,

—“এখন যাবি?”

—“আজই তো দেখতে হবে।”

দু’জনে বৃষ্টির মধ্যে রাস্তার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ছবি তুলল।

মেঘলা লক্ষ্য করল, রাস্তার একটি অংশে জল খুব দ্রুত জমছে।

কিন্তু তার একটু দূরেই মাটির উচ্চতা বেশি।

সে বুঝতে পারল, রাস্তার নকশা বদলালে হয়তো জল জমার সমস্যা অনেকটা কমানো সম্ভব।

পরদিন সে স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষকের কাছে গেল।

শিক্ষক সব শুনে বললেন,

—“তোমার পর্যবেক্ষণ ভালো। কিন্তু বাস্তব কাজ করতে হলে প্রকৌশলগত সমীক্ষা দরকার।”

মেঘলা বলল,

—“স্যার, আমরা কি অন্তত একটা প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করতে পারি?”

শিক্ষক বললেন,

—“পারো।”

সেই দিন থেকেই স্কুলের একটি ঘরে মেঘলার কাজ শুরু হল।


গ্রামের মানুষের সামনে

এক মাস পর মেঘলা একটি বড় কাগজে গ্রামের রাস্তার মানচিত্র আঁকল।

কোথায় জল জমে, কোথায় রাস্তা উঁচু করতে হবে, কোথায় কালভার্ট দরকার—সব চিহ্ন দিয়ে দেখাল।

তারপর গ্রামের মানুষকে ডেকে বলল,

—“আমরা যদি সমস্যাটা ঠিকভাবে দেখাতে পারি, তাহলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে পরিকল্পনাটা নিয়ে যাওয়া সহজ হবে।”

একজন বৃদ্ধ বললেন,

—“তুই তো মেয়ে মানুষ। এত কিছু করছিস কেন?”

মেঘলা শান্তভাবে বলল,

—“কারণ এই রাস্তা দিয়ে আমিও স্কুলে যাই।”

বৃদ্ধটি আর কিছু বললেন না।

কিছুক্ষণ পর বললেন,

—“ঠিক আছে। তুই যা করছিস, কর।”

সেদিন প্রথমবার মেঘলা বুঝল—মানুষকে বোঝাতে সবসময় বড় বড় কথা লাগে না।

নিজের জীবনের সঙ্গে সমস্যাটাকে যুক্ত করে দেখাতে পারলেই অনেক সময় মানুষ শুনতে শুরু করে।


শহরে যাওয়ার সুযোগ

মেঘলার স্কুলের শিক্ষক তার তৈরি পরিকল্পনার কথা একটি বিজ্ঞান মেলার আয়োজকদের জানান।

মেঘলাকে জেলার বিজ্ঞান মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হল।

কিন্তু সেখানে যেতে টাকা লাগবে।

মেঘলা বাড়িতে এসে বলল,

—“বাবা, আমি বিজ্ঞান মেলায় যেতে চাই।”

বাবা চুপ করে রইলেন।

মেঘলা বুঝতে পারল, টাকা নেই।

পরদিন সকালে সে আমগাছের নিচে এসে বসে পড়ল।

খাতাটা খুলে দেখল।

প্রথম পাতায় এখনও লেখা—

“আমি কী হতে চাই?”

তার চোখে জল এসে গেল।

সে ভাবল, হয়তো স্বপ্ন দেখাটাই তার ভুল হয়েছে।

ঠিক তখনই গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক সেখানে এসে দাঁড়ালেন।

তিনি বললেন,

—“এখানে বসে কাঁদছ কেন?”

মেঘলা সব বলল।

শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন,

—“তুমি একা নও।”

পরদিন স্কুলের শিক্ষকরা, গ্রামের কয়েকজন মানুষ এবং মেঘলার সহপাঠীরা মিলে তার যাতায়াতের খরচ জোগাড় করে দিল।

মেঘলা অবাক হয়ে বলল,

—“এত মানুষ আমাকে সাহায্য করল?”

শিক্ষক বললেন,

—“তুমি গ্রামের জন্য কাজ করেছ। এবার গ্রাম তোমার পাশে দাঁড়াল।”


বিজ্ঞান মেলার দিন

জেলার বিজ্ঞান মেলায় অনেক বড় বড় প্রকল্প ছিল।

কেউ সৌরশক্তি নিয়ে কাজ করেছে।

কেউ জল সংরক্ষণ নিয়ে।

কেউ কৃষি নিয়ে।

মেঘলার প্রকল্প ছিল—

“বর্ষায় গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের প্রাথমিক পরিকল্পনা।”

তার প্রকল্প দেখে বিচারকদের একজন জিজ্ঞেস করলেন,

—“তুমি এই সমস্যাটা কেন বেছে নিয়েছ?”

মেঘলা বলল,

—“কারণ বইয়ে পড়া সমস্যা আর নিজের জীবনে দেখা সমস্যার মধ্যে পার্থক্য আছে। নিজের গ্রামের সমস্যা সমাধান করতে পারলে তবেই আমার পড়াশোনার অর্থ আছে।”

ঘরটি কিছুক্ষণ নীরব হয়ে রইল।

তারপর বিচারকরা আরও প্রশ্ন করলেন।

মেঘলা যতটা জানে, ততটাই বলল।

যা জানে না, সেখানেও সোজাসুজি বলল,

—“এটা আমার জানা নেই। তবে আমি শিখতে চাই।”


ফিরে আসা

বিজ্ঞান মেলা শেষ হল।

মেঘলা কোনও বড় পুরস্কার পেল না।

কিন্তু সে পেল আরও বড় কিছু।

তার প্রকল্পটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার নজরে এল।

শিক্ষকদের সহায়তায় তার তৈরি তথ্য ও মানচিত্র স্থানীয় প্রশাসনের কাছে পৌঁছল।

পরের বর্ষার আগে গ্রামের রাস্তার একটি অংশের সংস্কার শুরু হল।

জল বের করার জন্য একটি নতুন কালভার্ট তৈরি হল।

রাস্তার নিচু অংশ উঁচু করা হল।

সব সমস্যা একবারে শেষ হয়নি।

কিন্তু বহু বছরের সমস্যার সমাধানের কাজ শুরু হল।

গ্রামের মানুষ বুঝল—

সমস্যা নিয়ে শুধু অভিযোগ করলেই হয় না, সমস্যাটাকে বুঝতেও হয়।


অনেক বছর পরে

সময়ের সঙ্গে মেঘলা বড় হল।

সে প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করল।

তারপর গ্রামে ফিরে এসে গ্রামীণ পরিকাঠামো নিয়ে কাজ শুরু করল।

মাধবপুরে তখন পাকা রাস্তা হয়েছে।

বর্ষায় আর আগের মতো গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না।

একদিন মেঘলা আবার সেই পুরোনো আমগাছের নিচে এসে বসল।

গাছটি এখনও আছে।

পাথরের বেঞ্চটিও আছে।

শুধু মেঘলা আর সেই কিশোরী নেই।

তার পাশে এসে বসেছে গ্রামের কয়েকজন স্কুলছাত্রী।

একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করল,

—“দিদি, তুমি ছোটবেলায় এখানে বসে কী করতে?”

মেঘলা হেসে বলল,

—“স্বপ্ন লিখতাম।”

—“কী স্বপ্ন?”

মেঘলা তার পুরোনো খাতাটি বের করল।

প্রথম পাতায় এখনও সেই লেখা—

“আমি কী হতে চাই?”

মেয়েটি বলল,

—“তারপর?”

মেঘলা কলম হাতে নিয়ে প্রথম পাতার নিচে নতুন করে লিখল—

“আমি কী করতে পারি?”

তারপর বলল,

—“শুধু কী হতে চাও সেটা ভাববে না। ভাববে, তুমি মানুষের জন্য কী করতে পারো।”

দূরে তখন বিকেলের সূর্য ডুবে যাচ্ছে।

আমগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়েছে মাটির ওপর।

মেঘলা খাতাটা বন্ধ করল।

আর মনে মনে বলল—

একটা স্বপ্নের মূল্য তখনই, যখন সেটি শুধু নিজের জীবন বদলায় না—অন্যের জীবনেও একটু আলো পৌঁছে দেয়।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

চায়ের দোকানের শেষ বেঞ্চ।

ভোরের কুয়াশায় তখনও গ্রামের রাস্তা পুরোপুরি দেখা যায়নি। দূরের বাঁশবাগান থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছিল। বাজারের দিকে যাওয়া মাটির রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান থেকে ধোঁয়া উঠছিল।

দোকানটির নাম কেউ জানত না।

সবাই বলত—“হরেনের চায়ের দোকান।”

দোকানের মালিক হরেনবাবুর বয়স প্রায় ষাট। মাথার চুল সাদা হয়ে এসেছে। সারাদিন চা বানানো, বিস্কুট বিক্রি আর গ্রামের মানুষের সঙ্গে গল্প করাই তাঁর কাজ।

দোকানের সামনে তিনটি বেঞ্চ ছিল।

প্রথম বেঞ্চে বসতেন গ্রামের বয়স্ক মানুষরা।

দ্বিতীয় বেঞ্চে বসতেন বাজারের ব্যবসায়ীরা।

আর তৃতীয় বেঞ্চটি—দোকানের একেবারে শেষ প্রান্তে—সাধারণত খালি থাকত।

সেই বেঞ্চেই প্রতিদিন এসে বসত তন্ময়।

তন্ময়ের বয়স আঠারো।

সে পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়েছিল তার ওপর।

সকালে বাজারে মাল তুলত, দুপুরে দোকানে কাজ করত, আর সন্ধ্যায় হরেনবাবুর দোকানে এসে বসত।

তার একটা অভ্যাস ছিল।

প্রতিদিন একটি পুরোনো খাতা নিয়ে আসত।

সে খাতায় লিখত।

কী লিখত, কেউ জানত না।


“তুই কী লিখিস?”

একদিন হরেনবাবু আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন,

—“তুই রোজ খাতায় কী লিখিস?”

তন্ময় হেসে বলল,

—“কিছু না।”

—“কিছু না হলে রোজ লিখিস কেন?”

তন্ময় একটু চুপ করে বলল,

—“মানুষের কথা লিখি।”

—“মানুষের কথা?”

—“হ্যাঁ। কে কী বলল, কী নিয়ে কষ্টে আছে, কে কী করতে চায়—এসব।”

হরেনবাবু হেসে বললেন,

—“তুই লেখক হবি নাকি?”

তন্ময় বলল,

—“জানি না।”

সেদিনের পর হরেনবাবু আর কিছু জিজ্ঞেস করেননি।

কিন্তু তিনি খেয়াল করতে শুরু করলেন—তন্ময় সত্যিই গ্রামের মানুষের কথা মন দিয়ে শুনত।


একজন বৃদ্ধের সমস্যা

একদিন সকালে দোকানে এলেন গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক নরেন মণ্ডল।

তিনি চা হাতে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন।

তন্ময় জিজ্ঞেস করল,

—“কী হয়েছে কাকু?”

নরেন বললেন,

—“ধান বিক্রি করতে গিয়ে ঠিক দাম পেলাম না।”

তন্ময় জিজ্ঞেস করল,

—“কোথায় বিক্রি করেছিলেন?”

—“মাঝিরহাটে।”

—“আর সরাসরি বাজারে নিয়ে যাননি?”

নরেন হেসে বললেন,

—“আমরা কি বাজারের নিয়ম জানি?”

তন্ময় কিছু বলল না।

খাতায় লিখে রাখল—

“কৃষকরা ফসলের ন্যায্য দাম সম্পর্কে তথ্য পান না।”


একজন মেয়ের কথা

পরদিন দোকানে এল পাশের বাড়ির মেয়ে মৌসুমি।

সে কলেজে পড়ে।

চা খেতে খেতে বলল,

—“দাদা, আমাদের কলেজের কয়েকজন মেয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে চাইছে।”

তন্ময় অবাক হল।

—“কেন?”

—“বাড়িতে টাকা নেই।”

তন্ময় আবার খাতায় লিখল—

“অর্থের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”

পরের দিন একজন যুবক এল।

সে বলল, কাজের জন্য শহরে যেতে চায়, কিন্তু কোথায় আবেদন করতে হবে জানে না।

আরেকজন বলল, সরকারি কোনো প্রকল্পের সুবিধা পেতে কী করতে হবে জানে না।

কেউ বলল, হাসপাতালে কোন কাগজ লাগবে জানে না।

তন্ময় সব লিখে রাখল।


একটি নতুন চিন্তা

একদিন সন্ধ্যায় হরেনবাবু বললেন,

—“তুই এত কথা লিখিস। এগুলো দিয়ে কী করবি?”

তন্ময় বলল,

—“জানি না। কিন্তু মনে হয় এই কথাগুলো হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়।”

হরেনবাবু বললেন,

—“তাহলে একটা কাজ কর।”

—“কী?”

—“যা লিখিস, সেটা গ্রামের মানুষকে পড়ে শোনা।”

তন্ময় অবাক হয়ে তাকাল।

—“কোথায়?”

হরেনবাবু দোকানের শেষ বেঞ্চটির দিকে দেখিয়ে বললেন,

—“এখানেই।”

পরের রবিবার সন্ধ্যায় দোকানের সামনে পাঁচজন মানুষ জড়ো হল।

তন্ময় খাতা খুলে বলল,

—“আজ আমি কারও বিরুদ্ধে কিছু বলব না। শুধু আমাদের গ্রামের সমস্যাগুলোর কথা বলব।”

সে একে একে কৃষক, ছাত্রছাত্রী, বেকার যুবক, বৃদ্ধদের সমস্যার কথা পড়ে শোনাল।

প্রথম দিন মানুষ হাসল।

দ্বিতীয় দিন আরও কয়েকজন এল।

তৃতীয় সপ্তাহে দোকানের সামনে বেঞ্চে বসার জায়গা রইল না।


চায়ের দোকা থেকে বৈঠক

হরেনবাবুর ছোট্ট দোকানটি ধীরে ধীরে গ্রামের আলোচনার জায়গা হয়ে উঠল।

কেউ এসে বলত,

—“আমার জমির কাগজ নিয়ে সমস্যা।”

কেউ বলত,

—“ছেলের চাকরির জন্য কোথায় আবেদন করব?”

কেউ বলত,

—“মেয়ের পড়াশোনার জন্য কোনো সাহায্য পাওয়া যায়?”

তন্ময় সব কথা লিখে রাখত।

তারপর যেটা সত্যিই যাচাই করার দরকার, সেটা স্কুলের শিক্ষক, পঞ্চায়েতের কর্মী বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে জেনে নিত।

সে বুঝেছিল—

শুধু সমস্যার কথা জানলেই হয় না, সঠিক তথ্যও দরকার।

একদিন সে দোকানের সামনে একটি ছোট বোর্ড লাগাল।

বোর্ডে লেখা—

“জানুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।”

নিচে সে বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা, শিক্ষার সুযোগ, কৃষি সংক্রান্ত তথ্য এবং জরুরি ফোন নম্বর লিখে দিতে শুরু করল।


হরেনবাবুর গোপন কথা

একদিন রাতে দোকান বন্ধ করার সময় হরেনবাবু তন্ময়কে বললেন,

—“তুই জানিস, আমি এই দোকান কেন করেছিলাম?”

তন্ময় মাথা নাড়ল।

হরেনবাবু বললেন,

—“আমার ছেলে শহরে চলে গিয়েছিল। অনেক বছর আগে। ও আর ফিরে আসেনি।”

তন্ময় চুপ করে রইল।

হরেনবাবু বললেন,

—“তখন এই দোকান খুলেছিলাম। ভাবতাম, মানুষের সঙ্গে কথা বললে নিজের একাকীত্বটা কমবে।”

তন্ময় ধীরে বলল,

—“আপনি একা নন কাকু।”

হরেনবাবু হেসে বললেন,

—“এখন বুঝি।”


সবচেয়ে কঠিন দিন

এক বর্ষায় গ্রামের একটি পরিবার বিপদে পড়ল।

বাড়ির কর্তা অসুস্থ। কাজ করতে পারছেন না। সংসারে খাবারও প্রায় নেই।

তন্ময় দোকানে বসে বিষয়টি জানতে পারল।

সে তৎক্ষণাৎ গ্রামের কয়েকজনকে নিয়ে তাদের বাড়িতে গেল।

তারপর স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তার আবেদন করার ব্যবস্থা করল।

কয়েকদিনের মধ্যে পরিবারটি সরকারি সহায়তা পেল।

তন্ময় ফিরে এসে আবার তার খাতায় লিখল—

“কখনও কখনও সাহায্য মানে নিজের পকেট থেকে টাকা দেওয়া নয়। সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়াও সাহায্য।”

হরেনবাবু লেখাটা পড়ে বললেন,

—“এই কথাটা বড় করে লিখে দোকানে টাঙিয়ে দে।”


শেষ বেঞ্চটি আর খালি থাকল না

সময়ের সঙ্গে তন্ময়ের খাতা বদলাতে লাগল।

প্রথম খাতা শেষ হল।

দ্বিতীয় খাতা এল।

তারপর তৃতীয়।

গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখন নিজেরাও সেখানে এসে তথ্য লিখত।

কেউ চাকরির খবর সংগ্রহ করত।

কেউ কৃষির খবর।

কেউ পড়াশোনার সুযোগ।

কেউ স্বাস্থ্য সচেতনতার তথ্য।

চায়ের দোকানের সেই শেষ বেঞ্চটি এখন আর খালি থাকত না।

সেখানে বসে গ্রামের মানুষ কথা বলত।

তর্ক করত।

শুনত।

শিখত।

আর সবচেয়ে বড় কথা—নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরাই খুঁজতে শিখছিল।


বহু বছর পরে

দশ বছর কেটে গেল।

তন্ময় শহরে একটি ছোট সংবাদপত্রে কাজ শুরু করল।

তারপর নিজের একটি স্থানীয় সংবাদপত্র তৈরি করল।

পত্রিকার নাম দিল—

“শেষ বেঞ্চ”

কারণ তার বিশ্বাস ছিল,

যে মানুষের কথা সবাই শেষে শোনে, সেই মানুষের কথাই আগে শোনা দরকার।

একদিন সে বহু বছর পর মাধবপুরে ফিরে এল।

হরেনবাবুর দোকান তখনও আছে।

তবে হরেনবাবু আর দোকানে বসেন না।

বয়স তাঁকে অনেকটা দুর্বল করে দিয়েছে।

তন্ময় দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

—“কাকু, আমাকে চিনতে পারছেন?”

হরেনবাবু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললেন।

—“শেষ বেঞ্চের ছেলেকে কি ভুলতে পারি?”

তন্ময়ের চোখ ভিজে গেল।

সে দোকানের পুরোনো বেঞ্চটায় বসে পড়ল।

হরেনবাবু বললেন,

—“তোর খাতা আছে?”

তন্ময় ব্যাগ থেকে একটি নতুন খাতা বের করল।

হরেনবাবু বললেন,

—“কী লিখবি?”

তন্ময় জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

—“আজ লিখব—একটা ছোট চায়ের দোকান কীভাবে একটা গ্রামের মানুষের কথা বলার জায়গা হয়ে উঠেছিল।”

হরেনবাবু মৃদু হেসে বললেন,

—“না রে। লিখবি—মানুষ যখন একে অন্যের কথা শুনতে শেখে, তখন একটা ছোট বেঞ্চও বড় হয়ে যায়।”

তন্ময় কলম হাতে নিল।

আর বহু বছর পর সেই শেষ বেঞ্চে বসে আবার লিখতে শুরু করল।

বাইরে সন্ধ্যার আলো নেমে আসছিল।

চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছিল।

আর গ্রামের মানুষজন আগের মতোই কথা বলছিল।

শুধু পার্থক্য একটাই—

এবার তাদের কথাগুলো হারিয়ে যাচ্ছিল না।

কেউ না কেউ সেগুলো শুনছিল।

কেউ না কেউ সেগুলো লিখে রাখছিল।

আর সেই লেখাগুলো থেকেই তৈরি হচ্ছিল নতুন দিনের পথ।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

লাল সিগন্যালের মানুষ।

মাধবপুর থেকে একটু দূরে ছিল একটি ছোট রেলস্টেশন। স্টেশনের নাম শিউলিডাঙা। সেখানে দিনে মাত্র কয়েকটি লোকাল ট্রেন থামত। স্টেশনটি এতটাই ছোট যে অনেক সময় ট্রেনের কামরার অর্ধেক যাত্রীও জানত না, তারা কোন স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে।

স্টেশনের পাশেই ছিল একটি রেলগেট।

সেই গেটের দায়িত্বে ছিলেন নিতাইবাবু।

বয়স প্রায় পঞ্চান্ন।

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে গেট বন্ধ করা, ট্রেন চলে গেলে আবার খুলে দেওয়া, সিগন্যাল দেখা—এই ছিল তাঁর কাজ।

কাজটা বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হলেও নিতাইবাবু জানতেন, তাঁর সামান্য ভুলের মূল্য অনেক বড় হতে পারে।

তাই তিনি কখনও কাজে অবহেলা করতেন না।

গ্রামের লোকেরা তাঁকে বলত,

—“নিতাইকাকু, আপনি তো একই কাজ রোজ করেন। বিরক্ত লাগে না?”

তিনি হাসতেন।

—“রোজ সূর্য ওঠে বলে কি সূর্যকে বিরক্ত মনে হয়?”

লোকেরা হেসে চলে যেত।

কিন্তু নিতাইবাবু কথাটা সত্যিই বিশ্বাস করতেন।


ছোট্ট মেয়েটি

রেলগেটের কাছেই থাকত দশ বছরের মেয়ে পিউ।

পিউয়ের বাবা ভ্যান চালাতেন।

মা বাড়িতে সেলাই করতেন।

পিউ প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে নিতাইবাবুর সঙ্গে কথা বলত।

—“কাকু, আজ কয়টা ট্রেন যাবে?”

—“তুই গুনবি?”

—“হ্যাঁ।”

নিতাইবাবু মজা করে বলতেন,

—“তাহলে আজ চারটে।”

পিউ খাতায় লিখে রাখত।

একদিন সে জিজ্ঞেস করল,

—“কাকু, আপনি কি ট্রেন চালাতে পারেন?”

নিতাইবাবু হেসে বললেন,

—“না।”

—“তাহলে ট্রেন থামাতে পারেন?”

—“সেটাও সবসময় না।”

—“তাহলে আপনার কাজ কী?”

নিতাইবাবু একটু ভেবে বললেন,

—“আমার কাজ হল, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।”

পিউ কথাটা মনে রাখল।


সেই ঝড়ের রাত

বর্ষার এক রাতে প্রচণ্ড ঝড় হল।

বৃষ্টি এত জোরে পড়ছিল যে সামনে দশ হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছিল না।

নিতাইবাবু ডিউটিতে ছিলেন।

রাত প্রায় সাড়ে দশটা।

দূরে ট্রেনের হর্ন শোনা গেল।

নিতাইবাবু গেট বন্ধ করলেন।

কিন্তু হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল—রেললাইনের পাশে কিছু একটা পড়ে আছে।

ঝড়ে একটা বড় গাছের ডাল ভেঙে লাইনের ওপর এসে পড়েছিল।

নিতাইবাবু সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেলেন।

তিনি বুঝলেন, কয়েক মিনিটের মধ্যে ট্রেন চলে আসবে।

তিনি লাল আলো নিয়ে লাইনের দিকে দৌড়লেন।

তারপর রেল কর্তৃপক্ষকে জরুরি সংকেত পাঠালেন।

কয়েক মিনিটের মধ্যে ট্রেন থামানো হল।

বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেল।

পরদিন গ্রামের মানুষজন জানতে পারল কী হয়েছে।

পিউ দৌড়ে এসে বলল,

—“কাকু, আপনি ট্রেন থামিয়ে দিয়েছেন!”

নিতাইবাবু মাথা নাড়লেন।

—“আমি একা না। অনেক মানুষ মিলে ট্রেন থামিয়েছে।”

পিউ বলল,

—“কিন্তু আপনি না দেখলে?”

নিতাইবাবু বললেন,

—“তাই তো নিজের কাজটা মন দিয়ে করতে হয়।”


একটি বদলে যাওয়া মানুষ

ঘটনার পর পিউ নিতাইবাবুর কাজকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করল।

আগে সে ভাবত, রেলগেট খোলা-বন্ধ করা খুব সাধারণ কাজ।

এখন সে বুঝল, ছোট কাজ বলে কোনো কাজ ছোট নয়।

পিউ স্কুলে গিয়ে শিক্ষককে বলল,

—“স্যার, নিতাইকাকু খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন।”

শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন,

—“কেন?”

পিউ পুরো ঘটনা বলল।

শিক্ষক বললেন,

—“ঠিক বলেছ। দায়িত্বের গুরুত্ব কাজের আকারে নয়, তার প্রভাবের মধ্যে।”

সেদিন শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের একটি কাজ দিলেন।

প্রত্যেকে এমন একজন মানুষের কথা লিখবে, যিনি প্রতিদিন নীরবে সমাজের জন্য কাজ করেন।

পিউ লিখল—

“নিতাই কাকু—রেলগেটের মানুষ।”


অপমানের দিন

কয়েক মাস পর একদিন একজন বাইকচালক রেলগেট বন্ধ থাকা অবস্থায় জোর করে গেটের পাশ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।

নিতাইবাবু তাকে থামালেন।

লোকটি রেগে গিয়ে বলল,

—“আপনারা এত দেরি করেন কেন?”

নিতাইবাবু শান্তভাবে বললেন,

—“ট্রেন চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।”

লোকটি গালাগাল করতে শুরু করল।

চারপাশের মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছিল।

নিতাইবাবু কোনো উত্তর দিলেন না।

ট্রেন চলে যাওয়ার পর গেট খুললেন।

লোকটি চলে গেল।

পিউ তখন স্কুল থেকে ফিরছিল।

সে সব দেখেছিল।

সে জিজ্ঞেস করল,

—“কাকু, আপনি কিছু বললেন না কেন?”

নিতাইবাবু বললেন,

—“সব কথার উত্তর দিতে হয় না।”

—“আপনার খারাপ লাগেনি?”

—“লেগেছে।”

—“তাহলে?”

নিতাইবাবু মৃদু হেসে বললেন,

—“আমার কাজটা যদি ঠিক থাকে, তাহলে একটা মানুষের রাগ আমার কাজকে ভুল করে দিতে পারে না।”


পিউয়ের পরীক্ষা

বছর কয়েক কেটে গেল।

পিউ বড় হল।

সে পড়াশোনায় ভালো করতে লাগল।

একদিন সে নিতাইবাবুকে বলল,

—“কাকু, আমি রেলওয়েতে চাকরি করতে চাই।”

নিতাইবাবু হেসে বললেন,

—“কেন?”

—“আপনার মতো মানুষের সঙ্গে কাজ করতে চাই।”

নিতাইবাবু বললেন,

—“আমার মতো হওয়ার দরকার নেই। নিজের মতো ভালো মানুষ হও।”

পিউ বলল,

—“কিন্তু আপনি আমাকে শিখিয়েছেন—দায়িত্ব মানে কী।”

নিতাইবাবু আর কিছু বললেন না।

শুধু বললেন,

—“তাহলে পড়াশোনা কর।”


একটি চিঠি

বহু বছর পর নিতাইবাবু অবসর নিলেন।

শেষ দিন তিনি রেলগেটের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

যে গেট তিনি হাজার হাজার বার খুলেছেন ও বন্ধ করেছেন, আজ সেটি অন্য একজনের দায়িত্বে চলে যাবে।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিনি একটি চিঠি পেলেন।

চিঠিটি পিউয়ের।

সে তখন রেলওয়েতে চাকরি পেয়েছে।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“কাকু, আপনি একদিন বলেছিলেন, ছোট কাজ বলে কোনো কাজ নেই। আমি সেই কথাটা ভুলিনি। আজ আমি রেলওয়েতে যোগ দিয়েছি। আমার প্রথম পোস্টিং অন্য জায়গায়। কিন্তু আমার কাজের প্রথম শিক্ষা আপনার কাছ থেকেই।”

নিতাইবাবু চিঠিটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।

তার চোখে জল এসে গেল।


শেষবারের মতো রেলগেট

অবসরের কয়েকদিন পর নিতাইবাবু একদিন পুরোনো রেলগেটের কাছে গেলেন।

নতুন কর্মী তাঁকে দেখে বললেন,

—“কাকু, আপনি আসবেন ভাবিনি।”

নিতাইবাবু হাসলেন।

—“দেখতে এলাম।”

ঠিক তখনই ট্রেনের হর্ন শোনা গেল।

নতুন কর্মী গেট নামিয়ে দিলেন।

নিতাইবাবু দাঁড়িয়ে দেখলেন।

ট্রেন চলে গেল।

গেট আবার উঠে গেল।

তিনি মৃদু হেসে বললেন,

—“ঠিক সময়ে।”

তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

পেছনে রেললাইন।

সামনে নতুন রাস্তা।

জীবনের মতোই।


শেষ কথা

নিতাইবাবুর গল্প কোনো বড় পুরস্কারের গল্প নয়।

কোনো সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় তাঁর ছবি ছাপা হয়নি।

কোনো বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বক্তৃতা দেননি।

তিনি শুধু নিজের কাজটা ঠিকভাবে করেছেন।

প্রতিদিন।

বছরের পর বছর।

কারণ তিনি জানতেন—

একজন মানুষের সতর্কতা কখনও কখনও বহু মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে।

আর একটি শিশুর চোখে একজন সাধারণ কর্মীও হয়ে উঠতে পারেন জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক।

শিউলিডাঙার সেই রেলগেট আজও আছে।

ট্রেন আসে।

ট্রেন চলে যায়।

গেট বন্ধ হয়।

আবার খুলে যায়।

কিন্তু পিউয়ের মনে নিতাইবাবুর সেই কথাটি আজও রয়ে গেছে—

“কাজ ছোট নয়। ছোট হয় শুধু আমাদের তাকে দেখার চোখ।”

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

পুকুরের জলে দেখা আকাশ।

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। গ্রামের চারপাশে হালকা কুয়াশা। পাখির ডাকের সঙ্গে দূরে কোথাও মোরগের ডাক শোনা যাচ্ছে।

মাধবপুর গ্রামের মাঝখানে ছিল একটি বড় পুকুর।

পুকুরটির নাম রায়পুকুর।

একসময় এই পুকুরে সারাবছর জল থাকত। গ্রামের মানুষ স্নান করত, মাছ ধরত, গরু জল খেত। বর্ষার জল জমিয়ে রাখার কারণে গরমকালেও পুকুরটি শুকিয়ে যেত না।

কিন্তু বছর কয়েক ধরে পুকুরটি ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে আসছিল।

পাড়ের মাটি ধসে পড়ছিল।

জলজ আগাছায় পুকুরের একটা বড় অংশ ঢেকে গিয়েছিল।

অনেকে বলত,

—“আর দু-এক বছর পর পুকুরটা থাকবে না।”

কেউ গুরুত্ব দিত না।

শুধু অয়ন প্রতিদিন পুকুরটার দিকে তাকিয়ে থাকত।

বয়স ষোলো।

বাবা ছিলেন মাছধরার কাজের সঙ্গে যুক্ত। ছোটবেলা থেকেই অয়নের পুকুরের সঙ্গে একটা আলাদা সম্পর্ক ছিল।

তার মা বলতেন,

—“তুই ছোটবেলায় হাঁটতেও পারতিস না। তোর বাবা তোকে কোলে করে এই পুকুরের ধারে বসাত।”

অয়ন তাই পুকুরটাকে শুধু জলাশয় হিসেবে দেখত না।

তার কাছে রায়পুকুর ছিল গ্রামের স্মৃতি।


একদিন মাছ কমে গেল

এক সকালে অয়নের বাবা জাল নিয়ে পুকুরে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন,

—“আজ মাছ খুব কম।”

অয়ন জিজ্ঞেস করল,

—“কেন?”

বাবা বললেন,

—“জল কমেছে। আগাছাও বেড়েছে।”

অয়ন পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইল।

সে লক্ষ্য করল, পুকুরের একপাশে প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট আর নানা আবর্জনা জমে আছে।

সে বাবাকে বলল,

—“আমরা কি এগুলো পরিষ্কার করতে পারি না?”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—“একজন মানুষ করলে কতটুকুই বা হবে?”

অয়ন বলল,

—“একজন দিয়ে শুরু করলে?”

বাবা কোনো উত্তর দিলেন না।


প্রথম দিন

পরদিন অয়ন হাতে একটা বস্তা নিয়ে পুকুরের ধারে গেল।

সে প্লাস্টিক কুড়োতে শুরু করল।

প্রথমে কেউ তাকে গুরুত্ব দিল না।

একজন পথচারী বলল,

—“এই কাজ করে কী হবে?”

অয়ন হাসল।

—“দেখি।”

দুই ঘণ্টায় সে তিন বস্তা প্লাস্টিক তুলল।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তার মা বললেন,

—“আজ কী করলি?”

অয়ন বলল,

—“পুকুর পরিষ্কার করেছি।”

মা হাসলেন।

—“একদিনে পুকুর পরিষ্কার হবে?”

অয়ন বলল,

—“একদিনে না। প্রতিদিন একটু করে।”


বন্ধুরা যোগ দিল

পরদিন অয়নের বন্ধু রাকিব এল।

—“কাল তোকে দেখেছি।”

—“তাহলে?”

—“আমিও আসব।”

তারপর এল মিতুল।

তারপর পিউ।

তারপর আরও কয়েকজন।

এক সপ্তাহের মধ্যে দশ-বারোজন ছেলে-মেয়ে প্রতিদিন বিকেলে পুকুরের পাড় পরিষ্কার করতে শুরু করল।

গ্রামের কয়েকজন বড় মানুষও এবার এগিয়ে এলেন।

কেউ বাঁশ দিল।

কেউ দড়ি দিল।

কেউ বস্তা দিল।

কেউ বলল,

—“আমরাও রবিবার আসব।”

অয়ন বুঝল—

মানুষকে শুধু কথা দিয়ে নয়, কাজ দেখিয়েও সঙ্গে নেওয়া যায়।


শুধু পরিষ্কার করলেই হবে না

পুকুর পরিষ্কার হওয়ার পর অয়ন বুঝল, আসল সমস্যা আরও বড়।

বর্ষায় গ্রামের নোংরা জল সরাসরি পুকুরে এসে পড়ে।

পাড়ের মাটি বৃষ্টিতে ধুয়ে পুকুরে চলে আসে।

ফলে পুকুর ক্রমশ ভরাট হচ্ছে।

অয়ন স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষকের কাছে গেল।

শিক্ষক বললেন,

—“তাহলে শুধু আবর্জনা পরিষ্কার করলে হবে না। জল ঢোকার পথটাও ঠিক করতে হবে।”

অয়ন বলল,

—“কীভাবে?”

শিক্ষক একটা খাতা বের করে বললেন,

—“চলো, আগে পুরো এলাকার একটা মানচিত্র বানাই।”


মানচিত্রের কাজ

অয়ন ও তার বন্ধুরা গ্রামের চারপাশ ঘুরে দেখল।

কোথা দিয়ে বৃষ্টির জল আসে?

কোথায় জমে?

কোথা দিয়ে পুকুরে ঢোকে?

কোথায় আবর্জনা পড়ে?

সবকিছু চিহ্নিত করা হল।

তারপর তারা একটি ছোট পরিকল্পনা তৈরি করল।

পুকুরের পাড়ে গাছ লাগানো হবে।

জল ঢোকার আগে মাটি ও আবর্জনা আটকে রাখার ব্যবস্থা করা হবে।

প্লাস্টিক ফেলার জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করা হবে।

পাড়ে অপ্রয়োজনীয় মাটি ফেলা বন্ধ করা হবে।

গ্রামের মানুষকে বোঝানো হবে—পুকুরে আবর্জনা ফেলা যাবে না।

পরিকল্পনাটি নিয়ে তারা পঞ্চায়েত ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে গেল।


প্রথম বাধা

সবাই একমত হল না।

একজন বললেন,

—“ছেলেপেলেরা এসব কী বোঝে?”

অয়ন চুপ করে রইল।

তার বিজ্ঞান শিক্ষক বললেন,

—“ওরা সব জানে না। কিন্তু সমস্যা দেখে প্রশ্ন করতে শিখেছে। এখন বড়দের কাজ ওদের সঠিকভাবে সাহায্য করা।”

কথাটা কাজে লাগল।

কয়েকজন প্রবীণ মানুষও এগিয়ে এলেন।

তারা বললেন,

—“এই পুকুর আমাদের বাবাদের সময়েও ছিল। এটাকে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।”


বর্ষার পরীক্ষা

বর্ষা এল।

প্রথম কয়েকদিন ভালোই বৃষ্টি হল।

এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হল।

অয়ন চিন্তায় ছিল।

সে ভোরে পুকুরের কাছে ছুটে গেল।

দেখল, পুকুরের জল অনেক বেড়েছে।

কিন্তু জল সরাসরি আবর্জনা নিয়ে পুকুরে ঢুকছে না।

আগে তৈরি করা ছোট জলছাঁকনি অংশে মাটি ও প্লাস্টিক আটকে গেছে।

অয়ন আনন্দে চিৎকার করে উঠল,

—“কাজ হয়েছে!”

তার বন্ধু রাকিব বলল,

—“সত্যি!”

অয়ন পুকুরের জলে তাকাল।

মেঘলা আকাশের প্রতিচ্ছবি জলের ওপর পড়েছে।

সে মনে মনে বলল,

“পুকুরটাকে বাঁচানো মানে শুধু জল বাঁচানো নয়। গ্রামের একটা ভবিষ্যৎ বাঁচানো।”


বছর ঘুরে গেল

পরের এক বছরে রায়পুকুরের চেহারা বদলে গেল।

পাড়ে গাছ লাগানো হল।

নিয়মিত পরিষ্কার করা হল।

পুকুরে আবর্জনা ফেলার প্রবণতা কমল।

জল ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ল।

মাছও বাড়তে শুরু করল।

অয়নের বাবা একদিন জাল তুলে এনে বললেন,

—“আজ অনেক মাছ।”

অয়ন হেসে বলল,

—“পুকুরটা বাঁচছে বলেই।”

বাবা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তুই ছোটবেলায় এখানে বসে আকাশ দেখতিস। এখন বুঝলাম, তুই শুধু আকাশ দেখিসনি। আকাশটাকে ধরে রাখার জায়গাটাকেও দেখেছিস।”


একটি নতুন স্বপ্ন

রায়পুকুরের কাজ শেষ হওয়ার পর অয়ন থামল না।

সে গ্রামের আরও দুটি ছোট পুকুরের কাজ শুরু করল।

তারপর স্কুলে একটি পরিবেশ ক্লাব তৈরি হল।

নাম দেওয়া হল—

“আমাদের জল, আমাদের দায়িত্ব”

প্রতি মাসে ছাত্রছাত্রীরা গ্রামের জলাশয়গুলোর অবস্থা পরীক্ষা করত।

কোথায় জল কমছে?

কোথায় আবর্জনা জমছে?

কোথায় গাছ লাগানো দরকার?

সবকিছু নথিভুক্ত করা হত।

একদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক অয়নকে বললেন,

—“তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?”

অয়ন একটু ভেবে বলল,

—“জানি না। কিন্তু যেখানে থাকব, সেখানকার জল আর মাটির ক্ষতি হতে দেব না।”

শিক্ষক বললেন,

—“এই চিন্তাটাই তোমাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।”


শেষ দৃশ্য

অনেক বছর পরে অয়ন শহরে পড়াশোনা শেষ করে আবার নিজের গ্রামে ফিরে এল।

রায়পুকুর তখন আরও সুন্দর।

পাড়ে বড় বড় গাছ।

জলে মাছের খেলা।

সকালে মানুষ হাঁটতে আসে।

ছোটরা পাড়ে বসে বই পড়ে।

এক বিকেলে অয়ন সেই পুরোনো জায়গায় এসে দাঁড়াল।

পুকুরের জলে আকাশের প্রতিচ্ছবি পড়েছে।

তার ছোটবেলার বন্ধু রাকিব পাশে এসে বলল,

—“মনে আছে? এখান থেকেই শুরু করেছিলি।”

অয়ন হেসে বলল,

—“আমি একা শুরু করিনি।”

—“তাহলে?”

অয়ন পুকুরের দিকে তাকিয়ে বলল,

—“একটা প্রশ্ন শুরু করেছিল। তারপর অনেক মানুষ উত্তর খুঁজতে নেমেছিল।”

দু’জনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে নেমে যাচ্ছে।

পুকুরের জলে সেই আলো কাঁপছে।

অয়ন মনে মনে ভাবল—

জলকে আমরা শুধু ব্যবহার করি না। জল আমাদের ভবিষ্যৎ তৈরি করে।

আর সেই দিন থেকে গ্রামের শিশুরা রায়পুকুরের পাড়ে একটি কথা লিখে রেখেছিল—

“আজ যে জল বাঁচাব, আগামীকাল সেই জলই আমাদের বাঁচাবে।”

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

ডাকবাক্সের ভেতর যে স্বপ্নগুলো ছিল।

চন্দনপুর গ্রামের বাজারের শেষ মাথায় একটি ছোট্ট ডাকঘর ছিল। লাল রঙের দেওয়াল, টিনের ছাদ আর দরজার পাশে ঝুলে থাকা পুরোনো একটি ডাকবাক্স।

ডাকঘরটির পোস্টম্যান ছিলেন গোপালবাবু।

বয়স ষাটের কাছাকাছি। প্রতিদিন ভোরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। কারও চিঠি, কারও মানিঅর্ডার, কারও সরকারি কাগজ—সবকিছু ঠিক মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ।

গ্রামের মানুষ তাঁকে ভালোবাসত।

কারণ গোপালবাবু শুধু চিঠি পৌঁছে দিতেন না।

তিনি মানুষের অপেক্ষার মূল্য বুঝতেন।


একটি মেয়ের অপেক্ষা

গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে থাকত রূপা।

রূপার বাবা কয়েক বছর আগে কাজের জন্য অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছিলেন। ফোনে কথা হত, কিন্তু রূপার বাবা চিঠি লিখতে খুব ভালোবাসতেন।

প্রতি মাসে একটা করে চিঠি আসত।

রূপা গোপালবাবুকে দূর থেকেই দেখলেই দৌড়ে আসত।

—“কাকু, আমার বাবার চিঠি আছে?”

গোপালবাবু হাসতেন।

—“আজ নেই।”

রূপার মুখটা একটু ম্লান হয়ে যেত।

আবার অন্যদিন সাইকেলের ঘণ্টা শুনে ছুটে আসত।

একদিন গোপালবাবুর ব্যাগ থেকে সত্যিই একটি চিঠি বেরোল।

খামের ওপর লেখা—

“রূপার জন্য।”

রূপা চিঠিটা হাতে নিয়ে এত খুশি হল যে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

গোপালবাবু বললেন,

—“যা, বাবার চিঠি পড়।”

রূপা দৌড়ে বাড়ির দিকে চলে গেল।

গোপালবাবু তাকিয়ে রইলেন।

তিনি জানতেন, তাঁর হাতে শুধু একটা কাগজ ছিল না।

ছিল একজন বাবার ভালোবাসা।


ডাকবাক্সের রহস্য

একদিন ডাকঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে গোপালবাবু পুরোনো একটি বাক্স পেলেন।

বাক্সের ভেতরে ছিল বহু বছরের কিছু ফেরত না নেওয়া চিঠি।

কেউ ঠিকানা বদলে ফেলেছে।

কেউ গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে।

কেউ চিঠি নিতে আসেনি।

গোপালবাবু চিঠিগুলো দেখে ভাবলেন,

“এগুলোর ভেতরেও তো মানুষের গল্প আছে।”

তিনি চিঠিগুলো কাউকে পড়লেন না।

কারণ সেগুলো ব্যক্তিগত।

কিন্তু একটা বিষয় তাঁকে ভাবিয়ে তুলল—

গ্রামের অনেক মানুষ এখনও ঠিকভাবে চিঠি লিখতে পারে না।

কেউ নিজের কথা লিখতে পারে না।

কেউ দূরে থাকা সন্তানকে নিজের অনুভূতি জানাতে পারে না।


চিঠি লেখার ক্লাস

পরের রবিবার গোপালবাবু ডাকঘরের সামনে একটি ছোট্ট বোর্ড লাগালেন।

তাতে লেখা—

“চিঠি লিখতে শিখবেন? বিনামূল্যে।”

প্রথম দিন এল মাত্র দু’জন।

একজন বৃদ্ধ কৃষক।

আর একজন স্কুলছাত্র।

গোপালবাবু বললেন,

—“চিঠি লেখার জন্য বড় পড়াশোনা দরকার নেই। নিজের মনের কথাটা পরিষ্কার করে লিখলেই হয়।”

বৃদ্ধ কৃষক বললেন,

—“আমি ছেলেকে বলতে চাই, বাড়িতে ফিরে আসুক। কিন্তু কীভাবে লিখব?”

গোপালবাবু কাগজ এগিয়ে দিলেন।

—“আপনি যেমন করে আমাকে বললেন, তেমন করেই লিখুন।”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করলেন।


চিঠির ভাষা

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চিঠি লেখার ক্লাসে দশ-বারোজন আসতে শুরু করল।

কেউ ছেলেকে চিঠি লিখছে।

কেউ মেয়েকে।

কেউ দূরে থাকা ভাইকে।

কেউ পুরোনো বন্ধুকে।

গোপালবাবু কাউকে চিঠির বিষয়বস্তু জিজ্ঞেস করতেন না।

শুধু বলতেন,

—“মনের কথা লিখুন।”

একদিন রূপা ক্লাসে এসে বলল,

—“কাকু, আমি বাবাকে চিঠি লিখব।”

—“লিখ।”

—“কিন্তু কী লিখব?”

—“তুমি বাবাকে যা বলতে চাও, সেটাই লিখবে।”

রূপা লিখল—

“বাবা, তুমি দূরে আছ বলে আমাদের বাড়িটা মাঝে মাঝে খুব চুপচাপ লাগে। তুমি তাড়াতাড়ি এসো।”

চিঠি লেখা শেষ করে রূপা বলল,

—“কাকু, এটা কি খুব ছোট হয়ে গেল?”

গোপালবাবু বললেন,

—“না। ছোট চিঠির মধ্যেও বড় ভালোবাসা থাকতে পারে।”


একটি বড় সমস্যা

সেই বছর গ্রামের অনেক মানুষ কাজের জন্য বাইরে চলে গেল।

কেউ কলকাতায়।

কেউ দিল্লিতে।

কেউ কেরলে।

বাড়িতে রয়ে গেল বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানরা।

ফোনে সব কথা বলা সম্ভব হত না।

তখন গোপালবাবুর চিঠির ক্লাস আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।

তিনি গ্রামের মানুষদের শুধু চিঠি লিখতে শেখালেন না।

শেখালেন—

কীভাবে ঠিকানা লিখতে হয়।

কীভাবে সরকারি চিঠি বুঝতে হয়।

কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিরাপদে রাখতে হয়।

কীভাবে প্রাপকের নাম সঠিকভাবে লিখতে হয়।

ডাকঘরটা ধীরে ধীরে গ্রামের একটি ছোট শেখার জায়গায় পরিণত হল।


একদিন রূপার বাবা এলেন

অনেক মাস পর এক দুপুরে গোপালবাবু রূপাদের বাড়ির সামনে সাইকেল থামালেন।

রূপা ছুটে এল।

—“কাকু, বাবার চিঠি?”

গোপালবাবু বললেন,

—“আজ চিঠি নয়।”

রূপা অবাক।

—“তাহলে?”

পেছন থেকে একজন লোক এগিয়ে এলেন।

রূপা এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।

তারপর চিৎকার করে উঠল—

—“বাবা!”

সে দৌড়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

রূপার বাবা হাসতে হাসতে বললেন,

—“তোর চিঠি পেয়েছিলাম।”

রূপা বলল,

—“তাই এসেছ?”

বাবা মাথা নাড়লেন।

—“তোর চিঠিটা পড়ে বুঝলাম, অনেকদিন হয়ে গেছে।”

গোপালবাবু একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

রূপার বাবা তাঁর কাছে এসে বললেন,

—“আপনি চিঠিটা পৌঁছে না দিলে হয়তো আমি বুঝতেই পারতাম না।”

গোপালবাবু বললেন,

—“আমি শুধু পৌঁছে দিয়েছি। কথাগুলো তো তোমার মেয়ের।”


অবসরের সময়

আরও কয়েক বছর কেটে গেল।

গোপালবাবুর অবসরের সময় এসে গেল।

শেষ দিন ডাকঘরে গ্রামের অনেক মানুষ এল।

রূপাও এল।

তখন সে কলেজে পড়ে।

রূপা একটি খাম গোপালবাবুর হাতে দিল।

—“কাকু, এটা আপনার জন্য।”

গোপালবাবু অবাক হয়ে খাম খুললেন।

ভেতরে একটি চিঠি।

রূপা লিখেছে—

“আপনি আমাদের চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, আপনি আমাদের কথা বলতে শিখিয়েছেন। আপনি না থাকলে হয়তো আমি বাবাকে আমার মনের কথাগুলো কোনোদিন লিখতে পারতাম না।”

গোপালবাবু চিঠিটি পড়ে চোখ মুছলেন।

বললেন,

—“এবার তুই চিঠি লিখবি অন্যদের।”

রূপা হেসে বলল,

—“আপনার কাছ থেকেই শিখেছি।”


শেষ ডাক

অবসরের দিন সন্ধ্যায় গোপালবাবু একবার শেষবারের মতো ডাকঘরের সামনে দাঁড়ালেন।

লাল ডাকবাক্সটি তাঁর চোখে পড়ল।

তিনি হাত দিয়ে বাক্সটির গায়ে আলতো করে স্পর্শ করলেন।

কত হাজার চিঠি যে এই বাক্সে পড়েছে!

কত মানুষের আনন্দ।

কত মানুষের দুঃখ।

কত অপেক্ষা।

কত বিচ্ছেদ।

কত ফিরে আসা।

সবই যেন এই ছোট্ট ডাকবাক্সের মধ্যে জমে ছিল।

হঠাৎ পেছন থেকে রূপা বলল,

—“কাকু!”

তিনি ঘুরে তাকালেন।

রূপা বলল,

—“আপনি আর চিঠি পৌঁছে দেবেন না?”

গোপালবাবু হেসে বললেন,

—“চিঠি পৌঁছে দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে।”

—“তাহলে এখন কী করবেন?”

গোপালবাবু বললেন,

—“এখন মানুষের গল্প শুনব।”

রূপা বলল,

—“গল্প?”

—“হ্যাঁ। এত বছর চিঠি পৌঁছে দিয়েছি। এবার গল্পগুলো মনে রাখব।”


গোপালবাবু চলে গেলেন।

ডাকঘরের দরজা বন্ধ হল।

কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে তাঁর কাজ শেষ হল না।

চিঠি লেখার ছোট্ট ক্লাসটি চলতে থাকল।

রূপা সেটির দায়িত্ব নিল।

নতুন ছেলেমেয়েরা সেখানে এসে চিঠি লিখতে শিখতে লাগল।

ডাকবাক্সটিও রয়ে গেল।

প্রতিদিন তার ভেতরে নতুন চিঠি পড়ত।

আর প্রতিটি চিঠি যেন মনে করিয়ে দিত—

দূরত্ব যতই হোক, মনের কথা পৌঁছে দেওয়ার পথ মানুষ সবসময় খুঁজে নিতে পারে।

কখনও ফোনে।

কখনও কথায়।

কখনও একটি ছোট্ট কাগজে লেখা কয়েকটি শব্দে।

আর কখনও—

একজন মানুষের আন্তরিকতার মাধ্যমে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

গল্প : নদীর ওপারের আলো।।

পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রাম—চরনদী। গ্রামের একদিকে বিস্তীর্ণ নদী, অন্যদিকে ধানক্ষেত। বর্ষাকালে নদী ফুলে-ফেঁপে উঠলে গ্রামের সঙ্গে পাশের শহরের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
নদীর ওপারে ছিল একটি ছোট হাসপাতাল। তাই গ্রামের মানুষের কাছে নদী শুধু জলধারা নয়—জীবন-মরণের সীমানা।
সেই নদীতে নৌকা চালাতেন গদাধর মাঝি। বয়স ষাটের বেশি। তাঁর ছোট্ট কাঠের নৌকার নাম ছিল “আলো”।
নৌকার সামনের দিকে তিনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটি কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে রাখতেন।
গ্রামের সবাই জানত—
নদীর ওপারে যদি রাতের অন্ধকারে সেই আলো দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে গদাধর মাঝি এখনও নদীতে আছেন।
আলোর গল্প
একদিন গ্রামের স্কুলছাত্র অভি গদাধর মাঝিকে জিজ্ঞেস করল,
— “মাঝিকাকু, আপনার নৌকার নাম ‘আলো’ কেন?”
গদাধর কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “অনেক বছর আগে এক রাতে আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তখন এই নদীতে কোনো নৌকা ছিল না। অনেক দেরিতে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। কিন্তু তাকে আর বাঁচানো যায়নি।”
অভি চুপ করে গেল।
গদাধর আবার বললেন,
— “সেই রাত থেকে ঠিক করেছি, আমার নৌকা যতদিন চলবে, কোনো অসুস্থ মানুষ যেন শুধু নদীর কারণে হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি না করে।”
অভি বলল,
— “তাই নৌকার নাম ‘আলো’?”
— “হ্যাঁ। কারণ সেদিন যদি নদীর ওপারে একটা আলো থাকত, হয়তো আমার জীবনটাও অন্যরকম হতো।”
ঝড়ের রাত
এক বর্ষার রাতে হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলো।
বৃষ্টি, বজ্রপাত আর তীব্র বাতাসে নদী উত্তাল হয়ে উঠল।
সব নৌকা ঘাটে তুলে রাখা হলো।
গদাধর মাঝিও নৌকা বেঁধে বাড়ি ফিরছিলেন।
ঠিক তখনই গ্রামের এক যুবক ছুটে এসে বলল,
— “কাকা! রমেনদার বউয়ের প্রসববেদনা উঠেছে। অবস্থা খুব খারাপ। হাসপাতালে নিতে হবে।”
সবাই নদীর দিকে তাকাল।
এমন নদীতে নৌকা চালানো প্রায় অসম্ভব।
কেউ বলল,
— “আজ আর যাওয়া যাবে না।”
গদাধর কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর নিজের নৌকার দিকে এগিয়ে গেলেন।
— “আলোটা জ্বেলে দাও।”
একজন বলল,
— “কাকা, নদী আজ খুব খারাপ।”
গদাধর উত্তর দিলেন,
— “আমি জানি। কিন্তু ওই মেয়েটার জন্য নদী আজ একটু কম খারাপ হতে হবে।”
অন্ধকার নদী
নৌকায় উঠলেন গদাধর, রমেন এবং তাঁর স্ত্রী।
বাতাসে নৌকা বারবার দুলছিল।
রমেন ভয়ে কাঁপছিল।
— “কাকা, যদি কিছু হয়?”
গদাধর বললেন,
— “আমার দিকে তাকিও না। ওই আলোটার দিকে তাকিয়ে থাকো।”
নৌকার সামনে ছোট্ট কেরোসিনের বাতিটি ঝড়ের মধ্যে দুলছিল।
কখনও মনে হচ্ছিল নিভে যাবে।
আবার মুহূর্ত পরে জ্বলে উঠছিল।
গদাধর দাঁড় শক্ত করে ধরে নদীর স্রোতের সঙ্গে লড়াই করতে লাগলেন।
হঠাৎ বিশাল একটি ঢেউ নৌকার ওপর আছড়ে পড়ল।
রমেনের স্ত্রী চিৎকার করে উঠলেন।
নৌকা প্রায় উল্টে যাচ্ছিল।
গদাধর সমস্ত শক্তি দিয়ে দাঁড় সামলে নিলেন।
তিনি বললেন,
— “ভয় পেও না। আলো এখনও জ্বলছে।”
হাসপাতালে পৌঁছনো
প্রায় এক ঘণ্টার সংগ্রামের পর নৌকা নদীর ওপারে পৌঁছাল।
হাসপাতালের কর্মীরা দ্রুত মহিলাটিকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
গদাধর বাইরে বসে ভিজতে ভিজতে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বেরিয়ে এসে হাসলেন।
— “মা ও সন্তান দুজনেই ভালো আছে।”
রমেন গদাধরের পা জড়িয়ে ধরল।
— “কাকা, আপনি না থাকলে…”
গদাধর তাকে থামিয়ে দিলেন।
— “আমার কিছু করিনি। নৌকাটা করেছে।”
তারপর নৌকার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “আর ওই আলোটা।”
আলোর উত্তরাধিকার
বছর কেটে গেল।
অভি বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হলো। শহরে চাকরি পেল।
কিন্তু গ্রামের সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনও ছিন্ন হয়নি।
একদিন সে জানতে পারল, গদাধর মাঝি আর নৌকা চালাতে পারছেন না।
বয়স হয়েছে।
নৌকাটিও পুরোনো হয়ে গেছে।
অভি শহর থেকে গ্রামে ফিরে এল।
সে গ্রামের কয়েকজন যুবককে নিয়ে একটি নতুন নৌকা তৈরি করল।
নৌকাটির নাম রাখা হলো—
“নতুন আলো”।
এটি শুধু যাত্রী পারাপারের জন্য নয়, জরুরি রোগী পরিবহনের জন্যও ব্যবহার করা হবে।
নৌকায় রাখা হলো—
প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স, অক্সিজেন সিলিন্ডার, জরুরি ওষুধ এবং একটি শক্তিশালী আলো।
উদ্বোধনের দিন অভি গদাধর মাঝির হাতে নৌকার প্রথম দাঁড়টি তুলে দিল।
গদাধরের চোখে জল এসে গেল।
— “আমি তো ভাবিনি আমার ছোট্ট নৌকার আলো এত দূর যাবে।”
অভি বলল,
— “আলো কখনও এক জায়গায় থাকে না কাকা। একজন জ্বালালে অন্যজন তা নিয়ে এগিয়ে যায়।”
শেষ রাত
কয়েক বছর পর গদাধর মাঝি অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
এক শীতের রাতে তিনি বিছানায় শুয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
দূরে নদীর ওপারে একটি আলো দেখা যাচ্ছিল।
তিনি ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন,
— “ওটা কী?”
ছেলে বলল,
— “নতুন আলোর নৌকা। আজও একজন রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে।”
গদাধর মৃদু হাসলেন।
চোখ বন্ধ করে বললেন,
— “তাহলে আলোটা এখনও জ্বলছে।”
সেটাই ছিল তাঁর শেষ কথা।
আজ চরনদীর নদীতে রাত নামলে একসঙ্গে অনেক আলো দেখা যায়।
একটি নৌকা এপারে আসে।
আরেকটি ওপারে যায়।
কেউ বাজার থেকে ফেরে।
কেউ হাসপাতালে যায়।
কেউ বাড়ি ফিরছে।
কিন্তু গ্রামের মানুষ জানে—
এই সব আলোর শুরু হয়েছিল একটি ছোট্ট কেরোসিনের বাতি থেকে।
একজন মানুষ নিজের হারানো জীবনের কষ্টকে অন্য মানুষের বাঁচার আশায় পরিণত করেছিলেন।
নদীর ওপারে আজও সন্ধ্যার পর আলো জ্বলে।
আর সেই আলো যেন দূর থেকে বলে—
“অন্ধকার যত গভীরই হোক, একজন মানুষের ছোট্ট সাহসও অন্য কারও কাছে পথের দিশা হয়ে উঠতে পারে।”
নদী বয়ে চলে।
সময়ও বয়ে চলে।
মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়।
কিন্তু কিছু আলো—
নদীর ওপারেও পৌঁছে যায়।
সমাপ্ত। 🪔🌊❤️

Share This
Categories
গল্প

পুরোনো বইয়ের দোকান।।

কলকাতার কলেজ স্ট্রিট। বইয়ের গন্ধে ভরা এক অনন্য জগৎ। নতুন বইয়ের ভিড়ের মাঝেই একটি ছোট্ট, প্রায় ভুলে যাওয়া দোকান ছিল—”জ্ঞানদীপ বুক স্টল”। দোকানটি এতটাই ছোট যে একসঙ্গে তিনজনের বেশি ঢুকলে নড়াচড়া করাও কঠিন হয়ে যেত।
দোকানের মালিক ছিলেন নির্মলবাবু। বয়স প্রায় আশি। সাদা ধুতি, ধূসর পাঞ্জাবি, নাকে গোল চশমা। তিনি শুধু বই বিক্রি করতেন না, বইকে ভালোবাসতেন। প্রতিটি বইয়ের অবস্থান তাঁর মুখস্থ ছিল।
তিনি বলতেন,
“বই কখনও পুরোনো হয় না, শুধু পাঠক বদলে যায়।”
এক অদ্ভুত বই
একদিন ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করা এক কলেজছাত্র, ঋষভ, দোকানে এল।
— “কাকু, বাংলার ইতিহাসের ওপর কোনো বিরল বই আছে?”
নির্মলবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর দোকানের একেবারে উপরের তাক থেকে ধুলো জমা একটি বই নামালেন।
বইটির নাম ছিল—
“সময়ের সিন্দুক”
বইটির কোনো লেখকের নাম নেই।
প্রথম পাতায় শুধু লেখা—
“যে পড়বে, সে নিজের জীবনের উত্তর খুঁজে পাবে।”
ঋষভ অবাক হয়ে বইটি কিনে বাড়ি নিয়ে গেল।
অদ্ভুত আবিষ্কার
বইটি পড়তে পড়তে হঠাৎ সে দেখতে পেল, মাঝখানে একটি হলুদ হয়ে যাওয়া খাম রাখা।
খামের ওপর লেখা—
“যে মানুষ এই বইটি পাবে, তার জন্য।”
ভেতরে একটি হাতে লেখা চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
“জীবনে বড় হওয়ার আগে ভালো মানুষ হও। কারণ বড় মানুষকে সবাই মনে রাখে না, কিন্তু ভালো মানুষকে কেউ ভুলে যায় না।”
ঋষভ চিঠিটি পড়ে গভীরভাবে ভাবতে লাগল।
এত বছর ধরে বইয়ের ভেতর এই চিঠি ছিল, অথচ কেউ খুঁজে পায়নি!
বইও মানুষের মতো
পরদিন সে নির্মলবাবুর কাছে ফিরে এল।
— “কাকু, চিঠিটা কে লিখেছিলেন?”
নির্মলবাবু মৃদু হেসে বললেন,
— “আমি জানি না।”
— “তাহলে?”
— “কিছু প্রশ্নের উত্তর না জানাই ভালো। কারণ উত্তর খুঁজতে গিয়েই মানুষ নতুন কিছু শেখে।”
তারপর তিনি দোকানের চারদিকে তাকিয়ে বললেন,
— “জানো, এই দোকানের প্রতিটি বইয়েরও একটা জীবন আছে।”
ঋষভ বিস্মিত।
— “জীবন?”
— “হ্যাঁ। কোনো বই একজন ডাক্তার তৈরি করেছে, কোনো বই একজন কবি, কোনো বই আবার একজন শিক্ষক। বই শুধু তথ্য দেয় না, মানুষও গড়ে।”
শেষ ইচ্ছা
কয়েক মাস পরে নির্মলবাবু অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
ঋষভ তাঁকে দেখতে গেল।
নির্মলবাবু বললেন,
— “আমি হয়তো আর বেশিদিন দোকানে বসতে পারব না।”
ঋষভের চোখ ভিজে উঠল।
— “আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।”
নির্মলবাবু মৃদু হেসে বললেন,
— “একটা কথা রাখবে?”
— “অবশ্যই।”
— “এই দোকানটা যেন কোনোদিন বন্ধ না হয়।”
একটি নতুন শুরু
কিছুদিন পরে নির্মলবাবু পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
কলেজ স্ট্রিটের মানুষ শোকাহত।
ঋষভ নিজের বন্ধুদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নিল—
দোকানটি বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না।
তারা সবাই মিলে দোকানটির সংস্কার করল।
নতুন রং করা হলো, কিন্তু পুরোনো কাঠের তাকগুলো আগের মতোই রেখে দেওয়া হলো।
দোকানের এক কোণে একটি ছোট্ট পাঠকক্ষ তৈরি করা হলো, যেখানে যে কেউ বিনামূল্যে বসে বই পড়তে পারে।
বইয়ের আলো
একদিন এক দরিদ্র স্কুলছাত্র দোকানে এসে বলল,
— “দাদা, বই কেনার টাকা নেই।”
ঋষভ হাসিমুখে একটি বই এগিয়ে দিয়ে বলল,
— “পড়ে ফেরত দিয়ে যেও।”
ছেলেটি অবাক।
— “টাকা লাগবে না?”
— “না। কারণ জ্ঞান বিক্রি করার জিনিস নয়, ভাগ করে নেওয়ার জিনিস।”
সেই মুহূর্তে ঋষভের মনে হলো, নির্মলবাবু যেন ঠিক তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন।
শেষ দৃশ্য
আজ বহু বছর কেটে গেছে।
“জ্ঞানদীপ বুক স্টল” এখনও কলেজ স্ট্রিটে রয়েছে।
দোকানের দরজার ওপরে নির্মলবাবুর একটি ছোট্ট ছবি ঝুলছে।
তার নিচে লেখা—
“একটি ভালো বই একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।”
প্রতিদিন অসংখ্য ছাত্রছাত্রী সেখানে আসে।
কেউ বই কিনে।
কেউ বই পড়ে।
কেউ শুধু পুরোনো বইয়ের গন্ধ নিতে আসে।
আর দোকানের ভেতরে কোথাও যেন এখনও নির্মলবাবুর কণ্ঠ ভেসে আসে—
“বইকে ভালোবাসো। কারণ বই কখনও তোমাকে একা থাকতে দেবে না।”
ঋষভ যখনই নতুন কোনো পাঠকের হাতে একটি বই তুলে দেয়, তার মনে হয়—
একজন মানুষ হয়তো চলে গেছেন,
কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আজও প্রতিটি বইয়ের পাতায় বেঁচে আছে।
সমাপ্ত। 📚✨❤️

Share This